deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ

তালাক, খোলা ও ইদ্দত

তালাকের আগে মীমাংসা, সুন্নাহ পদ্ধতিতে তালাক, এক বৈঠকে তিন তালাক নিয়ে আলেমদের দুই মত, হিল্লার বিধান, খোলা, সব ধরনের ইদ্দত আর সন্তানের হক: কুরআন ও সহিহ হাদিসের দলিলে।

১৯ আয়াত১৪ হাদিস৬ অধ্যায়

এই পাতা কাউকে তালাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য নয়; বরং যাতে কেউ না জেনে ভুল পথে না যায়, আর কারো হক নষ্ট না হয়। প্রতিটি কথার পাশে সূত্র ও মান দেওয়া আছে; দলিল হিসেবে শুধু কুরআন এবং সহিহ ও হাসান হাদিস নেওয়া হয়েছে। নিজের নির্দিষ্ট ঘটনায় নির্ভরযোগ্য আলেমের ফতোয়া নিন।

১

তালাকের আগে: মীমাংসার চেষ্টা

সংসার ভাঙা শেষ উপায়, প্রথম নয়

ইসলাম তালাকের পথ খোলা রেখেছে, কারণ কখনো কখনো একসাথে থাকা দুজনের জন্যই জুলুম হয়ে যায়। কিন্তু কুরআন আগে মীমাংসার কয়েকটি ধাপ দেখিয়েছে। রাগের মাথায় তালাক উচ্চারণ করা আর পরে আফসোস করা, আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি।

  • স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা হলে দুই পরিবার থেকে একজন করে সালিশ বসাতে হবে; তারা মীমাংসা চাইলে আল্লাহ মিল করে দেবেন।সূরা আন-নিসা ৪:৩৫
  • স্ত্রী যদি স্বামীর অবহেলার আশঙ্কা করে, তাহলে দুজনে আপস করে নেওয়াই উত্তম।সূরা আন-নিসা ৪:১২৮
  • কোনো মুমিন যেন স্ত্রীকে ঘৃণা না করে; একটা স্বভাব অপছন্দ হলে আরেকটা পছন্দ হবে।সহিহ মুসলিম ১৪৬৯সহিহ
  • স্ত্রীকে অপছন্দ হলেও ধৈর্য ধরো; হতে পারে তোমরা যা অপছন্দ করো, তাতেই আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।সূরা আন-নিসা ৪:১৯
  • আর যদি আলাদা হতেই হয়, আল্লাহ নিজের প্রাচুর্য দিয়ে দুজনকেই অভাবমুক্ত করবেন।সূরা আন-নিসা ৪:১৩০
পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ২টি আয়াত

وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا

আর তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশংকা করলে তোমরা স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত কর; তারা উভয়ে নিস্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।

وَإِنِ امْرَأَةٌ خَافَتْ مِن بَعْلِهَا نُشُوزًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا ۚ وَالصُّلْحُ خَيْرٌ ۗ وَأُحْضِرَتِ الْأَنفُسُ الشُّحَّ ۚ وَإِن تُحْسِنُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا

আর কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীর দুর্ব্যবহার কিংবা উপেক্ষার আশংকা করে তবে তারা আপোস-নিষ্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোনো গোনাহ নেই এবং আপোস-নিষ্পত্তিই শ্রেয়। মানুষের অন্তরসমূহে লোভজনিত কৃপণতা বিদ্যমান। আর যদি তোমরা সৎকর্মপরায়ণ হও ও মুত্তাকী হও, তবে তোমরা যা কর আল্লাহ তো তার খবর রাখেন।

لاَ يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ

কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে; তার একটা স্বভাব অপছন্দ হলে আরেকটা স্বভাব পছন্দ হবে।

সহিহ মুসলিম ১৪৬৯সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)
২

সুন্নাহ পদ্ধতিতে তালাক

এক তালাক, পবিত্র অবস্থায়, সাক্ষী রেখে

কুরআন ও সুন্নাহ তালাকের একটা পদ্ধতি দিয়েছে, যাতে রাগ ঠান্ডা হওয়ার আর ফিরে আসার সুযোগ থাকে। এই পদ্ধতি না মানলে তালাক পড়লেও গুনাহ হয়।

  • তালাক দিতে হবে ইদ্দতের হিসাব রেখে; অর্থাৎ স্ত্রী এমন পবিত্র অবস্থায় থাকবে, যে পবিত্রতায় সহবাস হয়নি।সূরা আত-তালাক ৬৫:১ · সহিহ বুখারী ৫২৫১সহিহ
  • হায়েজের সময় তালাক দিলে নবীজি (ﷺ) ফিরিয়ে নিতে আদেশ দিয়েছেন, তারপর পরের পবিত্রতায় চাইলে রেখে দেবে বা তালাক দেবে।সহিহ বুখারী ৫২৫১সহিহ
  • দিতে হবে এক তালাক। তালাক দুবার পর্যন্ত ফিরিয়ে নেওয়া যায়; তারপর হয় সম্মানের সাথে রাখো, নয়তো সুন্দরভাবে বিদায় দাও।সূরা আল-বাকারা ২:২২৯
  • এক বা দুই তালাকের পর ইদ্দতের মধ্যে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে, নতুন বিয়ে লাগে না; ইদ্দত শেষ হলে নতুন মোহরে নতুন বিয়ে করে ফেরা যায়।সূরা আল-বাকারা ২:২২৮ · সূরা আল-বাকারা ২:২৩২
  • তালাক বা ফিরিয়ে নেওয়ার সময় দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী রাখার আদেশ এসেছে।সূরা আত-তালাক ৬৫:২
  • ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া যাবে না, সেও বের হয়ে যাবে না।সূরা আত-তালাক ৬৫:১
  • ঠাট্টা করে তালাক দিলেও তালাক হয়ে যায়; বিয়ে, তালাক ও ফিরিয়ে নেওয়া নিয়ে মজা করা যায় না।সুনানে আবু দাউদ ২১৯৪হাসান
  • চরম রাগে যখন মানুষ কী বলছে বুঝতে পারে না, সেই অবস্থার তালাক হয় না বলে হাদিস এসেছে; তবে সাধারণ রাগ এর মধ্যে পড়ে না, কারণ রাগ ছাড়া কেউ সাধারণত তালাক দেয় না।সুনানে আবু দাউদ ২১৯৩হাসান
পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ২টি আয়াত

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ ۖ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِن بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَن يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ ۚ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ ۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ ۚ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَٰلِكَ أَمْرًا

হে নবী! তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীগণকে তালাক দিতে ইচ্ছে কর তাদেরকে তালাক দিও ইদ্দতের প্রতি লক্ষ রেখে এবং তোমরা ইদ্দতের হিসেব রেখো। আর তোমাদের রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো। তোমারা তাদেরকে তাদের ঘড়বাড়ি থেকে বহিস্কার করো না এবং তারাও বের হবে না, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা; যে আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। আপনি জানেন না, হয়ত আল্লাহ্‌ এর পর কোনো উপায় করে দেবেন।

الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ ۗ وَلَا يَحِلُّ لَكُمْ أَن تَأْخُذُوا مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا إِلَّا أَن يَخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

তালাক দু’বার। অতঃপর (স্ত্রীকে) হয় বিধিমত রেখে দেওয়া, নতুবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দেওয়া। আর তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে যা প্রদান করেছ তা থেকে কোনো কিছু গ্রহন করা তোমাদের পক্ষে হালাল নয়। অবশ্য যদি তাদের উভয়ের আশংকা হয় যে, তারা আল্লাহ্‌র সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তারপর যদি তোমরা আশংকা কর যে, তারা আল্লাহ্‌র সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তবে স্ত্রী কোনো কিছুর বিনিময়ে নিস্কৃতি পেতে চাইলে তাতে তাদের কারো কোনো অপরাধ নেই। এ সব আল্লাহ্‌র সীমারেখা সুতরাং তোমরা এর লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহ্‌র সীমারেখা লংঘন করে তারাই যালিম।

ইবনু উমর (রা.) রাসূলুল্লাহর (ﷺ) যুগে তাঁর স্ত্রীকে হায়েজ অবস্থায় তালাক দিলেন। উমর (রা.) এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহকে (ﷺ) জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: তাকে বলো, সে যেন স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়, তারপর পবিত্র হওয়া পর্যন্ত রাখে, তারপর আবার হায়েজ হয়ে আবার পবিত্র হয়। এরপর চাইলে রেখে দেবে, আর চাইলে স্পর্শ করার আগে তালাক দেবে। এটাই সেই ইদ্দত, যা অনুযায়ী নারীদের তালাক দিতে আল্লাহ আদেশ করেছেন।

সহিহ বুখারী ৫২৫১সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.)

ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ النِّكَاحُ وَالطَّلاَقُ وَالرَّجْعَةُ

তিনটি জিনিস এমন, যা সত্যি সত্যি বললেও সত্যি, ঠাট্টা করে বললেও সত্যি: বিয়ে, তালাক ও (তালাকের পর) ফিরিয়ে নেওয়া।

সুনানে আবু দাউদ ২১৯৪হাসানবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)
৩

তিন তালাক ও হিল্লা

এক বৈঠকে তিন তালাক নিয়ে দুই মত, আর হিল্লার অভিশাপ

তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রী আর আগের স্বামীর জন্য হালাল থাকে না, যতক্ষণ না সে স্বাভাবিকভাবে অন্য কাউকে বিয়ে করে এবং সেই সংসার কোনো কারণে ভেঙে যায়। কিন্তু এক বৈঠকে "তিন তালাক" বলে ফেললে কয়টি তালাক পড়ে, এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মতভেদ আছে।

  • তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রী অন্য স্বামীর সাথে সংসার না করা পর্যন্ত হালাল নয়।সূরা আল-বাকারা ২:২৩০
  • শুধু কাগুজে বিয়েতে হবে না; প্রকৃত দাম্পত্য জীবন হতে হবে।সহিহ বুখারী ৫২৬০সহিহ
  • আগের স্বামীর জন্য "হালাল করার" চুক্তিতে বিয়ে (হিল্লা): যে এমন বিয়ে করে আর যার জন্য করে, দুজনকেই নবীজি (ﷺ) লানত করেছেন।জামে আত-তিরমিযী ১১২০সহিহ
  • নবীজির (ﷺ) যুগে, আবু বকরের (রা.) যুগে আর উমরের (রা.) খিলাফতের প্রথম দুই বছর এক সাথে দেওয়া তিন তালাক এক তালাক গণ্য হতো; পরে উমর (রা.) মানুষের তাড়াহুড়া দেখে তা তিন হিসেবে কার্যকর করেন।সহিহ মুসলিম ১৪৭২সহিহ

এক বৈঠকে তিন তালাক: আলেমদের দুই মত

  • অধিকাংশের মত (চার মাযহাব): এক সাথে তিন তালাক দেওয়া গুনাহ, কিন্তু তিন তালাকই পড়ে যায়। তাঁদের দলিল উমরের (রা.) সিদ্ধান্ত ও সাহাবিদের একটি বড় অংশের ফতোয়া।
  • আরেক মত (ইবনু তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়িম, এবং বর্তমানের বহু আলেম ও কয়েকটি দেশের আইন): এক বৈঠকের তিন তালাক এক তালাক গণ্য হবে। দলিল ইবনু আব্বাসের (রা.) উপরের সহিহ হাদিস (সহিহ মুসলিম ১৪৭২)।
  • দুই মতই একমত যে এভাবে তালাক দেওয়া সুন্নাহবিরোধী। এমন ঘটনা ঘটলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে পুরো ঘটনা বলে ফতোয়া নিন, আর কোনো অবস্থাতেই হিল্লার পথে যাবেন না।
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত

فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

অতঃপর যদি সে স্ত্রীকে তালাক দেয় তবে সে স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না, যে পর্যন্ত সে অন্য স্বামীর সাথে সংগত না হবে। অতঃপর সে (দ্বিতীয় স্বামী) যদি তালাক দেয় আর তারা উভয়ে (স্ত্রী ও প্রথম স্বামী) মনে করে যে, তারা আল্লাহ্‌র সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে, তবে তাদের পুনর্মিলনে কারো কোনো অপরাধ হবে না। এগুলো আল্লাহ্‌র সীমারেখা যা তিনি স্পষ্টভাবে এমন কওমের জন্য বর্ণনা করেন যারা জানে।

রিফাআ আল-কুরাযীর স্ত্রী রাসূলুল্লাহর (ﷺ) কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, রিফাআ আমাকে চূড়ান্ত তালাক দিয়েছে। তারপর আমি আবদুর রহমান ইবনুয যুবাইরকে বিয়ে করেছি, কিন্তু তার কাছে কাপড়ের ঝালরের মতো ছাড়া কিছু নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: তুমি হয়তো রিফাআর কাছে ফিরে যেতে চাও? না, যতক্ষণ না সে (নতুন স্বামী) তোমার মধুর স্বাদ নেয় আর তুমি তার মধুর স্বাদ নাও (অর্থাৎ প্রকৃত দাম্পত্য হয়)।

সহিহ বুখারী ৫২৬০সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْمُحِلَّ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লানত করেছেন সেই ব্যক্তিকে, যে (চুক্তি করে তিন তালাকপ্রাপ্তাকে আগের স্বামীর জন্য) হালাল করতে বিয়ে করে, আর যার জন্য হালাল করা হয় তাকেও।

জামে আত-তিরমিযী ১১২০সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.)

রাসূলুল্লাহর (ﷺ) যুগে, আবু বকরের (রা.) যুগে আর উমরের (রা.) খিলাফতের প্রথম দুই বছর (এক সাথে দেওয়া) তিন তালাক এক তালাক গণ্য হতো। তারপর উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বললেন: মানুষ এমন বিষয়ে তাড়াহুড়া শুরু করেছে, যাতে তাদের জন্য ধীরে চলার সুযোগ ছিল; আমরা যদি এটা তাদের উপর কার্যকর করে দিই! তারপর তিনি তা (তিন হিসেবে) কার্যকর করে দিলেন।

সহিহ মুসলিম ১৪৭২সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)
৪

খোলা: স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ

মোহর ফিরিয়ে দিয়ে আলাদা হওয়া

তালাকের অধিকার স্বামীর হাতে, কিন্তু স্ত্রী যদি সংসারে থাকতে না পারে, ইসলাম তাকেও পথ দিয়েছে: খোলা। স্ত্রী মোহর বা অন্য কিছু ফিরিয়ে দিয়ে বিচ্ছেদ চায়; স্বামী রাজি না হলে বিচারক বা সালিশ ফয়সালা করেন।

  • স্বামী-স্ত্রী যদি আশঙ্কা করে তারা আল্লাহর সীমা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী কিছু দিয়ে মুক্ত হলে কারো গুনাহ নেই।সূরা আল-বাকারা ২:২২৯
  • সাবিত ইবনু কায়সের স্ত্রী তাঁর স্বামীর চরিত্র বা দ্বীনে দোষ না দিয়েও শুধু মনের অমিলের কারণে খোলা চেয়েছিলেন; নবীজি (ﷺ) মোহরের বাগান ফেরত নিয়ে তাঁকে মুক্ত করার আদেশ দিলেন।সহিহ বুখারী ৫২৭৩সহিহ
  • তবে সংগত কারণ ছাড়া স্বামীর কাছে তালাক চাওয়ার ব্যাপারে কঠিন সতর্কবাণী এসেছে।সুনানে আবু দাউদ ২২২৬সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ১টি আয়াত

الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ ۗ وَلَا يَحِلُّ لَكُمْ أَن تَأْخُذُوا مِمَّا آتَيْتُمُوهُنَّ شَيْئًا إِلَّا أَن يَخَافَا أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

তালাক দু’বার। অতঃপর (স্ত্রীকে) হয় বিধিমত রেখে দেওয়া, নতুবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দেওয়া। আর তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে যা প্রদান করেছ তা থেকে কোনো কিছু গ্রহন করা তোমাদের পক্ষে হালাল নয়। অবশ্য যদি তাদের উভয়ের আশংকা হয় যে, তারা আল্লাহ্‌র সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তারপর যদি তোমরা আশংকা কর যে, তারা আল্লাহ্‌র সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তবে স্ত্রী কোনো কিছুর বিনিময়ে নিস্কৃতি পেতে চাইলে তাতে তাদের কারো কোনো অপরাধ নেই। এ সব আল্লাহ্‌র সীমারেখা সুতরাং তোমরা এর লংঘন করো না। আর যারা আল্লাহ্‌র সীমারেখা লংঘন করে তারাই যালিম।

সাবিত ইবনু কায়সের স্ত্রী নবীজির (ﷺ) কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আমি সাবিতের চরিত্র বা দ্বীনের কোনো দোষ দিচ্ছি না; কিন্তু ইসলামে থেকে (স্বামীর হক আদায় না করার) অকৃতজ্ঞতায় পড়তে চাই না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: তুমি কি তার বাগানটি (মোহর) ফিরিয়ে দেবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (সাবিতকে) বললেন: বাগানটি নিয়ে নাও, আর তাকে এক তালাক দাও।

সহিহ বুখারী ৫২৭৩সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)

أَيُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا طَلاَقًا فِي غَيْرِ مَا بَأْسٍ فَحَرَامٌ عَلَيْهَا رَائِحَةُ الْجَنَّةِ

যে নারী কোনো সংগত কারণ ছাড়া স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের ঘ্রাণও হারাম।

সুনানে আবু দাউদ ২২২৬সহিহবর্ণনাকারী: সাওবান (রা.)
৫

ইদ্দত: কার কত দিন

তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর অপেক্ষার সময়

ইদ্দত হলো তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর অপেক্ষার নির্দিষ্ট সময়, যার মধ্যে নারী অন্য বিয়ে করতে পারে না। এর উদ্দেশ্য গর্ভ নিশ্চিত হওয়া, ফিরে আসার সুযোগ রাখা আর মৃত স্বামীর প্রতি সম্মান।

পুরো দলিল পড়ুন ২টি হাদিস, ৩টি আয়াত

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ ۚ وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَن يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِن كُنَّ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَٰلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا ۚ وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

আর তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীগণ তিন রজঃস্রাব কাল প্রতীক্ষায় থাকবে। আর তারা আল্লাহ্‌ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখলে তাদের গর্ভাশয়ে আল্লাহ্‌ যা সৃষ্টি করেছেন তা গোপন রাখা তাদের পক্ষে হালাল নয়। আর যদি তারা আপোষ-নিম্পত্তি করতে চায় তবে এতে তাদের পুনঃ গ্রহণে তাদের স্বামীরা বেশী হকদার। আর নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের; আর নারীদের উপর পুরুষদের মর্যাদা আছে। আর আল্লাহ্‌ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ ۚ وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ ۚ وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا

তোমাদের যে সব স্ত্রী আর ঋতুবর্তী হওয়ার আশা নেই তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস এবং যারা এখনো ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদেরও; আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আর যে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ্‌ তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন।

وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا ۖ فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

আর তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যায়, তারা (স্ত্রীগণ) নিজেরা চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় থাকবে। অতঃপর যখন তারা তাদের ‘ইদ্দতকাল পূর্ণ করবে, তখন যথাবিধি নিজেদের জন্য যা করবে তাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই। আর তোমরা যা করো আল্লাহ্‌ সে সম্পর্কে সম্যক খবর রাখেন।

আসলাম গোত্রের সুবাইআ নামের এক নারীর স্বামী মারা গেলেন, তখন তিনি গর্ভবতী। আবুস সানাবিল তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি রাজি হলেন না। আবুস সানাবিল বললেন: দুই মেয়াদের শেষটি পর্যন্ত ইদ্দত পালন না করে তোমার বিয়ে করা ঠিক হবে না। প্রায় দশ রাত পর (সন্তান প্রসবের পর) তিনি নবীজির (ﷺ) কাছে এলেন। তিনি বললেন: বিয়ে করো।

সহিহ বুখারী ৫৩১৮সহিহবর্ণনাকারী: উম্মু সালামা (রা.)

আমাদের নিষেধ করা হতো কোনো মৃতের জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করতে, স্বামী ছাড়া; তার জন্য চার মাস দশ দিন। (এ সময়) আমরা সুরমা লাগাতাম না, সুগন্ধি মাখতাম না, রঙিন কাপড় পরতাম না, তবে ইয়েমেনি সাধারণ কাপড় ছাড়া। হায়েজের পর গোসলের সময় সামান্য সুগন্ধি কাঠ ব্যবহারের অনুমতি ছিল। আর আমাদের জানাজার পেছনে যেতে নিষেধ করা হতো।

সহিহ বুখারী ৫৩৪১সহিহবর্ণনাকারী: উম্মু আতিয়্যা (রা.)
৬

সন্তান, ভরণপোষণ ও সদাচরণ

বিচ্ছেদেও জুলুম নয়

বিচ্ছেদ মানে শত্রুতা নয়। কুরআন বারবার বলেছে, রাখলে সম্মানের সাথে রাখো, ছাড়লে সুন্দরভাবে ছাড়ো; আর সন্তানের হক কোনো অবস্থায় নষ্ট করা যাবে না।

পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ৩টি আয়াত

وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ ۖ لِمَنْ أَرَادَ أَن يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ ۚ وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ لَا تُكَلَّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا ۚ لَا تُضَارَّ وَالِدَةٌ بِوَلَدِهَا وَلَا مَوْلُودٌ لَّهُ بِوَلَدِهِ ۚ وَعَلَى الْوَارِثِ مِثْلُ ذَٰلِكَ ۗ فَإِنْ أَرَادَا فِصَالًا عَن تَرَاضٍ مِّنْهُمَا وَتَشَاوُرٍ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا ۗ وَإِنْ أَرَدتُّمْ أَن تَسْتَرْضِعُوا أَوْلَادَكُمْ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِذَا سَلَّمْتُم مَّا آتَيْتُم بِالْمَعْرُوفِ ۗ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

আর জননীগণ তাদের সস্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর স্তন্য পান করাবে, এটা সে ব্যক্তির জন্য, যে স্তন্যপান কাল পূর্ণ করতে চায়। পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের (মাতাদের) ভরণ-পোষণ করা। কাউকেও তার সাধ্যাতীত কাজের ভার দেয়া হয় না। কোনো মাতাকে তার সন্তানের জন্য এবং যার সন্তান (পিতা) তাকেও তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। আর উত্তরাধিকারীরও অনুরূপ কর্তব্য। কিন্তু যদি তারা পরস্পরের সম্মতি ও পরামর্শক্রমে স্তন্যপান বন্ধ রাখতে চায়, তবে তাদের কারো কোনো অপরাধ নেই। আর যদি তোমরা (কোনো ধাত্রী দ্বারা) তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্য পান করাতে চাও, তাহলে যদি তোমরা প্রচলিত বিধি মোতাবেক বিনিময় দিয়ে দাও তবে তোমাদের কোনো পাপ নেই। আর আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ, তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তা প্রত্যক্ষকারী।

এক নারী বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আমার এই ছেলের জন্য আমার পেট ছিল তার আধার, আমার স্তন ছিল তার পানপাত্র, আমার কোল ছিল তার আশ্রয়। এখন তার বাবা আমাকে তালাক দিয়েছে, আর ছেলেটাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে চায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বললেন: যতদিন তুমি (অন্য কাউকে) বিয়ে না করছ, ততদিন তুমিই তার বেশি হকদার।

সুনানে আবু দাউদ ২২৭৬হাসানবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)

وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ سَرِّحُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ ۚ وَلَا تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا لِّتَعْتَدُوا ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ ۚ وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنزَلَ عَلَيْكُم مِّنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُم بِهِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

আর যখন তোমরা স্ত্রীকে তালাক দাও অতঃপর তারা ‘ইদ্দত পূর্তির নিকটবর্তী হয়, তখন তোমরা হয় বিধি অনুযায়ী তাদেরকে রেখে দেবে অথবা বিধিমত মুক্ত করে দেবে। তাদের ক্ষতি করে সীমালংঘনের উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটকে রেখো না। যে তা করে, সে নিজের প্রতি যুলুম করে। আর তোমরা আল্লাহ্‌র বিধানকে ঠাট্টা-বিদ্রুপের বস্তু করো না এবং তোমাদের প্রতি আল্লাহ্‌র নেয়ামত ও কিতাব এবং হেকমত যা তোমাদের প্রতি নাযিল করেছেন, যা দ্বারা তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন তা স্মরণ কর। আর তোমরা আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সব কিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।

وَلِلْمُطَلَّقَاتِ مَتَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ ۖ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ

আর তালাকপ্রাপ্ত নারীদের প্রথামত ভরণ-পোষণ করা মুত্তাকীদের কর্তব্য।

এক নজরে ইদ্দত

কার কত দিন, সূত্রসহ

অবস্থাইদ্দতসূত্র
তালাকপ্রাপ্তা, নিয়মিত হায়েজ হয়তিন হায়েজসূরা আল-বাকারা ২:২২৮
তালাকপ্রাপ্তা, হায়েজ হয় না (অল্প বয়স বা বার্ধক্য)তিন মাসসূরা আত-তালাক ৬৫:৪
গর্ভবতী (তালাক বা মৃত্যু, যেটাই হোক)সন্তান প্রসব পর্যন্তসূরা আত-তালাক ৬৫:৪
বিধবা, গর্ভবতী ননচার মাস দশ দিনসূরা আল-বাকারা ২:২৩৪
স্পর্শের আগেই তালাককোনো ইদ্দত নেইসূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৯
খোলাঅনেক আলেমের মতে এক হায়েজ, অধিকাংশের মতে তালাকের মতো তিন হায়েজসহিহ বুখারী ৫২৭৩সহিহ

শরিয়তে মুখে উচ্চারণ করলেই তালাক হয়ে যায়। তবে দেশের আইনে নোটিশ ও নিবন্ধনের যে নিয়ম আছে (যেমন বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১), দেনমোহর, ভরণপোষণ ও সন্তানের অধিকার রক্ষায় তা মেনে চলুন এবং প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

প্রচলিত কিন্তু সহিহ নয়

তালাক নিয়ে সমাজে যত ভুল ধারণা, তার দাম দিতে হয় নারী, শিশু আর পুরো পরিবারকে। প্রতিটির সাথে সঠিক কথা ও সূত্র দেওয়া হলো।

দুর্বল "আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দের হালাল কাজ তালাক"

এই বর্ণনা সুনানে আবু দাউদ ২১৭৮-এ আছে। শাইখ আলবানী ও মুহিউদ্দীন আব্দুল হামীদ একে দুর্বল বলেছেন; ইমাম আবু হাতিম ও দারাকুতনীসহ অনেকে বলেছেন, এটা আসলে মুরসাল (সাহাবির নাম বাদ)। তবে এর মর্ম সঠিক যে অপ্রয়োজনে সংসার ভাঙা আল্লাহর পছন্দ নয়; সেটা বোঝাতে কুরআনের মীমাংসার আদেশ (সূরা আন-নিসা ৪:৩৫) আর সহিহ হাদিসই যথেষ্ট (সহিহ মুসলিম ১৪৬৯)।

ভুল ধারণা "তিনবার তালাক না বললে তালাক হয় না"

একবার তালাক বললেই এক তালাক হয়ে যায়; বরং সুন্নাহ পদ্ধতি হলো একবারই বলা (সূরা আল-বাকারা ২:২২৯, সূরা আত-তালাক ৬৫:১)। তিনবার বলা উল্টো গুনাহ এবং বিপদ ডেকে আনে।

হারাম "হিল্লা বিয়ে দিলেই আবার আগের স্বামীর কাছে ফেরা যায়"

চুক্তি করে "হালাল করার" বিয়েতে দুজনকেই নবীজি (ﷺ) লানত করেছেন (জামে আত-তিরমিযী ১১২০)। এমন বিয়ে দিয়ে আগের স্বামীর জন্য স্ত্রী হালাল হয় না; কুরআন যে বিয়ের কথা বলেছে, তা স্বাভাবিক, স্থায়ী নিয়তের সংসার (সূরা আল-বাকারা ২:২৩০, সহিহ বুখারী ৫২৬০)।

আংশিক ভুল "রাগের মাথায় বললে তালাক হয় না"

হাদিসে "ইগলাক" অবস্থার তালাক না হওয়ার কথা এসেছে (সুনানে আবু দাউদ ২১৯৩)। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এর মানে এমন চরম রাগ যাতে মানুষ বুঝতে পারে না সে কী বলছে। সাধারণ রাগে দেওয়া তালাক পড়ে যায়; কারণ বেশিরভাগ তালাকই রাগ থেকে আসে। নিজের অবস্থার জন্য আলেমকে পুরো ঘটনা বলুন।

ভুল ধারণা "তালাক দিলেই স্ত্রীকে সেদিনই বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হয়"

কুরআন স্পষ্ট বলেছে, ইদ্দতের মধ্যে তাদের ঘর থেকে বের করে দিয়ো না, তারাও বের হবে না; হয়তো আল্লাহ এর মধ্যে নতুন কোনো পথ খুলে দেবেন (সূরা আত-তালাক ৬৫:১)। এক বা দুই তালাকের পর এই সময়েই অনেক সংসার আবার জোড়া লাগে।

বাড়াবাড়ি "বিধবা ইদ্দতের মধ্যে ঘর থেকে একেবারেই বের হতে পারবে না, চাঁদ বা আকাশও দেখা যাবে না"

বিধবা ইদ্দতের সময় সাধারণত স্বামীর ঘরে রাত কাটাবে আর সাজসজ্জা থেকে বিরত থাকবে (সহিহ বুখারী ৫৩৪১)। কিন্তু চিকিৎসা, জীবিকা বা জরুরি প্রয়োজনে দিনে বের হওয়া যায় (সহিহ মুসলিম ১৪৮৩)। চাঁদ-আকাশ না দেখা, কারো সাথে কথা না বলা, এসব প্রথার কোনো দলিল নেই।

শেষ কথা: তাকওয়াই পথ বের করে দেয়

তালাকের সূরায় আল্লাহ বারবার তাকওয়ার কথা বলেছেন। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন এবং ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেন (সূরা আত-তালাক ৬৫:২, সূরা আত-তালাক ৬৫:৩)। সংসার টিকুক বা না টিকুক, দুজনেই যেন জুলুম থেকে বাঁচেন।

فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ فَارِقُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ وَأَشْهِدُوا ذَوَيْ عَدْلٍ مِّنكُمْ وَأَقِيمُوا الشَّهَادَةَ لِلَّهِ ۚ ذَٰلِكُمْ يُوعَظُ بِهِ مَن كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

অতঃপর তাদের ইদ্দত পূরণের কাল আসন্ন হলে তোমরা হয় যথাবিধি তাদেরকে রেখে দেবে, না হয় তাদেরকে পরিত্যাগ করবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে দুজন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে; আর তোমার আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। এ দ্বারা তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখে তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর যে কেউ আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ তার জন্য (উত্তরণের) পথ করে দেবেন

وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ۚ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ۚ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا

এবং তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন রিযিক। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তার জন্য আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছে পূরণ করবেনই; অবশ্যই আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন সুনির্দিষ্ট মাত্ৰা।

সাথে পড়ুনসুন্নাহ মোতাবেক বিয়েপাত্র-পাত্রী বাছাই, মোহর, অভিভাবক ও ওলিমা: শুরুটা ঠিক হলে ভাঙার ঝুঁকি কমে
deenpedia.com · https://deenpedia.com/jibon/talak-iddot/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার