قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
জাহান্নাম কেমন
কুরআন ও সহিহ হাদিসে জাহান্নামের যে বর্ণনা এসেছে: দরজা, গভীরতা, প্রহরী, খাবার, শাস্তি, কারা যাবে আর কারা বের হবে। সাথে প্রতিটি দৃশ্য থেকে বাঁচার সহিহ আমল।
জাহান্নামের কথা পড়ার উদ্দেশ্য হতাশ হওয়া নয়, সময় থাকতে সাবধান হওয়া। আল্লাহ নিজের পরিচয় দিয়েছেন ক্ষমাশীল ও দয়ালু হিসেবে, আবার জানিয়েছেন তাঁর শাস্তিও কঠিন (সূরা আল-হিজর ১৫:৪৯, সূরা আল-হিজর ১৫:৫০)। মুমিন দুটোই মনে রাখে: আশা তাকে এগিয়ে নেয়, ভয় তাকে থামিয়ে রাখে। এই পাতার প্রতিটি কথার পাশে সূত্র ও মান দেওয়া আছে; দলিল হিসেবে শুধু কুরআন এবং সহিহ ও হাসান হাদিস নেওয়া হয়েছে।
এর বিপরীত পাতাজান্নাত কেমন? কুরআন ও সহিহ হাদিসে পুরো বর্ণনাভয়ের সাথে আশাও দরকার: দরজা, স্তর, নদী, প্রাসাদ, আর আল্লাহকে দেখা›গল্পে গল্পে: এক অবাধ্যের জাহান্নাম যাত্রা
শেষ নিঃশ্বাস থেকে চিরস্থায়ী ঘোষণা পর্যন্ত, ৮টি দৃশ্যে
এটা সেই মানুষের যাত্রা, যে আল্লাহর ডাক অস্বীকার করেই দুনিয়া ছেড়েছে। দৃশ্যগুলো সাজানোর ভাষা আমাদের, কিন্তু প্রতিটি ঘটনা ও বিবরণ কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া; কল্পনা থেকে কিছু যোগ করা হয়নি। প্রতিটি দৃশ্যের নিচে সূত্র আছে, আর আছে সেই দৃশ্য থেকে বাঁচার একটি সহিহ আমল।
- ১
শেষ নিঃশ্বাস
যে মানুষটা সারাজীবন আল্লাহর ডাক শুনেও ফিরে তাকায়নি, তার সময়ও একদিন ফুরিয়ে আসে। ফেরেশতারা তার প্রাণ বের করেন তার চেহারায় আর পিঠে আঘাত করতে করতে। তখন সে মিনতি করে: হে আমার রব, আমাকে আবার ফেরত পাঠান, যা ছেড়ে এসেছি সেখানে গিয়ে ভালো কাজ করব। উত্তর আসে: কখনো না, এটা তো শুধু একটা কথা, যা সে বলছেই। তার সামনে এখন এক পর্দা, পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।
সূরা আল-আনফাল ৮:৫০ · সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৭ · সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৯৯ · সূরা আল-মুমিনূন ২৩:১০০
এই দৃশ্য থেকে বাঁচার আমল: মৃত্যুযন্ত্রণা শুরুর আগেই তাওবা (জামে আত-তিরমিযী ৩৫৩৭)
- ২
কবরের রাত
সঙ্গীরা তাকে রেখে ফিরে যাচ্ছে, তাদের জুতার শব্দও সে শুনছে। দুজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন: এই মানুষটি, মুহাম্মাদ (ﷺ), সম্পর্কে তুমি কী বলতে? সে বলে: আমি জানি না, মানুষ যা বলত আমিও তাই বলতাম। বলা হয়: তুমি জানোওনি, পড়োওনি। তারপর লোহার হাতুড়ি দিয়ে তার দুই কানের মাঝে আঘাত করা হয়; সে এমন চিৎকার দেয়, যা মানুষ আর জিন ছাড়া আশেপাশের সবাই শোনে। আর প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় তাকে দেখানো হয় জাহান্নামে তার ঠিকানা: এটাই তোমার জায়গা।
সহিহ বুখারী ১৩৩৮সহিহ · সহিহ বুখারী ১৩৭৯সহিহ · সূরা গাফির ৪০:৪৬
এই দৃশ্য থেকে বাঁচার আমল: প্রতি নামাজের শেষে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাওয়া (সহিহ মুসলিম ৫৮৮)
- ৩
বাম হাতে আমলনামা
হাশরের ময়দানে সূর্য নেমে এসেছে মাথার এক মাইল উপরে, মানুষ ডুবে আছে নিজের আমল অনুযায়ী ঘামে। তার হাতে আমলনামা দেওয়া হলো, বাম হাতে। সে বলে উঠল: হায়, আমার আমলনামা যদি না-ই দেওয়া হতো! আমি যদি না-ই জানতাম আমার হিসাব কী! মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো! আমার সম্পদ কোনো কাজে এলো না, আমার ক্ষমতাও শেষ হয়ে গেছে।
সহিহ মুসলিম ২৮৬৪সহিহ · সূরা আল-হাক্কা ৬৯:২৫ · সূরা আল-হাক্কা ৬৯:২৬ · সূরা আল-হাক্কা ৬৯:২৭ · সূরা আল-হাক্কা ৬৯:২৮ · সূরা আল-হাক্কা ৬৯:২৯
এই দৃশ্য থেকে বাঁচার আমল: আধখানা খেজুর হলেও দান করা (সহিহ বুখারী ১৪১৭)
- ৪
জাহান্নামকে টেনে আনা হলো
তারপর জাহান্নামকে আনা হয়। তার সত্তর হাজার লাগাম, প্রতিটি লাগাম ধরে টানছেন সত্তর হাজার ফেরেশতা। দূর থেকেই শোনা যায় তার বিকট গর্জন, সে টগবগ করে ফুটছে; রাগে যেন ফেটে পড়বে।
সহিহ মুসলিম ২৮৪২সহিহ · সূরা আল-মুলক ৬৭:৭ · সূরা আল-মুলক ৬৭:৮
এই দৃশ্য থেকে বাঁচার আমল: দিনে তিনবার জাহান্নাম থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া (জামে আত-তিরমিযী ২৫৭২)
- ৫
পুলসিরাতের আঁকড়া
জাহান্নামের উপর সেতু বসানো হয়, পা পিছলে যাওয়ার মতো পিচ্ছিল। তার গায়ে আঁকড়া আর বাঁকা কাঁটা। মুমিনরা কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো পার হয়ে যাচ্ছে। কেউ আঁচড় খেয়েও পার হচ্ছে। আর কাউকে আঁকড়া টেনে ফেলে দিচ্ছে নিচের আগুনে। সে পা বাড়ায়, কিন্তু পার হতে পারে না।
সহিহ বুখারী ৭৪৩৯সহিহ · সূরা মারইয়াম ১৯:৭১ · সূরা মারইয়াম ১৯:৭২
এই দৃশ্য থেকে বাঁচার আমল: ফজর ও আসর কখনো না ছাড়া (সহিহ মুসলিম ৬৩৪)
- ৬
দরজায় রক্ষীদের প্রশ্ন
অবিশ্বাসীদের দলে দলে হাঁকিয়ে আনা হয়। কাছে পৌঁছাতেই জাহান্নামের দরজাগুলো খুলে যায়। রক্ষীরা জিজ্ঞেস করে: তোমাদের কাছে কি তোমাদেরই মধ্য থেকে রাসূল আসেননি, যাঁরা রবের আয়াত পড়ে শোনাতেন আর এই দিনের কথা মনে করিয়ে দিতেন? তারা বলে: হ্যাঁ, এসেছিলেন; আমরাই অস্বীকার করেছিলাম। হায়, যদি আমরা শুনতাম, অথবা বুঝতাম!
সূরা আয-যুমার ৩৯:৭১ · সূরা আল-মুলক ৬৭:৮ · সূরা আল-মুলক ৬৭:৯ · সূরা আল-মুলক ৬৭:১০
এই দৃশ্য থেকে বাঁচার আমল: আজই শোনা ও বোঝা: কুরআন অর্থসহ পড়া
- ৭
আগুনের ভেতরে
এই আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়ে উনসত্তর গুণ বেশি গরম। চামড়া পুড়ে গেলে নতুন চামড়া দেওয়া হয়, যাতে শাস্তি চলতেই থাকে। খাবার যাক্কূম গাছ, পেটে গলিত তামার মতো ফোটে; পানীয় পুঁজ, অনেক কষ্টে এক ঢোক গেলে, গলা দিয়ে নামতে চায় না। চারদিক থেকে মৃত্যু আসে, কিন্তু সে মরে না। আর সবচেয়ে হালকা শাস্তিটাও এমন: পায়ের নিচে দুটি অঙ্গার, তাতে মগজ টগবগ করে ফোটে।
সহিহ বুখারী ৩২৬৫সহিহ · সূরা আন-নিসা ৪:৫৬ · সূরা আদ-দুখান ৪৪:৪৩ · সূরা আদ-দুখান ৪৪:৪৫ · সূরা ইবরাহীম ১৪:১৬ · সূরা ইবরাহীম ১৪:১৭ · সহিহ বুখারী ৬৫৬২সহিহ
এই দৃশ্য থেকে বাঁচার আমল: এক দিনের নফল রোজা: সত্তর বছরের দূরত্ব (সহিহ বুখারী ২৮৪০)
- ৮
শেষ আশাটুকুও মুছে গেল
তারা চিৎকার করে ডাকে: হে মালিক, তোমার রব যেন আমাদের শেষ করে দেন! উত্তর আসে: তোমরা এখানেই থাকবে। তারা ডাকে: হে আমাদের রব, আমাদের বের করুন, এবার ভালো কাজ করব! বলা হয়: আমি কি তোমাদের যথেষ্ট সময় দিইনি? তারপর মৃত্যুকে একটি ভেড়ার আকারে এনে জান্নাত আর জাহান্নামের মাঝে জবাই করা হয়, আর ঘোষণা আসে: হে জাহান্নামবাসী, চিরকাল, আর কোনো মৃত্যু নেই।
সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৭৭ · সূরা ফাতির ৩৫:৩৭ · সহিহ বুখারী ৪৭৩০সহিহ
এই দৃশ্য থেকে বাঁচার আমল: তাওহীদ: আল্লাহর সাথে কিছু শরিক না করা (সহিহ বুখারী ৬৫৫৭)
আল্লাহর প্রজ্বলিত আগুন
যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর
জাহান্নাম আল্লাহর তৈরি শাস্তির ঘর, যা অবিশ্বাসীদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এটা এখনই আছে, আর দুনিয়ার কোনো আগুনের সাথে এর তুলনা হয় না। মুমিনকে আল্লাহ শুধু নিজেকে নয়, পরিবারকেও এ থেকে বাঁচানোর আদেশ দিয়েছেন।
- এর জ্বালানি মানুষ ও পাথর; তাতে নিয়োজিত আছে কঠোর ফেরেশতারা, যারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না।সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬ · সূরা আল-বাকারা ২:২৪
- এটা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।সূরা আলে ইমরান ৩:১৩১ · সূরা আল-বাকারা ২:২৪
- দুনিয়ার আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র।সহিহ বুখারী ৩২৬৫সহিহ
- জাহান্নাম এখনই আছে; গ্রীষ্মের তীব্র গরম আর শীতের তীব্র ঠান্ডা তার দুই নিঃশ্বাসের অংশ।সহিহ বুখারী ৩২৬০সহিহ
- জান্নাত ঘেরা নফসের অপছন্দের জিনিস দিয়ে, আর জাহান্নাম ঘেরা কামনা-বাসনা দিয়ে।সহিহ মুসলিম ২৮২২সহিহ
- জান্নাতের মতো জাহান্নামও মানুষের জুতার ফিতার চেয়েও কাছে।সহিহ বুখারী ৬৪৮৮সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদেশপ্ৰাপ্ত হয় তা-ই করে।
نَارُكُمْ جُزْءٌ مِنْ سَبْعِينَ جُزْءًا مِنْ نَارِ جَهَنَّمَ ". قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنْ كَانَتْ لَكَافِيَةً. قَالَ " فُضِّلَتْ عَلَيْهِنَّ بِتِسْعَةٍ وَسِتِّينَ جُزْءًا، كُلُّهُنَّ مِثْلُ حَرِّهَا
তোমাদের (দুনিয়ার) আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ। বলা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, (শাস্তির জন্য) এটুকুই তো যথেষ্ট ছিল! তিনি বললেন: জাহান্নামের আগুনকে এর চেয়ে আরও উনসত্তর গুণ বাড়ানো হয়েছে, প্রতিটি ভাগ এর মতোই গরম।
اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا، فَقَالَتْ رَبِّ أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا، فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ، فَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ فِي الْحَرِّ، وَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الزَّمْهَرِيرِ
জাহান্নাম তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলল: হে আমার রব, আমার এক অংশ আরেক অংশকে খেয়ে ফেলছে। তখন আল্লাহ তাকে দুটি নিঃশ্বাসের অনুমতি দিলেন: একটি শীতকালে, একটি গ্রীষ্মকালে। তাই তোমরা যে প্রচণ্ড গরম অনুভব করো আর যে প্রচণ্ড শীত অনুভব করো (তা তারই অংশ)।
حُفَّتِ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ وَحُفَّتِ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ
জান্নাতকে ঘিরে রাখা হয়েছে (নফসের) অপছন্দের জিনিস দিয়ে, আর জাহান্নামকে ঘিরে রাখা হয়েছে কামনা-বাসনা দিয়ে।
- দিনে তিনবার জাহান্নাম থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া (জামে আত-তিরমিযী ২৫৭২)
দরজা ও গভীরতা
সাতটি দরজা, সত্তর বছরের গভীরতা
জান্নাতের যেমন আটটি দরজা, জাহান্নামের তেমনি সাতটি। প্রতিটি দরজার জন্য নির্দিষ্ট দল আছে। আর এর গভীরতা এত বেশি যে উপর থেকে ফেলা পাথর তলায় পৌঁছাতে সত্তর বছর লাগে।
- জাহান্নামের সাতটি দরজা; প্রতিটি দরজার জন্য (শয়তানের অনুসারীদের) নির্দিষ্ট অংশ আছে।সূরা আল-হিজর ১৫:৪৩ · সূরা আল-হিজর ১৫:৪৪
- অবিশ্বাসীরা কাছে পৌঁছালে দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে, আর রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে: তোমাদের কাছে কি রাসূল আসেননি?সূরা আয-যুমার ৩৯:৭১ · সূরা আয-যুমার ৩৯:৭২
- নবীজি (ﷺ) একবার ভারী শব্দ শুনে বললেন: এটা একটি পাথর, সত্তর বছর আগে জাহান্নামে ফেলা হয়েছিল, এইমাত্র তলায় পৌঁছাল।সহিহ মুসলিম ২৮৪৪সহিহ
- মুনাফিকরা থাকবে জাহান্নামের সবচেয়ে নিচের স্তরে।সূরা আন-নিসা ৪:১৪৫
- "হুতামা" নামের আগুন হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছাবে, আর লম্বা স্তম্ভে তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে রাখবে।সূরা আল-হুমাযা ১০৪:৪ · সূরা আল-হুমাযা ১০৪:৫ · সূরা আল-হুমাযা ১০৪:৬ · সূরা আল-হুমাযা ১০৪:৭ · সূরা আল-হুমাযা ১০৪:৮ · সূরা আল-হুমাযা ১০৪:৯
পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ৩টি আয়াত
لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ لِّكُلِّ بَابٍ مِّنْهُمْ جُزْءٌ مَّقْسُومٌ
‘সেটার সাতটি দরজা আছে, প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য (শয়তানের অনুসারীদের) নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে।’
আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে ছিলাম, হঠাৎ তিনি ভারী কিছু পড়ার শব্দ শুনলেন। তিনি বললেন: জানো এটা কী? আমরা বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: এটা একটি পাথর, সত্তর বছর আগে জাহান্নামে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল; এতদিন সেটা জাহান্নামে পড়ছিল, এইমাত্র তার তলায় গিয়ে পৌঁছাল।
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا
মুনাফিকরা তো জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে থাকবে এবং তাদের জন্য আপনি কখনো কোনো সহায় পাবেন না।
وَسِيقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَىٰ جَهَنَّمَ زُمَرًا ۖ حَتَّىٰ إِذَا جَاءُوهَا فُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ يَتْلُونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِ رَبِّكُمْ وَيُنذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَـٰذَا ۚ قَالُوا بَلَىٰ وَلَـٰكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَى الْكَافِرِينَ
আর কাফিরদেরকে জাহান্নামের দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে যখন তারা জাহান্নামের কাছে আসবে তখন এর দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে এবং জাহান্নামের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, 'তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে রাসূল আসেনি যারা তোমাদের কাছে তোমাদের রবের আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করত এবং এ দিনের সাক্ষাত সম্বন্ধে তোমাদেরকে সতর্ক করত?' তারা বলবে, 'অবশ্যই হ্যাঁ।' কিন্তু শাস্তির বাণী কাফিরদের উপর বাস্তবায়িত হয়েছে।
- মুনাফিকির তিন লক্ষণ থেকে দূরে থাকা: মিথ্যা, ওয়াদা ভঙ্গ, আমানতের খেয়ানত (সহিহ বুখারী ৩৩)
প্রহরী ফেরেশতা
উনিশজন প্রহরী, প্রধান মালিক
জাহান্নামের দায়িত্বে আছেন ফেরেশতারা, যাঁরা আল্লাহর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। কুরআন তাঁদের সংখ্যা বলেছে, আর তাঁদের প্রধানের নাম মালিক।
- "সাকার"-এর তত্ত্বাবধানে আছেন উনিশজন প্রহরী, আর প্রহরী শুধু ফেরেশতারাই।সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩০ · সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩১
- তাঁরা কঠোর ও নির্মম, আল্লাহ যা আদেশ করেন তা অমান্য করেন না।সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬
- জাহান্নামিরা মালিককে ডেকে বলবে: তোমার রব যেন আমাদের শেষ করে দেন। তিনি বলবেন: তোমরা এখানেই থাকবে।সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৭৭
- নবীজি (ﷺ) স্বপ্নে মালিককে আগুন জ্বালাতে দেখেছেন।সহিহ বুখারী ৩২৩৬সহিহ
- কিয়ামতের দিন সত্তর হাজার লাগামে জাহান্নামকে টেনে আনবেন ফেরেশতারা; প্রতিটি লাগাম ধরে থাকবেন সত্তর হাজার ফেরেশতা।সহিহ মুসলিম ২৮৪২সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ১টি হাদিস, ৩টি আয়াত
عَلَيْهَا تِسْعَةَ عَشَرَ
‘সাকার’-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশজন প্রহরী।
وَمَا جَعَلْنَا أَصْحَابَ النَّارِ إِلَّا مَلَائِكَةً ۙ وَمَا جَعَلْنَا عِدَّتَهُمْ إِلَّا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا لِيَسْتَيْقِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ وَيَزْدَادَ الَّذِينَ آمَنُوا إِيمَانًا ۙ وَلَا يَرْتَابَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ وَالْمُؤْمِنُونَ ۙ وَلِيَقُولَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ وَالْكَافِرُونَ مَاذَا أَرَادَ اللَّهُ بِهَـٰذَا مَثَلًا ۚ كَذَٰلِكَ يُضِلُّ اللَّهُ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ ۚ وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ ۚ وَمَا هِيَ إِلَّا ذِكْرَىٰ لِلْبَشَرِ
আর আমরা তো জাহান্নামের প্রহরী কেবল ফেরেশতাদেরকেই করেছি; কাফিরদের পরীক্ষাস্বরূপই আমরা তাদের এ সংখ্যা উল্লেখ করেছি যাতে কিতাবপ্রাপ্তদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে, আর যারা ঈমান এনেছে তাদের ঈমান বেড়ে যায়। আর কিতাবপ্রাপ্তরা ও মুমিনরা সন্দেহ পোষণ না করে। আর যেন এর ফলে যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তারা ও কাফিররা বলে, আল্লাহ্ এ (সংখ্যার) উপমা (উল্লেখ করা) দ্বারা কি ইচ্ছা করেছেন?’ এভাবে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছে হেদায়াত করেন। আর আপনার রবের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া কেউ জানে না। আর জাহান্নামের এ বর্ণনা তো মানুষের জন্য এক উপদেশ মাত্র।
وَنَادَوْا يَا مَالِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ ۖ قَالَ إِنَّكُم مَّاكِثُونَ
তারা চিৎকার করে বলবে, ‘হে মালেক, তোমার রব যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন।’ সে বলবে, ‘নিশ্চয় তোমরা অবস্থানকারী হবে।’
يُؤْتَى بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لَهَا سَبْعُونَ أَلْفَ زِمَامٍ مَعَ كُلِّ زِمَامٍ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ يَجُرُّونَهَا
সেদিন (কিয়ামতের দিন) জাহান্নামকে আনা হবে; তার সত্তর হাজার লাগাম থাকবে, প্রতিটি লাগামের সাথে সত্তর হাজার ফেরেশতা, তারা তাকে টেনে আনবে।
খাবার ও পানীয়
যাক্কূম, ফুটন্ত পানি, পুঁজ
জান্নাতে যেমন মনের মতো খাবার আর চার রকম নদী, জাহান্নামে তার উল্টো: এমন খাবার যা ক্ষুধা মেটায় না, এমন পানীয় যা পিপাসা বাড়ায় আর ভেতরটা ছিঁড়ে ফেলে।
- যাক্কূম গাছ পাপীর খাবার; পেটে গলিত তামার মতো, ফুটন্ত পানির মতো ফুটতে থাকবে।সূরা আদ-দুখান ৪৪:৪৩ · সূরা আদ-দুখান ৪৪:৪৪ · সূরা আদ-দুখান ৪৪:৪৫ · সূরা আদ-দুখান ৪৪:৪৬
- যাক্কূম গজায় জাহান্নামের তলা থেকে, তার মোচা যেন শয়তানের মাথা; তারা তা দিয়েই পেট ভরবে।সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬২ · সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬৪ · সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬৫ · সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬৬
- পান করতে দেওয়া হবে এমন ফুটন্ত পানি, যা নাড়িভুঁড়ি টুকরো টুকরো করে দেবে।সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫
- পান করানো হবে গলিত পুঁজ; অনেক কষ্টে এক ঢোক গিলবে, কিন্তু সহজে গিলতে পারবে না।সূরা ইবরাহীম ১৪:১৬ · সূরা ইবরাহীম ১৪:১৭
- খাবার হবে শুধু ক্ষত থেকে বের হওয়া স্রাব, আর কাঁটাওয়ালা গুল্ম; যা পুষ্টিও দেবে না, ক্ষুধাও মেটাবে না।সূরা আল-হাক্কা ৬৯:৩৬ · সূরা আল-গাশিয়া ৮৮:৬ · সূরা আল-গাশিয়া ৮৮:৭
- সেখানে কোনো শীতলতা বা পানীয়ের স্বাদ নেই, ফুটন্ত পানি আর পুঁজ ছাড়া।সূরা আন-নাবা ৭৮:২৪ · সূরা আন-নাবা ৭৮:২৫
পুরো দলিল পড়ুন ৮টি আয়াত
إِنَّ شَجَرَتَ الزَّقُّومِ
নিশ্চয় যাক্কূম গাছ হবে ---
طَعَامُ الْأَثِيمِ
পাপীর খাদ্য ;
كَالْمُهْلِ يَغْلِي فِي الْبُطُونِ
গলিত তামার মত, পেটের মধ্যে ফুটতে থাকবে
كَغَلْيِ الْحَمِيمِ
ফুটন্ত পানি ফুটার মত।
إِنَّهَا شَجَرَةٌ تَخْرُجُ فِي أَصْلِ الْجَحِيمِ
এ গাছ উদ্গত হয় জাহান্নামের তলদেশ থেকে,
طَلْعُهَا كَأَنَّهُ رُءُوسُ الشَّيَاطِينِ
এর মোচা যেন শয়তানের মাথা,
مِّن وَرَائِهِ جَهَنَّمُ وَيُسْقَىٰ مِن مَّاءٍ صَدِيدٍ
তার সামনে রয়েছে জাহান্নাম এবং পান করানো হবে গলিত পুঁজ;
يَتَجَرَّعُهُ وَلَا يَكَادُ يُسِيغُهُ وَيَأْتِيهِ الْمَوْتُ مِن كُلِّ مَكَانٍ وَمَا هُوَ بِمَيِّتٍ ۖ وَمِن وَرَائِهِ عَذَابٌ غَلِيظٌ
যা সে অতি কষ্টে একেক ঢোক করে গিলবে এবং তা গিলা প্রায় সহজ হবে না। সকল স্থান থেকে তার কাছে আসবে মৃত্যু অথচ তার মৃত্যু ঘটবে না [২। আর এরপরও রয়েছে কঠোর শাস্তি।
- এতিমের সম্পদ থেকে দূরে থাকা: তা পেটে আগুন খাওয়ার মতো (সূরা আন-নিসা ৪:১০)
আগুনের শাস্তি
পোশাক, চামড়া, শিকল, আর সবচেয়ে হালকা শাস্তি
জাহান্নামের শাস্তি শরীর ও মন দুটোকেই ছোঁয়। শরীরকে বড় করে দেওয়া হবে, চামড়া বারবার বদলানো হবে, আর সবচেয়ে বড় বঞ্চনা: আল্লাহর কাছ থেকে আড়াল হয়ে থাকা।
- অবিশ্বাসীদের জন্য আগুনের পোশাক কেটে বানানো হবে; মাথায় ঢালা হবে ফুটন্ত পানি, যাতে পেটের ভেতর আর চামড়া গলে যাবে; আর থাকবে লোহার মুগুর।সূরা আল-হাজ্জ ২২:১৯ · সূরা আল-হাজ্জ ২২:২০ · সূরা আল-হাজ্জ ২২:২১
- যখনই চামড়া পুড়ে যাবে, নতুন চামড়া দেওয়া হবে, যাতে তারা শাস্তি অনুভব করতে থাকে।সূরা আন-নিসা ৪:৫৬
- গলায় বেড়ি পরিয়ে সত্তর হাত লম্বা শিকলে বাঁধা হবে।সূরা আল-হাক্কা ৬৯:৩০ · সূরা আল-হাক্কা ৬৯:৩১ · সূরা আল-হাক্কা ৬৯:৩২
- সবচেয়ে হালকা শাস্তি: পায়ের তলায় দুটি অঙ্গার, তাতে মগজ ফুটবে ডেকচির মতো।সহিহ বুখারী ৬৫৬২সহিহ
- কাফিরের দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের মতো, চামড়া তিন দিনের পথের মতো পুরু।সহিহ মুসলিম ২৮৫১সহিহ
- দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষটিও জাহান্নামে একবার চুবানো খেয়ে বলবে: আমি কখনো কোনো সুখ দেখিনি।সহিহ মুসলিম ২৮০৭সহিহ
- সেদিন তারা তাদের রবের কাছ থেকে আড়ালে থাকবে।সূরা আল-মুতাফফিফীন ৮৩:১৫
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ৪টি আয়াত
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُم بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا
নিশ্চয় যারা আমাদের আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে অবশ্যই তাদেরকে আমরা আগুনে পোড়াব; যখনই তাদের চামড়া পুড়ে পাকা দগ্ধ হবে তখনই তার স্থলে নতুন চামড়া বদলে দেব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
هَـٰذَانِ خَصْمَانِ اخْتَصَمُوا فِي رَبِّهِمْ ۖ فَالَّذِينَ كَفَرُوا قُطِّعَتْ لَهُمْ ثِيَابٌ مِّن نَّارٍ يُصَبُّ مِن فَوْقِ رُءُوسِهِمُ الْحَمِيمُ
এরা দুটি বিবাদমান পক্ষ, তারা তাদের রব সম্বন্ধে বিতর্ক করে। অতএব যারা কুফরী করে তাদের জন্য কেটে তৈরি করা হয়েছে আগুনের পোশাক, তাদের মাথার উপর ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি।
يُصْهَرُ بِهِ مَا فِي بُطُونِهِمْ وَالْجُلُودُ
যা দ্বারা তাদের পেটে যা আছে তা এবং তাদের চামড়া বিগলিত করা হবে।
وَلَهُم مَّقَامِعُ مِنْ حَدِيدٍ
এবং তাদের জন্য থাকবে লোহার গদা তথা হাতুড়ি।
إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ رَجُلٌ عَلَى أَخْمَصِ قَدَمَيْهِ جَمْرَتَانِ يَغْلِي مِنْهُمَا دِمَاغُهُ، كَمَا يَغْلِي الْمِرْجَلُ وَالْقُمْقُمُ
কিয়ামতের দিন জাহান্নামিদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা শাস্তি হবে সেই ব্যক্তির, যার দুই পায়ের তলার মাঝখানে দুটি জ্বলন্ত অঙ্গার রাখা হবে; তাতে তার মগজ এমনভাবে ফুটতে থাকবে, যেমন চুলায় ডেকচি ও পাতিল ফোটে।
ضِرْسُ الْكَافِرِ أَوْ نَابُ الْكَافِرِ مِثْلُ أُحُدٍ وَغِلَظُ جِلْدِهِ مَسِيرَةُ ثَلاَثٍ
(জাহান্নামে) কাফিরের মাড়ির দাঁত বা কুকুর-দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের মতো, আর তার চামড়ার পুরুত্ব হবে তিন দিনের পথের সমান।
কিয়ামতের দিন জাহান্নামিদের মধ্য থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষটিকে আনা হবে। তাকে জাহান্নামে একবার চুবিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদম সন্তান, তুমি কি কখনো কোনো সুখ দেখেছ? কোনো আরাম কি কখনো তোমার কাছ দিয়ে গেছে? সে বলবে: না, আল্লাহর কসম, হে রব। আর জান্নাতিদের মধ্য থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে কষ্টে থাকা মানুষটিকে আনা হবে। তাকে জান্নাতে একবার চুবিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদম সন্তান, তুমি কি কখনো কোনো কষ্ট দেখেছ? কোনো বিপদ কি কখনো তোমার উপর দিয়ে গেছে? সে বলবে: না, আল্লাহর কসম, হে রব; কোনো কষ্ট কখনো আমার উপর দিয়ে যায়নি, কোনো বিপদও আমি কখনো দেখিনি।
কারা যাবে জাহান্নামে
কুরআন ও সহিহ হাদিসে যাদের কথা এসেছে
কুরআন ও হাদিস জাহান্নামের কথা বলেছে মানুষকে সতর্ক করতে, যাতে সে সময় থাকতে ফিরে আসে। নিচের তালিকা কাউকে "জাহান্নামি" বলার জন্য নয়, নিজেকে দেখার জন্য।
- শিরক ও কুফর: আল্লাহ শিরক ক্ষমা করেন না; কিতাবিদের মধ্যে যারা কুফরি করেছে আর মুশরিকরা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।সূরা আন-নিসা ৪:৪৮ · সূরা আল-বাইয়িনা ৯৮:৬ · সূরা আল-মায়িদা ৫:৭২
- মুনাফিকি: মুখে ইসলাম, অন্তরে অস্বীকার; তাদের স্থান সবচেয়ে নিচে।সূরা আন-নিসা ৪:১৪৫
- জাহান্নামিদের নিজেদের স্বীকারোক্তি: আমরা নামাজ পড়তাম না, অভাবীকে খাবার দিতাম না, অনর্থক কথায় মেতে থাকতাম, বিচার দিবস অস্বীকার করতাম।সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪২ · সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪৩ · সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪৪ · সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪৫ · সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪৬
- অহংকার: যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার, সে জান্নাতে যাবে না; অহংকার মানে সত্যকে অস্বীকার আর মানুষকে তুচ্ছ করা।সহিহ মুসলিম ৯১সহিহ · সূরা আয-যুমার ৩৯:৭২
- ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিনকে হত্যা, আর আত্মহত্যা।সূরা আন-নিসা ৪:৯৩ · সহিহ বুখারী ৫৭৭৮সহিহ
- অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ খাওয়া।সূরা আন-নিসা ৪:১০
- সোনা-রুপা জমিয়ে রেখে আল্লাহর পথে খরচ না করা (যাকাত না দেওয়া)।সূরা আত-তাওবা ৯:৩৪ · সূরা আত-তাওবা ৯:৩৫
- জিহ্বা: মানুষকে মুখের উপর জাহান্নামে ফেলবে তাদের জিহ্বার ফসল।জামে আত-তিরমিযী ২৬১৬সহিহ
- নবীজির (ﷺ) নামে ইচ্ছা করে মিথ্যা বলা।সহিহ বুখারী ১১০সহিহ
- জুলুম: মানুষকে অন্যায়ভাবে চাবুক মারা, এমনকি একটি বিড়ালকে না খাইয়ে বেঁধে রাখা।সহিহ মুসলিম ২১২৮সহিহ · সহিহ বুখারী ৩৩১৮সহিহ
- কাপড় পরেও যারা উলঙ্গ, অন্যকে নিজের দিকে টানে।সহিহ মুসলিম ২১২৮সহিহ
- বেশি বেশি অভিশাপ দেওয়া আর স্বামীর অনুগ্রহের অকৃতজ্ঞতা; নবীজি (ﷺ) এর প্রতিকার বলেছেন: দান করো।সহিহ বুখারী ৩০৪সহিহ · সহিহ বুখারী ২৯সহিহ
- পুরুষের টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরা।সহিহ বুখারী ৫৭৮৭সহিহ
মনে রাখুন: এই তালিকার সব গুনাহ সমান নয়। শিরক বা কুফর নিয়ে মারা গেলে জাহান্নাম চিরস্থায়ী। বাকি বড় গুনাহের জন্য একজন মুমিন শাস্তি পেতে পারে, তবে অন্তরে সামান্যতম ঈমান থাকলেও একসময় বের হয়ে আসবে (সহিহ বুখারী ২২); আর আল্লাহ চাইলে শুরুতেই ক্ষমা করে দিতে পারেন (সূরা আন-নিসা ৪:৪৮)। আত্মহত্যা বা হত্যার দলিলে "চিরকাল" শব্দ এসেছে; আহলুস সুন্নাহর আলেমরা একে কঠিন হুঁশিয়ারি বা দীর্ঘ সময় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, অথবা বলেছেন এটা তার জন্য, যে কাজটিকে হালাল মনে করে। কোনো নির্দিষ্ট মুসলিমকে "জাহান্নামি" বলে দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই।
পুরো দলিল পড়ুন ৫টি হাদিস, ৩টি আয়াত
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ
‘তোমাদেরকে কিসে ‘সাকার’- এ নিক্ষেপ করেছে?’
قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ
তারা বলবে, ‘আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَىٰ إِثْمًا عَظِيمًا
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে।
যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি বলল: মানুষ তো চায় তার কাপড় সুন্দর হোক, জুতা সুন্দর হোক। তিনি বললেন: আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন। অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা আর মানুষকে তুচ্ছ করা।
যে পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের আগুনে চিরকাল সেভাবেই লাফিয়ে পড়তে থাকবে। যে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে, তার বিষ তার হাতে থাকবে, জাহান্নামের আগুনে চিরকাল সে তা খেতে থাকবে। আর যে লোহার অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করে, সেই অস্ত্র তার হাতে থাকবে, জাহান্নামের আগুনে চিরকাল সে তা দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে।
دَخَلَتِ امْرَأَةٌ النَّارَ فِي هِرَّةٍ رَبَطَتْهَا، فَلَمْ تُطْعِمْهَا، وَلَمْ تَدَعْهَا تَأْكُلُ مِنْ خِشَاشِ الأَرْضِ
এক নারী একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে গেল। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল; নিজেও খেতে দেয়নি, আবার ছেড়েও দেয়নি যে মাটির পোকামাকড় খেয়ে বাঁচবে।
দুই দল জাহান্নামি আমি দেখিনি (তারা পরে আসবে): এক দল, যাদের হাতে গরুর লেজের মতো চাবুক, তা দিয়ে তারা মানুষকে মারে। আরেক দল নারী, যারা কাপড় পরেও উলঙ্গ, (পুরুষদের) নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করে আর নিজেরাও ঝুঁকে পড়ে, তাদের মাথা উটের হেলে পড়া কুঁজের মতো। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, তার সুগন্ধও পাবে না, অথচ তার সুগন্ধ এত এত দূর থেকে পাওয়া যায়।
আমাকে জাহান্নাম দেখানো হলো; দেখলাম তার অধিবাসীদের বেশিরভাগ নারী, তারা অকৃতজ্ঞতা করে। জিজ্ঞেস করা হলো: তারা কি আল্লাহর সাথে কুফরি করে? তিনি বললেন: তারা স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা করে, অনুগ্রহ অস্বীকার করে। তুমি যদি তাদের কারো প্রতি সারা জীবন অনুগ্রহ করো, তারপর সে তোমার কাছ থেকে (অপছন্দের) কিছু দেখে, তাহলে বলে: তোমার কাছ থেকে আমি কখনো কোনো ভালো কিছু পাইনি।
কারা চিরকাল, কারা বের হবে
কাফিরের জন্য চিরস্থায়ী, মুমিনের জন্য আশা
জাহান্নাম দুই রকম মানুষের ঠিকানা। যারা ঈমান ছাড়া মারা গেছে, তাদের জন্য তা চিরস্থায়ী। আর যে মুমিন গুনাহের কারণে সেখানে গেছে, ঈমানের ছোট্ট একটি দানাও তাকে একদিন বের করে আনবে।
- অবিশ্বাসীদের মৃত্যুর ফায়সালাও হবে না যে মরে যাবে, শাস্তিও হালকা করা হবে না।সূরা ফাতির ৩৫:৩৬
- মৃত্যুকে ভেড়ার আকারে এনে জবাই করা হবে; তারপর জাহান্নামবাসীদের বলা হবে: চিরকাল, আর মৃত্যু নেই।সহিহ বুখারী ৪৭৩০সহিহ
- যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে, আল্লাহ তাকে বের করে আনার আদেশ দেবেন।সহিহ বুখারী ২২সহিহ
- নবীজির (ﷺ) সুপারিশে একদল মানুষ বের হয়ে জান্নাতে যাবে, তাদের নাম হবে "জাহান্নামিয়্যূন"।সহিহ বুখারী ৬৫৬৬সহিহ
- নবী, ফেরেশতা ও মুমিনদের সুপারিশের পর আল্লাহ নিজের এক মুঠোয় আরও মানুষ বের করবেন; জীবনের নদীতে তারা নতুন করে গজিয়ে উঠবে।সহিহ বুখারী ৭৪৩৯সহিহ
- সবশেষে যে মানুষটি জাহান্নাম থেকে বের হবে, সেও জান্নাতে পাবে দুনিয়ার দশ গুণ।সহিহ বুখারী ৬৫৭১সহিহ
পুরো দলিল পড়ুন ৩টি হাদিস, ১টি আয়াত
(কিয়ামতের পর) মৃত্যুকে সাদা-কালো মেশানো একটি ভেড়ার আকৃতিতে আনা হবে। একজন ঘোষক ডাকবেন: হে জান্নাতবাসী! তারা গলা বাড়িয়ে দেখবে। তিনি বলবেন: এটাকে চেনো? তারা বলবে: হ্যাঁ, এটা মৃত্যু; সবাই একে দেখেছে। তারপর ডাকবেন: হে জাহান্নামবাসী! তারাও গলা বাড়িয়ে দেখবে। তিনি বলবেন: এটাকে চেনো? তারা বলবে: হ্যাঁ, এটা মৃত্যু; সবাই একে দেখেছে। তারপর একে জবাই করা হবে, আর বলা হবে: হে জান্নাতবাসী, চিরকাল থাকবে, আর মৃত্যু নেই। হে জাহান্নামবাসী, চিরকাল থাকবে, আর মৃত্যু নেই।
وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَىٰ عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُم مِّنْ عَذَابِهَا ۚ كَذَٰلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ
আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য আছে জাহান্নামের আগুন। তাদের উপর ফায়সালা দেয়া হবে না যে, তারা মরবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমরা প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে শাস্তি দিয়ে থাকি।
জান্নাতবাসীরা জান্নাতে আর জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তারপর আল্লাহ তাআলা বলবেন: যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে, তাকে বের করে আনো। তখন তাদের বের করা হবে, তারা পুড়ে কালো হয়ে গেছে। তাদের "হায়া" বা "হায়াত" (জীবন) নামের নদীতে ফেলা হবে; তারা এমনভাবে গজিয়ে উঠবে, যেমন স্রোতের ধারে বীজ গজিয়ে ওঠে। তুমি কি দেখোনি, তা কেমন হলুদ আর পেঁচানো হয়ে বের হয়?
يَخْرُجُ قَوْمٌ مِنَ النَّارِ بِشَفَاعَةِ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم فَيَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ، يُسَمَّوْنَ الْجَهَنَّمِيِّينَ
মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সুপারিশে একদল মানুষ জাহান্নাম থেকে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে; তাদের ডাকা হবে "জাহান্নামিয়্যূন" (জাহান্নাম থেকে আসা লোক)।
যে আমল জাহান্নাম থেকে বাঁচায়
সহিহ হাদিসে যেসব আমলের সাথে সরাসরি জাহান্নাম থেকে মুক্তির কথা এসেছে
ভয়ের কথা পড়ে থেমে গেলে লাভ নেই; ভয় তখনই কাজে লাগে যখন তা আমলে নিয়ে যায়। নিচের আমলগুলোর বেশিরভাগ ছোট, আজ থেকেই শুরু করা যায়।
| আমল | পুরস্কার | সূত্র ও মান |
|---|---|---|
| ফজর ও আসর নিয়মিত পড়া | সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না | সহিহ মুসলিম ৬৩৪সহিহ |
| জোহরের আগে চার, পরে চার রাকাত | আল্লাহ তাকে জাহান্নামের জন্য হারাম করেন | জামে আত-তিরমিযী ৪২৭সহিহ |
| দান করা, আধখানা খেজুর হলেও | আগুন থেকে বাঁচার উপায় | সহিহ বুখারী ১৪১৭সহিহ |
| আল্লাহর পথে একদিন রোজা | জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের দূরত্ব | সহিহ বুখারী ২৮৪০সহিহ |
| আল্লাহর ভয়ে কাঁদা | জাহান্নাম তাকে ছোঁবে না | জামে আত-তিরমিযী ১৬৩৩সহিহ |
| অনুপস্থিত ভাইয়ের সম্মান রক্ষা | কিয়ামতের দিন চেহারা থেকে আগুন সরানো | জামে আত-তিরমিযী ১৯৩১সহিহ |
| মেয়েসন্তানদের সাথে সদাচরণ | তারা জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে | সহিহ বুখারী ১৪১৮সহিহ |
| আল্লাহর পথে পা ধুলামাখা হওয়া | জাহান্নাম তার জন্য হারাম | সহিহ বুখারী ৯০৭সহিহ |
| তিনবার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া | জাহান্নাম নিজেই তার জন্য দোয়া করে | জামে আত-তিরমিযী ২৫৭২সহিহ |
| ফরজ ইবাদত আর জিহ্বার হেফাজত | জাহান্নাম থেকে দূরে রাখে | জামে আত-তিরমিযী ২৬১৬সহিহ |
| শিরক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা | আল্লাহ এটুকুই চেয়েছিলেন | সহিহ বুখারী ৬৫৫৭সহিহ |
জাহান্নাম থেকে আশ্রয়ের দোয়া
নবীজি (ﷺ) নিজে প্রতিদিন জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাইতেন, আর সাহাবিদের নামাজের ভেতরেও তা শিখিয়েছেন। এগুলো মুখস্থ করে নিয়মিত পড়ুন।
হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন, আর আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচান।
সহিহ বুখারী ৬৩৮৯সহিহহে আমাদের রব, আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি সরিয়ে দিন; তার শাস্তি তো লেগে থাকা বিপদ।
সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৫কুরআনহে আল্লাহ, আমি আপনার আশ্রয় চাই জাহান্নামের আযাব থেকে, কবরের আযাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে, আর দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে।
সহিহ মুসলিম ৫৮৮সহিহজাহান্নাম নিজেই বলে: হে আল্লাহ, তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন।
জামে আত-তিরমিযী ২৫৭২সহিহপ্রচলিত কিন্তু সহিহ নয়
জাহান্নাম নিয়ে ওয়াজ আর সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ভয়ের গল্প ছড়ায়, যার সবটা সহিহ নয়। ভয় জাগাতে দুর্বল বর্ণনার দরকার নেই; কুরআন ও সহিহ হাদিসই যথেষ্ট। নিচের প্রতিটির সাথে সহিহ কথাটি দেওয়া হলো।
দুর্বল "ওয়াইল জাহান্নামের একটি উপত্যকা, কাফির তার তলায় পৌঁছাতে চল্লিশ বছর পড়তে থাকবে"
এই বর্ণনা সুনানে তিরমিযী ৩১৬৪-এ আছে। ইমাম তিরমিযী নিজেই বলেছেন, এটা শুধু ইবনু লাহীআর সূত্রে এসেছে; শাইখ আলবানী, আহমাদ শাকির ও যুবাইর আলী যাঈ একে দুর্বল বলেছেন। কুরআনে "ওয়াইল" শব্দের অর্থ ধ্বংস বা দুর্ভোগ (সূরা আল-মুতাফফিফীন ৮৩:১, সূরা আল-হুমাযা ১০৪:১)। জাহান্নামের গভীরতার সহিহ বর্ণনা হলো সত্তর বছর ধরে পড়তে থাকা পাথরের হাদিস (সহিহ মুসলিম ২৮৪৪)।
দুর্বল "ফজর ও মাগরিবের পর সাতবার আল্লাহুম্মা আজিরনী মিনান নার পড়লে সেদিন বা সে রাতে মারা গেলে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লেখা হয়"
এটা সুনানে আবু দাউদ ৫০৭৯-এ আছে। শাইখ আলবানী (সিলসিলাতুল আহাদীসিয যঈফাহ), শুআইব আল-আরনাঊত ও মুহিউদ্দীন আব্দুল হামীদ একে সনদের দুর্বলতার কারণে দুর্বল বলেছেন; শুধু যুবাইর আলী যাঈ হাসান বলেছেন। তাই আমরা একে দলিল হিসেবে নিইনি। জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়ার সহিহ দলিল: তিনবার চাওয়া (জামে আত-তিরমিযী ২৫৭২), আর প্রতি নামাজের শেষে চার জিনিস থেকে আশ্রয় (সহিহ মুসলিম ৫৮৮)। সাধারণভাবে "আল্লাহুম্মা আজিরনী মিনান নার" বলে দোয়া করায় কোনো সমস্যা নেই; শুধু সাতবারের নির্দিষ্ট ফজিলতটা সহিহ নয়।
বাতিল "নামাজে অবহেলাকারীর পনেরোটি শাস্তি: দুনিয়ায় পাঁচটি, মৃত্যুর সময় তিনটি, কবরে তিনটি, কিয়ামতে চারটি"
এই লম্বা বর্ণনা অনেক বই আর পোস্টে নবীজির (ﷺ) নামে চলে। হাদিস বিশেষজ্ঞ ইমাম যাহাবী ও ইবনু হাজার আসকালানী একে বাতিল বলেছেন। নামাজ ছাড়ার ভয়াবহতা বোঝাতে কুরআনের এই স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট: "আমরা নামাজিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না" (সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪২, সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪৩)।
সহিহ তালিকা নেই জাহান্নামের সাত স্তরের নামের তালিকা (জাহান্নাম, লাযা, হুতামা, সাঈর, সাকার, জাহীম, হাবিয়া) আর কোন স্তরে কারা থাকবে
সাতটি দরজা আছে, এটা কুরআনে স্পষ্ট (সূরা আল-হিজর ১৫:৪৪)। নামগুলোও কুরআনে আগুনের নাম বা বিশেষণ হিসেবে এসেছে, যেমন সাকার (সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:২৬) ও হুতামা (সূরা আল-হুমাযা ১০৪:৪)। কিন্তু প্রতিটি নামকে একেকটি স্তর বানিয়ে, কোন স্তরে কোন দল থাকবে তার পুরো বিন্যাস কোনো সহিহ হাদিসে আসেনি; এটা কিছু তাফসিরের বর্ণনা থেকে ছড়িয়েছে। সহিহভাবে নির্দিষ্ট করে শুধু এটুকু জানা যায়: মুনাফিকরা সবচেয়ে নিচের স্তরে (সূরা আন-নিসা ৪:১৪৫)।
ভুল ধারণা "মুসলিম হলে যা-ই করি, জাহান্নাম আমাকে ছোঁবে না"
সহিহ হাদিসে আছে, পুলসিরাত থেকে কিছু মুমিনও আঁকড়ার টানে আগুনে পড়বে, পরে সুপারিশে বের হবে (সহিহ বুখারী ৭৪৩৯)। কুরআন বলে, সবাইকে জাহান্নামের উপর দিয়ে যেতে হবে, আর আল্লাহ বাঁচাবেন মুত্তাকীদের (সূরা মারইয়াম ১৯:৭১, সূরা মারইয়াম ১৯:৭২)। ঈমান মানুষকে চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচায়, কিন্তু গুনাহকে হালকা করে দেখার সুযোগ দেয় না।
ভুল ধারণা "আল্লাহ এত দয়ালু, তিনি কাউকে চিরকাল জাহান্নামে রাখবেন না"
আল্লাহর রহমত সবকিছুকে ঘিরে আছে, তবে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, যারা কুফর ও শিরক নিয়ে মারা যাবে, তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে (সূরা আল-বাইয়িনা ৯৮:৬, সূরা আন-নিসা ৪:১৬৯); মৃত্যুকে জবাই করে সেই চিরস্থায়িত্বের ঘোষণা দেওয়া হবে (সহিহ বুখারী ৪৭৩০)। রহমতের দরজা খোলা আছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত (জামে আত-তিরমিযী ৩৫৩৭)।
শেষ কথা: নিরাশ হবেন না
এই পাতার সব ভয়ের কথার পরেও আল্লাহর শেষ কথা হলো রহমতের। যত বড় গুনাহই হোক, শিরক ছাড়া ফিরে এলে আল্লাহ বলেন, পৃথিবী ভরা গুনাহ নিয়ে এলেও তিনি পৃথিবী ভরা ক্ষমা নিয়ে আসবেন (জামে আত-তিরমিযী ৩৫৪০)। আজকের দিনটাই ফিরে আসার দিন।
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ---আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ يَوْمَ لَا يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ ۖ نُورُهُمْ يَسْعَىٰ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর---বিশুদ্ধ তাওবা; সম্ভবত তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেদিন আল্লাহ লাঞ্ছিত করবেন না নবীকে এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে। তাদের নূর তাদের সামনে ও ডানে ধাবিত হবে। তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণতা দান করুন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন, নিশ্চয় আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।'
আল্লাহ বলেন: হে আদম সন্তান, যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকবে আর আমার কাছে আশা রাখবে, তোমার যা কিছুই থাকুক আমি তোমাকে ক্ষমা করব, আমি কোনো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান, তোমার গুনাহ যদি আকাশের মেঘ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করব, আমি কোনো পরোয়া করি না। হে আদম সন্তান, তুমি যদি পৃথিবী ভরা গুনাহ নিয়ে আমার কাছে আসো, তারপর আমার সাথে কিছু শরিক না করে আমার সাথে সাক্ষাৎ করো, আমি পৃথিবী ভরা ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে আসব।