সপ্তাহের সাতটি দিনের মধ্যে একটি দিনকে আল্লাহ এই উম্মতের জন্য বেছে দিয়েছেন। আগের জাতিগুলো এই দিন হারিয়েছিল; আমরা পেয়েছি উপহার হিসেবে। জুমা শুধু দুই রাকাতের নামাজ নয়, পুরো একটা দিনের প্রস্তুতি: গোসল, সুগন্ধি, আগে যাওয়া, মন দিয়ে খুতবা শোনা, দরুদ আর দোয়া।
পর্ব ৫/৬ · আরও নামাজ ও কিরাত (বিন্দুতে চাপলে সেই পর্বে যাবে)
৮টি অধ্যায়
১৩টি আয়াত
২২টি সহিহ হাদিস
২টি দোয়া
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া; হাদিস শুধু সহিহ ও হাসান। দুর্বল বর্ণনা শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে, মানসহ। আয়াতের অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
গল্প দিয়ে শুরু
খুতবা ছেড়ে কাফেলার দিকে: বারোজন যাঁরা থেকে গেলেন
মদিনায় এক জুমার দিন। নবী (ﷺ) দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছেন। হঠাৎ খবর এল, খাদ্যদ্রব্য নিয়ে একটা ব্যবসায়ী কাফেলা এসে পৌঁছেছে।
মানুষ উঠে কাফেলার দিকে ছুটে গেল। নবীজির সাথে রইলেন মাত্র বারোজন। তখন আল্লাহ আয়াত নাজিল করলেন।
আমরা নবী (ﷺ)-এর সাথে (জুমার সময়) ছিলাম, এমন সময় খাদ্যদ্রব্য বহনকারী একটি কাফেলা এল। মানুষ সেদিকে ছুটে গেল, নবী (ﷺ)-এর সাথে বারোজন ছাড়া কেউ রইল না। তখন এই আয়াত নাজিল হলো: "আর যখন তারা কোনো ব্যবসা বা তামাশা দেখল, তখন তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে সেদিকে ছুটে গেল।" (৬২:১১)
আর যখন তারা দেখে ব্যবসা অথবা ক্রীড়া – কৌতুক তখন তারা আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে সেদিকে ছুটে যায়। বলুন, ‘আল্লাহ্র কাছে যা আছে তা খেল-তামাশা ও ব্যবসার চেয়ে উৎকৃষ্ট।’ আর আল্লাহ্ সর্বেশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।
এই গল্প আমাদের কী শেখায়? সাহাবিরাও মানুষ ছিলেন; ক্ষুধা আর ব্যবসার টান তাঁদেরও ছিল। কুরআন সেই মুহূর্তটা চিরকালের জন্য রেখে দিয়েছে, যাতে আমরা মনে রাখি: আল্লাহর কাছে যা আছে তা ব্যবসা আর আমোদের চেয়ে উত্তম, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা। জুমার সময় ফোনের নোটিফিকেশনও সেই কাফেলারই নতুন রূপ।
এই পর্বে ৮টি অধ্যায়
১
আদেশ
জুমার ডাক এলে: কেনাবেচা থামাও
জুমার আজান হলে আল্লাহর জিকিরের দিকে ছুটে যাওয়ার আর বেচাকেনা ছেড়ে দেওয়ার আদেশ।
নামাজ শেষ হলে আবার জমিনে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ খোঁজো। অর্থাৎ ইসলাম কাজের দিন বন্ধ করতে বলেনি, শুধু এক ঘণ্টা আল্লাহর জন্য আলাদা করতে বলেছে।
হে ঈমানদারগণ! জুমু’আর দিনে যখন সালাতের জন্য ডাকা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্বরণে ধাবিত হও এবং কেনা-বেচা ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে।
আপনার জীবনেজুমার দিন দোকান বা অফিসে থাকলে আগে থেকে ঠিক করে রাখুন, আজানের পর কোনো লেনদেন নয়। ক্যালেন্ডারে জুমার সময়টা "ব্লক" করে রাখুন।
২
মর্যাদা
সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন, এই উম্মতের উপহার
যেসব দিনে সূর্য ওঠে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ জুমার দিন: এ দিনে আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, এ দিনেই জান্নাতে প্রবেশ, এ দিনেই সেখান থেকে বের হওয়া, আর কিয়ামতও হবে জুমার দিনে।
আগের জাতিগুলো এই দিন থেকে সরে গিয়েছিল: ইহুদিদের শনিবার, খ্রিস্টানদের রবিবার। আল্লাহ আমাদের জুমার দিনের পথ দেখিয়েছেন। আমরা দুনিয়ায় সবার শেষে এলেও কিয়ামতে সবার আগে।
সূর্য ওঠে এমন দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দিন জুমার দিন। এ দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, আর এ দিনেই সেখান থেকে বের করা হয়েছে। আর কিয়ামতও হবে জুমার দিনেই।
সহিহ মুসলিম ৮৫৪সহিহবর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল
আমাদের আগের জাতিগুলোকে আল্লাহ জুমার দিন থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন: ইহুদিদের জন্য ছিল শনিবার, খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার। তারপর আল্লাহ আমাদের এনে জুমার দিনের দিকে পথ দেখালেন। এভাবে জুমা, শনি, রবি; কিয়ামতের দিনও তারা আমাদের পেছনে থাকবে। দুনিয়ায় আমরা সবার শেষে, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা প্রথম, সব সৃষ্টির আগে আমাদের বিচার হবে।
আপনার জীবনেবৃহস্পতিবার রাতেই পরিবারকে বলুন, কাল আমাদের সপ্তাহের ঈদ। বাচ্চাদের জন্য জুমাকে আনন্দের দিন বানান: পরিষ্কার কাপড়, সুগন্ধি, একসাথে মসজিদে যাওয়া।
৩
প্রস্তুতি
গোসল, সুগন্ধি আর আগে যাওয়া: উট থেকে ডিম
যে জুমার দিন গোসল করে প্রথম সময়ে যায়, সে যেন একটা উট কোরবানি করল; দ্বিতীয় সময়ে গরু, তৃতীয় সময়ে শিং-ওয়ালা দুম্বা, চতুর্থ সময়ে মুরগি, পঞ্চম সময়ে একটা ডিম। ইমাম খুতবার জন্য বের হলে ফেরেশতারাও খুতবা শুনতে হাজির হয়ে যায়।
গোসল, সামর্থ্য অনুযায়ী পবিত্রতা, তেল বা সুগন্ধি, দুজনের মাঝে ফাঁক করে না বসা, যতটুকু পারা যায় নফল, তারপর ইমাম কথা বললে চুপ থাকা; এতে দুই জুমার মাঝের গুনাহ মাফ।
আর আগে আগে হেঁটে গিয়ে ইমামের কাছে বসে মন দিয়ে শুনলে প্রতিটি কদমে এক বছরের রোজা ও রাতের নামাজের সওয়াব।
যে জুমার দিন ফরজ গোসলের মতো গোসল করে প্রথম সময়ে যায়, সে যেন একটি উট কোরবানি করল। যে দ্বিতীয় সময়ে যায়, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল। যে তৃতীয় সময়ে যায়, সে যেন শিংওয়ালা একটি দুম্বা কোরবানি করল। যে চতুর্থ সময়ে যায়, সে যেন একটি মুরগি দান করল। আর যে পঞ্চম সময়ে যায়, সে যেন একটি ডিম দান করল। তারপর ইমাম বের হলে ফেরেশতারা খুতবা শোনার জন্য উপস্থিত হয়।
সহিহ বুখারী ৮৮১সহিহবর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ৩টি দলিল
যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, যথাসাধ্য পবিত্রতা অর্জন করে, তেল লাগায় বা ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে, তারপর বের হয়, দুইজনের মাঝে ফাঁক করে বসে না, তারপর তার জন্য যতটুকু লেখা আছে নামাজ পড়ে, তারপর ইমাম কথা বললে চুপ থাকে, তার এই জুমা থেকে পরের জুমা পর্যন্ত (গুনাহ) মাফ করে দেওয়া হয়।
যে সুন্দরভাবে ওজু করে জুমায় আসে, তারপর মন দিয়ে (খুতবা) শোনে ও চুপ থাকে, তার এই জুমা থেকে পরের জুমা পর্যন্ত, আরও তিন দিনসহ, গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। আর (খুতবার সময়) যে কংকর নাড়াচাড়া করল, সে অনর্থক কাজ করল।
যে জুমার দিন (মাথা) ধোয় ও গোসল করে, তারপর সকাল সকাল যায় এবং খুতবার শুরু ধরে, হেঁটে যায়, বাহনে চড়ে না, ইমামের কাছে বসে, মন দিয়ে শোনে এবং অনর্থক কিছু করে না, তার প্রতিটি কদমের বিনিময়ে এক বছরের রোজা ও রাত জেগে নামাজের সওয়াব লেখা হয়।
আপনার জীবনেএই জুমায় অন্তত আধা ঘণ্টা আগে মসজিদে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন। "উট না হোক, অন্তত গরু" এই লক্ষ্যে শুরু করুন।
৪
দোয়ার মুহূর্ত
জুমার দিনের সেই মুহূর্ত, যখন দোয়া ফেরত যায় না
জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, কোনো মুসলিম তখন নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাইলে আল্লাহ তা দিয়ে দেন। নবীজি হাত দিয়ে ইশারা করে বুঝিয়েছিলেন, সময়টা খুব অল্প।
সেটা কখন? এক বর্ণনায় আসরের পর দিনের শেষ মুহূর্তে খুঁজতে বলা হয়েছে।
আলেমদের মত: সময়টা নিয়ে কয়েকটি মত আছে; সবচেয়ে প্রসিদ্ধ দুটি হলো ইমামের মিম্বারে বসা থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত, আর আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তাই দুই সময়েই দোয়ায় মন দিন।
(রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জুমার দিনের কথা বলে বললেন:) এতে এমন একটি মুহূর্ত আছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি সেই সময় দাঁড়িয়ে নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ তাকে তা দিয়ে দেন। আর তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে বোঝালেন, মুহূর্তটি খুব অল্প।
সহিহ বুখারী ৯৩৫সহিহবর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল
আপনার জীবনেজুমার দিন আসরের পর মাগরিব পর্যন্ত সময়টা ফোন রেখে দোয়ার জন্য আলাদা করুন। আগে থেকে একটা কাগজে লিখে রাখুন, কী কী চাইবেন।
৫
নিয়ম
জুমা কার ওপর ফরজ, কীভাবে পড়বেন
জুমা জামাতের সাথে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষের ওপর ফরজ, চার শ্রেণি ছাড়া: ক্রীতদাস, নারী, শিশু ও অসুস্থ। মুসাফিরের ওপরও জুমা ফরজ নয়।
জুমা দুই রাকাত, এবং তা পূর্ণাঙ্গ নামাজ, কম করা নয়। জুমা পড়লে সেদিন জোহর পড়তে হয় না।
নবীজি জুমায় সাধারণত সূরা আল-আ'লা ও আল-গাশিয়াহ পড়তেন (সহিহ মুসলিম ৮৭৮)। নারী বা মুসাফির মসজিদে গিয়ে জুমা পড়লে তাদের জোহর আদায় হয়ে যায়; না গেলে ঘরে জোহর পড়বেন।
জুমার পর সুন্নত: মসজিদে পড়লে চার রাকাত (সহিহ মুসলিম ৮৮১); ঘরে ফিরে পড়লে দুই রাকাত, নবীজি যেমন পড়তেন।
জুমার আগে কত রাকাত? জুমার আগে নির্দিষ্ট সংখ্যার সুন্নত প্রমাণে সহিহ হাদিস নেই। ইমাম আসার আগ পর্যন্ত যত খুশি নফল পড়া যায় (সহিহ বুখারী ৮৮৩)। হানাফি মাযহাবে আগে চার রাকাত সুন্নত পড়া হয়, যা কয়েকজন সাহাবির আমলের ভিত্তিতে।
জুমা জামাতের সাথে প্রত্যেক মুসলিমের ওপর অবশ্য কর্তব্য, চার শ্রেণি ছাড়া: ক্রীতদাস, নারী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তি।
জুমার নামাজ দুই রাকাত, ঈদুল ফিতরের নামাজ দুই রাকাত, ঈদুল আযহার নামাজ দুই রাকাত, আর সফরের নামাজ দুই রাকাত; পূর্ণাঙ্গ, সংক্ষিপ্ত নয়, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর জবানে।
আপনার জীবনেএই জুমায় খুতবার আগে মসজিদে ঢুকে যতটা সময় পান, দুই দুই রাকাত করে নফল পড়ুন, আর জুমার পর ঘরে বা মসজিদে সুন্নত না ছাড়ার নিয়ত করুন।
৬
খুতবার আদব
খুতবা: চুপ থাকা, ঘাড় না ডিঙানো
ইমামের খুতবার সময় পাশের জনকে "চুপ করো" বলাও অনর্থক কাজ, যা জুমার সওয়াব কমিয়ে দেয়।
এক লোক মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে যাচ্ছিল; নবীজি খুতবার মধ্যে বললেন: বসে পড়ো, তুমি কষ্ট দিচ্ছ।
খুতবা চলার সময় এলেও সংক্ষেপে দুই রাকাত পড়ে বসুন। এক সাহাবি না পড়ে বসে গেলে নবীজি খুতবা থামিয়ে বললেন, ওঠো, দুই রাকাত পড়ো।
আর ইমামদের জন্য নবীজির পরামর্শ: নামাজ লম্বা, খুতবা ছোট; এটা বোঝার পরিচয়।
খুতবার আগে দুই রাকাত নিয়ে: শাফেয়ি ও হাম্বলি মতে ওপরের হাদিস অনুযায়ী খুতবার সময় এসেও দুই রাকাত পড়বেন। হানাফি ও মালিকি মতে খুতবা শুরু হলে নামাজ না পড়ে চুপ করে শোনা উত্তম।
জুমার দিন ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় তুমি যদি পাশের জনকে বলো "চুপ করো", তাহলেও তুমি অনর্থক কাজ করলে।
সহিহ বুখারী ৯৩৪সহিহবর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ৩টি দলিল
جَاءَ رَجُلٌ يَتَخَطَّى رِقَابَ النَّاسِ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ بُسْرٍ جَاءَ رَجُلٌ يَتَخَطَّى رِقَابَ النَّاسِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " اجْلِسْ فَقَدْ آذَيْتَ
জুমার দিন নবী (ﷺ) খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় এক লোক মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে আসছিল। নবী (ﷺ) তাকে বললেন: বসে পড়ো, তুমি মানুষকে কষ্ট দিয়েছ।
আপনার জীবনেজুমায় ফোন পুরো বন্ধ করে ঢুকুন। খুতবায় যা শুনলেন, তা থেকে একটা কথা বাসায় ফিরে পরিবারকে বলুন।
৭
জুমার আমল
জুমার দিনের বিশেষ আমল: দরুদ, সূরা কাহফ
গোসল: জুমার দিনের গোসল প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের ওপর "ওয়াজিব"; আলেমদের অধিকাংশের মতে এর অর্থ জোরালো সুন্নত।
দরুদ: এই দিনে বেশি বেশি দরুদ পড়ো, কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।
সূরা কাহফ: যে সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করে, দাজ্জাল থেকে তাকে রক্ষা করা হয় (সহিহ মুসলিম ৮০৯)। জুমার দিন পুরো সূরা কাহফ পড়ার ফজিলতের বর্ণনাগুলোর কিছুকে আলেমরা সহিহ বা হাসান বলেছেন, তাই অনেকে এই দিনে পুরোটা পড়েন।
তবে জুমার রাতকে শুধু নফল নামাজের জন্য আর জুমার দিনকে শুধু রোজার জন্য আলাদা করে নির্দিষ্ট করতে নিষেধ আছে।
তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি জুমার দিন। এ দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিনেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে, এ দিনেই শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে, এ দিনেই সবাই বেহুঁশ হবে। তাই এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়ো, কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।
রাতগুলোর মধ্যে শুধু জুমার রাতকে কিয়ামের (রাতের নামাজের) জন্য আলাদা কোরো না, আর দিনগুলোর মধ্যে শুধু জুমার দিনকে রোজার জন্য আলাদা কোরো না; তবে তোমাদের কারো নিয়মিত রোজার মধ্যে পড়ে গেলে আলাদা কথা।
(সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ওপর দরুদ কীভাবে পড়ব? তিনি বললেন, বলো:) "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।" (হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবারের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন ইবরাহীম ও তাঁর পরিবারের ওপর করেছেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত। হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবারের ওপর বরকত দিন, যেমন ইবরাহীম ও তাঁর পরিবারের ওপর দিয়েছেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত।)
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই যিনি তাঁর বান্দার উপর কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে তিনি বক্রতা রাখেননি; সরলরূপে, তাঁর কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য এবং মুমিনগণ যারা সৎকাজ করে, তাদেরকে এ সুসংবাদ দেয়ার জন্য যে, তাদের জন্য আছে উত্তম পুরস্কার, যাতে তারা স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, আর সতর্ক করার জন্য তাদেরকে যারা বলে, আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করেছেন, এ বিষয়ে তাদের কোনো জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না। তাদের মুখ থেকে বের হওয়া বাক্য কী সাংঘাতিক! তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে। তারা এ বাণীতে ঈমান না আনলে সম্ভবত তাদের পিছনে ঘুরে আপনি দুঃখে আত্ম-বিনাশী হয়ে পড়বেন। নিশ্চয় যমীনের উপর যা কিছু আছে আমরা সেগুলোকে তার শোভা করেছি, মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কাজে কে শ্রেষ্ঠ। আর তার উপর যা কিছু আছে তা অবশ্যই আমরা উদ্ভিদশূন্য ময়দানে পরিণত করব। আপনি কি মনে করেন যে, কাহফ ও রাকীমের অধিবাসীরা আমাদের নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর? যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল তখন তারা বলেছিল, ‘হে আমাদের রব! আপনি নিজ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন।
কুরআনের দোয়ার অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে; হাদিসের দোয়ার সাথে মূল গ্রন্থের নম্বর ও মান দেওয়া আছে।
আমল চেকলিস্ট
টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।
প্রচলিত ভুল
জাল
"জুমা গরিবের হজ।"
যা সঠিক: এই কথাটি হাদিস হিসেবে প্রমাণিত নয়; মুহাদ্দিসরা এর সনদকে জাল বা ভিত্তিহীন বলেছেন। জুমার মর্যাদা বোঝাতে সহিহ হাদিসই যথেষ্ট (সহিহ মুসলিম ৮৫৪)।
খুবই দুর্বল
জুমার আগে চার রাকাত সুন্নত নবীজির নির্দিষ্ট আমল ছিল (হাদিস: "তিনি জুমার আগে চার রাকাত পড়তেন")।
যা সঠিক: এই বর্ণনাটি (ইবনু মাজাহ ১১২৯) শাইখ আলবানী খুবই দুর্বল বলেছেন। ইমাম আসার আগে যত খুশি নফল পড়ার কথা সহিহ (সহিহ বুখারী ৮৮৩)। হানাফি মাযহাবে চার রাকাত পড়া হয় সাহাবিদের আমলের ভিত্তিতে; চাইলে পড়ুন, কিন্তু একে নবীজির হাদিস বলবেন না।
ভিত্তিহীন
জুমার পর "আখেরি জোহর" পড়তে হয়, কারণ জুমা কবুল হলো কি না নিশ্চিত নয়।
যা সঠিক: জুমা দুই রাকাতের পূর্ণাঙ্গ নামাজ, যা জোহরের বদলে (সুনানে আন-নাসাঈ ১৪২০)। জুমার পর আবার জোহর পড়ার কোনো দলিল নবীজি বা সাহাবিদের থেকে নেই।
প্রমাণ নেই
"জুমা মোবারক" বলা সুন্নাহ, আর না বললে জুমার আদব পূর্ণ হয় না।
যা সঠিক: নবীজি বা সাহাবিরা জুমার দিন বিশেষ কোনো শুভেচ্ছাবাক্য বলতেন, এমন প্রমাণ নেই। ভালো দোয়া হিসেবে বলা দোষের নয়, কিন্তু একে সুন্নাহ মনে করা বা বার্তা পাঠানোকে জরুরি ভাবা ঠিক নয়।
দুর্বল
জুমার দিন নখ কাটলে বিশেষ রোগমুক্তি বা নির্দিষ্ট পুরস্কার।
যা সঠিক: জুমার দিন নখ কাটার নির্দিষ্ট ফজিলতের বর্ণনাগুলো দুর্বল। নখ কাটা ফিতরাতের সুন্নাহ, যেকোনো দিন করা যায়; তবে চল্লিশ দিনের বেশি দেরি করা উচিত নয়।
প্রতিটি দাবি যাচাই করা হয়েছে কুরআন, সহিহ হাদিস ও মুহাদ্দিসদের মান অনুযায়ী।
সব হাদিস
আমরা নবী (ﷺ)-এর সাথে (জুমার সময়) ছিলাম, এমন সময় খাদ্যদ্রব্য বহনকারী একটি কাফেলা এল। মানুষ সেদিকে ছুটে গেল, নবী (ﷺ)-এর সাথে বারোজন ছাড়া কেউ রইল না। তখন এই আয়াত নাজিল হলো: "আর যখন তারা কোনো ব্যবসা বা তামাশা দেখল, তখন তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে সেদিকে ছুটে গেল।" (৬২:১১)
সূর্য ওঠে এমন দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দিন জুমার দিন। এ দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, আর এ দিনেই সেখান থেকে বের করা হয়েছে। আর কিয়ামতও হবে জুমার দিনেই।
আমাদের আগের জাতিগুলোকে আল্লাহ জুমার দিন থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন: ইহুদিদের জন্য ছিল শনিবার, খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার। তারপর আল্লাহ আমাদের এনে জুমার দিনের দিকে পথ দেখালেন। এভাবে জুমা, শনি, রবি; কিয়ামতের দিনও তারা আমাদের পেছনে থাকবে। দুনিয়ায় আমরা সবার শেষে, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা প্রথম, সব সৃষ্টির আগে আমাদের বিচার হবে।
যে জুমার দিন ফরজ গোসলের মতো গোসল করে প্রথম সময়ে যায়, সে যেন একটি উট কোরবানি করল। যে দ্বিতীয় সময়ে যায়, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল। যে তৃতীয় সময়ে যায়, সে যেন শিংওয়ালা একটি দুম্বা কোরবানি করল। যে চতুর্থ সময়ে যায়, সে যেন একটি মুরগি দান করল। আর যে পঞ্চম সময়ে যায়, সে যেন একটি ডিম দান করল। তারপর ইমাম বের হলে ফেরেশতারা খুতবা শোনার জন্য উপস্থিত হয়।
যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, যথাসাধ্য পবিত্রতা অর্জন করে, তেল লাগায় বা ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে, তারপর বের হয়, দুইজনের মাঝে ফাঁক করে বসে না, তারপর তার জন্য যতটুকু লেখা আছে নামাজ পড়ে, তারপর ইমাম কথা বললে চুপ থাকে, তার এই জুমা থেকে পরের জুমা পর্যন্ত (গুনাহ) মাফ করে দেওয়া হয়।
যে সুন্দরভাবে ওজু করে জুমায় আসে, তারপর মন দিয়ে (খুতবা) শোনে ও চুপ থাকে, তার এই জুমা থেকে পরের জুমা পর্যন্ত, আরও তিন দিনসহ, গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। আর (খুতবার সময়) যে কংকর নাড়াচাড়া করল, সে অনর্থক কাজ করল।
যে জুমার দিন (মাথা) ধোয় ও গোসল করে, তারপর সকাল সকাল যায় এবং খুতবার শুরু ধরে, হেঁটে যায়, বাহনে চড়ে না, ইমামের কাছে বসে, মন দিয়ে শোনে এবং অনর্থক কিছু করে না, তার প্রতিটি কদমের বিনিময়ে এক বছরের রোজা ও রাত জেগে নামাজের সওয়াব লেখা হয়।
(রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জুমার দিনের কথা বলে বললেন:) এতে এমন একটি মুহূর্ত আছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি সেই সময় দাঁড়িয়ে নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ তাকে তা দিয়ে দেন। আর তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে বোঝালেন, মুহূর্তটি খুব অল্প।
জুমার নামাজ দুই রাকাত, ঈদুল ফিতরের নামাজ দুই রাকাত, ঈদুল আযহার নামাজ দুই রাকাত, আর সফরের নামাজ দুই রাকাত; পূর্ণাঙ্গ, সংক্ষিপ্ত নয়, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর জবানে।
جَاءَ رَجُلٌ يَتَخَطَّى رِقَابَ النَّاسِ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ بُسْرٍ جَاءَ رَجُلٌ يَتَخَطَّى رِقَابَ النَّاسِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " اجْلِسْ فَقَدْ آذَيْتَ
জুমার দিন নবী (ﷺ) খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় এক লোক মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে আসছিল। নবী (ﷺ) তাকে বললেন: বসে পড়ো, তুমি মানুষকে কষ্ট দিয়েছ।
তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি জুমার দিন। এ দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিনেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে, এ দিনেই শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে, এ দিনেই সবাই বেহুঁশ হবে। তাই এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়ো, কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।
রাতগুলোর মধ্যে শুধু জুমার রাতকে কিয়ামের (রাতের নামাজের) জন্য আলাদা কোরো না, আর দিনগুলোর মধ্যে শুধু জুমার দিনকে রোজার জন্য আলাদা কোরো না; তবে তোমাদের কারো নিয়মিত রোজার মধ্যে পড়ে গেলে আলাদা কথা।
(সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ওপর দরুদ কীভাবে পড়ব? তিনি বললেন, বলো:) "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।" (হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবারের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন ইবরাহীম ও তাঁর পরিবারের ওপর করেছেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত। হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবারের ওপর বরকত দিন, যেমন ইবরাহীম ও তাঁর পরিবারের ওপর দিয়েছেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত।)