deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

يَا غُلَامُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ

শৈশব: ভালোবাসা দিয়ে দ্বীন শেখানো

ধাপ ৩/১৪শিশুকাল (০ থেকে ১০ বছর)জন্মের আগে ও শৈশব

নবী (ﷺ) শিশুদের কোলে নিতেন, চুমু খেতেন, নামাজের মধ্যেও নাতনিকে কোলে রাখতেন। আবার একই মানুষ শিশুদের খাওয়ার আদব, আল্লাহর উপর ভরসা আর নামাজ শিখিয়েছেন। শৈশবের সুন্নাহ হলো: আগে ভালোবাসা, তারপর শিক্ষা।

৪টি অধ্যায়
৬টি আয়াত
৭টি সহিহ হাদিস
৩টি দোয়া

এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া; হাদিস শুধু সহিহ ও হাসান। দুর্বল বর্ণনা শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে, মানসহ। আয়াতের অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।

গল্প দিয়ে শুরু

ছোট্ট উমারের প্লেট

উমার ইবনু আবী সালামা ছিলেন উম্মু সালামা (রা.)-এর ছেলে। মায়ের সাথে তিনি নবী (ﷺ)-এর ঘরে বড় হচ্ছিলেন। একদিন সবাই একসাথে খেতে বসেছে। ছোট্ট উমারের হাত প্লেটের এদিক-ওদিক ঘুরছে, যেখানে যা পাচ্ছে তুলে নিচ্ছে।

নবীজি বকা দিলেন না, প্লেট সরিয়ে নিলেন না, অন্যদের সামনে লজ্জাও দিলেন না। শুধু নরমভাবে তিনটা কথা বললেন: হে বালক, বিসমিল্লাহ বলো, ডান হাতে খাও, আর তোমার সামনে থেকে খাও।

আমি ছোটবেলায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর তত্ত্বাবধানে ছিলাম। খাওয়ার সময় আমার হাত পাত্রের সবদিকে ঘুরত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন: হে বালক, আল্লাহর নাম নাও (বিসমিল্লাহ বলো), ডান হাতে খাও, আর তোমার সামনে থেকে খাও। এরপর থেকে সারা জীবন আমি এভাবেই খেয়েছি।

সহিহ বুখারী ৫৩৭৬সহিহবর্ণনাকারী: উমার ইবনু আবী সালামা (রা.)

উমার পরে বড় হয়ে বলেছেন: সেদিনের পর থেকে সারা জীবন আমি এভাবেই খেয়েছি। একটা ছোট, নরম, স্পষ্ট নির্দেশ সারা জীবনের অভ্যাস হয়ে গেল। শিশুকে শেখানোর নববী পদ্ধতি এটাই।

এই ধাপে ৪টি অধ্যায়
১
ভালোবাসা

যে শিশুকে দয়া করে না, সে আল্লাহর দয়া পায় না

নবী (ﷺ) নাতি হাসানকে চুমু খাচ্ছিলেন। এক গোত্রনেতা অবাক হয়ে বলল, আমার দশটা সন্তান, কাউকে কখনো চুমু খাইনি। নবীজি বললেন: যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।

তিনি নামাজের মধ্যেও নাতনি উমামাকে কোলে রাখতেন; সিজদায় নামিয়ে রাখতেন, দাঁড়ালে আবার তুলে নিতেন। শিশুর জন্য মসজিদ বা ইবাদত "নিষিদ্ধ জায়গা" নয়।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাসান ইবনু আলী (রা.)-কে চুমু খেলেন। তখন আকরা ইবনু হাবিস পাশে বসা ছিলেন। তিনি বললেন: আমার দশটি সন্তান, আমি কাউকে কখনো চুমু খাইনি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার দিকে তাকিয়ে বললেন: যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।

সহিহ বুখারী ৫৯৯৭ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

كَانَ يُصَلِّي وَهْوَ حَامِلٌ أُمَامَةَ بِنْتَ زَيْنَبَ بِنْتِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَلأَبِي الْعَاصِ بْنِ رَبِيعَةَ بْنِ عَبْدِ شَمْسٍ، فَإِذَا سَجَدَ وَضَعَهَا، وَإِذَا قَامَ حَمَلَهَا‏

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর নাতনি উমামা বিনতু যাইনাবকে কোলে নিয়ে নামাজ পড়তেন। সিজদায় গেলে তাকে নামিয়ে রাখতেন, আবার দাঁড়ালে কোলে তুলে নিতেন।

সহিহ বুখারী ৫১৬সহিহবর্ণনাকারী: আবু কাতাদা আল-আনসারী (রা.)
আপনার জীবনেপ্রতিদিন সন্তানকে জড়িয়ে ধরুন, চুমু দিন, তার কথা শুনুন। ভালোবাসার এই ভিত্তি না থাকলে পরে নামাজের আদেশও তার কাছে বোঝা মনে হবে।
২
আদব

ছোট ছোট আদব, স্পষ্ট ও নরম ভাষায়

উপরের গল্পে দেখলেন, নবীজি একসাথে তিনটা আদব শিখিয়েছেন, ছোট বাক্যে, ঠিক সেই মুহূর্তে। শিশুরা দীর্ঘ বক্তৃতা মনে রাখে না, কিন্তু ঘটনার সময় পাওয়া ছোট নির্দেশ মনে রাখে।

আর মনে রাখুন, প্রত্যেকেই তার অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সন্তান আপনার কাছে আল্লাহর আমানত, কিয়ামতের দিন তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে।

আল্লাহ মুমিনদের আদেশ দিয়েছেন নিজেদের আর পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদেশপ্ৰাপ্ত হয় তা-ই করে।

সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

كُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، الإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهْوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا

তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নেতা দায়িত্বশীল, তাকে তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তাকে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নারী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল, তাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।

সহিহ বুখারী ৮৯৩সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)
আপনার জীবনেএই সপ্তাহে সন্তানকে একটা আদব শেখান, ঘটনার সময়ে, এক বাক্যে: খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ, ঘরে ঢুকে সালাম, বা ডান হাতে খাওয়া। নিজে আগে করে দেখান।
৩
ঈমানের ভিত্তি

শিশুকে আল্লাহর উপর ভরসা শেখানো

ইবনু আব্বাস (রা.) তখন কিশোর। একদিন নবীজির পেছনে একই বাহনে বসে ছিলেন। পথেই নবীজি তাঁকে কয়েকটি কথা শেখালেন, যা আজও তাওহীদের সবচেয়ে সুন্দর পাঠ।

লুকমান (আ.)-ও তাঁর ছেলেকে প্রথমেই শিখিয়েছিলেন: আল্লাহর সাথে শরীক কোরো না।

একদিন আমি (কিশোর বয়সে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পেছনে (একই বাহনে) ছিলাম। তিনি বললেন: হে বালক, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাচ্ছি। আল্লাহর (বিধানের) হেফাজত করো, তিনি তোমার হেফাজত করবেন। আল্লাহর হেফাজত করো, তাঁকে তোমার সামনে পাবে। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাও, সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছে চাও। জেনে রাখো, সব মানুষ মিলে তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে কোনো উপকার করতে পারবে না; আর সবাই মিলে ক্ষতি করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে, আর খাতা শুকিয়ে গেছে।

জামে আত-তিরমিযী ২৫১৬ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

আর স্বরণ করুন যখন লুকমান উপদেশ দিতে গিয়ে তার পুত্রকে বলেছিল, 'হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কোনো শির্ক করো না। নিশ্চয় শির্ক বড় যুলুম।

আপনার জীবনেগাড়িতে, হাঁটার পথে, ঘুমানোর আগে শিশুর সাথে কথা বলুন: আল্লাহ সব দেখেন, কিছু লাগলে তাঁর কাছে চাও। তাওহীদ শেখানোর জন্য আলাদা ক্লাস লাগে না।
৪
নামাজ ও ইনসাফ

সাত বছরে নামাজ, আর সব সন্তানের সাথে সমান আচরণ

নবী (ﷺ) বলেছেন, সাত বছর বয়সে সন্তানকে নামাজের আদেশ দাও, দশ বছরে প্রয়োজনে শাসন করো, আর তাদের বিছানা আলাদা করো। আলেমরা বলেছেন, এই শাসন হবে আঘাতহীন, শুধু গুরুত্ব বোঝানোর জন্য; আর তার আগের তিন বছর ধৈর্য ধরে উৎসাহ দিয়ে শেখাতে হবে।

আল্লাহ বলেছেন, পরিবারকে নামাজের আদেশ দাও আর নিজেও তাতে অবিচল থাকো।

সন্তানদের মধ্যে কাউকে বেশি দেওয়া, কাউকে কম, এটা নবীজি "জুলুম" হিসেবে ফিরিয়ে দিয়েছেন। নুমান ইবনু বাশীরের বাবা এক ছেলেকে উপহার দিয়ে সাক্ষী রাখতে এলে নবীজি বললেন: আল্লাহকে ভয় করো, সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।

সন্তানকে নামাজ শেখাতে: ছবিসহ নামাজের নিয়ম ›

তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাজের আদেশ দাও; দশ বছর হলে নামাজের জন্য (প্রয়োজনে হালকা) শাসন করো; আর তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।

সুনানে আবু দাউদ ৪৯৫ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ২টি দলিল

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا ۖ لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُكَ ۗ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَىٰ

আর আপনার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দিন ও তাতে অবিচল থাকুন, আমরা আপনার কাছে কোনো রিযিক চাই না; আমরাই আপনাকে রিযিক দেই। আর শুভ পরিণাম তো তাকওয়াতেই নিহিত।

আমার বাবা আমাকে একটি উপহার দিলেন। আমার মা আমরা বিনতু রাওয়াহা বললেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সাক্ষী না রাখলে আমি রাজি নই। বাবা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে গিয়ে বিষয়টা জানালেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তোমার সব সন্তানকে কি এমন দিয়েছ? বাবা বললেন: না। তিনি বললেন: আল্লাহকে ভয় করো, আর সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো। বাবা ফিরে এসে উপহারটি ফিরিয়ে নিলেন।

সহিহ বুখারী ২৫৮৭সহিহবর্ণনাকারী: নুমান ইবনু বাশীর (রা.)
আপনার জীবনেসাত বছরের সন্তানকে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে নামাজ পড়ুন, শেষ হলে প্রশংসা করুন। আর উপহার, আদর বা সময় দেওয়ায় সব সন্তানকে সমান রাখুন।

দোয়া, আমল ও যাচাই

এই ধাপের দোয়া, আমলের চেকলিস্ট, প্রচলিত ভুল আর নিজেকে যাচাই

দোয়া

সন্তানকে নামাজি বানানোর দোয়া (ইবরাহীম আ.)

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ ﴿٤٠﴾

‘হে আমার রব! আমাকে সালাত কয়েমকারী করুন এবং আমার বংশধরদের মধ্য হতেও। হে আমাদের রব! আর আমার দো’আ কবূল করুন।

সূরা ইবরাহীম ১৪:৪০
জ্ঞান বাড়ানোর দোয়া (শিশুকে শেখান)

فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ ۗ وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِن قَبْلِ أَن يُقْضَىٰ إِلَيْكَ وَحْيُهُ ۖ وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا ﴿١١٤﴾

সুতরাং প্রকৃত মালিক আল্লাহ্ অতি মহান সর্বোচ্চ সত্ত্বা। আর আপনার প্রতি আল্লাহর ওহী সম্পূর্ণ হওয়ার আগে আপনি কুরআন পাঠে তাড়াহুড়া করবেন না এবং বলুন, ‘হে আমার রব! আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করুন।

সূরা ত্বা-হা ২০:১১৪
চোখ জুড়ানো পরিবার

وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا ﴿٧٤﴾

এবং যারা প্রার্থনা করে বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যারা হবে আমাদের জন্য চোখজুড়ানো। আর আপনি আমাদেরকে করুন মুত্তাকীদের জন্য অনুসরণযোগ্য।

সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৪

কুরআনের দোয়ার অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে; হাদিসের দোয়ার সাথে মূল গ্রন্থের নম্বর ও মান দেওয়া আছে।

সুন্নাহর আলোয় জীবন: সব ধাপ

deenpedia.com · https://deenpedia.com/jibon/shoishob/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার