কোনো সম্মানিত মানুষের সাথে দেখা করতে গেলে আমরা পরিচ্ছন্ন হয়ে, ভালো পোশাক পরে, সময়মতো যাই। নামাজ হলো আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো। তাই ইসলাম শরীর, কাপড়, জায়গা আর মনকে প্রস্তুত করার পুরো একটা পদ্ধতি দিয়েছে, আর এই প্রস্তুতিও নিজেই ইবাদত।
পর্ব ১/৬ · নামাজের আগে (বিন্দুতে চাপলে সেই পর্বে যাবে)
৮টি অধ্যায়
৪টি আয়াত
২৭টি সহিহ হাদিস
৫টি দোয়া
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া; হাদিস শুধু সহিহ ও হাসান। দুর্বল বর্ণনা শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে, মানসহ। আয়াতের অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
গল্প দিয়ে শুরু
আজান যেভাবে এল: এক সাহাবির স্বপ্ন
হিজরতের পর মদিনায় মসজিদ তৈরি হলো, কিন্তু নামাজের সময় মানুষকে ডাকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সবাই আন্দাজ করে আসত; কেউ আগে, কেউ দেরিতে। একদিন সাহাবিরা বসে পরামর্শ করলেন। কেউ বললেন, খ্রিস্টানদের মতো ঘণ্টা বাজানো হোক। কেউ বললেন, ইহুদিদের মতো শিঙা। উমার (রা.) বললেন, একজন মানুষকে পাঠানো হোক, যে ডাক দেবে।
মুসলিমরা মদিনায় এসে নামাজের জন্য আন্দাজ করে জমা হতেন, তখন নামাজের জন্য কোনো ডাক দেওয়া হতো না। একদিন এ নিয়ে তাঁরা আলোচনা করলেন। কেউ বললেন, খ্রিস্টানদের মতো ঘণ্টা নাও। কেউ বললেন, বরং ইহুদিদের মতো শিঙা। উমার (রা.) বললেন, তোমরা একজন মানুষকে পাঠাও না কেন, যে নামাজের জন্য ডাক দেবে? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: হে বিলাল, ওঠো, নামাজের জন্য ডাক দাও।
সেই রাতে আবদুল্লাহ ইবনু যায়দ (রা.) স্বপ্নে দেখলেন, এক লোক হাতে ঘণ্টা নিয়ে যাচ্ছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ঘণ্টাটা বিক্রি করবে? নামাজে ডাকব। লোকটি বলল, এর চেয়ে ভালো কিছু শিখিয়ে দিই? তারপর শিখিয়ে দিল: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার... আজ পৃথিবীর প্রতিটি কোণে যে বাক্যগুলো দিনে পাঁচবার শোনা যায়।
সকালে তিনি ছুটে গেলেন নবী (ﷺ)-এর কাছে। নবীজি বললেন: ইনশাআল্লাহ, এটা সত্য স্বপ্ন। বিলালকে শিখিয়ে দাও, তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে উঁচু। হাবশার এক সাবেক দাস, যাঁকে একদিন মক্কার গরম বালুতে শুইয়ে পাথর চাপা দেওয়া হয়েছিল, সেই বিলাল (রা.) মদিনার আকাশে প্রথম আজান দিলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মানুষকে নামাজে ডাকার জন্য ঘণ্টা বানানোর আদেশ দিলেন, তখন আমি ঘুমের মধ্যে দেখলাম, এক লোক হাতে ঘণ্টা নিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর বান্দা, ঘণ্টাটা বিক্রি করবে? সে বলল, এটা দিয়ে কী করবে? বললাম, এটা দিয়ে নামাজে ডাকব। সে বলল, এর চেয়ে ভালো কিছু দেখিয়ে দেব না? তারপর সে আজানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দিল, তারপর ইকামতের বাক্য। সকালে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে স্বপ্নের কথা জানালাম। তিনি বললেন: ইনশাআল্লাহ, এটা সত্য স্বপ্ন। তুমি বিলালের সাথে দাঁড়াও, যা দেখেছ তাকে বলে দাও, সে আজান দিক; কারণ তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে উঁচু।
এই গল্প আমাদের কী শেখায়? নামাজের ডাকও ইবাদতের অংশ, তাই তা এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে, মানুষের বানানো ঘণ্টা বা শিঙা থেকে নয়। আর আজান শুনে প্রস্তুত হওয়া, ওজু করা, মসজিদের দিকে হাঁটা, সবই সেই ডাকে সাড়া দেওয়া।
এই পর্বে ৮টি অধ্যায়
১
কেন প্রস্তুতি
পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক
আল্লাহ বলেছেন, তিনি পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।
নবী (ﷺ) পবিত্রতাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন, আর বলেছেন, পবিত্রতা ছাড়া কোনো নামাজ কবুল হয় না।
ওজু শুধু শরীর ধোয়া নয়। মুখ ধোয়ার সাথে চোখের গুনাহ, হাত ধোয়ার সাথে হাতের গুনাহ, পা ধোয়ার সাথে পায়ের গুনাহ ঝরে যায়।
পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। আর "আলহামদুলিল্লাহ" (আমলের) পাল্লা ভরে দেয়।
সহিহ মুসলিম ২২৩সহিহবর্ণনা: আবু মালিক আল-আশআরী (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ৩টি দলিল
আর তারা আপনাকে রজঃস্রাব (হায়েজ) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। বলুন, তা ‘অশুচি’। কাজেই তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রী-সঙ্গম থেকে বিরত থাক এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত (সঙ্গমের জন্যে) তাদের নিকটবর্তী হবে না। তারপর তারা যখন উত্তমরূপে পরিশুদ্ধ হবে তখন তাদের নিকট ঠিক সেভাবে গমন করবে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালোবাসেন এবং তাদেরকেও ভালোবাসেন যারা পবিত্র থাকে।
মুসলিম বা মুমিন বান্দা যখন ওজু করে মুখ ধোয়, তখন চোখ দিয়ে দেখা সব গুনাহ পানির সাথে (বা পানির শেষ ফোঁটার সাথে) মুখ থেকে বের হয়ে যায়। হাত ধুলে হাত দিয়ে ধরা সব গুনাহ বের হয়ে যায়। পা ধুলে পা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সব গুনাহ বের হয়ে যায়। শেষে সে গুনাহ থেকে পরিষ্কার হয়ে বের হয়।
আপনার জীবনেপরের বার ওজুর সময় মনে মনে ভাবুন: এই পানির সাথে আমার আজকের ভুলগুলো ঝরে যাচ্ছে। তাড়াহুড়ার ওজু আর মনোযোগের ওজুর পার্থক্য নিজেই টের পাবেন।
২
টয়লেট
পবিত্রতার শুরু: টয়লেটের আদব
প্রস্রাবের ছিটা থেকে অসতর্কতা ছোট বিষয় নয়। দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নবীজি জানালেন, তাদের শাস্তি হচ্ছে, আর একজনের শাস্তির কারণ সে প্রস্রাব থেকে সাবধান থাকত না।
ঢোকার আগে দোয়া, বাম পা দিয়ে ঢোকা, পরিষ্কারের কাজ বাম হাতে, পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার হওয়া, আর বের হয়ে "গুফরানাকা" বলা, এই হলো সুন্নাহ।
নবী (ﷺ) টয়লেটে ঢোকার সময় বলতেন: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস" (হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অপবিত্র পুরুষ ও নারী শয়তান থেকে আশ্রয় চাই)।
নবী (ﷺ) মদিনা বা মক্কার একটি বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দুজন মানুষের আওয়াজ শুনলেন, যাদের কবরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি বললেন: তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, অথচ (তাদের ধারণায়) বড় কোনো কারণে নয়। তারপর বললেন: হ্যাঁ, (আসলে তা বড়)। তাদের একজন প্রস্রাব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখত না, আর অন্যজন চোগলখুরি করে বেড়াত।
আপনার জীবনেটয়লেটের দরজায় দোয়াটা ছোট কাগজে লিখে রাখুন, পরিবারের ছোটরাও শিখে যাবে। বের হয়ে "গুফরানাকা" বলার অভ্যাস করুন।
৩
ওজু
ওজু ধাপে ধাপে, যেভাবে সাহাবিরা দেখিয়েছেন
কুরআনে ওজুর মূল চারটি কাজ আছে: মুখ ধোয়া, হাত কনুইসহ ধোয়া, মাথা মাসেহ আর পা টাখনুসহ ধোয়া।
খলিফা উসমান (রা.) একদিন পানি আনিয়ে সবার সামনে ধীরে ধীরে ওজু করে দেখালেন, তারপর বললেন, আমি নবীজিকে ঠিক এভাবে ওজু করতে দেখেছি।
নিয়ত মনে মনে, তারপর বিসমিল্লাহ।
দুই হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার, আঙুলের ফাঁকসহ।
কুলি ও নাকে পানি তিনবার করে; ডান হাতে পানি নিয়ে নাকে, বাম হাতে ঝাড়া।
মুখমণ্ডল তিনবার: কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনির নিচ, এক কান থেকে অন্য কান।
দুই হাত কনুইসহ তিনবার, আগে ডান।
মাথা মাসেহ একবার: ভেজা হাত কপাল থেকে পেছনে, আবার সামনে। সাথে কান মাসেহ।
দুই পা টাখনুসহ তিনবার, আগে ডান; আঙুলের ফাঁক খিলাল করে।
শেষে কালিমা শাহাদাতের দোয়া।
গোড়ালি যেন শুকনো না থাকে। তাড়াহুড়ায় পায়ে শুধু ভেজা হাত বুলাতে দেখে নবীজি উঁচু গলায় সতর্ক করেছিলেন।
ওজু শেষের দোয়া পড়লে জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয়।
মাযহাবের পার্থক্য: হানাফি মতে ওজুর ফরজ চারটি, যা আয়াতে আছে; বাকিগুলো সুন্নত। শাফেয়ি ও হাম্বলি মতে নিয়ত ও ক্রমও ফরজ। নবীজির পুরো পদ্ধতি মানলে সব মতই মানা হয়ে যায়। নখপালিশের মতো যা চামড়ায় পানি পৌঁছাতে দেয় না, তা থাকলে ওজু হয় না।
হে মুমিনগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য দাঁড়াতে চাও তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাতগুলো কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, তোমাদের মাথায় মাসেহ কর এবং পায়ের টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে নাও আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হবে। আর যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে বা তোমরা স্ত্রীর সাথে সংগত হও এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করবে। সুতরাং তা দ্বারা মুখমণ্ডলে ও হাতে মাসেহ করবে। আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো সংকীর্ণতা করতে চান না; বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি তাঁর নেয়ামত সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।
তিনি দেখলেন, উসমান ইবনু আফফান (রা.) একটি পাত্র আনালেন। তিনবার দুই হাতের তালুতে পানি ঢেলে তা ধুলেন। তারপর ডান হাত পাত্রে ঢুকিয়ে (পানি নিয়ে) কুলি করলেন ও নাকে পানি দিলেন। তারপর তিনবার মুখমণ্ডল ধুলেন, আর দুই হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। তারপর মাথা মাসাহ করলেন। তারপর দুই পা টাখনু পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। তারপর বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যে আমার এই অজুর মতো অজু করে, তারপর দুই রাকাত নামাজ পড়ে, যাতে সে মনে মনে (দুনিয়ার) কথা বলে না, তার আগের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
সহিহ বুখারী ১৫৯সহিহবর্ণনাকারী: উসমান ইবনু আফফান (রা.)-এর মুক্ত দাস হুমরান
تَخَلَّفَ عَنَّا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِي سَفْرَةٍ سَافَرْنَاهَا، فَأَدْرَكَنَا وَقَدْ أَرْهَقَتْنَا الصَّلاَةُ وَنَحْنُ نَتَوَضَّأُ، فَجَعَلْنَا نَمْسَحُ عَلَى أَرْجُلِنَا، فَنَادَى بِأَعْلَى صَوْتِهِ " وَيْلٌ لِلأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ
এক সফরে নবী (ﷺ) আমাদের পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি যখন আমাদের ধরলেন, তখন নামাজের সময় চলে যাচ্ছিল আর আমরা তাড়াহুড়া করে ওজু করছিলাম; পায়ে শুধু ভেজা হাত বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। তিনি উচ্চস্বরে দুই বা তিনবার বললেন: গোড়ালিগুলোর জন্য জাহান্নামের দুর্ভোগ!
তোমাদের যে কেউ অজু করে এবং পূর্ণভাবে অজু করে, তারপর বলে: "আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুল্লাহি ওয়া রাসূলুহ" (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হয়, যেটা দিয়ে ইচ্ছা সে প্রবেশ করবে।
সহিহ মুসলিম ২৩৪সহিহবর্ণনাকারী: উকবা ইবনু আমির (রা.), উমার (রা.) থেকে
আপনার জীবনেআজ একবার আয়নার সামনে ধীরে ধীরে ওজু করুন, ওপরের তালিকা মিলিয়ে। গোড়ালি, আঙুলের ফাঁক আর কনুই, এই তিন জায়গা সবচেয়ে বেশি শুকনো থাকে।
৪
ওজু ভাঙা
কিসে ওজু ভাঙে, আর সন্দেহ হলে কী করবেন
প্রস্রাব, পায়খানা বা বায়ু বের হলে, গভীর ঘুমে, জ্ঞান হারালে ওজু ভাঙে; আর যা গোসল ফরজ করে, তা ওজুও ভাঙে। ওজু ভাঙলে নতুন ওজু ছাড়া নামাজ কবুল হয় না।
কিন্তু শুধু সন্দেহে ওজু ভাঙে না। নামাজে কেউ পেটে কিছু অনুভব করে দ্বিধায় পড়লে নবীজি বললেন, আওয়াজ না শোনা বা গন্ধ না পাওয়া পর্যন্ত নামাজ ছেড়ে যাবে না।
মতভেদ আছে: রক্ত বা মুখভরা বমিতে হানাফি মতে ওজু ভাঙে, শাফেয়ি ও মালিকি মতে ভাঙে না। লজ্জাস্থান সরাসরি স্পর্শে শাফেয়ি ও হাম্বলি মতে ভাঙে, হানাফি মতে ভাঙে না। নিজের মাযহাব মেনে চলুন; সন্দেহ থাকলে নতুন ওজু করে নেওয়া সতর্কতা।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে অভিযোগ করল যে নামাজের মধ্যে তার মনে হয় যেন কিছু (বায়ু) বের হয়েছে। তিনি বললেন: সে যেন নামাজ ছেড়ে না যায়, যতক্ষণ না কোনো শব্দ শোনে বা গন্ধ পায়।
আপনার জীবনেবারবার "ওজু ভাঙল কি না" মনে হলে মূলনীতিটা মনে রাখুন: নিশ্চিত পবিত্রতা সন্দেহে নষ্ট হয় না। এই ওয়াসওয়াসাকে পাত্তা দেবেন না।
৫
গোসল ও তায়াম্মুম
গোসল, মোজায় মাসেহ আর তায়াম্মুম: সহজ করে দেওয়া দ্বীন
স্বামী-স্ত্রীর মিলন, স্বপ্নদোষ, আর মাসিক বা প্রসব-পরবর্তী রক্ত শেষ হলে গোসল ফরজ। নবীজির গোসল ছিল এভাবে: হাত ধোয়া, লজ্জাস্থান পরিষ্কার, নামাজের মতো ওজু, চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো, তারপর পুরো শরীরে পানি।
শীতে বা সফরে পূর্ণ ওজু করে চামড়ার মোজা পরলে, মুকিম এক দিন এক রাত, মুসাফির তিন দিন তিন রাত মোজার ওপর মাসেহ করতে পারেন।
আর পানি না পেলে? এক সফরে আয়েশা (রা.)-এর হার হারিয়ে গেল, সবাই পানিহীন জায়গায় আটকে গেলেন, তখন নাজিল হলো তায়াম্মুমের আয়াত।
পদ্ধতি সহজ: দুই হাত একবার পবিত্র মাটিতে মেরে, ঝেড়ে, মুখ আর দুই হাত মাসেহ।
নারীদের জন্য: মাসিক ও নিফাসের সময় নামাজ নেই, পরে কাজাও নেই; রোজা পরে কাজা করতে হয়। এটা আল্লাহর দেওয়া ছাড়, অপমান নয়; এ সময়েও জিকির ও দোয়া চলবে।
আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বের হলাম। বাইদা বা যাতুল জাইশে পৌঁছালে আমার গলার হার ছিঁড়ে হারিয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেটা খুঁজতে থেমে গেলেন, মানুষও থামল, অথচ সেখানে পানি ছিল না, সাথেও পানি ছিল না। মানুষ আবু বকর (রা.)-এর কাছে অভিযোগ করল। তিনি এসে আমাকে ভর্ৎসনা করলেন। ভোর হলো, পানি নেই। তখন আল্লাহ তায়াম্মুমের আয়াত নাজিল করলেন, আর সবাই তায়াম্মুম করল। উসাইদ ইবনু হুদাইর (রা.) বললেন: হে আবু বকরের পরিবার, এটা তোমাদের প্রথম বরকত নয়! পরে যে উটে আমি ছিলাম, সেটাকে ওঠানো হলে তার নিচেই হারটা পাওয়া গেল।
নবী (ﷺ) যখন জানাবাতের (বড় নাপাকির) গোসল করতেন, প্রথমে দুই হাত ধুতেন। তারপর নামাজের অজুর মতো অজু করতেন। তারপর আঙুল পানিতে ভিজিয়ে চুলের গোড়ায় খিলাল করতেন। তারপর দুই হাতে তিন আঁজলা পানি মাথায় ঢালতেন। তারপর সারা শরীরে পানি ঢেলে দিতেন।
(আমি পানি না পেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়েছিলাম, পরে নবী (ﷺ)-কে জানালে) তিনি বললেন: তোমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। এই বলে তিনি হাতের তালু একবার মাটিতে মারলেন, ঝেড়ে নিলেন, তারপর বাম হাত দিয়ে ডান হাতের পিঠ (বা ডান দিয়ে বামের পিঠ) মাসেহ করলেন, তারপর দুই হাত দিয়ে মুখ মাসেহ করলেন।
আপনার জীবনেহাসপাতালে বা অসুস্থ কাউকে দেখলে মনে করিয়ে দিন: পানি ব্যবহার ক্ষতিকর হলে তায়াম্মুম করে নামাজ পড়া যায়। নামাজ ছাড়ার দরকার নেই।
৬
পোশাক ও কিবলা
পোশাক, কিবলা আর নামাজের জায়গা
আল্লাহ বলেছেন, প্রত্যেক নামাজের সময় সুন্দর পোশাক পরো।
পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু ঢাকা ফরজ, কাঁধও ঢাকা উচিত। নারীর মুখ ও কবজি পর্যন্ত হাত ছাড়া পুরো শরীর। যে পোশাকে অফিসে বা বিয়েতে যেতে লজ্জা লাগে, সেটা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর জন্যও উপযুক্ত নয়।
মদিনায় প্রায় ষোলো-সতেরো মাস মুসলিমরা বায়তুল মাকদিসের দিকে নামাজ পড়েছেন। নবীজি মনে মনে চাইতেন কাবা কিবলা হোক, বারবার আকাশের দিকে তাকাতেন। তখন নাজিল হলো এই আয়াত।
পরদিন কুবার মুসল্লিরা ফজর পড়ছিলেন, খবর পেয়ে নামাজের মধ্যেই কাবার দিকে ঘুরে গেলেন।
বাংলাদেশ থেকে কিবলা পশ্চিমে, একটু উত্তর ঘেঁষে। আর পুরো পৃথিবীই নামাজের জায়গা; যেখানে সময় হবে, সেখানেই পড়া যায়।
একা পড়লে সামনে একটা আড়াল (সুতরা) রাখুন। আর নামাজির সামনে দিয়ে হাঁটা থেকে সাবধান।
অবশ্যই আমরা আকাশের দিকে আপনার বারবার তাকানো লক্ষ্য করি। সুতরাং অবশ্যই আমরা আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিব যা আপনি পছন্দ করেন। অতএব আপনি মসজিদুল হারামের দিকে চেহারা ফিরান। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন তোমাদের চেহারাসমূহকে এর দিকে ফিরাও এবং নিশ্চয় যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা অবশ্যই জানে যে, এটা তাদের রবের পক্ষ হতে হক। আর তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ্ গাফেল নন।
কুবায় মানুষ ফজরের নামাজ পড়ছিল। এমন সময় একজন এসে বলল: আজ রাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর কুরআন নাজিল হয়েছে, তাঁকে কাবার দিকে মুখ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে; তাই তোমরাও কাবার দিকে ফেরো। তাদের মুখ ছিল শামের (বায়তুল মাকদিসের) দিকে, তারা (নামাজের মধ্যেই) ঘুরে কাবার দিকে ফিরল।
আমাকে পাঁচটি জিনিস দেওয়া হয়েছে, যা আমার আগে কাউকে দেওয়া হয়নি: এক মাসের দূরত্ব পর্যন্ত শত্রুর মনে ভয় দিয়ে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে; পুরো পৃথিবীকে আমার জন্য মসজিদ ও পবিত্রতার উপকরণ বানানো হয়েছে, তাই আমার উম্মতের যে কেউ যেখানে নামাজের সময় পাবে, সেখানেই পড়ে নেবে; গনিমতের সম্পদ আমার জন্য হালাল করা হয়েছে; আমাকে শাফাআত দেওয়া হয়েছে; আর আগের নবীরা শুধু নিজ জাতির কাছে আসতেন, আমাকে পাঠানো হয়েছে সব মানুষের কাছে।
নামাজির সামনে দিয়ে যে যায়, সে যদি জানত এতে তার কী গুনাহ, তাহলে সামনে দিয়ে যাওয়ার চেয়ে চল্লিশ (দিন, মাস বা বছর) দাঁড়িয়ে থাকা তার কাছে ভালো মনে হতো।
আপনার জীবনেঅফিসে বা দোকানে নামাজের জন্য একটা পরিষ্কার কোণ ঠিক করুন, কিবলার দিক একবার কম্পাসে দেখে চিহ্ন দিয়ে রাখুন। প্রস্তুতি সহজ হলে নামাজ দেরি হয় না।
৭
আজান ও মসজিদ
আজানের জবাব, দোয়া আর মসজিদে যাওয়ার আদব
মুয়াজ্জিন যা বলে, তা-ই বলুন; শুধু "হাইয়া আলাস সালাহ" আর "হাইয়া আলাল ফালাহ" শুনে বলুন "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"। অন্তর থেকে এভাবে জবাব দিলে জান্নাত।
আজান শেষে দরুদ, তারপর এই দোয়া; এর পাঠকের জন্য কিয়ামতে নবীজির শাফাআত অবধারিত।
মসজিদের দিকে শান্তভাবে হাঁটুন, দৌড়াবেন না। ঢুকতে ডান পা আর রহমতের দরজা খোলার দোয়া, বসার আগে দুই রাকাত।
আজান শুনে যে বলে: "আল্লাহুম্মা রাব্বা হাযিহিদ দা'ওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালাতিল কাইমাহ, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদীলাহ, ওয়াব'আসহু মাকামাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়া'আদতাহ" (হে আল্লাহ, এই পূর্ণ আহ্বান ও প্রতিষ্ঠিতব্য নামাজের রব, মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে ওয়াসীলা ও মর্যাদা দিন, আর তাঁকে সেই প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দিন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি দিয়েছেন), কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফাআত অবধারিত হয়ে যায়।
মুয়াজ্জিন যখন "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার" বলে, তোমাদের কেউ যদি বলে "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার"; মুয়াজ্জিন "আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বললে সেও তা বলে; "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ" বললে সেও তা বলে; "হাইয়া আলাস সালাহ" ও "হাইয়া আলাল ফালাহ" বললে সে বলে "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"; তারপর "আল্লাহু আকবার" ও "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বললে সেও তা বলে, আর এগুলো অন্তর থেকে বলে, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
তোমাদের কেউ মসজিদে ঢুকলে যেন বলে: "আল্লাহুম্মাফতাহ লী আবওয়াবা রাহমাতিক" (হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন)। আর বের হওয়ার সময় যেন বলে: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাদলিক" (হে আল্লাহ, আমি আপনার অনুগ্রহ চাই)।
সহিহ মুসলিম ৭১৩সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুমাইদ বা আবু উসাইদ (রা.)
আপনার জীবনেফোনে আজানের নোটিফিকেশন চালু করুন, আর আজান শুনলে অন্তত শেষের দোয়াটা পড়ার অভ্যাস করুন। এক মিনিটের আমল, পুরস্কার শাফাআত।
৮
মন
সবচেয়ে জরুরি প্রস্তুতি: মন
শরীর পবিত্র হলো, পোশাক ঠিক হলো; এখন তাকবীর দেওয়ার আগে এক মুহূর্ত থামুন। ক্ষুধা আর টয়লেটের চাপ আগে মেটান, কারণ এগুলো নিয়ে নামাজে মন থাকে না।
আর নামাজের অপেক্ষাও নামাজ। আগে এসে বসে থাকলে ফেরেশতারা আপনার জন্য দোয়া করতে থাকে।
খাবার উপস্থিত থাকলে নামাজ নেই, আর প্রস্রাব-পায়খানার চাপ চেপে রেখেও নামাজ নেই।
সহিহ মুসলিম ৫৬০সহিহবর্ণনা: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল
তোমাদের কেউ যতক্ষণ নামাজের জায়গায় থাকে আর ওজু না ভাঙে, ততক্ষণ ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করতে থাকে: হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন; হে আল্লাহ, তার ওপর রহম করুন। আর তোমাদের কেউ যতক্ষণ নামাজের অপেক্ষায় আটকে থাকে, যদি নামাজ ছাড়া অন্য কিছু তাকে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে বাধা না দেয়, ততক্ষণ সে নামাজের মধ্যেই আছে।
আপনার জীবনেনামাজের আগে ফোন সাইলেন্ট করে চোখের আড়ালে রাখুন। তাকবীরের আগে মনে মনে বলুন: আমি এখন আল্লাহর সামনে দাঁড়াচ্ছি।
দোয়া, আমল ও যাচাই
এই পর্বের দোয়া, আমলের চেকলিস্ট, প্রচলিত ভুল আর নিজেকে যাচাই
দোয়া
টয়লেটে ঢোকার দোয়া
كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ الْخَلاَءَ قَالَ " اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ
নবী (ﷺ) টয়লেটে ঢোকার সময় বলতেন: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস" (হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অপবিত্র পুরুষ ও নারী শয়তান থেকে আশ্রয় চাই)।
তোমাদের যে কেউ অজু করে এবং পূর্ণভাবে অজু করে, তারপর বলে: "আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুল্লাহি ওয়া রাসূলুহ" (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হয়, যেটা দিয়ে ইচ্ছা সে প্রবেশ করবে।
আজান শুনে যে বলে: "আল্লাহুম্মা রাব্বা হাযিহিদ দা'ওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালাতিল কাইমাহ, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদীলাহ, ওয়াব'আসহু মাকামাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়া'আদতাহ" (হে আল্লাহ, এই পূর্ণ আহ্বান ও প্রতিষ্ঠিতব্য নামাজের রব, মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে ওয়াসীলা ও মর্যাদা দিন, আর তাঁকে সেই প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দিন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি দিয়েছেন), কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফাআত অবধারিত হয়ে যায়।
তোমাদের কেউ মসজিদে ঢুকলে যেন বলে: "আল্লাহুম্মাফতাহ লী আবওয়াবা রাহমাতিক" (হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন)। আর বের হওয়ার সময় যেন বলে: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাদলিক" (হে আল্লাহ, আমি আপনার অনুগ্রহ চাই)।
কুরআনের দোয়ার অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে; হাদিসের দোয়ার সাথে মূল গ্রন্থের নম্বর ও মান দেওয়া আছে।
আমল চেকলিস্ট
টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।
প্রচলিত ভুল
ভিত্তিহীন
ওজুর প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার আলাদা দোয়া আছে (যেমন মুখ ধোয়ার সময় "আল্লাহুম্মা বাইয়িদ ওয়াজহী...")।
যা সঠিক: ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, এগুলোর নবীজি থেকে কোনো ভিত্তি নেই। ওজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ আর শেষে কালিমা শাহাদাতের দোয়াই সুন্নাহ (সহিহ মুসলিম ২৩৪)।
দুর্বল
ওজুতে ঘাড় মাসেহ করা সুন্নাহ।
যা সঠিক: ঘাড় মাসেহের বর্ণনাগুলো দুর্বল। সহিহ বর্ণনায় শুধু মাথা ও কান মাসেহের কথা আছে (সহিহ বুখারী ১৫৯)। হানাফি মাযহাবের কিছু কিতাবে একে মুস্তাহাব বলা হয়েছে, তবে দলিল দুর্বল।
ভিত্তিহীন
আজানে "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" শুনে বুড়ো আঙুলে চুমু দিয়ে চোখে লাগাতে হয়।
যা সঠিক: ইমাম সাখাবী (রহ.) বলেছেন, এ বিষয়ে কোনো বর্ণনা সহিহ নয়। সুন্নাহ হলো মুয়াজ্জিনের সাথে সাথে বলা (সহিহ মুসলিম ৩৮৫) আর শেষে দরুদ ও দোয়া পড়া (সহিহ বুখারী ৬১৪)।
ভিত্তিহীন
আজানের সময় কথা বললে ঈমান চলে যায়।
যা সঠিক: এমন কোনো হাদিস নেই। তবে আজানের জবাব দেওয়া সুন্নাহ, তাই অপ্রয়োজনীয় কথা থামিয়ে জবাব দেওয়াই উত্তম।
বাড়াবাড়ি
প্রস্রাবের পর অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি, কাশি দেওয়া বা ঢিলা নিয়ে বসে থাকা জরুরি।
যা সঠিক: এসব বাড়াবাড়ি ওয়াসওয়াসা বাড়ায়। ভালোভাবে পরিষ্কার হওয়াই যথেষ্ট; সন্দেহ ঠেকাতে কাপড়ে হালকা পানি ছিটিয়ে নেওয়া যায়। নিশ্চিত পবিত্রতা সন্দেহে নষ্ট হয় না (সহিহ বুখারী ১৩৭)।
প্রতিটি দাবি যাচাই করা হয়েছে কুরআন, সহিহ হাদিস ও মুহাদ্দিসদের মান অনুযায়ী।
সব হাদিস
মুসলিমরা মদিনায় এসে নামাজের জন্য আন্দাজ করে জমা হতেন, তখন নামাজের জন্য কোনো ডাক দেওয়া হতো না। একদিন এ নিয়ে তাঁরা আলোচনা করলেন। কেউ বললেন, খ্রিস্টানদের মতো ঘণ্টা নাও। কেউ বললেন, বরং ইহুদিদের মতো শিঙা। উমার (রা.) বললেন, তোমরা একজন মানুষকে পাঠাও না কেন, যে নামাজের জন্য ডাক দেবে? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: হে বিলাল, ওঠো, নামাজের জন্য ডাক দাও।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মানুষকে নামাজে ডাকার জন্য ঘণ্টা বানানোর আদেশ দিলেন, তখন আমি ঘুমের মধ্যে দেখলাম, এক লোক হাতে ঘণ্টা নিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর বান্দা, ঘণ্টাটা বিক্রি করবে? সে বলল, এটা দিয়ে কী করবে? বললাম, এটা দিয়ে নামাজে ডাকব। সে বলল, এর চেয়ে ভালো কিছু দেখিয়ে দেব না? তারপর সে আজানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দিল, তারপর ইকামতের বাক্য। সকালে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে স্বপ্নের কথা জানালাম। তিনি বললেন: ইনশাআল্লাহ, এটা সত্য স্বপ্ন। তুমি বিলালের সাথে দাঁড়াও, যা দেখেছ তাকে বলে দাও, সে আজান দিক; কারণ তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে উঁচু।
মুসলিম বা মুমিন বান্দা যখন ওজু করে মুখ ধোয়, তখন চোখ দিয়ে দেখা সব গুনাহ পানির সাথে (বা পানির শেষ ফোঁটার সাথে) মুখ থেকে বের হয়ে যায়। হাত ধুলে হাত দিয়ে ধরা সব গুনাহ বের হয়ে যায়। পা ধুলে পা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সব গুনাহ বের হয়ে যায়। শেষে সে গুনাহ থেকে পরিষ্কার হয়ে বের হয়।
নবী (ﷺ) মদিনা বা মক্কার একটি বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দুজন মানুষের আওয়াজ শুনলেন, যাদের কবরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি বললেন: তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, অথচ (তাদের ধারণায়) বড় কোনো কারণে নয়। তারপর বললেন: হ্যাঁ, (আসলে তা বড়)। তাদের একজন প্রস্রাব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখত না, আর অন্যজন চোগলখুরি করে বেড়াত।
كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ الْخَلاَءَ قَالَ " اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ
নবী (ﷺ) টয়লেটে ঢোকার সময় বলতেন: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস" (হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অপবিত্র পুরুষ ও নারী শয়তান থেকে আশ্রয় চাই)।
তিনি দেখলেন, উসমান ইবনু আফফান (রা.) একটি পাত্র আনালেন। তিনবার দুই হাতের তালুতে পানি ঢেলে তা ধুলেন। তারপর ডান হাত পাত্রে ঢুকিয়ে (পানি নিয়ে) কুলি করলেন ও নাকে পানি দিলেন। তারপর তিনবার মুখমণ্ডল ধুলেন, আর দুই হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। তারপর মাথা মাসাহ করলেন। তারপর দুই পা টাখনু পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। তারপর বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যে আমার এই অজুর মতো অজু করে, তারপর দুই রাকাত নামাজ পড়ে, যাতে সে মনে মনে (দুনিয়ার) কথা বলে না, তার আগের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
সহিহ বুখারী ১৫৯সহিহবর্ণনাকারী: উসমান ইবনু আফফান (রা.)-এর মুক্ত দাস হুমরান
تَخَلَّفَ عَنَّا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِي سَفْرَةٍ سَافَرْنَاهَا، فَأَدْرَكَنَا وَقَدْ أَرْهَقَتْنَا الصَّلاَةُ وَنَحْنُ نَتَوَضَّأُ، فَجَعَلْنَا نَمْسَحُ عَلَى أَرْجُلِنَا، فَنَادَى بِأَعْلَى صَوْتِهِ " وَيْلٌ لِلأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ
এক সফরে নবী (ﷺ) আমাদের পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি যখন আমাদের ধরলেন, তখন নামাজের সময় চলে যাচ্ছিল আর আমরা তাড়াহুড়া করে ওজু করছিলাম; পায়ে শুধু ভেজা হাত বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। তিনি উচ্চস্বরে দুই বা তিনবার বললেন: গোড়ালিগুলোর জন্য জাহান্নামের দুর্ভোগ!
তোমাদের যে কেউ অজু করে এবং পূর্ণভাবে অজু করে, তারপর বলে: "আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুল্লাহি ওয়া রাসূলুহ" (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেওয়া হয়, যেটা দিয়ে ইচ্ছা সে প্রবেশ করবে।
সহিহ মুসলিম ২৩৪সহিহবর্ণনাকারী: উকবা ইবনু আমির (রা.), উমার (রা.) থেকে
أَنَّهُ شَكَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الرَّجُلُ الَّذِي يُخَيَّلُ إِلَيْهِ أَنَّهُ يَجِدُ الشَّىْءَ فِي الصَّلاَةِ. فَقَالَ " لاَ يَنْفَتِلْ ـ أَوْ لاَ يَنْصَرِفْ ـ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে অভিযোগ করল যে নামাজের মধ্যে তার মনে হয় যেন কিছু (বায়ু) বের হয়েছে। তিনি বললেন: সে যেন নামাজ ছেড়ে না যায়, যতক্ষণ না কোনো শব্দ শোনে বা গন্ধ পায়।
নবী (ﷺ) যখন জানাবাতের (বড় নাপাকির) গোসল করতেন, প্রথমে দুই হাত ধুতেন। তারপর নামাজের অজুর মতো অজু করতেন। তারপর আঙুল পানিতে ভিজিয়ে চুলের গোড়ায় খিলাল করতেন। তারপর দুই হাতে তিন আঁজলা পানি মাথায় ঢালতেন। তারপর সারা শরীরে পানি ঢেলে দিতেন।
আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে বের হলাম। বাইদা বা যাতুল জাইশে পৌঁছালে আমার গলার হার ছিঁড়ে হারিয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেটা খুঁজতে থেমে গেলেন, মানুষও থামল, অথচ সেখানে পানি ছিল না, সাথেও পানি ছিল না। মানুষ আবু বকর (রা.)-এর কাছে অভিযোগ করল। তিনি এসে আমাকে ভর্ৎসনা করলেন। ভোর হলো, পানি নেই। তখন আল্লাহ তায়াম্মুমের আয়াত নাজিল করলেন, আর সবাই তায়াম্মুম করল। উসাইদ ইবনু হুদাইর (রা.) বললেন: হে আবু বকরের পরিবার, এটা তোমাদের প্রথম বরকত নয়! পরে যে উটে আমি ছিলাম, সেটাকে ওঠানো হলে তার নিচেই হারটা পাওয়া গেল।
(আমি পানি না পেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়েছিলাম, পরে নবী (ﷺ)-কে জানালে) তিনি বললেন: তোমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। এই বলে তিনি হাতের তালু একবার মাটিতে মারলেন, ঝেড়ে নিলেন, তারপর বাম হাত দিয়ে ডান হাতের পিঠ (বা ডান দিয়ে বামের পিঠ) মাসেহ করলেন, তারপর দুই হাত দিয়ে মুখ মাসেহ করলেন।
কুবায় মানুষ ফজরের নামাজ পড়ছিল। এমন সময় একজন এসে বলল: আজ রাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর কুরআন নাজিল হয়েছে, তাঁকে কাবার দিকে মুখ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে; তাই তোমরাও কাবার দিকে ফেরো। তাদের মুখ ছিল শামের (বায়তুল মাকদিসের) দিকে, তারা (নামাজের মধ্যেই) ঘুরে কাবার দিকে ফিরল।
আমাকে পাঁচটি জিনিস দেওয়া হয়েছে, যা আমার আগে কাউকে দেওয়া হয়নি: এক মাসের দূরত্ব পর্যন্ত শত্রুর মনে ভয় দিয়ে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে; পুরো পৃথিবীকে আমার জন্য মসজিদ ও পবিত্রতার উপকরণ বানানো হয়েছে, তাই আমার উম্মতের যে কেউ যেখানে নামাজের সময় পাবে, সেখানেই পড়ে নেবে; গনিমতের সম্পদ আমার জন্য হালাল করা হয়েছে; আমাকে শাফাআত দেওয়া হয়েছে; আর আগের নবীরা শুধু নিজ জাতির কাছে আসতেন, আমাকে পাঠানো হয়েছে সব মানুষের কাছে।
নামাজির সামনে দিয়ে যে যায়, সে যদি জানত এতে তার কী গুনাহ, তাহলে সামনে দিয়ে যাওয়ার চেয়ে চল্লিশ (দিন, মাস বা বছর) দাঁড়িয়ে থাকা তার কাছে ভালো মনে হতো।
মুয়াজ্জিন যখন "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার" বলে, তোমাদের কেউ যদি বলে "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার"; মুয়াজ্জিন "আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বললে সেও তা বলে; "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ" বললে সেও তা বলে; "হাইয়া আলাস সালাহ" ও "হাইয়া আলাল ফালাহ" বললে সে বলে "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"; তারপর "আল্লাহু আকবার" ও "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বললে সেও তা বলে, আর এগুলো অন্তর থেকে বলে, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
আজান শুনে যে বলে: "আল্লাহুম্মা রাব্বা হাযিহিদ দা'ওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালাতিল কাইমাহ, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদীলাহ, ওয়াব'আসহু মাকামাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়া'আদতাহ" (হে আল্লাহ, এই পূর্ণ আহ্বান ও প্রতিষ্ঠিতব্য নামাজের রব, মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে ওয়াসীলা ও মর্যাদা দিন, আর তাঁকে সেই প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দিন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি দিয়েছেন), কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফাআত অবধারিত হয়ে যায়।
তোমাদের কেউ মসজিদে ঢুকলে যেন বলে: "আল্লাহুম্মাফতাহ লী আবওয়াবা রাহমাতিক" (হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন)। আর বের হওয়ার সময় যেন বলে: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাদলিক" (হে আল্লাহ, আমি আপনার অনুগ্রহ চাই)।
সহিহ মুসলিম ৭১৩সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুমাইদ বা আবু উসাইদ (রা.)
তোমাদের কেউ যতক্ষণ নামাজের জায়গায় থাকে আর ওজু না ভাঙে, ততক্ষণ ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করতে থাকে: হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন; হে আল্লাহ, তার ওপর রহম করুন। আর তোমাদের কেউ যতক্ষণ নামাজের অপেক্ষায় আটকে থাকে, যদি নামাজ ছাড়া অন্য কিছু তাকে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে বাধা না দেয়, ততক্ষণ সে নামাজের মধ্যেই আছে।