deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ

রোজা: রমজানের পূর্ণ গাইড, আজকের প্রশ্নসহ

গাইড ১/৪রমজান মাসরমজান ও সম্পদের ইবাদত

রমজান এলে ঘরে ঘরে একই প্রশ্ন: ইনসুলিন নিলে রোজা থাকবে তো? প্লেনে সফরে কী করব? সাহরির সময় কখন শেষ? এই গাইডে রোজার মূল নিয়ম থেকে শুরু করে আজকের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আছে, কুরআন ও সহিহ হাদিসের দলিলে। যেখানে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে, সেখানে দুই মতই খোলাখুলি লেখা।

১০টি অধ্যায়
৫টি আয়াত
১৩টি হাদিস (সহিহ/হাসান)
৩টি দোয়া

এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া; হাদিস শুধু সহিহ ও হাসান। দুর্বল বর্ণনা শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে, মানসহ। আয়াতের অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।

গল্প দিয়ে শুরু

বালিশের নিচে দুটো সুতো

রোজার আয়াত তখন সবে নাজিল হয়েছে: খাও, পান করো, যতক্ষণ না কালো সুতো থেকে সাদা সুতো স্পষ্ট হয়। আদী ইবনু হাতিম (রা.) কথাটা একদম শব্দে শব্দে নিলেন।

রাতে তিনি একটা কালো রশি আর একটা সাদা রশি বালিশের নিচে রাখলেন। খানিক পরপর উঁকি দিয়ে দেখেন, দুটো আলাদা করে চেনা যায় কি না। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই বোঝা গেল না।

সকালে তিনি নবীজির (ﷺ) কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা বললেন। নবীজি বুঝিয়ে দিলেন: এর মানে রাতের কালো আর ভোরের সাদা আলো।

যখন নাজিল হলো "যতক্ষণ না তোমাদের জন্য কালো সুতো থেকে সাদা সুতো স্পষ্ট হয়", আমি একটা কালো আর একটা সাদা রশি নিয়ে বালিশের নিচে রাখলাম। রাতে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম, কিন্তু আমার কাছে কিছুই স্পষ্ট হলো না। সকালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে গিয়ে ঘটনাটা বললাম। তিনি বললেন: এর মানে তো রাতের কালো আর দিনের সাদা (ভোরের আলো)।

সহিহ বুখারী ১৯১৬সহিহবর্ণনাকারী: আদী ইবনু হাতিম (রা.)

এই গল্প আমাদের কী শেখায়? আদী (রা.) মানতে চেয়েছিলেন, তাই কষ্ট করে চেষ্টা করেছেন; আর যেখানে বুঝতে পারেননি, সেখানে আন্দাজে না চলে নবীজিকে জিজ্ঞেস করেছেন। রোজার প্রতিটি প্রশ্নেও আমাদের পথ এটাই: মানার আগ্রহ, আর না জানলে দলিলসহ জেনে নেওয়া।

এই গাইডে ১০টি অধ্যায়
১
ফরজ

রোজা কেন: তাকওয়ার প্রশিক্ষণ

আল্লাহ রোজা ফরজ করেছেন, যেন আমরা তাকওয়া অর্জন করি; আগের উম্মতদের উপরও রোজা ফরজ ছিল।

রমজান কুরআন নাজিলের মাস। যে এই মাস পায়, সে রোজা রাখবে; অসুস্থ ও মুসাফির পরে সমান সংখ্যক রোজা রাখবে।

রোজা এমন ইবাদত, যার প্রতিদান আল্লাহ নিজে দেবেন বলেছেন। আর রোজা ঢাল: গালি, ঝগড়া আর অশ্লীলতা থেকে বাঁচায়।

রোজা মানে শুধু না খাওয়া নয়। মিথ্যা আর অন্যায় কাজ না ছাড়লে খাবার ছাড়ার কোনো মূল্য নেই (সহিহ বুখারী ১৯০৩)। ঈমান ও সওয়াবের আশায় রাখা রোজায় আগের গুনাহ মাফ হয় (সহিহ বুখারী ৩৮)।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

হে মুমিনগণ ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেয়া হয়েছিল , যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার।

সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩
এই অধ্যায়ের আরও ২টি দলিল

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ ۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۗ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

রমাদান মাস, এতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের হেদায়াতের জন্য এবং হিদায়াতের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে সে যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে। তবে তোমাদের কেউ অসুস্থ থাকলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং তোমাদের জন্য কষ্ট চান না। আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূর্ণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন সে জন্য তোমরা আল্লাহ্‌র মহিমা ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।

আল্লাহ বলেন: আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা ছাড়া; রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব। রোজা ঢাল। তাই যেদিন তোমাদের কেউ রোজা রাখে, সে যেন অশ্লীল কথা না বলে, চেঁচামেচি না করে। কেউ তাকে গালি দিলে বা ঝগড়া করতে এলে সে যেন বলে: আমি রোজাদার। যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, তাঁর কসম, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধের চেয়েও প্রিয়। রোজাদারের দুটি আনন্দ: ইফতারের সময় সে আনন্দিত হয়, আর রবের সাথে সাক্ষাতের সময় নিজের রোজার জন্য আনন্দিত হবে।

সহিহ বুখারী ১৯০৪সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)
আপনার জীবনেএবারের রমজানে খাওয়ার সাথে একটা বদভ্যাসও ছাড়ার নিয়ত করুন: গীবত, রাগ, বা ফোনে অযথা সময়। রোজার আসল লক্ষ্য এটাই।
২
চাঁদ

রমজান কবে শুরু: চাঁদ দেখা

রমজান শুরু আর শেষ, দুটোই চাঁদ দেখে। আকাশ মেঘলা থাকলে শাবানের ত্রিশ দিন পূর্ণ করতে হয়।

এক দেশে চাঁদ দেখা গেলে কি পৃথিবীর সব দেশে রোজা শুরু হবে? সাহাবিদের যুগেই এ প্রশ্ন এসেছিল। শামে এক দিন আগে চাঁদ দেখা গেলেও ইবনু আব্বাস (রা.) মদিনায় নিজেদের দেখা অনুযায়ী চলেছেন।

আজকের প্রশ্ন, সৌদির সাথে রোজা? আলেমদের দুটি মত আছে। এক মত: নিজের এলাকার চাঁদ দেখা ধরতে হবে (ওপরের হাদিস এর দলিল)। আরেক মত: পৃথিবীর কোথাও চাঁদ দেখা নিশ্চিত হলেই সবার জন্য যথেষ্ট। দুটোই আলেমদের ইজতিহাদ। সহজ ও নিরাপদ পথ হলো, নিজের দেশের মুসলিমদের সাথে রোজা ও ঈদ করা (বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণা), যাতে পরিবার ও সমাজে বিভেদ না হয়।

চাঁদ দেখে রোজা রাখো, আর চাঁদ দেখে রোজা ছাড়ো (ঈদ করো)। আকাশ মেঘলা থাকলে শাবানের ত্রিশ দিন পূর্ণ করো।

সহিহ বুখারী ১৯০৯ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

উম্মুল ফাদল (রা.) কুরাইবকে মুআবিয়ার কাছে শামে পাঠালেন। কুরাইব বলেন: আমি শামে থাকতেই রমজানের চাঁদ উঠল; আমি জুমার রাতে চাঁদ দেখলাম। মাসের শেষে মদিনায় ফিরলে ইবনু আব্বাস (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা চাঁদ কবে দেখেছ? বললাম: জুমার রাতে। তিনি বললেন: তুমি নিজে দেখেছ? বললাম: হ্যাঁ, লোকেরাও দেখেছে, তারা রোজা রেখেছে, মুআবিয়াও রোজা রেখেছেন। তিনি বললেন: কিন্তু আমরা দেখেছি শনিবার রাতে। তাই আমরা ত্রিশ পূর্ণ করা বা চাঁদ দেখা পর্যন্ত রোজা রেখে যাব। আমি বললাম: মুআবিয়ার দেখা আর রোজা কি আপনার জন্য যথেষ্ট নয়? তিনি বললেন: না, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন।

সহিহ মুসলিম ১০৮৭সহিহবর্ণনাকারী: কুরাইব (রহ.), ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে
আপনার জীবনেশাবানের শেষ দিকে চাঁদ দেখার চেষ্টা করুন বা ঘোষণা শুনুন, আর রমজানের প্রথম রাতেই তারাবিহ দিয়ে শুরু করুন।
৩
সাহরি-ইফতার

সাহরি কখন শেষ, ইফতার কখন

ফজরের সময় শুরু হওয়া (সুবহে সাদিক, আকাশের পূর্ব দিগন্তে ছড়িয়ে পড়া সাদা আলো) পর্যন্ত খাওয়া-পান করা যায়; তারপর সূর্য ডোবা পর্যন্ত রোজা (সহিহ বুখারী ১৯১৬)।

সাহরিতে বরকত আছে, তাই অল্প হলেও খান (সহিহ বুখারী ১৯২৩)। আর সূর্য ডুবলে দেরি না করে ইফতার করা কল্যাণের লক্ষণ (সহিহ বুখারী ১৯৫৭)।

ইফতারের পর নবীজি (ﷺ) এই দোয়া পড়তেন:

ক্যালেন্ডারের "সাহরির শেষ সময়": অনেক ক্যালেন্ডার ফজরের কয়েক মিনিট আগের সময় লেখে, সতর্কতার জন্য। এর পরে, কিন্তু ফজরের আগে খেলে রোজা নষ্ট হয় না; তবে সময় নিয়ে সন্দেহ থাকলে আগেই থেমে যাওয়া ভালো। আজানের মাঝে মুখের খাবার ফেলে দিন, আর গিলবেন না।

أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَائِكُمْ ۚ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ ۗ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَخْتَانُونَ أَنفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنكُمْ ۖ فَالْآنَ بَاشِرُوهُنَّ وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ ۚ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ۖ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ ۚ وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ

সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের পোষাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের পোষাকস্বরূপ। আল্লাহ্‌ জানেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদেরকে মার্জনা করেছেন। কাজেই এখন তোমরা তাদের সাথে সংগত হও এবং আল্লাহ্‌ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা কর। আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাতের কালোরেখা থেকে উষার সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রকাশ না হয়। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় তাদের সাথে সংগত হয়ো না। এগুলো আল্লাহ্‌র সীমারেখা। কাজেই এগুলোর নিকটবতী হয়ো না। এভাবে আল্লাহ্‌ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষদের জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারে।

সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا أَفْطَرَ قَالَ ‏ "‏ ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইফতার করে বলতেন: "যাহাবায যামাউ, ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু, ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ" (পিপাসা মিটল, শিরাগুলো ভিজল, আর আল্লাহ চাইলে প্রতিদান নিশ্চিত হলো)।

সুনানে আবু দাউদ ২৩৫৭হাসানবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)
আপনার জীবনেসাহরির জন্য অ্যালার্ম ফজরের অন্তত ২০ মিনিট আগে দিন, যাতে তাড়াহুড়ো না হয়; আর ইফতারে খেজুর বা পানি দিয়ে শুরু করুন।
৪
যা ভাঙে

কী করলে রোজা ভাঙে

রোজা ভাঙে মূলত তিন কারণে, আর এগুলো ইচ্ছা করে, মনে থাকা অবস্থায় করলে তবেই:

  1. খাওয়া বা পান করা, আর যা খাবারের কাজ করে, যেমন পুষ্টির স্যালাইন বা গ্লুকোজ ড্রিপ। ধূমপান ও তামাক জাতীয় ধোঁয়া টানলেও রোজা ভাঙে, আলেমদের ব্যাপক মতে।
  2. স্বামী-স্ত্রীর মিলন। এতে কাযার সাথে কাফফারাও লাগে: একটানা দুই মাস রোজা, না পারলে ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানো (সহিহ বুখারী ১৯৩৬)।
  3. ইচ্ছা করে বমি করা (সুনানে আবু দাউদ ২৩৮০)। অনিচ্ছায় বমি হলে রোজা ভাঙে না।

এছাড়া হায়েয বা নিফাস শুরু হলে সেদিনের রোজা হয় না; পরে কাযা করতে হয় (সহিহ মুসলিম ৩৩৫)।

ভুলে খেয়ে ফেললে রোজা ভাঙে না; মনে পড়লেই থেমে যান (সহিহ বুখারী ১৯৩৩)।

আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে বসে ছিলাম। এক লোক এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি! তিনি বললেন: কী হয়েছে? সে বলল: রোজা অবস্থায় আমি স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: একজন দাস মুক্ত করার সামর্থ্য আছে? সে বলল: না। বললেন: একটানা দুই মাস রোজা রাখতে পারবে? সে বলল: না। বললেন: ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানোর সামর্থ্য আছে? সে বলল: না। নবী (ﷺ) কিছুক্ষণ থামলেন। এর মধ্যে তাঁর কাছে এক ঝুড়ি খেজুর আনা হলো। তিনি বললেন: প্রশ্নকারী কোথায়? সে বলল: এই যে আমি। তিনি বললেন: এটা নিয়ে সদকা করে দাও। লোকটি বলল: আমার চেয়েও গরিব কাউকে, হে আল্লাহর রাসূল? আল্লাহর কসম, মদিনার দুই কালো পাথুরে প্রান্তের মাঝে আমার পরিবারের চেয়ে গরিব কোনো পরিবার নেই। এ কথা শুনে নবী (ﷺ) এমনভাবে হাসলেন যে তাঁর দাঁত দেখা গেল। তারপর বললেন: এটা তোমার পরিবারকেই খাওয়াও।

সহিহ বুখারী ১৯৩৬ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)
আপনার জীবনেরোজায় বড় ভুল হয়ে গেলে লুকিয়ে না রেখে লোকটির মতো সমাধান খুঁজুন: তওবা করুন, কাযা ও কাফফারার নিয়ম জেনে আদায় করুন।
৫
যা ভাঙে না

যা করলে রোজা ভাঙে না

অনেকে অকারণে ভয় পান যে রোজা ভেঙে গেছে। সহিহ হাদিসে এগুলো স্পষ্ট:

  • নাপাক অবস্থায় ফজর হয়ে গেলে পরে গোসল করে রোজা রাখা যায় (সহিহ বুখারী ১৯২৬)।
  • স্ত্রীকে চুমু দেওয়া, যদি নিজেকে সামলাতে পারেন (সহিহ বুখারী ১৯২৭)। না পারলে দূরে থাকুন।
  • শিঙ্গা লাগানো, অর্থাৎ শরীর থেকে রক্ত বের করা (সহিহ বুখারী ১৯৩৮)। তাই রক্ত পরীক্ষার জন্য অল্প রক্ত দিলে রোজা ভাঙে না।
  • অজুতে কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া; তবে রোজায় নাকে জোরে পানি টানবেন না (সুনানে আবু দাউদ ২৩৬৬)।
  • নিজের থুথু গেলা, মিসওয়াক বা ব্রাশ করা (পেস্ট গিলবেন না), সুগন্ধি নেওয়া, গোসল করা।

শিঙ্গা নিয়ে মতভেদ: আরেকটি হাদিসে আছে, "শিঙ্গা যে লাগায় আর যাকে লাগানো হয়, দুজনেরই রোজা ভাঙল" (আবু দাউদ ২৩৬৭, আলবানী: সহিহ)। হাম্বলি আলেমরা এই হাদিস ধরে বলেন শিঙ্গায় রোজা ভাঙে; অধিকাংশ আলেম বলেন ইবনু আব্বাসের (রা.) ওপরের হাদিস পরের ঘটনা, তাই ভাঙে না। এ কারণে দুর্বল লাগার মতো বেশি রক্ত দেওয়া (যেমন রক্তদান) ইফতারের পরে করাই ভালো।

নবী (ﷺ) ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন (শরীর থেকে রক্ত বের করিয়েছেন), আর রোজা অবস্থায়ও শিঙ্গা লাগিয়েছেন।

সহিহ বুখারী ১৯৩৮ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)
আপনার জীবনেরোজা নিয়ে ভয়ের কোনো কথা শুনলে প্রথমে জিজ্ঞেস করুন: এর দলিল কী? অনেক "রোজা ভাঙার কারণ" আসলে মানুষের বানানো।
৬
আজকের প্রশ্ন

ওষুধ, ইনজেকশন, ইনহেলার: আধুনিক মাসআলা

নবীজির (ﷺ) যুগে ইনজেকশন বা ইনহেলার ছিল না; তাই আলেমরা মূলনীতি দিয়ে বিচার করেন: যা মুখ বা নাক দিয়ে পেটে যায়, অথবা যা খাবারের কাজ করে, তাতে রোজা ভাঙে; যা খাবারও নয়, পেটেও যায় না, তাতে ভাঙে না। ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (OIC, জেদ্দা) ১৯৯৭ সালে চিকিৎসার এসব বিষয়ে এই মূলনীতিতেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। নিচের "এক নজরে" সারণিতে প্রতিটি বিষয় দেখুন।

সবচেয়ে বড় কথা: আল্লাহ সহজ চান, কঠিন চান না। রোজা রাখলে যদি রোগ বাড়ে বা ক্ষতির ভয় থাকে, তাহলে রোজা ভেঙে পরে কাযা করাই আল্লাহর দেওয়া ছাড়।

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ ۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۗ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

রমাদান মাস, এতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের হেদায়াতের জন্য এবং হিদায়াতের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে সে যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে। তবে তোমাদের কেউ অসুস্থ থাকলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং তোমাদের জন্য কষ্ট চান না। আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূর্ণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন সে জন্য তোমরা আল্লাহ্‌র মহিমা ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।

সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫
আপনার জীবনেআপনার নিয়মিত ওষুধ থাকলে রমজানের আগেই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন, ডোজ সাহরি আর ইফতারে ভাগ করা যায় কি না।
৭
ছাড়

কারা রোজা না রেখে পরে রাখতে পারেন

অসুস্থ ও মুসাফির রোজা না রেখে পরে কাযা করতে পারেন; আর যারা একেবারেই পারে না, তারা ফিদইয়া দেয়।

সফরে নবীজির (ﷺ) সাথে কেউ রোজা রাখতেন, কেউ রাখতেন না; কেউ কাউকে দোষ দিতেন না (সহিহ বুখারী ১৯৪৭)। তবে কষ্টের সফরে জোর করে রোজা রাখা নেকির কাজ নয়।

অবস্থাকী করবেন
সফর (প্রায় ৮০ কিলোমিটার বা তার বেশি পথ; বাস, ট্রেন বা প্লেন, সব একই)রাখতেও পারেন, ভাঙতেও পারেন; ভাঙলে পরে কাযা। কষ্ট না হলে রাখা ভালো, কষ্ট হলে ভাঙা ভালো।
প্লেনে ইফতারজানালা দিয়ে যখন সূর্য ডুবে যেতে দেখবেন, তখন ইফতার; নিচের শহরের সময় নয়।
অসুস্থ, যার সেরে ওঠার আশা আছেরোজা রাখলে রোগ বাড়বে বা দেরিতে সারবে, এমন ভয় থাকলে ভাঙবেন; সুস্থ হয়ে কাযা।
ডায়াবেটিস, কিডনি বা হৃদরোগীঅভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার যদি বলেন রোজা ক্ষতিকর, তাহলে রাখবেন না। স্থায়ী অক্ষমতা হলে ফিদইয়া।
গর্ভবতী বা দুধ খাওয়ানো মানিজের বা শিশুর ক্ষতির ভয় থাকলে রাখবেন না (সুনানে আবু দাউদ ২৪০৮); পরে কাযা। ফিদইয়াও লাগবে কি না, এ নিয়ে মতভেদ আছে।
হায়েয বা নিফাসরোজা রাখবেন না; পরে কাযা (সহিহ মুসলিম ৩৩৫)।
খুব বৃদ্ধ বা স্থায়ী রোগীপ্রতিদিনের বদলে একজন মিসকিনকে খাওয়ানো (ফিদইয়া) (সহিহ বুখারী ৪৫০৫)।
পরীক্ষা, ভারী কাজএটা নিজে ছাড়ের কারণ নয়; রোজা রেখে কাজ শুরু করুন। দিনের মাঝে সত্যিই প্রাণের বা স্বাস্থ্যের আশঙ্কা হলে ভেঙে পরে কাযা।

যেখানে দিন খুব লম্বা: ইউরোপ বা উত্তরের দেশে যেখানে দিন-রাত আলাদা চেনা যায়, সেখানে দিন লম্বা হলেও স্থানীয় সময়েই রোজা। যেখানে কয়েক দিন সূর্য ডোবেই না, সেখানে আলেমরা কাছের স্বাভাবিক দেশ বা মক্কার সময় ধরে হিসাব করতে বলেন; দাজ্জালের লম্বা দিনে নামাজের সময় "অনুমান করে নেওয়ার" নির্দেশ থেকে তাঁরা এই নীতি নিয়েছেন (সহিহ মুসলিম ২৯৩৭, নাওয়াস ইবনু সামআন রা.-এর লম্বা হাদিসের প্রথম অংশ)।

أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ ۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۚ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ ۖ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ ۚ وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

এগুলো গোনা কয়েক দিন। অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। আর যাদের জন্য সিয়াম কষ্টসাধ্য তাদের কর্তব্য এর পরিবর্তে ফিদ্‌ইয়া- একজন মিসকীনকে খাদ্য দান করা। যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎকাজ করে তবে তা তার জন্য কল্যাণকর। আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণের যদি তোমরা জানতে।

সূরা আল-বাকারা ২:১৮৪
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي سَفَرٍ، فَرَأَى زِحَامًا، وَرَجُلاً قَدْ ظُلِّلَ عَلَيْهِ، فَقَالَ ‏"‏ مَا هَذَا ‏"‏‏.‏ فَقَالُوا صَائِمٌ‏.‏ فَقَالَ ‏"‏ لَيْسَ مِنَ الْبِرِّ الصَّوْمُ فِي السَّفَرِ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক সফরে ছিলেন। তিনি দেখলেন ভিড়, আর একজন লোককে ছায়া দেওয়া হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলেন: এ কী? লোকেরা বলল: সে রোজাদার। তিনি বললেন: সফরে (এভাবে কষ্ট করে) রোজা রাখা নেকির কাজ নয়।

সহিহ বুখারী ১৯৪৬সহিহবর্ণনাকারী: জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.)
আপনার জীবনেছাড় নেওয়া দুর্বলতা নয়, আল্লাহর দেওয়া সুযোগ। তবে যে কয়টা রোজা ছুটল, তার হিসাব আজই লিখে রাখুন।
৮
কাযা ও কাফফারা

ছুটে যাওয়া রোজা: কাযা, কাফফারা ও ফিদইয়া

তিনটি শব্দ আলাদা করে বুঝুন:

শব্দমানেকখন
কাযাছুটে যাওয়া প্রতিটি রোজার বদলে পরে একটি রোজাঅসুস্থতা, সফর, হায়েয, ইচ্ছা করে বমি, বা অন্য কারণে ভাঙলে (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৪)
কাফফারাএকটানা দুই মাস রোজা; না পারলে ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানোরমজানের দিনে স্ত্রী-মিলনে রোজা ভাঙলে, কাযার সাথে (সহিহ বুখারী ১৯৩৬); হানাফি মতে ইচ্ছা করে খাওয়া-পান করলেও
ফিদইয়াপ্রতিটি রোজার বদলে একজন মিসকিনকে এক বেলা পেট ভরে খাওয়ানো, বা সমপরিমাণ খাদ্যযে আর কখনো রোজা রাখতে পারবে না (সহিহ বুখারী ৪৫০৫)

কাযা পরের রমজানের আগেই শেষ করুন; একটানা রাখা জরুরি নয়। আর ইচ্ছা করে রোজা ছাড়া কবিরা গুনাহ; কাযার সাথে খাঁটি তওবা করুন।

أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ ۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۚ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ ۖ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ ۚ وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

এগুলো গোনা কয়েক দিন। অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। আর যাদের জন্য সিয়াম কষ্টসাধ্য তাদের কর্তব্য এর পরিবর্তে ফিদ্‌ইয়া- একজন মিসকীনকে খাদ্য দান করা। যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎকাজ করে তবে তা তার জন্য কল্যাণকর। আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণের যদি তোমরা জানতে।

সূরা আল-বাকারা ২:১৮৪
আপনার জীবনেকাযা বাকি থাকলে সামনের সোমবার বা বৃহস্পতিবার থেকে শুরু করুন; সপ্তাহে দুটো রাখলেও দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।
৯
শেষ দশক

শেষ দশ রাত, ইতিকাফ ও লাইলাতুল কদর

শেষ দশক শুরু হলে নবীজি (ﷺ) ইবাদতে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতেন, রাত জাগতেন, পরিবারকেও জাগাতেন।

এই দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর খুঁজতে বলেছেন; নির্দিষ্ট কোনো তারিখ নিশ্চিত নয় (সহিহ বুখারী ২০১৭)। কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম (সূরা আল-কদর ৯৭:৩)।

শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ নবীজির (ﷺ) নিয়মিত সুন্নাহ ছিল, আর তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীরাও করেছেন (সহিহ বুখারী ২০২৬)। পুরো দশ দিন না পারলে যতটুকু পারেন, ততটুকু নফল ইতিকাফের নিয়ত করুন।

(রমজানের শেষ) দশক শুরু হলে নবী (ﷺ) কোমর বেঁধে নিতেন (পুরো মনোযোগ দিতেন), রাত জেগে ইবাদত করতেন আর পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন।

সহিহ বুখারী ২০২৪ সহিহ বর্ণনা: আয়েশা (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে (ইবাদতে) দাঁড়ায়, তার আগের গুনাহ মাফ করা হয়। আর যে ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার আগের গুনাহ মাফ করা হয়।

সহিহ বুখারী ১৯০১সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)
আপনার জীবনেশেষ দশকের রাতে অন্তত এশা ও ফজর জামাতে পড়ুন, আর ঘুমানোর আগে কদরের দোয়াটা পড়ুন। এই দশ রাতে ফোন দূরে রাখার চেষ্টা করুন।
১০
ফিতরা ও ঈদ

সাদাকাতুল ফিতর, ঈদ আর শাওয়ালের ছয় রোজা

ফিতরা রোজার ছোটখাটো ত্রুটি থেকে পবিত্রতা, আর গরিবের ঈদের খাবার। ঈদের নামাজের আগেই দিতে হয়।

পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের পক্ষ থেকে, শিশুসহ, এক সা (প্রায় আড়াই থেকে তিন কেজি) খাদ্য (সহিহ বুখারী ১৫০৩)। যার কাছে ঈদের দিনের খাবারের চেয়ে বেশি আছে, তার উপর ফিতরা।

টাকায় ফিতরা দেওয়া যাবে? হাদিসে খাদ্যের কথা আছে, তাই অধিকাংশ আলেম (মালিকি, শাফিঈ, হাম্বলি) খাদ্য দিতে বলেন। হানাফি আলেমরা খাদ্যের দামের সমান টাকা দেওয়াও জায়েজ বলেন, কারণ এতে গরিব নিজের দরকারমতো কিনতে পারে। বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতি বছর টাকার হার ঘোষণা করে। যেটাই দিন, ঈদের নামাজের আগে দিন।

ফিতরার পরিমাণ, ঈদের নামাজ আর ঈদের দিনের সুন্নাহ বিস্তারিত দেখুন ঈদ ও কুরবানির পাতায়।

রমজানের পর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখলে সারা বছর রোজার সওয়াব।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন রোজাদারের অনর্থক ও অশ্লীল কথা থেকে পবিত্রতা হিসেবে, আর মিসকিনদের খাবার হিসেবে। যে ঈদের নামাজের আগে আদায় করে, তা কবুলযোগ্য যাকাত; আর যে নামাজের পরে আদায় করে, তা সাধারণ সদকাগুলোর একটি সদকা।

সুনানে আবু দাউদ ১৬০৯ হাসান বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ

যে রমজানের রোজা রাখল, তারপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।

সহিহ মুসলিম ১১৬৪সহিহবর্ণনাকারী: আবু আইয়ুব আল-আনসারী (রা.)
আপনার জীবনেফিতরা ঈদের দুই-এক দিন আগেই দিয়ে দিন, যাতে গরিব পরিবার ঈদের কেনাকাটা করতে পারে।

এক নজরে: রোজা ভাঙে কি না

বিষয়রোজা ভাঙে?ব্যাখ্যা
ভুলে খাওয়া বা পান করানামনে পড়লেই থামুন (সহিহ বুখারী ১৯৩৩)
ইচ্ছা করে খাওয়া, পান করা, ধূমপানহ্যাঁকাযা; সাথে তওবা
স্ত্রী-মিলনহ্যাঁকাযা ও কাফফারা (সহিহ বুখারী ১৯৩৬)
অনিচ্ছায় বমিনাসুনানে আবু দাউদ ২৩৮০
ইচ্ছা করে বমিহ্যাঁকাযা (সুনানে আবু দাউদ ২৩৮০)
মাংসপেশি, চামড়া বা শিরায় ওষুধের ইনজেকশন (টিকা, ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক)নাখাবার নয়, মুখ দিয়ে পেটেও যায় না; ফিকহ একাডেমি ও অধিকাংশ সমকালীন আলেমের মত
ইনসুলিন ইনজেকশননাএকই কারণে; তবে রক্তে চিনি খুব কমে গেলে রোজা ভেঙে চিকিৎসা নিন
পুষ্টির স্যালাইন, গ্লুকোজ ড্রিপহ্যাঁ, অধিকাংশ আলেমের মতেখাবার ও পানীয়ের কাজ করে
হাঁপানির ইনহেলারমতভেদশাইখ ইবনু বায ও ইবনু উসাইমীনসহ অনেকে বলেন ভাঙে না, কারণ প্রায় সবটুকু ফুসফুসে যায়; কিছু আলেম ও অনেক হানাফি মুফতি বলেন ভাঙে। দরকার হলে নিন; সম্ভব হলে ডোজ সাহরি-ইফতারে নিন
অক্সিজেন (ওষুধ মেশানো ছাড়া)নাখাবার বা পানীয় নয়
চোখের ড্রপ, কানের ড্রপ (কানের পর্দা ঠিক থাকলে)না, অধিকাংশের মতেগলায় স্বাদ পেলে থুথু ফেলে দিন
নাকের ড্রপ বা স্প্রেসাবধানেগলায় চলে গেলে অনেকের মতে ভাঙে (সুনানে আবু দাউদ ২৩৬৬); দরকার না হলে ইফতারের পর নিন
রক্ত পরীক্ষা, অল্প রক্ত দেওয়ানাসহিহ বুখারী ১৯৩৮
রক্তদান (বেশি রক্ত)মতভেদহাম্বলি মতে শিঙ্গার মতো রোজা ভাঙে; নিরাপদ পথ ইফতারের পরে দেওয়া
দাঁত তোলা, ফিলিং, ব্রাশ, মিসওয়াকনারক্ত বা পেস্ট গিলবেন না
জিভের নিচে হার্টের ট্যাবলেট (না গিলে)নাফিকহ একাডেমির সিদ্ধান্ত; গিলে ফেললে ভাঙে
ডায়ালাইসিসমতভেদঅনেক আলেম বলেন ভাঙে, কারণ শরীরে পুষ্টি ও তরল যায়; এমন রোগী সাধারণত ছাড়ের মধ্যেই পড়েন
এন্ডোসকপি, পায়ুপথে ওষুধ বা পরীক্ষামতভেদঅনেক আলেম বলেন শুধু শুকনো নল ঢুকলে ভাঙে না, তরল বা ওষুধ ভেতরে গেলে ভাঙে; অন্যরা আরও কড়া। সম্ভব হলে রাতে করান
সুগন্ধি, আতর, গোসল, সাঁতার (পানি না গিলে)নামুখ দিয়ে পেটে যায় না
নাপাক অবস্থায় ফজর হয়ে যাওয়ানাসহিহ বুখারী ১৯২৬

যেখানে "মতভেদ" লেখা, সেখানে দুই পক্ষেই নির্ভরযোগ্য আলেম আছেন। নিজের অবস্থায় যে আলেমের কাছে নিয়মিত মাসআলা জিজ্ঞেস করেন, তাঁর মত মেনে চলুন, আর সন্দেহ থাকলে সতর্ক পথটা নিন। রোজার আরও প্রচলিত কথা দলিলসহ: প্রচলিত ভুল।

দোয়া, আমল ও যাচাই

এই গাইডের দোয়া, আমলের চেকলিস্ট, প্রচলিত ভুল আর নিজেকে যাচাই

দোয়া

লাইলাতুল কদরের দোয়া

قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ عَلِمْتُ أَىُّ لَيْلَةٍ لَيْلَةُ الْقَدْرِ مَا أَقُولُ فِيهَا قَالَ ‏ "‏ قُولِي اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, যদি জানতে পারি কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তাহলে সে রাতে কী বলব? তিনি বললেন: বলো, "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন কারীমুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নী" (হে আল্লাহ, তুমি ক্ষমাশীল, দয়ালু, ক্ষমা করতে ভালোবাসো; তাই আমাকে ক্ষমা করো)।

জামে আত-তিরমিযী ৩৫১৩ সহিহ

ইফতারের পরের দোয়া

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا أَفْطَرَ قَالَ ‏ "‏ ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইফতার করে বলতেন: "যাহাবায যামাউ, ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু, ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ" (পিপাসা মিটল, শিরাগুলো ভিজল, আর আল্লাহ চাইলে প্রতিদান নিশ্চিত হলো)।

সুনানে আবু দাউদ ২৩৫৭ হাসান

আমল কবুলের দোয়া

وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴿١٢٧﴾

আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিলেন, (তারা বলছিলেন) ‘হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

সূরা আল-বাকারা ২:১২৭

কুরআনের দোয়ার অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে; হাদিসের দোয়ার সাথে মূল গ্রন্থের নম্বর ও মান দেওয়া আছে।

রোজা, যাকাত ও হজ: সব গাইড

deenpedia.com · https://deenpedia.com/poth/roja/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার