deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ

নবজাতক: জন্মের পর প্রথম সাত দিনের সুন্নাহ

ধাপ ২/১৪জন্ম থেকে সপ্তম দিনজন্মের আগে ও শৈশব

একটি শিশু পৃথিবীতে আসে নিষ্পাপ, ফিতরাতের উপর। প্রথম সাত দিনে নবী (ﷺ) কয়েকটি সহজ কাজ শিখিয়েছেন: মিষ্টি মুখ, বরকতের দোয়া, সুন্দর নাম, আকীকা আর পরিচ্ছন্নতা। এগুলো আনন্দের কাজ, বোঝা নয়।

৪টি অধ্যায়
২টি আয়াত
১০টি সহিহ হাদিস
৩টি দোয়া

এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া; হাদিস শুধু সহিহ ও হাসান। দুর্বল বর্ণনা শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে, মানসহ। আয়াতের অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।

গল্প দিয়ে শুরু

আবু মূসার ছেলে: নবীজির কোলে প্রথম দিন

সাহাবি আবু মূসা আল-আশআরী (রা.)-এর ঘরে প্রথম ছেলে জন্ম নিল। খুশির খবর নিয়ে তিনি সোজা গেলেন নবী (ﷺ)-এর কাছে, কোলে নবজাতক।

নবীজি শিশুটিকে কোলে নিলেন। একটা খেজুর নিজে চিবিয়ে নরম করে শিশুর মুখে লাগিয়ে দিলেন। একে বলে তাহনীক। তারপর শিশুর নাম রাখলেন ইবরাহীম, তাঁর প্রিয় পূর্বপুরুষ নবীর নামে। শেষে শিশুর জন্য বরকতের দোয়া করে বাবার কোলে ফিরিয়ে দিলেন।

وُلِدَ لِي غُلاَمٌ، فَأَتَيْتُ بِهِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَسَمَّاهُ إِبْرَاهِيمَ، فَحَنَّكَهُ بِتَمْرَةٍ، وَدَعَا لَهُ بِالْبَرَكَةِ وَدَفَعَهُ إِلَىَّ

আমার একটি ছেলে হলো। আমি তাকে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইবরাহীম, একটি খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দিলেন (তাহনীক), তার জন্য বরকতের দোয়া করলেন, তারপর তাকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিলেন।

সহিহ বুখারী ৫৪৬৭সহিহবর্ণনাকারী: আবু মূসা আল-আশআরী (রা.)

পুরো ঘটনায় কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। আছে মিষ্টি মুখ, সুন্দর নাম, আর দোয়া। নবজাতককে স্বাগত জানানোর সুন্নাহ এতটাই সহজ আর সুন্দর।

এই ধাপে ৪টি অধ্যায়
১
জন্মের দিন

তাহনীক ও বরকতের দোয়া

নবজাতককে কোনো নেককার মানুষের কাছে নিয়ে গিয়ে খেজুর চিবিয়ে মুখে দেওয়া (তাহনীক) আর বরকতের দোয়া করানো সাহাবিদের আমল ছিল, যেমন উপরের ঘটনায় দেখলেন।

মনে রাখবেন, প্রতিটি শিশু ফিতরাতের উপর জন্ম নেয়। মা-বাবাই তাকে পরে অন্য পথে নিয়ে যায়। তাই এই প্রথম দিন থেকেই আমাদের দায়িত্ব শুরু।

প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের (আল্লাহকে চেনার স্বাভাবিক প্রবণতা) উপর জন্ম নেয়। তারপর তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজারী বানায়।

সহিহ বুখারী ১৩৮৫ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)
আপনার জীবনেসন্তানকে প্রথম যে স্বাদ দেবেন, তা হোক খেজুরের মিষ্টি; প্রথম যে কথা শোনাবেন, তা হোক দোয়া। পরিবারের প্রবীণ নেককার কাউকে দিয়ে বরকতের দোয়া করাতে পারেন।
২
নাম রাখা

সুন্দর অর্থের নাম: সন্তানের প্রথম উপহার

নাম শুধু ডাকার জন্য নয়, এটা সন্তানের পরিচয়। নবী (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।

খারাপ অর্থের নাম তিনি বদলে দিতেন। উমার (রা.)-এর মেয়ের নাম ছিল "আসিয়া" (অবাধ্য), নবীজি তা বদলে "জামীলা" (সুন্দর) রাখলেন।

নাম রাখা যায় জন্মের দিনই (যেমন আবু মূসার ছেলের নাম সেদিনই রাখা হয়েছিল), আবার সপ্তম দিনেও (সুনানে আবু দাউদ ২৮৩৮)। দুটোই সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত।

আল্লাহর কাছে তোমাদের নামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় নাম আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।

সহিহ মুসলিম ২১৩২ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল

أَنَّ ابْنَةً لِعُمَرَ، كَانَتْ يُقَالُ لَهَا عَاصِيَةُ فَسَمَّاهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم جَمِيلَةَ

উমার (রা.)-এর এক মেয়েকে "আসিয়া" (অবাধ্য) নামে ডাকা হতো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার নাম রাখলেন "জামীলা" (সুন্দর)।

সহিহ মুসলিম ২১৩৯সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)
আপনার জীবনেনাম রাখার আগে অর্থটা জেনে নিন। "আব্দ" (বান্দা) যুক্ত নাম, নবী ও সাহাবিদের নাম, বা সুন্দর অর্থের যেকোনো নাম রাখুন। অর্থহীন বা খারাপ অর্থের নাম থাকলে বড় বয়সেও বদলানো যায়।
৩
সপ্তম দিন

আকীকা, চুল কাটা: সন্তানের জন্য শুকরিয়া

আকীকা হলো সন্তান জন্মের শুকরিয়া হিসেবে পশু জবাই করা। নবী (ﷺ) বলেছেন, সন্তানের সাথে আকীকা আছে।

সময় সপ্তম দিন। সেদিন জবাই, মাথা মুণ্ডানো আর নাম রাখার কথা এসেছে।

পরিমাণ: ছেলের জন্য সমান মানের দুটি ছাগল, মেয়ের জন্য একটি। সামর্থ্য না থাকলে ছেলের জন্যও একটি দিলে চলে বলে অনেক আলেম বলেছেন; আর সামর্থ্য না থাকলে আকীকা না করায় গুনাহ নেই, কারণ আল্লাহ সাধ্যের বাইরে চাপ দেন না (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬)।

প্রত্যেক শিশু তার আকীকার সাথে বাঁধা। জন্মের সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে জবাই করা হবে, তার মাথা মুণ্ডানো হবে এবং নাম রাখা হবে।

সুনানে আবু দাউদ ২৮৩৮ সহিহ বর্ণনা: সামুরা ইবনু জুনদুব (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ২টি দলিল

مَعَ الْغُلاَمِ عَقِيقَةٌ، فَأَهْرِيقُوا عَنْهُ دَمًا وَأَمِيطُوا عَنْهُ الأَذَى

সন্তানের সাথে আকীকা আছে। তাই তার পক্ষ থেকে (পশু জবাই করে) রক্ত প্রবাহিত করো, আর তার থেকে কষ্টদায়ক জিনিস (জন্মের চুল) সরিয়ে দাও।

সহিহ বুখারী ৫৪৭২সহিহবর্ণনাকারী: সালমান ইবনু আমির আদ-দাব্বী (রা.)

عَنِ الْغُلاَمِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ

ছেলের পক্ষ থেকে সমান মানের দুটি ছাগল, আর মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল।

সুনানে আবু দাউদ ২৮৩৪সহিহবর্ণনাকারী: উম্মু কুরয আল-কা'বিয়্যাহ (রা.)
আপনার জীবনেআকীকার গোশত নিজেরা খেতে পারেন, আত্মীয়-প্রতিবেশীদের দিতে পারেন, গরিবদেরও দিন। দেনা করে বা লোক দেখানো বড় অনুষ্ঠান করে আকীকা করার দরকার নেই।
৪
পরিচ্ছন্নতা ও সুরক্ষা

খতনা, নিফাস আর বদনজর থেকে সুরক্ষার দোয়া

ছেলে শিশুর খতনা ফিতরাতের (মানুষের স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতার) অংশ। কোন বয়সে করতে হবে, তা হাদিসে নির্দিষ্ট নেই; চিকিৎসকের পরামর্শে ছোট বয়সে করা সহজ।

মায়ের জন্য: প্রসবের পর যতদিন নিফাসের রক্ত থাকে, ততদিন নামাজ-রোজা থেকে বিরত থাকবেন। নবীজির যুগে নারীরা সাধারণত চল্লিশ দিন অপেক্ষা করতেন; আগে রক্ত বন্ধ হলে গোসল করে নামাজ শুরু করবেন।

বদনজর ও ক্ষতি থেকে শিশুর সুরক্ষার জন্য কালো টিপ বা সুতা নয়, নবীজির শেখানো দোয়া পড়ুন। তিনি হাসান-হুসাইনের জন্য এভাবে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন।

নবী (ﷺ) হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন আর বলতেন: তোমাদের পিতা (ইবরাহীম আ.) এই কথাগুলো দিয়ে ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্য আশ্রয় চাইতেন: "আঊযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ, মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ" (আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর আশ্রয় চাই প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণী থেকে, আর প্রত্যেক ক্ষতিকর বদনজর থেকে)।

সহিহ বুখারী ৩৩৭১ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)
এই অধ্যায়ের আরও ২টি দলিল

الْفِطْرَةُ خَمْسٌ ـ أَوْ خَمْسٌ مِنَ الْفِطْرَةِ ـ الْخِتَانُ، وَالاِسْتِحْدَادُ، وَنَتْفُ الإِبْطِ، وَتَقْلِيمُ الأَظْفَارِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ

ফিতরাত (মানুষের স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা) পাঁচটি: খতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, বগলের লোম তুলে ফেলা, নখ কাটা আর গোঁফ ছোট করা।

সহিহ বুখারী ৫৮৮৯সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

كَانَتِ النُّفَسَاءُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم تَقْعُدُ بَعْدَ نِفَاسِهَا أَرْبَعِينَ يَوْمًا أَوْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে সন্তান জন্মের পর নারীরা (নিফাসের রক্তের কারণে, নামাজ-রোজা থেকে) চল্লিশ দিন বা চল্লিশ রাত বিরত থাকতেন।

সুনানে আবু দাউদ ৩১১সহিহবর্ণনাকারী: উম্মু সালামা (রা.)
আপনার জীবনেদোয়াটা মুখস্থ করে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় সন্তানের মাথায় হাত রেখে পড়ুন: "উঈযুকা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ..." (দুই সন্তান হলে "উঈযুকুমা")।

দোয়া, আমল ও যাচাই

এই ধাপের দোয়া, আমলের চেকলিস্ট, প্রচলিত ভুল আর নিজেকে যাচাই

দোয়া

শিশুর সুরক্ষার দোয়া

يُعَوِّذُ الْحَسَنَ وَالْحُسَيْنَ وَيَقُولُ ‏ "‏ إِنَّ أَبَاكُمَا كَانَ يُعَوِّذُ بِهَا إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ، أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ

নবী (ﷺ) হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন আর বলতেন: তোমাদের পিতা (ইবরাহীম আ.) এই কথাগুলো দিয়ে ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্য আশ্রয় চাইতেন: "আঊযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ, মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ" (আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর আশ্রয় চাই প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণী থেকে, আর প্রত্যেক ক্ষতিকর বদনজর থেকে)।

সহিহ বুখারী ৩৩৭১ সহিহ

সন্তান ও পরিবারকে নামাজি বানানোর দোয়া

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ ﴿٤٠﴾

‘হে আমার রব! আমাকে সালাত কয়েমকারী করুন এবং আমার বংশধরদের মধ্য হতেও। হে আমাদের রব! আর আমার দো’আ কবূল করুন।

সূরা ইবরাহীম ১৪:৪০
চোখ জুড়ানো পরিবার

وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا ﴿٧٤﴾

এবং যারা প্রার্থনা করে বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যারা হবে আমাদের জন্য চোখজুড়ানো। আর আপনি আমাদেরকে করুন মুত্তাকীদের জন্য অনুসরণযোগ্য।

সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৪

কুরআনের দোয়ার অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে; হাদিসের দোয়ার সাথে মূল গ্রন্থের নম্বর ও মান দেওয়া আছে।

সুন্নাহর আলোয় জীবন: সব ধাপ

deenpedia.com · https://deenpedia.com/jibon/jonmo/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার