পুরো জীবনের সব সুন্নাহ, সব চেষ্টা, সব ধৈর্যের ফল দেখা যাবে এখানে। দুনিয়ার জীবন ছিল কয়েক দশকের; আখিরাতের জীবন চিরকালের। এই শেষ ধাপে দেখব, কবরের প্রথম রাত থেকে জান্নাতের দরজা পর্যন্ত কুরআন ও সহিহ হাদিস কী বলে, যাতে আজকের প্রতিটি দিন সেই দিনের প্রস্তুতি হয়।
ধাপ ১৪/১৪ · চিরস্থায়ী জীবন (বিন্দুতে চাপলে সেই ধাপে যাবে)
৬টি অধ্যায়
১১টি আয়াত
১৫টি সহিহ হাদিস
৪টি দোয়া
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া; হাদিস শুধু সহিহ ও হাসান। দুর্বল বর্ণনা শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে, মানসহ। আয়াতের অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
গল্প দিয়ে শুরু
জান্নাতে সবশেষে প্রবেশকারী মানুষটি
নবী (ﷺ) একদিন সাহাবিদের একটি গল্প বললেন। কিয়ামতের পর এক ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হবে, সবার শেষে। আল্লাহ তাকে বলবেন, যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো।
সে জান্নাতের কাছে গিয়ে ভাববে, এটা তো ভরে গেছে। ফিরে এসে বলবে, হে রব, জান্নাত তো ভরা। আল্লাহ আবার বলবেন, যাও, প্রবেশ করো। আবার একই ঘটনা। শেষে আল্লাহ বলবেন, যাও, তোমার জন্য রয়েছে পুরো দুনিয়ার সমান, আর তার দশ গুণ।
লোকটি বিশ্বাসই করতে পারবে না। বলবে, আপনি তো রাজাধিরাজ, আমার সাথে কি ঠাট্টা করছেন? বর্ণনাকারী ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন, এ কথা বলে নবীজি এমনভাবে হাসলেন যে তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা গেল। বলা হতো, এটাই জান্নাতিদের সবচেয়ে নিচু স্তর।
আমি জানি জাহান্নাম থেকে সবশেষে কে বের হবে আর জান্নাতে সবশেষে কে ঢুকবে। এক ব্যক্তি হামাগুড়ি দিয়ে জাহান্নাম থেকে বের হবে। আল্লাহ বলবেন: যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। সে গিয়ে মনে করবে জান্নাত ভরে গেছে। ফিরে এসে বলবে: হে রব, তা তো ভরা। আল্লাহ বলবেন: যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। এভাবে আবার হবে। শেষে আল্লাহ বলবেন: যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো; তোমার জন্য রয়েছে পুরো দুনিয়ার সমান এবং তার দশ গুণ। সে বলবে: আপনি তো রাজাধিরাজ, আমার সাথে কি ঠাট্টা করছেন? (বর্ণনাকারী বলেন:) আমি দেখলাম রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমনভাবে হাসলেন যে তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা গেল। বলা হতো, এটাই জান্নাতিদের মধ্যে সবচেয়ে নিচু স্তর।
এই গল্প আমাদের কী শেখায়? জান্নাতের সবচেয়ে নিচু মানুষটি পাবে দুনিয়ার দশ গুণ। তাহলে যারা দুনিয়ায় নামাজ, সততা, ধৈর্য আর সুন্নাহ নিয়ে বেঁচেছে, তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে? আল্লাহ বলেছেন, এমন জিনিস যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি (সহিহ বুখারী ৩২৪৪)। এই পুরো যাত্রা সেই দিকেই।
এই ধাপে ৬টি অধ্যায়
১
বারযাখ ও কবর
জুতার আওয়াজ মিলিয়ে যাওয়ার পর
মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত একটা পর্দা আছে, যাকে কুরআন বলেছে বারযাখ। সেখানে গিয়ে কেউ ফিরে আসতে চাইবে নেক আমল করার জন্য, কিন্তু আর সুযোগ থাকবে না।
নবী (ﷺ) বলেছেন, কবরে রেখে সঙ্গীরা ফিরে যায়, মৃত তখনও তাদের জুতার আওয়াজ শোনে। তখন দুজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন। মুমিন সঠিক উত্তর দেয়, আর তাকে জাহান্নামের জায়গার বদলে জান্নাতের জায়গা দেখানো হয়। অন্যজন বলে, আমি জানি না, লোকে যা বলত আমিও তা-ই বলতাম।
সেই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহ মুমিনদের "দৃঢ় বাক্য" দিয়ে অবিচল রাখেন।
বান্দাকে যখন কবরে রাখা হয় আর তার সঙ্গীরা ফিরে যায়, এমনকি সে তাদের জুতার আওয়াজও শুনতে পায়, তখন দুজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন: এই ব্যক্তি, মুহাম্মাদ (ﷺ) সম্পর্কে তুমি কী বলতে? মুমিন বলবে: আমি সাক্ষ্য দিই, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তাকে বলা হবে: জাহান্নামে তোমার জায়গাটা দেখো, আল্লাহ এর বদলে তোমাকে জান্নাতে জায়গা দিয়েছেন। সে দুটোই দেখবে। আর কাফির বা মুনাফিক বলবে: আমি জানি না, লোকে যা বলত আমিও তা-ই বলতাম। তাকে বলা হবে: তুমি নিজেও জানোনি, (জ্ঞানীদের) অনুসরণও করোনি। তারপর লোহার হাতুড়ি দিয়ে তাকে এমন আঘাত করা হবে যে সে চিৎকার করে উঠবে; মানুষ ও জিন ছাড়া আশপাশের সবাই তা শুনতে পাবে।
যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ্ তাদেরকে সুদৃঢ় বাক্যের দ্বারা দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যারা যালিম আল্লাহ্ তাদেরকে বিভ্রান্তিতে রাখবেন। আর আল্লাহ্ যা ইচ্ছে তা করেন।
আপনার জীবনেকবরের প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে দেওয়া যাবে না; সেটা আসবে সারা জীবনের বিশ্বাস আর আমল থেকে। প্রতিটি নামাজের শেষে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চান (সহিহ মুসলিম ৫৮৮)।
২
কিয়ামতের দিন
খালি পায়ে, বস্ত্রহীন, আমল অনুযায়ী ঘামে
নবী (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সবাইকে খালি পায়ে, বস্ত্রহীন অবস্থায় একত্র করা হবে। আয়েশা (রা.) লজ্জায় জিজ্ঞেস করলেন, নারী-পুরুষ একে অপরকে দেখবে? নবীজি বললেন, অবস্থা এত কঠিন হবে যে সেদিকে কারো খেয়ালই থাকবে না।
সূর্য মানুষের খুব কাছে আনা হবে, আর মানুষ যার যার আমল অনুযায়ী ঘামে ডুবে থাকবে: কারো গোড়ালি পর্যন্ত, কারো হাঁটু, কারো কোমর, কারো মুখ পর্যন্ত।
কিয়ামতের দিন সূর্যকে মানুষের এত কাছে আনা হবে যে তা এক মাইলের মতো দূরত্বে থাকবে। মানুষ তাদের আমল অনুযায়ী ঘামে ডুবে থাকবে: কারো ঘাম গোড়ালি পর্যন্ত, কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত, আর কারো ঘাম মুখে লাগাম পরিয়ে দেবে। এই বলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাত দিয়ে নিজের মুখের দিকে ইশারা করলেন।
সহিহ মুসলিম ২৮৬৪সহিহবর্ণনা: মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল
তোমাদের (কিয়ামতের দিন) খালি পায়ে, বস্ত্রহীন ও খতনাবিহীন অবস্থায় একত্র করা হবে। আয়েশা (রা.) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, নারী-পুরুষ একে অপরের দিকে তাকাবে? তিনি বললেন: অবস্থা তখন এত ভয়াবহ হবে যে এসব চিন্তা কারো মাথায়ই আসবে না।
আপনার জীবনেসেদিন ঘাম কতটুকু হবে, তা ঠিক হচ্ছে আজকের আমলে। আজ যে গুনাহটা ছাড়তে কষ্ট হচ্ছে, সেদিনের তুলনায় সেই কষ্ট কিছুই না।
৩
হিসাব ও মীযান
অণু পরিমাণ ভালো কাজও হারাবে না
আল্লাহ কিয়ামতের দিন ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবেন; কারো উপর সামান্য জুলুম হবে না, সরিষার দানা পরিমাণ আমলও আনা হবে। যে অণু পরিমাণ ভালো করবে, সে তা দেখবে; যে অণু পরিমাণ মন্দ করবে, তাও দেখবে।
আর কিয়ামতের দিনে আমরা ন্যায়বিচারের পাল্লাসমূহ স্থাপন করব, সুতরাং কারো প্রতি কোনো যুলুম করা হবে না এবং কাজ যদি শস্য দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও তা আমরা উপস্থিত করব; আর হিসেব গ্রহণকারীরূপে আমরাই যথেষ্ট।
কিয়ামতের দিন যারই হিসাব নেওয়া হবে, সে-ই ধ্বংস হবে। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ কি বলেননি, "যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব সহজভাবে নেওয়া হবে"? তিনি বললেন: সেটা তো শুধু (আমল) সামনে পেশ করা। কিয়ামতের দিন যার হিসাব খুঁটিয়ে নেওয়া হবে, তাকে শাস্তি পেতেই হবে।
আপনার জীবনেপ্রতিদিন অন্তত একশবার "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম" বলুন; হাঁটতে হাঁটতে, গাড়িতে বসে। আর চরিত্র সুন্দর করার চেষ্টা করুন, কারণ পাল্লায় সেটাই সবচেয়ে ভারী।
৪
হাউয ও সুপারিশ
হাউযে কাউসার আর নবীজির সুপারিশ
নবী (ﷺ) বলেছেন, তাঁর হাউযের দৈর্ঘ্য এক মাসের পথ; পানি দুধের চেয়ে সাদা, ঘ্রাণ মিশকের চেয়ে সুগন্ধি; যে একবার পান করবে, আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।
আবু হুরায়রা (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার সুপারিশ পেয়ে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান কে হবে? নবীজি বললেন, যে খাঁটি অন্তরে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলেছে।
কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ পেয়ে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সে, যে খাঁটি অন্তরে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলেছে।
সহিহ বুখারী ৯৯সহিহবর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল
আমার হাউয (এর দৈর্ঘ্য) এক মাসের পথ। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা, ঘ্রাণ মিশকের চেয়ে সুগন্ধি, আর পানপাত্র আকাশের তারার মতো অসংখ্য। যে একবার এখান থেকে পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।
আপনার জীবনেসুপারিশের চাবি তাওহীদ: শিরক থেকে দূরে থাকা আর খাঁটি অন্তরে কালিমা। সুন্নাহ মেনে চলুন, যাতে হাউযের পাশে নবীজি আপনাকে চিনে নেন।
৫
জাহান্নাম
যে আগুন থেকে বাঁচতেই এই পুরো যাত্রা
নবী (ﷺ) বলেছেন, দুনিয়ার আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র।
দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষটিকে জাহান্নামে একবার চুবিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে, কখনো কোনো সুখ দেখেছ? সে বলবে, না, আল্লাহর কসম। আর দুনিয়ার সবচেয়ে কষ্টে থাকা মুমিনকে জান্নাতে একবার চুবিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে, কখনো কষ্ট দেখেছ? সে বলবে, না, আল্লাহর কসম, কখনো না।
কিয়ামতের দিন জাহান্নামিদের মধ্য থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষটিকে আনা হবে। তাকে জাহান্নামে একবার চুবিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদম সন্তান, তুমি কি কখনো কোনো সুখ দেখেছ? কোনো আরাম কি কখনো তোমার কাছ দিয়ে গেছে? সে বলবে: না, আল্লাহর কসম, হে রব। আর জান্নাতিদের মধ্য থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে কষ্টে থাকা মানুষটিকে আনা হবে। তাকে জান্নাতে একবার চুবিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদম সন্তান, তুমি কি কখনো কোনো কষ্ট দেখেছ? কোনো বিপদ কি কখনো তোমার উপর দিয়ে গেছে? সে বলবে: না, আল্লাহর কসম, হে রব; কোনো কষ্ট কখনো আমার উপর দিয়ে যায়নি, কোনো বিপদও আমি কখনো দেখিনি।
সহিহ মুসলিম ২৮০৭সহিহবর্ণনা: আনাস ইবনু মালিক (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল
তোমাদের (দুনিয়ার) আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ। বলা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, (শাস্তির জন্য) এটুকুই তো যথেষ্ট ছিল! তিনি বললেন: জাহান্নামের আগুনকে এর চেয়ে আরও উনসত্তর গুণ বাড়ানো হয়েছে, প্রতিটি ভাগ এর মতোই গরম।
আপনার জীবনেদুনিয়ার কষ্টে মন ভেঙে গেলে এই হাদিসটা মনে করুন: জান্নাতের এক মুহূর্ত সব কষ্ট মুছে দেবে। আর কোনো হারাম সুখের লোভ হলে মনে করুন, জাহান্নামের এক মুহূর্ত সব সুখ ভুলিয়ে দেবে।
৬
জান্নাত
যা কোনো চোখ দেখেনি, আর আল্লাহর দর্শন
আল্লাহ বলেছেন, আমি নেক বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি রেখেছি যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, কোনো মানুষের মনে কল্পনাও আসেনি। কেউ জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
মুত্তাকীদের দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে; দরজা খোলা থাকবে, আর ফেরেশতারা বলবেন, তোমাদের উপর সালাম, তোমরা সুখী হও, চিরকালের জন্য প্রবেশ করো।
আর সবচেয়ে বড় নিয়ামত: সেদিন কিছু মুখ উজ্জ্বল হবে, তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। নবীজি পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, এভাবেই তোমরা তোমাদের রবকে দেখবে; তাই ফজর আর আসরের নামাজ যেন কিছুতেই ছুটে না যায়।
শেষে মৃত্যুকে এনে জবাই করা হবে, আর ঘোষণা আসবে: হে জান্নাতবাসী, চিরস্থায়ী জীবন, আর মৃত্যু নেই।
আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে ছিলাম। তিনি পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন: তোমরা তোমাদের রবকে দেখবে, যেমন এই চাঁদ দেখছ; তাঁকে দেখতে তোমাদের কোনো ভিড় বা কষ্ট হবে না। তাই পারলে সূর্য ওঠার আগের নামাজ (ফজর) আর সূর্য ডোবার আগের নামাজ (আসর) যেন কিছুতেই ছুটে না যায়।
আর যারা তাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে যখন তারা জান্নাতের কাছে আসবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, 'তোমাদের প্রতি সালাম’, তোমরা ভাল ছিলে সুতরাং জান্নাতে প্রবেশ কর স্থায়ীভাবে অবস্থিতির জন্য। '
(কিয়ামতের পর) মৃত্যুকে সাদা-কালো মেশানো একটি ভেড়ার আকৃতিতে আনা হবে। একজন ঘোষক ডাকবেন: হে জান্নাতবাসী! তারা গলা বাড়িয়ে দেখবে। তিনি বলবেন: এটাকে চেনো? তারা বলবে: হ্যাঁ, এটা মৃত্যু; সবাই একে দেখেছে। তারপর ডাকবেন: হে জাহান্নামবাসী! তারাও গলা বাড়িয়ে দেখবে। তিনি বলবেন: এটাকে চেনো? তারা বলবে: হ্যাঁ, এটা মৃত্যু; সবাই একে দেখেছে। তারপর একে জবাই করা হবে, আর বলা হবে: হে জান্নাতবাসী, চিরকাল থাকবে, আর মৃত্যু নেই। হে জাহান্নামবাসী, চিরকাল থাকবে, আর মৃত্যু নেই।
আপনার জীবনেআল্লাহকে দেখার সাথে নবীজি সরাসরি জুড়ে দিয়েছেন ফজর আর আসরকে। এই দুই নামাজ দিয়েই শুরু করুন। জান্নাতের পথ এই বইয়ের প্রথম ধাপ থেকে শুরু হয়েছিল; প্রতিটি সুন্নাহ সেই পথেরই একেকটা কদম।
দোয়া, আমল ও যাচাই
এই ধাপের দোয়া, আমলের চেকলিস্ট, প্রচলিত ভুল আর নিজেকে যাচাই
যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ্ তাদেরকে সুদৃঢ় বাক্যের দ্বারা দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং যারা যালিম আল্লাহ্ তাদেরকে বিভ্রান্তিতে রাখবেন। আর আল্লাহ্ যা ইচ্ছে তা করেন।
জান্নাত নিজের আমলের জোরেই পাওয়া যায়; যত আমল, তত নিশ্চিত।
যা সঠিক: নবীজি বলেছেন, কারো আমল তাকে জান্নাতে নেবে না; আল্লাহর রহমত লাগবে (সহিহ বুখারী ৬৪৬৪)। আমল সেই রহমত পাওয়ার পথ, অহংকারের কারণ নয়।
কুরআনবিরোধী
অমুক পীর বা বুজুর্গকে ধরলে তিনি কিয়ামতে সুপারিশ করে পার করে দেবেন, আমল না থাকলেও।
যা সঠিক: আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ সুপারিশ করতে পারবে না (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৫)। নবীজির সুপারিশ সবচেয়ে বেশি পাবে খাঁটি তাওহীদের মানুষ (সহিহ বুখারী ৯৯)। আর মানুষ নিজে যা চেষ্টা করে, তা-ই তার (সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৯)।
প্রতিটি দাবি যাচাই করা হয়েছে কুরআন, সহিহ হাদিস ও মুহাদ্দিসদের মান অনুযায়ী।
সব হাদিস
আমি জানি জাহান্নাম থেকে সবশেষে কে বের হবে আর জান্নাতে সবশেষে কে ঢুকবে। এক ব্যক্তি হামাগুড়ি দিয়ে জাহান্নাম থেকে বের হবে। আল্লাহ বলবেন: যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। সে গিয়ে মনে করবে জান্নাত ভরে গেছে। ফিরে এসে বলবে: হে রব, তা তো ভরা। আল্লাহ বলবেন: যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। এভাবে আবার হবে। শেষে আল্লাহ বলবেন: যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো; তোমার জন্য রয়েছে পুরো দুনিয়ার সমান এবং তার দশ গুণ। সে বলবে: আপনি তো রাজাধিরাজ, আমার সাথে কি ঠাট্টা করছেন? (বর্ণনাকারী বলেন:) আমি দেখলাম রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমনভাবে হাসলেন যে তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা গেল। বলা হতো, এটাই জান্নাতিদের মধ্যে সবচেয়ে নিচু স্তর।
বান্দাকে যখন কবরে রাখা হয় আর তার সঙ্গীরা ফিরে যায়, এমনকি সে তাদের জুতার আওয়াজও শুনতে পায়, তখন দুজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন: এই ব্যক্তি, মুহাম্মাদ (ﷺ) সম্পর্কে তুমি কী বলতে? মুমিন বলবে: আমি সাক্ষ্য দিই, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তাকে বলা হবে: জাহান্নামে তোমার জায়গাটা দেখো, আল্লাহ এর বদলে তোমাকে জান্নাতে জায়গা দিয়েছেন। সে দুটোই দেখবে। আর কাফির বা মুনাফিক বলবে: আমি জানি না, লোকে যা বলত আমিও তা-ই বলতাম। তাকে বলা হবে: তুমি নিজেও জানোনি, (জ্ঞানীদের) অনুসরণও করোনি। তারপর লোহার হাতুড়ি দিয়ে তাকে এমন আঘাত করা হবে যে সে চিৎকার করে উঠবে; মানুষ ও জিন ছাড়া আশপাশের সবাই তা শুনতে পাবে।
তোমাদের (কিয়ামতের দিন) খালি পায়ে, বস্ত্রহীন ও খতনাবিহীন অবস্থায় একত্র করা হবে। আয়েশা (রা.) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, নারী-পুরুষ একে অপরের দিকে তাকাবে? তিনি বললেন: অবস্থা তখন এত ভয়াবহ হবে যে এসব চিন্তা কারো মাথায়ই আসবে না।
কিয়ামতের দিন সূর্যকে মানুষের এত কাছে আনা হবে যে তা এক মাইলের মতো দূরত্বে থাকবে। মানুষ তাদের আমল অনুযায়ী ঘামে ডুবে থাকবে: কারো ঘাম গোড়ালি পর্যন্ত, কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত, আর কারো ঘাম মুখে লাগাম পরিয়ে দেবে। এই বলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাত দিয়ে নিজের মুখের দিকে ইশারা করলেন।
কিয়ামতের দিন যারই হিসাব নেওয়া হবে, সে-ই ধ্বংস হবে। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ কি বলেননি, "যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব সহজভাবে নেওয়া হবে"? তিনি বললেন: সেটা তো শুধু (আমল) সামনে পেশ করা। কিয়ামতের দিন যার হিসাব খুঁটিয়ে নেওয়া হবে, তাকে শাস্তি পেতেই হবে।
আমার হাউয (এর দৈর্ঘ্য) এক মাসের পথ। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা, ঘ্রাণ মিশকের চেয়ে সুগন্ধি, আর পানপাত্র আকাশের তারার মতো অসংখ্য। যে একবার এখান থেকে পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।
তোমাদের (দুনিয়ার) আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ। বলা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, (শাস্তির জন্য) এটুকুই তো যথেষ্ট ছিল! তিনি বললেন: জাহান্নামের আগুনকে এর চেয়ে আরও উনসত্তর গুণ বাড়ানো হয়েছে, প্রতিটি ভাগ এর মতোই গরম।
কিয়ামতের দিন জাহান্নামিদের মধ্য থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষটিকে আনা হবে। তাকে জাহান্নামে একবার চুবিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদম সন্তান, তুমি কি কখনো কোনো সুখ দেখেছ? কোনো আরাম কি কখনো তোমার কাছ দিয়ে গেছে? সে বলবে: না, আল্লাহর কসম, হে রব। আর জান্নাতিদের মধ্য থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে কষ্টে থাকা মানুষটিকে আনা হবে। তাকে জান্নাতে একবার চুবিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদম সন্তান, তুমি কি কখনো কোনো কষ্ট দেখেছ? কোনো বিপদ কি কখনো তোমার উপর দিয়ে গেছে? সে বলবে: না, আল্লাহর কসম, হে রব; কোনো কষ্ট কখনো আমার উপর দিয়ে যায়নি, কোনো বিপদও আমি কখনো দেখিনি।
আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে ছিলাম। তিনি পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন: তোমরা তোমাদের রবকে দেখবে, যেমন এই চাঁদ দেখছ; তাঁকে দেখতে তোমাদের কোনো ভিড় বা কষ্ট হবে না। তাই পারলে সূর্য ওঠার আগের নামাজ (ফজর) আর সূর্য ডোবার আগের নামাজ (আসর) যেন কিছুতেই ছুটে না যায়।
(কিয়ামতের পর) মৃত্যুকে সাদা-কালো মেশানো একটি ভেড়ার আকৃতিতে আনা হবে। একজন ঘোষক ডাকবেন: হে জান্নাতবাসী! তারা গলা বাড়িয়ে দেখবে। তিনি বলবেন: এটাকে চেনো? তারা বলবে: হ্যাঁ, এটা মৃত্যু; সবাই একে দেখেছে। তারপর ডাকবেন: হে জাহান্নামবাসী! তারাও গলা বাড়িয়ে দেখবে। তিনি বলবেন: এটাকে চেনো? তারা বলবে: হ্যাঁ, এটা মৃত্যু; সবাই একে দেখেছে। তারপর একে জবাই করা হবে, আর বলা হবে: হে জান্নাতবাসী, চিরকাল থাকবে, আর মৃত্যু নেই। হে জাহান্নামবাসী, চিরকাল থাকবে, আর মৃত্যু নেই।