فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ
তাওহীদ, শিরক ও ঈমান ভঙ্গের কারণ
তাওহীদের তিন দিক, ইবাদত কী কী, বড় ও ছোট শিরক, ঈমান ভঙ্গের দশ কারণ আর মুনাফিকির চিহ্ন: কুরআন ও সহিহ হাদিসের দলিলে, সহজ বাংলায়।
তাওহীদ দ্বীনের ভিত্তি, আর শিরক তার সবচেয়ে বড় শত্রু। এই পাতা পড়ার উদ্দেশ্য নিজের ঈমান পরিষ্কার করা, অন্যকে বিচার করা নয়। প্রতিটি কথার পাশে সূত্র ও মান দেওয়া আছে; দলিল হিসেবে শুধু কুরআন এবং সহিহ ও হাসান হাদিস নেওয়া হয়েছে।
তাওহীদ কী: তিনটি দিক
আল্লাহকে এক মানা মানে কী কী
তাওহীদ মানে আল্লাহকে এক মানা: তিনি একাই সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালক, একমাত্র তিনিই ইবাদতের যোগ্য, আর তাঁর নাম ও গুণে কেউ তাঁর মতো নয়। আলেমরা কুরআনের আয়াত থেকে একে তিনটি দিকে ভাগ করে বুঝিয়েছেন। মনে রাখার কথা: প্রথম দিকটা মক্কার মুশরিকরাও মানত, তবু তারা মুসলিম ছিল না; কারণ দ্বিতীয় দিকটা তারা মানেনি।
- রুবূবিয়্যাহ (রব হিসেবে এক): সৃষ্টি, রিযিক, জীবন-মৃত্যু আর সবকিছুর পরিচালনা একমাত্র আল্লাহর হাতে।সূরা ইউনুস ১০:৩১
- মক্কার মুশরিকরাও স্বীকার করত, আসমান-জমিন আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন আর জমিনের মালিক তিনিই; অথচ তারা ইবাদতে অন্যদের শরিক করত।সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৬১ · সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৮৪ · সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৮৫ · সূরা ইউসুফ ১২:১০৬
- উলূহিয়্যাহ (ইবাদতে এক): মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে শুধু আল্লাহর ইবাদতের জন্য; প্রত্যেক নবী এই দাওয়াত নিয়েই এসেছেন।সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬ · সূরা আন-নাহল ১৬:৩৬
- আমরা প্রতি রাকাতে বলি: আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি, শুধু আপনারই সাহায্য চাই।সূরা আল-ফাতিহা ১:৫
- আসমা ওয়াস সিফাত (নাম ও গুণে এক): কোনো কিছুই তাঁর মতো নয়, আর তিনি সব শোনেন, সব দেখেন।সূরা আশ-শূরা ৪২:১১
- বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো, তারা তাঁর ইবাদত করবে আর তাঁর সাথে কিছু শরিক করবে না।সহিহ বুখারী ২৮৫৬সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ৩টি আয়াত
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ۖ فَمِنْهُم مَّنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُم مَّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ ۚ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ
আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর। অতঃপর তাদের কিছু সংখ্যককে আল্লাহ্ হিদায়াত দিয়েছেন, আর তাদের কিছু সংখ্যকের উপর পথভ্রান্তি সাব্যস্ত হয়েছিল; কাজেই তোমরা যমীনে পরিভ্রমন কর অতঃপর দেখে নাও মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম কী হয়েছে?
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ ۖ فَأَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ
আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, 'কে আসমানসমূহ ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন?' তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ্'। তাহলে কোথায় তাদের ফিরানো হচ্ছে !
(মুআয (রা.) বলেন, আমি একটি গাধার পিঠে নবীজির (ﷺ) পেছনে বসে ছিলাম।) তিনি বললেন: হে মুআয, তুমি কি জানো বান্দার উপর আল্লাহর হক কী, আর আল্লাহর উপর বান্দার হক কী? আমি বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো, তারা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কিছুকে শরিক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, যে তাঁর সাথে কিছু শরিক করে না, তিনি তাকে শাস্তি দেবেন না। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, মানুষকে কি এই সুসংবাদ দেব না? তিনি বললেন: না, দিয়ো না, তাহলে তারা এর উপর ভরসা করে (আমল) ছেড়ে দেবে।
ইবাদত কী কী
যা শুধু আল্লাহর জন্য, অন্য কারো জন্য নয়
অনেকে ভাবেন ইবাদত মানে শুধু নামাজ-রোজা। আসলে আল্লাহ যা ভালোবাসেন এমন প্রতিটি কথা ও কাজ, ভেতরের হোক বা বাইরের, ইবাদত। এর কোনো একটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করলেই শিরক হয়। নিচের ইবাদতগুলো সমাজে সবচেয়ে বেশি ভুল জায়গায় যায়।
- দোয়া: নবীজি (ﷺ) বলেছেন, দোয়াই ইবাদত। তাই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে, জীবিত বা মৃত, এমন কিছুর জন্য ডাকা যা শুধু আল্লাহ দিতে পারেন, শিরক।জামে আত-তিরমিযী ২৯৬৯সহিহ · সূরা গাফির ৪০:৬০ · সূরা আল-জিন ৭২:১৮
- সাহায্য চাওয়া ও আশ্রয় চাওয়া: চাইলে আল্লাহর কাছে চাও, সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছে চাও।জামে আত-তিরমিযী ২৫১৬সহিহ · সূরা আল-ফাতিহা ১:৫
- জবাই ও কুরবানি: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে বা সন্তুষ্টির জন্য জবাইকারীকে আল্লাহ লানত করেছেন।সূরা আল-আনআম ৬:১৬২ · সূরা আল-আনআম ৬:১৬৩ · সূরা আল-কাওসার ১০৮:২ · সহিহ মুসলিম ১৯৭৮সহিহ
- মানত: মানত একটি ইবাদত, তাই মাজার বা পীরের নামে মানত শিরক।সূরা আল-ইনসান ৭৬:৭
- ভরসা (তাওয়াক্কুল): মুমিন হলে আল্লাহর উপরই ভরসা করো।সূরা আল-মায়িদা ৫:২৩ · সূরা আত-তালাক ৬৫:৩
- ভালোবাসা, ভয় ও আশা: কেউ কেউ অন্যদের আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে আল্লাহর মতো করে ভালোবাসে; মুমিনদের ভালোবাসা আল্লাহর জন্যই সবচেয়ে গভীর।সূরা আল-বাকারা ২:১৬৫
- আনুগত্য: আল্লাহ যা হারাম করেছেন, কেউ তা হালাল বললে তা মেনে নেওয়াকে কুরআন "রব বানানো" বলেছে।সূরা আত-তাওবা ৯:৩১ · জামে আত-তিরমিযী ৩০৯৫হাসান
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ২টি আয়াত
فِي قَوْلِهِ : (وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ) قَالَ " الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ " . وَقَرَأَ :( وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ) إِلَى قَوْلِهِ ( دَاخِرِينَ
নবীজি (ﷺ) "তোমাদের রব বলেছেন: আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব" আয়াত প্রসঙ্গে বললেন: দোয়াই ইবাদত। তারপর তিনি আয়াতটি পড়লেন।
একদিন আমি (কিশোর বয়সে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পেছনে (একই বাহনে) ছিলাম। তিনি বললেন: হে বালক, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাচ্ছি। আল্লাহর (বিধানের) হেফাজত করো, তিনি তোমার হেফাজত করবেন। আল্লাহর হেফাজত করো, তাঁকে তোমার সামনে পাবে। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাও, সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছে চাও। জেনে রাখো, সব মানুষ মিলে তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে কোনো উপকার করতে পারবে না; আর সবাই মিলে ক্ষতি করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে, আর খাতা শুকিয়ে গেছে।
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
বলুন, ‘আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।’
لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
‘তাঁর কোনো শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।’
لَعَنَ اللَّهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَيْهِ وَلَعَنَ اللَّهُ مَنْ غَيَّرَ الْمَنَارَ
যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে জবাই করে, আল্লাহ তাকে লানত করেন; যে কোনো বিদআতিকে (বা অপরাধীকে) আশ্রয় দেয়, আল্লাহ তাকে লানত করেন; যে নিজের মা-বাবাকে লানত করে, আল্লাহ তাকে লানত করেন; আর যে জমির সীমানার চিহ্ন বদলে দেয়, আল্লাহ তাকে লানত করেন।
বড় শিরক: যা ঈমান নষ্ট করে
সবচেয়ে বড় গুনাহ, তাওবা ছাড়া ক্ষমা নেই
বড় শিরক মানে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত অন্য কারো জন্য করা, বা আল্লাহর নির্দিষ্ট কোনো গুণ অন্য কারো আছে বলে বিশ্বাস করা। এটা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। তবে মৃত্যুর আগে তাওবা করলে আল্লাহ সব ক্ষমা করেন, শিরকও।
- আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করানো, অথচ তিনিই সৃষ্টি করেছেন।সহিহ বুখারী ৪৪৭৭সহিহ · সূরা লুকমান ৩১:১৩
- শিরক নিয়ে মারা গেলে আল্লাহ তা ক্ষমা করেন না; এর চেয়ে ছোট গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।সূরা আন-নিসা ৪:৪৮ · সূরা আন-নিসা ৪:১১৬
- শিরক সব আমল নষ্ট করে দেয়, এমনকি নবীদের সম্পর্কেও আল্লাহ এ কথা বলেছেন।সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৫ · সূরা আল-আনআম ৬:৮৮
- শিরককারীর জন্য জান্নাত হারাম, তার ঠিকানা জাহান্নাম।সূরা আল-মায়িদা ৫:৭২ · সহিহ মুসলিম ৯৩সহিহ
- মৃত মানুষ, পীর, ওলি বা অন্য কাউকে আল্লাহর বদলে ডাকা: তারা শোনে না, শুনলেও সাড়া দিতে পারে না; কিয়ামতের দিন তারা এই শিরক অস্বীকার করবে।সূরা ফাতির ৩৫:১৩ · সূরা ফাতির ৩৫:১৪ · সূরা আল-আহকাফ ৪৬:৫
- "এরা আমাদের আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেবে", মক্কার মুশরিকদের যুক্তিও ঠিক এটাই ছিল।সূরা আয-যুমার ৩৯:৩ · সূরা ইউনুস ১০:১৮
- আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে, এমন বিশ্বাস; তাই গণক-জ্যোতিষীর কাছে ভাগ্য জানতে যাওয়াও বড় অপরাধ।সূরা আন-নামল ২৭:৬৫ · সহিহ মুসলিম ২২৩০সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ৫টি আয়াত
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَىٰ إِثْمًا عَظِيمًا
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে।
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
আর আপনার প্রতি ও আপনার পুর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, 'যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল তো নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।
يُولِجُ اللَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي اللَّيْلِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُّسَمًّى ۚ ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ ۚ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ
তিনি রাতকে দিনে প্রবেশ করান এবং দিনকে প্রবেশ করান রাতে, তিনি সূর্য ও চাঁদকে করেছেন নিয়মাধীন; প্রত্যেকে পরিভ্রমণ করে এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। তিনিই আল্লাহ্ তোমাদের রব। আধিপত্য তাঁরই। আর তোমরা তাঁর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো খেজুর আঁটির আবরণেরও অধিকারী নয়।
إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ ۚ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ
তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না। আর তোমরা তাদেরকে যে শরীক করেছ তা তারা কিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞ আল্লাহর মত কেউই আপনাকে অবহিত করতে পারে না।
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ ۚ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ
জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
আমি নবীজিকে (ﷺ) জিজ্ঞেস করলাম: আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেন: আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করানো, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম: এটা তো সত্যিই বড়। তারপর কোনটি? তিনি বললেন: খাওয়ানোর ভয়ে নিজের সন্তানকে হত্যা করা। আমি বললাম: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা।
أَتَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الْمُوجِبَتَانِ فَقَالَ " مَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ
এক ব্যক্তি নবীজির (ﷺ) কাছে এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, নিশ্চিত করে দেয় এমন দুটি জিনিস কী? তিনি বললেন: যে আল্লাহর সাথে কিছু শরিক না করে মারা যায়, সে জান্নাতে যাবে; আর যে আল্লাহর সাথে কিছু শরিক করে মারা যায়, সে জাহান্নামে যাবে।
ছোট শিরক: যা আমল নষ্ট করে
রিয়া, অন্যের নামে কসম, তাবিজ, কুলক্ষণ
ছোট শিরক মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে না, কিন্তু এটা কবিরা গুনাহের চেয়েও ভয়াবহ, আর যে আমলে মেশে সেটা নষ্ট করে দেয়। এর অনেকগুলো আমাদের মুখে ও অভ্যাসে মিশে গেছে, তাই চিনে রাখা জরুরি।
- রিয়া (লোক দেখানো): আল্লাহ বলেন, যে আমলে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি তাকে ও তার শিরককে ছেড়ে দিই।সহিহ মুসলিম ২৯৮৫সহিহ
- আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে কসম, যেমন "মায়ের কসম", "কাবার কসম", "কুরআন ছুঁয়ে বলছি" বলে কুরআন ছাড়া অন্য কিছুর কসম।জামে আত-তিরমিযী ১৫৩৫সহিহ · সহিহ বুখারী ৬৬৪৬সহিহ
- "আল্লাহ আর আপনি যা চান", "আল্লাহ আর আপনি না থাকলে" বলা; বলতে হবে "আল্লাহ যা চান, তারপর আপনি"।সুনানে আবু দাউদ ৪৯৮০সহিহ
- সুরক্ষার জন্য তাবিজ, সুতা, কড়ি ঝোলানো আর শিরকি ঝাড়ফুঁক। কেউ যদি বিশ্বাস করে তাবিজ নিজেই রক্ষা করে, তা বড় শিরক।সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮৩সহিহ
- কুলক্ষণ মানা: পেঁচার ডাক, হাঁচি, খালি কলস বা কোনো দিন-মাসকে অশুভ ভাবা। মনে ভাব এলে আল্লাহর উপর ভরসা করে কাজে এগিয়ে যান।সুনানে আবু দাউদ ৩৯১০সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ৪টি হাদিস
قَالَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ
আল্লাহ তাআলা বলেন: আমি শরিকদের শরিকানা থেকে সবচেয়ে বেশি অমুখাপেক্ষী। যে কেউ কোনো আমল করে এবং তাতে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি তাকে ও তার শিরককে ছেড়ে দিই।
سَمِعَ رَجُلاً، يَقُولُ لاَ وَالْكَعْبَةِ . فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ لاَ يُحْلَفُ بِغَيْرِ اللَّهِ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ
ইবনু উমর (রা.) এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন: "না, কাবার কসম।" তিনি বললেন: আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে কসম করা যায় না, কারণ আমি রাসূলুল্লাহকে (ﷺ) বলতে শুনেছি: যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে কসম করল, সে কুফরি বা শিরক করল।
لاَ تَقُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ وَشَاءَ فُلاَنٌ وَلَكِنْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ فُلاَنٌ
তোমরা বলো না: "আল্লাহ যা চান আর অমুক যা চায়।" বরং বলো: "আল্লাহ যা চান, তারপর অমুক যা চায়।"
الطِّيَرَةُ شِرْكٌ الطِّيَرَةُ شِرْكٌ " . ثَلاَثًا " وَمَا مِنَّا إِلاَّ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكُّلِ
কুলক্ষণ মানা (কোনো কিছু দেখে অশুভ ভাবা) শিরক, কুলক্ষণ মানা শিরক; তিনি এটা তিনবার বললেন। (ইবনু মাসঊদ বলেন:) আমাদের প্রত্যেকের মনেই এমন ভাব আসে, কিন্তু আল্লাহ তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে তা দূর করে দেন।
- কসম করতে হলে শুধু "আল্লাহর কসম" বলা, নয়তো চুপ থাকা (সহিহ বুখারী ৬৬৪৬)
ঈমান ভঙ্গের কারণ
যে কাজে মুসলিম ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়
অজু যেমন কিছু কারণে ভেঙে যায়, ঈমানও তেমনি কিছু কথা, কাজ বা বিশ্বাসে নষ্ট হয়। আলেমরা কুরআন-সুন্নাহ থেকে এগুলো একত্র করেছেন; শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল ওয়াহহাবের "নাওয়াকিদুল ইসলাম" পুস্তিকায় দশটি কারণ একসাথে আছে, যা পূর্ববর্তী ফকিহদের "মুরতাদের বিধান" অধ্যায় থেকে নেওয়া। এই তালিকা নিজেকে বাঁচানোর জন্য, অন্যকে কাফির বলার জন্য নয়; নিচের সাবধানতার বাক্সটি অবশ্যই পড়ুন।
- আল্লাহর ইবাদতে শিরক করা।সূরা আন-নিসা ৪:৪৮ · সূরা আল-মায়িদা ৫:৭২
- নিজের ও আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতাকারী বানিয়ে তাদের ডাকা, তাদের কাছে সুপারিশ চাওয়া ও তাদের উপর ভরসা করা।সূরা আয-যুমার ৩৯:৩ · সূরা ইউনুস ১০:১৮
- মুশরিকদের কাফির মনে না করা, তাদের কুফরে সন্দেহ করা বা তাদের ধর্মকে সঠিক মনে করা।সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫
- নবীজির (ﷺ) আদর্শের চেয়ে অন্য কারো আদর্শ বা বিধানকে উত্তম মনে করা।সূরা আন-নিসা ৪:৬৫
- রাসূলের (ﷺ) আনা কোনো বিধানকে ঘৃণা করা, যদিও সে নিজে তা পালন করে।সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৯
- আল্লাহর দ্বীনের কোনো বিষয়, তাঁর পুরস্কার বা শাস্তি নিয়ে ঠাট্টা করা।সূরা আত-তাওবা ৯:৬৫ · সূরা আত-তাওবা ৯:৬৬
- জাদু করা বা জাদুতে সন্তুষ্ট থাকা।সূরা আল-বাকারা ২:১০২
- মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য ও সমর্থন করা।সূরা আল-মায়িদা ৫:৫১
- মনে করা যে কেউ কেউ মুহাম্মাদের (ﷺ) শরিয়ত থেকে বের হয়ে চলার অধিকার রাখে।সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫
- আল্লাহর দ্বীন থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেওয়া: তা শেখেও না, মানেও না।সূরা আস-সাজদা ৩২:২২
সাবধানতা: কাউকে কাফির বলা আমাদের কাজ নয়
- উপরের কাজগুলো কুফর, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো মানুষ কাফির কিনা, তা ঠিক করতে দেখতে হয় সে জেনে বুঝে করেছে কিনা, তাকে বাধ্য করা হয়েছিল কিনা, ভুল বুঝে বা অজ্ঞতায় করেছে কিনা। এই বিচার আলেম ও বিচারকের কাজ।
- কাউকে জোর করে কুফরি কথা বলানো হলে, অথচ তার অন্তর ঈমানে অটল, সে কাফির নয় (সূরা আন-নাহল ১৬:১০৬)।
- কেউ ভাইকে "কাফির" বললে, কথাটি দুজনের একজনের উপর ফিরে আসে (সহিহ বুখারী ৬১০৪)। তাই নিজের ঈমান পাহারা দিন, অন্যের ঈমানের বিচারক হবেন না।
পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ৩টি আয়াত
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
আর আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করলে অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেলা-তামাশা করছিলাম।‘ বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে?’
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ ۚ إِن نَّعْفُ عَن طَائِفَةٍ مِّنكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ
‘তোমরা ওজর পেশ করো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ। আমরা তোমাদের মধ্যে কোনো দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দেব---কারণ তারা অপরাধী।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
مَن كَفَرَ بِاللَّهِ مِن بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَـٰكِن مَّن شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
কেউ তার ঈমান আনার পর আল্লাহ্র সাথে কুফরী করলে এবং কুফরীর জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আপতিত হবে আল্লাহ্র গযব এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরীর জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচলিত।
أَيُّمَا رَجُلٍ قَالَ لأَخِيهِ يَا كَافِرُ. فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا
কেউ তার ভাইকে "হে কাফির" বললে, এ কথা দুজনের একজনের উপর অবশ্যই ফিরে আসে।
মুনাফিকি: ভেতরে এক, বাইরে আরেক
বিশ্বাসের মুনাফিকি আর কাজের মুনাফিকি
বিশ্বাসের মুনাফিকি হলো মুখে ইসলাম আর অন্তরে অস্বীকার; এর শাস্তি জাহান্নামের সবচেয়ে নিচের স্তর। কাজের মুনাফিকি হলো মুনাফিকদের স্বভাব নিজের মধ্যে থাকা, যেমন মিথ্যা ও খেয়ানত; এটা ঈমান থেকে বের করে না, কিন্তু বড় গুনাহ এবং বড় মুনাফিকির দিকে টেনে নেয়। সাহাবিরা নিজেদের মধ্যে এই স্বভাব আছে কিনা, তা নিয়ে ভয় করতেন।
- মুনাফিকরা নবীজির (ﷺ) কাছে এসে সাক্ষ্য দিত, অথচ আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন তারা মিথ্যাবাদী।সূরা আল-মুনাফিকূন ৬৩:১
- মুনাফিকরা থাকবে জাহান্নামের সবচেয়ে নিচের স্তরে।সূরা আন-নিসা ৪:১৪৫
- মুনাফিকের তিন চিহ্ন: কথা বললে মিথ্যা, ওয়াদা করলে ভঙ্গ, আমানতে খেয়ানত।সহিহ বুখারী ৩৩সহিহ
- চারটি স্বভাব একসাথে থাকলে খাঁটি মুনাফিক; একটি থাকলেও মুনাফিকির একটি স্বভাব থাকে, যতক্ষণ না সে তা ছাড়ে।সহিহ বুখারী ৩৪সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ১টি আয়াত
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلاَثٌ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আর আমানত রাখলে খেয়ানত করে।
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে, সে খাঁটি মুনাফিক। আর যার মধ্যে এর একটি থাকবে, তার মধ্যে মুনাফিকির একটি স্বভাব থাকবে, যতক্ষণ না সে তা ছেড়ে দেয়: আমানত রাখলে খেয়ানত করে, কথা বললে মিথ্যা বলে, চুক্তি করলে ভঙ্গ করে, আর ঝগড়া করলে গালিগালাজ করে।
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا
মুনাফিকরা তো জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে থাকবে এবং তাদের জন্য আপনি কখনো কোনো সহায় পাবেন না।
- আজ থেকে মিথ্যা, ওয়াদা ভঙ্গ ও খেয়ানত ছাড়ার প্রতিজ্ঞা (সহিহ বুখারী ৩৪)
শিরক থেকে বাঁচার উপায়
জানা, ছাড়া, আর আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া
ইবরাহীম (আ.), যিনি নিজ হাতে মূর্তি ভেঙেছিলেন, তিনিও দোয়া করতেন আল্লাহ যেন তাঁকে ও তাঁর সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখেন (সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৫)। আমরা নিজেদের নিরাপদ ভাবব কীভাবে?
| উপায় | কেন | সূত্র |
|---|---|---|
| কালিমার অর্থ বুঝে বারবার পড়া | সবচেয়ে উত্তম যিকির "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" | জামে আত-তিরমিযী ৩৩৮৩হাসান |
| কুরআন অর্থসহ পড়া, বিশেষ করে নবীদের দাওয়াতের ঘটনা | প্রত্যেক নবীর দাওয়াত ছিল তাওহীদ | সূরা আন-নাহল ১৬:৩৬ |
| দোয়া, মানত, জবাই শুধু আল্লাহর জন্য রাখা | এগুলো ইবাদত; অন্যের জন্য করলে শিরক | সূরা আল-আনআম ৬:১৬২ |
| তাবিজ-সুতা খুলে ফেলা, সুন্নাহর রুকইয়া করা | শিরকি ঝাড়ফুঁক ও তাবিজ শিরক | সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮৩সহিহ |
| গণক, জ্যোতিষী, রাশিফল এড়িয়ে চলা | চল্লিশ রাতের নামাজ কবুল হয় না | সহিহ মুসলিম ২২৩০সহিহ |
| আমলের আগে নিয়ত ঠিক করা, গোপন আমল বাড়ানো | লোক দেখানো আমল আল্লাহ ছেড়ে দেন | সহিহ মুসলিম ২৯৮৫সহিহ |
| শুধু আল্লাহর নামে কসম করা | অন্যের নামে কসম ছোট শিরক | জামে আত-তিরমিযী ১৫৩৫সহিহ |
| কুলক্ষণের ভাব এলে তাওয়াক্কুল করে এগিয়ে যাওয়া | আল্লাহ তাওয়াক্কুল দিয়ে তা দূর করেন | সুনানে আবু দাউদ ৩৯১০সহিহ |
তাওহীদের উপর অটল থাকার দোয়া
ঈমান আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নিয়ামত; তা ধরে রাখার জন্যও তাঁর কাছেই চাইতে হয়।
হে আমার রব, এই শহরকে নিরাপদ করুন, আর আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন।
সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৫কুরআনহে আমাদের রব, সঠিক পথ দেখানোর পর আমাদের অন্তরকে বাঁকা করে দেবেন না, আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দিন; নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।
সূরা আলে ইমরান ৩:৮কুরআনপ্রচলিত কিন্তু সহিহ নয়
তাওহীদ আর শিরক নিয়ে সমাজে যে কথাগুলো বেশি শোনা যায়, তার সাথে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক কথা।
ভুল ধারণা "পীর বা ওলির কাছে চাই না, শুধু বলি আল্লাহর কাছে আমার কথা পৌঁছে দিন; এটা শিরক নয়, ওসিলা"
মক্কার মুশরিকরাও ঠিক এ কথাই বলত: "আমরা তো এদের ইবাদত করি শুধু এজন্য যে, এরা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে" (সূরা আয-যুমার ৩৯:৩), "এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী" (সূরা ইউনুস ১০:১৮)। আল্লাহ এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সহিহ ওসিলা হলো আল্লাহর নাম ও গুণ, নিজের নেক আমল, বা জীবিত নেক মানুষের দোয়া চাওয়া; মৃত মানুষকে ডাকা বা তাদের কাছে চাওয়া নয়। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, তিনি নিকটে, ডাকলে সাড়া দেন (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৬)।
ভুল ধারণা "নিয়ত ভালো থাকলে তাবিজ ঝোলাতে দোষ নেই, ভেতরে তো কুরআনের আয়াত"
নবীজি (ﷺ) তাবিজকে শিরকের মধ্যে গণ্য করেছেন (সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮৩), আর কোনো ব্যতিক্রম বলেননি। কুরআনের আয়াত লেখা তাবিজ নিয়ে সালাফের মধ্যে মতভেদ ছিল, তবে ইবনু মাসঊদ (রা.) ও তাঁর ছাত্রসহ অনেকে তা-ও অপছন্দ করতেন; আর এর আড়ালে শিরকি তাবিজ ঢুকে পড়ে, কুরআনের অসম্মানও হয়। সুন্নাহ পদ্ধতি হলো আয়াত ও দোয়া পড়ে ফুঁ দেওয়া (রুকইয়া)। বিস্তারিত: প্রচলিত ভুল।
সাবধান "অমুক মাজারে যায়, তাই সে কাফির"
কাজটি শিরক হতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট মানুষটির ব্যাপারে রায় দেওয়ার আগে দেখতে হয় সে জানে কিনা, ভুল বুঝে করছে কিনা। সাধারণ মানুষের কাজ হলো নম্রভাবে দলিলসহ বোঝানো, গালি দেওয়া বা কাফির বলা নয় (সহিহ বুখারী ৬১০৪)। নবীজি (ﷺ) কোমলতা ভালোবাসতেন, আর আল্লাহ কোমলতায় যা দেন, কঠোরতায় তা দেন না (সহিহ মুসলিম ২৫৯৩)।
ভুল ধারণা "কালিমা পড়েছি, এখন যা-ই বলি বা করি, ঈমান যাবে না"
কালিমা পড়া মানুষও কুফরি কথা বা কাজে ঈমান হারাতে পারে। তাবুকের সফরে কিছু লোক ঠাট্টা করে বলেছিল, "আমরা তো মজা করছিলাম"; আল্লাহ বললেন: অজুহাত দিয়ো না, ঈমান আনার পর তোমরা কুফরি করেছ (সূরা আত-তাওবা ৯:৬৫, সূরা আত-তাওবা ৯:৬৬)। আর নবীদের সম্পর্কেও আল্লাহ বলেছেন, শিরক করলে সব আমল নষ্ট হবে (সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৫)। তাই ঈমানকে হালকাভাবে নেবেন না।
ভুল ধারণা "শুধু মূর্তিপূজাই শিরক"
মূর্তিপূজা শিরকের একটা রূপ মাত্র। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকা (সূরা আল-জিন ৭২:১৮), অন্যের নামে জবাই (সহিহ মুসলিম ১৯৭৮), গায়েব জানার দাবি মানা (সূরা আন-নামল ২৭:৬৫), আল্লাহর হারামকে কারো কথায় হালাল মানা (সূরা আত-তাওবা ৯:৩১), এমনকি লোক দেখানো আমলও (সহিহ মুসলিম ২৯৮৫) শিরকের মধ্যে পড়ে।
ভুল ধারণা "রাশিফল দেখা তো শুধু মজা, বিশ্বাস করি না"
গণক বা ভাগ্য বলে দাবিকারীর কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেই চল্লিশ রাত নামাজ কবুল হয় না, বিশ্বাস না করলেও (সহিহ মুসলিম ২২৩০)। গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহর (সূরা আন-নামল ২৭:৬৫)। তাই "মজা করে" দেখাও এড়িয়ে চলুন।
শেষ কথা: যত বড় ভুলই হোক, ফেরার পথ খোলা
কেউ যদি বুঝতে পারেন, আগে না জেনে শিরকি কাজ করেছেন, হতাশ হবেন না। আল্লাহ শিরককারীকেও ডেকে বলেছেন, তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)। আজই তাওবা করুন, তাবিজ-সুতা খুলে ফেলুন, আর শুধু আল্লাহকে ডাকুন।
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ---আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُولَـٰئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে যুলুম (শির্ক) দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।
لَمَّا نَزَلَتِ {الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ} قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَيُّنَا لَمْ يَظْلِمْ فَأَنْزَلَ اللَّهُ {إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
যখন নাজিল হলো: "যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে জুলুমের সাথে মিশিয়ে ফেলেনি…", তখন রাসূলুল্লাহর (ﷺ) সাহাবিরা বললেন: আমাদের মধ্যে কে আছে যে জুলুম করেনি? তখন আল্লাহ নাজিল করলেন: "নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।"