অন্য সব ইবাদত ফরজ হয়েছে পৃথিবীতে, কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়েছে আসমানে, মিরাজের রাতে। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল শুধু "নামাজ" নয়, "সময়মতো নামাজ"। এই পর্বে প্রতিটি ওয়াক্তের সময়, রাকাত আর ফজিলত, আর প্রতিদিন সময়মতো ও মন দিয়ে পড়ার উপায়।
পর্ব ২/৬ · প্রতিদিনের নামাজ (বিন্দুতে চাপলে সেই পর্বে যাবে)
৮টি অধ্যায়
৬টি আয়াত
২২টি সহিহ হাদিস
৪টি দোয়া
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া; হাদিস শুধু সহিহ ও হাসান। দুর্বল বর্ণনা শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে, মানসহ। আয়াতের অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
গল্প দিয়ে শুরু
পঞ্চাশ থেকে পাঁচ: মিরাজের রাতের উপহার
মিরাজের রাত। নবী (ﷺ)-কে নিয়ে যাওয়া হলো সাত আসমান পেরিয়ে। সেখানে আল্লাহ তাঁর উম্মতের ওপর দিনে-রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন।
ফেরার পথে মূসা (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, আপনার উম্মতের ওপর কী ফরজ হলো? পঞ্চাশ ওয়াক্ত শুনে বললেন, ফিরে যান, কমানোর আবেদন করুন; আপনার উম্মত পারবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে দেখেছি। নবীজি ফিরে গেলেন, কমানো হলো। মূসা (আ.) আবার বললেন, আবার যান। এভাবে বারবার যাওয়া-আসার পর থাকল পাঁচ ওয়াক্ত।
তখন আল্লাহ ঘোষণা দিলেন: এগুলো পড়তে পাঁচ, কিন্তু সওয়াবে পঞ্চাশ; আমার কথার কোনো পরিবর্তন হয় না।
(নবী ﷺ বলেন:) আল্লাহ আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন। আমি তা নিয়ে ফেরার পথে মূসা (আ.)-এর কাছ দিয়ে গেলাম। তিনি বললেন: আল্লাহ আপনার উম্মতের উপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম: পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ। তিনি বললেন: আপনার রবের কাছে ফিরে যান, আপনার উম্মত এটা পারবে না। আমি ফিরে গেলাম, তিনি এর একটা অংশ কমিয়ে দিলেন। ... এভাবে কয়েকবার যাওয়ার পর আল্লাহ বললেন: এগুলো পাঁচ, আর এগুলোই পঞ্চাশ। আমার কাছে কথা বদলায় না।
সহিহ বুখারী ৩৪৯সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.), আবু যার (রা.) থেকে
এই গল্প আমাদের কী শেখায়? প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত আসলে পঞ্চাশের পুরস্কার নিয়ে আসা এক দয়া। যে নামাজকে বোঝা মনে হয়, তার পেছনে আছে এক রাতের দীর্ঘ দরকষাকষি, শুধু যাতে আমাদের জন্য সহজ হয়।
এই পর্বে ৮টি অধ্যায়
১
কুরআনে
কুরআনে পাঁচ ওয়াক্তের ইশারা
পাঁচ ওয়াক্তের নাম কুরআনে একসাথে তালিকা আকারে নেই, কিন্তু কয়েকটি আয়াতে সময়গুলোর দিকে ইশারা আছে, আর নবীজি হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন। মুফাসসিরদের ব্যাখ্যায় এই এক আয়াতেই পাঁচ ওয়াক্ত: সূর্য হেলে পড়া থেকে জোহর ও আসর, রাতের অন্ধকার পর্যন্ত মাগরিব ও এশা, আর আলাদা করে ফজর।
নামাজ নির্দিষ্ট সময়ের সাথে বাঁধা ফরজ (সূরা আন-নিসা ৪:১০৩)। দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে নামাজ কায়েমের আদেশ, কারণ নেক কাজ গুনাহ মুছে দেয় (সূরা হুদ ১১:১১৪)। আর বিশেষ যত্ন নিতে বলা হয়েছে মধ্যবর্তী নামাজের, যা সহিহ হাদিসে আসর।
আপনার জীবনেআজ এই আয়াতটা অর্থসহ একবার পড়ুন, তারপর দিনের পাঁচটা সময় মিলিয়ে দেখুন। কুরআনের সাথে নিজের দিনটা মিলে গেলে নামাজ আর আলাদা কাজ মনে হয় না।
২
ফজিলত
সবচেয়ে প্রিয় আমল, আর দরজার সামনের নদী
ইবনু মাসউদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? উত্তর এল: সময়মতো নামাজ।
নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, কারো দরজার সামনে একটা নদী থাকলে আর সে তাতে দিনে পাঁচবার গোসল করলে শরীরে কি ময়লা থাকবে? পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উদাহরণ এমনই।
যে পাঁচ ওয়াক্ত ঠিকমতো আদায় করে, আল্লাহর কাছে তার জন্য জান্নাতের অঙ্গীকার আছে (সুনানে আবু দাউদ ১৪২০)। আর কিয়ামতে সবার আগে নামাজের হিসাব হবে; ফরজে ঘাটতি থাকলে নফল দিয়ে পূরণ করা হবে (সুনানে আবু দাউদ ৮৬৪)।
আমি নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বললেন: সময়মতো নামাজ পড়া। জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোনটি? বললেন: তারপর মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার। জিজ্ঞেস করলাম, তারপর? বললেন: আল্লাহর পথে জিহাদ।
বলো তো, তোমাদের কারও দরজার সামনে যদি একটি নদী থাকে, আর সে প্রতিদিন তাতে পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার গায়ে কোনো ময়লা থাকবে? সাহাবিরা বললেন: কোনো ময়লাই থাকবে না। তিনি বললেন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উদাহরণ এমনই। এর মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহ মুছে দেন।
আপনার জীবনেকাল একটা ওয়াক্ত বেছে নিন, আজান হলেই পড়বেন, কোনো "একটু পরে" নয়। একটা ওয়াক্তে জিতলে বাকিগুলো সহজ হয়।
৩
সতর্কবাণী
নামাজ ছাড়া আর দেরি করার বিপদ
নবীজি বলেছেন, মানুষ আর শিরক ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।
কুরআন সতর্ক করেছে তাদের ব্যাপারে, যারা নামাজ নষ্ট করল (সূরা মারইয়াম ১৯:৫৯), আর তাদের ব্যাপারে, যারা নামাজ পড়ে ঠিকই, কিন্তু উদাসীন। অনেক মুফাসসিরের ব্যাখ্যায় এর একটি অর্থ: নামাজকে সময় পার করে দেরিতে পড়া।
শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া করে আসর পড়াকে নবীজি বলেছেন মুনাফিকের নামাজ: সূর্য ডোবার একদম আগে উঠে চারটা ঠোকর।
মানুষ এবং শিরক ও কুফরের মাঝে (পার্থক্য) হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।
সহিহ মুসলিম ৮২সহিহবর্ণনা: জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ২টি দলিল
এটা মুনাফিকের নামাজ: বসে বসে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, যখন তা শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝে চলে যায় (ডোবার কাছাকাছি), তখন উঠে চারটা ঠোকর দেয়, তাতে আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।
আপনার জীবনেআজ কোন নামাজটা শেষ মুহূর্তে পড়েছেন, আর কেন? কারণটা লিখে ফেলুন। বেশিরভাগ সময় কারণ একটাই থাকে, আর সেটা বদলানো যায়।
৪
সময়
জিবরাঈল (আ.) যেভাবে সময় শেখালেন
নামাজের সময়ের মূল দলিল একটি বিখ্যাত হাদিস। জিবরাঈল (আ.) কাবার কাছে পরপর দুই দিন নবীজিকে পাঁচ ওয়াক্ত পড়ালেন: প্রথম দিন প্রতিটি নামাজ সময়ের শুরুতে, দ্বিতীয় দিন শেষ দিকে। তারপর বললেন, সময় এই দুইয়ের মাঝখানে।
সহিহ মুসলিমের আরেকটি হাদিসে নবীজি নিজে প্রতিটি সময়ের শেষ সীমা বলে দিয়েছেন।
ছায়া দিয়ে সময় চেনা: মাটিতে সোজা একটা লাঠি পুঁতলে দুপুরে ছায়া সবচেয়ে ছোট হয়; ছায়া আবার বাড়তে শুরু করলেই জোহর। ছায়া লাঠির সমান হলে (দুপুরের সেই ছোট ছায়া বাদ দিয়ে) আসর শুরু; হানাফি মতে দ্বিগুণ হলে। বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারে আসর সাধারণত হানাফি মতে দেওয়া থাকে; অ্যাপে "Hanafi" আর "Standard" দুটো অপশনে প্রায় ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার পার্থক্য হয়। দুই মতেরই দলিল আছে।
জিবরাঈল (আ.) কাবার কাছে দুইবার আমার ইমামতি করলেন। (প্রথম দিন) জোহর পড়ালেন যখন সূর্য হেলে পড়ল; আসর যখন প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার সমান হলো; মাগরিব যখন রোজাদার ইফতার করে; এশা যখন লালিমা মিলিয়ে গেল; ফজর যখন রোজাদারের খাওয়া-পান করা হারাম হয়। পরদিন জোহর পড়ালেন যখন ছায়া জিনিসের সমান; আসর যখন ছায়া দ্বিগুণ; মাগরিব রোজাদারের ইফতারের সময়; এশা রাতের এক-তৃতীয়াংশে; আর ফজর পড়ালেন চারদিক ফর্সা হলে। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন: হে মুহাম্মাদ, এটা আপনার আগের নবীদের সময়, আর (নামাজের) সময় এই দুইয়ের মাঝখানে।
সুনানে আবু দাউদ ৩৯৩সহিহবর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ১টি দলিল
তোমরা ফজর পড়লে তার সময় সূর্যের প্রথম কিনারা ওঠা পর্যন্ত। জোহর পড়লে তার সময় আসরের সময় আসা পর্যন্ত। আসর পড়লে তার সময় সূর্য হলুদ হওয়া পর্যন্ত। মাগরিব পড়লে তার সময় পশ্চিম আকাশের লালিমা (শাফাক) মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। আর এশা পড়লে তার সময় মধ্যরাত পর্যন্ত।
আপনার জীবনেফোনের নামাজের অ্যাপে নিজের জেলা আর আসরের পদ্ধতি একবার ঠিক করে নিন। সময় জানা থাকলে "পরে পড়ব" বলার সুযোগ কমে যায়।
৫
ফজর ও আসর
দুই ঠান্ডা সময়ের নামাজ: ফজর ও আসর
একরাতে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে নবীজি বললেন, তোমরা তোমাদের রবকে এভাবে দেখবে; তাই সূর্য ওঠার আগের আর ডোবার আগের নামাজ যেন কিছুতেই ছুটে না যায়।
এই দুই নামাজে রাত আর দিনের ফেরেশতারা পালা বদল করে, আর আল্লাহকে জানায়: তাদের নামাজরত অবস্থায় রেখে এসেছি।
যে দুই ঠান্ডা সময়ের নামাজ পড়ে, সে জান্নাতে যাবে (সহিহ বুখারী ৫৭৪)। ফজর পড়লে সারাদিন আল্লাহর জিম্মায় (সহিহ মুসলিম ৬৫৭)। আর ফজরের আগের দুই রাকাত সুন্নত দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে উত্তম (সহিহ মুসলিম ৭২৫)।
উল্টো দিকে, যার আসর ছুটে গেল, সে যেন পরিবার ও সম্পদ হারিয়ে ফেলল।
আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে ছিলাম। তিনি পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন: তোমরা তোমাদের রবকে দেখবে, যেমন এই চাঁদ দেখছ; তাঁকে দেখতে তোমাদের কোনো ভিড় বা কষ্ট হবে না। তাই পারলে সূর্য ওঠার আগের নামাজ (ফজর) আর সূর্য ডোবার আগের নামাজ (আসর) যেন কিছুতেই ছুটে না যায়।
রাতের ফেরেশতা আর দিনের ফেরেশতারা পালা করে তোমাদের কাছে আসে, আর ফজর ও আসরের নামাজে তারা একত্র হয়। তারপর যারা রাতে তোমাদের মাঝে ছিল, তারা ওপরে ওঠে। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জেনেও তাদের জিজ্ঞেস করেন: আমার বান্দাদের কোন অবস্থায় রেখে এলে? তারা বলে: আমরা তাদের নামাজরত অবস্থায় রেখে এসেছি, আর যখন গিয়েছিলাম তখনও তারা নামাজ পড়ছিল।
আপনার জীবনেফজরের জন্য প্রস্তুতি শুরু হয় আগের রাতে: এশার পর অপ্রয়োজনীয় কাজ বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুম, আর একটা অ্যালার্ম ফোন থেকে দূরে রাখুন।
৬
জোহর, মাগরিব, এশা
জোহর, মাগরিব ও এশা: উত্তম সময়
জোহর: সময় শুরু হলে তাড়াতাড়ি; প্রচণ্ড গরমে একটু দেরি করে, রোদ কমলে।
মাগরিব: সূর্য ডোবার সাথে সাথে, দেরি না করে। সাহাবিরা মাগরিব পড়ে ফিরতেন, তখনো এত আলো থাকত যে ছোড়া তীর কোথায় পড়ল দেখা যেত।
এশা: রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত দেরি উত্তম, যদি কষ্ট না হয় (সহিহ মুসলিম ৬৩৮); তবে পুরুষদের জন্য মসজিদের জামাতই আগে। জামাতে এশা অর্ধেক রাতের নামাজ, আর ফজরও জামাতে পড়লে পুরো রাতের।
মুনাফিকদের জন্য সবচেয়ে ভারী নামাজ এশা আর ফজর; তারা যদি জানত এতে কী আছে, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও আসত।
যে জামাতে এশা পড়ল, সে যেন অর্ধেক রাত নামাজ পড়ল। আর যে জামাতে ফজর পড়ল, সে যেন পুরো রাত নামাজ পড়ল।
সহিহ মুসলিম ৬৫৬সহিহবর্ণনা: উসমান ইবনু আফফান (রা.)এই অধ্যায়ের আরও ৩টি দলিল
আপনার জীবনেএই সপ্তাহে অন্তত একদিন এশা আর পরদিন ফজর দুটোই জামাতে পড়ুন। হাদিসের হিসাবে সেটা পুরো এক রাতের নামাজ।
৭
মাসআলা
নিষিদ্ধ সময়, কাজা, জামাত আর সফর
তিন সময়ে নামাজ নিষেধ: সূর্য ওঠার সময়, ঠিক দুপুরে, আর সূর্য ডোবার সময়।
ঘুম বা ভুলে নামাজ ছুটে গেলে মনে পড়ামাত্র পড়ে নিন, এটাই কাফফারা।
ঘুমের মধ্যে অবহেলা নেই; অবহেলা হলো জেগে থেকেও না পড়া (সহিহ মুসলিম ৬৮১)।
জামাতে নামাজ একা পড়ার চেয়ে সাতাশ গুণ বেশি মর্যাদার (সহিহ বুখারী ৬৪৫)। মসজিদের পথে প্রতিটি কদমে একটি গুনাহ মাফ, আরেক কদমে মর্যাদা বৃদ্ধি (সহিহ মুসলিম ৬৬৬)।
সফরে চার রাকাতের ফরজ দুই রাকাত। আয়েশা (রা.) বলেছেন, নামাজ প্রথমে দুই রাকাত করে ফরজ হয়েছিল; সফরের নামাজ সেভাবেই রাখা হয়েছে।
কেউ যদি কোনো নামাজ ভুলে যায়, তাহলে মনে পড়ার সাথে সাথে যেন তা পড়ে নেয়। এর আর কোনো কাফফারা নেই।
তিনটি সময়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নামাজ পড়তে ও মৃতদের দাফন করতে নিষেধ করতেন: সূর্য যখন উঠতে থাকে, যতক্ষণ না কিছুটা ওপরে ওঠে; দুপুরে সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর থাকে, যতক্ষণ না হেলে পড়ে; আর সূর্য যখন ডুবতে শুরু করে, যতক্ষণ না পুরোপুরি ডোবে।
আল্লাহ যখন নামাজ ফরজ করেন, তখন ঘরে ও সফরে দুই রাকাত দুই রাকাত করে ফরজ করেছিলেন। পরে সফরের নামাজ সেভাবেই রাখা হলো, আর নিজ এলাকায় থাকা অবস্থার নামাজে বাড়ানো হলো।
আপনার জীবনেকোনো নামাজ ছুটে গেলে হতাশ হয়ে বাকি দিনটা ছেড়ে দেবেন না। মনে পড়ামাত্র পড়ে নিন, তাওবা করুন, পরের ওয়াক্ত থেকে আবার শুরু।
৮
খুশু
"পড়তে হবে" নয়, "পড়তে পারছি": মনোযোগী নামাজ
সফল তারা, যারা নামাজে বিনয়ী ও মনোযোগী।
খুশুর সবচেয়ে বড় চাবি অর্থ বোঝা। ফাতিহার প্রতিটি আয়াতে আল্লাহ জবাব দিচ্ছেন, এটা জানলে ফাতিহা আর যান্ত্রিক থাকে না।
নবীজি নামাজকে দেখতেন বিশ্রাম ও আনন্দ হিসেবে। বিলালকে বলতেন, ইকামত দাও, এর মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও (সুনানে আবু দাউদ ৪৯৮৫)। নামাজে রাখা হয়েছিল তাঁর চোখের শীতলতা (সুনানে আন-নাসাঈ ৩৯৩৯)। ঘরে পরিবারের কাজে সাহায্য করতেন, নামাজের সময় হলে বেরিয়ে যেতেন (সহিহ বুখারী ৬৭৬)।
আর এক নামাজের পর পরের নামাজের অপেক্ষাকে তিনি বলেছেন রিবাত, সীমান্ত পাহারা।
আল্লাহ বলেন: আমি নামাজকে (সূরা ফাতিহাকে) আমার ও আমার বান্দার মাঝে দুই ভাগ করেছি, আর আমার বান্দা যা চায় তা পাবে। বান্দা যখন বলে "আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন", আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা আমার প্রশংসা করল। যখন বলে "আর-রাহমানির রাহীম", আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা আমার গুণগান করল। যখন বলে "মালিকি ইয়াওমিদ্দীন", আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা আমার মর্যাদা ঘোষণা করল। যখন বলে "ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন", আল্লাহ বলেন: এটা আমার ও আমার বান্দার মাঝে, আর আমার বান্দা যা চায় তা পাবে। আর যখন বলে "ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম..." শেষ পর্যন্ত, আল্লাহ বলেন: এটা আমার বান্দার জন্য, আর আমার বান্দা যা চায় তা পাবে।
আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলব না, যা দিয়ে আল্লাহ গুনাহ মুছে দেন আর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন? সাহাবিরা বললেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: কষ্টের সময়েও পূর্ণভাবে ওজু করা, মসজিদের দিকে বেশি কদম চলা, আর এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষায় থাকা। এটাই তোমাদের রিবাত (সীমান্ত পাহারা)।
কাজেই তারা যা বলে, সে বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের আগে আপনার রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং রাতে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন এবং দিনের প্রান্তসমূহেও, যাতে আপনি সন্তুষ্ট হতে আপ্রেন।
যে প্রত্যেক নামাজের পর তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ, তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার বলে, এই নিরানব্বই; আর একশ পূর্ণ করতে বলে: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর", তার গুনাহ সমুদ্রের ফেনার সমান হলেও মাফ করে দেওয়া হয়।
কুরআনের দোয়ার অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে; হাদিসের দোয়ার সাথে মূল গ্রন্থের নম্বর ও মান দেওয়া আছে।
আমল চেকলিস্ট
টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।
প্রচলিত ভুল
জাল
"ওয়াক্তের শুরুতে নামাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর শেষে আল্লাহর ক্ষমা।"
যা সঠিক: এটা তিরমিযী ১৭২-এ আছে, কিন্তু শাইখ আলবানী একে জাল (মাওযূ) বলেছেন। সময়মতো নামাজের ফজিলত বোঝাতে সহিহ হাদিসই যথেষ্ট: সবচেয়ে প্রিয় আমল সময়মতো নামাজ (সহিহ বুখারী ৫২৭)।
ভিত্তিহীন
"নামাজ মুমিনের মিরাজ।"
যা সঠিক: এটা হাদিস হিসেবে কোনো সনদে পাওয়া যায় না। কথাটার অর্থ ভালো হলেও নবীজির নামে বলা ঠিক নয়। সহিহ কথা হলো: সিজদায় বান্দা রবের সবচেয়ে কাছে (সহিহ মুসলিম ৪৮২)।
জাল
নামাজ ছাড়লে পনেরোটি শাস্তি: পাঁচটি দুনিয়ায়, তিনটি মৃত্যুর সময়...
যা সঠিক: এই লম্বা তালিকা জাল বর্ণনা। নামাজ ছাড়ার ভয়াবহতা বোঝাতে কুরআন ও সহিহ হাদিসই যথেষ্ট (সহিহ মুসলিম ৮২)।
ভিত্তিহীন
এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা করলে ৮০ হুকবা (২ কোটি ৮৮ লাখ বছর) জাহান্নামে থাকতে হবে।
যা সঠিক: এর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই। ঘুম বা ভুলে ছুটে গেলে মনে পড়ামাত্র পড়ে নেওয়াই কাফফারা (সহিহ বুখারী ৫৯৭)।
বাতিল
"যার নামাজ তাকে অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে না, সে আল্লাহ থেকে শুধু দূরেই সরে যায়।"
যা সঠিক: এটা নবীজির হাদিস হিসেবে প্রমাণিত নয়; শাইখ আলবানী একে বাতিল বলেছেন (সিলসিলা যঈফা ২)। সহিহ কথা কুরআনের আয়াত: নামাজ অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে (সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৪৫)।
প্রতিটি দাবি যাচাই করা হয়েছে কুরআন, সহিহ হাদিস ও মুহাদ্দিসদের মান অনুযায়ী।
সব হাদিস
(নবী ﷺ বলেন:) আল্লাহ আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন। আমি তা নিয়ে ফেরার পথে মূসা (আ.)-এর কাছ দিয়ে গেলাম। তিনি বললেন: আল্লাহ আপনার উম্মতের উপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম: পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ। তিনি বললেন: আপনার রবের কাছে ফিরে যান, আপনার উম্মত এটা পারবে না। আমি ফিরে গেলাম, তিনি এর একটা অংশ কমিয়ে দিলেন। ... এভাবে কয়েকবার যাওয়ার পর আল্লাহ বললেন: এগুলো পাঁচ, আর এগুলোই পঞ্চাশ। আমার কাছে কথা বদলায় না।
সহিহ বুখারী ৩৪৯সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.), আবু যার (রা.) থেকে
আমি নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বললেন: সময়মতো নামাজ পড়া। জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কোনটি? বললেন: তারপর মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার। জিজ্ঞেস করলাম, তারপর? বললেন: আল্লাহর পথে জিহাদ।
বলো তো, তোমাদের কারও দরজার সামনে যদি একটি নদী থাকে, আর সে প্রতিদিন তাতে পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার গায়ে কোনো ময়লা থাকবে? সাহাবিরা বললেন: কোনো ময়লাই থাকবে না। তিনি বললেন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উদাহরণ এমনই। এর মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহ মুছে দেন।
এটা মুনাফিকের নামাজ: বসে বসে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, যখন তা শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝে চলে যায় (ডোবার কাছাকাছি), তখন উঠে চারটা ঠোকর দেয়, তাতে আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।
জিবরাঈল (আ.) কাবার কাছে দুইবার আমার ইমামতি করলেন। (প্রথম দিন) জোহর পড়ালেন যখন সূর্য হেলে পড়ল; আসর যখন প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার সমান হলো; মাগরিব যখন রোজাদার ইফতার করে; এশা যখন লালিমা মিলিয়ে গেল; ফজর যখন রোজাদারের খাওয়া-পান করা হারাম হয়। পরদিন জোহর পড়ালেন যখন ছায়া জিনিসের সমান; আসর যখন ছায়া দ্বিগুণ; মাগরিব রোজাদারের ইফতারের সময়; এশা রাতের এক-তৃতীয়াংশে; আর ফজর পড়ালেন চারদিক ফর্সা হলে। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন: হে মুহাম্মাদ, এটা আপনার আগের নবীদের সময়, আর (নামাজের) সময় এই দুইয়ের মাঝখানে।
তোমরা ফজর পড়লে তার সময় সূর্যের প্রথম কিনারা ওঠা পর্যন্ত। জোহর পড়লে তার সময় আসরের সময় আসা পর্যন্ত। আসর পড়লে তার সময় সূর্য হলুদ হওয়া পর্যন্ত। মাগরিব পড়লে তার সময় পশ্চিম আকাশের লালিমা (শাফাক) মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। আর এশা পড়লে তার সময় মধ্যরাত পর্যন্ত।
আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে ছিলাম। তিনি পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন: তোমরা তোমাদের রবকে দেখবে, যেমন এই চাঁদ দেখছ; তাঁকে দেখতে তোমাদের কোনো ভিড় বা কষ্ট হবে না। তাই পারলে সূর্য ওঠার আগের নামাজ (ফজর) আর সূর্য ডোবার আগের নামাজ (আসর) যেন কিছুতেই ছুটে না যায়।
রাতের ফেরেশতা আর দিনের ফেরেশতারা পালা করে তোমাদের কাছে আসে, আর ফজর ও আসরের নামাজে তারা একত্র হয়। তারপর যারা রাতে তোমাদের মাঝে ছিল, তারা ওপরে ওঠে। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জেনেও তাদের জিজ্ঞেস করেন: আমার বান্দাদের কোন অবস্থায় রেখে এলে? তারা বলে: আমরা তাদের নামাজরত অবস্থায় রেখে এসেছি, আর যখন গিয়েছিলাম তখনও তারা নামাজ পড়ছিল।
তিনটি সময়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নামাজ পড়তে ও মৃতদের দাফন করতে নিষেধ করতেন: সূর্য যখন উঠতে থাকে, যতক্ষণ না কিছুটা ওপরে ওঠে; দুপুরে সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর থাকে, যতক্ষণ না হেলে পড়ে; আর সূর্য যখন ডুবতে শুরু করে, যতক্ষণ না পুরোপুরি ডোবে।
আল্লাহ যখন নামাজ ফরজ করেন, তখন ঘরে ও সফরে দুই রাকাত দুই রাকাত করে ফরজ করেছিলেন। পরে সফরের নামাজ সেভাবেই রাখা হলো, আর নিজ এলাকায় থাকা অবস্থার নামাজে বাড়ানো হলো।
আল্লাহ বলেন: আমি নামাজকে (সূরা ফাতিহাকে) আমার ও আমার বান্দার মাঝে দুই ভাগ করেছি, আর আমার বান্দা যা চায় তা পাবে। বান্দা যখন বলে "আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন", আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা আমার প্রশংসা করল। যখন বলে "আর-রাহমানির রাহীম", আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা আমার গুণগান করল। যখন বলে "মালিকি ইয়াওমিদ্দীন", আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা আমার মর্যাদা ঘোষণা করল। যখন বলে "ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন", আল্লাহ বলেন: এটা আমার ও আমার বান্দার মাঝে, আর আমার বান্দা যা চায় তা পাবে। আর যখন বলে "ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম..." শেষ পর্যন্ত, আল্লাহ বলেন: এটা আমার বান্দার জন্য, আর আমার বান্দা যা চায় তা পাবে।
আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলব না, যা দিয়ে আল্লাহ গুনাহ মুছে দেন আর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন? সাহাবিরা বললেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: কষ্টের সময়েও পূর্ণভাবে ওজু করা, মসজিদের দিকে বেশি কদম চলা, আর এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষায় থাকা। এটাই তোমাদের রিবাত (সীমান্ত পাহারা)।
যে প্রত্যেক নামাজের পর তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ, তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার বলে, এই নিরানব্বই; আর একশ পূর্ণ করতে বলে: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর", তার গুনাহ সমুদ্রের ফেনার সমান হলেও মাফ করে দেওয়া হয়।