deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

দ্বীনের পথ · ধাপ ৫

রোজা, যাকাত ও হজ: ইসলামের বাকি তিন স্তম্ভ

কালিমা আর নামাজের পর ইসলামের বাকি তিন স্তম্ভ হলো রোজা, যাকাত ও হজ। তিনটিরই একটি নির্দিষ্ট সময় ও শর্ত আছে, আর তিনটিতেই আল্লাহ অসুবিধার সময় ছাড় দিয়েছেন। এই ধাপে জানবেন কার উপর কোনটি ফরজ, কীভাবে আদায় করবেন, আর কোন অবস্থায় কী করবেন।

গল্প দিয়ে শুরু

"আমি ধ্বংস হয়ে গেছি!": রমজানের এক দুপুরে

রমজানের এক দিন। নবীজি (ﷺ) সাহাবিদের সাথে বসে আছেন। হঠাৎ এক লোক ছুটে এল, মুখে আতঙ্ক: হে আল্লাহর রাসূল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি! সে রোজা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে বড় একটি গুনাহ করে ফেলেছিল।

নবীজি (ﷺ) তাকে তিরস্কার করলেন না, লজ্জাও দিলেন না। শুধু বিধানটা জানালেন: একজন দাস মুক্ত করতে পারবে? না। একটানা দুই মাস রোজা? না। ষাটজন মিসকিনকে খাওয়াতে পারবে? তা-ও না। নবীজি (ﷺ) চুপ করে রইলেন।

এর মধ্যে কেউ এক ঝুড়ি খেজুর নিয়ে এল। নবীজি (ﷺ) লোকটিকে ডেকে বললেন: এগুলো নিয়ে সদকা করে দাও। লোকটি বলল, মদিনায় আমার পরিবারের চেয়ে গরিব আর কে আছে? এ কথা শুনে নবীজি (ﷺ) এমন হাসলেন যে তাঁর দাঁত দেখা গেল।

"আমি ধ্বংস হয়ে গেছি!": রমজানের দিনে ভুল করা লোকটিসহিহ বুখারী ১৯৩৬ · সহিহ · পুরো হাদিস পড়ুন

আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে বসে ছিলাম। এক লোক এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি! তিনি বললেন: কী হয়েছে? সে বলল: রোজা অবস্থায় আমি স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: একজন দাস মুক্ত করার সামর্থ্য আছে? সে বলল: না। বললেন: একটানা দুই মাস রোজা রাখতে পারবে? সে বলল: না। বললেন: ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানোর সামর্থ্য আছে? সে বলল: না। নবী (ﷺ) কিছুক্ষণ থামলেন। এর মধ্যে তাঁর কাছে এক ঝুড়ি খেজুর আনা হলো। তিনি বললেন: প্রশ্নকারী কোথায়? সে বলল: এই যে আমি। তিনি বললেন: এটা নিয়ে সদকা করে দাও। লোকটি বলল: আমার চেয়েও গরিব কাউকে, হে আল্লাহর রাসূল? আল্লাহর কসম, মদিনার দুই কালো পাথুরে প্রান্তের মাঝে আমার পরিবারের চেয়ে গরিব কোনো পরিবার নেই। এ কথা শুনে নবী (ﷺ) এমনভাবে হাসলেন যে তাঁর দাঁত দেখা গেল। তারপর বললেন: এটা তোমার পরিবারকেই খাওয়াও।

সহিহ বুখারী ১৯৩৬সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

এই গল্প আপনাকে কী বলে

  • রোজা, যাকাত আর হজের বিধান গুরুত্বপূর্ণ; ইচ্ছা করে রোজা ভাঙার বিধান যে কঠিন, এই হাদিসেই তা আছে। কিন্তু এর পেছনে আছে দয়া, ধ্বংস করার ইচ্ছা নয়।
  • ভুল হলে লুকিয়ে না রেখে সঠিক মানুষকে জিজ্ঞেস করুন। যে নিজে এসে স্বীকার করেছিল, সে-ই খালি হাতে নয়, খাবার নিয়ে ফিরেছিল।
  • আল্লাহ এই ইবাদতগুলোতে সামর্থ্য অনুযায়ী ছাড় দিয়েছেন: অসুস্থ, মুসাফির, বৃদ্ধ আর অক্ষমদের জন্য। এই ধাপে সেগুলো ভালো করে জেনে নিন।
  • রমজান শুধু না খেয়ে থাকা নয়; এটা দান, কুরআন আর অন্তর বদলানোর মাস। নবীজি (ﷺ) রমজানে সবচেয়ে বেশি দানশীল হতেন (সহিহ বুখারী ৬)।

এই ধাপ শেষে আপনি

  1. রোজার নিয়ম, ভাঙার কারণ আর ছাড় জানবেন
  2. নিজের যাকাত হিসাব করতে পারবেন
  3. হজ কার উপর ফরজ ও এর মূল ধাপ জানবেন

এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া। হাদিসের মান মুহাদ্দিসদের রায় অনুযায়ী। সব মূল গ্রন্থ ও মিলিয়ে দেখার লিংক এক জায়গায়: সূত্র তালিকা।

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের তিনটি

নবীজি (ﷺ) ইসলামকে পাঁচটি স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো ঘরের সাথে তুলনা করেছেন। আগের ধাপে কালিমা ও নামাজ শিখেছেন; বাকি তিনটি এখানে।

بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ

ইসলাম পাঁচটি জিনিসের উপর প্রতিষ্ঠিত: এই সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল; নামাজ কায়েম করা; যাকাত দেওয়া; হজ করা; এবং রমজানের রোজা রাখা।

সহিহ বুখারী ৮সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)
ইবাদতকার উপর ফরজকখন
রমজানের রোজাপ্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের প্রত্যেক মুসলিম; অসুস্থ ও মুসাফির পরে কাযা করবেপ্রতি বছর রমজান মাসে
যাকাতযার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ পুরো এক চান্দ্র বছর থাকেপ্রতি বছর, সম্পদের বছর পূর্ণ হলে
হজশারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমজীবনে একবার, যিলহজ মাসে

রোজা: তাকওয়া শেখার মাস

রোজা ফরজ করা হয়েছে যেন আমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারি।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

হে মুমিনগণ ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেয়া হয়েছিল , যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার।

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার আগের গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হয়।

সহিহ বুখারী ৩৮সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

রোজা মানে শুধু না খেয়ে থাকা নয়। মিথ্যা, গালি আর অন্যায় কাজ না ছাড়লে খাবার ছাড়ার কোনো মূল্য থাকে না।

مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ

যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা অনুযায়ী কাজ ছাড়ে না, তার খাবার ও পানীয় ছেড়ে দেওয়ায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।

সহিহ বুখারী ১৯০৩সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

রোজা কীভাবে রাখবেন

  1. রাতেই নিয়ত করুন। নিয়ত অন্তরের সিদ্ধান্ত; সাহরি খেতে ওঠাই নিয়ত। মুখে নির্দিষ্ট বাক্য বলা জরুরি নয় (সহিহ বুখারী ১)।
  2. সাহরি খান। সাহরিতে বরকত আছে, আর ফজরের সময় শুরু হওয়া পর্যন্ত খাওয়া যায় (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭)।
  3. ফজর থেকে সূর্য ডোবা পর্যন্ত খাওয়া, পান করা ও স্বামী-স্ত্রীর মিলন থেকে বিরত থাকুন। ভুলে খেয়ে ফেললে রোজা ভাঙে না (সহিহ বুখারী ১৯৩৩)।
  4. জিহ্বা ও চোখের হেফাজত করুন। গীবত, মিথ্যা, ঝগড়া থেকে দূরে থাকুন (সহিহ বুখারী ১৯০৩)।
  5. সূর্য ডুবলেই দেরি না করে ইফতার করুন।
  6. রাতে তারাবিহ পড়ুন, আর কুরআন বেশি পড়ুন। রমজানের রাতের নামাজে গুনাহ মাফ হয় (সহিহ বুখারী ৩৭)।

تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً

তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত আছে।

সহিহ বুখারী ১৯২৩সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

لاَ يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ

মানুষ ততদিন কল্যাণের উপর থাকবে, যতদিন তারা (সূর্য ডোবার পর) দেরি না করে ইফতার করবে।

সহিহ বুখারী ১৯৫৭সহিহবর্ণনাকারী: সাহল ইবনু সাদ (রা.)

রোজায় কারা ছাড় পায়

অবস্থাকী করবেনদলিল
অসুস্থ বা সফরে (মুসাফির)রোজা না রাখার অনুমতি; পরে সমান সংখ্যক রোজা কাযাসূরা আল-বাকারা ২:১৮৪, সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫
হায়েয বা নিফাসের সময়রোজা রাখবেন না; পরে কাযা করবেন (নামাজ কাযা নেই)সহিহ মুসলিম ৩৩৫
গর্ভবতী বা দুধ খাওয়ানো মা, নিজের বা শিশুর ক্ষতির ভয় থাকলেরোজা না রাখার অনুমতি; পরে কাযাসুনানে আবু দাউদ ২৪০৮
এমন বৃদ্ধ বা স্থায়ী রোগী, যার আর রোজা রাখার আশা নেইপ্রতিদিনের বদলে একজন মিসকিনকে খাওয়াবেন (ফিদইয়া)সহিহ বুখারী ৪৫০৫

গর্ভবতী ও দুধ খাওয়ানো মা শুধু কাযা করবেন, নাকি ফিদইয়াও দেবেন, এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। নিজের অবস্থায় নির্ভরযোগ্য আলেমকে জিজ্ঞেস করুন।

যাকাত: সম্পদ পবিত্র করার ইবাদত

যাকাত সম্পদকে পবিত্র করে, আর দাতার অন্তরকে কৃপণতা থেকে পরিষ্কার করে।

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ ۖ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

আপনি তাদের সম্পদ থেকে ‘সদকা’ গ্রহন করুন। এর দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন। আর আপনি তেদের জন্য দো’আ করুন। আপনার দো’আ তো তোদের জন্য প্রশান্তি কর। আর আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

যাকাত না দেওয়ার শাস্তি খুব কঠিন।

مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالاً، فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ، لَهُ زَبِيبَتَانِ، يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ ـ يَعْنِي شِدْقَيْهِ ـ ثُمَّ يَقُولُ أَنَا مَالُكَ، أَنَا كَنْزُكَ

আল্লাহ যাকে সম্পদ দিয়েছেন, আর সে তার যাকাত দেয়নি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে একটি বিষধর টাক-মাথা সাপের রূপ দেওয়া হবে, যার চোখের উপর দুটি কালো দাগ। সেটি তার গলায় পেঁচিয়ে দেওয়া হবে, তারপর তার দুই চোয়াল কামড়ে ধরে বলবে: আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমানো ধন।

সহিহ বুখারী ১৪০৩সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

যাকাত কীভাবে হিসাব করবেন

  1. নিসাব দেখুন। নগদ টাকা, ব্যাংকের জমা, সোনা-রুপা আর ব্যবসার মাল মিলিয়ে যদি প্রায় ৮৫ গ্রাম সোনা বা প্রায় ৫৯৫ গ্রাম রুপার দামের সমান বা বেশি হয়, তাহলে আপনি নিসাবের মালিক। (গ্রামের হিসাবে আলেমদের মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে; টাকার ক্ষেত্রে অনেক আলেম রুপার নিসাব ধরতে বলেন, কারণ তাতে গরিবের উপকার বেশি।)
  2. এক চান্দ্র বছর পূর্ণ হোক। যেদিন নিসাবের মালিক হলেন, সেদিন থেকে এক হিজরি বছর পর যাকাত ফরজ হবে। এর জন্য রমজান পর্যন্ত অপেক্ষা জরুরি নয়।
  3. মোট সম্পদের ২.৫% (চল্লিশ ভাগের এক ভাগ) দিন। থাকার ঘর, ব্যবহারের গাড়ি, আসবাব ও পরার কাপড়ে যাকাত নেই।
  4. যাকাত দেবেন আট শ্রেণির মানুষকে, যাদের কথা কুরআনে আছে: ফকির, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত, মুসাফির, নতুন মুসলিম ইত্যাদি।

لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ ذَوْدٍ صَدَقَةٌ مِنَ الإِبِلِ، وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ، وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ صَدَقَةٌ

পাঁচটির কম উটে যাকাত নেই, পাঁচ উকিয়ার (দুইশো দিরহাম রুপার) কমে যাকাত নেই, আর পাঁচ ওয়াসাকের কম (ফসলে) যাকাত নেই।

সহিহ বুখারী ১৪৪৭সহিহবর্ণনাকারী: আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.)

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

সদকা তো শুধু ফকীর, মিসকীন ও সদকা আদায়ের কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তিতে, ঋণ ভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহ্‌র পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

সাদাকাতুল ফিতর: ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের (শিশুসহ) পক্ষ থেকে এক সা (প্রায় আড়াই থেকে তিন কেজি) খাদ্য দিতে হয়।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন: এক সা খেজুর বা এক সা যব, মুসলিমদের দাস ও স্বাধীন, পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড় সবার উপর। আর তিনি আদেশ দিয়েছেন, মানুষ (ঈদের) নামাজে বের হওয়ার আগেই যেন তা আদায় করা হয়।

সহিহ বুখারী ১৫০৩সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)

হজ: জীবনে একবার

যার কাবা পর্যন্ত যাওয়ার সামর্থ্য আছে, তার উপর আল্লাহর জন্য হজ করা ফরজ।

فِيهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ مَّقَامُ إِبْرَاهِيمَ ۖ وَمَن دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا ۗ وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا ۚ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ

তাতে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে, যেমন মাকামে ইবরাহীম। আর যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ। আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ্ব করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর যে কেউ কুফরী করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন।

أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ فَرَضَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ الْحَجَّ فَحُجُّوا ‏"‏ ‏.‏ فَقَالَ رَجُلٌ أَكُلَّ عَامٍ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَسَكَتَ حَتَّى قَالَهَا ثَلاَثًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ لَوْ قُلْتُ نَعَمْ لَوَجَبَتْ وَلَمَا اسْتَطَعْتُمْ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খুতবায় বললেন: হে লোকেরা, আল্লাহ তোমাদের উপর হজ ফরজ করেছেন, তাই হজ করো। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল: প্রতি বছর, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি চুপ রইলেন, লোকটি তিনবার জিজ্ঞেস করল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: আমি যদি "হ্যাঁ" বলতাম, তাহলে (প্রতি বছর) ফরজ হয়ে যেত, আর তোমরা তা পারতে না।

সহিহ মুসলিম ১৩৩৭সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ

যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করে, তাতে অশ্লীল কথা বা কাজ করে না এবং গুনাহে জড়ায় না, সে (গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে) সেই দিনের মতো ফিরে আসে, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।

সহিহ বুখারী ১৫২১সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

হজের মূল ধাপ এক নজরে

দিনকাজ
যাওয়ার আগেমীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা, তালবিয়া পড়া ("লাব্বাইকাল্লাহুম্মা লাব্বাইক")
৮ যিলহজমিনায় অবস্থান
৯ যিলহজআরাফায় অবস্থান (হজের সবচেয়ে বড় রুকন); সূর্য ডোবার পর মুযদালিফায় রাত
১০ যিলহজবড় জামরায় কংকর মারা, কুরবানি, মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা, তাওয়াফে ইফাদা ও সাঈ
১১ থেকে ১৩ যিলহজমিনায় থেকে প্রতিদিন তিন জামরায় কংকর মারা (চাইলে ১২ তারিখে চলে আসা যায়)
ফেরার আগেবিদায়ী তাওয়াফ

الْحَجُّ عَرَفَةُ مَنْ جَاءَ لَيْلَةَ جَمْعٍ قَبْلَ طُلُوعِ الْفَجْرِ فَقَدْ أَدْرَكَ الْحَجَّ

হজ হলো আরাফা। যে ব্যক্তি মুযদালিফার রাতে ফজর হওয়ার আগে (আরাফায়) পৌঁছে যায়, সে হজ পেয়ে গেল।

জামে আত-তিরমিযী ৮৮৯সহিহবর্ণনাকারী: আবদুর রহমান ইবনু ইয়ামার (রা.)

এটা শুধু একটা পরিচিতি। হজে যাওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য আলেম বা প্রশিক্ষণ থেকে নিয়মগুলো বিস্তারিত শিখে নিন। নারীরা মাহরামের সাথে যাবেন (সহিহ বুখারী ১৮৬২)।

নবীজির (ﷺ) জীবন থেকে: রমজানে বাতাসের চেয়েও দানশীল

নবীজি (ﷺ) এমনিতেই সবচেয়ে দানশীল ছিলেন, আর রমজানে জিবরীল (আ.) যখন প্রতি রাতে এসে তাঁর সাথে কুরআন পড়তেন, তখন তাঁর দান বয়ে যাওয়া বাতাসের চেয়েও বেশি হয়ে যেত।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল। আর রমজানে, যখন জিবরীল (আ.) তাঁর সাথে দেখা করতেন, তখন তিনি সবচেয়ে বেশি দানশীল হতেন। জিবরীল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে তাঁর সাথে দেখা করে কুরআন পাঠ করে শোনাতেন ও শুনতেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কল্যাণের কাজে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি উদার হতেন।

সহিহ বুখারী ৬সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)

আপনার জীবনে এর মানে: রমজান, যাকাত আর হজ আলাদা আলাদা নিয়ম নয়; তিনটিই শেখায় আল্লাহর জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ছাড়তে: খাবার, সম্পদ, সময় আর আরাম। রমজানে কুরআন আর দান দুটোই বাড়ান।

কোন অবস্থায় কী করবেন

রোজা রেখে ভুলে খেয়ে ফেলেছি। রোজা কি ভেঙে গেছে?

না। মনে পড়ার সাথে সাথে থেমে যান আর রোজা পূর্ণ করুন; আল্লাহই আপনাকে খাইয়েছেন (সহিহ বুখারী ১৯৩৩)। কাযা বা কাফফারা কিছুই লাগবে না।

রোজা অবস্থায় বমি হয়ে গেলে?

অনিচ্ছায় বমি এলে রোজা ভাঙে না, কাযাও নেই। ইচ্ছা করে বমি করলে সেই রোজা পরে কাযা করতে হবে (সুনানে আবু দাউদ ২৩৮০)।

অসুস্থতায় রোজা ছুটে গেছে। এখন কী করব?

সুস্থ হওয়ার পর যতগুলো ছুটেছে, ততগুলো রোজা কাযা করুন (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৪)। আর যদি এমন রোগ হয় যাতে আর কখনো রোজা রাখার আশা নেই, তাহলে প্রতিদিনের বদলে একজন মিসকিনকে খাওয়ান (সহিহ বুখারী ৪৫০৫)।

যাকাত কাকে দেওয়া যাবে না?

নিজের মা-বাবা, দাদা-দাদি, সন্তান-নাতি আর স্ত্রীকে যাকাত দেওয়া যায় না, কারণ তাদের ভরণপোষণ এমনিতেই আপনার দায়িত্ব। আর ধনী ব্যক্তিও যাকাত পায় না। এর বাইরে গরিব ভাই-বোন, চাচা বা অন্য আত্মীয়কে দেওয়া উত্তম, কারণ এতে সদকার সাথে আত্মীয়তার হকও আদায় হয়। প্রাপকের তালিকা কুরআনে আছে (সূরা আত-তাওবা ৯:৬০)।

হজ ফরজ, কিন্তু টাকা জমাতে পারছি না। কী করব?

হজ ফরজ হয় সামর্থ্যের শর্তে (সূরা আলে ইমরান ৩:৯৭)। প্রয়োজনীয় খরচ আর পরিবারের খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য না থাকলে আপনার উপর এখনো ফরজ হয়নি। তবে নিয়ত রাখুন আর অল্প অল্প করে হালাল টাকা জমান। আর সামর্থ্য হলে দেরি করবেন না।

প্রচলিত ভুল

✗ "যাকাত শুধু রমজানেই দিতে হয়।"

যাকাত ফরজ হয় সম্পদের এক বছর পূর্ণ হলে, সেটা যে মাসেই হোক। রমজানে সওয়াব বেশি বলে অনেকে তখন দেন, সেটা ভালো; তবে বছর পূর্ণ হওয়ার পর রমজানের অপেক্ষায় দেরি করা ঠিক নয়। রোজার নিয়ত, সাহরি ও অন্যান্য প্রচলিত কথা দলিলসহ দেখুন: প্রচলিত ভুল ও সঠিক তথ্য।

এই সপ্তাহের আমল

টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।

নিজেকে যাচাই করুন

রোজা রেখে ভুলে পানি খেয়ে ফেললে কী হবে?

আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন (সহিহ বুখারী ১৯৩৩)।

যাকাতের হার কত?

নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর থাকলে মোট সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ ২.৫%।

সামর্থ্যবানের উপর জীবনে কতবার হজ ফরজ?

প্রতি বছর ফরজ হলে মানুষ পারত না (সহিহ মুসলিম ১৩৩৭)।

পরের ধাপ ৬চরিত্র ও সম্পর্কগল্প: আবু বকর (রা.) ও মিসতাহ: যে কষ্ট দিয়েছিল, তাকে ক্ষমা ›
deenpedia.com · https://deenpedia.com/poth/roja-zakat-hajj/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার