দ্বীনের পথ · ধাপ ১
ঈমান ও তাওহীদ: আল্লাহকে চেনা
ঈমান সবকিছুর ভিত্তি। ভিত্তি মজবুত হলে বাকি আমল সহজ হয়। এই ধাপে জানবেন কালিমার অর্থ, ঈমানের ছয়টি রুকন, আর শিরক থেকে কীভাবে বাঁচবেন।
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া। হাদিসের মান মুহাদ্দিসদের রায় অনুযায়ী। সব মূল গ্রন্থ ও মিলিয়ে দেখার লিংক এক জায়গায়: সূত্র তালিকা।
কালিমার অর্থ
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" মানে: আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ (ইবাদতের যোগ্য সত্তা) নেই। অর্থাৎ দোয়া, সিজদা, কুরবানি, ভরসা, ভয় ও আশা, সব ইবাদত শুধু আল্লাহর জন্য।
"মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" মানে: মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল। তাই তিনি যা বলেছেন তা বিশ্বাস করব, যা আদেশ করেছেন তা মানব, যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকব, আর তাঁর দেখানো পদ্ধতিতেই আল্লাহর ইবাদত করব।
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ
কাজেই জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই। আর ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার ও মুমিন নর-নারীদের ক্রটির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।
مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ
যে ব্যক্তি এই জ্ঞান (ও বিশ্বাস) নিয়ে মারা যায় যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
ইসলাম, ঈমান ও ইহসান
একদিন জিবরীল (আ.) মানুষের রূপে এসে নবীজিকে (ﷺ) প্রশ্ন করে সাহাবিদের দ্বীন শিখিয়েছিলেন। এই একটি হাদিসেই দ্বীনের তিনটি স্তর আছে।
(সাদা কাপড় পরা এক অচেনা ব্যক্তি এসে বললেন:) হে মুহাম্মাদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: ইসলাম হলো, তুমি সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, নামাজ কায়েম করবে, যাকাত দেবে, রমজানের রোজা রাখবে, আর সামর্থ্য থাকলে বাইতুল্লাহর হজ করবে। তিনি বললেন: আপনি সত্য বলেছেন। ... তিনি বললেন: আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। নবীজি বললেন: তুমি ঈমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবগুলোর প্রতি, তাঁর রাসূলদের প্রতি, শেষ দিনের প্রতি, আর তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি। তিনি বললেন: আপনি সত্য বলেছেন। তিনি বললেন: আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। নবীজি বললেন: তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তাঁকে দেখছ; আর যদি তাঁকে না দেখো, তিনি তো তোমাকে দেখছেন। ... (পরে নবীজি বললেন:) তিনি ছিলেন জিবরীল, তোমাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন।
| ঈমানের রুকন | সহজ অর্থ |
|---|---|
| ১. আল্লাহর প্রতি ঈমান | তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই; সৃষ্টি, মালিকানা ও ইবাদত সব তাঁর। |
| ২. ফেরেশতাদের প্রতি | আল্লাহর সৃষ্টি, যাঁরা তাঁর আদেশ পালন করেন। |
| ৩. কিতাবগুলোর প্রতি | আল্লাহ নবীদের উপর কিতাব নাজিল করেছেন; সর্বশেষ কিতাব কুরআন। |
| ৪. রাসূলদের প্রতি | আল্লাহ সব জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছেন; সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)। |
| ৫. শেষ দিনের প্রতি | মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, হিসাব, জান্নাত ও জাহান্নাম। |
| ৬. তাকদীরের প্রতি | ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহর জ্ঞান ও ইচ্ছায় ঘটে; আমাদের কাজ চেষ্টা করা। |
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ۚ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ
রাসূল তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহ্র উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে: আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্তাবর্তনস্থল।
আল্লাহ এক: সূরা আল-ইখলাস
চার আয়াতের এই সূরায় তাওহীদের মূল কথা আছে। অর্থ বুঝে মুখস্থ করুন এবং নামাজে পড়ুন।
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
বলুন , ‘তিনি আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয় ,
اللَّهُ الصَّمَدُ
‘আল্লাহ্ হচ্ছেন ‘সামাদ' (তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী);
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ
তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি ,
وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
‘এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।’
শিরক: সবচেয়ে বড় গুনাহ
শিরক মানে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত বা গুণে অন্য কাউকে শরিক করা। তাওবা ছাড়া মারা গেলে আল্লাহ শিরক ক্ষমা করেন না।
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَىٰ إِثْمًا عَظِيمًا
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে।
আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু শিরক ও শিরকের দিকে নেওয়া কাজ:
- মৃত ব্যক্তি, পীর বা মাজারের কাছে সন্তান, রোগমুক্তি বা বিপদ থেকে উদ্ধার চাওয়া।
- সুরক্ষার জন্য তাবিজ, সুতা বা কড়ি ঝোলানো (সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮৩)।
- গণক বা জ্যোতিষীর কাছে ভাগ্য জানতে যাওয়া (সহিহ মুসলিম ২২৩০)।
আল্লাহ বান্দার খুব কাছে। তাঁর কাছে সরাসরি চাইলেই তিনি শোনেন; কোনো মাধ্যম লাগে না।
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
আর আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।'
নবীজির (ﷺ) সাহাবিদের জীবন থেকে: বিলাল (রা.)
মক্কায় ইসলামের শুরুর দিকে মুশরিকরা বিলাল (রা.)-কে কঠিন নির্যাতন করত। তবু তাঁর মুখে একটাই কথা ছিল: "আহাদ, আহাদ" (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)।
সবার আগে যারা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কথা জানিয়েছিলেন, তাঁরা সাতজন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ), আবু বকর, আম্মার, তাঁর মা সুমাইয়া, সুহাইব, বিলাল ও মিকদাদ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আল্লাহ তাঁর চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে রক্ষা করলেন, আর আবু বকরকে তাঁর গোত্রের মাধ্যমে। বাকিদের মুশরিকরা ধরে লোহার বর্ম পরিয়ে রোদে ফেলে রাখত। ... কিন্তু বিলাল আল্লাহর পথে নিজের কষ্টকে তুচ্ছ মনে করলেন। তারা তাঁকে ধরে বাচ্চাদের হাতে তুলে দিল, তারা তাঁকে মক্কার পাহাড়ি পথে টেনে বেড়াত, আর তিনি বলতে থাকতেন: আহাদ, আহাদ (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)।
আপনার জীবনে এর মানে: তাওহীদ শুধু মুখের কথা নয়, এটা জীবনের অবস্থান। চাপ, ভয় বা লোভের মুখেও আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে মাথা নত না করা।
কোন অবস্থায় কী করবেন
মনে আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ প্রশ্ন বা কুমন্ত্রণা আসে। আমি কি ঈমান হারিয়ে ফেলছি?
না। সাহাবিরাও এমন অভিযোগ করেছিলেন, আর নবীজি (ﷺ) বলেছেন এগুলোকে খারাপ মনে করাই স্পষ্ট ঈমান (সহিহ মুসলিম ১৩২)। এমন চিন্তা এলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান ("আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম") এবং চিন্তাটা থামিয়ে দিন (সহিহ বুখারী ৩২৭৬)।
বিপদে পড়লে কার কাছে চাইব?
দোয়া শুধু আল্লাহর কাছে (সূরা গাফির ৪০:৬০, সূরা আল-বাকারা ২:১৮৬)। জীবিত মানুষের কাছে তার সাধ্যের মধ্যের সাহায্য (যেমন ডাক্তার, আত্মীয়, প্রতিবেশী) চাওয়া জায়েয; আল্লাহ ভালো কাজে একে অপরকে সাহায্য করতে বলেছেন (সূরা আল-মায়িদা ৫:২)। কিন্তু যা শুধু আল্লাহ পারেন, তা অন্য কারও কাছে চাওয়া শিরক।
অসুস্থতায় ঝাড়ফুঁক করা যাবে? তাবিজ?
কুরআনের আয়াত ও সহিহ দোয়া দিয়ে শিরকমুক্ত ঝাড়ফুঁক জায়েয (সহিহ মুসলিম ২২০০)। কিন্তু তাবিজ বা সুতা ঝোলানো থেকে বিরত থাকুন (সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮৩)। চিকিৎসা নেওয়াও সুন্নাহর অংশ।
রাশিফল দেখা বা হাত দেখিয়ে ভাগ্য জানা কি ঠিক?
না। গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেই চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হয় না (সহিহ মুসলিম ২২৩০)। অদৃশ্যের জ্ঞান শুধু আল্লাহর।
আল্লাহ কোথায়?
আল্লাহ আরশের উপরে আছেন, যেমনটা তিনি নিজে বলেছেন (সূরা ত্বা-হা ২০:৫)। নবীজি (ﷺ) এক দাসীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন "আল্লাহ কোথায়?", সে বলেছিল "আসমানে", আর তিনি তাকে মুমিন বলেছেন (সহিহ মুসলিম ৫৩৭)। একই সাথে আল্লাহ জ্ঞান, দেখা ও শোনার মাধ্যমে আমাদের সাথে আছেন, আমরা যেখানেই থাকি (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:৪)। সাহাবি ও সালাফে সালেহীন এভাবেই বুঝেছেন।
প্রচলিত ভুল
✗ "আল্লাহ সত্তাগতভাবে সব জায়গায় বিরাজমান।"
কুরআন বলছে আল্লাহ আরশের উপরে (সূরা ত্বা-হা ২০:৫, সূরা আল-হাদীদ ৫৭:৪), আর দাসীর হাদিসও তা-ই বলে (সহিহ মুসলিম ৫৩৭)। "আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন" মানে তাঁর জ্ঞান, দেখা, শোনা ও সাহায্য সবখানে।
✗ "পীর বা মাজারের মাধ্যমে চাইলে দোয়া তাড়াতাড়ি কবুল হয়।"
আল্লাহ বলেছেন, তিনি কাছে আছেন এবং যে ডাকে তার ডাকে সাড়া দেন (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৬)। আল্লাহ আর বান্দার মাঝে দোয়ার জন্য কোনো মাধ্যম লাগে না।
✗ "তাবিজে তো কুরআনের আয়াত আছে, তাই সমস্যা নেই।"
নবীজি (ﷺ) তাবিজকে শিরক বলেছেন (সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮৩)। কুরআনের আয়াতওয়ালা তাবিজ নিয়ে সাহাবিদের পরবর্তী আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে; তবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো তা থেকে দূরে থাকা এবং নবীজির শেখানো পদ্ধতিতে আয়াত ও দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করা।
এই সপ্তাহের আমল
টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।
নিজেকে যাচাই করুন
আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসূল, শেষ দিন ও তাকদীর (সহিহ মুসলিম ৮)।
ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহ।
"আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব" (সূরা গাফির ৪০:৬০)।