deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ

কর্মজীবন: নবীজির পাঁচ দক্ষতা

ধাপ ৮/১৪কর্মজীবনকর্মজীবন ও সমাজ

নবুওয়াতের আগেই মক্কার মানুষ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে চিনত একজন সৎ ব্যবসায়ী আর বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে। কর্মক্ষেত্রে সফল হতে আজ যে দক্ষতাগুলোর কথা বলা হয়, তার প্রায় সবই তাঁর জীবনে আছে। এই ধাপে পাঁচটি দক্ষতা দেখব: নেতৃত্ব, যোগাযোগ, সততা, আমানত, আর পরামর্শ ও দলগত কাজ।

৫টি অধ্যায়
১৫টি আয়াত
১১টি হাদিস (সহিহ/হাসান)
৩টি দোয়া

এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া; হাদিস শুধু সহিহ ও হাসান। দুর্বল বর্ণনা শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে, মানসহ। আয়াতের অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।

গল্প দিয়ে শুরু

মাদইয়ানের কূপের পাশে: "শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত"

মিসর থেকে পালিয়ে মূসা (আ.) পৌঁছলেন মাদইয়ানে। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, অচেনা দেশে একা। একটা কূপের পাশে দেখলেন, রাখালরা ভিড় করে পশুকে পানি খাওয়াচ্ছে, আর দুটি মেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের পশু আটকে রেখেছে। জিজ্ঞেস করে জানলেন, তাদের বাবা বৃদ্ধ, তাই তারা পুরুষদের ভিড় শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছে।

وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِّنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِن دُونِهِمُ امْرَأَتَيْنِ تَذُودَانِ ۖ قَالَ مَا خَطْبُكُمَا ۖ قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّىٰ يُصْدِرَ الرِّعَاءُ ۖ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ

আর যখন তিনি মাদ্‌য়ানের কূপের কাছে পৌঁছলেন, দেখতে পেলেন, একদল লোক তাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করাচ্ছে এবং তাদের পিছনে দুজন নারী তাদের পশুগুলোকে আগলে রাখছে। মূসা বললেন, ‘তোমাদের কী ব্যাপার?’ তারা বলল, ‘আমরা আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ রাখালেরা তাদের জানোয়ারগুলোকে নিয়ে সরে না যায়। আর আমাদের পিতা খুব বৃদ্ধ।’

মূসা (আ.) কোনো পারিশ্রমিক চাইলেন না, নিজে গিয়ে তাদের পশুকে পানি খাইয়ে দিলেন। তারপর ছায়ায় বসে আল্লাহর কাছে বললেন, হে আমার রব, আপনি আমার জন্য যে কল্যাণই পাঠান, আমি তার মুখাপেক্ষী (সূরা আল-কাসাস ২৮:২৪)।

কিছুক্ষণ পর একটি মেয়ে লাজুকভাবে হেঁটে এসে বলল, আমার বাবা আপনাকে ডেকেছেন, পানি খাওয়ানোর পারিশ্রমিক দিতে। বাড়ি গিয়ে মূসা (আ.) সব খুলে বললেন। তখন মেয়েটি বাবাকে বলল এমন একটি কথা, যা আজও যেকোনো চাকরির সবচেয়ে বড় যোগ্যতা: বাবা, তাকে কাজে রাখুন; আপনি যাদের কাজে রাখবেন, তাদের মধ্যে সেরা সেই, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।

فَجَاءَتْهُ إِحْدَاهُمَا تَمْشِي عَلَى اسْتِحْيَاءٍ قَالَتْ إِنَّ أَبِي يَدْعُوكَ لِيَجْزِيَكَ أَجْرَ مَا سَقَيْتَ لَنَا ۚ فَلَمَّا جَاءَهُ وَقَصَّ عَلَيْهِ الْقَصَصَ قَالَ لَا تَخَفْ ۖ نَجَوْتَ مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

তখন নারী দুজনের একজন শরম-জড়িত পায়ে তার কাছে আসল এবং বলল, ‘আমার পিতা আপনাকে আমন্ত্রণ করছেন, আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করানোর পারিশ্রমিক দেয়ার জন্য।’ অতঃপর মূসা তার কাছে এসে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলে তিনি বললেন, ‘ভয় করো না, তুমি যালিম সম্প্রদায়ের কবল থেকে বেঁচে গেছ।’

قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ ۖ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ

নারীদ্বয়ের একজন বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনি একে মজুর নিযুক্ত করুন, কারণ আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সে ব্যক্তি, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত।’

এই গল্প আমাদের কী শেখায়? কাজের জন্য দুটি গুণ লাগে: সামর্থ্য (কাজটা পারা) আর আমানতদারি (কাজটা সৎভাবে করা)। শুধু দক্ষতা থাকলে মানুষ ঠকায়, শুধু সততা থাকলে কাজ হয় না। মূসা (আ.) কারো নজরে আসার জন্য নয়, আল্লাহর জন্য একটা ভালো কাজ করেছিলেন; আল্লাহ সেখান থেকেই তাঁর চাকরি, ঘর আর পরিবারের ব্যবস্থা করে দিলেন।

এই ধাপে ৫টি অধ্যায়
১
দক্ষতা ১: নেতৃত্ব

সেবক নেতা: যিনি নিজে মাটি বয়েছেন

খন্দকের যুদ্ধের আগে মদিনার চারপাশে পরিখা খোঁড়া হচ্ছিল। প্রচণ্ড শীত, খাবারের অভাব। সাহাবিরা দেখলেন, তাঁদের নেতা কোনো উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন না; নিজে মাটি বহন করছেন, মাটিতে তাঁর পেট ঢেকে গেছে, আর সবার সাথে গলা মিলিয়ে আবৃত্তি করছেন।

তিনি দায়িত্বশীলদের জন্য দুটি দোয়া করেছেন: যে অধীনদের কষ্টে ফেলে, আল্লাহ যেন তাকে কষ্টে ফেলেন; আর যে নম্র হয়, আল্লাহ যেন তার সাথে নম্র হন।

আর প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল: শাসক, পরিবারের কর্তা, কর্মচারী সবাইকে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে (সহিহ বুখারী ৮৯৩)। আল্লাহ বলেছেন, নবীজি কঠোর হলে মানুষ সরে যেত (সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯)।

আমি দেখেছি, আহযাবের (খন্দকের) যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে মাটি বহন করছিলেন; মাটিতে তাঁর পেটের সাদা চামড়া ঢেকে গিয়েছিল। তিনি (সাহাবিদের সাথে) আবৃত্তি করছিলেন: (হে আল্লাহ) আপনি না হলে আমরা হিদায়াত পেতাম না, দান করতাম না, নামাজও পড়তাম না। আমাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করুন, আর শত্রুর মুখোমুখি হলে আমাদের পা দৃঢ় রাখুন।

সহিহ বুখারী ২৮৩৭ সহিহ বর্ণনা: বারা ইবনু আযিব (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

اللَّهُمَّ مَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَشَقَّ عَلَيْهِمْ فَاشْقُقْ عَلَيْهِ وَمَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَرَفَقَ بِهِمْ فَارْفُقْ بِهِ

হে আল্লাহ, যে আমার উম্মতের কোনো বিষয়ের দায়িত্ব পেয়ে তাদের কষ্টে ফেলে, আপনি তাকে কষ্টে ফেলুন; আর যে দায়িত্ব পেয়ে তাদের সাথে নম্র আচরণ করে, আপনি তার সাথে নম্র আচরণ করুন।

সহিহ মুসলিম ১৮২৮সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)
আপনার জীবনেআপনি দলনেতা বা ম্যানেজার হলে কঠিন কাজে নিজে আগে হাত লাগান। টিমের কারো কষ্ট হলে আগে শুনুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন। পদ নয়, মানুষের সেবাই নেতৃত্ব।
২
দক্ষতা ২: যোগাযোগ

স্পষ্ট কথা, নরম আচরণ

নবী (ﷺ) গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনবার বলতেন, যাতে সবাই বোঝে। তাঁর কথা ছিল ধীর আর স্পষ্ট, প্রতিটি শব্দ আলাদা; যে শুনত, সে-ই বুঝত।

একবার এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করে ফেলল। সাহাবিরা রেগে তেড়ে গেলেন। নবীজি তাঁদের থামালেন, পানি ঢেলে জায়গাটা পরিষ্কার করালেন, তারপর লোকটিকে শান্তভাবে বুঝিয়ে দিলেন। ভুল সংশোধনের এর চেয়ে ভালো উদাহরণ পাওয়া কঠিন।

মূসা (আ.) ফেরাউনের কাছে যাওয়ার আগে আল্লাহর কাছে চেয়েছিলেন: আমার বুক খুলে দিন, কাজ সহজ করুন, জিহ্বার জড়তা দূর করুন, যাতে তারা আমার কথা বোঝে।

এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করে ফেলল। লোকেরা তার দিকে তেড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: তাকে মাঝপথে থামিয়ো না। তারপর এক বালতি পানি আনিয়ে সেখানে ঢেলে দিলেন।

সহিহ বুখারী ৬০২৫ সহিহ বর্ণনা: আনাস ইবনু মালিক (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ৬টি দলিল

أَنَّهُ كَانَ إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَعَادَهَا ثَلاَثًا حَتَّى تُفْهَمَ عَنْهُ

নবী (ﷺ) যখন কোনো (গুরুত্বপূর্ণ) কথা বলতেন, তা তিনবার বলতেন, যাতে তা ভালোভাবে বোঝা যায়।

সহিহ বুখারী ৯৫সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

كَانَ كَلاَمُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَلاَمًا فَصْلاً يَفْهَمُهُ كُلُّ مَنْ سَمِعَهُ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কথা ছিল স্পষ্ট, প্রতিটি শব্দ আলাদা; যে-ই শুনত, বুঝতে পারত।

সুনানে আবু দাউদ ৪৮৩৯হাসানবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي

মুসা বললেন, ‘হে আমার রব! আমার বক্ষ সম্প্রসারিত করে দিন।

وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي

‘এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।

وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي

‘আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দিন---

يَفْقَهُوا قَوْلِي

‘যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।

আপনার জীবনেমিটিং বা প্রেজেন্টেশনের আগে মূসা (আ.)-এর দোয়াটা পড়ুন। জরুরি কথা ছোট করে, স্পষ্ট করে বলুন, দরকার হলে আবার বলুন। সহকর্মীর ভুল ধরলে সবার সামনে নয়, আলাদা করে নরমভাবে।
৩
দক্ষতা ৩: সত্যের পথে

"আমরা আপনাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি"

নবুওয়াতের ঘোষণার দিন নবী (ﷺ) সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আমি যদি বলি পাহাড়ের ওপাশে শত্রুবাহিনী আসছে, বিশ্বাস করবে? সবাই এক বাক্যে বলল, হ্যাঁ, আমরা আপনাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি। চল্লিশ বছরের সততাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।

তিনি বলেছেন, সত্য নেক কাজের দিকে নিয়ে যায়, নেক কাজ জান্নাতের দিকে; আর মিথ্যা পাপের দিকে, পাপ জাহান্নামের দিকে।

আল্লাহ মুমিনদের আদেশ দিয়েছেন সঠিক কথা বলতে, আর সত্যবাদীদের সাথে থাকতে।

সত্য মানুষকে নেক কাজের দিকে নিয়ে যায়, আর নেক কাজ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ সত্য বলতে বলতে (আল্লাহর কাছে) "সিদ্দীক" (পরম সত্যবাদী) হয়ে যায়। আর মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যা বলতে বলতে আল্লাহর কাছে "কাযযাব" (চরম মিথ্যাবাদী) হিসেবে লেখা হয়ে যায়।

সহিহ বুখারী ৬০৯৪ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ৩টি দলিল

যখন নাযিল হলো "আর তোমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করো", নবী (ﷺ) সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশের গোত্রগুলোকে নাম ধরে ডাকতে লাগলেন: হে বনু ফিহর, হে বনু আদী! সবাই জড়ো হলো; যে নিজে আসতে পারল না, সে লোক পাঠাল কী হয়েছে দেখতে। আবু লাহাব ও কুরাইশরা এল। তিনি বললেন: আমি যদি বলি, উপত্যকায় একদল অশ্বারোহী তোমাদের উপর হামলা করতে আসছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বলল: হ্যাঁ, আমরা আপনাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি। তিনি বললেন: তাহলে শোনো, আমি তোমাদের সামনে আসা এক কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করছি।

সহিহ বুখারী ৪৭৭০সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا

হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সঠিক কথা বল;

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।

আপনার জীবনেরিপোর্টে সংখ্যা বাড়িয়ে লিখবেন না, দেরিতে আসার মিথ্যা অজুহাত দেবেন না, ভুল হলে নিজে স্বীকার করুন। সততায় সাময়িক ক্ষতি হতে পারে, কিন্তু আস্থা একবার তৈরি হলে সেটাই আপনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
৪
দক্ষতা ৪: আমানত

পদ, সময় আর অফিসের জিনিস সবই আমানত

আবু যর (রা.) একবার নবীজির কাছে একটা দায়িত্ব চাইলেন। নবীজি তাঁর কাঁধে হাত রেখে স্নেহের সাথে বললেন, তুমি দুর্বল, আর পদ একটি আমানত; কিয়ামতের দিন এটা লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ হবে, তবে তার জন্য নয়, যে ন্যায্যভাবে নিয়েছে আর দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করেছে।

আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে। সফল মুমিনদের গুণ হিসেবে বলেছেন, তারা আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে।

উল্টো দিকে, কথায় মিথ্যা, ওয়াদা ভঙ্গ আর আমানতে খেয়ানতকে নবীজি মুনাফিকের চিহ্ন বলেছেন।

মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আর আমানত রাখলে খেয়ানত করে।

সহিহ বুখারী ৩৩ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ৩টি দলিল

আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আমাকে কোনো দায়িত্বে নিয়োগ দেবেন না? তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন: হে আবু যর, তুমি দুর্বল, আর এটা (পদ) একটা আমানত। কিয়ামতের দিন এটা লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ হবে; তবে তার জন্য নয়, যে এটা ন্যায্যভাবে নিয়েছে আর এর দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করেছে।

সহিহ মুসলিম ১৮২৫সহিহবর্ণনাকারী: আবু যর আল-গিফারী (রা.)

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ ۚ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তা কত উৎকৃষ্ট! নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ

আর যারা রক্ষা করে নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি,

আপনার জীবনেঅফিসের সময়ে ব্যক্তিগত কাজ, অফিসের জিনিস বাসায় নেওয়া, ডেডলাইনের ওয়াদা ভাঙা, এগুলো ছোট মনে হলেও আমানতের খেয়ানত। কাজ যত ছোটই হোক, ইহসানের সাথে করুন (সহিহ মুসলিম ১৯৫৫)।
৫
দক্ষতা ৫: পরামর্শ ও দলগত কাজ

হুদাইবিয়ায় উম্মু সালামার একটি পরামর্শ

হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সাহাবিরা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। নবীজি তিনবার বললেন কুরবানি করে মাথা মুণ্ডাতে, কিন্তু কেউ উঠল না। তিনি তাঁবুতে গিয়ে স্ত্রী উম্মু সালামা (রা.)-কে বিষয়টা বললেন। উম্মু সালামা পরামর্শ দিলেন, আপনি কাউকে কিছু না বলে নিজে বাইরে গিয়ে কুরবানি করুন, মাথা মুণ্ডিয়ে নিন। নবীজি তা-ই করলেন, আর তাঁকে দেখে সবাই উঠে একই কাজ করল।

আল্লাহর রাসূল ওহী পেতেন, তবু আল্লাহ তাঁকে আদেশ দিয়েছেন সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতে; আর মুমিনদের পরিচয় দিয়েছেন "তাদের কাজ পরামর্শের ভিত্তিতে"।

দল হিসেবে মুমিনরা একটি দালানের মতো, এক অংশ আরেক অংশকে শক্ত করে ধরে রাখে।

(হুদাইবিয়ার সন্ধি লেখা শেষ হলে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবিদের বললেন: ওঠো, কুরবানি করো, তারপর মাথা মুণ্ডাও। কিন্তু (মন খারাপের কারণে) কেউ উঠল না, যদিও তিনি তিনবার বললেন। কেউ না ওঠায় তিনি উম্মু সালামা (রা.)-এর কাছে গিয়ে মানুষের এই অবস্থার কথা বললেন। উম্মু সালামা বললেন: হে আল্লাহর নবী, আপনি কি এটাই চান? তাহলে বাইরে যান, কাউকে একটা কথাও বলবেন না; নিজের পশু কুরবানি করুন আর নাপিত ডেকে মাথা মুণ্ডিয়ে নিন। তিনি বের হলেন, কারো সাথে কথা না বলে তা-ই করলেন। তাঁকে দেখে সাহাবিরা উঠে কুরবানি করলেন, আর একে অপরের মাথা মুণ্ডাতে লাগলেন।

সহিহ বুখারী ২৭৩১ সহিহ বর্ণনা: মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রা.) ও মারওয়ান
এই অধ্যায়ের আরও ৩টি দলিল

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ۖ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ

আল্লাহ্‌র দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন; যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। কাজেই আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, তারপর আপনি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহ্‌র উপর নির্ভর করবেন; নিশ্চয় আল্লাহ (তার উপর) নির্ভরকারীদের ভালবাসেন।

وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ

আর যারা তাদের রবের ডাকে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে এবং তাদের কার্যাবলী পরস্পর পরামর্শের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। আর তাদেরকে আমরা যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।

إِنَّ الْمُؤْمِنَ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ، يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا ‏"‏‏.‏ وَشَبَّكَ أَصَابِعَهُ‏

এক মুমিন আরেক মুমিনের জন্য দালানের মতো, যার এক অংশ আরেক অংশকে শক্ত করে ধরে রাখে। এই বলে তিনি এক হাতের আঙুল আরেক হাতের আঙুলের ফাঁকে ঢুকিয়ে দেখালেন।

সহিহ বুখারী ৪৮১সহিহবর্ণনাকারী: আবু মূসা আল-আশআরী (রা.)
আপনার জীবনেসিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে টিমের মত নিন, জুনিয়র বা নারী সহকর্মীর পরামর্শকেও গুরুত্ব দিন; সেরা সমাধান কোথা থেকে আসবে, আগে বোঝা যায় না। আর সহকর্মীর সাফল্যে খুশি হন, প্রতিযোগিতা হোক কাজের মানে, পা টেনে ধরায় নয়।

দোয়া, আমল ও যাচাই

এই ধাপের দোয়া, আমলের চেকলিস্ট, প্রচলিত ভুল আর নিজেকে যাচাই

দোয়া

কাজ সহজ ও কথা স্পষ্ট হওয়ার দোয়া (মূসা আ.)

قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي ﴿٢٥﴾ وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي ﴿٢٦﴾ وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي ﴿٢٧﴾ يَفْقَهُوا قَوْلِي ﴿٢٨﴾

মুসা বললেন, ‘হে আমার রব! আমার বক্ষ সম্প্রসারিত করে দিন। ‘এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। ‘আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দিন--- ‘যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।

সূরা ত্বা-হা ২০:২৫-২৮
কল্যাণের মুখাপেক্ষিতা (মূসা আ.)

فَسَقَىٰ لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّىٰ إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ ﴿٢٤﴾

মুসা তখন তাদের পক্ষে জানোয়ারগুলোকে পানি পান করালেন। তারপর তিনি ছায়ার নীচে আশ্রয় গ্রহন করে বললেন, ‘হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন আমি তার কাঙ্গাল।’

সূরা আল-কাসাস ২৮:২৪
জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া

فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ ۗ وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِن قَبْلِ أَن يُقْضَىٰ إِلَيْكَ وَحْيُهُ ۖ وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا ﴿١١٤﴾

সুতরাং প্রকৃত মালিক আল্লাহ্ অতি মহান সর্বোচ্চ সত্ত্বা। আর আপনার প্রতি আল্লাহর ওহী সম্পূর্ণ হওয়ার আগে আপনি কুরআন পাঠে তাড়াহুড়া করবেন না এবং বলুন, ‘হে আমার রব! আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ করুন।

সূরা ত্বা-হা ২০:১১৪

কুরআনের দোয়ার অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে; হাদিসের দোয়ার সাথে মূল গ্রন্থের নম্বর ও মান দেওয়া আছে।

সুন্নাহর আলোয় জীবন: সব ধাপ

deenpedia.com · https://deenpedia.com/jibon/kormojibon/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার