দ্বীনের পথ · ধাপ ৩
নামাজ: দ্বীনের খুঁটি
ঈমানের পর সবচেয়ে বড় আমল নামাজ। কিয়ামতে সবার আগে এর হিসাব হবে। এই ধাপে জানবেন কেন নামাজ, কয় রাকাত, কীভাবে, আর বিশেষ অবস্থায় কী করবেন।
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া। হাদিসের মান মুহাদ্দিসদের রায় অনুযায়ী। সব মূল গ্রন্থ ও মিলিয়ে দেখার লিংক এক জায়গায়: সূত্র তালিকা।
কেন নামাজ
নামাজ নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ, আর তা ছেড়ে দেওয়াকে নবীজি (ﷺ) কুফর ও শিরকের সীমানা বলেছেন।
فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلَاةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِكُمْ ۚ فَإِذَا اطْمَأْنَنتُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ ۚ إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا
অতঃপর যখন তোমরা সালাত সমাপ্ত করবে তখন দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করবে, অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন যথাযথ সালাত কায়েম করবে; নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।
إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ
মানুষ এবং শিরক ও কুফরের মাঝে (পার্থক্য) হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।
কিয়ামতের দিন মানুষের আমলের মধ্যে সবার আগে নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। আমাদের রব ফেরেশতাদের বলবেন, অথচ তিনি সবচেয়ে ভালো জানেন: আমার বান্দার নামাজ দেখো, সে কি তা পূর্ণ করেছে, নাকি কম করেছে? পূর্ণ হলে পূর্ণই লেখা হবে। আর কিছু কম থাকলে বলবেন: দেখো, আমার বান্দার কোনো নফল আছে কি? নফল থাকলে বলবেন: তার নফল দিয়ে আমার বান্দার ফরজ পূর্ণ করে দাও। তারপর বাকি আমলগুলোও এভাবেই হিসাব করা হবে।
নামাজ শুধু দায়িত্ব নয়, এটা প্রতিদিনের পরিচ্ছন্নতা আর অন্তরের প্রশান্তি।
বলো তো, তোমাদের কারও দরজার সামনে যদি একটি নদী থাকে, আর সে প্রতিদিন তাতে পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার গায়ে কোনো ময়লা থাকবে? সাহাবিরা বললেন: কোনো ময়লাই থাকবে না। তিনি বললেন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উদাহরণ এমনই। এর মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহ মুছে দেন।
اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ ۖ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ ۗ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ
আপনি তেলাওয়াত করুন কিতাব থেকে যা আপনার প্রতি ওহী করা হয় এবং সালাত কায়েম করুন। নিশ্চয় সালাত বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তা জানেন।
পাঁচ ওয়াক্ত ও রাকাত সংখ্যা
| নামাজ | ফরজ রাকাত | সফরে |
|---|---|---|
| ফজর | ২ | ২ |
| যোহর | ৪ | ২ |
| আসর | ৪ | ২ |
| মাগরিব | ৩ | ৩ |
| এশা | ৪ | ২ |
রাকাত সংখ্যা নবীজির (ﷺ) আমল থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে, এতে কোনো মতভেদ নেই। সফরে চার রাকাতের নামাজ দুই রাকাত পড়া হয় (সহিহ বুখারী ৩৫০)। প্রতিটি নামাজের সময় নিয়ে আলাদা পাতা আসছে।
নামাজ কীভাবে পড়বেন (সংক্ষেপে)
নবীজি (ﷺ) বলেছেন: "যেভাবে আমাকে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবে পড়ো" (সহিহ বুখারী ৬৩১)। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা ও অন্যান্য সহিহ হাদিস অনুযায়ী মূল ধাপ:
- পবিত্র হয়ে কিবলামুখী দাঁড়ান, মনে নিয়ত করুন।
- "আল্লাহু আকবার" বলে নামাজ শুরু করুন (তাকবীরে তাহরীমা)।
- সূরা আল-ফাতিহা পড়ুন; এটা ছাড়া নামাজ হয় না (সহিহ বুখারী ৭৫৬)। প্রথম দুই রাকাতে এরপর কুরআনের আরও কিছু অংশ পড়ুন।
- রুকু করুন, পিঠ সোজা রেখে স্থির হয়ে।
- রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ান।
- সিজদা করুন, স্থির হয়ে। তারপর স্থির হয়ে বসুন, তারপর দ্বিতীয় সিজদা।
- দুই রাকাত পর বসে তাশাহহুদ পড়ুন (সহিহ বুখারী ৮৩১)।
- শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ, দরুদ ও দোয়া পড়ে ডানে ও বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন (সুনানে আবু দাউদ ৬১)।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকবীর দিয়ে নামাজ শুরু করতেন, আর কিরাআত শুরু করতেন "আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন" দিয়ে। রুকু করলে মাথা উঁচুও রাখতেন না, নিচুও করতেন না, মাঝামাঝি রাখতেন। রুকু থেকে মাথা তুললে সোজা হয়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত সিজদায় যেতেন না। সিজদা থেকে মাথা তুললে সোজা হয়ে না বসা পর্যন্ত (দ্বিতীয়) সিজদা করতেন না। প্রতি দুই রাকাতে "আত্তাহিয়্যাতু" পড়তেন। বাম পা বিছিয়ে দিতেন আর ডান পা খাড়া রাখতেন। শয়তানের মতো (পায়ের গোড়ালির উপর) বসতে নিষেধ করতেন, আর হিংস্র প্রাণীর মতো দুই বাহু (মাটিতে) বিছিয়ে দিতে নিষেধ করতেন। আর তিনি সালাম দিয়ে নামাজ শেষ করতেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মসজিদে প্রবেশ করলেন। তখন এক ব্যক্তি এসে নামাজ পড়ল, তারপর নবী (ﷺ)-কে সালাম দিল। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন: ফিরে যাও, আবার নামাজ পড়ো, কারণ তুমি নামাজ পড়োনি। সে ফিরে গিয়ে আগের মতোই নামাজ পড়ল, তারপর এসে সালাম দিল। তিনি বললেন: ফিরে যাও, আবার নামাজ পড়ো, কারণ তুমি নামাজ পড়োনি। এভাবে তিনবার হলো। তখন লোকটি বলল: যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর কসম, আমি এর চেয়ে ভালো পারি না, আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন: যখন নামাজে দাঁড়াবে, তাকবীর বলবে। তারপর তোমার জানা কুরআন থেকে যা সহজ, তা পড়বে। তারপর রুকু করবে, রুকুতে স্থির হওয়া পর্যন্ত। তারপর মাথা তুলবে, সোজা হয়ে দাঁড়ানো পর্যন্ত। তারপর সিজদা করবে, সিজদায় স্থির হওয়া পর্যন্ত। তারপর মাথা তুলবে, স্থির হয়ে বসা পর্যন্ত। আর পুরো নামাজে এভাবেই করবে।
ছবিসহ বিস্তারিত নিয়ম (প্রতিটি অবস্থানে কী পড়বেন) আলাদা পাতায় আসছে।
সালামের পরের যিকির
ফরজ নামাজের পর নবীজি (ﷺ) যা পড়তেন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا انْصَرَفَ مِنْ صَلاَتِهِ اسْتَغْفَرَ ثَلاَثًا وَقَالَ " اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلاَمُ وَمِنْكَ السَّلاَمُ تَبَارَكْتَ ذَا الْجَلاَلِ وَالإِكْرَامِ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নামাজ শেষ করে তিনবার ইস্তিগফার করতেন (আস্তাগফিরুল্লাহ বলতেন) এবং বলতেন: "আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম, ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম" (হে আল্লাহ, তুমিই শান্তি, তোমার কাছ থেকেই শান্তি; তুমি বরকতময়, হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী)।
নবীজির (ﷺ) জীবন থেকে: মিরাজে নামাজের উপহার
মিরাজের রাতে আল্লাহ নিজে নামাজ ফরজ করেছেন। শুরুতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত, শেষে পাঁচ ওয়াক্ত, কিন্তু সওয়াব পঞ্চাশের।
(নবী ﷺ বলেন:) আল্লাহ আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন। আমি তা নিয়ে ফেরার পথে মূসা (আ.)-এর কাছ দিয়ে গেলাম। তিনি বললেন: আল্লাহ আপনার উম্মতের উপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম: পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ। তিনি বললেন: আপনার রবের কাছে ফিরে যান, আপনার উম্মত এটা পারবে না। আমি ফিরে গেলাম, তিনি এর একটা অংশ কমিয়ে দিলেন। ... এভাবে কয়েকবার যাওয়ার পর আল্লাহ বললেন: এগুলো পাঁচ, আর এগুলোই পঞ্চাশ। আমার কাছে কথা বদলায় না।
নবীজির (ﷺ) কাছে নামাজ বোঝা ছিল না, ছিল প্রশান্তি।
يَا بِلاَلُ أَقِمِ الصَّلاَةَ أَرِحْنَا بِهَا
হে বিলাল, নামাজের ইকামত দাও, এর মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও।
আপনার জীবনে এর মানে: নামাজকে "করতে হবে" না ভেবে "পেয়েছি" ভাবুন। দিনে পাঁচবার আল্লাহর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ।
কোন অবস্থায় কী করবেন
সফরে আছি। নামাজ কীভাবে পড়ব?
সফরে চার রাকাতের ফরজ নামাজ (যোহর, আসর, এশা) দুই রাকাত পড়বেন; ফজর ও মাগরিব আগের মতোই (সূরা আন-নিসা ৪:১০১, সহিহ বুখারী ৩৫০)। কতটা দূরত্ব বা কত দিনের সফরে কসর করা যায়, তা নিয়ে আলেমদের মতভেদ আছে; বিস্তারিত পাতা আসছে।
অসুস্থ, দাঁড়াতে পারছি না।
দাঁড়িয়ে না পারলে বসে, বসেও না পারলে কাত হয়ে শুয়ে নামাজ পড়ুন (সহিহ বুখারী ১১১৭)। অসুস্থতায়ও নামাজ মাফ নয়, তবে আল্লাহ সাধ্যের বাইরে কিছু চাপান না (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬)।
নামাজের কথা ভুলে গিয়েছিলাম বা ঘুমিয়ে ছিলাম।
মনে পড়ার সাথে সাথে বা ঘুম ভাঙার পরেই নামাজটি পড়ে নিন (সহিহ বুখারী ৫৯৭)। এতে গুনাহ নেই; ইচ্ছাকৃত দেরি করা আলাদা বিষয়।
নামাজে মনে নেই তিন রাকাত পড়েছি না চার রাকাত।
যেটা নিশ্চিত (কম সংখ্যাটা) ধরে নামাজ শেষ করুন, তারপর সালামের আগে দুটি সিজদা (সিজদায়ে সাহু) করুন (সহিহ মুসলিম ৫৭১)।
অনেক বছর নামাজ পড়িনি। এখন কী করব?
আজ থেকেই নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত শুরু করুন এবং আন্তরিক তাওবা করুন (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)। বেশি বেশি নফল নামাজ পড়ুন, কারণ কিয়ামতে নফল দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করা হবে (সুনানে আবু দাউদ ৮৬৪)। ইচ্ছাকৃত ছেড়ে দেওয়া পুরোনো নামাজ কাযা করতে হবে কিনা, এ নিয়ে আলেমদের মতভেদ আছে; একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের সাথে পরামর্শ করুন (সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩)।
জুমার দিনে কী করব?
জুমার আযান হলে কেনাবেচা ছেড়ে আল্লাহর স্মরণে (মসজিদে) যাওয়ার আদেশ (সূরা আল-জুমুআ ৬২:৯)। জুমার বিস্তারিত পাতা আসছে।
প্রচলিত ভুল
✗ "নামাজের আগে 'নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া...' পড়তে হয়।"
নিয়ত অন্তরের কাজ (সহিহ বুখারী ১)। নবীজি (ﷺ) তাকবীর দিয়ে নামাজ শুরু করতেন (সহিহ মুসলিম ৪৯৮); তাঁর থেকে মুখে নিয়তের কোনো বাক্য পড়ার সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না।
✗ "তাড়াতাড়ি পড়লেও নামাজ হয়ে যায়।"
রুকু-সিজদায় স্থির না হওয়া ব্যক্তিকে নবীজি (ﷺ) তিনবার বলেছেন, "তুমি নামাজ পড়োনি" (সহিহ বুখারী ৭৫৭)।
✗ "মন না বসলে নামাজ পড়ে লাভ নেই।"
নামাজ ফরজ, মন বসুক বা না বসুক। মনোযোগ (খুশু) ধীরে ধীরে বাড়ানোর চেষ্টা করুন; সফল মুমিনদের গুণই হলো নামাজে বিনয় (সূরা আল-মুমিনূন ২৩:২)।
✗ "ফরজ নামাজের পর ইমামের সাথে হাত তুলে সম্মিলিত মুনাজাত নবীজির (ﷺ) নিয়মিত আমল।"
ফরজের পর নবীজি (ﷺ) যে যিকির করতেন তা সহিহভাবে বর্ণিত (সহিহ মুসলিম ৫৯১)। কিন্তু প্রতিদিন ইমাম-মুক্তাদি মিলে হাত তুলে সম্মিলিত মুনাজাত করার কোনো সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। প্রত্যেকে নিজে নিজে যেকোনো সময় দোয়া করতে পারেন।
এই সপ্তাহের আমল
টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।
নিজেকে যাচাই করুন
সুনানে আবু দাউদ ৮৬৪ (আলবানী: সহিহ)।
মাগরিব তিন রাকাত, সফরেও তিন।
সহিহ মুসলিম ৫৭১।