إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ
তাকদীর
তাকদীর মানে কী, এর চারটি স্তর, মায়ের গর্ভে কী লেখা হয়, সবই লেখা থাকলে আমল কেন, চেষ্টা ও তাওয়াক্কুল, আর বিপদে তাকদীরের প্রশান্তি: কুরআন ও সহিহ হাদিসের দলিলে, সহজ বাংলায়।
তাকদীর ঈমানের ছয় রুকনের শেষটি, আর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ওঠে এটা নিয়েই। এই পাতায় শুধু ততটুকু, যতটুকু কুরআন ও সহিহ হাদিস স্পষ্ট বলেছে; প্রতিটি কথার পাশে সূত্র ও মান দেওয়া আছে। উদ্দেশ্য তর্ক নয়, মনের শান্তি আর আমলে উৎসাহ।
তাকদীর মানে কী
ঈমানের ষষ্ঠ রুকন
তাকদীর (আরবিতে কদর) মানে আল্লাহর নির্ধারণ: ছোট-বড়, ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটে, সবই আল্লাহ আগে থেকে জানেন, লিখে রেখেছেন, তিনি চেয়েছেন বলেই ঘটে, আর তিনিই তা সৃষ্টি করেন। এতে ঈমান না আনলে ঈমান পূর্ণ হয় না। তবে এর মানে এই নয় যে মানুষ যন্ত্রের মতো: আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা ও বেছে নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন, আর সেই বেছে নেওয়ার জন্যই হিসাব হবে।
- আল্লাহ প্রতিটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন নির্ধারিত পরিমাণে।সূরা আল-কামার ৫৪:৪৯
- তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তারপর প্রত্যেকটির জন্য যথাযথ পরিমাপ ঠিক করে দিয়েছেন।সূরা আল-ফুরকান ২৫:২
- জিবরীল (আ.) ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে নবীজি (ﷺ) ছয় রুকনের শেষে বললেন: আর তাকদীরের ভালো-মন্দে ঈমান আনা।সহিহ মুসলিম ৮সহিহ
- কোনো বান্দা মুমিন হয় না, যতক্ষণ না সে জানে, যা তার কাছে পৌঁছেছে তা তাকে এড়িয়ে যেত না, আর যা এড়িয়ে গেছে তা পৌঁছাত না।জামে আত-তিরমিযী ২১৪৪সহিহ
তিরমিযী ২১৪৪-এর সনদকে ইমাম তিরমিযী নিজে গরিব বলেছেন (এক বর্ণনাকারী দুর্বল); একই অর্থ অন্য সনদে আসায় শাইখ আলবানী একে সহিহ বলেছেন, আর একই কথা আবু দাউদ ৪৭০০-এ উবাদা ইবনুস সামিত (রা.)-এর বর্ণনায়ও আছে।
পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ২টি আয়াত
إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ
নিশ্চয় আমরা প্রত্যেক কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে,
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا
যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌমত্বে তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ অনুপাতে।
(সাদা কাপড় পরা এক অচেনা ব্যক্তি এসে বললেন:) হে মুহাম্মাদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: ইসলাম হলো, তুমি সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, নামাজ কায়েম করবে, যাকাত দেবে, রমজানের রোজা রাখবে, আর সামর্থ্য থাকলে বাইতুল্লাহর হজ করবে। তিনি বললেন: আপনি সত্য বলেছেন। ... তিনি বললেন: আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। নবীজি বললেন: তুমি ঈমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবগুলোর প্রতি, তাঁর রাসূলদের প্রতি, শেষ দিনের প্রতি, আর তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি। তিনি বললেন: আপনি সত্য বলেছেন। তিনি বললেন: আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। নবীজি বললেন: তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তাঁকে দেখছ; আর যদি তাঁকে না দেখো, তিনি তো তোমাকে দেখছেন। ... (পরে নবীজি বললেন:) তিনি ছিলেন জিবরীল, তোমাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন।
لاَ يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى يُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ حَتَّى يَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَهُ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَهُ وَأَنَّ مَا أَخْطَأَهُ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَهُ
কোনো বান্দা মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ না সে তাকদীরের ভালো ও মন্দে ঈমান আনে; যতক্ষণ না সে জানে, যা তার কাছে পৌঁছেছে তা কখনো তাকে পাশ কাটিয়ে যেত না, আর যা তাকে পাশ কাটিয়ে গেছে তা কখনো তার কাছে পৌঁছাত না।
তাকদীরের চারটি স্তর
জানা, লেখা, চাওয়া ও সৃষ্টি করা
আলেমরা কুরআন-সুন্নাহ থেকে তাকদীরকে চারটি স্তরে বুঝিয়েছেন (ইবনুল কাইয়্যিম, শিফাউল আলীল)। চারটিতেই ঈমান আনতে হয়; কোনো একটি অস্বীকার করলে তাকদীরে ঈমান পূর্ণ হয় না।
- ১. ইলম (জানা): আল্লাহ সবকিছু আগে থেকেই জানেন; গায়েবের চাবি তাঁরই কাছে, গাছের একটি পাতা ঝরলেও তিনি জানেন।সূরা আল-আনআম ৬:৫৯
- ২. কিতাবাহ (লেখা): আসমান-জমিনে যা আছে তিনি জানেন, আর সব একটি কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) লেখা আছে।সূরা আল-হাজ্জ ২২:৭০
- আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সৃষ্টিজগতের তাকদীর লিখেছেন।সহিহ মুসলিম ২৬৫৩সহিহ
- আল্লাহ সবার আগে কলম সৃষ্টি করেছেন; পুরো হাদিসে আছে, তিনি কলমকে বললেন: কিয়ামত পর্যন্ত সবকিছুর তাকদীর লেখো।সুনানে আবু দাউদ ৪৭০০সহিহ
- ৩. মাশিয়্যাহ (চাওয়া): আল্লাহ যা চান তা-ই হয়, যা চান না তা হয় না; তোমরা কিছু চাইতে পারো না, যদি না আল্লাহ চান।সূরা আত-তাকভীর ৮১:২৯
- ৪. খালক (সৃষ্টি): আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, আর তোমরা যা করো তা-ও।সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৯৬
"চাওয়া" আর "পছন্দ করা" এক নয়
- আল্লাহর চাওয়ায় দুনিয়াতে খারাপ কাজও ঘটে, কারণ তিনি মানুষকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি কুফর ও গুনাহ পছন্দ করেন না, আর বান্দার শুকরিয়া পছন্দ করেন (সূরা আয-যুমার ৩৯:৭)।
- তাই "আল্লাহ চেয়েছেন বলেই ঘটেছে" কথাটা সত্য, কিন্তু "আল্লাহ এটা পছন্দ করেন" বলা যায় শুধু সেই কাজের ব্যাপারে, যার আদেশ তিনি দিয়েছেন।
পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ৪টি আয়াত
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ۚ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ۚ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ
আর গায়েবের চাবি তাঁরই কাছে রয়েছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারসমূহে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত রয়েছেন, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।
أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ۗ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَابٍ ۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
আপনি কি জানেন না যে, আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা জানেন। এসবই তো আছে এক কিতাবে; নিশ্চয় তা আল্লাহ্র নিকট অতি সহজ।
كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلاَئِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ - قَالَ - وَعَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ
আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সৃষ্টিজগতের তাকদীর লিখে রেখেছেন। (তিনি বললেন:) আর তখন তাঁর আরশ ছিল পানির উপর।
إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ
আল্লাহ সবার আগে যা সৃষ্টি করেছেন, তা হলো কলম।
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
আর তোমরা ইচ্ছে করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন।
وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ
অথচ আল্লাহ্ই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর তাও।'
মায়ের গর্ভেই লেখা হয়
রিযিক, আয়ু, আমল আর শেষ পরিণতি
লাওহে মাহফুজের সাধারণ লেখার বাইরে প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা লেখা হয় মায়ের গর্ভে। এ কথা জানলে দুশ্চিন্তা কমে: যা আমার জন্য লেখা, তা কেউ ঠেকাতে পারবে না; যা লেখা নেই, তা দৌড়ে ধরা যাবে না।
- মায়ের পেটে কয়েক ধাপ পেরোনোর পর ফেরেশতা পাঠানো হয়, তিনি চারটি কথা লেখেন: তার রিযিক, আয়ু, আমল আর সে সৌভাগ্যবান না হতভাগা।সহিহ বুখারী ৩২০৮সহিহ
- পৃথিবীতে বা তোমাদের নিজেদের উপর যে বিপদই আসে, তা ঘটানোর আগেই একটি কিতাবে লেখা আছে।সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২২
- এটা জানানো হয়েছে যাতে যা হারিয়েছ তাতে ভেঙে না পড়ো, আর যা পেয়েছ তাতে অহংকার না করো।সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৩
পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ২টি আয়াত
তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান মায়ের পেটে চল্লিশ দিন একত্র করা হয়। তারপর একই সময় ধরে তা জমাট রক্ত থাকে, তারপর একই সময় ধরে মাংসপিণ্ড। তারপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠান। তাকে চারটি বিষয় লেখার আদেশ দেওয়া হয়: তার আমল, তার রিযিক, তার আয়ু, আর সে দুর্ভাগা হবে না সৌভাগ্যবান। তারপর তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়।
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَا ۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
যমীনে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয়ই আসে তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আমরা তা কিতাবে লিপিবদ্ধ রেখেছি। নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষে এটা খুব সহজ।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
لِّكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَىٰ مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ ۗ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
এটা এ জন্যে যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য আনন্দিত না হও। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না কোনো উদ্ধত - অহংকারীদেরকে---
সবই যদি লেখা, তাহলে আমল কেন?
সাহাবিরাও ঠিক এই প্রশ্ন করেছিলেন
তাকদীর শুনে মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। সাহাবিরা নবীজিকে (ﷺ) সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর তিনি পরিষ্কার উত্তর দিয়েছেন: আমল করো। আমাদের তাকদীর কী লেখা আছে, তা আমরা জানি না; আমরা জানি আল্লাহ কী আদেশ করেছেন। দায়িত্ব সেই আদেশ মানা, আর ভালো আমলের সুযোগ পাওয়াই ভালো তাকদীরের চিহ্ন।
- প্রত্যেকের জান্নাত ও জাহান্নামের ঠিকানা লেখা আছে শুনে সাহাবিরা বললেন, তাহলে কি আমল ছেড়ে দেব? নবীজি (ﷺ) বললেন: আমল করো, যাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তা তার জন্য সহজ করা হয়।সহিহ বুখারী ৪৯৪৯সহিহ
- যে দান করে, তাকওয়া অবলম্বন করে আর উত্তম কথাকে সত্য মানে, আল্লাহ তার জন্য সহজ পথ সহজ করে দেন।সূরা আল-লাইল ৯২:৫ · সূরা আল-লাইল ৯২:৬ · সূরা আল-লাইল ৯২:৭
- আল্লাহ মানুষকে পথ দেখিয়েছেন; এখন সে কৃতজ্ঞ হবে, না অকৃতজ্ঞ, সেটা তার বেছে নেওয়া।সূরা আল-ইনসান ৭৬:৩
- আল্লাহ কারো উপর সাধ্যের বেশি বোঝা চাপান না; প্রত্যেকে যা অর্জন করে, তার ফল সে-ই পায়।সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬
- তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায় তার জন্য (এ কুরআন উপদেশ); আর তোমরা চাইতে পারো না, যদি না আল্লাহ চান।সূরা আত-তাকভীর ৮১:২৮ · সূরা আত-তাকভীর ৮১:২৯
পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ৪টি আয়াত
(এক জানাজায় নবীজি (ﷺ) একটি কাঠি দিয়ে মাটিতে দাগ কাটছিলেন। তিনি বললেন:) তোমাদের প্রত্যেকের জাহান্নামের ঠিকানা আর জান্নাতের ঠিকানা লেখা হয়ে গেছে। সাহাবিরা বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, তাহলে আমরা কি আমাদের লেখার উপর ভরসা করে আমল ছেড়ে দেব না? তিনি বললেন: আমল করো, যাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেটা সহজ করে দেওয়া হয়। যে সৌভাগ্যবানদের একজন, তার জন্য সৌভাগ্যবানদের আমল সহজ করা হয়; আর যে হতভাগাদের একজন, তার জন্য হতভাগাদের আমল সহজ করা হয়। তারপর তিনি পড়লেন: "অতএব যে দান করে, তাকওয়া অবলম্বন করে, আর উত্তম কথাকে সত্য বলে মানে…"
فَأَمَّا مَنْ أَعْطَىٰ وَاتَّقَىٰ
কাজেই কেউ দান করলে, তাকওয়া অবলম্বন করলে
وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَىٰ
এবং যা উত্তম তা সত্য বলে গ্ৰহণ করলে,
فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَىٰ
আমরা তার জন্য সুগম করে দেব সহজ পথ।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا
নিশ্চয় আমরা তাকে পথ নির্দেশ দিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
- আজ একটি ভালো কাজ করে আল্লাহর কাছে চাওয়া, তিনি যেন এ পথ সহজ করে দেন (সূরা আল-লাইল ৯২:৭)
চেষ্টা আর ভরসা একসাথে
উট বাঁধো, তারপর তাওয়াক্কুল করো
তাকদীরে বিশ্বাস মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। উপায় অবলম্বন করাও আল্লাহর নির্ধারণের অংশ: ওষুধ খাওয়া, চাকরি খোঁজা, পড়াশোনা করা। মুমিন চেষ্টা করে পুরোটা, আর ফলের জন্য ভরসা রাখে আল্লাহর উপর; ফল যা-ই হোক, মেনে নেয়।
- শক্তিশালী মুমিন উত্তম; যা উপকারে আসে তার জন্য চেষ্টা করো, আল্লাহর সাহায্য চাও, হাল ছেড়ো না। বিপদ এলে "যদি" বলো না, বলো: আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন, তিনি যা চেয়েছেন করেছেন।সহিহ মুসলিম ২৬৬৪সহিহ
- এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, উট বেঁধে ভরসা করব, না ছেড়ে দিয়ে? নবীজি (ﷺ) বললেন: বেঁধে রাখো, তারপর ভরসা করো।জামে আত-তিরমিযী ২৫১৭হাসান
- যথাযথ ভরসা করলে আল্লাহ রিযিক দেন পাখির মতো: সকালে খালি পেটে বের হয়, সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফেরে। লক্ষ করুন, পাখিও বাসায় বসে থাকে না, বের হয়।জামে আত-তিরমিযী ২৩৪৪সহিহ
- যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট; আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটি পরিমাণ ঠিক করে রেখেছেন।সূরা আত-তালাক ৬৫:৩
তিরমিযী ২৫১৭-এর এই সনদ নিয়ে ইয়াহইয়া আল-কাত্তান আপত্তি করেছেন; অন্য সনদ মিলিয়ে শাইখ আলবানী একে হাসান বলেছেন। অর্থের দিক থেকে কথাটা উপরের সহিহ মুসলিমের হাদিসের সাথে পুরো মেলে।
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত
শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়, তবে প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ আছে। যা তোমার উপকারে আসে, তার জন্য আগ্রহ নিয়ে চেষ্টা করো, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও, আর হাল ছেড়ে দিয়ো না। কোনো বিপদ এলে বলো না: "যদি আমি এমন করতাম, তাহলে এমন হতো।" বরং বলো: "আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন, আর তিনি যা চেয়েছেন করেছেন।" কারণ "যদি" শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়।
قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْقِلُهَا وَأَتَوَكَّلُ أَوْ أُطْلِقُهَا وَأَتَوَكَّلُ قَالَ " اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ
এক ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমি কি উটটা বেঁধে রেখে (আল্লাহর উপর) ভরসা করব, নাকি ছেড়ে দিয়ে ভরসা করব? তিনি বললেন: বেঁধে রাখো, তারপর ভরসা করো।
لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا تُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا
তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের রিযিক দিতেন যেমন পাখিকে দেন: সকালে খালি পেটে বের হয়, আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফেরে।
وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ۚ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ۚ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا
এবং তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন রিযিক। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তার জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছে পূরণ করবেনই; অবশ্যই আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন সুনির্দিষ্ট মাত্ৰা।
- বড় সিদ্ধান্তের আগে ইস্তিখারা করা (সহিহ বুখারী ৬৩৮২)
বিপদে তাকদীর: মনের প্রশান্তি
যা হারিয়েছেন, তা আপনার ছিল না
তাকদীরে ঈমানের সবচেয়ে বড় ফল দেখা যায় বিপদের সময়। মুমিন জানে, এটা আল্লাহর জানা ও লেখা ছিল, এর পেছনে হিকমত আছে, আর ধৈর্যের প্রতিদান আছে। তাই সে কাঁদে, কষ্ট পায়, কিন্তু আল্লাহর উপর অভিযোগ করে না, আর ভেঙেও পড়ে না।
- আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না; যে আল্লাহর উপর ঈমান রাখে, আল্লাহ তার অন্তরকে পথ দেখান।সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১১
- বলুন: আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া আর কিছুই আমাদের কাছে পৌঁছাবে না।সূরা আত-তাওবা ৯:৫১
- পুরো উম্মত মিলে তোমার উপকার বা ক্ষতি করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখেছেন তার বাইরে পারবে না; কলম তুলে নেওয়া হয়েছে, কালি শুকিয়ে গেছে।জামে আত-তিরমিযী ২৫১৬সহিহ
- মুমিনের সব অবস্থাই কল্যাণ: সুখে শুকরিয়া, কষ্টে সবর, দুটোই তার জন্য ভালো।সহিহ মুসলিম ২৯৯৯সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ২টি আয়াত
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ ۚ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আপতিত হয় না এবং কেউ আল্লাহর উপর ঈমান রাখলে তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন। আর আল্লাহ্ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।
قُل لَّن يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلَانَا ۚ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
বলুন, ‘আমাদের জন্য আল্লাহ্ যা লিখেছেন তা ছাড়া আমাদের অন্য কিছু ঘটবে না; তিনি আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহ্র উপরই মুমিনদের নির্ভর করা উচিত।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
একদিন আমি (কিশোর বয়সে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পেছনে (একই বাহনে) ছিলাম। তিনি বললেন: হে বালক, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাচ্ছি। আল্লাহর (বিধানের) হেফাজত করো, তিনি তোমার হেফাজত করবেন। আল্লাহর হেফাজত করো, তাঁকে তোমার সামনে পাবে। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাও, সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছে চাও। জেনে রাখো, সব মানুষ মিলে তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে কোনো উপকার করতে পারবে না; আর সবাই মিলে ক্ষতি করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে, আর খাতা শুকিয়ে গেছে।
عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلاَّ لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
মুমিনের ব্যাপারটা কত চমৎকার! তার সব কিছুই কল্যাণকর; আর এটা মুমিন ছাড়া আর কারো জন্য নয়। আনন্দের কিছু ঘটলে সে শুকরিয়া আদায় করে, তা তার জন্য কল্যাণ। আর কষ্টের কিছু ঘটলে সে ধৈর্য ধরে, সেটাও তার জন্য কল্যাণ।
- বিপদে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন" আর বিপদের দোয়া পড়া (সহিহ মুসলিম ৯১৮)
জীবনে তাকদীরের ঈমান
চেষ্টা, ভরসা, সবর আর শুকরিয়া
তাকদীরে ঈমান শুধু মনে রাখার বিশ্বাস নয়; প্রতিদিনের কথা ও সিদ্ধান্তে এর ছাপ পড়ে। নিচের অভ্যাসগুলো সেই ঈমানের বাস্তব রূপ।
| কী করবেন | কেন | সূত্র |
|---|---|---|
| কাজের আগে পুরো চেষ্টা আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া | চেষ্টা করো, সাহায্য চাও, হাল ছেড়ো না | সহিহ মুসলিম ২৬৬৪সহিহ |
| সিদ্ধান্তের আগে ইস্তিখারা | ভালোটা আল্লাহই জানেন | সহিহ বুখারী ৬৩৮২সহিহ |
| ভবিষ্যতের কথায় "ইনশাআল্লাহ" বলা | আল্লাহ না চাইলে কিছুই হয় না | সূরা আল-কাহফ ১৮:২৪ |
| ব্যর্থ হলে "যদি" না বলে "কদ্দারাল্লাহ ওয়া মা শাআ ফাআল" বলা | "যদি" শয়তানের দরজা খোলে | সহিহ মুসলিম ২৬৬৪সহিহ |
| বিপদে ইন্না লিল্লাহ ও বিপদের দোয়া | আল্লাহ এর চেয়ে ভালো বদলা দেন | সহিহ মুসলিম ৯১৮সহিহ |
| সাফল্যে অহংকার না করে শুকরিয়া | যা পেয়েছ তা আল্লাহর দেওয়া | সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৩ |
| অন্যের নিয়ামতে হিংসা না করা | রিযিক বণ্টন আল্লাহর নির্ধারণ | সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৩২ |
| ভাগ্য জানতে গণক-জ্যোতিষী, রাশিফল থেকে দূরে থাকা | গায়েব শুধু আল্লাহ জানেন | সূরা আন-নামল ২৭:৬৫ |
বিপদে ও অটল থাকার দোয়া
তাকদীর মেনে নেওয়া মানে আল্লাহর কাছে চাওয়া বন্ধ করা নয়; বরং যা ঘটেছে তার জন্য প্রতিদান আর সামনে ভালোর জন্য তাঁর কাছেই চাওয়া।
আমরা আল্লাহরই, আর তাঁর কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ, আমার এই বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন, আর এর চেয়ে উত্তম কিছু দিন।
সহিহ মুসলিম ৯১৮সহিহহে আমাদের রব, সঠিক পথ দেখানোর পর আমাদের অন্তরকে বাঁকা করে দেবেন না, আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দিন; নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।
সূরা আলে ইমরান ৩:৮কুরআনপ্রচলিত কিন্তু সহিহ নয়
তাকদীর নিয়ে সমাজে যে কথাগুলো বেশি শোনা যায়, তার সাথে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক কথা।
ভুল ধারণা "সবই তো আগে থেকে লেখা, তাহলে নামাজ-রোজা করে কী লাভ?"
সাহাবিরা ঠিক এই প্রশ্ন করেছিলেন, আর নবীজি (ﷺ) বলেছেন: আমল করো, প্রত্যেকের জন্য তার পথ সহজ করা হয় (সহিহ বুখারী ৪৯৪৯)। আমরা জানি না কী লেখা আছে; জানি শুধু কী আদেশ করা হয়েছে। কেউ যদি বলে "খাবার লেখা থাকলে এমনিই পেটে যাবে", সে তবু খাবার মুখে তোলে। দ্বীনের বেলায়ও তা-ই।
ভুল ধারণা "গুনাহ করেছি, কারণ আল্লাহ তাকদীরে লিখে রেখেছিলেন"
মক্কার মুশরিকরাও বলত: "আল্লাহ চাইলে আমরা শিরক করতাম না"; আল্লাহ এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন (সূরা আল-আনআম ৬:১৪৮)। গুনাহ করার সময় কেউ জানত না কী লেখা আছে; সে নিজের ইচ্ছায় বেছে নিয়েছে। আদম (আ.) মূসাকে (আ.) তাকদীরের কথা বলেছিলেন (সহিহ বুখারী ৬৬১৪), কিন্তু আলেমরা (ইবনু তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম) ব্যাখ্যা করেছেন: আদম (আ.) তাওবা করার পর, আর কথা ছিল বিপদ (জান্নাত থেকে বের হওয়া) নিয়ে, গুনাহের অজুহাত হিসেবে নয়। বিপদে তাকদীরের কথা বলা যায়; গুনাহে বলতে হয় "আমি ভুল করেছি", তারপর তাওবা।
ভুল ধারণা "শবে বরাতে সারা বছরের ভাগ্য লেখা হয়"
কুরআনে যে "বরকতময় রাতে" প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় ফয়সালা হয় (সূরা আদ-দুখান ৪৪:৩, সূরা আদ-দুখান ৪৪:৪), সেটা কুরআন নাজিলের রাত, আর কুরআন নাজিল হয়েছে লাইলাতুল কদরে (সূরা আল-কদর ৯৭:১), রমজানে (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫)। তাই অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এখানে লাইলাতুল কদরই উদ্দেশ্য, শাবানের মধ্যরাত নয়। শবে বরাত নিয়ে বিস্তারিত: প্রচলিত ভুল।
ভুল ধারণা "হাত দেখে, রাশি দেখে বা জন্মতারিখ দেখে ভাগ্য বলা যায়"
আসমান-জমিনে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না (সূরা আন-নামল ২৭:৬৫)। গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেই চল্লিশ রাত নামাজ কবুল হয় না (সহিহ মুসলিম ২২৩০)। তাকদীর আল্লাহর গোপন বিষয়; তা জানার চেষ্টা নয়, বরং আদেশ মানাই আমাদের কাজ।
সাবধান "যদি ওই রাস্তায় না যেতাম, দুর্ঘটনা হতো না"
যা ঘটে গেছে তা নিয়ে "যদি" বলে আফসোস করাকে নবীজি (ﷺ) নিষেধ করেছেন, কারণ তা শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়; বলতে হবে: আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন, তিনি যা চেয়েছেন করেছেন (সহিহ মুসলিম ২৬৬৪)। তবে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়া, সাবধান হওয়া দোষের নয়, বরং চেষ্টারই অংশ।
ভুল ধারণা "তাকদীর বদলায় না, তাই দোয়া করে লাভ নেই"
দোয়া নিজেই একটি উপায়, আর উপায়ও তাকদীরের অংশ: আল্লাহ যা দেবেন বলে লিখেছেন, অনেক সময় তা দোয়ার মাধ্যমেই দেন। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব (সূরা গাফির ৪০:৬০), আর দোয়াই ইবাদত (জামে আত-তিরমিযী ২৯৬৯)। তাই দোয়া কখনো ছাড়বেন না।
শেষ কথা: চেষ্টা আমার, ফয়সালা আল্লাহর
তাকদীরে ঈমান মুমিনকে দুই দিক থেকে বাঁচায়: সাফল্যে অহংকার থেকে, আর ব্যর্থতায় হতাশা থেকে (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৩)। চেষ্টা আমাদের দায়িত্ব, ফল আল্লাহর হাতে; আর যা-ই ঘটুক, মুমিনের জন্য তাতে কল্যাণ আছে। তাকদীরের গভীর রহস্য নিয়ে তর্কে না জড়িয়ে, যতটুকু কুরআন-সুন্নাহ বলেছে ততটুকুতে ঈমান আনা আর আমলে মন দেওয়াই নিরাপদ পথ।
قُل لَّن يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلَانَا ۚ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
বলুন, ‘আমাদের জন্য আল্লাহ্ যা লিখেছেন তা ছাড়া আমাদের অন্য কিছু ঘটবে না; তিনি আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহ্র উপরই মুমিনদের নির্ভর করা উচিত।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ۚ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ۚ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا
এবং তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন রিযিক। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তার জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছে পূরণ করবেনই; অবশ্যই আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন সুনির্দিষ্ট মাত্ৰা।