নামাজের প্রকার: সুন্নত, বিতর, তাহাজ্জুদ থেকে জানাজা
পর্ব ৪/৬ফরজের বাইরেআরও নামাজ ও কিরাত
ফরজ নামাজ হলো ভিত্তি; কিয়ামতে ফরজে ঘাটতি থাকলে নফল দিয়ে পূরণ করা হবে। তাই নবীজি (ﷺ) দিনে-রাতে ফরজের বাইরেও নামাজ পড়তেন: ফরজের আগে-পরে, গভীর রাতে, সকালের রোদে, খুশির দিনে, বিপদে আর বিদায়ের সময়। এই পর্বে প্রতিটি নামাজের সহজ পরিচয়, আর কোনগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।
পর্ব ৪/৬ · আরও নামাজ ও কিরাত (বিন্দুতে চাপলে সেই পর্বে যাবে)
৮টি অধ্যায়
২টি আয়াত
২৯টি সহিহ হাদিস
৪টি দোয়া
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া; হাদিস শুধু সহিহ ও হাসান। দুর্বল বর্ণনা শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে, মানসহ। আয়াতের অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
গল্প দিয়ে শুরু
"আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?"
গভীর রাত। মদিনার ছোট্ট একটা ঘরে নবী (ﷺ) নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন। কিরাত লম্বা হতে থাকে, রুকু লম্বা, সিজদা লম্বা। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর দুই পা ফুলে ফেটে গেছে।
আয়েশা (রা.) দেখে জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এত কষ্ট করছেন কেন? আল্লাহ তো আপনার আগের-পরের সব ভুল ক্ষমা করে দিয়েছেন।
নবী (ﷺ) রাতে এত দীর্ঘ সময় নামাজে দাঁড়াতেন যে তাঁর দুই পা ফেটে যেত। আয়েশা (রা.) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কেন এমন করেন, অথচ আল্লাহ আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন? তিনি বললেন: আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হতে চাইব না?
এই গল্প আমাদের কী শেখায়? নফল নামাজ ভয় থেকে নয়, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা থেকে আসে। যাঁর জান্নাত নিশ্চিত, তিনিও রাতে দাঁড়াতেন ধন্যবাদ জানাতে। আমরা দুই রাকাত দিয়ে শুরু করতে পারি।
এই পর্বে ৮টি অধ্যায়
১
স্তর
ফরজ, সুন্নত আর নফল: দিনের বারো রাকাত
নামাজের কয়েকটি স্তর: ফরজ (পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমা, বাদ দেওয়া কবিরা গুনাহ), ওয়াজিব (হানাফি মতে, যেমন বিতর ও দুই ঈদ), সুন্নতে মুয়াক্কাদা (নবীজি নিয়মিত পড়তেন), আর নফল (ঐচ্ছিক, যত খুশি)।
সবচেয়ে জোরালো সুন্নত দিনের বারো রাকাত। এগুলো নিয়মিত পড়লে আল্লাহ জান্নাতে একটি ঘর বানিয়ে দেন।
এর মধ্যে ফজরের আগের দুই রাকাতের প্রতি নবীজির যত্ন ছিল সবচেয়ে বেশি; সফরেও ছাড়তেন না।
যে মুসলিম বান্দা প্রতিদিন আল্লাহর জন্য ফরজ ছাড়া বারো রাকাত নফল (সুন্নত) নামাজ পড়ে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানান, অথবা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানানো হয়।
সহিহ মুসলিম ৭২৮সহিহবর্ণনা: উম্মু হাবীবা (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ২টি দলিল
যে দিনে-রাতে বারো রাকাত (সুন্নত) পড়ে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানানো হয়: জোহরের আগে চার, পরে দুই, মাগরিবের পরে দুই, এশার পরে দুই, আর ফজরের আগে দুই রাকাত।
আপনার জীবনেবারো রাকাতের তালিকাটা ফোনে নোট করে রাখুন: ফজরের আগে ২, জোহরের আগে ৪ ও পরে ২, মাগরিবের পরে ২, এশার পরে ২। এক সপ্তাহ টানা পড়ুন, জান্নাতের ঘরের নিয়তে।
২
বিতর
বিতর: রাতের শেষ নামাজ
নবীজি বলেছেন, রাতের নামাজের শেষটা বিতর বানাও।
কখন পড়বেন? নবীজি আবু বকর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি বললেন রাতের শুরুতে, ঘুমানোর আগে। উমার (রা.) বললেন শেষ রাতে। নবীজি দুজনেরই প্রশংসা করলেন: একজন সতর্ক, আরেকজন দৃঢ়। যার শেষ রাতে ওঠার ভরসা নেই, সে এশার পরেই পড়ে নিক।
বিতরে দোয়া কুনূত পড়া হয়। হাসান ইবনু আলী (রা.)-কে নবীজি যে কুনূত শিখিয়েছিলেন, সেটি এই।
মাযহাবের পার্থক্য: হানাফি মতে বিতর ওয়াজিব, তিন রাকাত এক সালামে; তৃতীয় রাকাতে কিরাতের পর তাকবীর দিয়ে হাত তুলে, রুকুর আগে কুনূত। শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি মতে বিতর সুন্নতে মুয়াক্কাদা; এক, তিন, পাঁচ বা আরও বেজোড় রাকাত পড়া যায়, কুনূত অনেকের মতে রুকুর পরে। সবগুলোর পক্ষে বর্ণনা আছে।
নবী (ﷺ) আবু বকর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি বিতর কখন পড়ো? তিনি বললেন, রাতের শুরুতে বিতর পড়ি। উমার (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি বিতর কখন পড়ো? তিনি বললেন, রাতের শেষে। তখন তিনি আবু বকরকে বললেন: এ সতর্কতার পথ নিয়েছে। আর উমারকে বললেন: এ শক্তির পথ নিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বিতরে পড়ার জন্য কিছু বাক্য শিখিয়েছেন: "আল্লাহুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইত, ওয়া আফিনী ফীমান আফাইত, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইত, ওয়া বারিক লী ফীমা আ'তাইত, ওয়া কিনী শাররা মা কাদাইত, ফাইন্নাকা তাকদী ওয়ালা ইউকদা আলাইক, ওয়া ইন্নাহু লা ইয়াযিল্লু মান ওয়ালাইত, তাবারাকতা রাব্বানা ওয়া তাআলাইত" (হে আল্লাহ, আপনি যাদের হিদায়াত দিয়েছেন, তাদের সাথে আমাকেও হিদায়াত দিন; যাদের নিরাপদ রেখেছেন, তাদের সাথে আমাকেও নিরাপদ রাখুন; যাদের অভিভাবক হয়েছেন, তাদের সাথে আমারও অভিভাবক হোন; যা দিয়েছেন তাতে বরকত দিন; আর আপনার ফয়সালার মন্দ থেকে আমাকে রক্ষা করুন; কারণ আপনি ফয়সালা করেন, আপনার ওপর কেউ ফয়সালা করতে পারে না। আপনি যার অভিভাবক, সে কখনো লাঞ্ছিত হয় না। হে আমাদের রব, আপনি বরকতময়, সুউচ্চ)।
আপনার জীবনেআজ এশার পর ঘুমানোর আগে বিতর পড়ে নিন, যদি শেষ রাতে ওঠার নিশ্চয়তা না থাকে। ধীরে ধীরে কুনূতের অর্থটাও মুখস্থ করুন।
৩
রাতের নামাজ
তাহাজ্জুদ ও তারাবিহ: রাতের নীরব কথোপকথন
নবীজিকে বিশেষভাবে রাতের নামাজের কথা বলা হয়েছিল, আর এর বিনিময়ে প্রশংসিত মর্যাদার (মাকামে মাহমুদ) আশা।
প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে এসে ডাকেন: কে আছ আমাকে ডাকবে, আমি সাড়া দেব? কে চাইবে, আমি দেব? কে ক্ষমা চাইবে, আমি ক্ষমা করব?
নবীজির রাতের নামাজ সাধারণত ছিল এগারো রাকাত, বিতরসহ; রমজানেও এর বেশি পড়তেন না, কিন্তু প্রতিটি রাকাত হতো দীর্ঘ ও সুন্দর।
রমজানের রাতের নামাজ (তারাবিহ) ঈমান ও সওয়াবের আশায় পড়লে আগের গুনাহ মাফ (সহিহ বুখারী ৩৭)। নবীজি কয়েক রাত জামাতে পড়িয়ে তারপর থেমে গিয়েছিলেন, এই ভয়ে যে এটা ফরজ হয়ে যাবে।
আর ইমামের সাথে শেষ পর্যন্ত থাকলে পুরো রাত নামাজের সওয়াব লেখা হয়।
তারাবিহ আট না বিশ? আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় নবীজির রাতের নামাজ এগারো রাকাত। উমার (রা.)-এর সময় থেকে মসজিদে বিশ রাকাতের জামাত চালু হয়, আর হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবে বিশ রাকাতই প্রচলিত। রাতের নফল নামাজের কোনো সর্বোচ্চ সীমা বাঁধা নেই; দুই আমলই বৈধ। আসল কথা সংখ্যা নয়, মনোযোগ আর স্থিরতা।
আমাদের রব, যিনি বরকতময় ও সুউচ্চ, প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকে, দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন: কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?
তিনি (নবী ﷺ) রমজানে বা অন্য সময়ে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না। চার রাকাত পড়তেন, তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যের কথা জিজ্ঞেস কোরো না! তারপর আরও চার রাকাত, তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যের কথাও জিজ্ঞেস কোরো না! তারপর তিন রাকাত পড়তেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক রাতে মাঝরাতে বের হয়ে মসজিদে নামাজ পড়লেন, কিছু মানুষ তাঁর পেছনে নামাজ পড়ল। সকালে মানুষ এ নিয়ে কথা বলল, পরের রাতে আরও বেশি মানুষ জমা হলো। তৃতীয় রাতে মসজিদ ভরে গেল। চতুর্থ রাতে মসজিদে জায়গা হচ্ছিল না, কিন্তু তিনি ফজরের আগে বের হলেন না। ফজর পড়িয়ে মানুষের দিকে ফিরে বললেন: তোমাদের উপস্থিতি আমার অজানা ছিল না; কিন্তু আমার ভয় হয়েছিল, এটা তোমাদের ওপর ফরজ করে দেওয়া হবে, তারপর তোমরা পারবে না।
আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে রোজা রাখলাম। মাসের সাত দিন বাকি থাকা পর্যন্ত তিনি আমাদের নিয়ে (রাতের) নামাজ পড়লেন না। তারপর এক রাতে রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত, আরেক রাতে অর্ধেক রাত পর্যন্ত আমাদের নিয়ে নামাজ পড়লেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, বাকি রাতটাও যদি আমাদের নিয়ে পড়তেন! তিনি বললেন: যে ইমামের সাথে দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ না ইমাম শেষ করে, তার জন্য পুরো রাতের নামাজ লেখা হয়।
আপনার জীবনেএই সপ্তাহে একরাত ফজরের বিশ মিনিট আগে অ্যালার্ম দিন। ওজু করে মাত্র দুই রাকাত পড়ুন, তারপর নিজের ভাষায় দোয়া। শেষ রাতের এই ডাকে সাড়া দেওয়ার স্বাদ একবার পেলে ছাড়তে ইচ্ছা করে না।
৪
দিনের নফল
দুহা, তাহিয়্যাতুল মসজিদ আর ওজুর পরের দুই রাকাত
শরীরের প্রতিটি জোড়ার পক্ষ থেকে প্রতিদিন একটি সদকা দেওয়া দরকার; সকালের রোদে দুই রাকাত দুহা এর জন্য যথেষ্ট।
মক্কা বিজয়ের দিন নবীজি আট রাকাত দুহা পড়েছিলেন। দুই থেকে আট রাকাত, যতটা সহজ হয়। সময়: সূর্য ওঠার প্রায় পনেরো-বিশ মিনিট পর থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত।
মসজিদে ঢুকে বসার আগে দুই রাকাত (তাহিয়্যাতুল মসজিদ)। এক সাহাবি না পড়ে বসে পড়লে নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, বসার আগে দুই রাকাত পড়লে না কেন?
আর ওজুর পর দুই রাকাত। এই আমলের কারণেই নবীজি জান্নাতে নিজের সামনে বিলাল (রা.)-এর জুতার আওয়াজ শুনেছিলেন।
প্রতিদিন সকালে তোমাদের প্রত্যেকের শরীরের প্রতিটি জোড়ার পক্ষ থেকে একটি করে সদকা দেওয়া দরকার। প্রতিটি সুবহানাল্লাহ সদকা, প্রতিটি আলহামদুলিল্লাহ সদকা, প্রতিটি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সদকা, প্রতিটি আল্লাহু আকবার সদকা, ভালো কাজের আদেশ সদকা, মন্দ কাজে নিষেধ সদকা। আর এ সবের জন্য দুহার সময়ের দুই রাকাত নামাজই যথেষ্ট।
সহিহ মুসলিম ৭২০সহিহবর্ণনা: আবু যর আল-গিফারী (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ৪টি দলিল
মক্কা বিজয়ের বছর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে গেলাম। দেখলাম, তিনি গোসল করছেন, আর তাঁর মেয়ে ফাতিমা (রা.) কাপড় দিয়ে আড়াল করে রেখেছেন। গোসল শেষে তিনি একটি কাপড় জড়িয়ে আট রাকাত নামাজ পড়লেন। তারপর আমি বললাম, আমি অমুককে আশ্রয় দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: হে উম্মু হানি, তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমরাও তাকে আশ্রয় দিলাম।
আমি মসজিদে ঢুকলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মানুষের মাঝে বসে ছিলেন। আমিও বসে পড়লাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: বসার আগে দুই রাকাত পড়তে তোমাকে কিসে বাধা দিল? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকে বসা দেখলাম, মানুষকেও বসা দেখলাম। তিনি বললেন: তোমাদের কেউ মসজিদে ঢুকলে দুই রাকাত না পড়ে বসবে না।
নবী (ﷺ) ফজরের নামাজের সময় বিলাল (রা.)-কে বললেন: হে বিলাল, ইসলাম গ্রহণের পর তোমার সবচেয়ে আশাজাগানিয়া আমলটি কী, আমাকে বলো। কারণ আমি জান্নাতে আমার সামনে তোমার জুতার আওয়াজ শুনেছি। বিলাল বললেন: আমার কাছে সবচেয়ে আশার আমল এটাই যে, দিনে বা রাতে যখনই আমি পবিত্রতা অর্জন (অজু) করেছি, সেই অজু দিয়ে আমার ভাগ্যে যতটুকু নামাজ লেখা ছিল, পড়েছি।
আপনার জীবনেঅফিসে বা ক্লাসে যাওয়ার আগে, সকালের রোদে, মাত্র দুই রাকাত দুহা পড়ুন। সারাদিনের ৩৬০টি জোড়ার শুকরিয়া দশ মিনিটে।
৫
ইস্তিখারা ও তাওবা
সিদ্ধান্তের নামাজ আর ফিরে আসার নামাজ
নবীজি সাহাবিদের সব বিষয়ে ইস্তিখারা শেখাতেন, যেভাবে কুরআনের সূরা শেখাতেন: কোনো কাজের ইচ্ছা হলে ফরজ ছাড়া দুই রাকাত পড়ে এই দোয়া, আর দোয়ায় নিজের বিষয়টির নাম।
ইস্তিখারা কী নয়: এর জন্য স্বপ্ন দেখা বা বিশেষ কোনো লক্ষণ পাওয়া জরুরি নয়, আর রাতেই পড়তে হবে এমন শর্তও নেই। দোয়ার পর পরামর্শ করুন, তারপর যে দিকে মন স্থির হয় এবং কাজ সহজ হয়, সেটাই আল্লাহর বেছে দেওয়া বলে আশা করুন।
আর গুনাহ হয়ে গেলে? সুন্দর করে ওজু, তারপর দুই রাকাত নামাজ, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া; আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।
এক লোক এক নারীকে চুমু দিয়ে ফেলে লজ্জায় নবীজির কাছে এল। তখন নাজিল হলো: নেক কাজ গুনাহ মুছে দেয়। লোকটি জিজ্ঞেস করল, এটা কি শুধু আমার জন্য? নবীজি বললেন: আমার পুরো উম্মতের জন্য।
নবী (ﷺ) আমাদের সব বিষয়ে ইস্তিখারা শেখাতেন, যেভাবে কুরআনের সূরা শেখাতেন। (তিনি বলতেন:) কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে দুই রাকাত নামাজ পড়বে, তারপর বলবে: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আসতাখীরুকা বি'ইলমিকা, ওয়া আসতাকদিরুকা বিকুদরাতিকা, ওয়া আসআলুকা মিন ফাদলিকাল আযীম..." হে আল্লাহ, আমি আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে আপনার কাছে কল্যাণ চাই, আপনার শক্তির মাধ্যমে শক্তি চাই, আর আপনার মহান অনুগ্রহ চাই। আপনি পারেন, আমি পারি না; আপনি জানেন, আমি জানি না; আপনি গায়েবের সব জানেন। হে আল্লাহ, যদি আপনি জানেন যে এই কাজটি আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য (অথবা বললেন: আমার নিকট ও দূর ভবিষ্যতের জন্য) ভালো, তাহলে তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন। আর যদি জানেন যে এটা আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য খারাপ, তাহলে তা আমার থেকে সরিয়ে দিন, আমাকেও তা থেকে সরিয়ে দিন, আর যেখানেই কল্যাণ থাকুক তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন, তারপর তাতে আমাকে সন্তুষ্ট করুন। আর (দোয়ার মধ্যে) নিজের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করবে।
কোনো বান্দা যদি গুনাহ করে, তারপর সুন্দরভাবে পবিত্র হয় (অজু করে), তারপর দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।
সুনানে আবু দাউদ ১৫২১সহিহবর্ণনাকারী: আবু বকর সিদ্দীক (রা.), আলী (রা.)-এর বর্ণনায়
এক লোক এক নারীকে চুমু দিয়ে ফেলল। তারপর নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে তা জানাল। তখন আল্লাহ নাজিল করলেন: "দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে নামাজ কায়েম করো; নিশ্চয়ই নেক কাজ গুনাহকে মুছে দেয়।" (১১:১১৪) লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল, এটা কি শুধু আমার জন্য? তিনি বললেন: আমার উম্মতের সবার জন্য।
আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে-বুঝে তারা তা পুনরায় করতে থাকে না।
আপনার জীবনেজীবনের কোনো একটা সিদ্ধান্ত (চাকরি, বিয়ে, কেনাকাটা) সামনে থাকলে আজই ইস্তিখারার দোয়াটা শিখে নিন। আর কোনো গুনাহ মনে খোঁচা দিলে আজ রাতেই তাওবার দুই রাকাত।
প্রথম রাকাতে কিরাতের আগে আর দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পরে (হানাফি) বা আগে (অন্যরা) কয়েকটি বাড়তি তাকবীর; হানাফি মতে মোট ছয়টি, অন্য মাযহাবে বারোটি। নবীজি ঈদে সাধারণত সূরা আল-আ'লা ও সূরা আল-গাশিয়াহ পড়তেন (সহিহ মুসলিম ৮৭৮)। আর ঈদ আনন্দের দিন; নির্দোষ আনন্দে বাধা দিতে নবীজি নিষেধ করেছেন (সহিহ বুখারী ৯৫২)।
জানাজার নামাজ: দাঁড়িয়ে চার তাকবীর, রুকু-সিজদা নেই। নাজাশীর মৃত্যুর দিন নবীজি এভাবেই পড়িয়েছিলেন।
১ম তাকবীর: সানা (হানাফি) বা সূরা ফাতিহা; ইবনু আব্বাস (রা.) ফাতিহা পড়ে বলেছিলেন, এটা সুন্নাহ (সহিহ বুখারী ১৩৩৫)।
জানাজায় শরিক হলে এক কীরাত, দাফন পর্যন্ত থাকলে দুই কীরাত সওয়াব, প্রতিটি পাহাড়ের সমান (সহিহ বুখারী ১৩২৫)। মসজিদ ঝাড়ু দিতেন এমন এক সাধারণ মানুষ মারা গেলে কেউ নবীজিকে জানায়নি। খোঁজ নিয়ে খবর পেয়ে তিনি বললেন, আমাকে জানালে না কেন? তারপর কবরের কাছে গিয়ে জানাজা পড়লেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যেদিন নাজাশী মারা গেলেন, সেদিনই মানুষকে তাঁর মৃত্যুর খবর দিলেন। তারপর তাদের নিয়ে ঈদগাহে গেলেন, কাতার করলেন এবং চার তাকবীর দিলেন।
সহিহ বুখারী ১৩৩৩সহিহবর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ২টি দলিল
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ ـ رضى الله عنهما ـ يُصَلُّونَ الْعِيدَيْنِ قَبْلَ الْخُطْبَةِ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ), আবু বকর ও উমার (রা.) দুই ঈদের নামাজ খুতবার আগে পড়তেন।
كَانَ يَقُمُّ الْمَسْجِدَ، فَمَاتَ، فَسَأَلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنْهُ فَقَالُوا مَاتَ. قَالَ " أَفَلاَ كُنْتُمْ آذَنْتُمُونِي بِهِ دُلُّونِي عَلَى قَبْرِهِ ". ـ أَوْ قَالَ قَبْرِهَا ـ فَأَتَى قَبْرَهُ فَصَلَّى عَلَيْهِ
একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ বা নারী মসজিদ ঝাড়ু দিতেন। তিনি মারা গেলেন। নবী (ﷺ) তাঁর খোঁজ করলেন। বলা হলো, তিনি মারা গেছেন। তিনি বললেন: আমাকে জানালে না কেন? আমাকে তার কবর দেখাও। তারপর তিনি কবরের কাছে এসে তার জানাজা পড়লেন।
আপনার জীবনেজানাজার চার তাকবীরের ধাপগুলো আজ মুখস্থ করে ফেলুন, আর অন্তত সংক্ষিপ্ত দোয়াটা। মহল্লায় পরের জানাজায় পেছনে দাঁড়িয়ে শুধু অনুসরণ নয়, বুঝে দোয়া করবেন।
৭
বিশেষ অবস্থা
গ্রহণ, বৃষ্টি, ভয়, সফর আর অসুস্থতা
সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ: নবীজির ছেলে ইবরাহীম মারা যাওয়ার দিন সূর্যগ্রহণ হলে মানুষ বলল, তাঁর মৃত্যুর কারণে। নবীজি কুসংস্কার ভেঙে দিলেন: গ্রহণ কারো জন্ম-মৃত্যুতে হয় না; এটা আল্লাহর নিদর্শন, তখন নামাজ পড়ো আর দোয়া করো।
সহিহ বর্ণনায় গ্রহণের নামাজে প্রতি রাকাতে দুটি রুকু আর দীর্ঘ কিরাত এসেছে; হানাফি মতে সাধারণ দুই রাকাতের মতো, তবে দীর্ঘ করে।
বৃষ্টির নামাজ (ইস্তিসকা): খরায় মাঠে গিয়ে কিবলামুখী হয়ে দোয়া, চাদর উল্টে নেওয়া, আর দুই রাকাত (সহিহ বুখারী ১০১২)। বৃষ্টি দেখলে দোয়া: "আল্লাহুম্মা সাইয়্যিবান নাফিআ" (সহিহ বুখারী ১০৩২)।
ভয়ের নামাজ: যুদ্ধের ময়দানেও জামাত ছাড়া হয়নি; দল ভাগ করে পালা করে পড়ার পদ্ধতি কুরআনেই বলা আছে (সূরা আন-নিসা ৪:১০২)।
সফরের নামাজ: চার রাকাতের ফরজ দুই রাকাত। কুরআনে ভয়ের কথা থাকলেও (সূরা আন-নিসা ৪:১০১) নিরাপদ সফরেও এটা চলবে; নবীজি বলেছেন, এটা আল্লাহর দেওয়া সদকা, গ্রহণ করো।
অসুস্থ হলে: দাঁড়িয়ে, না পারলে বসে, না পারলে কাত হয়ে শুয়ে। নামাজ ছাড়া নয়, সাধ্যমতো।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে যেদিন (তাঁর ছেলে) ইবরাহীম মারা গেলেন, সেদিন সূর্যগ্রহণ হলো। মানুষ বলল, ইবরাহীমের মৃত্যুর কারণে সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: সূর্য ও চাঁদের গ্রহণ কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে হয় না। যখন তোমরা তা দেখবে, তখন নামাজ পড়ো এবং আল্লাহকে ডাকো।
(ইয়ালা ইবনু উমাইয়া উমার (রা.)-কে বললেন, আয়াতে তো ভয়ের শর্ত আছে, এখন তো মানুষ নিরাপদ। উমার বললেন, আমিও এতে অবাক হয়েছিলাম, তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন:) এটা একটা সদকা, যা আল্লাহ তোমাদের দিয়েছেন; তাই তাঁর সদকা গ্রহণ করো।
আপনার জীবনেপরের বার গ্রহণ বা বৃষ্টির খবর পেলে কুসংস্কারের আলাপ না করে পরিবারকে নিয়ে নামাজ ও দোয়ায় দাঁড়ান। আর অসুস্থ আত্মীয়কে মনে করিয়ে দিন: শুয়ে শুয়েও নামাজ পড়া যায়।
৮
ভিত্তিহীন নামাজ
যে নামাজগুলোর কোনো ভিত্তি নেই
নফল নামাজ যত খুশি পড়া যায়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রাতে নির্দিষ্ট রাকাত, নির্দিষ্ট সূরা নির্দিষ্ট সংখ্যায়, নির্দিষ্ট পুরস্কারসহ, এমন "বিশেষ নামাজ" বানানো দ্বীনে নতুন সংযোজন। নবীজি বলেছেন, যে আমাদের দ্বীনে এমন কিছু যোগ করে যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।
শবে বরাতের একশো রাকাত, রজবের প্রথম জুমার "সালাতুর রাগাইব", রমজানের শেষ জুমার "কাজায়ে উমরী" এগুলোর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই; বিস্তারিত নিচের "প্রচলিত ভুল" অংশে। মন চাইলে যেকোনো রাতে সাধারণ নফল পড়ুন, কিন্তু মনগড়া পদ্ধতি ও পুরস্কারের কথা বিশ্বাস করবেন না।
যে আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নতুন যোগ করে যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বিতরে পড়ার জন্য কিছু বাক্য শিখিয়েছেন: "আল্লাহুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইত, ওয়া আফিনী ফীমান আফাইত, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইত, ওয়া বারিক লী ফীমা আ'তাইত, ওয়া কিনী শাররা মা কাদাইত, ফাইন্নাকা তাকদী ওয়ালা ইউকদা আলাইক, ওয়া ইন্নাহু লা ইয়াযিল্লু মান ওয়ালাইত, তাবারাকতা রাব্বানা ওয়া তাআলাইত" (হে আল্লাহ, আপনি যাদের হিদায়াত দিয়েছেন, তাদের সাথে আমাকেও হিদায়াত দিন; যাদের নিরাপদ রেখেছেন, তাদের সাথে আমাকেও নিরাপদ রাখুন; যাদের অভিভাবক হয়েছেন, তাদের সাথে আমারও অভিভাবক হোন; যা দিয়েছেন তাতে বরকত দিন; আর আপনার ফয়সালার মন্দ থেকে আমাকে রক্ষা করুন; কারণ আপনি ফয়সালা করেন, আপনার ওপর কেউ ফয়সালা করতে পারে না। আপনি যার অভিভাবক, সে কখনো লাঞ্ছিত হয় না। হে আমাদের রব, আপনি বরকতময়, সুউচ্চ)।
নবী (ﷺ) আমাদের সব বিষয়ে ইস্তিখারা শেখাতেন, যেভাবে কুরআনের সূরা শেখাতেন। (তিনি বলতেন:) কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে দুই রাকাত নামাজ পড়বে, তারপর বলবে: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আসতাখীরুকা বি'ইলমিকা, ওয়া আসতাকদিরুকা বিকুদরাতিকা, ওয়া আসআলুকা মিন ফাদলিকাল আযীম..." হে আল্লাহ, আমি আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে আপনার কাছে কল্যাণ চাই, আপনার শক্তির মাধ্যমে শক্তি চাই, আর আপনার মহান অনুগ্রহ চাই। আপনি পারেন, আমি পারি না; আপনি জানেন, আমি জানি না; আপনি গায়েবের সব জানেন। হে আল্লাহ, যদি আপনি জানেন যে এই কাজটি আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য (অথবা বললেন: আমার নিকট ও দূর ভবিষ্যতের জন্য) ভালো, তাহলে তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন। আর যদি জানেন যে এটা আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য খারাপ, তাহলে তা আমার থেকে সরিয়ে দিন, আমাকেও তা থেকে সরিয়ে দিন, আর যেখানেই কল্যাণ থাকুক তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন, তারপর তাতে আমাকে সন্তুষ্ট করুন। আর (দোয়ার মধ্যে) নিজের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করবে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি জানাজার নামাজ পড়লেন; আমি তাঁর দোয়া মুখস্থ করে নিলাম। তিনি বলছিলেন: "হে আল্লাহ, তাকে মাফ করুন, তার উপর রহম করুন, তাকে নিরাপত্তা দিন, তাকে ক্ষমা করুন, তার মেহমানদারি সম্মানজনক করুন, তার প্রবেশস্থল প্রশস্ত করুন, তাকে পানি, বরফ ও শিলা দিয়ে ধুয়ে দিন, তাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করুন যেমন সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়, তাকে তার ঘরের চেয়ে ভালো ঘর, পরিবারের চেয়ে ভালো পরিবার আর সঙ্গীর চেয়ে ভালো সঙ্গী দিন, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান, আর তাকে কবরের আযাব (বা জাহান্নামের আযাব) থেকে রক্ষা করুন।"
কুরআনের দোয়ার অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে; হাদিসের দোয়ার সাথে মূল গ্রন্থের নম্বর ও মান দেওয়া আছে।
আমল চেকলিস্ট
টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।
প্রচলিত ভুল
জাল
শবে বরাতে একশো রাকাত নামাজ, প্রতি রাকাতে দশবার সূরা ইখলাস; এতে সত্তরবার আল্লাহর দিকে তাকানো...
যা সঠিক: ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) এই বর্ণনাকে তাঁর জাল হাদিসের সংকলনে (আল-মাওযূআত) এনেছেন, আর ইমাম নববী (রহ.) এই নামাজকে নিন্দনীয় বিদআত বলেছেন। এ রাতে সাধারণ নফল ও দোয়া করা যায়, কিন্তু নির্দিষ্ট রাকাত ও সূরার পদ্ধতি ভিত্তিহীন।
জাল
রজবের প্রথম জুমার রাতে "সালাতুর রাগাইব" (বারো রাকাত, নির্দিষ্ট সূরা ও দোয়াসহ)।
যা সঠিক: ইমাম নববী (রহ.) সহ অনেক আলেম একে জাল বর্ণনার ভিত্তিতে বানানো বিদআত বলেছেন। দ্বীনে নতুন সংযোজন প্রত্যাখ্যাত (সহিহ বুখারী ২৬৯৭)।
ভিত্তিহীন
রমজানের শেষ জুমায় কয়েক রাকাত "কাজায়ে উমরী" পড়লে সারাজীবনের ছুটে যাওয়া নামাজ আদায় হয়ে যায়।
যা সঠিক: এর কোনো ভিত্তি নেই, আর হানাফি সহ সব মাযহাবের আলেমরা একে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ছুটে যাওয়া নামাজের জন্য তাওবা আর একটা একটা করে কাজা আদায় করতে হয় (সহিহ বুখারী ৫৯৭)।
খুবই দুর্বল
মাগরিবের পর ছয় রাকাত "আওয়াবীন" পড়লে বারো বছরের ইবাদতের সওয়াব।
যা সঠিক: এটা তিরমিযী ৪৩৫-এ আছে, শাইখ আলবানী একে খুবই দুর্বল বলেছেন। মাগরিবের পর নফল পড়া এমনিতে ভালো, তবে এই পুরস্কারের কথা প্রমাণিত নয়। সহিহ মুসলিমে (৭৪৮) "আওয়াবীনের নামাজ" বলা হয়েছে দুহার নামাজকে, যখন রোদ তপ্ত হয়।
খুবই দুর্বল
সালাতুল হাজত: নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট দোয়াসহ বারো রাকাত বা দুই রাকাত পড়লে যেকোনো প্রয়োজন পূরণ হয়।
যা সঠিক: প্রচলিত সালাতুল হাজতের বর্ণনাটি (তিরমিযী ৪৭৯) শাইখ আলবানী খুবই দুর্বল বলেছেন। প্রয়োজনে যেকোনো সময় দুই রাকাত নফল পড়ে নিজের ভাষায় দোয়া করা যায়; সিজদায় দোয়া সবচেয়ে কাছের (সহিহ মুসলিম ৪৮২)। আর সালাতুত তাসবীহ (আবু দাউদ ১২৯৭) নিয়ে আলেমদের মতভেদ আছে: আলবানী সহ অনেকে সহিহ বলেছেন, আবার অনেকে দুর্বল। পড়তে চাইলে মাঝে মাঝে পড়া যায়, তবে একে নিয়ে বাড়াবাড়ি নয়।
প্রতিটি দাবি যাচাই করা হয়েছে কুরআন, সহিহ হাদিস ও মুহাদ্দিসদের মান অনুযায়ী।
নবী (ﷺ) রাতে এত দীর্ঘ সময় নামাজে দাঁড়াতেন যে তাঁর দুই পা ফেটে যেত। আয়েশা (রা.) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কেন এমন করেন, অথচ আল্লাহ আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন? তিনি বললেন: আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হতে চাইব না?
যে মুসলিম বান্দা প্রতিদিন আল্লাহর জন্য ফরজ ছাড়া বারো রাকাত নফল (সুন্নত) নামাজ পড়ে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানান, অথবা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানানো হয়।
যে দিনে-রাতে বারো রাকাত (সুন্নত) পড়ে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানানো হয়: জোহরের আগে চার, পরে দুই, মাগরিবের পরে দুই, এশার পরে দুই, আর ফজরের আগে দুই রাকাত।
নবী (ﷺ) আবু বকর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি বিতর কখন পড়ো? তিনি বললেন, রাতের শুরুতে বিতর পড়ি। উমার (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি বিতর কখন পড়ো? তিনি বললেন, রাতের শেষে। তখন তিনি আবু বকরকে বললেন: এ সতর্কতার পথ নিয়েছে। আর উমারকে বললেন: এ শক্তির পথ নিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বিতরে পড়ার জন্য কিছু বাক্য শিখিয়েছেন: "আল্লাহুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইত, ওয়া আফিনী ফীমান আফাইত, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইত, ওয়া বারিক লী ফীমা আ'তাইত, ওয়া কিনী শাররা মা কাদাইত, ফাইন্নাকা তাকদী ওয়ালা ইউকদা আলাইক, ওয়া ইন্নাহু লা ইয়াযিল্লু মান ওয়ালাইত, তাবারাকতা রাব্বানা ওয়া তাআলাইত" (হে আল্লাহ, আপনি যাদের হিদায়াত দিয়েছেন, তাদের সাথে আমাকেও হিদায়াত দিন; যাদের নিরাপদ রেখেছেন, তাদের সাথে আমাকেও নিরাপদ রাখুন; যাদের অভিভাবক হয়েছেন, তাদের সাথে আমারও অভিভাবক হোন; যা দিয়েছেন তাতে বরকত দিন; আর আপনার ফয়সালার মন্দ থেকে আমাকে রক্ষা করুন; কারণ আপনি ফয়সালা করেন, আপনার ওপর কেউ ফয়সালা করতে পারে না। আপনি যার অভিভাবক, সে কখনো লাঞ্ছিত হয় না। হে আমাদের রব, আপনি বরকতময়, সুউচ্চ)।
আমাদের রব, যিনি বরকতময় ও সুউচ্চ, প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকে, দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন: কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?
তিনি (নবী ﷺ) রমজানে বা অন্য সময়ে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না। চার রাকাত পড়তেন, তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যের কথা জিজ্ঞেস কোরো না! তারপর আরও চার রাকাত, তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যের কথাও জিজ্ঞেস কোরো না! তারপর তিন রাকাত পড়তেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক রাতে মাঝরাতে বের হয়ে মসজিদে নামাজ পড়লেন, কিছু মানুষ তাঁর পেছনে নামাজ পড়ল। সকালে মানুষ এ নিয়ে কথা বলল, পরের রাতে আরও বেশি মানুষ জমা হলো। তৃতীয় রাতে মসজিদ ভরে গেল। চতুর্থ রাতে মসজিদে জায়গা হচ্ছিল না, কিন্তু তিনি ফজরের আগে বের হলেন না। ফজর পড়িয়ে মানুষের দিকে ফিরে বললেন: তোমাদের উপস্থিতি আমার অজানা ছিল না; কিন্তু আমার ভয় হয়েছিল, এটা তোমাদের ওপর ফরজ করে দেওয়া হবে, তারপর তোমরা পারবে না।
আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে রোজা রাখলাম। মাসের সাত দিন বাকি থাকা পর্যন্ত তিনি আমাদের নিয়ে (রাতের) নামাজ পড়লেন না। তারপর এক রাতে রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত, আরেক রাতে অর্ধেক রাত পর্যন্ত আমাদের নিয়ে নামাজ পড়লেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, বাকি রাতটাও যদি আমাদের নিয়ে পড়তেন! তিনি বললেন: যে ইমামের সাথে দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ না ইমাম শেষ করে, তার জন্য পুরো রাতের নামাজ লেখা হয়।
প্রতিদিন সকালে তোমাদের প্রত্যেকের শরীরের প্রতিটি জোড়ার পক্ষ থেকে একটি করে সদকা দেওয়া দরকার। প্রতিটি সুবহানাল্লাহ সদকা, প্রতিটি আলহামদুলিল্লাহ সদকা, প্রতিটি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সদকা, প্রতিটি আল্লাহু আকবার সদকা, ভালো কাজের আদেশ সদকা, মন্দ কাজে নিষেধ সদকা। আর এ সবের জন্য দুহার সময়ের দুই রাকাত নামাজই যথেষ্ট।
মক্কা বিজয়ের বছর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে গেলাম। দেখলাম, তিনি গোসল করছেন, আর তাঁর মেয়ে ফাতিমা (রা.) কাপড় দিয়ে আড়াল করে রেখেছেন। গোসল শেষে তিনি একটি কাপড় জড়িয়ে আট রাকাত নামাজ পড়লেন। তারপর আমি বললাম, আমি অমুককে আশ্রয় দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: হে উম্মু হানি, তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমরাও তাকে আশ্রয় দিলাম।
আমি মসজিদে ঢুকলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মানুষের মাঝে বসে ছিলেন। আমিও বসে পড়লাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: বসার আগে দুই রাকাত পড়তে তোমাকে কিসে বাধা দিল? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকে বসা দেখলাম, মানুষকেও বসা দেখলাম। তিনি বললেন: তোমাদের কেউ মসজিদে ঢুকলে দুই রাকাত না পড়ে বসবে না।
নবী (ﷺ) ফজরের নামাজের সময় বিলাল (রা.)-কে বললেন: হে বিলাল, ইসলাম গ্রহণের পর তোমার সবচেয়ে আশাজাগানিয়া আমলটি কী, আমাকে বলো। কারণ আমি জান্নাতে আমার সামনে তোমার জুতার আওয়াজ শুনেছি। বিলাল বললেন: আমার কাছে সবচেয়ে আশার আমল এটাই যে, দিনে বা রাতে যখনই আমি পবিত্রতা অর্জন (অজু) করেছি, সেই অজু দিয়ে আমার ভাগ্যে যতটুকু নামাজ লেখা ছিল, পড়েছি।
নবী (ﷺ) আমাদের সব বিষয়ে ইস্তিখারা শেখাতেন, যেভাবে কুরআনের সূরা শেখাতেন। (তিনি বলতেন:) কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে দুই রাকাত নামাজ পড়বে, তারপর বলবে: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আসতাখীরুকা বি'ইলমিকা, ওয়া আসতাকদিরুকা বিকুদরাতিকা, ওয়া আসআলুকা মিন ফাদলিকাল আযীম..." হে আল্লাহ, আমি আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে আপনার কাছে কল্যাণ চাই, আপনার শক্তির মাধ্যমে শক্তি চাই, আর আপনার মহান অনুগ্রহ চাই। আপনি পারেন, আমি পারি না; আপনি জানেন, আমি জানি না; আপনি গায়েবের সব জানেন। হে আল্লাহ, যদি আপনি জানেন যে এই কাজটি আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য (অথবা বললেন: আমার নিকট ও দূর ভবিষ্যতের জন্য) ভালো, তাহলে তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন। আর যদি জানেন যে এটা আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য খারাপ, তাহলে তা আমার থেকে সরিয়ে দিন, আমাকেও তা থেকে সরিয়ে দিন, আর যেখানেই কল্যাণ থাকুক তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন, তারপর তাতে আমাকে সন্তুষ্ট করুন। আর (দোয়ার মধ্যে) নিজের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করবে।
কোনো বান্দা যদি গুনাহ করে, তারপর সুন্দরভাবে পবিত্র হয় (অজু করে), তারপর দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।
সুনানে আবু দাউদ ১৫২১সহিহবর্ণনাকারী: আবু বকর সিদ্দীক (রা.), আলী (রা.)-এর বর্ণনায়
এক লোক এক নারীকে চুমু দিয়ে ফেলল। তারপর নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে তা জানাল। তখন আল্লাহ নাজিল করলেন: "দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে নামাজ কায়েম করো; নিশ্চয়ই নেক কাজ গুনাহকে মুছে দেয়।" (১১:১১৪) লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল, এটা কি শুধু আমার জন্য? তিনি বললেন: আমার উম্মতের সবার জন্য।
كَانَ يَقُمُّ الْمَسْجِدَ، فَمَاتَ، فَسَأَلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنْهُ فَقَالُوا مَاتَ. قَالَ " أَفَلاَ كُنْتُمْ آذَنْتُمُونِي بِهِ دُلُّونِي عَلَى قَبْرِهِ ". ـ أَوْ قَالَ قَبْرِهَا ـ فَأَتَى قَبْرَهُ فَصَلَّى عَلَيْهِ
একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ বা নারী মসজিদ ঝাড়ু দিতেন। তিনি মারা গেলেন। নবী (ﷺ) তাঁর খোঁজ করলেন। বলা হলো, তিনি মারা গেছেন। তিনি বললেন: আমাকে জানালে না কেন? আমাকে তার কবর দেখাও। তারপর তিনি কবরের কাছে এসে তার জানাজা পড়লেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে যেদিন (তাঁর ছেলে) ইবরাহীম মারা গেলেন, সেদিন সূর্যগ্রহণ হলো। মানুষ বলল, ইবরাহীমের মৃত্যুর কারণে সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: সূর্য ও চাঁদের গ্রহণ কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে হয় না। যখন তোমরা তা দেখবে, তখন নামাজ পড়ো এবং আল্লাহকে ডাকো।
(ইয়ালা ইবনু উমাইয়া উমার (রা.)-কে বললেন, আয়াতে তো ভয়ের শর্ত আছে, এখন তো মানুষ নিরাপদ। উমার বললেন, আমিও এতে অবাক হয়েছিলাম, তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন:) এটা একটা সদকা, যা আল্লাহ তোমাদের দিয়েছেন; তাই তাঁর সদকা গ্রহণ করো।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি জানাজার নামাজ পড়লেন; আমি তাঁর দোয়া মুখস্থ করে নিলাম। তিনি বলছিলেন: "হে আল্লাহ, তাকে মাফ করুন, তার উপর রহম করুন, তাকে নিরাপত্তা দিন, তাকে ক্ষমা করুন, তার মেহমানদারি সম্মানজনক করুন, তার প্রবেশস্থল প্রশস্ত করুন, তাকে পানি, বরফ ও শিলা দিয়ে ধুয়ে দিন, তাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করুন যেমন সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়, তাকে তার ঘরের চেয়ে ভালো ঘর, পরিবারের চেয়ে ভালো পরিবার আর সঙ্গীর চেয়ে ভালো সঙ্গী দিন, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান, আর তাকে কবরের আযাব (বা জাহান্নামের আযাব) থেকে রক্ষা করুন।"