কুরআন আল্লাহর বাণী, আর আমাদের জন্য তাঁর সরাসরি চিঠি। এই ধাপে লক্ষ্য একটাই: কুরআনকে প্রতিদিনের সঙ্গী বানানো। সঠিকভাবে পড়া শিখবেন, অল্প হলেও প্রতিদিন পড়বেন, অর্থ বুঝবেন, আর তা জীবনে আনবেন।
গল্প দিয়ে শুরু
উসাইদ (রা.)-এর রাতের তিলাওয়াত, আর আকাশ থেকে নেমে আসা আলো
মদিনার এক রাত। সাহাবি উসাইদ ইবনু হুদাইর (রা.) তাঁর উঠানে বসে সূরা আল-বাকারা পড়ছেন। পাশে বাঁধা তাঁর ঘোড়া, কাছেই ঘুমিয়ে আছে ছোট ছেলে ইয়াহইয়া।
হঠাৎ ঘোড়াটা অস্থির হয়ে লাফাতে লাগল। তিনি থামলেন, ঘোড়াও শান্ত হলো। আবার পড়লেন, ঘোড়া আবার লাফাল। এভাবে কয়েকবার। ছেলেকে মাড়িয়ে দেবে এই ভয়ে তিনি উঠে গেলেন, আর মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন এক আশ্চর্য দৃশ্য: ছাউনির মতো কিছু একটা, তাতে বাতির মতো অসংখ্য আলো, ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে, তারপর মিলিয়ে গেল।
সকালে তিনি নবীজির (ﷺ) কাছে ঘটনাটি বললেন। নবীজি (ﷺ) যা বললেন, তা শুনলে কুরআন পড়ার আগ্রহ বেড়ে যায়:
উসাইদের তিলাওয়াত শুনতে নেমে এলেন ফেরেশতারাসহিহ মুসলিম ৭৯৬ · সহিহ · পুরো হাদিস পড়ুন
এক রাতে উসাইদ ইবনু হুদাইর (রা.) তাঁর খেজুর শুকানোর উঠানে কুরআন পড়ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ঘোড়া লাফাতে লাগল। তিনি পড়তে থাকলেন, ঘোড়া আবার লাফাল। আবার পড়লেন, আবারও লাফাল। উসাইদ বলেন: আমার ভয় হলো, ঘোড়াটি (আমার ছেলে) ইয়াহইয়াকে মাড়িয়ে দেবে। আমি ঘোড়ার দিকে উঠে গেলাম। তখন দেখি, আমার মাথার উপর ছাউনির মতো কিছু, তাতে বাতির মতো আলো। সেটা আকাশে উঠে গেল, শেষে আর দেখতে পেলাম না। সকালে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে গিয়ে সব বললাম। প্রতিবার তিনি বলছিলেন: পড়তে থাকতে, হে ইবনু হুদাইর! … রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: ওরা ছিল ফেরেশতা, তোমার তিলাওয়াত শুনছিল। তুমি পড়তে থাকলে সকালে মানুষ তাদের দেখতে পেত, তারা আড়ালে যেত না।
সহিহ মুসলিম ৭৯৬সহিহবর্ণনাকারী: আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.), উসাইদ ইবনু হুদাইর (রা.) থেকে
ফেরেশতারা আকাশ থেকে নেমে এসেছিলেন একজন মানুষের তিলাওয়াত শুনতে। আর যে কুরআনের নিয়মিত সাথী, কিয়ামতের দিন সেই কুরআনই তার পক্ষে সুপারিশ করবে (সহিহ মুসলিম ৮০৪)।
এই গল্প আপনাকে কী বলে
আপনার ঘরে যখন কুরআন পড়া হয়, তা শুধু আপনার ঘরের ঘটনা নয়; আসমানের অধিবাসীরাও তা শোনে।
উসাইদ (রা.) পড়ছিলেন রাতে, একা, নিজের উঠানে। কুরআনের সাথে সবচেয়ে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয় এমন নীরব, নিয়মিত মুহূর্তে।
আজ রাতে ঘুমানোর আগে পাঁচ মিনিট হলেও কুরআন পড়ুন। যা পারেন, যেভাবে পারেন; আটকে আটকে পড়লেও দুটি সওয়াব (সহিহ মুসলিম ৭৯৮)।
এই ধাপ শেষে আপনি
প্রতিদিনের কুরআনের একটি সময় ও পরিমাণ ঠিক করবেন
আরবি পড়া শেখার প্রথম পা ফেলবেন
অর্থ বুঝে পড়া ও আমলের অভ্যাস শুরু করবেন
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া। হাদিসের মান মুহাদ্দিসদের রায় অনুযায়ী। সব মূল গ্রন্থ ও মিলিয়ে দেখার লিংক এক জায়গায়: সূত্র তালিকা।
কুরআন কী, আর কেন প্রতিদিন
কুরআন মানুষের জন্য পথনির্দেশ। আল্লাহ বলেছেন, এই কুরআন সবচেয়ে সঠিক পথ দেখায়।
কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অভিযোগ করবেন, তাঁর জাতি কুরআনকে পরিত্যক্ত করে রেখেছিল (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৩০)। তাই প্রশ্নটা হলো: আমি কি কুরআন পড়ি, বুঝি আর মানি, নাকি শুধু তাকে তুলে রাখি?
কুরআনের সাথে থাকার পুরস্কার
যে কুরআন শেখে ও শেখায়, নবীজি (ﷺ) তাকে সবচেয়ে ভালো মানুষ বলেছেন।
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
তোমাদের মধ্যে সেরা সে, যে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।
যে আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পড়ে, তার জন্য একটি নেকি, আর একটি নেকি দশ গুণ। আমি বলি না "আলিফ-লাম-মীম" একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, মীম একটি হরফ।
আর যে কুরআনের নিয়মিত সাথী, কিয়ামতের দিন কুরআন নিজেই তার জন্য সুপারিশ করবে। জান্নাতে তাকে বলা হবে, পড়তে থাকো আর উপরে উঠতে থাকো (সুনানে আবু দাউদ ১৪৬৪)।
সঠিকভাবে পড়া শিখুন। আরবি হরফ থেকে শুরু করে তাজবীদ পর্যন্ত আমাদের কুরআন পড়া শিখুন পাঠগুলো ধাপে ধাপে সাজানো। সাহাবিরাও দক্ষ শিক্ষকের কাছে শুনে শিখতেন (সহিহ বুখারী ৪৯৯৯), তাই সম্ভব হলে একজন শিক্ষকের কাছে পড়া শুনিয়ে নিন। আটকে আটকে পড়লেও হতাশ হবেন না, আপনার জন্য দুটি সওয়াব।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটু পড়ুন। সময়টা ঠিক করে নিন, যেমন ফজরের পর বা ঘুমানোর আগে। পরিমাণ ছোট হোক, কিন্তু বাদ যেন না পড়ে; অল্প হলেও নিয়মিত আমলই আল্লাহর কাছে প্রিয় (সহিহ বুখারী ৬৪৬৪)। পড়বেন ধীরে, স্পষ্ট করে (সূরা আল-মুযযাম্মিল ৭৩:৪)।
অর্থ বুঝুন, চিন্তা করুন। প্রতিদিন অন্তত কয়েকটি আয়াতের অর্থ পড়ুন। আমাদের সাইটে পুরো কুরআন বাংলা অর্থসহ আছে। আগে নামাজে যে সূরাগুলো পড়েন, সেগুলোর অর্থ জানুন: নামাজের সূরা।
আমল করুন। যে আয়াত পড়লেন, সেটা আজ জীবনে কোথায় আনা যায়, ভাবুন। কুরআনের আসল হক এটাই।
এক পারা (প্রায় ২০ পৃষ্ঠা); এতে মাসে একবার খতম হয়
পড়া অংশের কিছু অর্থ ও তাফসীর
নবীজি (ﷺ) আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)-কে প্রথমে মাসে একবার খতম করতে বলেছিলেন। তিনি বেশি পারবেন বলায় সাত দিন পর্যন্ত অনুমতি দিয়েছেন, আর তিন দিনের কমে খতম করতে নিষেধ করেছেন, কারণ তাতে বোঝা হয় না (সুনানে আবু দাউদ ১৩৯০)।
(নবীজি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন) তুমি কীভাবে রোজা রাখো? বললাম: প্রতিদিন। বললেন: কীভাবে খতম করো? বললাম: প্রতি রাতে। তিনি বললেন: প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখো, আর প্রতি মাসে একবার কুরআন খতম করো। … (আমি বারবার বললাম, আরও বেশি পারব; শেষে তিনি বললেন) সবচেয়ে উত্তম রোজা দাউদ (আ.)-এর রোজা: একদিন রোজা, একদিন বিরতি। আর প্রতি সাত রাতে একবার খতম করো। … (বুড়ো বয়সে আবদুল্লাহ বলতেন) হায়! যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দেওয়া ছাড়টা গ্রহণ করে নিতাম।
নবীজির (ﷺ) জীবনই ছিল কুরআনের জীবন্ত রূপ। আয়েশা (রা.)-কে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এক কথায় উত্তর দিয়েছেন।
أَنْبِئِينِي عَنْ خُلُقِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم . قَالَتْ أَلَسْتَ تَقْرَأُ الْقُرْآنَ قُلْتُ بَلَى . قَالَتْ فَإِنَّ خُلُقَ نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ الْقُرْآنَ
(সাদ ইবনু হিশাম বলেন) আমি বললাম: হে উম্মুল মুমিনীন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চরিত্র সম্পর্কে আমাকে বলুন। তিনি বললেন: তুমি কি কুরআন পড়ো না? বললাম: অবশ্যই পড়ি। তিনি বললেন: আল্লাহর নবী (ﷺ)-এর চরিত্র ছিল কুরআন।
সহিহ মুসলিম ৭৪৬সহিহবর্ণনাকারী: সাদ ইবনু হিশাম, আয়েশা (রা.) থেকে
কুরআন উপদেশ নেওয়ার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছে (সূরা আল-কামার ৫৪:১৭)। তবে বিধান বের করার মতো গভীর বিষয়ে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নির্ভরযোগ্য তাফসীর পড়ুন, আর আলেমদের জিজ্ঞেস করুন (সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩)।
নবীজির (ﷺ) জীবন থেকে: "আমাকে কুরআন পড়ে শোনাও"
যাঁর উপর কুরআন নাজিল হয়েছে, তিনিই একদিন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.)-কে বললেন, আমাকে পড়ে শোনাও। একটি আয়াতে এসে তাঁর চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল।
নবী (ﷺ) আমাকে বললেন: আমাকে কুরআন পড়ে শোনাও। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে পড়ে শোনাব, অথচ আপনার উপরই তো তা নাজিল হয়েছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি সূরা আন-নিসা পড়তে লাগলাম। যখন এই আয়াতে পৌঁছলাম: "তখন কী অবস্থা হবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী আনব, আর আপনাকে আনব এদের উপর সাক্ষী হিসেবে?" তিনি বললেন: এখন যথেষ্ট। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি, তাঁর দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরছে।
আপনার জীবনে এর মানে: কুরআন শোনাও ইবাদত, আর কুরআন অন্তর ছোঁয়ার জন্য। পড়া শিখতে সময় লাগলে ততদিন ভালো ক্বারির তিলাওয়াত অর্থসহ শুনুন। আর যে আয়াতে আখিরাতের কথা আসে, একটু থেমে নিজেকে সেখানে কল্পনা করুন।
কোন অবস্থায় কী করবেন
আরবি একদমই পড়তে পারি না। কী করব?
আজই শুরু করুন, বয়স যা-ই হোক। আটকে আটকে কষ্ট করে যে পড়ে, তার জন্য দুটি সওয়াব (সহিহ মুসলিম ৭৯৮)। আমাদের কুরআন পড়া শিখুন পাঠ দিয়ে হরফ চেনা শুরু করুন। শেখার পাশাপাশি তিলাওয়াত শুনুন আর বাংলা অর্থ পড়ুন, যাতে কুরআনের সাথে সম্পর্ক এখনই শুরু হয়।
অজু ছাড়া কি কুরআন পড়া যায়?
মুখস্থ থেকে বা স্ক্রিনে দেখে পড়তে অজু শর্ত নয়। নবীজি (ﷺ) রাতে ঘুম থেকে উঠে অজুর আগেই সূরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পড়েছেন (সহিহ বুখারী ১৮৩)। তবে কাগজের মুসহাফ (কুরআনের কপি) হাতে ছোঁয়ার জন্য অধিকাংশ আলেম অজু জরুরি বলেছেন; দলিল আমর ইবনু হাযমের চিঠির হাদিস: "পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না" (মুয়াত্তা মালিক; আলবানী: সহিহ)। আর ফরজ গোসল বাকি থাকলে অধিকাংশ আলেমের মতে আগে গোসল করে তারপর তিলাওয়াত করবেন।
অর্থ না বুঝে পড়লে কি সওয়াব হয়?
হ্যাঁ, প্রতিটি হরফে নেকি আছে (জামে আত-তিরমিযী ২৯১০)। তবে কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য চিন্তা ও উপদেশ নেওয়া (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৯)। তাই তিলাওয়াতের পাশাপাশি অল্প অল্প করে অর্থ বোঝাকেও প্রতিদিনের অংশ বানান।
কত দিনে একবার খতম করা উচিত?
নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ফরজ নয়। নবীজি (ﷺ) মাসে একবার দিয়ে শুরু করতে বলেছেন, সর্বোচ্চ সাত দিনে, আর তিন দিনের কমে নিষেধ করেছেন (সহিহ বুখারী ৫০৫২, সুনানে আবু দাউদ ১৩৯০)। নতুনদের জন্য খতমের চেয়ে বড় লক্ষ্য হলো প্রতিদিন না থেমে পড়া।
কুরআন নাজিল হয়েছে জীবিতদের সতর্ক করতে আর পথ দেখাতে (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৭০)। মৃত্যুর পর টাকা দিয়ে খতম পড়ানো বা নির্দিষ্ট দিনে জমায়েত করে পড়ানোর প্রথা নবীজি (ﷺ) বা সাহাবিদের থেকে প্রমাণিত নয়। মৃতের জন্য সবচেয়ে বড় উপকার দোয়া, সদকা আর তার রেখে যাওয়া ভালো কাজ (সহিহ মুসলিম ১৬৩১)।
✗ "কুরআনের অর্থ বোঝা শুধু আলেমদের কাজ, সাধারণ মানুষের নয়।"
আল্লাহ কুরআনকে উপদেশের জন্য সহজ করেছেন, আর সবাইকে চিন্তা করতে বলেছেন (সূরা আল-কামার ৫৪:১৭, সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৪)। অর্থ পড়া ও বোঝা সবার জন্য। তবে বিধান বের করা বা কঠিন আয়াতের ব্যাখ্যায় নির্ভরযোগ্য তাফসীর ও আলেমদের সাহায্য নিন (সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩)।
এই বর্ণনাটি তিরমিযী (২৮৮৭) এনেছেন, কিন্তু নিজেই একে "গরীব" বলেছেন আর এর এক বর্ণনাকারী হারূন আবু মুহাম্মাদকে অপরিচিত (মাজহূল) বলেছেন। আলবানী একে জাল (মাওযূ) বলেছেন। সহিহ হাদিসে যে ফজিলত আছে তা হলো: সূরা ইখলাস কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান (সহিহ বুখারী ৫০১৩)।
এই সপ্তাহের আমল
টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।
নিজেকে যাচাই করুন
কুরআনের একটি হরফ পড়লে কত নেকি?
একটি হরফে একটি নেকি, আর একটি নেকি দশ গুণ (জামে আত-তিরমিযী ২৯১০)।
যে আটকে আটকে কষ্ট করে কুরআন পড়ে, তার কী হবে?
কষ্ট করে যে পড়ে, তার জন্য দুটি সওয়াব (সহিহ মুসলিম ৭৯৮)।
নবীজি (ﷺ) প্রথমে কত দিনে একবার কুরআন খতম করতে বলেছিলেন?