দ্বীনের পথ · ধাপ ২
পবিত্রতা: অজু, গোসল ও তায়াম্মুম
নামাজের চাবি হলো পবিত্রতা। এই ধাপে শিখবেন নবীজির (ﷺ) পদ্ধতিতে অজু, ফরজ গোসল আর পানি না থাকলে তায়াম্মুম।
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া। হাদিসের মান মুহাদ্দিসদের রায় অনুযায়ী। সব মূল গ্রন্থ ও মিলিয়ে দেখার লিংক এক জায়গায়: সূত্র তালিকা।
কেন পবিত্রতা
পবিত্রতা ছাড়া নামাজ হয় না, আর আল্লাহ পবিত্র থাকা মানুষকে ভালোবাসেন।
الطُّهُورُ شَطْرُ الإِيمَانِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلأُ الْمِيزَانَ
পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। আর "আলহামদুলিল্লাহ" (আমলের) পাল্লা ভরে দেয়।
مِفْتَاحُ الصَّلاَةِ الطُّهُورُ وَتَحْرِيمُهَا التَّكْبِيرُ وَتَحْلِيلُهَا التَّسْلِيمُ
নামাজের চাবি হলো পবিত্রতা। তাকবীর দিয়ে নামাজ শুরু হয় (তখন অন্য সব কাজ হারাম হয়ে যায়), আর সালাম দিয়ে শেষ হয় (তখন আবার সব কাজ বৈধ হয়)।
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ ۖ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ ۖ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
আর তারা আপনাকে রজঃস্রাব (হায়েজ) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। বলুন, তা ‘অশুচি’। কাজেই তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রী-সঙ্গম থেকে বিরত থাক এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত (সঙ্গমের জন্যে) তাদের নিকটবর্তী হবে না। তারপর তারা যখন উত্তমরূপে পরিশুদ্ধ হবে তখন তাদের নিকট ঠিক সেভাবে গমন করবে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালোবাসেন এবং তাদেরকেও ভালোবাসেন যারা পবিত্র থাকে।
অজু: ধাপে ধাপে
অজুর মূল নিয়ম কুরআনেই আছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ ۚ وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا ۚ وَإِن كُنتُم مَّرْضَىٰ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ ۚ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَـٰكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
হে মুমিনগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য দাঁড়াতে চাও তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাতগুলো কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, তোমাদের মাথায় মাসেহ কর এবং পায়ের টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে নাও আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হবে। আর যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে বা তোমরা স্ত্রীর সাথে সংগত হও এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করবে। সুতরাং তা দ্বারা মুখমণ্ডলে ও হাতে মাসেহ করবে। আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো সংকীর্ণতা করতে চান না; বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি তাঁর নেয়ামত সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।
উসমান (রা.) নবীজির (ﷺ) অজু যেভাবে দেখিয়েছেন (সহিহ বুখারী ১৫৯), সেভাবে:
- মনে মনে নিয়ত করুন (মুখে বলার দরকার নেই)।
- দুই হাত কব্জি পর্যন্ত তিনবার ধুয়ে নিন।
- ডান হাতে পানি নিয়ে কুলি করুন ও নাকে পানি দিন।
- পুরো মুখমণ্ডল তিনবার ধুয়ে নিন।
- দুই হাত কনুইসহ তিনবার ধুয়ে নিন, আগে ডান হাত (সহিহ বুখারী ১৬৮)।
- ভেজা হাতে মাথা মাসাহ করুন।
- দুই পা টাখনুসহ তিনবার ধুয়ে নিন, আগে ডান পা।
প্রতিটি অঙ্গ একবার ধোয়া ফরজ; নবীজি (ﷺ) একবার একবার করেও অজু করেছেন (সহিহ বুখারী ১৫৭)। তিনবার ধোয়া সুন্নাহ।
তিনি দেখলেন, উসমান ইবনু আফফান (রা.) একটি পাত্র আনালেন। তিনবার দুই হাতের তালুতে পানি ঢেলে তা ধুলেন। তারপর ডান হাত পাত্রে ঢুকিয়ে (পানি নিয়ে) কুলি করলেন ও নাকে পানি দিলেন। তারপর তিনবার মুখমণ্ডল ধুলেন, আর দুই হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। তারপর মাথা মাসাহ করলেন। তারপর দুই পা টাখনু পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। তারপর বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যে আমার এই অজুর মতো অজু করে, তারপর দুই রাকাত নামাজ পড়ে, যাতে সে মনে মনে (দুনিয়ার) কথা বলে না, তার আগের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
অজুর পরের দোয়া:
তোমাদের যে কেউ অজু করে এবং পূর্ণভাবে অজু করে, তারপর বলে: "আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুল্লাহি ওয়া রাসূলুহ" (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হয়, যেটা দিয়ে ইচ্ছা সে প্রবেশ করবে।
ফরজ গোসল
বড় নাপাকি (জানাবাত) হলে, আর নারীদের হায়েয ও নিফাস শেষ হলে গোসল ফরজ (সূরা আল-মায়িদা ৫:৬, সূরা আল-বাকারা ২:২২২)। নবীজির (ﷺ) গোসলের পদ্ধতি:
নবী (ﷺ) যখন জানাবাতের (বড় নাপাকির) গোসল করতেন, প্রথমে দুই হাত ধুতেন। তারপর নামাজের অজুর মতো অজু করতেন। তারপর আঙুল পানিতে ভিজিয়ে চুলের গোড়ায় খিলাল করতেন। তারপর দুই হাতে তিন আঁজলা পানি মাথায় ঢালতেন। তারপর সারা শরীরে পানি ঢেলে দিতেন।
- নিয়ত করে দুই হাত ধুয়ে নিন।
- নামাজের অজুর মতো অজু করুন।
- ভেজা আঙুল দিয়ে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছান।
- মাথায় তিনবার পানি ঢালুন।
- তারপর সারা শরীরে পানি ঢালুন, যেন কোথাও শুকনো না থাকে।
তায়াম্মুম: পানি না পেলে
পানি না পেলে, অথবা অসুস্থতার কারণে পানি ব্যবহার ক্ষতিকর হলে, পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করা যায় (সূরা আন-নিসা ৪:৪৩)।
إِنَّمَا كَانَ يَكْفِيكَ هَكَذَا ". فَضَرَبَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِكَفَّيْهِ الأَرْضَ، وَنَفَخَ فِيهِمَا ثُمَّ مَسَحَ بِهِمَا وَجْهَهُ وَكَفَّيْهِ
(আম্মার (রা.) সফরে নাপাক হয়ে পানি না পেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়েছিলেন। ঘটনাটি শুনে নবী (ﷺ) বললেন:) তোমার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। এই বলে নবী (ﷺ) দুই হাতের তালু মাটিতে মারলেন, তাতে ফুঁ দিলেন, তারপর তা দিয়ে মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত মাসাহ করলেন।
- মনে মনে নিয়ত করুন।
- দুই হাতের তালু একবার পবিত্র মাটিতে মারুন।
- হালকা ফুঁ দিয়ে অতিরিক্ত ধুলা ঝেড়ে নিন।
- তালু দিয়ে মুখমণ্ডল মাসাহ করুন।
- তারপর দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত মাসাহ করুন।
নবীজির (ﷺ) সাহাবিদের জীবন থেকে: জান্নাতে বিলালের জুতার আওয়াজ
নবীজি (ﷺ) জান্নাতে নিজের সামনে বিলাল (রা.)-এর জুতার আওয়াজ শুনেছিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে বিলাল ছোট্ট একটা অভ্যাসের কথা বললেন।
নবী (ﷺ) ফজরের নামাজের সময় বিলাল (রা.)-কে বললেন: হে বিলাল, ইসলাম গ্রহণের পর তোমার সবচেয়ে আশাজাগানিয়া আমলটি কী, আমাকে বলো। কারণ আমি জান্নাতে আমার সামনে তোমার জুতার আওয়াজ শুনেছি। বিলাল বললেন: আমার কাছে সবচেয়ে আশার আমল এটাই যে, দিনে বা রাতে যখনই আমি পবিত্রতা অর্জন (অজু) করেছি, সেই অজু দিয়ে আমার ভাগ্যে যতটুকু নামাজ লেখা ছিল, পড়েছি।
আপনার জীবনে এর মানে: ছোট আমলকে ছোট মনে করবেন না। প্রতিবার অজুর পর দুই রাকাত নামাজ, এই একটি নিয়মিত অভ্যাস বিলালকে জান্নাতের সুসংবাদ এনে দিয়েছিল।
কোন অবস্থায় কী করবেন
অজু আছে কিনা সন্দেহ হচ্ছে। আবার অজু করব?
অজু করেছেন এটা নিশ্চিত হলে শুধু সন্দেহের কারণে অজু ভাঙে না। নবীজি (ﷺ) বলেছেন, শব্দ না শোনা বা গন্ধ না পাওয়া পর্যন্ত নামাজ ছাড়বে না (সহিহ বুখারী ১৩৭)। বারবার সন্দেহ শয়তানের ওয়াসওয়াসা হতে পারে; সেটাকে গুরুত্ব দেবেন না।
পানি নেই, বা অসুস্থতায় পানি লাগানো নিষেধ। কী করব?
তায়াম্মুম করুন (সূরা আন-নিসা ৪:৪৩, সহিহ বুখারী ৩৩৮)। পানি পাওয়া গেলে বা সুস্থ হলে আবার পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবেন।
মোজা পরে আছি। প্রতিবার খুলে পা ধুতে হবে?
অজু করে পবিত্র অবস্থায় মোজা পরলে, পরে অজুর সময় মোজার উপর মাসাহ করা যায় (সহিহ বুখারী ২০৬)। মেয়াদ: নিজ এলাকায় থাকলে এক দিন এক রাত, সফরে তিন দিন তিন রাত (সহিহ মুসলিম ২৭৬)।
হায়েযের সময় নামাজ পড়ব? পরে কাযা করতে হবে?
হায়েয ও নিফাসের সময় নামাজ পড়বেন না, এবং পরে সেই নামাজ কাযাও করতে হবে না। তবে রমজানের রোজা পরে কাযা করতে হবে (সহিহ মুসলিম ৩৩৫)। রক্ত বন্ধ হলে গোসল করে নামাজ শুরু করবেন।
প্রস্রাবের পর সাবধানতা কতটা জরুরি?
খুবই জরুরি। প্রস্রাবের ছিটা থেকে সাবধান না থাকা কবরের শাস্তির একটি কারণ (সহিহ বুখারী ২১৬)। ভালোভাবে পানি দিয়ে পরিষ্কার হোন এবং কাপড়ে ছিটা লাগা থেকে বাঁচুন।
প্রচলিত ভুল
✗ "অজুর প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সময় আলাদা আলাদা দোয়া পড়তে হয়।"
প্রতিটি অঙ্গের জন্য আলাদা দোয়ার কোনো সহিহ বর্ণনা নেই; ইমাম নববী (রহ.) "আল-আযকার" গ্রন্থে বলেছেন, এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। অজুর পরে সহিহ দোয়াটি পড়ুন (সহিহ মুসলিম ২৩৪)।
✗ "একটু সন্দেহ হলেই আবার অজু করা উচিত, এতেই সতর্কতা।"
নিশ্চিত অজু সন্দেহে ভাঙে না (সহিহ বুখারী ১৩৭)। বারবার অজু করার অভ্যাস ওয়াসওয়াসা বাড়ায়।
✗ "তিনবার না ধুলে অজু হয় না।"
একবার ধোয়াই ফরজ (সহিহ বুখারী ১৫৭); তিনবার সুন্নাহ ও উত্তম।
এই সপ্তাহের আমল
টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।
নিজেকে যাচাই করুন
"আর পা টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে নাও" (সূরা আল-মায়িদা ৫:৬)।
শব্দ না শোনা বা গন্ধ না পাওয়া পর্যন্ত নামাজ ছাড়বে না (সহিহ বুখারী ১৩৭)।
পানি না পেলে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম (সূরা আন-নিসা ৪:৪৩)।