إِنَّ زَلْزَلَةَ ٱلسَّاعَةِ شَىْءٌ عَظِيمٌ
কিয়ামত
কুরআন ও সহিহ হাদিসে কিয়ামতের পুরো যাত্রা: ছোট ও বড় আলামত, শিঙায় ফুঁ, হাশরের মাঠ, মহাসুপারিশ, আমলনামা, মীযান, হাউযে কাউসার আর পুলসিরাত। প্রতিটি ধাপের সাথে সেদিনের জন্য আজকের আমল।
কিয়ামতের কথা পড়ার উদ্দেশ্য ভয়ে থেমে যাওয়া নয়, প্রস্তুত হওয়া। এক সাহাবি নবীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিয়ামত কবে? নবীজি পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, তার জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ? (সহিহ বুখারী ৩৬৮৮) এই পাতার প্রতিটি কথার পাশে সূত্র ও মান দেওয়া আছে; দলিল হিসেবে শুধু কুরআন এবং সহিহ ও হাসান হাদিস নেওয়া হয়েছে।
কিয়ামত কবে?
সময় শুধু আল্লাহ জানেন, তবে তা কাছে
কিয়ামত মানে এই পৃথিবীর শেষ, আর সব মানুষের আবার জীবিত হয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো। আখিরাতে বিশ্বাস ঈমানের ছয় স্তম্ভের একটি। এর সময় কেউ জানে না, কিন্তু নবীজি (ﷺ) এর আগের অনেক আলামত জানিয়ে গেছেন, যাতে আমরা সময় থাকতে প্রস্তুত হই।
- মানুষ কিয়ামতের সময় জানতে চায়; বলে দিন, এর জ্ঞান শুধু আমার রবের কাছে। হয়তো তা খুব কাছেই।সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৭ · সূরা আল-আহযাব ৩৩:৬৩
- কিয়ামতের জ্ঞান আল্লাহর কাছে; এটা সেই পাঁচ গায়েবের একটি, যা তিনি ছাড়া কেউ জানে না।সূরা লুকমান ৩১:৩৪ · সহিহ বুখারী ৫০সহিহ
- তবু তা কাছে: নবীজির আগমন আর কিয়ামত দুই আঙুলের মতো পাশাপাশি।সহিহ বুখারী ৬৫০৪সহিহ
- কিয়ামত আসবে হঠাৎ, মানুষ যখন বেচাকেনা আর নিজের কাজে ব্যস্ত।সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৭
- কিয়ামত হবে শুধু নিকৃষ্ট মানুষদের উপর; পৃথিবীতে যতদিন কেউ "আল্লাহ, আল্লাহ" বলবে, ততদিন তা হবে না।সহিহ মুসলিম ২৯৪৯সহিহ · সহিহ মুসলিম ১৪৮সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ২টি আয়াত
يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي ۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ ۚ ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً ۗ يَسْأَلُونَكَ كَأَنَّكَ حَفِيٌّ عَنْهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ اللَّهِ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
তারা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে (বলে) ‘তা কখন ঘটবে? বলুন, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার রবেরই নিকট। শুধু তিনিই যথাসময়ে সেটার প্রকাশ ঘটাবেন; আসমানসমূহ ও যমীনে সেটা ভারী বিষয়। হঠাৎ করেই তা তোমাদের উপর আসবে।’ আপনি এ বিষয়ে সবিশেষ জ্ঞানী মনে করে তারা আপনাকে প্রশ্ন করে। বলুন, ‘এ বিষয়ে জ্ঞান শুধু আল্লাহ্রই নিকট, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।
إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
নিশ্চয় আল্লাহ্, তাঁর কাছেই রয়েছে কিয়ামতের জ্ঞান, তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনি জানেন যা মাতৃগর্ভে আছে। আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কি অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন্ স্থানে তার মৃত্যু ঘটবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।
قَالَ مَتَى السَّاعَةُ قَالَ " مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ، وَسَأُخْبِرُكَ عَنْ أَشْرَاطِهَا إِذَا وَلَدَتِ الأَمَةُ رَبَّهَا، وَإِذَا تَطَاوَلَ رُعَاةُ الإِبِلِ الْبُهْمُ فِي الْبُنْيَانِ، فِي خَمْسٍ لاَ يَعْلَمُهُنَّ إِلاَّ اللَّهُ
(জিবরীল মানুষের রূপে এসে) জিজ্ঞেস করলেন: কিয়ামত কবে? নবীজি বললেন: যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, সে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না। তবে আমি তোমাকে এর কিছু আলামত বলছি: যখন দাসী তার মনিবকে জন্ম দেবে, আর যখন উটের কালো রাখালরা উঁচু উঁচু দালান বানানোর প্রতিযোগিতা করবে। কিয়ামতের সময় সেই পাঁচ জিনিসের একটি, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةَ كَهَاتَيْنِ
আমাকে আর কিয়ামতকে পাঠানো হয়েছে এই দুটির মতো (পাশাপাশি)। (বলে তিনি শাহাদাত আঙুল ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি দেখালেন।)
ছোট আলামত
যার অনেকগুলো ঘটে গেছে, অনেকগুলো চোখের সামনে
ছোট আলামত হলো সেসব ঘটনা, যা কিয়ামতের অনেক আগে থেকে ধীরে ধীরে দেখা দেয়। নবীজির (ﷺ) আগমন দিয়ে এর শুরু। নিচে সহিহ হাদিসে আসা আলামতগুলো সাজানো হলো; উপরের বোতাম দিয়ে আলাদা করে দেখতে পারেন।
- ঘটে গেছেনবীজির (ﷺ) আগমন ও ইন্তিকাল
তিনি নিজেই বলেছেন, তাঁর আগমন আর কিয়ামত দুই আঙুলের মতো পাশাপাশি। ছয়টি আলামতের প্রথমটিই তাঁর মৃত্যু।
সহিহ বুখারী ৬৫০৪সহিহ · সহিহ বুখারী ৩১৭৬সহিহ - ঘটে গেছেচাঁদ দুই ভাগ হওয়া
মক্কার লোকেরা নিদর্শন চাইলে নবীজির সময়েই এটা ঘটেছিল, আর কুরআন একে কিয়ামত কাছে আসার সাথে জুড়ে দিয়েছে।
সূরা আল-কামার ৫৪:১ · সহিহ বুখারী ৩৬৩৭সহিহ - ঘটে গেছেবায়তুল মাকদিস বিজয়
উমার (রা.)-এর খিলাফতে, ১৬ হিজরিতে (৬৩৭ খ্রি.) মুসলিমরা বায়তুল মাকদিস জয় করেন।
সহিহ বুখারী ৩১৭৬সহিহ - ঘটে গেছেভেড়ার রোগের মতো দ্রুত মৃত্যু ঘটানো মহামারি
ইবনু হাজার (ফাতহুল বারী) বলেছেন, এর বাস্তবায়ন হয়েছে ১৮ হিজরির আমওয়াসের প্লেগে, যাতে বহু সাহাবি শহীদ হন।
সহিহ বুখারী ৩১৭৬সহিহ - ঘটে গেছেএকই দাওয়াতের দুই বড় দলের যুদ্ধ
দুই দলের দাবি একই, তবু ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। ইবনু হাজার এর উদাহরণ হিসেবে আলী (রা.) ও মুআবিয়া (রা.)-এর দলের সিফফীনের যুদ্ধের কথা বলেছেন।
সহিহ বুখারী ৭১২১সহিহ - ঘটে গেছেহিজাযের আগুন, যার আলো বুসরায় পৌঁছাবে
৬৫৪ হিজরিতে মদিনার কাছে আগ্নেয়গিরির বিশাল আগুন দেখা দেয়; ইমাম নববী ও ইবনু কাসীর একে এই হাদিসের বাস্তবায়ন বলেছেন।
সহিহ বুখারী ৭১১৮সহিহ - দেখা যাচ্ছেনবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদার
প্রায় ত্রিশজন "দাজ্জাল" নিজেকে নবী দাবি করবে। মুসাইলামা থেকে শুরু করে ইতিহাসে এমন অনেকে এসেছে।
সহিহ বুখারী ৭১২১সহিহ - দেখা যাচ্ছেদাসী তার মনিবকে জন্ম দেবে
আলেমরা এর কয়েকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন; একটি হলো, সন্তান মায়ের সাথে মনিবের মতো আচরণ করবে।
সহিহ বুখারী ৫০সহিহ - দেখা যাচ্ছেখালি পায়ের রাখালদের উঁচু দালানের প্রতিযোগিতা
যারা একসময় মরুভূমিতে পশু চরাত, তারা উঁচু দালান বানানোয় একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে চাইবে।
সহিহ বুখারী ৫০সহিহ · সহিহ বুখারী ৭১২১সহিহ - দেখা যাচ্ছেইলম উঠে যাওয়া, অজ্ঞতা ছড়ানো
আলেমদের চলে যাওয়ার সাথে দ্বীনের জ্ঞান কমবে, আর না জেনে ফতোয়া দেওয়া বাড়বে।
সহিহ বুখারী ৮১সহিহ · সহিহ বুখারী ৭১২১সহিহ - দেখা যাচ্ছেজিনা প্রকাশ্য হওয়া
যে গুনাহ মানুষ লুকিয়ে করত, তা খোলাখুলি হবে।
সহিহ বুখারী ৮১সহিহ - দেখা যাচ্ছেআমানত নষ্ট, অযোগ্যের হাতে দায়িত্ব
আমানত নষ্টের একটি রূপ: দায়িত্ব এমন লোকের হাতে যাবে, যে তার যোগ্য নয়।
সহিহ বুখারী ৫৯সহিহ - দেখা যাচ্ছেহত্যা আর ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়া, সময় দ্রুত ফুরানো
হারজ, অর্থাৎ হত্যা বাড়বে; ভূমিকম্প বেশি হবে; সময় থেকে বরকত উঠে গিয়ে দিন-মাস দ্রুত চলে যাবে।
সহিহ বুখারী ৭১২১সহিহ - এখনো বাকিনারীর সংখ্যা বেশি, পঞ্চাশজন নারীর একজন অভিভাবক
পুরুষ কমে যাওয়ার এই চরম অবস্থা এখনো আসেনি।
সহিহ বুখারী ৮১সহিহ - এখনো বাকিসদকা নেওয়ার মানুষ থাকবে না
সম্পদ এত বাড়বে যে সদকা দিতে চাইলে মানুষ বলবে, আমার দরকার নেই।
সহিহ বুখারী ৭১২১সহিহ - এখনো বাকিকবরের পাশে দাঁড়িয়ে মৃতের জায়গা কামনা
ফিতনা এত কঠিন হবে যে জীবিত মানুষ কবরের মৃতকে ঈর্ষা করবে।
সহিহ বুখারী ৭১২১সহিহ - এখনো বাকিফোরাত নদী থেকে সোনার পাহাড়
ফোরাত সরে গিয়ে সোনার পাহাড় বের হবে; নবীজি এ থেকে কিছু নিতে নিষেধ করেছেন।
সহিহ বুখারী ৭১১৯সহিহ - এখনো বাকিরোমানদের সাথে সন্ধি ও বিশ্বাসঘাতকতা
সন্ধির পর তারা আশিটি পতাকার নিচে, প্রতিটিতে বারো হাজার সৈন্য নিয়ে আসবে।
সহিহ বুখারী ৩১৭৬সহিহ
অবস্থা কীভাবে লেখা হলো: "ঘটে গেছে" লেখা হয়েছে ইতিহাস আর ইবনু হাজার, নববী, ইবনু কাসীরের মতো আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী। "দেখা যাচ্ছে" মানে লক্ষণ চোখে পড়ছে, পূর্ণ রূপ কখন হবে তা আল্লাহই জানেন। কোনো আলামত দেখে নির্দিষ্ট সাল ঠিক করা যায় না।
পুরো দলিল পড়ুন ৫টি হাদিস, ১টি আয়াত
কিয়ামত হবে না যতক্ষণ না: একই দাওয়াতের দাবিদার দুটি বড় দল পরস্পর যুদ্ধ করবে, তাদের মাঝে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড হবে; প্রায় ত্রিশজন মিথ্যাবাদী দাজ্জাল আসবে, প্রত্যেকে নিজেকে আল্লাহর রাসূল দাবি করবে; ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে; ভূমিকম্প বেড়ে যাবে; সময় দ্রুত ফুরাবে; ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে; "হারজ" অর্থাৎ হত্যা বেড়ে যাবে; তোমাদের মাঝে সম্পদ এত বাড়বে যে সম্পদের মালিক চিন্তায় পড়বে, কে তার সদকা নেবে, আর যাকে দিতে চাইবে সে বলবে, আমার দরকার নেই; মানুষ উঁচু দালান বানানোর প্রতিযোগিতা করবে; আর মানুষ কারো কবরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলবে, আহা, আমি যদি তার জায়গায় থাকতাম!
(তাবুক যুদ্ধের সময় নবীজি বললেন:) কিয়ামতের আগে ছয়টি জিনিস গুনে রাখো: আমার মৃত্যু; তারপর বায়তুল মাকদিস বিজয়; তারপর এমন মহামারি, যা তোমাদের মাঝে ভেড়ার রোগের মতো দ্রুত মৃত্যু ঘটাবে; তারপর সম্পদের প্রাচুর্য, এমনকি কাউকে একশ দিনার দিলেও সে অসন্তুষ্ট থাকবে; তারপর এমন ফিতনা, যা আরবের প্রতিটি ঘরে ঢুকবে; তারপর তোমাদের আর বনুল আসফারের (রোমানদের) মাঝে সন্ধি হবে, কিন্তু তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং আশিটি পতাকার নিচে তোমাদের বিরুদ্ধে আসবে, প্রতিটি পতাকার নিচে বারো হাজার।
مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ يَقِلَّ الْعِلْمُ، وَيَظْهَرَ الْجَهْلُ، وَيَظْهَرَ الزِّنَا، وَتَكْثُرَ النِّسَاءُ وَيَقِلَّ الرِّجَالُ، حَتَّى يَكُونَ لِخَمْسِينَ امْرَأَةً الْقَيِّمُ الْوَاحِدُ
কিয়ামতের আলামতের মধ্যে আছে: ইলম কমে যাবে, অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়বে, জিনা প্রকাশ্য হবে, নারীর সংখ্যা বাড়বে আর পুরুষ কমবে, এমনকি পঞ্চাশজন নারীর দেখাশোনার জন্য একজন পুরুষ থাকবে।
فَإِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ … إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ
(এক বেদুইন জিজ্ঞেস করেছিল, কিয়ামত কবে। কথা শেষ করে নবীজি বললেন:) কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়? সে বলল: এই যে আমি। তিনি বললেন: যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো। সে জিজ্ঞেস করল: আমানত নষ্ট হবে কীভাবে? তিনি বললেন: যখন দায়িত্ব অযোগ্য লোকের হাতে দেওয়া হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।
لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَخْرُجَ نَارٌ مِنْ أَرْضِ الْحِجَازِ، تُضِيءُ أَعْنَاقَ الإِبِلِ بِبُصْرَى
কিয়ামত হবে না যতক্ষণ না হিজাযের ভূমি থেকে এমন আগুন বের হবে, যা (শামের) বুসরায় উটের ঘাড় আলোকিত করবে।
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانشَقَّ الْقَمَرُ
কিয়ামত কাছাকাছি হয়েছে, আর চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে,
- আমানত রক্ষা: যে দায়িত্ব পেয়েছেন, তা ঠিকভাবে পালন (সহিহ বুখারী ৫৯)
- প্রতিদিন দ্বীনের একটু ইলম শেখা
বড় দশ আলামত
এগুলো এলে কিয়ামত একেবারে দরজায়
সাহাবিরা একদিন কিয়ামত নিয়ে কথা বলছিলেন। নবীজি (ﷺ) বললেন, দশটি নিদর্শন না দেখা পর্যন্ত কিয়ামত হবে না। এগুলো হবে অস্বাভাবিক, পুরো দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা, আর একটার পর একটা দ্রুত আসবে।
মূল হাদিস: সহিহ মুসলিম ২৯০১সহিহ
- ১ধোঁয়া (দুখান)
আকাশ স্পষ্ট ধোঁয়া নিয়ে আসবে, যা মানুষকে ঢেকে ফেলবে। ইবনু মাসঊদ (রা.) আয়াতটিকে কুরাইশের দুর্ভিক্ষের সাথে মিলিয়েছেন, কিন্তু এই হাদিস ধোঁয়াকে ভবিষ্যতের আলামতের মধ্যে গুনেছে; তাই অনেক আলেম বলেছেন, বড় ধোঁয়া এখনো আসবে।
সূরা আদ-দুখান ৪৪:১০ · সূরা আদ-দুখান ৪৪:১১ · সহিহ বুখারী ৪৮২১সহিহ - ২দাজ্জাল
এক চোখ কানা, কপালে "কাফির" লেখা মিথ্যাবাদী, যার ব্যাপারে প্রত্যেক নবী সাবধান করেছেন। মক্কা ও মদিনায় সে ঢুকতে পারবে না। বাঁচার উপায়: সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত আর নামাজে আশ্রয় চাওয়া।
সহিহ বুখারী ৭১৩১সহিহ · সহিহ বুখারী ১৮৮১সহিহ · সহিহ মুসলিম ৮০৯সহিহ - ৩দাব্বাতুল আরদ
মাটি থেকে বের হওয়া এক প্রাণী, যা মানুষের সাথে কথা বলবে। এর আকৃতি নিয়ে প্রচলিত বিস্তারিত বর্ণনাগুলো সহিহ নয়; কুরআন ও সহিহ হাদিসে যতটুকু আছে, ততটুকুই বিশ্বাস করি।
সূরা আন-নামল ২৭:৮২ · সহিহ মুসলিম ১৫৮সহিহ - ৪পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠা
এটা দেখে সবাই ঈমান আনবে, কিন্তু তখন আর আগে ঈমান না আনা কারো ঈমান কাজে আসবে না। তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।
সূরা আল-আনআম ৬:১৫৮ · সহিহ বুখারী ৪৬৩৫সহিহ - ৫ঈসা (আ.)-এর অবতরণ
দামেস্কের পূর্বে সাদা মিনারের কাছে নামবেন, দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ক্রুশ ভাঙবেন, ন্যায়বিচারক শাসক হবেন।
সূরা আন-নিসা ৪:১৫৯ · সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৬১ · সহিহ বুখারী ৩৪৪৮সহিহ · সহিহ মুসলিম ২৯৩৭সহিহ - ৬ইয়াজুজ-মাজুজ
যুলকারনাইনের প্রাচীরের ওপারে আটকে থাকা দুই জাতি; ঈসা (আ.)-এর যুগে তারা প্রতিটি উঁচু জায়গা থেকে নেমে আসবে।
সূরা আল-কাহফ ১৮:৯৪ · সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৯৬ · সহিহ বুখারী ৩৩৪৬সহিহ - ৭পূর্বে ভূমিধস
পৃথিবীর পূর্বাঞ্চলে বিশাল ভূমিধস।
সহিহ মুসলিম ২৯০১সহিহ - ৮পশ্চিমে ভূমিধস
পৃথিবীর পশ্চিমাঞ্চলে বিশাল ভূমিধস।
সহিহ মুসলিম ২৯০১সহিহ - ৯আরব উপদ্বীপে ভূমিধস
আরব উপদ্বীপে বিশাল ভূমিধস।
সহিহ মুসলিম ২৯০১সহিহ - ১০ইয়েমেনের আগুন
সবশেষ আলামত: ইয়েমেন থেকে বের হওয়া আগুন মানুষকে তাদের হাশরের জায়গার দিকে তাড়িয়ে নেবে।
সহিহ মুসলিম ২৯০১সহিহ
ক্রম নিয়ে: হাদিসে দশটি আলামত নির্দিষ্ট ক্রমে বলা হয়নি, কোনটা প্রথম তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। সহিহ হাদিস থেকে নিশ্চিত এটুকু: দাজ্জালের পর ঈসা (আ.) নামবেন, তাঁর যুগেই ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে (সহিহ মুসলিম ২৯৩৭), আর সবশেষ আলামত ইয়েমেনের আগুন (সহিহ মুসলিম ২৯০১)।
দশ আলামতের তালিকায় নেই, তবে সহিহ সনদে সুনান গ্রন্থে এসেছে: শেষ যুগে নবীজির বংশের, ফাতিমার (রা.) সন্তানদের থেকে একজন শাসক আসবেন, যাঁর নাম নবীজির নামের মতো, বাবার নাম নবীজির বাবার নামের মতো; জুলুমে ভরা পৃথিবীকে তিনি ইনসাফে ভরে দেবেন। বুখারী ও মুসলিমে "মাহদি" নামটি স্পষ্ট আসেনি; সুনান গ্রন্থের বর্ণনাগুলো আলবানী সহ অনেক মুহাদ্দিস সহিহ বলেছেন।
সুনানে আবু দাউদ ৪২৮২সহিহ · সুনানে আবু দাউদ ৪২৮৪সহিহপুরো দলিল পড়ুন ৫টি হাদিস, ১টি আয়াত
আমরা (কিয়ামত নিয়ে) আলোচনা করছিলাম, এমন সময় নবী (ﷺ) আমাদের কাছে এসে বললেন: তোমরা কী আলোচনা করছ? তারা বলল: আমরা কিয়ামতের কথা বলছি। তিনি বললেন: তোমরা দশটি নিদর্শন না দেখা পর্যন্ত কিয়ামত হবে না। তারপর তিনি উল্লেখ করলেন: ধোঁয়া, দাজ্জাল, দাব্বাহ (বিশেষ প্রাণী), পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠা, মারইয়ামের পুত্র ঈসা (আ.)-এর অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজ, তিনটি ভূমিধস: একটি পূর্বে, একটি পশ্চিমে, একটি আরব উপদ্বীপে, আর সবশেষে ইয়েমেন থেকে এক আগুন বের হবে, যা মানুষকে তাদের একত্র হওয়ার জায়গার দিকে তাড়িয়ে নেবে।
مَا بُعِثَ نَبِيٌّ إِلاَّ أَنْذَرَ أُمَّتَهُ الأَعْوَرَ الْكَذَّابَ، أَلاَ إِنَّهُ أَعْوَرُ، وَإِنَّ رَبَّكُمْ لَيْسَ بِأَعْوَرَ، وَإِنَّ بَيْنَ عَيْنَيْهِ مَكْتُوبٌ كَافِرٌ
এমন কোনো নবী পাঠানো হয়নি, যিনি তাঁর উম্মতকে এক-চোখ-কানা মিথ্যাবাদী (দাজ্জাল) সম্পর্কে সাবধান করেননি। জেনে রাখো, সে এক চোখ কানা, আর তোমাদের রব কানা নন। তার দুই চোখের মাঝে লেখা থাকবে: কাফির।
(দাজ্জাল যখন ফিতনা ছড়াচ্ছে) এমন সময় আল্লাহ মাসীহ ইবনু মারইয়ামকে পাঠাবেন। তিনি দামেস্কের পূর্ব দিকে সাদা মিনারের কাছে নামবেন, হালকা হলুদ রঙের দুটি কাপড় পরে, দুই ফেরেশতার ডানায় হাত রেখে। মাথা নিচু করলে পানির ফোঁটা ঝরবে, মাথা তুললে মুক্তার দানার মতো ফোঁটা গড়িয়ে পড়বে। কোনো কাফির তাঁর নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ পেলেই মারা যাবে, আর তাঁর নিঃশ্বাস পৌঁছাবে যতদূর তাঁর দৃষ্টি যায়। তিনি দাজ্জালকে খুঁজে লুদ্দ-এর ফটকে ধরে হত্যা করবেন। তারপর যাদের আল্লাহ দাজ্জাল থেকে রক্ষা করেছেন, তিনি তাদের কাছে এসে তাদের চেহারায় হাত বুলাবেন আর জান্নাতে তাদের মর্যাদার কথা শোনাবেন। এমন সময় আল্লাহ ঈসাকে ওহী পাঠাবেন: আমি আমার এমন কিছু বান্দা বের করেছি, যাদের সাথে লড়ার ক্ষমতা কারো নেই; তুমি আমার বান্দাদের নিয়ে তূর পাহাড়ে আশ্রয় নাও। আল্লাহ ইয়াজূজ-মাজূজকে পাঠাবেন, তারা প্রতিটি উঁচু জায়গা থেকে ছুটে আসবে। ... ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা অবরুদ্ধ থাকবেন। তারপর তাঁরা আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন, আর আল্লাহ ওদের ঘাড়ে এক ধরনের পোকা পাঠাবেন; সকালে সবাই একসাথে মরে পড়ে থাকবে, যেন একজনের মৃত্যু।
لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا، فَإِذَا رَآهَا النَّاسُ آمَنَ مَنْ عَلَيْهَا، فَذَاكَ حِينَ لاَ يَنْفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا، لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ
সূর্য পশ্চিম দিক থেকে না ওঠা পর্যন্ত কিয়ামত হবে না। যখন মানুষ তা দেখবে, পৃথিবীর সবাই ঈমান আনবে। কিন্তু সেটাই সেই সময়, যখন আগে ঈমান না আনা কোনো ব্যক্তির ঈমান তার কোনো কাজে আসবে না।
ثَلاَثٌ إِذَا خَرَجْنَ لاَ يَنْفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيمَانِهَا خَيْرًا طُلُوعُ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا وَالدَّجَّالُ وَدَابَّةُ الأَرْضِ
তিনটি জিনিস যখন বের হবে, তখন যে আগে ঈমান আনেনি বা ঈমান অবস্থায় কোনো ভালো কাজ করেনি, তার ঈমান কোনো কাজে আসবে না: পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠা, দাজ্জাল, আর দাব্বাতুল আরদ (মাটির প্রাণী)।
هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن تَأْتِيَهُمُ الْمَلَائِكَةُ أَوْ يَأْتِيَ رَبُّكَ أَوْ يَأْتِيَ بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ ۗ يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ لَا يَنفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِن قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيمَانِهَا خَيْرًا ۗ قُلِ انتَظِرُوا إِنَّا مُنتَظِرُونَ
তারা শুধু এরই তো প্রতীক্ষা করে যে, তাদের কাছে ফিরিশতা আসবে, কিংবা আপনার রব আসবেন, কিংবা আপনার রবের কোনো নিদর্শন আসবে? যেদিন আপনার রবের কোন নিদর্শন আসবে সেদিন তার ঈমান কোনো কাজে আসবে না, যে পূর্বে ঈমান আনেনি অথবা যে ব্যাক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ লাভ করেনি। বলুন, ‘তোমরা প্রতীক্ষা কর , আমরাও প্রতীক্ষায় রইলাম।’
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
- সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করা (সহিহ মুসলিম ৮০৯)
- প্রতি নামাজে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাওয়া (সহিহ মুসলিম ৫৮৮)
- তাওবা আজই, দরজা বন্ধ হওয়ার আগে
মৃত্যু থেকে কিয়ামত: বারযাখ
প্রত্যেকের নিজের কিয়ামত শুরু হয় মৃত্যুতে
কিয়ামত আসার আগে যারা মারা যায়, তারা থাকে বারযাখে, অর্থাৎ দুনিয়া আর আখিরাতের মাঝের এক পর্দার আড়ালে। সেখানেই কবরের প্রশ্ন, আর সেখান থেকেই শুরু হয় শান্তি বা শাস্তির প্রথম স্বাদ।
- মৃত্যুর পর মানুষ ফিরে এসে নেক আমল করতে চাইবে, কিন্তু তাদের সামনে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত এক পর্দা (বারযাখ) থাকবে।সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৯৯ · সূরা আল-মুমিনূন ২৩:১০০
- সঙ্গীরা কবর থেকে ফিরে যাওয়ার সময়ও মৃত ব্যক্তি তাদের জুতার আওয়াজ শোনে; তখন দুজন ফেরেশতা এসে তাকে প্রশ্ন করেন।সহিহ বুখারী ১৩৩৮সহিহ
- ফিরআউনের লোকদের সকাল-সন্ধ্যা আগুনের সামনে পেশ করা হয়, আর কিয়ামতের দিন তাদের কঠিনতম শাস্তিতে ঢোকানো হবে। অর্থাৎ বারযাখেও শাস্তি আছে।সূরা গাফির ৪০:৪৬
- সেই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহ মুমিনদের "দৃঢ় বাক্য" দিয়ে অবিচল রাখেন।সূরা ইবরাহীম ১৪:২৭
কবরের জীবন নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন "সুন্নাহর আলোয় জীবন" বইয়ের শেষ অধ্যায়ে: আখিরাত: কবর থেকে জান্নাত ›
পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ১টি আয়াত
বান্দাকে যখন কবরে রাখা হয় আর তার সঙ্গীরা ফিরে যায়, এমনকি সে তাদের জুতার আওয়াজও শুনতে পায়, তখন দুজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন: এই ব্যক্তি, মুহাম্মাদ (ﷺ) সম্পর্কে তুমি কী বলতে? মুমিন বলবে: আমি সাক্ষ্য দিই, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তাকে বলা হবে: জাহান্নামে তোমার জায়গাটা দেখো, আল্লাহ এর বদলে তোমাকে জান্নাতে জায়গা দিয়েছেন। সে দুটোই দেখবে। আর কাফির বা মুনাফিক বলবে: আমি জানি না, লোকে যা বলত আমিও তা-ই বলতাম। তাকে বলা হবে: তুমি নিজেও জানোনি, (জ্ঞানীদের) অনুসরণও করোনি। তারপর লোহার হাতুড়ি দিয়ে তাকে এমন আঘাত করা হবে যে সে চিৎকার করে উঠবে; মানুষ ও জিন ছাড়া আশপাশের সবাই তা শুনতে পাবে।
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ ۚ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ্ তাদেরকে সুদৃঢ় বাক্যের দ্বারা দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যারা যালিম আল্লাহ্ তাদেরকে বিভ্রান্তিতে রাখবেন। আর আল্লাহ্ যা ইচ্ছে তা করেন।
- প্রতি নামাজের শেষে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাওয়া (সহিহ মুসলিম ৫৮৮)
- মৃত্যু, জানাজা ও দাফনের সুন্নাহ জানা
শিঙায় ফুঁ
এক ফুঁয়ে সব শেষ, আরেক ফুঁয়ে সবাই দাঁড়িয়ে
কিয়ামত শুরু হবে শিঙায় ফুঁ দিয়ে। প্রথম ফুঁয়ে আসমান-জমিনের সবাই বেহুঁশ হয়ে মারা যাবে, আল্লাহ যাদের চান তারা ছাড়া। দ্বিতীয় ফুঁয়ে সবাই দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকবে।
- শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে, আসমান ও জমিনে যারা আছে সবাই বেহুঁশ হয়ে পড়বে; তারপর আবার ফুঁ দেওয়া হবে, আর তারা দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকবে।সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৮
- দুই ফুঁয়ের মাঝে "চল্লিশ"। চল্লিশ দিন, মাস নাকি বছর, তা সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) নিজেও বলেননি, কারণ তিনি জানতেন না।সহিহ বুখারী ৪৯৩৫সহিহ
- মানুষের শরীরের সব পচে যায়, শুধু মেরুদণ্ডের শেষের ছোট্ট হাড় (আজবুয যানাব) ছাড়া; সেখান থেকেই আবার গড়া হবে, আকাশ থেকে নামা পানিতে সবজির মতো গজিয়ে উঠবে।সহিহ বুখারী ৪৯৩৫সহিহ
- শিঙা মুখে নিয়ে এক ফেরেশতা কান পেতে আছেন, কখন আদেশ আসবে। আলেমদের প্রসিদ্ধ মত, তিনি ইসরাফীল (আ.); তবে কোনো সহিহ হাদিসে শিঙাওয়ালার নাম স্পষ্ট করে বলা হয়নি।জামে আত-তিরমিযী ২৪৩১সহিহ
- পৃথিবী আল্লাহর মুঠোয় থাকবে, আকাশগুলো তাঁর ডান হাতে গোটানো; তিনি বলবেন: আমিই বাদশাহ, কোথায় দুনিয়ার রাজারা?সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৭ · সহিহ বুখারী ৪৮১২সহিহ
- কিয়ামত হবে জুমার দিন।সহিহ মুসলিম ৮৫৪সহিহ
ফেরেশতাদের দায়িত্ব নিয়ে আরও পড়ুন: ফেরেশতা: নূরের তৈরি আল্লাহর বান্দা ›
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَن شَاءَ اللَّهُ ۖ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَىٰ فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنظُرُونَ
আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমানসমূহে যারা আছে ও যমীনে যারা আছে তারা সবাই বেহুশ হয়ে পড়বে, যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। তারপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে তৎক্ষণাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।
দুই ফুঁয়ের মাঝে চল্লিশ। (লোকেরা আবু হুরায়রাকে জিজ্ঞেস করল:) চল্লিশ দিন? তিনি বললেন: আমি বলতে অস্বীকার করছি (আমি জানি না)। চল্লিশ মাস? বললেন: আমি অস্বীকার করছি। চল্লিশ বছর? বললেন: আমি অস্বীকার করছি। (নবীজি বললেন:) তারপর আল্লাহ আকাশ থেকে পানি নামাবেন, আর মানুষ সবজির মতো গজিয়ে উঠবে। মানুষের শরীরের সবকিছু পচে যায়, শুধু একটি হাড় ছাড়া, তা হলো মেরুদণ্ডের শেষ মাথার ছোট্ট হাড় (আজবুয যানাব)। কিয়ামতের দিন সেটা থেকেই সৃষ্টিকে আবার গড়া হবে।
আমি কীভাবে আরামে থাকি, অথচ শিঙাওয়ালা (ফেরেশতা) শিঙা মুখে নিয়ে কান পেতে আছেন, কখন ফুঁ দেওয়ার আদেশ আসবে আর তিনি ফুঁ দেবেন! কথাটি সাহাবিদের কাছে ভারী মনে হলো। তখন তিনি বললেন: তোমরা বলো, "হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল, আলাল্লাহি তাওয়াক্কালনা" (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক; আমরা আল্লাহর উপরই ভরসা করি)।
يَقْبِضُ اللَّهُ الأَرْضَ، وَيَطْوِي السَّمَوَاتِ بِيَمِينِهِ، ثُمَّ يَقُولُ أَنَا الْمَلِكُ، أَيْنَ مُلُوكُ الأَرْضِ
আল্লাহ পৃথিবীকে মুঠোয় নেবেন, আর আকাশগুলোকে তাঁর ডান হাতে গুটিয়ে নেবেন। তারপর বলবেন: আমিই বাদশাহ, কোথায় দুনিয়ার রাজারা?
- শিঙার কথা মনে হলে নবীজির শেখানো বাক্য: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল (জামে আত-তিরমিযী ২৪৩১)
পুনরুত্থান ও হাশরের মাঠ
খালি পায়ে, বস্ত্রহীন, আমল অনুযায়ী ঘামে
দ্বিতীয় ফুঁয়ের পর প্রথম থেকে শেষ সব মানুষকে এক সাদা সমতল মাঠে একত্র করা হবে। পাহাড় ধুলো হয়ে উড়বে, সাগর উথলে উঠবে, আর সূর্য নেমে আসবে মাথার খুব কাছে। সেদিন মানুষ নিজের ভাই, মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান থেকেও পালাবে।
- পৃথিবী আর আকাশ বদলে দেওয়া হবে, আর সবাই এক পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে হাজির হবে।সূরা ইবরাহীম ১৪:৪৮
- মানুষকে একত্র করা হবে রুটির মতো সাদা এক সমতল ভূমিতে, যেখানে কারো জন্য কোনো চিহ্ন বা সীমানা থাকবে না।সহিহ বুখারী ৬৫২১সহিহ
- সবাই উঠবে খালি পায়ে, বস্ত্রহীন, খতনাবিহীন। আয়েশা (রা.) লজ্জার কথা জিজ্ঞেস করলে নবীজি বললেন, অবস্থা এত ভয়াবহ হবে যে কেউ সেদিকে তাকানোর কথা ভাববেই না।সহিহ বুখারী ৬৫২৭সহিহ
- সবার আগে কাপড় পরানো হবে ইবরাহীম (আ.)-কে।সহিহ বুখারী ৩৩৪৯সহিহ
- সূর্য মানুষের খুব কাছে আনা হবে; প্রত্যেকে নিজের আমল অনুযায়ী ঘামে ডুববে: কারো গোড়ালি, কারো হাঁটু, কারো কোমর, কারো মুখ পর্যন্ত।সহিহ মুসলিম ২৮৬৪সহিহ
- সেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবে না; সাত ধরনের মানুষ সেই ছায়া পাবে।সহিহ বুখারী ৬৬০সহিহ
- সেদিন মানুষ পালাবে নিজের ভাই, মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তান থেকে; প্রত্যেকের নিজের চিন্তাই যথেষ্ট হবে।সূরা আবাসা ৮০:৩৪ · সূরা আবাসা ৮০:৩৫ · সূরা আবাসা ৮০:৩৬ · সূরা আবাসা ৮০:৩৭
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ৪টি আয়াত
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।
يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَىٰ وَمَا هُم بِسُكَارَىٰ وَلَـٰكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ
যেদিন তোমরা তা দেখতে পাবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী বিস্মৃত হবে তাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তাদের গর্ভপাত করে ফেলবে ; মানুষকে দেখবেন নেশাগ্রস্থের মত, যদিও তারা নেশগ্রস্থ নয়। বরং আল্লাহর শাস্তি কঠিন।
تُحْشَرُونَ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلاً " قَالَتْ عَائِشَةُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ الرِّجَالُ وَالنِّسَاءُ يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ. فَقَالَ " الأَمْرُ أَشَدُّ مِنْ أَنْ يُهِمَّهُمْ ذَاكِ
তোমাদের (কিয়ামতের দিন) খালি পায়ে, বস্ত্রহীন ও খতনাবিহীন অবস্থায় একত্র করা হবে। আয়েশা (রা.) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, নারী-পুরুষ একে অপরের দিকে তাকাবে? তিনি বললেন: অবস্থা তখন এত ভয়াবহ হবে যে এসব চিন্তা কারো মাথায়ই আসবে না।
কিয়ামতের দিন সূর্যকে মানুষের এত কাছে আনা হবে যে তা এক মাইলের মতো দূরত্বে থাকবে। মানুষ তাদের আমল অনুযায়ী ঘামে ডুবে থাকবে: কারো ঘাম গোড়ালি পর্যন্ত, কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত, আর কারো ঘাম মুখে লাগাম পরিয়ে দেবে। এই বলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাত দিয়ে নিজের মুখের দিকে ইশারা করলেন।
সাত ধরনের মানুষকে আল্লাহ সেদিন তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না: ন্যায়পরায়ণ নেতা; যে যুবক তার রবের ইবাদতের মধ্যে বড় হয়েছে; যার অন্তর মসজিদের সাথে ঝুলে থাকে; দুই ব্যক্তি, যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, তাঁর জন্যই একত্র হয় আর তাঁর জন্যই আলাদা হয়; যে পুরুষকে সম্মানিত ও সুন্দরী নারী (অন্যায় কাজে) ডাকল, আর সে বলল: আমি আল্লাহকে ভয় করি; যে এত গোপনে দান করে যে তার বাম হাত জানে না ডান হাত কী দিল; আর যে একাকী আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا
যখন প্ৰবল কম্পনে যমীন প্ৰকম্পিত করা হবে,
وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا
আর যমীন তার ভার বের করে দেবে,
- আরশের ছায়া পাওয়ার সাত আমলের একটি আজ থেকে ধরা (সহিহ বুখারী ৬৬০)
- কারো কষ্ট দূর করা, তাহলে কিয়ামতের কষ্ট দূর হবে (সহিহ বুখারী ২৪৪২)
মহাসুপারিশ (শাফাআতুল উযমা)
নবী থেকে নবীর দরজায়, শেষে মুহাম্মাদ (ﷺ)
হাশরের মাঠের অপেক্ষা যখন অসহ্য হয়ে উঠবে, মানুষ চাইবে কেউ আল্লাহর কাছে সুপারিশ করুক, যাতে বিচার শুরু হয়। তারা একে একে বড় নবীদের কাছে যাবে। এই সুপারিশ শুধু আমাদের নবীর (ﷺ) জন্য; একেই কুরআন বলেছে "মাকামে মাহমূদ", প্রশংসিত স্থান।
- ১আদম (আ.)আল্লাহ নিজের হাতে বানিয়েছেন, ফেরেশতারা সিজদা করেছে
"আমি এর যোগ্য নই; নূহের কাছে যাও"
- ২নূহ (আ.)পৃথিবীবাসীর কাছে প্রথম রাসূল
"আমি এর যোগ্য নই; ইবরাহীমের কাছে যাও"
- ৩ইবরাহীম (আ.)আল্লাহর খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু)
"আমি এর যোগ্য নই; মূসার কাছে যাও"
- ৪মূসা (আ.)যাঁর সাথে আল্লাহ সরাসরি কথা বলেছেন
"আমি এর যোগ্য নই; ঈসার কাছে যাও"
- ৫ঈসা (আ.)আল্লাহর বাণী ও তাঁর পক্ষ থেকে রূহ
"আমি এর যোগ্য নই; মুহাম্মাদের (ﷺ) কাছে যাও"
- ৬মুহাম্মাদ (ﷺ)যাঁর আগের-পরের সব ভুল ক্ষমা করা হয়েছে
"আরশের নিচে সিজদায় পড়বেন; বলা হবে: সুপারিশ করো, কবুল হবে"
পুরো ঘটনা: সহিহ বুখারী ৬৫৬৫সহিহ
- আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারবে না; আর তিনি যার উপর সন্তুষ্ট, শুধু তার জন্যই সুপারিশ হবে।সূরা আল-বাকারা ২:২৫৫ · সূরা আল-আম্বিয়া ২১:২৮ · সূরা ত্বা-হা ২০:১০৯
- আপনার রব আপনাকে প্রশংসিত স্থানে (মাকামে মাহমূদ) পৌঁছাবেন।সূরা আল-ইসরা ১৭:৭৯
- প্রত্যেক নবীর একটি নিশ্চিত কবুল দোয়া ছিল; সবাই দুনিয়াতেই করে ফেলেছেন। নবীজি তাঁরটা জমিয়ে রেখেছেন কিয়ামতের দিন উম্মতের সুপারিশের জন্য, যা পাবে শিরক না করে মারা যাওয়া প্রত্যেকে।সহিহ মুসলিম ১৯৯সহিহ
- নবীজির সুপারিশ পেয়ে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান সে, যে খাঁটি অন্তরে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলেছে।সহিহ বুখারী ৯৯সহিহ
- কুরআন তার নিয়মিত পাঠকদের জন্য সুপারিশ করবে।সহিহ মুসলিম ৮০৪সহিহ
- নবী, ফেরেশতা ও মুমিনরাও সুপারিশ করবেন; তাঁদের সুপারিশে গুনাহগার মুমিনরা জাহান্নাম থেকে বের হবে।সহিহ বুখারী ৭৪৩৯সহিহ · সহিহ বুখারী ৬৫৬৬সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস
কিয়ামতের দিন আল্লাহ মানুষকে একত্র করবেন। তারা বলবে: আমরা যদি আমাদের রবের কাছে কারো সুপারিশ নিতাম, যাতে তিনি আমাদের এই জায়গার কষ্ট থেকে মুক্তি দেন! তারা আদম (আ.)-এর কাছে এসে বলবে: আপনাকে আল্লাহ নিজের হাতে বানিয়েছেন, আপনার মধ্যে তাঁর পক্ষ থেকে রূহ ফুঁকেছেন, ফেরেশতাদের আদেশ দিয়েছেন আর তারা আপনাকে সিজদা করেছে; আমাদের জন্য রবের কাছে সুপারিশ করুন। তিনি বলবেন: আমি এর যোগ্য নই, আর নিজের ভুলের কথা বলবেন; বলবেন: নূহের কাছে যাও, আল্লাহর পাঠানো প্রথম রাসূল। তারা তাঁর কাছে যাবে, তিনিও বলবেন: আমি এর যোগ্য নই, আর নিজের ভুলের কথা বলবেন; বলবেন: ইবরাহীমের কাছে যাও, যাঁকে আল্লাহ বন্ধু বানিয়েছেন। তিনিও বলবেন: আমি এর যোগ্য নই, আর নিজের ভুলের কথা বলবেন; বলবেন: মূসার কাছে যাও, যাঁর সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন। তিনিও একই কথা বলে বলবেন: ঈসার কাছে যাও। ঈসা (আ.) বলবেন: আমি এর যোগ্য নই, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কাছে যাও, যাঁর আগের ও পরের সব ভুল আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তখন তারা আমার কাছে আসবে। আমি আমার রবের কাছে অনুমতি চাইব। তাঁকে দেখামাত্র আমি সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহ যতক্ষণ চান আমাকে সেভাবে রাখবেন। তারপর বলা হবে: মাথা তোলো, চাও, দেওয়া হবে; বলো, শোনা হবে; সুপারিশ করো, কবুল করা হবে। আমি মাথা তুলে আমার রবের এমন প্রশংসা করব, যা তিনি আমাকে শিখিয়ে দেবেন। তারপর সুপারিশ করব, আমার জন্য একটি সীমা ঠিক করে দেওয়া হবে; আমি তাদের জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নিয়ে যাব। তারপর আবার ফিরে এসে আগের মতো সিজদায় পড়ব, তৃতীয় বা চতুর্থবার, শেষে জাহান্নামে শুধু তারাই থাকবে, যাদের কুরআন আটকে দিয়েছে (অর্থাৎ যাদের জন্য চিরস্থায়ী শাস্তি অবধারিত)।
لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا
প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে দোয়া আছে, যা নিশ্চিত কবুল হয়। প্রত্যেক নবী তাঁর সেই দোয়া (দুনিয়াতেই) তাড়াতাড়ি করে ফেলেছেন। আর আমি আমার দোয়াটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের জন্য সুপারিশ হিসেবে লুকিয়ে রেখেছি। ইনশাআল্লাহ, আমার উম্মতের যে কেউ আল্লাহর সাথে কিছু শরিক না করে মারা গেছে, সে তা পাবে।
أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ
কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ পেয়ে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সে, যে খাঁটি অন্তরে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলেছে।
- খাঁটি তাওহীদ: শিরক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা (সহিহ বুখারী ৯৯)
- নিয়মিত কুরআন পড়া
আমলনামা ও হিসাব
ডান হাতে নাকি বাম হাতে
প্রত্যেকের হাতে তার আমলনামা দেওয়া হবে, যাতে ছোট-বড় কিছুই বাদ নেই। তারপর হিসাব: কারো শুধু আমল সামনে পেশ করা, কারো খুঁটিয়ে জেরা। নিজের হাত-পা-চামড়াও সেদিন সাক্ষী দেবে।
- যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, সে খুশিতে সবাইকে ডেকে বলবে: এসো, আমার আমলনামা পড়ো! আর যার বাম হাতে, সে বলবে: হায়, আমার আমলনামা যদি না দেওয়া হতো!সূরা আল-হাক্কা ৬৯:১৯ · সূরা আল-হাক্কা ৬৯:২৫
- যার আমলনামা ডান হাতে, তার হিসাব হবে সহজ; আর যার পিঠের পেছন দিক থেকে দেওয়া হবে, সে ধ্বংস ডাকবে।সূরা আল-ইনশিকাক ৮৪:৭ · সূরা আল-ইনশিকাক ৮৪:৮ · সূরা আল-ইনশিকাক ৮৪:১০ · সূরা আল-ইনশিকাক ৮৪:১১
- আমলনামা দেখে অপরাধীরা বলবে: এ কেমন খাতা, ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি!সূরা আল-কাহফ ১৮:৪৯
- যার হিসাব খুঁটিয়ে নেওয়া হবে, সে ধ্বংস হবে; মুমিনের "সহজ হিসাব" মানে শুধু আমল সামনে পেশ করা।সহিহ বুখারী ৬৫৩৭সহিহ
- আল্লাহ মুমিনকে আড়ালে নিয়ে গুনাহ স্বীকার করাবেন, তারপর বলবেন: দুনিয়ায় ঢেকে রেখেছিলাম, আজ ক্ষমা করলাম।সহিহ বুখারী ২৪৪১সহিহ
- আল্লাহর হকের মধ্যে সবার আগে নামাজের হিসাব; মানুষের হকের মধ্যে সবার আগে রক্তপাতের বিচার।সুনানে আবু দাউদ ৮৬৪সহিহ · সহিহ বুখারী ৬৫৩৩সহিহ
- চারটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কারো পা নড়বে না: জীবন, জ্ঞান, সম্পদ আর শরীর।জামে আত-তিরমিযী ২৪১৭সহিহ
- আসল দেউলিয়া সে, যে নামাজ-রোজা নিয়ে আসবে, কিন্তু মানুষকে গালি, অপবাদ, জুলুম করে এসেছে; তার নেকি পাওনাদারদের দিয়ে দেওয়া হবে।সহিহ মুসলিম ২৫৮১সহিহ
- মুখে মোহর মেরে দেওয়া হবে, আর হাত-পা কথা বলবে, সাক্ষী দেবে।সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬৫ · সহিহ মুসলিম ২৯৬৯সহিহ
- উম্মতের সত্তর হাজার মানুষ বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে: যারা ঝাড়ফুঁক চাইত না, কুলক্ষণ মানত না, দাগ নিত না, শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করত।সহিহ বুখারী ৬৫৪১সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ৪টি হাদিস, ২টি আয়াত
আল্লাহ মুমিনকে কাছে টেনে নেবেন, তার উপর নিজের আড়াল দিয়ে তাকে ঢেকে রাখবেন। বলবেন: অমুক গুনাহটা কি তোমার মনে আছে? অমুক গুনাহটা? সে বলবে: হ্যাঁ, হে রব। এভাবে যখন তার সব গুনাহ সে স্বীকার করবে আর মনে মনে ভাববে, আমি তো শেষ, তখন আল্লাহ বলবেন: দুনিয়ায় আমি এগুলো তোমার জন্য ঢেকে রেখেছিলাম, আর আজ তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তারপর তাকে তার নেক আমলের খাতা দেওয়া হবে। আর কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে সাক্ষীরা ঘোষণা দেবে: এরাই তারা, যারা তাদের রবের নামে মিথ্যা বলেছিল; জেনে রাখো, জালিমদের উপর আল্লাহর লানত।
তোমরা কি জানো দেউলিয়া কে? সাহাবিরা বললেন: আমাদের মধ্যে দেউলিয়া সে, যার টাকা-পয়সা নেই, জিনিসপত্রও নেই। তিনি বললেন: আমার উম্মতের আসল দেউলিয়া সে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা আর যাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারো উপর অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ খেয়েছে, কারো রক্ত ঝরিয়েছে, কাউকে মেরেছে। তখন একে তার নেকি থেকে দেওয়া হবে, ওকে তার নেকি থেকে দেওয়া হবে। পাওনা শোধের আগেই তার নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ নিয়ে তার উপর চাপানো হবে, তারপর তাকে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।
لاَ تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَا فَعَلَ وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَا أَنْفَقَهُ وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَا أَبْلاَهُ
কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা (হিসাবের জায়গা থেকে) সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে: তার জীবন কোন কাজে শেষ করেছে; তার জ্ঞান অনুযায়ী কী আমল করেছে; তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে আর কোথায় খরচ করেছে; আর তার শরীর (যৌবন ও শক্তি) কোন কাজে ক্ষয় করেছে।
(নবীজি হেসে বললেন:) তোমরা কি জানো আমি কেন হাসছি? আমরা বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: বান্দা তার রবের সাথে যে কথা বলবে, তা থেকে। সে বলবে: হে রব, আপনি কি আমাকে জুলুম থেকে নিরাপত্তা দেননি? আল্লাহ বলবেন: হ্যাঁ। সে বলবে: তাহলে আমি আমার নিজের ভেতরের সাক্ষী ছাড়া আর কারো সাক্ষ্য মানব না। আল্লাহ বলবেন: আজ তোমার নিজের বিরুদ্ধে তুমিই যথেষ্ট সাক্ষী, আর সম্মানিত লেখক ফেরেশতারাও সাক্ষী। তারপর তার মুখে মোহর মেরে দেওয়া হবে, আর তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বলা হবে: কথা বলো। তারা তার সব আমলের কথা বলে দেবে। তারপর তাকে আবার কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে। সে (নিজের অঙ্গগুলোকে) বলবে: দূর হও, ধ্বংস হও! তোমাদের বাঁচানোর জন্যই তো আমি তর্ক করছিলাম।
وَكُلَّ إِنسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ ۖ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنشُورًا
আর প্রত্যেক মানুষের কাজ আমরা তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমরা তার জন্য বের করব এক কিতাব যা সে পাবে উন্মুক্ত।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا
'তুমি তোমার কিতাব পাঠ করো, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসেব-নিকেশের জন্য যথেষ্ট।’
- নামাজ যত্ন করে আদায় করা, কারণ এর হিসাব সবার আগে (সুনানে আবু দাউদ ৮৬৪)
- কারো দোষ ঢেকে রাখা (সহিহ বুখারী ২৪৪২)
- আজই পাওনা মিটিয়ে নেওয়া আর মাফ চেয়ে নেওয়া (সহিহ মুসলিম ২৫৮১)
মীযান: ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা
অণু পরিমাণ আমলও হারাবে না
হিসাবের পর আমল ওজন করা হবে। পাল্লা ভারী হলে সন্তুষ্ট জীবন, হালকা হলে সর্বনাশ। এখানে শরীরের ওজন বা লোকের চোখে বড় হওয়ার কোনো মূল্য নেই; ভারী হবে ঈমান, চরিত্র আর আল্লাহর জিকির।
- আল্লাহ কিয়ামতের দিন ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবেন; কারো উপর সামান্য জুলুম হবে না, সরিষার দানা পরিমাণ আমলও আনা হবে।সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৪৭
- যার পাল্লা ভারী, সে সন্তোষজনক জীবনে থাকবে; যার পাল্লা হালকা, তার ঠিকানা "হাবিয়া", জ্বলন্ত আগুন।সূরা আল-কারিআ ১০১:৬ · সূরা আল-কারিআ ১০১:৭ · সূরা আল-কারিআ ১০১:৮ · সূরা আল-কারিআ ১০১:৯
- যে অণু পরিমাণ ভালো করবে, সে তা দেখবে; যে অণু পরিমাণ মন্দ করবে, সেও তা দেখবে।সূরা আয-যিলযাল ৯৯:৭ · সূরা আয-যিলযাল ৯৯:৮
- একজনের নিরানব্বইটি গুনাহের খাতার বিপরীতে এক টুকরো কাগজে লেখা কালিমা ভারী হবে; আল্লাহর নামের সাথে কিছুই ভারী হয় না।জামে আত-তিরমিযী ২৬৩৯সহিহ
- মীযানে সবচেয়ে ভারী উত্তম চরিত্র।জামে আত-তিরমিযী ২০০২সহিহ
- "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম" জিহ্বায় হালকা, পাল্লায় ভারী; আর "আলহামদুলিল্লাহ" পাল্লা ভরে দেয়।সহিহ বুখারী ৬৪০৬সহিহ · সহিহ মুসলিম ২২৩সহিহ
- বিশালদেহী মানুষও আল্লাহর কাছে মশার ডানার ওজন পাবে না, যদি ঈমান না থাকে।সহিহ বুখারী ৪৭২৯সহিহ · সূরা আল-কাহফ ১৮:১০৫
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ
আর কিয়ামতের দিনে আমরা ন্যায়বিচারের পাল্লাসমূহ স্থাপন করব, সুতরাং কারো প্রতি কোনো যুলুম করা হবে না এবং কাজ যদি শস্য দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও তা আমরা উপস্থিত করব; আর হিসেব গ্রহণকারীরূপে আমরাই যথেষ্ট।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমার উম্মতের এক ব্যক্তিকে সব সৃষ্টির সামনে আলাদা করে আনবেন। তার সামনে নিরানব্বইটি খাতা খোলা হবে, প্রতিটি খাতা চোখ যতদূর যায় ততদূর লম্বা। তারপর বলবেন: এর কোনোটা কি তুমি অস্বীকার করো? আমার হেফাজতকারী লেখকরা কি তোমার উপর জুলুম করেছে? সে বলবে: না, হে রব। বলবেন: তোমার কোনো অজুহাত আছে? সে বলবে: না, হে রব। আল্লাহ বলবেন: অবশ্যই, আমার কাছে তোমার একটি নেকি আছে, আজ তোমার উপর কোনো জুলুম হবে না। তখন একটি ছোট কাগজ (বিতাকা) বের করা হবে, তাতে লেখা: আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু। আল্লাহ বলবেন: তোমার ওজনের জায়গায় যাও। সে বলবে: হে রব, এত খাতার সামনে এই ছোট কাগজের কী দাম? বলা হবে: তোমার উপর জুলুম করা হবে না। তখন খাতাগুলো এক পাল্লায় আর কাগজটি আরেক পাল্লায় রাখা হবে। খাতাগুলোর পাল্লা হালকা হয়ে উঠে যাবে, আর কাগজের পাল্লা ভারী হবে। আল্লাহর নামের সাথে কোনো কিছুই ভারী হতে পারে না।
مَا شَيْءٌ أَثْقَلُ فِي مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ خُلُقٍ حَسَنٍ وَإِنَّ اللَّهَ لَيَبْغَضُ الْفَاحِشَ الْبَذِيءَ
কিয়ামতের দিন মুমিনের মীযানে উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী আর কিছু হবে না। আর আল্লাহ অশ্লীল ও কটুভাষীকে ঘৃণা করেন।
كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ، حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ، سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ
দুটি বাক্য জিহ্বায় হালকা, মীযানে (দাঁড়িপাল্লায়) ভারী, আর দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রিয়: "সুবহানাল্লাহিল আযীম, সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী"।
- প্রতিদিন "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম" (সহিহ বুখারী ৬৪০৬)
- চরিত্রের একটি দুর্বলতা চিহ্নিত করে ঠিক করা (জামে আত-তিরমিযী ২০০২)
হাউযে কাউসার
যে পানি একবার পান করলে আর পিপাসা নেই
হাশরের মাঠের তীব্র পিপাসায় নবীজি (ﷺ) তাঁর হাউযের পাশে উম্মতের অপেক্ষায় থাকবেন। তিনি উম্মতকে চিনবেন অজুর আলোয়। কিন্তু কিছু মানুষকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে, কারণ তারা তাঁর পরে দ্বীনে নতুন কিছু বানিয়েছিল।
- আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি।সূরা আল-কাওসার ১০৮:১
- হাউযের দৈর্ঘ্য এক মাসের পথ; পানি দুধের চেয়ে সাদা, ঘ্রাণ মিশকের চেয়ে সুগন্ধি, পেয়ালা আকাশের তারার মতো অসংখ্য; যে একবার পান করবে, আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।সহিহ বুখারী ৬৫৭৯সহিহ
- নবীজি উম্মতকে চিনবেন অজুর কারণে উজ্জ্বল চেহারা আর উজ্জ্বল হাত-পা দেখে।সহিহ মুসলিম ২৪৯সহিহ
- কিছু লোককে হাউয থেকে টেনে সরিয়ে নেওয়া হবে; নবীজি বলবেন, এরা আমার সাথী! বলা হবে: আপনি জানেন না, আপনার পরে তারা কী নতুন জিনিস বানিয়েছিল।সহিহ বুখারী ৬৫৭৬সহিহ · সহিহ মুসলিম ২৪৯সহিহ
কেন এটা জরুরি: হাউয থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে নবীজি বলেছেন "তারা নতুন জিনিস বানিয়েছিল" ও "দ্বীন বদলে ফেলেছিল"। তাই প্রতিটি আমল কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর সাথে মিলিয়ে নেওয়াই নিরাপদ পথ। আমাদের প্রচলিত ভুল অংশে এমন অনেক কথা যাচাই করা আছে।
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস
حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ، مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ اللَّبَنِ، وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمِسْكِ، وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ، مَنْ شَرِبَ مِنْهَا فَلاَ يَظْمَأُ أَبَدًا
আমার হাউয (এর দৈর্ঘ্য) এক মাসের পথ। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা, ঘ্রাণ মিশকের চেয়ে সুগন্ধি, আর পানপাত্র আকাশের তারার মতো অসংখ্য। যে একবার এখান থেকে পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।
(নবীজিকে জিজ্ঞেস করা হলো, যারা এখনো আসেনি তাদের কীভাবে চিনবেন। তিনি সাদা কপাল ও পায়ের ঘোড়ার উদাহরণ দিয়ে বললেন:) তারা অজুর কারণে উজ্জ্বল চেহারা আর উজ্জ্বল হাত-পা নিয়ে আসবে, আর আমি হাউযের কাছে তাদের আগে পৌঁছে থাকব। জেনে রাখো, কিছু লোককে আমার হাউয থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে, যেমন হারানো উটকে তাড়ানো হয়। আমি তাদের ডাকব: এদিকে এসো! তখন বলা হবে: তারা আপনার পরে (দ্বীন) বদলে ফেলেছিল। তখন আমি বলব: দূর হও, দূর হও।
أَنَا فَرَطُكُمْ، عَلَى الْحَوْضِ، وَلَيُرْفَعَنَّ رِجَالٌ مِنْكُمْ ثُمَّ لَيُخْتَلَجُنَّ دُونِي فَأَقُولُ يَا رَبِّ أَصْحَابِي. فَيُقَالُ إِنَّكَ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ
আমি হাউযের কাছে তোমাদের আগে পৌঁছে অপেক্ষা করব। তোমাদের কিছু লোককে আমার সামনে তুলে আনা হবে, তারপর আমার কাছ থেকে টেনে সরিয়ে নেওয়া হবে। আমি বলব: হে রব, এরা তো আমার সাথী! বলা হবে: আপনি জানেন না, আপনার পরে তারা (দ্বীনে) কী নতুন জিনিস বানিয়েছিল।
- যত্ন করে, পুরো অঙ্গ ধুয়ে অজু করা (সহিহ মুসলিম ২৪৯)
- সুন্নাহ মেনে চলা, দ্বীনে নতুন কিছু না বানানো
পুলসিরাত ও কানতারা
আমলই হবে গতি
জাহান্নামের উপর দিয়ে একটি সেতু বসানো হবে, সবাইকে তার উপর দিয়ে যেতে হবে। কেউ পার হবে বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাস, পাখি বা দৌড়ানো মানুষের মতো, কেউ হামাগুড়ি দিয়ে; দুই পাশের আঁকড়া কাউকে টেনে নেবে। নবীজি দাঁড়িয়ে দোয়া করতে থাকবেন: রব্বি সাল্লিম, সাল্লিম।
- তোমাদের প্রত্যেককেই জাহান্নামের উপর দিয়ে যেতে হবে; তারপর আল্লাহ মুত্তাকীদের বাঁচাবেন, আর জালিমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেবেন।সূরা মারইয়াম ১৯:৭১ · সূরা মারইয়াম ১৯:৭২
- সেতুটি পিচ্ছিল, তাতে আঁকড়া আর কাঁটা; মুমিনরা চোখের পলক, বিদ্যুৎ, বাতাস বা ঘোড়ার গতিতে পার হবে।সহিহ বুখারী ৭৪৩৯সহিহ
- আমানত আর আত্মীয়তার সম্পর্ক সেতুর দুই পাশে দাঁড়াবে; আমলই মানুষকে নিয়ে চলবে, আর নবীজি বলতে থাকবেন: রব্বি সাল্লিম, সাল্লিম।সহিহ মুসলিম ১৯৫সহিহ
- সাহাবি আবু সাঈদ (রা.) বলেছেন, তাঁর কাছে পৌঁছেছে যে সেতুটি চুলের চেয়ে সরু আর তলোয়ারের চেয়ে ধারালো।সহিহ মুসলিম ১৮৩সহিহ
- মুমিনদের নূর তাদের সামনে ও ডানে ছুটবে; মুনাফিকরা অন্ধকারে আলো চেয়ে পাবে না।সূরা আল-হাদীদ ৫৭:১২ · সূরা আল-হাদীদ ৫৭:১৩
- পার হওয়ার পর জান্নাতের আগে এক সেতুতে (কানতারা) মুমিনদের থামানো হবে, দুনিয়ার পারস্পরিক অন্যায়ের বদলা মিটিয়ে অন্তর পরিষ্কার করে তবে জান্নাতে ঢোকানো হবে।সহিহ বুখারী ২৪৪০সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত
(মানুষ নবীদের কাছে ঘুরে শেষে) মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কাছে আসবে। তিনি দাঁড়াবেন, তাঁকে অনুমতি দেওয়া হবে। আর আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ককে পাঠানো হবে, তারা পুলসিরাতের ডানে ও বামে দাঁড়াবে। তোমাদের প্রথম দল পার হবে বিদ্যুতের মতো। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি বললাম: আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান, বিদ্যুতের মতো কেমন? তিনি বললেন: দেখোনি, বিদ্যুৎ কীভাবে চোখের পলকে যায় আর ফিরে আসে? তারপর বাতাসের মতো, তারপর পাখির মতো, তারপর দৌড়ানো মানুষের মতো; তাদের আমলই তাদের নিয়ে চলবে। আর তোমাদের নবী পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে বলতে থাকবেন: রব্বি সাল্লিম, সাল্লিম (হে রব, নিরাপদ রাখুন, নিরাপদ রাখুন)। শেষে বান্দাদের আমল দুর্বল হয়ে পড়বে, এমনকি একজন আসবে, যে হামাগুড়ি দেওয়া ছাড়া চলতে পারবে না। পুলসিরাতের দুই পাশে আঁকড়া ঝুলানো থাকবে, যাকে ধরার আদেশ আছে তাকে ধরবে। কেউ আঁচড় খেয়ে বেঁচে যাবে, কেউ স্তূপ হয়ে জাহান্নামে পড়বে।
(কিয়ামতের দীর্ঘ হাদিসের দুটি অংশ।) তারপর সেতুটি আনা হবে এবং জাহান্নামের উপর স্থাপন করা হবে। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, সেতুটি কেমন? তিনি বললেন: পিছলে পড়ার মতো পিচ্ছিল জায়গা; তার উপর আঁকড়া, হুক আর চওড়া কাঁটা থাকবে, নাজদের সা'দান গাছের বাঁকা কাঁটার মতো। মুমিন তার উপর দিয়ে পার হবে চোখের পলকে, বিদ্যুতের মতো, বাতাসের মতো, দ্রুতগামী ঘোড়া ও উটের মতো। কেউ নিরাপদে পার হয়ে যাবে, কেউ আঁচড় খেয়ে পার হবে, আর কেউ জাহান্নামের আগুনে ধাক্কা খেয়ে পড়বে; শেষে সবার শেষজন টেনে-হিঁচড়ে পার হবে। … (মুমিনরা তাদের ভাইদের বের করে আনার পর) নবীগণ, ফেরেশতাগণ ও মুমিনরা সুপারিশ করবেন। তখন মহাপরাক্রমশালী (আল্লাহ) বলবেন: এবার বাকি আছে আমার সুপারিশ। তিনি জাহান্নাম থেকে এক মুঠো নেবেন, আর এমন কিছু মানুষকে বের করবেন যারা পুড়ে কালো হয়ে গেছে। তাদের জান্নাতের মুখে "মাউল হায়াত" (জীবনের পানি) নামের নদীতে ফেলা হবে; তারা তার দুই তীরে এমনভাবে গজিয়ে উঠবে, যেমন বন্যার পলিতে বীজ গজিয়ে ওঠে।
قَالَ أَبُو سَعِيدٍ بَلَغَنِي أَنَّ الْجِسْرَ أَدَقُّ مِنَ الشَّعْرَةِ وَأَحَدُّ مِنَ السَّيْفِ
আবু সাঈদ (রা.) বলেন: আমার কাছে (নবীজির পক্ষ থেকে) পৌঁছেছে যে সেতুটি (পুলসিরাত) চুলের চেয়ে সরু আর তলোয়ারের চেয়ে ধারালো।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ يَوْمَ لَا يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ ۖ نُورُهُمْ يَسْعَىٰ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর---বিশুদ্ধ তাওবা; সম্ভবত তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেদিন আল্লাহ লাঞ্ছিত করবেন না নবীকে এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে। তাদের নূর তাদের সামনে ও ডানে ধাবিত হবে। তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণতা দান করুন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন, নিশ্চয় আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।'
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
- আমানত রক্ষা আর আত্মীয়তার সম্পর্ক জোড়া রাখা (সহিহ মুসলিম ১৯৫)
- ফজর ও আসর কখনো না ছাড়া (সহিহ মুসলিম ৬৩৪)
শেষে দুই ঠিকানা
একদল জান্নাতে, একদল জ্বলন্ত আগুনে
সব ধাপ পেরিয়ে মানুষকে দলে দলে নেওয়া হবে দুই ঠিকানার দিকে। মুত্তাকীদের জন্য দরজা আগেই খোলা থাকবে, ফেরেশতারা সালাম দিয়ে বলবেন: চিরকালের জন্য প্রবেশ করো। আর অবিশ্বাসীরা পৌঁছানো মাত্র জাহান্নামের দরজা খুলবে। তারপর মৃত্যুকে জবাই করে ঘোষণা আসবে: আর মৃত্যু নেই, চিরকাল।
- একদল থাকবে জান্নাতে, আরেক দল জ্বলন্ত আগুনে।সূরা আশ-শূরা ৪২:৭কুরআন
- অবিশ্বাসীদের দলে দলে জাহান্নামের দিকে, আর মুত্তাকীদের দলে দলে জান্নাতের দিকে নেওয়া হবে।সূরা আয-যুমার ৩৯:৭১কুরআন · সূরা আয-যুমার ৩৯:৭৩কুরআন
- মৃত্যুকে ভেড়ার আকারে এনে জবাই করা হবে, আর দুই দলকে বলা হবে: চিরকাল, আর মৃত্যু নেই।সহিহ বুখারী ৪৭৩০সহিহ
যে আমল সেদিন কাজে আসবে
সহিহ হাদিসে যেসব আমলের সাথে কিয়ামতের দিনের পুরস্কারের কথা এসেছে
কিয়ামতের বর্ণনা পড়ার আসল লাভ তখনই, যখন তা আজকের আমলে বদল আনে। নিচের আমলগুলোর বেশিরভাগ ছোট, আজ থেকেই শুরু করা যায়।
| আমল | সেদিনের পুরস্কার | সূত্র ও মান |
|---|---|---|
| খাঁটি তাওহীদ, শিরক থেকে দূরে থাকা | নবীজির সুপারিশের সবচেয়ে বড় হকদার | সহিহ বুখারী ৯৯সহিহ |
| নামাজ যত্ন করে আদায় করা | সবার আগে এর হিসাব; ঠিক থাকলে বাকিটা সহজ | সুনানে আবু দাউদ ৮৬৪সহিহ |
| যৌবনে ইবাদত, মসজিদে মন, গোপন দান | আরশের ছায়া, যেদিন আর কোনো ছায়া নেই | সহিহ বুখারী ৬৬০সহিহ |
| কারো কষ্ট দূর করা, দোষ ঢেকে রাখা | কিয়ামতের কষ্ট দূর হবে, নিজের দোষ ঢাকা থাকবে | সহিহ বুখারী ২৪৪২সহিহ |
| দায়িত্বে ও পরিবারে ইনসাফ | রহমানের ডানে নূরের মিম্বার | সহিহ মুসলিম ১৮২৭সহিহ |
| উত্তম চরিত্র | মীযানে সবচেয়ে ভারী | জামে আত-তিরমিযী ২০০২সহিহ |
| সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম | জিহ্বায় হালকা, পাল্লায় ভারী | সহিহ বুখারী ৬৪০৬সহিহ |
| যত্ন করে অজু | উজ্জ্বল চেহারায় হাউযের পাশে নবীজি চিনবেন | সহিহ মুসলিম ২৪৯সহিহ |
| নিয়মিত কুরআন পড়া | কুরআন সুপারিশকারী হয়ে আসবে | সহিহ মুসলিম ৮০৪সহিহ |
| শুধু আল্লাহর উপর ভরসা, কুলক্ষণ না মানা | বিনা হিসাবে জান্নাত | সহিহ বুখারী ৬৫৪১সহিহ |
| মানুষের হক মেরে না খাওয়া, গালি-অপবাদ না দেওয়া | দেউলিয়া হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচা | সহিহ মুসলিম ২৫৮১সহিহ |
কিয়ামতের দিনের জন্য দোয়া
কুরআন ও সহিহ হাদিসে শেখানো দোয়া, যা নবীজি (ﷺ) ও সাহাবিরা নিয়মিত পড়তেন। মুখস্থ করে নামাজে ও নামাজের বাইরে পড়ুন।
হে আল্লাহ, আমি আপনার আশ্রয় চাই জাহান্নামের শাস্তি থেকে, কবরের শাস্তি থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে, আর মাসীহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে।
সহিহ মুসলিম ৫৮৮সহিহহে আমাদের রব, যেদিন হিসাব শুরু হবে, সেদিন আমাকে, আমার মা-বাবাকে আর সব মুমিনকে ক্ষমা করুন।
সূরা ইবরাহীম ১৪:৪১কুরআনহে আমাদের রব, রাসূলদের মাধ্যমে আমাদের যা দেওয়ার ওয়াদা করেছেন তা দিন, আর কিয়ামতের দিন আমাদের লাঞ্ছিত করবেন না; আপনি তো ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।
সূরা আলে ইমরান ৩:১৯৪কুরআনআল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি কত উত্তম অভিভাবক; আল্লাহর উপরই আমরা ভরসা করি।
জামে আত-তিরমিযী ২৪৩১সহিহহে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন, আর আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচান।
সহিহ বুখারী ৬৩৮৯সহিহপ্রচলিত কিন্তু সহিহ নয়
কিয়ামত আর এর আলামত নিয়ে ওয়াজ, বই আর সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক কথা ছড়ায়, যার সবটা সহিহ নয়। নিচের প্রতিটির সাথে সহিহ কথাটি দেওয়া হলো।
ভিত্তিহীন কিয়ামতের সাল বা তারিখ বলে দেওয়া, যেমন "দুনিয়ার বয়স সাত হাজার বছর, আমরা শেষ হাজারে" বা "অমুক হিজরিতে কিয়ামত"
কিয়ামতের সময় আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না; নবীজিকেও জানানো হয়নি (সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৭, সূরা লুকমান ৩১:৩৪)। জিবরীল (আ.) জিজ্ঞেস করলে নবীজি বলেছিলেন, যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে সে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না (সহিহ বুখারী ৫০)। দুনিয়ার বয়স সাত হাজার বছরের বর্ণনাকে ইমাম ইবনুল কাইয়িম (আল-মানারুল মুনীফ) মিথ্যা বর্ণনার মধ্যে গুনেছেন। কাজেই কেউ সাল-তারিখ বললে বুঝবেন, সেটা অনুমান বা বানানো।
সহিহ সূত্র নেই "কিয়ামত হবে মুহাররমের দশ তারিখ, আশুরার দিনে"
সহিহ হাদিসে শুধু এটুকু এসেছে যে কিয়ামত হবে জুমার দিন (সহিহ মুসলিম ৮৫৪)। কোন মাস বা কোন তারিখ, তা কোনো সহিহ বা হাসান হাদিসে নেই। আশুরার সাথে কিয়ামতকে জোড়া দেওয়া কথাটা ওয়াজে প্রচলিত হলেও এর কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায় না।
ভিত্তিহীন "তোমাদের কুরবানির পশুকে মোটাতাজা করো, কারণ পুলসিরাতে এরাই তোমাদের বাহন হবে"
ইমাম ইবনুস সালাহ বলেছেন, এই হাদিস পরিচিতও নয়, প্রমাণিতও নয়। শাইখ আলবানী (আস-সিলসিলাতুয যঈফাহ, ৭৪) একে "এই শব্দে ভিত্তিহীন" বলেছেন, আর "ইস্তাফরিহূ দাহায়াকুম" শব্দের বর্ণনাকে খুবই দুর্বল বলেছেন। সহিহ কথা হলো, কুরবানির গোশত-রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় তাকওয়া (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৩৭); আর পুলসিরাতে মানুষকে নিয়ে চলবে তার নিজের আমল (সহিহ মুসলিম ১৯৫)।
জাল "কিয়ামতের দিন মানুষকে মায়ের নামে ডাকা হবে, যাতে কারো দোষ প্রকাশ না পায়"
এই বর্ণনা ইবনু আদী এক অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারীর সূত্রে এনেছেন; শাইখ আলবানী একে জাল বলেছেন, আর ইবনু হাজার (ফাতহুল বারী) বলেছেন এর সনদ খুবই দুর্বল। ইমাম বুখারী বরং অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন "মানুষকে তাদের বাবার নামে ডাকা হবে", আর সেখানে এনেছেন: বিশ্বাসঘাতকের পতাকায় লেখা থাকবে "অমুকের ছেলে অমুক" (সহিহ বুখারী ৬১৭৭)।
অনুমান নির্দিষ্ট কোনো মানুষকে "ইমাম মাহদি" ঘোষণা করা, বা আজকের কোনো দেশ, প্রযুক্তি বা সংস্থাকে "দাজ্জাল" বানানো
মাহদির কথা সহিহ সনদে সুনান গ্রন্থে আছে: তিনি নবীজির বংশের, ফাতিমার (রা.) সন্তানদের থেকে, তাঁর নাম ও বাবার নাম নবীজির নাম ও বাবার নামের মতো, তিনি পৃথিবী ইনসাফে ভরে দেবেন (সুনানে আবু দাউদ ৪২৮২, সুনানে আবু দাউদ ৪২৮৪)। ইতিহাসে বহু মানুষ নিজেকে মাহদি দাবি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। আর দাজ্জাল একজন মানুষ, এক চোখ কানা, কপালে "কাফির" লেখা, মক্কা-মদিনায় ঢুকতে পারবে না (সহিহ বুখারী ৭১৩১, সহিহ বুখারী ১৮৮১)। হাদিসের এই স্পষ্ট বিবরণ বাদ দিয়ে প্রতীকী ব্যাখ্যা বানানো দলিলহীন অনুমান।
ভুল ধারণা "আলামত তো শুরু হয়ে গেছে, এখন আর কাজকর্ম বা দুনিয়ার দায়িত্ব দিয়ে কী হবে"
নবীজি বলেছেন, কিয়ামত শুরু হয়ে যাচ্ছে আর কারো হাতে একটি খেজুরের চারা আছে, তবু পারলে সে যেন তা লাগিয়ে দেয় (আল-আদাবুল মুফরাদ ৪৭৯; আলবানী: সহিহ)। আলামত জানার উদ্দেশ্য হতাশ হয়ে বসে থাকা নয়, আমলে তাড়াতাড়ি করা। আর তাওবার দরজা খোলা আছে পশ্চিমে সূর্য ওঠা পর্যন্ত (সহিহ বুখারী ৪৬৩৫)।
নিজেকে যাচাই করুন
কিয়ামত কবে হবে, তা কে জানেন?
শুধু আল্লাহ জানেন; নবীজিকেও জানানো হয়নি (সূরা আরাফ ৭:১৮৭; সহিহ বুখারী ৫০)।
কোন আলামত দেখার পর তাওবা আর কবুল হবে না?
পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠা (সহিহ বুখারী ৪৬৩৫)।
দাজ্জাল থেকে বাঁচার জন্য কুরআনের কোন অংশ মুখস্থ করতে বলা হয়েছে?
সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত (সহিহ মুসলিম ৮০৯)।
মহাসুপারিশের জন্য মানুষ প্রথমে কোন নবীর কাছে যাবে?
আদম (আ.)-এর কাছে; শেষে মুহাম্মাদ (ﷺ) সুপারিশ করবেন (সহিহ বুখারী ৬৫৬৫)।
বিতাকার হাদিসে এক টুকরো কাগজে কী লেখা ছিল, যা নিরানব্বইটি খাতার চেয়ে ভারী হলো?
কালিমায়ে শাহাদাত (তিরমিযী ২৬৩৯, সহিহ)।
হাউযের পাশে নবীজি উম্মতকে কীভাবে চিনবেন?
অজুর কারণে উজ্জ্বল চেহারা আর হাত-পা দেখে (সহিহ মুসলিম ২৪৯)।
শেষ কথা: প্রস্তুতি আজ থেকেই
কিয়ামতের আলামত গোনার চেয়ে জরুরি নিজের প্রস্তুতি। আমাদের প্রত্যেকের কিয়ামত শুরু হয় নিজের মৃত্যুতে, আর সেটা কবে, কেউ জানে না। তাই আজকের নামাজটা যত্ন করে পড়ুন, কারো হক থাকলে মিটিয়ে দিন, আর তাওবা করুন। আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা আছে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং প্ৰত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা আগামী কালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ---আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'