إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا
হুদায়বিয়ার সন্ধি: যে "পরাজয়"কে আল্লাহ বললেন স্পষ্ট বিজয়
এবার কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়। সাহাবিরা বের হয়েছিলেন সাদা ইহরামে, মুখে তালবিয়া, সাথে কুরবানির পশু। কিন্তু মক্কার কাছে এসে পথ বন্ধ। যা ঘটল, তা মানুষের হিসাবে ছিল নিচু হয়ে ফিরে যাওয়া, আর আল্লাহর হিসাবে এক বিরাট বিজয়ের শুরু।
সীরাত · মাদানী যুগ৬২৮ খ্রি. · ৬ হিজরি · যিলকদ
- কখন
- ৬ হিজরি, যিলকদ মাস
- কোথায়
- মক্কা থেকে প্রায় ২০-২৫ কিমি পশ্চিমে হুদায়বিয়া (আজকের আশ-শুমাইসি এলাকা), হারামের সীমানার কাছে
- কারা
- নবীজি (ﷺ) ও প্রায় ১৪০০-১৫০০ সাহাবি (ভিন্ন বর্ণনা); কুরাইশের পক্ষে দূত বুদাইল, উরওয়া ইবনু মাসউদ, শেষে সুহাইল ইবনু আমর
- এই গল্পে
- মদিনা থেকে উমরার সফর থেকে সূরা আল-ফাতহ নাজিল পর্যন্ত
কেন পড়বেন: হুদায়বিয়া শেখায়, আল্লাহর সিদ্ধান্ত বোঝা সবসময় সহজ নয়। সবচেয়ে সাহসী সাহাবিও প্রশ্ন করেছিলেন, তবু শেষে আনুগত্য করেছিলেন। আর এই সন্ধির পরের দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তা আগের সব বছরকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
গল্প
বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।
- ১
যিলকদ, ৬ হিজরি
ইহরামে, যুদ্ধের জন্য নয়
নবীজি (ﷺ) প্রায় চৌদ্দশো সাহাবি নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে মক্কার পথে রওনা হলেন, সাথে কুরবানির পশু, যাতে সবাই বোঝে তাঁরা যুদ্ধ করতে আসেননি। পথে খবর এল, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ কুরাইশের অশ্বারোহী নিয়ে পথ আটকাতে এসেছেন; নবীজি (ﷺ) অন্য পথ ধরলেন। মক্কায় নামার গিরিপথে পৌঁছাতেই তাঁর উটনী কাসওয়া বসে পড়ল, কিছুতেই উঠল না। লোকেরা বলল, কাসওয়া জেদ ধরেছে। নবীজি (ﷺ) বললেন: না, তাকে থামিয়েছেন তিনিই, যিনি (আবরাহার) হাতিকে থামিয়েছিলেন। তারপর ঘোষণা দিলেন: তারা আমার কাছে এমন যেকোনো প্রস্তাব চাইবে, যাতে আল্লাহর পবিত্র বিষয়গুলোর সম্মান রক্ষা হয়, আমি তা মেনে নেব (সহিহ বুখারী ২৭৩২)।
কুরাইশ তাঁদের মসজিদুল হারামে যেতে দিল না, কুরবানির পশুগুলোও আটকে রইল। আল্লাহ পরে এ কথা কুরআনে বলেছেন:
هُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَالْهَدْيَ مَعْكُوفًا أَن يَبْلُغَ مَحِلَّهُ ۚ وَلَوْلَا رِجَالٌ مُّؤْمِنُونَ وَنِسَاءٌ مُّؤْمِنَاتٌ لَّمْ تَعْلَمُوهُمْ أَن تَطَئُوهُمْ فَتُصِيبَكُم مِّنْهُم مَّعَرَّةٌ بِغَيْرِ عِلْمٍ ۖ لِّيُدْخِلَ اللَّهُ فِي رَحْمَتِهِ مَن يَشَاءُ ۚ لَوْ تَزَيَّلُوا لَعَذَّبْنَا الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
তারাই তো কুফরী করেছিল এবং বাধা দিয়েছিল তোমাদেরকে মসজিদুল- হারাম হতে ও বাধা দিয়েছিল কুরবানীর জন্য আবদ্ধ পশুগুলোকে যথাস্থানে পৌঁছতে। আর যদি মুমিন পুরুষরা ও মুমিন নারীরা না থাকত, যাদের সম্পর্কে তোমরা জান না যে, তোমরা অজ্ঞাতসারে তাদেরকে পদদলিত করবে, ফলে তাদের কারণে তোমরা অপরাধী ও দোষী সাব্যস্ত হতে, (তবে অবশ্যই তিনি যুদ্ধের অনুমতি দিতেন। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তখন এর অনুমতি দেন নি) যাতে তিনি যাকে ইচ্ছে নিজ অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন। যদি তারা পৃথক হয়ে থাকত, তবে অবশ্যই আমরা তাদের মধ্যে কাফিরদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
সূত্রসহিহ বুখারী ২৭৩২ সহিহসূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৫ কুরআন
"আল্লাহর পবিত্র বিষয়গুলোর সম্মান রক্ষা হয়, এমন যেকোনো প্রস্তাব মেনে নেব।" যুদ্ধের শক্তি থাকা সত্ত্বেও শান্তির দরজা খোলা রাখা, এ ছিল তাঁর প্রথম ঘোষণা।
- ২
হুদায়বিয়ায় পৌঁছে
শুকনো কূপ আর আঙুলের ফোয়ারা
হুদায়বিয়ায় সামান্য পানির একটা কূপ ছিল, মানুষ অল্প সময়েই তা শুকিয়ে ফেলল। নবীজি (ﷺ) তূণ থেকে একটা তীর বের করে কূপে রাখতে বললেন, আর পানি উথলে উঠল (সহিহ বুখারী ২৭৩২)। আরেকবার, যখন অজুর পানিও শেষ:
হুদায়বিয়ার দিন লোকেরা পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। নবীজির (ﷺ) সামনে ছিল একটা চামড়ার পাত্র, তিনি তা থেকে অজু করলেন। লোকেরা তাঁর দিকে ছুটে এল। তিনি বললেন: কী হয়েছে? তারা বলল: আপনার সামনের এই পানিটুকু ছাড়া আমাদের কাছে অজু বা পান করার মতো পানি নেই। তিনি পাত্রে হাত রাখলেন, আর তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরনার মতো পানি উথলে উঠতে লাগল। আমরা পান করলাম, অজু করলাম। (জাবিরকে) জিজ্ঞেস করা হলো: আপনারা কতজন ছিলেন? বললেন: এক লাখ হলেও যথেষ্ট হতো; আমরা ছিলাম পনেরোশো জন।
সূত্রসহিহ বুখারী ৩৫৭৬ সহিহসহিহ বুখারী ২৭৩২ সহিহ
সংকটে সাহাবিরা দৌড়ে গিয়েছিলেন নবীজির (ﷺ) কাছে। আমাদের সংকটে প্রথম দৌড় কোথায়: মানুষের কাছে, নাকি আল্লাহর কাছে আর তাঁর রাসূলের সুন্নাহর কাছে?
- ৩
দূত বিনিময়ের দিনগুলো
গাছের নিচে বাইআত
দুই পক্ষে দূত আসা-যাওয়া চলল। কুরাইশের দূত উরওয়া ইবনু মাসউদ ফিরে গিয়ে বলল: আমি কায়সার, কিসরা আর নাজাশির দরবারে গেছি, কিন্তু কোনো রাজাকে তার সঙ্গীরা এত সম্মান করতে দেখিনি, যতটা মুহাম্মাদের (ﷺ) সঙ্গীরা তাঁকে করে (একই হাদিস, সহিহ বুখারী ২৭৩২)। নবীজি (ﷺ) উসমানকে (রা.) মক্কায় পাঠালেন। সীরাতের বর্ণনায় আছে, গুজব ছড়াল তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তখন নবীজি (ﷺ) একটি গাছের নিচে সবার কাছ থেকে বাইআত নিলেন, পিছু না হটার। আল্লাহ এই বাইআতকারীদের উপর সন্তুষ্টির ঘোষণা দিলেন:
لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
অবশ্যই আল্লাহ মুমিনগণের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নীচে আপনার কাছে বাই’আত গ্ৰহণ করেছিল, অতঃপর তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি জেনে নিয়েছেন; ফলে তিনি তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয়ে পুরস্কৃত করলেন;
আর নবীজি (ﷺ) তাঁদের বললেন:
قَالَ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ الْحُدَيْبِيَةِ " أَنْتُمْ خَيْرُ أَهْلِ الأَرْضِ ". وَكُنَّا أَلْفًا وَأَرْبَعَمِائَةٍ، وَلَوْ كُنْتُ أُبْصِرُ الْيَوْمَ لأَرَيْتُكُمْ مَكَانَ الشَّجَرَةِ
হুদায়বিয়ার দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের বললেন: তোমরা পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে সেরা। আমরা ছিলাম এক হাজার চারশো জন। (জাবির বললেন:) আজ যদি আমার চোখে দেখার শক্তি থাকত, তোমাদের সেই গাছের জায়গাটা দেখিয়ে দিতাম।
সূত্রসূরা আল-ফাতহ ৪৮:১৮ কুরআনসহিহ বুখারী ৪১৫৪ সহিহসহিহ বুখারী ২৯৫৮ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: উসমানকে (রা.) মক্কায় পাঠানো ও হত্যার গুজব ঐতিহাসিক বর্ণনা
এক মুসলিম ভাইয়ের হত্যার গুজবে চৌদ্দশো জন প্রাণ দিতে প্রস্তুত হলেন। এই ভ্রাতৃত্বের জন্যই আল্লাহ বললেন: আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট।
- ৪
সন্ধিপত্র লেখা
"বিসমিকা আল্লাহুম্মা" আর "মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ"
শেষে কুরাইশ পাঠাল সুহাইল ইবনু আমরকে। নবীজি (ﷺ) দেখে বললেন, এবার ব্যাপারটা সহজ হলো। সন্ধির শর্তগুলো ছিল এমন: এ বছর মুসলিমরা উমরা না করে ফিরে যাবেন, পরের বছর আসবেন; দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ; আর মক্কার কেউ মুসলিম হয়ে মদিনায় গেলে তাকে ফেরত দিতে হবে, কিন্তু মদিনা থেকে কেউ মক্কায় গেলে ফেরত দেওয়া হবে না (শর্তগুলোর বিস্তারিত সীরাতের বইয়ে)। লেখার সময় প্রথম শব্দ থেকেই আপত্তি:
হুদায়বিয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (উমরার উদ্দেশ্যে) বের হলেন। পথে নবীজি (ﷺ) বললেন: খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ কুরাইশের অশ্বারোহী অগ্রবাহিনী নিয়ে গামীমে আছে, তাই তোমরা ডান দিকের পথ ধরো। ... নবীজি (ﷺ) চলতে চলতে যখন সেই গিরিপথে পৌঁছালেন, যেখান দিয়ে (মক্কার দিকে) নামতে হয়, তাঁর উটনী বসে পড়ল। লোকেরা বলল: চল, চল! সে বসেই রইল। তারা বলল: কাসওয়া জেদ ধরেছে, কাসওয়া জেদ ধরেছে। নবীজি (ﷺ) বললেন: কাসওয়া জেদ ধরেনি, এটা তার স্বভাবও নয়; বরং তাকে থামিয়েছেন তিনিই, যিনি (আবরাহার) হাতিকে থামিয়েছিলেন। তারপর বললেন: যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম, তারা আমার কাছে এমন যেকোনো প্রস্তাব চাইবে, যাতে আল্লাহর পবিত্র বিষয়গুলোর সম্মান রক্ষা হয়, আমি তা মেনে নেব। ... তারপর সুহাইল ইবনু আমর এসে বলল: আসুন, আমাদের আর আপনাদের মধ্যে একটা চুক্তিপত্র লিখি। নবীজি (ﷺ) লেখককে ডেকে বললেন: লেখো, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। সুহাইল বলল: রাহমান কে, আল্লাহর কসম, আমি জানি না; বরং লেখো "বিসমিকা আল্লাহুম্মা", যেমন আগে লিখতে। মুসলিমরা বললেন: আল্লাহর কসম, আমরা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম ছাড়া লিখব না। নবীজি (ﷺ) বললেন: লেখো, বিসমিকা আল্লাহুম্মা। তারপর বললেন: এ সেই চুক্তি, যা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ করছেন। সুহাইল বলল: আল্লাহর কসম, আমরা যদি জানতাম আপনি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আপনাকে কাবা থেকে আটকাতাম না, আপনার সাথে যুদ্ধও করতাম না; বরং লেখো, মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ। নবীজি (ﷺ) বললেন: আল্লাহর কসম, তোমরা আমাকে অস্বীকার করলেও আমি আল্লাহর রাসূল। লেখো, মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ। ... সুহাইল বলল: আর শর্ত এই যে, আমাদের কোনো লোক আপনার কাছে গেলে, সে আপনার দ্বীনের অনুসারী হলেও, আপনি তাকে আমাদের কাছে ফেরত দেবেন। মুসলিমরা বললেন: সুবহানাল্লাহ! মুসলিম হয়ে আসা একজনকে মুশরিকদের কাছে কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে? এমন সময় সুহাইলের নিজের ছেলে আবু জানদাল শিকল পায়ে হেঁটে হেঁটে মক্কার নিচের দিক থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিমদের মাঝে নিজেকে ছুড়ে দিলেন। সুহাইল বলল: মুহাম্মাদ, এই যে প্রথম জন, যাকে ফেরত দেওয়ার দাবি আমি করছি। নবীজি (ﷺ) বললেন: আমরা তো এখনো চুক্তি লেখা শেষ করিনি। সে বলল: তাহলে আল্লাহর কসম, আমি আপনার সাথে কোনো কিছুতেই সন্ধি করব না। নবীজি (ﷺ) বললেন: তাহলে একে আমার জন্য ছাড় দাও। সে বলল: আমি ছাড় দেব না। তিনি বললেন: না, দাও। সে বলল: দেব না। ... আবু জানদাল বললেন: হে মুসলিমগণ, আমি মুসলিম হয়ে এসেছি, তবু আমাকে মুশরিকদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে? দেখছ না আমি কী ভোগ করেছি? আল্লাহর পথে তাঁকে কঠিন নির্যাতন করা হয়েছিল।
সূত্রসহিহ বুখারী ২৭৩২ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: সন্ধির শর্তসমূহ ও দশ বছরের মেয়াদ ঐতিহাসিক বর্ণনা
নবীজি (ﷺ) নামের পদবি ছেড়েছেন, কিন্তু সত্য ছাড়েননি: "তোমরা অস্বীকার করলেও আমি আল্লাহর রাসূল।" নীতি অটল রেখে ভাষায় নমনীয় হওয়া, এটাই প্রজ্ঞা।
- ৫
সন্ধির দিন
শিকল পায়ে আবু জানদাল, আর উমরের প্রশ্ন
সন্ধি লেখা তখনো শেষ হয়নি। এমন সময় সুহাইলেরই ছেলে আবু জানদাল (রা.), যিনি মুসলিম হওয়ায় বাবার হাতে বন্দি ছিলেন, শিকল পায়ে পালিয়ে এসে মুসলিমদের মাঝে পড়লেন। সুহাইল তাঁকে ফেরত চাইল, নইলে কোনো সন্ধি নয়। নবীজি (ﷺ) অনুরোধ করলেন, সে মানল না। আবু জানদালকে ফিরতে হলো (একই হাদিস, সহিহ বুখারী ২৭৩২)।
সাহাবিদের বুক ফেটে যাচ্ছিল। উমর (রা.) আর সহ্য করতে পারলেন না:
(সিফফীনে সাহল বললেন: নিজেদের মতকে সন্দেহ করো,) আমরা হুদায়বিয়ার দিন রাসূলুল্লাহর (ﷺ) সাথে ছিলাম; যুদ্ধ দরকার মনে করলে আমরা যুদ্ধ করতাম। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি হকের উপর নেই, আর ওরা বাতিলের উপর? তিনি বললেন: অবশ্যই। উমর বললেন: আমাদের নিহতরা কি জান্নাতে নয়, আর ওদের নিহতরা জাহান্নামে? বললেন: অবশ্যই। উমর বললেন: তাহলে কেন আমরা দ্বীনের ব্যাপারে নিচু হয়ে ফিরে যাব, অথচ আল্লাহ এখনো আমাদের মধ্যে ফয়সালা করেননি? তিনি বললেন: খাত্তাবের ছেলে, আমি আল্লাহর রাসূল; আল্লাহ কখনো আমাকে ধ্বংস হতে দেবেন না। উমর আবু বকরের (রা.) কাছে গিয়ে একই কথা বললেন। আবু বকর বললেন: তিনি আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ কখনো তাঁকে ধ্বংস হতে দেবেন না। তারপর সূরা আল-ফাতহ নাজিল হলো, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উমরকে শেষ পর্যন্ত পড়ে শোনালেন। উমর বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, এটা কি বিজয়? তিনি বললেন: হ্যাঁ।
সূত্রসহিহ বুখারী ২৭৩২ সহিহসহিহ বুখারী ৩১৮২ সহিহ
উমর (রা.) প্রশ্ন করেছিলেন, আর আবু বকর (রা.) দিয়েছিলেন হুবহু নবীজির (ﷺ) মতো উত্তর, না শুনেই। বোঝা না গেলে প্রশ্ন করা দোষ নয়, কিন্তু শেষ কথা আল্লাহ ও রাসূলের।
- ৬
সন্ধির পর
উম্মে সালামার (রা.) পরামর্শ
সন্ধি শেষে নবীজি (ﷺ) বললেন, এখানেই কুরবানি করো, মাথা মুণ্ডাও; উমরা এ বছর হবে না। কষ্টে, হয়তো আশায়, কেউ উঠলেন না, তিনবার বলার পরও। নবীজি (ﷺ) তাঁবুতে গিয়ে উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামাকে (রা.) বললেন। তাঁর পরামর্শই সমাধান হলো:
(হুদাইবিয়ার সন্ধি লেখা শেষ হলে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবিদের বললেন: ওঠো, কুরবানি করো, তারপর মাথা মুণ্ডাও। কিন্তু (মন খারাপের কারণে) কেউ উঠল না, যদিও তিনি তিনবার বললেন। কেউ না ওঠায় তিনি উম্মু সালামা (রা.)-এর কাছে গিয়ে মানুষের এই অবস্থার কথা বললেন। উম্মু সালামা বললেন: হে আল্লাহর নবী, আপনি কি এটাই চান? তাহলে বাইরে যান, কাউকে একটা কথাও বলবেন না; নিজের পশু কুরবানি করুন আর নাপিত ডেকে মাথা মুণ্ডিয়ে নিন। তিনি বের হলেন, কারো সাথে কথা না বলে তা-ই করলেন। তাঁকে দেখে সাহাবিরা উঠে কুরবানি করলেন, আর একে অপরের মাথা মুণ্ডাতে লাগলেন।
সূত্রসহিহ বুখারী ২৭৩১ সহিহ
কথায় যা হয়নি, কাজের দৃষ্টান্তে তা হলো। আর একজন নারীর পরামর্শ পুরো উম্মাহকে এক কঠিন মুহূর্ত থেকে বাঁচাল।
- ৭
মদিনায় ফেরার পথে
"এই সূরা আমার কাছে দুনিয়ার চেয়ে প্রিয়"
ফেরার পথে এক রাতে উমর (রা.) নবীজিকে (ﷺ) তিনবার কিছু জিজ্ঞেস করলেন, উত্তর পেলেন না। ভয় পেলেন, তাঁর ব্যাপারে হয়তো কুরআন নাজিল হবে। তখন ডাক এল:
لَقَدْ أُنْزِلَتْ عَلَىَّ اللَّيْلَةَ سُورَةٌ لَهِيَ أَحَبُّ إِلَىَّ مِمَّا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ، ثُمَّ قَرَأَ {إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا
(হুদায়বিয়া থেকে ফেরার পথে এক রাতে নবীজি (ﷺ) বললেন:) আজ রাতে আমার উপর এমন একটি সূরা নাজিল হয়েছে, যা আমার কাছে সূর্য যার উপর ওঠে (অর্থাৎ পুরো দুনিয়া), তার চেয়েও প্রিয়। তারপর পড়লেন: "নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দিয়েছি এক সুস্পষ্ট বিজয়।"
পরে দেখা গেল, সত্যিই এ ছিল বিজয়। যুদ্ধ থামায় মানুষ নির্ভয়ে মুসলিমদের সাথে মিশতে লাগল, ইসলামের কথা শুনল; দুই বছরের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা কয়েক গুণ হলো। মক্কার যে মুসলিমরা ফেরত গিয়েছিলেন, আবু বাসীর (রা.) ও আবু জানদাল (রা.) তাঁদের নিয়ে সমুদ্রতীরে আলাদা দল গড়লেন, শেষে কুরাইশ নিজেরাই ফেরত দেওয়ার শর্ত তুলে নিতে অনুরোধ করল (একই হাদিস সহিহ বুখারী ২৭৩২-এর শেষ অংশে)। আর দুই বছর পর এই সন্ধি ভাঙে কুরাইশের মিত্ররা, যার পর আসে মক্কা বিজয়।
সূত্রসহিহ বুখারী ৪১৭৭ সহিহসূরা আল-ফাতহ ৪৮:১ কুরআনসূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৭ কুরআনসহিহ বুখারী ২৭৩২ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা (যুহরীর কথা) ঐতিহাসিক বর্ণনা
যে শর্তকে সবচেয়ে অপমানজনক মনে হয়েছিল, সেটাই শেষে কুরাইশের বোঝা হয়ে দাঁড়াল। আল্লাহর ফয়সালা দেখতে সময় লাগে, ধৈর্য লাগে।
প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়
এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।
ভুল ধারণা হুদায়বিয়ায় মুসলিমরা হেরে গিয়েছিলেন, সন্ধি ছিল অপমানের
বাহ্যত শর্তগুলো কঠিন ছিল, সাহাবিরাও কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ নিজে একে "স্পষ্ট বিজয়" বলেছেন (সূরা আল-ফাতহ ৪৮:১), আর উমর (রা.) জিজ্ঞেস করলে নবীজি (ﷺ) বলেছেন, হ্যাঁ, এটা বিজয় (সহিহ বুখারী ৩১৮২)।
ভিত্তিহীন বাইআতে রিদওয়ানের গাছটা আজও চেনা যায়, সেখানে নামাজ পড়লে বা ছুঁয়ে দিলে বিশেষ বরকত
যে সাহাবিরা নিজে গাছের নিচে বাইআত দিয়েছিলেন, তাঁরাই পরের বছর গাছটা খুঁজে পাননি; ইবনু উমর (রা.) একে আল্লাহর রহমত বলেছেন (সহিহ বুখারী ২৯৫৮)। পরবর্তী যুগে লোকেরা একটা গাছকে সেই গাছ ভেবে নামাজ পড়তে শুরু করলে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহ.) তা ভুল বলেছেন (সহিহ বুখারী ৪১৬৩)। বরকত আল্লাহর আনুগত্যে, কোনো গাছ বা জায়গাকে নিজেরা পবিত্র বানানোয় নয়।
এই গল্প থেকে আমার জীবনে
গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।
আল্লাহর ফয়সালায় আস্থা
যে সন্ধিকে মানুষ পরাজয় ভেবেছিল, আল্লাহ তাকে বিজয় বলেছেন।
আজকের কাজ: আপনার জীবনের যে ঘটনাকে এখন ক্ষতি মনে হচ্ছে, আজ তার সম্ভাব্য একটা কল্যাণ লিখে রাখুন, আর আল্লাহর উপর ভরসার দোয়া করুন।
সূরা আল-ফাতহ ৪৮:১ কুরআনসূরা আল-বাকারা ২:২১৬ কুরআন
শান্তির পথ খোলা রাখা
শক্তি থাকা সত্ত্বেও নবীজি (ﷺ) এমন যেকোনো প্রস্তাব মানতে রাজি ছিলেন, যাতে আল্লাহর পবিত্রতা রক্ষা হয়।
আজকের কাজ: কারও সাথে চলমান বিরোধে আজ এমন একটা প্রস্তাব দিন, যাতে আপনি কিছুটা ছাড় দেন, কিন্তু হক ছাড়েন না।
সহিহ বুখারী ২৭৩২ সহিহসূরা আল-আনফাল ৮:৬১ কুরআন
কথার বদলে দৃষ্টান্ত
সাহাবিরা কথায় ওঠেননি, নবীজিকে (ﷺ) কুরবানি করতে দেখে সবাই উঠে গেলেন।
আজকের কাজ: পরিবারে যে ভালো অভ্যাস চান (নামাজ, কুরআন, তাড়াতাড়ি ঘুম), আজ বলার বদলে নিজে করে দেখান।
সহিহ বুখারী ২৭৩১ সহিহ
স্ত্রী ও পরিবারের পরামর্শ নেওয়া
সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে নবীজি (ﷺ) উম্মে সালামার (রা.) পরামর্শ চেয়েছেন, মেনেছেন।
আজকের কাজ: আজ কোনো সিদ্ধান্তে আপনার জীবনসঙ্গী বা পরিবারের কারও মত জিজ্ঞেস করুন, মন দিয়ে শুনুন।
সহিহ বুখারী ২৭৩১ সহিহসূরা আশ-শূরা ৪২:৩৮ কুরআন
বরকত সুন্নাহয়, স্থানে নয়
সাহাবিরা বাইআতের গাছ খুঁজে পাননি, আর এটাকে তাঁরা রহমত বলেছেন।
আজকের কাজ: কোনো মাজার, গাছ বা জায়গার "বরকত" নিয়ে শোনা কথা থাকলে আজ তার দলিল যাচাই করুন।
সহিহ বুখারী ২৯৫৮ সহিহসহিহ বুখারী ৪১৬৩ সহিহ
উমর (রা.) বলেছিলেন, "কেন আমরা দ্বীনের ব্যাপারে নিচু হব?" অথচ সেটাই ছিল বিজয়ের দরজা। আপনার জীবনে কোন "হার" পরে বিজয় হয়ে ফিরে এসেছে?
সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
- কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
- সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
- ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
- মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
- দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।
সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।