deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

দ্বীনের পথ · ধাপ ৬

চরিত্র ও সম্পর্ক: মানুষের হক আদায়

নামাজ-রোজা আল্লাহর হক, আর মানুষের সাথে আচরণ মানুষের হক। দুটো মিলেই দ্বীন। এই ধাপে জানবেন মা-বাবা, পরিবার, আত্মীয় আর প্রতিবেশীর হক কী, আর জিহ্বা ও রাগকে কীভাবে সংযত রাখবেন।

গল্প দিয়ে শুরু

আবু বকর (রা.) ও মিসতাহ: যে কষ্ট দিয়েছিল, তাকে ক্ষমা

মিসতাহ ছিলেন আবু বকর (রা.)-এর গরিব আত্মীয়। আবু বকর (রা.) নিয়মিত তাঁর খরচ চালাতেন। তারপর এমন এক ঘটনা ঘটল, যা যেকোনো বাবার বুক ভেঙে দেয়: মুনাফিকরা আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে জঘন্য অপবাদ ছড়াল, আর সেই কথা যারা মুখে মুখে ছড়িয়েছিল, মিসতাহ ছিলেন তাদের একজন।

প্রায় এক মাস পর আল্লাহ নিজে আয়াত নাজিল করে আয়েশা (রা.)-এর নির্দোষিতা ঘোষণা করলেন। কষ্টে আর রাগে আবু বকর (রা.) কসম করলেন: যে আমার মেয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলেছে, তাকে আর কখনো কিছু দেব না।

মানুষ হিসেবে এই রাগ বোঝা যায়। কিন্তু আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দার কাছে আরও উঁচু কিছু চাইলেন। আয়াত নাজিল হলো: তারা যেন ক্ষমা করে, দোষ উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?

وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنكُمْ وَالسَّعَةِ أَن يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۖ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا ۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

আর তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্থকে ও আল্লাহ্‌র রাস্তায় হিজরতকারীদেরকে কিছুই দেবে না; তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে এবং তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

আবু বকর (রা.)-এর উত্তর ছিল এক মুহূর্তের: অবশ্যই, আল্লাহর কসম, আমি চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। তিনি মিসতাহর খরচ আবার চালু করলেন, আর বললেন, আর কখনো বন্ধ করব না।

আবু বকর (রা.) ও মিসতাহ: অপবাদদাতাকে ক্ষমাসহিহ বুখারী ৪৭৫০ · সহিহ · পুরো হাদিস পড়ুন

(আয়েশা (রা.)-এর নির্দোষিতা ঘোষণা করে আয়াত নাজিল হওয়ার পর) আবু বকর সিদ্দীক (রা.), যিনি আত্মীয়তা ও দারিদ্র্যের কারণে মিসতাহ ইবনু উসাসাকে খরচ দিতেন, বললেন: আয়েশা সম্পর্কে সে যা বলেছে, এরপর আল্লাহর কসম, আমি আর কখনো মিসতাহর জন্য কিছু খরচ করব না। তখন আল্লাহ নাজিল করলেন: "তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন আত্মীয়, মিসকিন ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছু না দেওয়ার কসম না করে। তারা যেন ক্ষমা করে, দোষ উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।" আবু বকর (রা.) বললেন: অবশ্যই, আল্লাহর কসম, আমি চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। তিনি মিসতাহর খরচ আবার চালু করলেন, আর বললেন: আল্লাহর কসম, আমি আর কখনো তা বন্ধ করব না।

সহিহ বুখারী ৪৭৫০সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

এই গল্প আপনাকে কী বলে

  • উত্তম চরিত্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় আপনজনের কাছে, আর সেই মানুষের সাথে, যে আপনাকে কষ্ট দিয়েছে।
  • প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে, যে ছিন্ন সম্পর্ক জোড়া লাগায় (সহিহ বুখারী ৫৯৯১)। আবু বকর (রা.) ঠিক তা-ই করেছিলেন।
  • যখন কাউকে ক্ষমা করতে কষ্ট হয়, নিজেকে আয়াতের প্রশ্নটাই করুন: আমি কি চাই না আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন?
  • এই ধাপে মা-বাবা, পরিবার, আত্মীয় আর প্রতিবেশীর হক শিখবেন, আর জিহ্বা ও রাগ সামলানোর উপায়।

এই ধাপ শেষে আপনি

  1. মা-বাবা, পরিবার, আত্মীয় ও প্রতিবেশীর হক জানবেন
  2. গীবত ও মিথ্যা চিনে জিহ্বা সংযত রাখবেন
  3. রাগের সময় সুন্নাহ অনুযায়ী নিজেকে সামলাবেন

এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া। হাদিসের মান মুহাদ্দিসদের রায় অনুযায়ী। সব মূল গ্রন্থ ও মিলিয়ে দেখার লিংক এক জায়গায়: সূত্র তালিকা।

চরিত্র দ্বীনের কতটা জুড়ে

আল্লাহ নবীজির (ﷺ) প্রশংসা করেছেন তাঁর মহান চরিত্রের জন্য।

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ

আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন ।

নবীজি (ﷺ) বলেছেন, সেরা মানুষ সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর; আর কিয়ামতের দিন মীযানে উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কিছু হবে না।

لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا وَكَانَ يَقُولُ ‏ "‏ إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلاَقًا

নবী (ﷺ) অশ্লীলভাষী ছিলেন না, ইচ্ছা করে অশ্লীল কথাও বলতেন না। তিনি বলতেন: তোমাদের মধ্যে সেরা তারা, যাদের চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।

সহিহ বুখারী ৩৫৫৯সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)

مَا شَيْءٌ أَثْقَلُ فِي مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ خُلُقٍ حَسَنٍ وَإِنَّ اللَّهَ لَيَبْغَضُ الْفَاحِشَ الْبَذِيءَ

কিয়ামতের দিন মুমিনের মীযানে উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী আর কিছু হবে না। আর আল্লাহ অশ্লীল ও কটুভাষীকে ঘৃণা করেন।

জামে আত-তিরমিযী ২০০২সহিহবর্ণনাকারী: আবু দারদা (রা.)

অর্থাৎ যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে কিন্তু মানুষকে কষ্ট দেয়, তার দ্বীন অসম্পূর্ণ। প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মানুষ নিরাপদ (সহিহ বুখারী ১০)।

মা-বাবা: আল্লাহর পরেই

আল্লাহ তাঁর ইবাদতের আদেশের ঠিক পরেই মা-বাবার সাথে সদাচরণের আদেশ দিয়েছেন। বিরক্ত হয়ে "উফ" বলাও নিষেধ।

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا

আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে 'উফ' বল না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল।

وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

আর মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত কর এবং বল, ‘হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।’

সদাচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার মা, তিনবার; তারপর বাবা।

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমার সদাচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন: তোমার মা। সে বলল: তারপর কে? তিনি বললেন: তোমার মা। সে বলল: তারপর কে? তিনি বললেন: তোমার মা। সে বলল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার বাবা।

সহিহ বুখারী ৫৯৭১সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ

রবের সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে, আর রবের অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে।

জামে আত-তিরমিযী ১৮৯৯সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)

মা-বাবা অমুসলিম হলেও তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে (সহিহ বুখারী ২৬২০)। শুধু আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে কারো কথা মানা যায় না (সূরা লুকমান ৩১:১৫, সহিহ বুখারী ৭২৫৭)। বিস্তারিত: মা-বাবা, আত্মীয় ও প্রতিবেশীর হক।

পরিবার, আত্মীয় ও প্রতিবেশী

  1. পরিবারের কাছে সবচেয়ে ভালো মানুষ হোন। নবীজি (ﷺ) ঘরের কাজে সাহায্য করতেন, আর কখনো স্ত্রী বা খাদেমকে মারেননি (সহিহ বুখারী ৬৭৬, সহিহ মুসলিম ২৩২৮)। পরিবারের জন্য যা খরচ করেন, তাতেও সওয়াব (সহিহ বুখারী ৫৬)।
  2. আত্মীয়তার সম্পর্ক জুড়ে রাখুন। এতে রিযিক ও আয়ু বাড়ে (সহিহ বুখারী ৫৯৮৬), আর সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না (সহিহ বুখারী ৫৯৮৪)।
  3. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেবেন না, পারলে উপকার করুন। জিবরীল (আ.) প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত উপদেশ দিতেন যে নবীজি (ﷺ) ভেবেছিলেন, প্রতিবেশীকে হয়তো উত্তরাধিকারী বানানো হবে (সহিহ বুখারী ৬০১৪)।
  4. সমাজে প্রতিটি মুসলিমের ছয় হক মনে রাখুন: সালাম, দাওয়াত গ্রহণ, পরামর্শ, হাঁচির জবাব, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া আর জানাজায় যাওয়া।

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لأَهْلِي

তোমাদের মধ্যে সেরা সে, যে তার পরিবারের কাছে সেরা; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে ভালো।

জামে আত-তিরমিযী ৩৮৯৫সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

এক মুসলিমের উপর আরেক মুসলিমের ছয়টি হক। জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, সেগুলো কী? তিনি বললেন: দেখা হলে সালাম দেবে; দাওয়াত দিলে গ্রহণ করবে; পরামর্শ চাইলে আন্তরিক পরামর্শ দেবে; হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে; অসুস্থ হলে দেখতে যাবে; আর মারা গেলে জানাজায় যাবে।

সহিহ মুসলিম ২১৬২সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

জিহ্বা: সবচেয়ে বেশি গুনাহ যেখান থেকে

যে জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, নবীজি (ﷺ) তার জন্য জান্নাতের জামিন হয়েছেন।

مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ

যে আমার কাছে তার দুই চোয়ালের মাঝের জিনিস (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মাঝের জিনিসের (লজ্জাস্থানের) হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।

সহিহ বুখারী ৬৪৭৪সহিহবর্ণনাকারী: সাহল ইবনু সাদ (রা.)

গীবত মানে কারও অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, এমনকি কথাটা সত্য হলেও। আর মিথ্যা হলে তা অপবাদ, আরও বড় গুনাহ।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: তোমরা কি জানো গীবত কী? সাহাবিরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: তোমার ভাইয়ের এমন আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে। জিজ্ঞেস করা হলো: আমি যা বলছি তা যদি সত্যিই আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে? তিনি বললেন: তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তাহলেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি না থাকে, তাহলে তুমি তার উপর অপবাদ দিলে।

সহিহ মুসলিম ২৫৮৯সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোনো কোনো অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণ্যই মনে কর। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।

সত্য বলা জান্নাতের পথ, আর মিথ্যা জাহান্নামের পথ (সহিহ বুখারী ৬০৯৪)। ঠাট্টা করেও মিথ্যা না বলা আর ঠিক হয়েও ঝগড়া ছেড়ে দেওয়ার জন্য জান্নাতে ঘরের সুসংবাদ আছে (সুনানে আবু দাউদ ৪৮০০)।

রাগ উঠলে কী করবেন

  1. "আঊযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতান" বলুন। নবীজি (ﷺ) বলেছেন, রাগী ব্যক্তি এটা বললে তার রাগ চলে যেত (সহিহ বুখারী ৩২৮২)।
  2. চুপ হয়ে যান। রাগের মাথায় বলা কথাই পরে সবচেয়ে বেশি আফসোস ডেকে আনে।
  3. মনে রাখুন, আসল শক্তি রাগ সামলানোয়। কুস্তিতে হারিয়ে দেওয়া নয়, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাই বীরত্ব (সহিহ বুখারী ৬১১৪)।
  4. ক্ষমা করার অভ্যাস করুন। যারা রাগ সংবরণ করে আর মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন (সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৪)।

أَوْصِنِي‏.‏ قَالَ ‏"‏ لاَ تَغْضَبْ

এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-কে বলল: আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন: রাগ কোরো না। লোকটি বারবার একই কথা জিজ্ঞেস করল, প্রতিবার তিনি বললেন: রাগ কোরো না।

সহিহ বুখারী ৬১১৬সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

নবীজির (ﷺ) জীবন থেকে: মসজিদে প্রস্রাব করা বেদুইন

এক বেদুইন না জেনে মসজিদে নববীর ভেতরেই প্রস্রাব করে ফেলল। সাহাবিরা রেগে তার দিকে তেড়ে গেলেন। নবীজি (ﷺ) তাদের থামালেন, লোকটিকে শেষ করতে দিলেন, তারপর পানি ঢেলে জায়গাটি পরিষ্কার করালেন।

أَعْرَابِيًّا، بَالَ فِي الْمَسْجِدِ، فَقَامُوا إِلَيْهِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ لا تُزْرِمُوهُ ‏"‏‏.‏ ثُمَّ دَعَا بِدَلْوٍ مِنْ مَاءٍ فَصُبَّ عَلَيْهِ‏

এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করে ফেলল। লোকেরা তার দিকে তেড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: তাকে মাঝপথে থামিয়ো না। তারপর এক বালতি পানি আনিয়ে সেখানে ঢেলে দিলেন।

সহিহ বুখারী ৬০২৫সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

আপনার জীবনে এর মানে: কারও ভুল দেখলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হোক ধৈর্য, আর শেখানোর পদ্ধতি হোক নরম। নবীজি (ﷺ) শিখিয়েছেন: সহজ করো, কঠিন কোরো না (সহিহ বুখারী ৬৯)। দ্বীনের পথে আসার পর পরিবার বা বন্ধুদের সাথে কঠোর হয়ে যাওয়া এই সুন্নাহর উল্টো।

কোন অবস্থায় কী করবেন

মা-বাবা দ্বীন পালনে বাধা দেন (যেমন নামাজ বা পর্দায়)। কী করব?

ফরজ ইবাদত ছাড়বেন না, কারণ আল্লাহর অবাধ্যতায় কারো আনুগত্য নেই (সহিহ বুখারী ৭২৫৭)। কিন্তু তাদের সাথে আচরণ থাকবে নরম ও সম্মানজনক; আল্লাহ শিরকের দিকে ডাকা মা-বাবার সাথেও দুনিয়ায় সদাচরণ করতে বলেছেন (সূরা লুকমান ৩১:১৫)। তর্ক না করে সুন্দর ব্যবহার আর তাদের জন্য দোয়া চালিয়ে যান (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৪)।

আত্মীয়রা খারাপ ব্যবহার করে, সম্পর্ক রাখতে চায় না। তবুও কি রাখতে হবে?

হ্যাঁ, যতটা সম্ভব। প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে, যার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলেও সে জোড়া লাগায় (সহিহ বুখারী ৫৯৯১)। সালাম, খোঁজখবর, বিপদে সাহায্য, এটুকু অন্তত রাখুন। তবে কেউ গুরুতর ক্ষতি করলে নিজেকে নিরাপদ রেখে দূরত্ব রাখা যায়।

কারও দোষ সত্যি হলে তা বলাও কি গীবত?

হ্যাঁ। নবীজি (ﷺ) স্পষ্ট বলেছেন, কথাটা সত্য হলেই গীবত, আর মিথ্যা হলে অপবাদ (সহিহ মুসলিম ২৫৮৯)। তবে জুলুমের বিচার চাওয়া বা বিয়ে-ব্যবসার মতো বিষয়ে কেউ পরামর্শ চাইলে প্রয়োজনমতো সত্য জানানো গীবতের মধ্যে পড়ে না; ইমাম নববী (রহ.) "রিয়াদুস সালেহীন"-এ এই ব্যতিক্রমগুলো উল্লেখ করেছেন।

কেউ আমার সামনে অন্যের গীবত করলে কী করব?

সুন্দরভাবে থামান বা অনুপস্থিত ভাইয়ের পক্ষে কথা বলুন। যে ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার চেহারা থেকে আগুন সরিয়ে দেবেন (জামে আত-তিরমিযী ১৯৩১)। না পারলে অন্তত সেখান থেকে উঠে যান।

প্রচলিত ভুল

✗ "যা বলছি সত্যিই তো, তাহলে গীবত হবে কেন?"

গীবতের সংজ্ঞাই হলো সত্য দোষ বলা; মিথ্যা হলে তা আরও বড় গুনাহ, অপবাদ (সহিহ মুসলিম ২৫৮৯)।

✗ "পরিবারের জন্য খরচ তো দুনিয়াবি কাজ, এতে কোনো সওয়াব নেই।"

আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে স্ত্রীর মুখে তুলে দেওয়া লোকমাতেও সওয়াব (সহিহ বুখারী ৫৬)। আর নবীজি (ﷺ) বলেছেন, পরিবারের জন্য খরচ করা দীনারের সওয়াবই সবচেয়ে বেশি (সহিহ মুসলিম ৯৯৫)।

✗ "যে আমার সাথে সম্পর্ক রাখে, আমিও শুধু তার সাথে রাখব।"

এটা বদলা, আসল সম্পর্ক রক্ষা নয়। প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে, যে ছিন্ন সম্পর্ক জোড়া লাগায় (সহিহ বুখারী ৫৯৯১)।

এই সপ্তাহের আমল

টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।

নিজেকে যাচাই করুন

সদাচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?

নবীজি (ﷺ) তিনবার মায়ের কথা বলেছেন, তারপর বাবার (সহিহ বুখারী ৫৯৭১)।

কারও সত্যিকারের দোষ তার অনুপস্থিতিতে বলা কী?

সত্য হলে গীবত, মিথ্যা হলে অপবাদ (সহিহ মুসলিম ২৫৮৯)।

রাগ উঠলে নবীজি (ﷺ) কোন বাক্য বলতে শিখিয়েছেন?

শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইলে রাগ চলে যায় (সহিহ বুখারী ৩২৮২)।

পরের ধাপ ৭দৈনন্দিন সুন্নাহ ও যিকিরগল্প: ফাতিমা (রা.)-এর ক্লান্ত হাত, আর খাদেমের চেয়ে উত্তম উপহার ›
deenpedia.com · https://deenpedia.com/poth/choritro/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার