deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ

নবীজির (ﷺ) শামায়েল

সাহাবিদের চোখে নবীজির (ﷺ) চেহারা ও গড়ন, কুরআনের মতো চরিত্র, মানুষের সাথে ব্যবহার, ঘরের জীবন, ইবাদত আর সাদাসিধে জীবন: শুধু সহিহ ও হাসান বর্ণনায়।

১২ আয়াত২৮ হাদিস৭ অধ্যায়

"শামায়েল" মানে স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য। যাঁকে ভালোবাসি, তাঁকে চিনতে চাওয়াই স্বাভাবিক। এই পাতায় নবীজির (ﷺ) চেহারা, চরিত্র আর দৈনন্দিন অভ্যাসের কথা শুধু সহিহ ও হাসান বর্ণনা থেকে; প্রতিটির পাশে সূত্র ও মান দেওয়া আছে।

১

চেহারা ও গড়ন

সাহাবিদের চোখে দেখা নবীজি (ﷺ)

আমরা নবীজিকে (ﷺ) দেখিনি, কিন্তু যাঁরা দেখেছেন তাঁরা এত যত্ন করে বর্ণনা দিয়ে গেছেন, যেন আমরাও তাঁকে চিনতে পারি। ইসলামে তাঁর ছবি আঁকা বা মূর্তি বানানো হয় না; তাঁকে চেনার পথ এই সহিহ বর্ণনাগুলো।

  • তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চেহারার আর সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের; খুব লম্বাও নন, বেঁটেও নন।সহিহ বুখারী ৩৫৪৯সহিহ
  • মাঝারি গড়ন, উজ্জ্বল গায়ের রং (ফ্যাকাশে সাদাও নন, গাঢ় বাদামিও নন), চুল খুব কোঁকড়াও নয়, একেবারে সোজাও নয়; জীবনের শেষে মাথা ও দাড়ি মিলিয়ে বিশটি সাদা চুলও ছিল না।সহিহ বুখারী ৩৫৪৭সহিহ
  • দুই কাঁধের মাঝে চওড়া, চুল কানের লতি থেকে কাঁধ পর্যন্ত; বারা (রা.) বলেছেন, তাঁর চেয়ে সুন্দর কিছু আমি কখনো দেখিনি।সহিহ বুখারী ৩৫৫১সহিহ
  • তাঁর চেহারা তলোয়ারের মতো লম্বাটে নয়, বরং চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও গোলগাল।সহিহ বুখারী ৩৫৫২সহিহ
  • তাঁর হাত ছিল রেশমের চেয়েও নরম, আর তাঁর ঘ্রাণের চেয়ে সুন্দর ঘ্রাণ আনাস (রা.) কখনো পাননি।সহিহ বুখারী ৩৫৬১সহিহ
  • দুই কাঁধের মাঝে ছিল নবুয়তের মোহর।সহিহ বুখারী ৩৫৪১সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ৪টি হাদিস

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَحْسَنَ النَّاسِ وَجْهًا وَأَحْسَنَهُ خَلْقًا، لَيْسَ بِالطَّوِيلِ الْبَائِنِ وَلاَ بِالْقَصِيرِ‏

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চেহারার আর সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের; খুব লম্বাও নন, বেঁটেও নন।

সহিহ বুখারী ৩৫৪৯সহিহবর্ণনাকারী: বারা ইবনু আযিব (রা.)

তিনি ছিলেন মাঝারি গড়নের, খুব লম্বাও নন, বেঁটেও নন; উজ্জ্বল গায়ের রং, ফ্যাকাশে সাদাও নন, গাঢ় বাদামিও নন; চুল খুব কোঁকড়াও নয়, একেবারে সোজাও নয়। চল্লিশ বছর বয়সে তাঁর উপর ওহী নাজিল হয়; মক্কায় দশ বছর আর মদিনায় দশ বছর থাকেন। তাঁর মাথা ও দাড়িতে বিশটি সাদা চুলও ছিল না। (বর্ণনাকারী) রাবীআ বলেন: আমি তাঁর একটি চুল দেখেছি, তা লালচে; জিজ্ঞেস করলে বলা হলো, সুগন্ধির কারণে লালচে হয়েছে।

সহিহ বুখারী ৩৫৪৭সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

سُئِلَ الْبَرَاءُ أَكَانَ وَجْهُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مِثْلَ السَّيْفِ قَالَ لاَ بَلْ مِثْلَ الْقَمَرِ‏

বারাকে (রা.) জিজ্ঞেস করা হলো: নবীজির (ﷺ) চেহারা কি তলোয়ারের মতো (চকচকে ও লম্বাটে) ছিল? তিনি বললেন: না, বরং চাঁদের মতো (গোলগাল ও উজ্জ্বল)।

সহিহ বুখারী ৩৫৫২সহিহবর্ণনাকারী: বারা ইবনু আযিব (রা.)

مَا مَسِسْتُ حَرِيرًا وَلاَ دِيبَاجًا أَلْيَنَ مِنْ كَفِّ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، وَلاَ شَمِمْتُ رِيحًا قَطُّ أَوْ عَرْفًا قَطُّ أَطْيَبَ مِنْ رِيحِ أَوْ عَرْفِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم‏

নবীজির (ﷺ) হাতের তালুর চেয়ে নরম কোনো রেশম বা মখমল আমি ছুঁইনি, আর নবীজির (ﷺ) ঘ্রাণের চেয়ে সুন্দর কোনো ঘ্রাণ কখনো শুঁকিনি।

সহিহ বুখারী ৩৫৬১সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)
২

চরিত্র: চলমান কুরআন

আল্লাহ নিজে যে চরিত্রের প্রশংসা করেছেন

নবীজির (ﷺ) চরিত্র জানতে চাইলে আয়েশা (রা.) এক বাক্যে উত্তর দিয়েছিলেন: তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন। কুরআনে যা পড়ি, তিনি তা-ই হয়ে চলতেন।

পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ

আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন ।

أَنْبِئِينِي عَنْ خُلُقِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏ قَالَتْ أَلَسْتَ تَقْرَأُ الْقُرْآنَ قُلْتُ بَلَى ‏.‏ قَالَتْ فَإِنَّ خُلُقَ نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ الْقُرْآنَ

(সাদ ইবনু হিশাম বলেন) আমি বললাম: হে উম্মুল মুমিনীন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চরিত্র সম্পর্কে আমাকে বলুন। তিনি বললেন: তুমি কি কুরআন পড়ো না? বললাম: অবশ্যই পড়ি। তিনি বললেন: আল্লাহর নবী (ﷺ)-এর চরিত্র ছিল কুরআন।

সহিহ মুসলিম ৭৪৬সহিহবর্ণনাকারী: সাদ ইবনু হিশাম, আয়েশা (রা.) থেকে

রাসূলুল্লাহকে (ﷺ) যখনই দুটি কাজের মধ্যে বেছে নিতে বলা হতো, তিনি সহজটাই নিতেন, যদি তা গুনাহ না হয়; গুনাহ হলে তিনি তা থেকে সবচেয়ে দূরে থাকতেন। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনো নিজের জন্য প্রতিশোধ নেননি; তবে আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করা হলে আল্লাহর জন্য শাস্তি দিতেন।

সহিহ বুখারী ৩৫৬০সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ হাতে কখনো কাউকে মারেননি, না কোনো নারীকে, না কোনো খাদেমকে; শুধু আল্লাহর পথে জিহাদের ময়দান ছাড়া। আর কেউ তাঁর সাথে অন্যায় করলে তিনি নিজের জন্য প্রতিশোধ নেননি; তবে আল্লাহর নিষিদ্ধ সীমা লঙ্ঘন হলে আল্লাহর জন্য ব্যবস্থা নিতেন।

সহিহ মুসলিম ২৩২৮সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)
৩

মানুষের সাথে ব্যবহার

খাদেম, শিশু, অভাবী সবার সাথে

নবীজির (ﷺ) কোমলতাই মানুষকে তাঁর কাছে টেনেছে। আল্লাহ বলেছেন, তিনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর কাছ থেকে সরে যেত (সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯)।

  • আনাস (রা.) দশ বছর তাঁর খেদমত করেছেন; তিনি কখনো "উফ" বলেননি, "কেন করলে" বা "কেন করলে না" বলেননি।সহিহ বুখারী ৬০৩৮সহিহ
  • তাঁর কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো "না" বলেননি।সহিহ বুখারী ৬০৩৪সহিহ
  • তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, রমজানে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি।সহিহ বুখারী ৩৫৫৪সহিহ
  • নাতি হাসানকে (রা.) চুমু দিতে দেখে এক বেদুইন অবাক হলে বললেন: যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।সহিহ বুখারী ৫৯৯৭সহিহ
  • সাহাবিদের শিখিয়েছেন: সহজ করো, কঠিন কোরো না; মানুষকে শান্তি দাও, দূরে ঠেলে দিয়ো না।সহিহ বুখারী ৬১২৫সহিহ
  • আল্লাহর রহমতে তিনি কোমল ছিলেন; রূঢ় হলে মানুষ তাঁর কাছ থেকে সরে যেত।সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত

خَدَمْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي أُفٍّ‏.‏ وَلاَ لِمَ صَنَعْتَ وَلاَ أَلاَّ صَنَعْتَ‏

আমি দশ বছর নবীজির (ﷺ) খেদমত করেছি; তিনি কখনো আমাকে "উফ" বলেননি, "এটা কেন করলে" বা "এটা কেন করলে না" তাও বলেননি।

সহিহ বুখারী ৬০৩৮সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

مَا سُئِلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنْ شَىْءٍ قَطُّ فَقَالَ لاَ‏

নবীজির (ﷺ) কাছে কখনো কিছু চাওয়া হলে তিনি "না" বলেননি।

সহিহ বুখারী ৬০৩৪সহিহবর্ণনাকারী: জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.)

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাসান ইবনু আলী (রা.)-কে চুমু খেলেন। তখন আকরা ইবনু হাবিস পাশে বসা ছিলেন। তিনি বললেন: আমার দশটি সন্তান, আমি কাউকে কখনো চুমু খাইনি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার দিকে তাকিয়ে বললেন: যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।

সহিহ বুখারী ৫৯৯৭সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ۖ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ

আল্লাহ্‌র দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন; যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। কাজেই আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, তারপর আপনি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহ্‌র উপর নির্ভর করবেন; নিশ্চয় আল্লাহ (তার উপর) নির্ভরকারীদের ভালবাসেন।

৪

ঘরে ও দৈনন্দিন জীবনে

খাওয়া, কথা, হাসি আর সংসারের কাজ

নবীজি (ﷺ) মসজিদে যেমন ছিলেন, ঘরেও তেমন সহজ মানুষ। ঘরের কাজে হাত লাগাতেন, খাবার নিয়ে অভিযোগ করতেন না, আর মুখে থাকত মুচকি হাসি।

পুরো দলিল পড়ুন ৪টি হাদিস

سَأَلْتُ عَائِشَةَ مَا كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ قَالَتْ كَانَ يَكُونُ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ ـ تَعْنِي خِدْمَةَ أَهْلِهِ ـ فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلاَةُ خَرَجَ إِلَى الصَّلاَةِ‏

আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী (ﷺ) ঘরে কী করতেন? তিনি বললেন: তিনি ঘরের কাজে পরিবারের সাহায্য করতেন; আর নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য বেরিয়ে যেতেন।

সহিহ বুখারী ৬৭৬সহিহবর্ণনাকারী: আসওয়াদ (রহ.), আয়েশা (রা.) থেকে

مَا عَابَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم طَعَامًا قَطُّ، إِنِ اشْتَهَاهُ أَكَلَهُ، وَإِنْ كَرِهَهُ تَرَكَهُ‏

নবীজি (ﷺ) কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরেননি; ভালো লাগলে খেতেন, ভালো না লাগলে রেখে দিতেন।

সহিহ বুখারী ৫৪০৯সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم مُسْتَجْمِعًا قَطُّ ضَاحِكًا حَتَّى أَرَى مِنْهُ لَهَوَاتِهِ، إِنَّمَا كَانَ يَتَبَسَّمُ‏

আমি কখনো নবীজিকে (ﷺ) এমনভাবে হাসতে দেখিনি যে তাঁর আলজিভ দেখা যায়; তিনি মুচকি হাসতেন।

সহিহ বুখারী ৬০৯২সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُحَدِّثُ حَدِيثًا لَوْ عَدَّهُ الْعَادُّ لأَحْصَاهُ‏

নবীজি (ﷺ) এমনভাবে কথা বলতেন যে কেউ গুনতে চাইলে তাঁর শব্দগুলো গুনে ফেলতে পারত।

সহিহ বুখারী ৩৫৬৭সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)
৫

ইবাদতে নবীজি (ﷺ)

আগে-পরের গুনাহ মাফ, তবু রাত জেগে নামাজ

আল্লাহ তাঁর আগে-পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছিলেন (সূরা আল-ফাতহ ৪৮:২), তবু তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি ইবাদতকারী। তাঁর ইবাদত ভয়ের চেয়েও বেশি ছিল ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার।

পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ২টি আয়াত

إِنْ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لَيَقُومُ لِيُصَلِّيَ حَتَّى تَرِمُ قَدَمَاهُ أَوْ سَاقَاهُ، فَيُقَالُ لَهُ فَيَقُولُ ‏ "‏ أَفَلاَ أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا

নবীজি (ﷺ) রাতে এত দীর্ঘ নামাজ পড়তেন যে তাঁর পা বা পায়ের গোছা ফুলে যেত। তাঁকে (কারণ) জিজ্ঞেস করা হলে বলতেন: আমি কি শুকরগুজার বান্দা হব না?

সহিহ বুখারী ১১৩০সহিহবর্ণনাকারী: মুগীরা ইবনু শু’বা (রা.)

أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا

অথবা তার চেয়েও একটু বাড়ান। আর কুরআন তিলাওয়াত করুন ধীরে ধীরে সুস্পষ্টভাবে;

لِّيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُّسْتَقِيمًا

যেন আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং আপনার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন। আর আপনাকে সরল পথের হেদায়াত দেন

৬

সাদাসিধে জীবন

পুরো আরবের নেতা, তবু খেজুর আর পানি

মদিনার শেষ দিকে নবীজি (ﷺ) ছিলেন প্রায় পুরো আরবের শাসক, তাঁর হাত দিয়ে অনেক সম্পদ এসেছে। কিন্তু নিজের ঘরে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সবচেয়ে সাদাসিধে জীবন।

  • দুই মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখা যেত, অথচ তাঁর ঘরগুলোতে চুলা জ্বলত না; খাবার ছিল খেজুর আর পানি।সহিহ বুখারী ৬৪৫৯সহিহ
  • তাঁর বিছানা ছিল চামড়ার, ভেতরে খেজুর গাছের ছাল।সহিহ বুখারী ৬৪৫৬সহিহ
  • মদিনায় আসার পর থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর পরিবার একটানা তিন রাত পেট ভরে গমের রুটি খায়নি।সহিহ বুখারী ৫৪১৬সহিহ
  • আল্লাহ তাঁকে বলেছিলেন, অন্যদের দুনিয়ার চাকচিক্যের দিকে চোখ না দিতে; রবের দেওয়া রিযিকই উত্তম ও স্থায়ী।সূরা ত্বা-হা ২০:১৩১
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত

(আয়েশা (রা.) ভাগ্নে উরওয়াকে বললেন:) আমরা দুই মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম, অথচ রাসূলুল্লাহর (ﷺ) ঘরগুলোতে চুলা জ্বলত না। উরওয়া বললেন: তাহলে কী খেয়ে বাঁচতেন? তিনি বললেন: দুই কালো জিনিস, খেজুর আর পানি। তবে রাসূলুল্লাহর (ﷺ) কিছু আনসারি প্রতিবেশীর দুধেল পশু ছিল; তারা নিজেদের ঘর থেকে তাঁকে দুধ পাঠাত, আর তিনি আমাদের তা পান করাতেন।

সহিহ বুখারী ৬৪৫৯সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

كَانَ فِرَاشُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ أَدَمٍ، وَحَشْوُهُ مِنْ لِيفٍ‏

রাসূলুল্লাহর (ﷺ) বিছানা ছিল চামড়ার, যার ভেতরে ভরা ছিল খেজুর গাছের ছাল।

সহিহ বুখারী ৬৪৫৬সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

مَا شَبِعَ آلُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم مُنْذُ قَدِمَ الْمَدِينَةَ مِنْ طَعَامِ الْبُرِّ ثَلاَثَ لَيَالٍ تِبَاعًا، حَتَّى قُبِضَ‏

মদিনায় আসার পর থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত মুহাম্মাদের (ﷺ) পরিবার একটানা তিন রাত পেট ভরে গমের খাবার খায়নি।

সহিহ বুখারী ৫৪১৬সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَىٰ مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ ۚ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ

আর আপনি আপনার দু’চোখ কখনো প্রসারিত করবেন না সে সবের প্রতি, যা আমরা বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্যসরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি, তা দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। আর আপনার রবের দোয়া রিযিকই সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।

অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।

৭

তাঁকে ভালোবাসার পথ

অনুসরণ, দরূদ আর বাড়াবাড়ি থেকে দূরে থাকা

নবীজিকে (ﷺ) ভালোবাসা ঈমানের শর্ত। কিন্তু সেই ভালোবাসার প্রমাণ মুখের দাবি নয়, তাঁর সুন্নাহ মানা; আর ভালোবাসার নামে তাঁকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করাও নিষেধ।

  • তোমাদের কেউ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে বাবা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে প্রিয় হই।সহিহ বুখারী ১৫সহিহ
  • বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।সূরা আলে ইমরান ৩:৩১
  • তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।সূরা আল-আহযাব ৩৩:২১
  • আল্লাহ ও ফেরেশতারা নবীর উপর দরূদ পাঠান; হে মুমিনরা, তোমরাও দরূদ ও সালাম পাঠাও। একবার দরূদে আল্লাহ দশটি রহমত দেন।সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৬ · সহিহ মুসলিম ৪০৮সহিহ
  • তিনি বলেছেন: নাসারারা যেমন ইবনু মারইয়ামের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে, আমার প্রশংসায় তেমন বাড়াবাড়ি কোরো না; বলো, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।সহিহ বুখারী ৩৪৪৫সহিহ
  • আল্লাহ তাঁকে বলতে বলেছেন: আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার কাছে ওহী আসে।সূরা আল-কাহফ ১৮:১১০
পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ২টি আয়াত

لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

তোমাদের কেউ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার বাবা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।

সহিহ বুখারী ১৫সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্‌ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দোআ-ইসতেগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর উপর সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।

لاَ تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ

নাসারারা যেভাবে মারইয়ামের ছেলে (ঈসা)-এর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা আমার প্রশংসায় সেভাবে বাড়াবাড়ি কোরো না। আমি তো শুধু তাঁর (আল্লাহর) বান্দা; তাই বলো: আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।

সহিহ বুখারী ৩৪৪৫সহিহবর্ণনাকারী: উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.)

আজ থেকে যে সুন্নাহগুলো

শামায়েল পড়ার উদ্দেশ্য, জীবনে আনা

সুন্নাহকীভাবেসূত্র
মুচকি হাসিপরিবার, সহকর্মী আর অচেনা মানুষের সাথেও হাসিমুখে কথাজামে আত-তিরমিযী ৩৬৪১সহিহ
খাবারের দোষ না ধরাপছন্দ না হলে চুপচাপ রেখে দেওয়া, রাঁধুনিকে কষ্ট না দেওয়াসহিহ বুখারী ৫৪০৯সহিহ
ঘরের কাজে হাত লাগানোনিজের কাপড়, থালা-বাসন, ঘরের ছোট কাজ নিজে করাসহিহ বুখারী ৬৭৬সহিহ
থেমে থেমে স্পষ্ট কথাতাড়াহুড়া না করে, জরুরি কথা প্রয়োজনে তিনবারসহিহ বুখারী ৩৫৬৭সহিহ
সহজটা বেছে নেওয়ানিজের ও অন্যের জন্য গুনাহমুক্ত সহজ পথসহিহ বুখারী ৩৫৬০সহিহ
খাদেম ও অধীনদের প্রতি কোমলতা"কেন করলে না" বলে খোঁটা না দেওয়াসহিহ বুখারী ৬০৩৮সহিহ
দরূদ পাঠপ্রতিদিন, বিশেষ করে জুমার দিনে বেশি করেসহিহ মুসলিম ৪০৮সহিহ

প্রচলিত কিন্তু সহিহ নয়

নবীজিকে (ﷺ) ভালোবেসে অনেক কথা ছড়ানো হয়েছে, যার সূত্র নেই। তাঁর নামে অসত্য বলা কঠিন গুনাহ (সহিহ বুখারী ১১০); তাই ভালোবাসার সাথে সতর্কতাও দরকার।

ভিত্তিহীন "নবীজি (ﷺ) নূরের তৈরি, মাটির মানুষ নন; আল্লাহ সবার আগে তাঁর নূর সৃষ্টি করেছেন"

"হে জাবির, আল্লাহ সবার আগে তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন" কথাটি কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থে সনদসহ পাওয়া যায় না; মুহাদ্দিসরা একে ভিত্তিহীন বলেছেন। কুরআন বলছে, তিনি আমাদের মতোই মানুষ, পার্থক্য হলো তাঁর কাছে ওহী আসে (সূরা আল-কাহফ ১৮:১১০, সূরা ফুসসিলাত ৪১:৬)। তিনি হিদায়াতের আলো নিয়ে এসেছেন; সেই অর্থে তিনি আলো, শরীরের উপাদানে নয়।

ভিত্তিহীন "নবীজির (ﷺ) কোনো ছায়া ছিল না"

কোনো সহিহ বা হাসান হাদিসে এ কথা নেই; যে বর্ণনা উল্লেখ করা হয়, তা সনদবিহীন বা অত্যন্ত দুর্বল। তাঁর মহত্ত্বের জন্য এমন বানানো অলৌকিকতার প্রয়োজন নেই; সহিহ বর্ণনায় যে চরিত্র আর চেহারার কথা এসেছে, তা-ই যথেষ্ট (সহিহ বুখারী ৩৫৪৯)।

জাল "আপনি না হলে আমি আসমান-জমিন সৃষ্টি করতাম না" (লাওলাকা)

ইমাম সাগানী, শাইখ আলবানীসহ মুহাদ্দিসরা এই কথাকে জাল বলেছেন। আল্লাহ জিন ও মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিজেই বলে দিয়েছেন: তাঁর ইবাদত (সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬)।

ভুল ধারণা "নবীজি (ﷺ) গায়েবের সব কিছু জানতেন"

আল্লাহ তাঁকে বলতে বলেছেন: আমি গায়েব জানলে অনেক কল্যাণ লাভ করতাম, কোনো অকল্যাণ আমাকে ছুঁত না (সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৮); আমি বলি না যে আমি গায়েব জানি (সূরা আল-আনআম ৬:৫০)। আল্লাহ যতটুকু ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন, ততটুকুই তিনি জানতেন (সূরা আল-জিন ৭২:২৬, সূরা আল-জিন ৭২:২৭)।

ভুল ধারণা "শামায়েলে তিরমিযীর সব বর্ণনাই সহিহ"

ইমাম তিরমিযীর "আশ-শামাইল" নবীজির (ﷺ) শামায়েলের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বই, কিন্তু এতে অনেক দুর্বল বর্ণনাও আছে। শাইখ আলবানী "মুখতাসারুশ শামাইল"-এ সহিহ ও দুর্বল আলাদা করেছেন। তাই ওয়াজে শোনা প্রতিটি বর্ণনা যাচাই করে নিন; এই পাতায় শুধু সহিহ ও হাসান বর্ণনা রাখা হয়েছে।

অপ্রমাণিত "অমুক মসজিদে নবীজির (ﷺ) চুল মোবারক সংরক্ষিত, দেখলে বরকত"

সাহাবিরা নবীজির (ﷺ) চুল সংরক্ষণ করতেন, এটা সত্য। কিন্তু আজ বিভিন্ন জায়গায় যেসব চুল দেখানো হয়, সেগুলো যে সত্যিই তাঁর, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ নেই। অপ্রমাণিত জিনিসকে তাঁর দিকে সম্বোধন করাও তাঁর নামে অসত্য বলার শামিল হতে পারে (সহিহ বুখারী ১১০)। তাঁর আসল উত্তরাধিকার তাঁর সুন্নাহ।

শেষ কথা: চেনা থেকে অনুসরণ

সাহাবিরা নবীজিকে (ﷺ) দেখে ভালোবেসেছেন, আর আমরা তাঁকে না দেখে ভালোবাসি। তাঁকে ভালোবাসার সবচেয়ে সত্য প্রকাশ হলো, তাঁর মতো হতে চেষ্টা করা (সূরা আলে ইমরান ৩:৩১, সূরা আল-আহযাব ৩৩:২১)। আজ এই পাতা থেকে একটা অভ্যাস বেছে নিন, আর তাঁর উপর দরূদ পাঠান।

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দোআ-ইসতেগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর উপর সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।

সাথে পড়ুননবীজির (ﷺ) সীরাতজন্ম থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা গল্পের ভাষায়, সূত্রসহ
deenpedia.com · https://deenpedia.com/sirat/shamail/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার