deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا

খন্দক (আহযাব) যুদ্ধ: পরিখা, ক্ষুধা আর ঝড়ের রাত

উহুদের দুই বছর পর কুরাইশ আর আরবের নানা গোত্র মিলে এমন এক বাহিনী গড়ল, যা মদিনা আগে কখনো দেখেনি। মুসলিমদের হাতে ছিল না সৈন্যের সংখ্যা, না খাবার। ছিল শুধু একটা পরিখা, ধৈর্য আর আল্লাহর উপর ভরসা।

৭ দৃশ্য১০ হাদিস৯ আয়াত

সীরাত · মাদানী যুগ৬২৭ খ্রি. · ৫ হিজরি · শাওয়াল

কখন
৫ হিজরি, শাওয়াল মাস (প্রসিদ্ধ মত); প্রায় এক মাস অবরোধ
কোথায়
মদিনার উত্তর-পশ্চিমের খোলা দিক, সালা পাহাড়ের সামনে; বাকি দিক পাহাড়, খেজুর বাগান আর পাথুরে ভূমিতে ঘেরা
দুই পক্ষ
মুসলিম প্রায় ৩০০০ জন; কুরাইশ, গাতাফান ও অন্যান্য গোত্রের সম্মিলিত বাহিনী (আহযাব) প্রায় ১০,০০০ জন
এই গল্পে
পরিখা খনন থেকে বনু কুরাইযার পরিণতি পর্যন্ত

কেন পড়বেন: খন্দকে কোনো বড় সম্মুখযুদ্ধ হয়নি, তবু কুরআন এই ঘটনার নামে একটা পুরো সূরা নাম দিয়েছে: আল-আহযাব। এখানে আছে নেতার নিজে পরিশ্রম করা, ক্ষুধার মধ্যে ভাগাভাগি, ভয়ের মধ্যে ঈমানের পরীক্ষা, আর আল্লাহর সেই সাহায্য, যা আসে মানুষের সব উপায় শেষ হলে।

গল্প

বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।

  1. ১

    ৫ হিজরি

    দশ হাজারের জোট

    মদিনা থেকে বের করে দেওয়া বনু নাদিরের কিছু নেতা মক্কায় গিয়ে কুরাইশকে আবার যুদ্ধে উসকাল, তারপর গাতাফানসহ অন্যান্য গোত্রকেও জোটে আনল। প্রায় দশ হাজার সৈন্যের এই সম্মিলিত বাহিনীকেই কুরআন বলেছে "আল-আহযাব", দলগুলো। সীরাতের বর্ণনায় আছে, মদিনার খোলা দিকে পরিখা খোঁড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন সালমান ফারসি (রা.); পারস্যে এই কৌশলের চল ছিল, আরবরা এর আগে দেখেনি।

    সেই দিনগুলোর ভয় আল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেছেন:

    إِذْ جَاءُوكُم مِّن فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا

    যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল তোমাদের উপরের দিক ও নিচের দিক হতে, তোমাদের চোখ বিস্ফোরিত হয়েছিল এবং তোমাদের প্রাণ হয়ে পরেছিল কণ্ঠাগত, আর তোমরা আল্লাহ্ সম্মন্ধে নানাবিধ ধারনা পোষণ করছিলে;

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আহযাবের জোট গঠন ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা: সালমান ফারসির (রা.) পরিখার পরামর্শ ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা আল-আহযাব ৩৩:১০ কুরআনসূরা আল-আহযাব ৩৩:১১ কুরআন

    নবীজি (ﷺ) একজন নতুন মুসলিম, পারস্য থেকে আসা মানুষের পরামর্শ নিয়েছেন। ভালো কৌশল কোথা থেকে এল, তা দেখার আগে দেখতে হয়, তা উপকারী কি না।

  2. ২

    পরিখা খননের দিনগুলো

    শীতের সকালে, খালি পেটে

    মুহাজির আর আনসার, সবাই নিজের হাতে খুঁড়ছিলেন, পিঠে করে মাটি বইছিলেন; কারও হয়ে কাজ করার মতো দাস ছিল না। নবীজি (ﷺ) তাঁদের ক্লান্ত মুখ দেখে কবিতার ছন্দে দোয়া করলেন, আর তাঁরা জবাব দিলেন:

    রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খন্দকের দিকে বের হলেন। দেখলেন, মুহাজির আর আনসাররা এক শীতের সকালে খনন করছেন; তাঁদের কোনো দাস ছিল না যে তাঁদের হয়ে কাজ করবে। তাঁদের ক্লান্তি আর ক্ষুধা দেখে তিনি বললেন: হে আল্লাহ, আসল জীবন তো আখিরাতের জীবন; তাই আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করো। তাঁরা জবাবে বললেন: আমরা তারা, যারা মুহাম্মাদের (ﷺ) হাতে জিহাদের বাইআত দিয়েছি, যতদিন বেঁচে থাকি।

    সহিহ বুখারী ৪০৯৯সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

    খাবারের অবস্থা কেমন ছিল, আনাস (রা.) তা-ও বলেছেন: এক মুঠো যব, পুরোনো গন্ধওয়ালা চর্বিতে রান্না, গলায় আটকে যেত (সহিহ বুখারী ৪১০০)। আর নবীজি (ﷺ) নিজে ছিলেন সবার সাথে, ধুলোয় পেট ঢেকে যাওয়া পর্যন্ত মাটি বইতেন:

    খন্দকের দিন নবীজি (ﷺ) মাটি বইছিলেন, এমনকি ধুলোয় তাঁর পেট ঢেকে গিয়েছিল। তিনি বলছিলেন: আল্লাহর কসম, আল্লাহ না থাকলে আমরা হেদায়াত পেতাম না, দানও করতাম না, নামাজও পড়তাম না। তাই আমাদের উপর প্রশান্তি নাজিল করো, আর শত্রুর মুখোমুখি হলে আমাদের পা দৃঢ় রাখো। ওরা আমাদের উপর বাড়াবাড়ি করেছে; ওরা ফিতনা চাইলে আমরা অস্বীকার করি। শেষ শব্দে তিনি গলা উঁচু করতেন: আমরা অস্বীকার করি, আমরা অস্বীকার করি।

    সহিহ বুখারী ৪১০৪সহিহবর্ণনাকারী: বারা ইবনু আযিব (রা.)

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪০৯৯ সহিহসহিহ বুখারী ৪১০০ সহিহসহিহ বুখারী ৪১০৪ সহিহ

    নেতা দূরে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেননি; সবার আগে মাটি বয়েছেন, সবার সাথে ক্ষুধার্ত থেকেছেন। এমন নেতৃত্বের পেছনে মানুষ ক্ষুধা ভুলে কাজ করে।

  3. ৩

    খননের মধ্যে একদিন

    জাবিরের ছাগলছানা

    এক শক্ত পাথর কেউ ভাঙতে পারছিল না। নবীজি (ﷺ) নিজে নামলেন, পেটে ক্ষুধার পাথর বাঁধা অবস্থায়। জাবির (রা.) সেই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে বাড়ি ছুটলেন:

    খন্দকের দিন আমরা খুঁড়ছিলাম, এমন সময় একটা শক্ত পাথর সামনে এল। সাহাবিরা নবীজির (ﷺ) কাছে এসে বললেন: খন্দকে একটা শক্ত পাথর পড়েছে। তিনি বললেন: আমি নামছি। তিনি উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর পেটে পাথর বাঁধা; আমরা তিন দিন কিছুই মুখে দিইনি। নবীজি (ﷺ) কোদাল নিয়ে আঘাত করলেন, পাথরটা ঝুরঝুরে বালুর ঢিবি হয়ে গেল। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দিন। (বাড়ি গিয়ে) স্ত্রীকে বললাম: নবীজির (ﷺ) যে অবস্থা দেখলাম, তা সহ্য করার মতো নয়; তোমার কাছে কিছু আছে? সে বলল: কিছু যব আর একটা ছাগলছানা আছে। আমি ছানাটা জবাই করলাম, সে যব পিষল; মাংস হাঁড়িতে দিলাম। তারপর নবীজির (ﷺ) কাছে গিয়ে বললাম: আমার কাছে সামান্য খাবার আছে; আপনি আর একজন-দুজন চলুন। তিনি বললেন: কতটুকু? আমি বললাম। তিনি বললেন: অনেক, ভালো। স্ত্রীকে বলো, আমি না আসা পর্যন্ত হাঁড়ি নামাবে না, চুলা থেকে রুটিও বের করবে না। তারপর বললেন: সবাই ওঠো! মুহাজির আর আনসার সবাই উঠলেন। আমি স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললাম: সর্বনাশ! নবীজি (ﷺ) মুহাজির, আনসার আর সবাইকে নিয়ে আসছেন। সে বলল: তিনি কি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন (কতটুকু আছে)? বললাম: হ্যাঁ। নবীজি (ﷺ) বললেন: ঢোকো, ভিড় কোরো না। তিনি রুটি ছিঁড়ে তার উপর মাংস দিতে থাকলেন; হাঁড়ি আর চুলা ঢেকে রাখতেন, নিতেন, সাহাবিদের দিতেন। এভাবে তিনি রুটি ছিঁড়ে আর তরকারি তুলে দিতে থাকলেন, সবাই পেট ভরে খেলেন, তবু কিছু রয়ে গেল। তিনি (জাবিরের স্ত্রীকে) বললেন: এটা নিজে খাও, আর অন্যদের উপহার দাও, কারণ মানুষ দুর্ভিক্ষে পড়েছে।

    সহিহ বুখারী ৪১০১সহিহবর্ণনাকারী: জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.)

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪১০১ সহিহ

    জাবির (রা.) গোপনে অল্প কয়েকজনকে ডাকতে চেয়েছিলেন; নবীজি (ﷺ) পুরো বাহিনী নিয়ে গেলেন, আর আল্লাহ বরকত দিলেন। ভাগাভাগি করলে অল্পও যথেষ্ট হয়।

  4. ৪

    অবরোধের দিনগুলো

    ভেতর থেকে বিশ্বাসঘাতকতা, আর ছুটে যাওয়া নামাজ

    সম্মিলিত বাহিনী এসে দেখল, সামনে এক গভীর পরিখা, ঘোড়া পার হতে পারে না। শুরু হলো অবরোধ, প্রায় এক মাস। এর মধ্যে খবর এল, মদিনার ভেতরের ইহুদি গোত্র বনু কুরাইযা মুসলিমদের সাথে চুক্তি ভেঙে শত্রুপক্ষে যোগ দিয়েছে। পেছনে নারী ও শিশুরা, সামনে দশ হাজার সৈন্য। মুনাফিকরা বলতে লাগল, আল্লাহ ও রাসূলের ওয়াদা ধোঁকা ছাড়া কিছু নয় (সূরা আল-আহযাব ৩৩:১২)। কিন্তু মুমিনদের অবস্থা ছিল ভিন্ন:

    وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَـٰذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ ۚ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيمَانًا وَتَسْلِيمًا

    আর মুমিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল, তারা বলে উঠল, ’এটা তো তাই, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল যার প্রতিশ্রুতি আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন।' আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল।

    অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।

    পরিখার ওপার থেকে তীর-পাথর ছোড়াছুড়িতে একদিন এত ব্যস্ত থাকতে হলো যে আসরের নামাজ সময়মতো পড়া গেল না:

    لَمَّا كَانَ يَوْمُ الأَحْزَابِ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ مَلأَ اللَّهُ بُيُوتَهُمْ وَقُبُورَهُمْ نَارًا، شَغَلُونَا عَنِ الصَّلاَةِ الْوُسْطَى حِينَ غَابَتِ الشَّمْسُ

    আহযাবের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: আল্লাহ এদের ঘর আর কবর আগুনে ভরে দিন; এরা আমাদের মধ্যবর্তী নামাজ (আসর) থেকে ব্যস্ত রেখেছে, এমনকি সূর্য ডুবে গেছে।

    সহিহ বুখারী ২৯৩১সহিহবর্ণনাকারী: আলী ইবনু আবি তালিব (রা.)

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: বনু কুরাইযার চুক্তিভঙ্গ ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা আল-আহযাব ৩৩:১২ কুরআনসূরা আল-আহযাব ৩৩:২২ কুরআনসহিহ বুখারী ২৯৩১ সহিহ

    নামাজ ছুটে যাওয়ায় নবীজির (ﷺ) কষ্ট দেখুন; যুদ্ধের মতো ব্যস্ততাও তাঁর কাছে নামাজের চেয়ে বড় ছিল না। আমাদের ব্যস্ততা কি এর চেয়েও বড়?

  5. ৫

    অবরোধের শেষ রাত

    ঝড়ের রাতে একজন গোয়েন্দা

    নবীজি (ﷺ) দোয়া করলেন: হে আল্লাহ, কিতাব নাজিলকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী, এই দলগুলোকে পরাজিত করো, তাদের কাঁপিয়ে দাও (সহিহ বুখারী ৪১১৫)। তারপর এক রাতে এল প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাস। সেই রাতের কথা হুযাইফা (রা.) বলেছেন:

    আহযাবের রাতে আমরা রাসূলুল্লাহর (ﷺ) সাথে ছিলাম। প্রচণ্ড বাতাস আর কনকনে ঠান্ডা আমাদের ঘিরে ধরল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: কেউ কি আছে, যে আমাকে শত্রুদের খবর এনে দেবে? আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে আমার সাথে রাখবেন। আমরা চুপ রইলাম, কেউ জবাব দিল না। তিনি তিনবার এ কথা বললেন, প্রতিবারই আমরা চুপ। তারপর বললেন: হুযাইফা, ওঠো, শত্রুদের খবর নিয়ে এসো। তিনি নাম ধরে ডাকায় উঠতেই হলো। তিনি বললেন: যাও, খবর নিয়ে এসো, তবে তাদের আমার বিরুদ্ধে খেপিয়ে দিয়ো না। তাঁর কাছ থেকে রওনা হতেই মনে হলো, আমি যেন গরম হাম্মামের ভেতর দিয়ে হাঁটছি (ঠান্ডা লাগছিল না)। তাদের কাছে পৌঁছে দেখলাম, আবু সুফিয়ান আগুনে পিঠ সেঁকছে। আমি ধনুকে তীর বসিয়ে তাকে মারতে চাইলাম, তখন রাসূলুল্লাহর (ﷺ) কথা মনে পড়ল: তাদের খেপিয়ে দিয়ো না। মারলে তাকে লাগাতে পারতাম। আমি ফিরে এলাম, তখনো যেন হাম্মামের মধ্যে হাঁটছি। তাঁকে খবর দিয়ে কাজ শেষ হতেই ঠান্ডায় জমে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের নামাজের চাদরের বাড়তি অংশ আমার গায়ে জড়িয়ে দিলেন। আমি সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে রইলাম। সকাল হলে তিনি বললেন: ওঠো, ঘুমকাতুরে!

    সহিহ মুসলিম ১৭৮৮সহিহবর্ণনাকারী: হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.)

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪১১৫ সহিহসহিহ মুসলিম ১৭৮৮ সহিহ

    তিনবার ডাকেও কেউ সাড়া দেয়নি, এতটা ঠান্ডা আর ভয় ছিল। তবু নাম ধরে ডাকতেই হুযাইফা (রা.) উঠে গেলেন, আর শত্রুকে মারার সুযোগ পেয়েও নির্দেশের বাইরে যাননি।

  6. ৬

    অবরোধের সমাপ্তি

    বাতাস আর অদৃশ্য সৈন্য

    সেই রাতে বাতাস শত্রুর তাঁবু উল্টে দিল, হাঁড়ি উল্টে গেল, আগুন নিভে গেল। সকালে দেখা গেল, দশ হাজারের বাহিনী রাতের অন্ধকারে চলে গেছে। আল্লাহ বলেছেন:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا ۚ وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا

    হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল অতঃপর আমরা তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম ঘূর্ণিবায়ু এবং এমন বাহিনী যা তোমরা দেখনি। আর তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।

    অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।

    নবীজি (ﷺ) নিজেও এই বাতাসের কথা বলেছেন: পুবালি বাতাস দিয়ে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে (সহিহ বুখারী ১০৩৫)। আর তিনি ঘোষণা দিলেন, এখন থেকে ধারা উল্টে গেল:

    قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ الأَحْزَابِ ‏ "‏ نَغْزُوهُمْ وَلاَ يَغْزُونَنَا

    আহযাবের দিন (তারা ফিরে যাওয়ার পর) নবীজি (ﷺ) বললেন: এখন থেকে আমরাই তাদের দিকে অভিযানে যাব, তারা আর আমাদের উপর আক্রমণ করতে আসবে না।

    সহিহ বুখারী ৪১০৯সহিহবর্ণনাকারী: সুলাইমান ইবনু সুরাদ (রা.)

    সূত্রসূরা আল-আহযাব ৩৩:৯ কুরআনসূরা আল-আহযাব ৩৩:২৫ কুরআনসহিহ বুখারী ১০৩৫ সহিহসহিহ বুখারী ৪১০৯ সহিহ

    মুসলিমরা এক তীরও না ছুড়ে জিতলেন। যখন মানুষের সব উপায় শেষ, তখন আল্লাহর সাহায্য আসে এমন জায়গা থেকে, যা কেউ ভাবেনি।

  7. ৭

    খন্দকের পরপরই

    চুক্তিভঙ্গের বিচার

    নবীজি (ﷺ) খন্দক থেকে ফিরে অস্ত্র রেখে গোসল করলেন। তখন জিবরীল (আ.) এসে বললেন: আপনি অস্ত্র রেখে দিয়েছেন? আল্লাহর কসম, আমরা রাখিনি; চলুন ওদের দিকে, আর ইশারা করলেন বনু কুরাইযার দিকে (সহিহ বুখারী ৪১২২)। মুসলিমরা তাদের দুর্গ অবরোধ করলেন। শেষে তারা নিজেরাই তাদের পুরোনো মিত্র আওস গোত্রের নেতা সাদ ইবনু মুআযকে (রা.) বিচারক মেনে নেমে এল:

    বনু কুরাইযা সাদ ইবনু মুআযের ফয়সালা মেনে নিয়ে (দুর্গ থেকে) নেমে এল। নবী (ﷺ) সাদকে ডেকে পাঠালেন; তিনি গাধায় চড়ে এলেন। মসজিদের কাছে এলে নবীজি আনসারদের বললেন: তোমাদের নেতার (বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির) দিকে উঠে যাও। তারপর বললেন: এরা তোমার ফয়সালা মেনে নেমে এসেছে। সাদ বললেন: তাদের যোদ্ধাদের হত্যা করা হবে, আর তাদের শিশু ও নারীদের বন্দি করা হবে। নবীজি বললেন: তুমি আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ী রায় দিয়েছ।

    সহিহ বুখারী ৪১২১সহিহবর্ণনাকারী: আবু সাঈদ খুদরী (রা.)

    এই শাস্তি ছিল যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে চুক্তি ভেঙে শত্রুর সাথে যোগ দেওয়ার, আর তা যোদ্ধা পুরুষদের জন্য; নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়নি। আল্লাহ এ ঘটনা কুরআনে উল্লেখ করেছেন (সূরা আল-আহযাব ৩৩:২৬)।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪১২২ (আয়েশা রা.): খন্দকের পর জিবরীলের (আ.) আগমন সহিহসহিহ বুখারী ৪১২১ সহিহসূরা আল-আহযাব ৩৩:২৬ কুরআন

    ইসলামে চুক্তি রক্ষা করা ফরজ, আর চুক্তিভঙ্গের বিচার হয় ন্যায়ের সাথে, বিচারক নির্বাচনের সুযোগসহ। আবেগে নয়, ফয়সালা হয়েছে নির্ধারিত বিচারকের রায়ে।

প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়

এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।

দুর্বল নবীজি (ﷺ) ক্ষুধায় পেটে দুটি পাথর বেঁধেছিলেন, আর সাহাবিরা একটি করে

এ কথা আছে সুনানে তিরমিযীর (২৩৭১) এক বর্ণনায়, যার সনদ দুর্বল (আলবানী, আহমাদ শাকির)। সহিহ বুখারীতে জাবিরের (রা.) বর্ণনায় শুধু আছে, তাঁর পেটে পাথর বাঁধা ছিল, আর সাহাবিরা তিন দিন কিছু খাননি (সহিহ বুখারী ৪১০১)। কষ্টের কথা সহিহ সূত্রেই যথেষ্ট, সংখ্যা বাড়ানোর দরকার নেই।

সনদ খুব দুর্বল খন্দকে নবীজি (ﷺ) বলেছিলেন, "সালমান আমাদের আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত"

এ কথা হাকেমসহ কয়েকটি বইয়ে এসেছে কাসীর ইবনু আবদিল্লাহ আল-মুযানীর সূত্রে, যাঁকে হাদিসবিশারদরা খুবই দুর্বল বলেছেন (যাহাবী)। সালমান ফারসির (রা.) মর্যাদা প্রমাণে এর দরকারও নেই; তাঁর মর্যাদার কথা সহিহ হাদিসে আছে।

ঐতিহাসিক বর্ণনা পরিখার পরামর্শ যে সালমান (রা.) দিয়েছিলেন, তা সহিহ বুখারীতে আছে

সহিহ বুখারী ও মুসলিমে পরিখা খননের বর্ণনা আছে (সহিহ বুখারী ৪০৯৯, সহিহ বুখারী ৪১০১), কিন্তু কে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তা নেই। সালমানের (রা.) পরামর্শের কথা এসেছে সীরাত ও ইতিহাসের বইয়ে (ইবনে সাদ, ওয়াকিদী); সীরাতবিদরা একে ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন, তবে হাদিসের মানে নয়।

এই গল্প থেকে আমার জীবনে

গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।

নেতা নিজে কাজে নামেন

নবীজি (ﷺ) পেটে পাথর বেঁধে নিজে কোদাল চালিয়েছেন, মাটি বয়েছেন।

আজকের কাজ: ঘরে বা কর্মস্থলে আজ এমন একটা কাজ নিজের হাতে করুন, যা সাধারণত অন্যকে দিয়ে করান।

সহিহ বুখারী ৪১০৪ সহিহসহিহ বুখারী ৪১০১ সহিহ

অল্প থেকে ভাগ করা

জাবিরের (রা.) সামান্য খাবারে আল্লাহ পুরো বাহিনীর জন্য বরকত দিলেন।

আজকের কাজ: আজ নিজের খাবার থেকে কিছু অংশ কোনো প্রতিবেশী বা অভাবী মানুষের সাথে ভাগ করুন।

সহিহ বুখারী ৪১০১ সহিহ

ব্যস্ততায়ও নামাজ আগে

যুদ্ধের চাপে আসর ছুটে যাওয়ায় নবীজি (ﷺ) কত কষ্ট পেয়েছেন, দেখুন।

আজকের কাজ: আজ প্রতিটি নামাজের আযানের সাথে সাথে হাতের কাজ থামানোর চেষ্টা করুন, অন্তত আসর।

সহিহ বুখারী ২৯৩১ সহিহসূরা আল-বাকারা ২:২৩৮ কুরআন

ভয়ের সময় ঈমান বাড়ানো

মুমিনরা শত্রু দেখে বলেছিলেন, এটাই তো আল্লাহ ও রাসূলের ওয়াদা; এতে তাদের ঈমান বাড়ল।

আজকের কাজ: যে বিপদ বা দুশ্চিন্তা এখন আপনার সামনে, আজ সেটার জন্য নবীজির (ﷺ) আহযাবের দোয়াটা নিজের ভাষায় পড়ুন।

সূরা আল-আহযাব ৩৩:২২ কুরআনসহিহ বুখারী ৪১১৫ সহিহ

চুক্তি ও কথা রাখা

বনু কুরাইযার পরিণতি এসেছিল যুদ্ধের সময় চুক্তি ভাঙার কারণে।

আজকের কাজ: আজ এমন একটা প্রতিশ্রুতি খুঁজে বের করুন, যা আপনি কাউকে দিয়ে রাখেননি, আর তা পূরণ করুন।

সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৪ কুরআনসূরা আল-আহযাব ৩৩:২৬ কুরআন

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন

খন্দকের দিনগুলোতে চোখ বিস্ফারিত, প্রাণ কণ্ঠাগত, এমন ভয়ের মধ্যে মুমিনরা বলেছিলেন: "এটাই তো আল্লাহর ওয়াদা।" আপনার জীবনের কোন কঠিন সময়কে আপনি এভাবে দেখতে পারেন?

সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
  • কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
  • সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
  • ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
  • মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
  • দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।

সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sirat/khandaq/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার