নবীদের জীবনী · কালীমুল্লাহ, উলুল আযম রাসূল
মূসা (আ.)
مُوسَى
কুরআনে সবচেয়ে বেশি বার এসেছে মূসা (আ.)-এর নাম। আল্লাহ তাঁর সাথে সরাসরি কথা বলেছেন, তাঁকে তাওরাত দিয়েছেন। জালিম শাসক ফিরআউনের ঘরেই তিনি বড় হয়েছেন, পরে সেই ফিরআউনের সামনে দাঁড়িয়ে এক আল্লাহর দাওয়াত দিয়েছেন। শেষে আল্লাহ সাগর ভাগ করে বনী ইসরাঈলকে বাঁচিয়েছেন আর ফিরআউনকে ডুবিয়ে দিয়েছেন।
এই পাতার ঘটনা শুধু কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া; ইসরাঈলি বর্ণনা বা লোকমুখের গল্প রাখা হয়নি। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
- পরিচয়
- আল্লাহ যাঁর সাথে সরাসরি কথা বলেছেন (সূরা আন-নিসা ৪:১৬৪)
- কিতাব
- তাওরাত, ফলকে লেখা উপদেশ (সূরা আল-আরাফ ৭:১৪৫)
- সহযোগী
- ভাই হারুন (আ.), যিনিও নবী
- কুরআনে যেখানে
- সূরা আল-কাসাস, ত্ব-হা, আশ-শুআরা, আল-আরাফ, ইউনুস সহ বহু সূরায়
জীবনের রোডম্যাপ: শুরু থেকে শেষ
- ১জন্ম
ফিরআউনের শিশুহত্যার যুগে জন্ম; আল্লাহর নির্দেশে মা তাঁকে নদীতে ভাসিয়ে দেন (সূরা আল-কাসাস ২৮:৭)।
- ২বেড়ে ওঠা
ফিরআউনের ঘরে লালিত, তবে দুধ পান করেছেন নিজের মায়ের কাছে (সূরা আল-কাসাস ২৮:১৩)।
- ৩মাদইয়ানে
অনিচ্ছাকৃত হত্যার পর মাদইয়ানে হিজরত, সেখানে বিয়ে ও আট-দশ বছর কাজ (সূরা আল-কাসাস ২৮:২২, সূরা আল-কাসাস ২৮:২৭)।
- ৪নবুয়ত
তূর পাহাড়ের কাছে আল্লাহর সাথে কথা ও রিসালাত লাভ (সূরা আল-কাসাস ২৮:৩০, সূরা ত্বা-হা ২০:১৩)।
- ৫ফিরআউনের সাথে সংগ্রাম
দাওয়াত, জাদুকরদের ঈমান, সাগর পার হওয়া ও ফিরআউনের পতন (সূরা ত্বা-হা ২০:৭০, সূরা আশ-শুআরা ২৬:৬৩, সূরা ইউনুস ১০:৯০)।
- ৬তাওরাত ও বনী ইসরাঈল
চল্লিশ রাত পর তাওরাত লাভ (সূরা আল-আরাফ ৭:১৪২, সূরা আল-আরাফ ৭:১৪৫), বাছুর পূজার পরীক্ষা, চল্লিশ বছর মরুভূমিতে ঘোরা (সূরা আল-মায়িদা ৫:২৬)।
- ৭ইন্তেকাল
মালাকুল মাওত এলে শেষে আল্লাহর সাক্ষাৎ বেছে নেন, আর পবিত্র ভূমির কাছে মৃত্যুর দোয়া করেন (সহিহ বুখারী ৩৪০৭)।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা
১নদীতে ভাসানো শিশু
ফিরআউন বনী ইসরাঈলের ছেলে শিশুদের হত্যা করত। আল্লাহ মূসা (আ.)-এর মাকে নির্দেশ দিলেন, ভয় হলে শিশুকে নদীতে ভাসিয়ে দিতে, আর প্রতিশ্রুতি দিলেন তাঁকে ফিরিয়ে দেবেন ও রাসূল বানাবেন।
وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ أُمِّ مُوسَىٰ أَنْ أَرْضِعِيهِ ۖ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي ۖ إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ
আর মূসা-জননীর প্রতি আমরা নির্দেশ দিলাম, ‘তাকে দুধ পান করাও। যখন তুমি তার সম্পর্কে কোনো আশংকা করবে, তখন একে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, পেরেশানও হয়ো না। আমরা অবশ্যই একে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং একে রাসূলদের একজন করব।’
ফিরআউনের লোকেরাই শিশুটিকে তুলে নিল। আর আল্লাহ তাঁকে তাঁর মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন, যেন মায়ের চোখ জুড়ায় আর তিনি জানেন আল্লাহর ওয়াদা সত্য।
فَالْتَقَطَهُ آلُ فِرْعَوْنَ لِيَكُونَ لَهُمْ عَدُوًّا وَحَزَنًا ۗ إِنَّ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا كَانُوا خَاطِئِينَ
তারপর ফির‘আউনের লোকজন তাকে কুড়িয়ে নিল। এর পরিণাম তো এ ছিল যে, সে তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হবে। নিঃসন্দেহে ফির‘আউন, হামান ও তাদের বাহিনী ছিল অপরাধী।
فَرَدَدْنَاهُ إِلَىٰ أُمِّهِ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَلِتَعْلَمَ أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
অতঃপর আমরা তাকে ফিরিয়ে দিলাম তার জননীর কাছে, যাতে তার চোখ জুড়ায় এবং সে দুঃখ না করে, আর সে জেনে নেয় যে, আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি সত্য; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এটা জানে না।
২ভুল, তাওবা ও মাদইয়ানে হিজরত
যুবক বয়সে এক ঝগড়া থামাতে গিয়ে তাঁর ঘুষিতে একজন মারা গেল। তিনি সাথে সাথে একে শয়তানের কাজ বলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন, আল্লাহ ক্ষমা করলেন।
وَدَخَلَ الْمَدِينَةَ عَلَىٰ حِينِ غَفْلَةٍ مِّنْ أَهْلِهَا فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلَانِ هَـٰذَا مِن شِيعَتِهِ وَهَـٰذَا مِنْ عَدُوِّهِ ۖ فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِن شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ فَوَكَزَهُ مُوسَىٰ فَقَضَىٰ عَلَيْهِ ۖ قَالَ هَـٰذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ ۖ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُّضِلٌّ مُّبِينٌ
আর তিনি নগরীতে প্রবেশ করলেন, যখন এর অধিবাসীরা ছিল অসতর্ক। সেখানে তিনি দুটি লোককে সংঘর্ষে লিপ্ত দেখলেন, একজন তার নিজ দলের এবং অন্যজন তার শক্রদলের। অতঃপর মূসার দলের লোকটি ওর শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল, তখন মূসা তাকে ঘুষি মারলেন; এভাবে তিনি তাকে হত্যা করে বসলেন। মূসা বললেন, ‘এটা শয়তানের কাণ্ড। সে তো প্ৰকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী।’
قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! আমি তো আমার নিজের প্রতি যুলুম করেছি; কাজেই আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’ অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তারপর প্রাণের ভয়ে তিনি মিসর ছেড়ে মাদইয়ানের পথে বের হলেন, আল্লাহর কাছে সঠিক পথের আশা নিয়ে।
فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ ۖ قَالَ رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
তখন তিনি ভীত সতর্ক অবস্থায় সেখান থেকে বের হয়ে পড়লেন এবং বললেন, ‘হে আমার রব! আপনি যালিম সম্পপ্ৰদায় থেকে আমাকে রক্ষা করুন।’
وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَاءَ مَدْيَنَ قَالَ عَسَىٰ رَبِّي أَن يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبِيلِ
আর যখন মূসা মাদ্ইয়ান অভিমুখে যাত্রা করলেন তখন বললেন, ‘আশা করি আমার রব আমাকে সরল পথ দেখাবেন।’
৩মাদইয়ানে বিয়ে
মাদইয়ানে পৌঁছে দেখলেন দুই নারী পশুদের পানি খাওয়াতে পারছেন না। তিনি নিজে পানি তুলে দিলেন, তারপর ছায়ায় বসে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন জানালেন। মেয়েদের বৃদ্ধ পিতা তাঁকে ডেকে আনলেন, আর আট বা দশ বছর কাজের বিনিময়ে এক মেয়েকে তাঁর সাথে বিয়ে দিলেন।
وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِّنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِن دُونِهِمُ امْرَأَتَيْنِ تَذُودَانِ ۖ قَالَ مَا خَطْبُكُمَا ۖ قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّىٰ يُصْدِرَ الرِّعَاءُ ۖ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ
আর যখন তিনি মাদ্য়ানের কূপের কাছে পৌঁছলেন, দেখতে পেলেন, একদল লোক তাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করাচ্ছে এবং তাদের পিছনে দুজন নারী তাদের পশুগুলোকে আগলে রাখছে। মূসা বললেন, ‘তোমাদের কী ব্যাপার?’ তারা বলল, ‘আমরা আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ রাখালেরা তাদের জানোয়ারগুলোকে নিয়ে সরে না যায়। আর আমাদের পিতা খুব বৃদ্ধ।’
فَسَقَىٰ لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّىٰ إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
মুসা তখন তাদের পক্ষে জানোয়ারগুলোকে পানি পান করালেন। তারপর তিনি ছায়ার নীচে আশ্রয় গ্রহন করে বললেন, ‘হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন আমি তার কাঙ্গাল।’
فَجَاءَتْهُ إِحْدَاهُمَا تَمْشِي عَلَى اسْتِحْيَاءٍ قَالَتْ إِنَّ أَبِي يَدْعُوكَ لِيَجْزِيَكَ أَجْرَ مَا سَقَيْتَ لَنَا ۚ فَلَمَّا جَاءَهُ وَقَصَّ عَلَيْهِ الْقَصَصَ قَالَ لَا تَخَفْ ۖ نَجَوْتَ مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
তখন নারী দুজনের একজন শরম-জড়িত পায়ে তার কাছে আসল এবং বলল, ‘আমার পিতা আপনাকে আমন্ত্রণ করছেন, আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করানোর পারিশ্রমিক দেয়ার জন্য।’ অতঃপর মূসা তার কাছে এসে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলে তিনি বললেন, ‘ভয় করো না, তুমি যালিম সম্প্রদায়ের কবল থেকে বেঁচে গেছ।’
قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ ۖ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ
নারীদ্বয়ের একজন বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনি একে মজুর নিযুক্ত করুন, কারণ আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সে ব্যক্তি, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত।’
قَالَ إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أُنكِحَكَ إِحْدَى ابْنَتَيَّ هَاتَيْنِ عَلَىٰ أَن تَأْجُرَنِي ثَمَانِيَ حِجَجٍ ۖ فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَشْرًا فَمِنْ عِندِكَ ۖ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أَشُقَّ عَلَيْكَ ۚ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ
তিনি মূসাকে বললেন, ‘আমি আমার এ কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই এ শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করবে, আর যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ কর, সে তোমার ইচ্ছে। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে তুমি আমাকে সদাচারী পাবে।’
قَالَ ذَٰلِكَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ ۖ أَيَّمَا الْأَجَلَيْنِ قَضَيْتُ فَلَا عُدْوَانَ عَلَيَّ ۖ وَاللَّهُ عَلَىٰ مَا نَقُولُ وَكِيلٌ
মূসা বললেন, ‘আমার ও আপনার মধ্যে এ চুক্তিই রইল। এ দুটি মেয়াদের কোনো একটি আমি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকবে না। আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি আল্লাহ্ তার কর্মবিধায়ক।’
৪তূর পাহাড়ে নবুয়ত
বহু বছর পর পরিবার নিয়ে ফেরার পথে তূর পাহাড়ের দিকে আগুন দেখে এগিয়ে গেলেন। সেখানে আল্লাহ তাঁকে ডেকে বললেন: আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমার ইবাদত করুন আর আমার স্মরণে নামাজ কায়েম করুন।
فَلَمَّا قَضَىٰ مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ بِأَهْلِهِ آنَسَ مِن جَانِبِ الطُّورِ نَارًا قَالَ لِأَهْلِهِ امْكُثُوا إِنِّي آنَسْتُ نَارًا لَّعَلِّي آتِيكُم مِّنْهَا بِخَبَرٍ أَوْ جَذْوَةٍ مِّنَ النَّارِ لَعَلَّكُمْ تَصْطَلُونَ
অতঃপর মূসা যখন তার মেয়াদ পূর্ণ করার পর সপরিবারে যাত্রা করলেন তখন তিনি তূর পর্বতের দিকে আগুন দেখতে পেলেন। তিনি তার পরিজনবৰ্গকে বললেন, ‘তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখেছি, সম্ভবত আমি সেখান থেকে তোমাদের জন্য খবর আনতে পারি অথবা একখণ্ড জ্বলন্ত কাঠ আনতে পারি যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পার।’
فَلَمَّا أَتَاهَا نُودِيَ مِن شَاطِئِ الْوَادِ الْأَيْمَنِ فِي الْبُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ أَن يَا مُوسَىٰ إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
অতঃপর যখন মূসা আগুনের কাছে পৌঁছলেন তখন উপত্যকার ডান পাশে বরকতময় ভূমির উপর অবস্থিত সুনির্দিষ্ট গাছের দিক থেকে তাকে ডেকে বলা হল, ‘হে মূসা! আমিই আল্লাহ্, সৃষ্টিকুলের রব;’
وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَىٰ
‘আর আমি আপনাকে মনোনীত করেছি। অতএব যা ওহী পাঠানো হচ্ছে আপনি তা মনোযোগের সাথে শুনুন।
إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي
‘আমি আল্লাহ্ আমি ছাড়া অন্য কোনো হক ইলাহ নেই। অতএব, আমারই ইবাদাত করুন এবং আমার স্মরণার্থে সালাত আদায় করুন।
তাঁর হাতের লাঠি আল্লাহর আদেশে সাপ হয়ে গেল, এটি ছিল তাঁর অন্যতম নিদর্শন।
وَمَا تِلْكَ بِيَمِينِكَ يَا مُوسَىٰ
আর হে মুসা! আপনার ডান হাতে সেটা কি?’
قَالَ هِيَ عَصَايَ أَتَوَكَّأُ عَلَيْهَا وَأَهُشُّ بِهَا عَلَىٰ غَنَمِي وَلِيَ فِيهَا مَآرِبُ أُخْرَىٰ
মূসা বললেন, ‘এটা আমার লাঠি; আমি এতে ভর দেই এবং এর দ্বারা আঘাত করে আমি আমার মেষপালের জন্য গাছের পাতা ফেলে থাকি আর এটা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে।’
قَالَ أَلْقِهَا يَا مُوسَىٰ
আল্লাহ্ বলেন, ‘হে মুসা! আপনি তা নিক্ষেপ করুন।’
فَأَلْقَاهَا فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ
তারপর তিনি তা নিক্ষেপ করলেন, সংগে সংগে সেটা সাপ হয়ে ছুটতে লাগল,
قَالَ خُذْهَا وَلَا تَخَفْ ۖ سَنُعِيدُهَا سِيرَتَهَا الْأُولَىٰ
আল্লাহ্ বললেন, ‘আপনি তাকে ধরুন, ভয় করবেন না, আমরা এটাকে তার আগের রূপে ফিরিয়ে দেব।
৫ফিরআউনের কাছে, নরম ভাষায়
আল্লাহ তাঁকে সীমালঙ্ঘনকারী ফিরআউনের কাছে যেতে বললেন। মূসা (আ.) দোয়া করলেন বুক প্রশস্ত হওয়ার, কাজ সহজ হওয়ার ও জিহ্বার জড়তা দূর হওয়ার জন্য।
اذْهَبْ إِلَىٰ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَىٰ
‘ফির’আউনের কাছে যান, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে।’
قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي
মুসা বললেন, ‘হে আমার রব! আমার বক্ষ সম্প্রসারিত করে দিন।
وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي
‘এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।
وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي
‘আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দিন---
يَفْقَهُوا قَوْلِي
‘যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।
সবচেয়ে বড় জালিমের কাছেও আল্লাহ নরম কথা বলার নির্দেশ দিলেন।
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ
‘আপনারা তার সাথে নরম কথা বলবেন, হয়ত সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।
قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ
ফির‘আউন বলল, ‘সৃষ্টিকুলের রব আবার কী?’
قَالَ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا ۖ إِن كُنتُم مُّوقِنِينَ
মূসা বললেন, ‘তিনি আসমানসমূহ ও যমীন এবং তাদের মধ্যবর্তী সব কিছুর রব, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও।’
৬জাদুকরদের ঈমান
ফিরআউন সারা দেশের জাদুকর জড়ো করল। তাদের দড়ি-লাঠি জাদুর প্রভাবে ছুটছে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু সত্য দেখার পর জাদুকররা সিজদায় পড়ে ঈমান আনল, ফিরআউনের ভয়ংকর হুমকিও তাদের টলাতে পারেনি।
قَالَ بَلْ أَلْقُوا ۖ فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِن سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَىٰ
মূসা বললেন, ‘বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। অতঃপর তাদের জাদু-প্রভাবে হঠাৎ মূসার মনে হল তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো ছুটোছুটি করছে।
فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سُجَّدًا قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ هَارُونَ وَمُوسَىٰ
অতঃপর জাদুকরেরা সাজদাবনত হও, তার বলল, ‘আমরা হারুন ও মূসার রবের প্রতি ঈমান আনলাম।
قَالَ آمَنتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ ۖ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ ۖ فَلَأُقَطِّعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُم مِّنْ خِلَافٍ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ وَلَتَعْلَمُنَّ أَيُّنَا أَشَدُّ عَذَابًا وَأَبْقَىٰ
ফির’আউন বলল, ‘আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার আগেই তোমরা মূসার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলে! সে তো তোমাদের প্রধান যে তোমাদেরকে জাদু শিক্ষা দিয়েছে। কাজেই আমি তো তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কাটবই এবং আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শুলিবিদ্ধ করবই আর তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে আমাদের মধ্যে কার শাস্তি কঠোরতর ও অধিক স্থায়ী।
৭সাগর ভাগ ও ফিরআউনের পরিণতি
বনী ইসরাঈলকে নিয়ে বের হওয়ার পর ফিরআউনের বাহিনী পিছু নিল। সামনে সাগর দেখে সঙ্গীরা বলল, আমরা ধরা পড়ে গেলাম। মূসা (আ.) বললেন: কখনো না, আমার রব আমার সাথে আছেন।
فَلَمَّا تَرَاءَى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَىٰ إِنَّا لَمُدْرَكُونَ
অতঃপর যখন দু‘দল পরস্পরকে দেখল, তখন মূসার সঙ্গীরা বলল, ‘আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!’
قَالَ كَلَّا ۖ إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ
মূসা বললেন, ‘কখনই নয়! আমার সঙ্গে আছেন আমার রব; সত্বর তিনি আমাকে পথনির্দেশ করবেন।’
আল্লাহর আদেশে লাঠির আঘাতে সাগর ভাগ হয়ে গেল, মুমিনরা পার হলো, আর ফিরআউনের বাহিনী ডুবে গেল।
فَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ مُوسَىٰ أَنِ اضْرِب بِّعَصَاكَ الْبَحْرَ ۖ فَانفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ
অতঃপর আমরা মূসার প্রতি ওহী করলাম যে, আপনার লাঠি দ্বারা সাগরে আঘাত করুন। ফলে তা বিভক্ত প্ৰত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতের মত হয়ে গেল;
وَأَنجَيْنَا مُوسَىٰ وَمَن مَّعَهُ أَجْمَعِينَ
এবং আমরা উদ্ধার করলাম মূসা ও তার সঙ্গী সকলকে,
ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ
তারপর নিমজ্জিত করলাম অন্য দলটিকে।
ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে ফিরআউন ঈমানের কথা বলল, কিন্তু তখন আর তা কাজে আসেনি। আল্লাহ তার দেহ পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হিসেবে রেখে দিলেন।
وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوًا ۖ حَتَّىٰ إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنتُ أَنَّهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ
আর আমরা বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করালাম। আর ফির’আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য সহকারে সীমালংঘন করে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। পরিশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল তখন বলল, ‘আমি ঈমান আনলাম যে, নিশ্চয় তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ্ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।
فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً ۚ وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ عَنْ آيَاتِنَا لَغَافِلُونَ
‘সুতরাং আজ আমরা তোমার দেহটি রক্ষা করব যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাক। আর নিশ্চয় মানুষের মধ্যে অনেকেই আমাদের নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল।
এই মুক্তির দিন ছিল আশুরা। নবী (ﷺ) সেই দিন রোজা রেখেছেন এবং রাখতে বলেছেন।
নবী (ﷺ) মদীনায় এসে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখে। তিনি বললেন: এটা কী? তারা বলল: এটা একটা ভালো দিন। এই দিনে আল্লাহ বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রু থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, তাই মূসা (আ.) এ দিন রোজা রেখেছিলেন। তিনি বললেন: মূসার উপর তোমাদের চেয়ে আমার অধিকার বেশি। তারপর তিনি নিজে এ দিন রোজা রাখলেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।
৮তূরে চল্লিশ রাত, তাওরাত ও বাছুর পূজা
সাগর পার হওয়ার পর আল্লাহ মূসা (আ.)-কে চল্লিশ রাতের জন্য ডাকলেন। তিনি আল্লাহকে দেখতে চাইলেন; আল্লাহ পাহাড়ে নূর প্রকাশ করলে পাহাড় চূর্ণ হয়ে গেল, মূসা (আ.) জ্ঞান হারালেন।
وَوَاعَدْنَا مُوسَىٰ ثَلَاثِينَ لَيْلَةً وَأَتْمَمْنَاهَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِيقَاتُ رَبِّهِ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ۚ وَقَالَ مُوسَىٰ لِأَخِيهِ هَارُونَ اخْلُفْنِي فِي قَوْمِي وَأَصْلِحْ وَلَا تَتَّبِعْ سَبِيلَ الْمُفْسِدِينَ
আর মূসার জন্য আমরা ত্রিশ রাতের ওয়াদা করি এবং আরো দশ দিয়ে তা পূর্ণ করি। এভাবে তার রবের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাতে পূর্ণ হয়। এবং মূসা তার ভাই হারূনকে বললেন, ‘আমার অনুপস্থিতিতে আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে আপনি আমার প্রতিনিধিত্ব করবেন, সংশোধন করবেন আর বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবেন না।’
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَىٰ لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ ۚ قَالَ لَن تَرَانِي وَلَـٰكِنِ انظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي ۚ فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكًّا وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقًا ۚ فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ
আর মূসা যখন আমাদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলেন এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! আমাকে দর্শন দান করুন, আমি আপনাকে দেখব’। তিনি বললেন, ‘আপনি আমাকে দেখতে পাবেন না। আপনি বরং পাহাড়ের দিকেই তাকিয়ে দেখুন, সেটা যদি নিজের জায়গায় স্থির থাকে তবে আপনি আমাকে দেখতে পাবেন।’ যখন তাঁর রব পাহারে জৌতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন বললেন, ‘মহিমাময় আপনি, আমি অনুতপ্ত হয়ে আপনার কাছে তাওবাহ্ করছি এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম।’
তাঁর অনুপস্থিতিতে সামিরী একটি বাছুর বানিয়ে লোকদের পূজায় লাগিয়ে দিল। মূসা (আ.) ফিরে এসে সেটা পুড়িয়ে সাগরে ছড়িয়ে দিলেন।
فَأَخْرَجَ لَهُمْ عِجْلًا جَسَدًا لَّهُ خُوَارٌ فَقَالُوا هَـٰذَا إِلَـٰهُكُمْ وَإِلَـٰهُ مُوسَىٰ فَنَسِيَ
‘অতঃপর সে তাদের জন্য গড়লো এক বাছুর, এক অবয়ব যা হাম্বা রব করত।’ তখন তারা বলল, এ তোমাদের ইলাহ এবং মূসারও ইলাহ, অতঃপর সে (মূসা) ভুলে গেছে।
قَالَ فَاذْهَبْ فَإِنَّ لَكَ فِي الْحَيَاةِ أَن تَقُولَ لَا مِسَاسَ ۖ وَإِنَّ لَكَ مَوْعِدًا لَّن تُخْلَفَهُ ۖ وَانظُرْ إِلَىٰ إِلَـٰهِكَ الَّذِي ظَلْتَ عَلَيْهِ عَاكِفًا ۖ لَّنُحَرِّقَنَّهُ ثُمَّ لَنَنسِفَنَّهُ فِي الْيَمِّ نَسْفًا
মূসা বললেন, ‘যাও; তোমার জীবদ্দশায় তোমার জন্য এটাই রইলো যে, তুমি বলবে, ‘আমি অস্পৃশ্য এবং তোমার জন্য রইল এক নির্দিষ্ট সময়, তোমার বেলায় যার ব্যতিক্রম হবে না। আর তুমি তোমার সে ইলাহের প্রতি লক্ষ্য কর যার পুজায় তুমি রত ছিলে; আমরা সেটাকে জ্বালিয়ে দেবই, তারপর সেটাকে বিক্ষিপ্ত করে সাগরে ছড়িয়ে দেবই।
৯পবিত্র ভূমিতে প্রবেশে অস্বীকৃতি
মূসা (আ.) বনী ইসরাঈলকে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে বললেন। তারা ভয়ে বলল: তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা এখানেই বসে থাকব। শাস্তি হিসেবে চল্লিশ বছর তারা মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াল।
يَا قَوْمِ ادْخُلُوا الْأَرْضَ الْمُقَدَّسَةَ الَّتِي كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَرْتَدُّوا عَلَىٰ أَدْبَارِكُمْ فَتَنقَلِبُوا خَاسِرِينَ
‘হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি লিখে দিয়েছেন তাতে তোমরা প্রবেশ কর এবং পশ্চাদপসরণ করো না, করলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রত্যাবর্তন করবে।’
قَالُوا يَا مُوسَىٰ إِنَّا لَن نَّدْخُلَهَا أَبَدًا مَّا دَامُوا فِيهَا ۖ فَاذْهَبْ أَنتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلَا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُونَ
তারা বলল, ‘হে মূসা! তারা যতক্ষণ সেখানে থাকবে ততক্ষণ আমরা সেখানে কখনো প্রবেশ করব না; কাজেই তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর। নিশ্চয় আমরা এখানেই বসে থাকব।’
قَالَ فَإِنَّهَا مُحَرَّمَةٌ عَلَيْهِمْ ۛ أَرْبَعِينَ سَنَةً ۛ يَتِيهُونَ فِي الْأَرْضِ ۚ فَلَا تَأْسَ عَلَى الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ
আল্লাহ বললেন, ‘তবে তা চল্লিশ বছর তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হল, তারা যমীনে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে, কাজেই আপনি ফাসিক সম্প্রদায়ের জন্য দুঃখ করবেন না ।’
এই যাত্রাপথেই আল্লাহ পাথর থেকে বারোটি ঝর্ণা বের করে দিয়েছিলেন।
وَإِذِ اسْتَسْقَىٰ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ فَقُلْنَا اضْرِب بِّعَصَاكَ الْحَجَرَ ۖ فَانفَجَرَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا ۖ قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَّشْرَبَهُمْ ۖ كُلُوا وَاشْرَبُوا مِن رِّزْقِ اللَّهِ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ
আর স্মরণ কর, যখন মূসা তার জাতির জন্য পানি চাইলেন। আমরা বললাম, ‘আপনার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করুন’। ফলে তা হতে বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হলো। প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ পানি গ্রহণের স্থান জেনে নিলো। (বললাম), ‘আল্লাহ্র দেয়া জীবিকা হতে তোমরা খাও, পান কর এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না’।
১০খিযিরের সাথে জ্ঞানের সফর
মূসা (আ.) আল্লাহর এক বিশেষ জ্ঞানপ্রাপ্ত বান্দার (খিযির) কাছে শেখার জন্য দুই সাগরের মিলনস্থলে সফর করেছিলেন। পুরো ঘটনা সূরা আল-কাহফের ৬০ থেকে ৮২ নম্বর আয়াতে।
وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِفَتَاهُ لَا أَبْرَحُ حَتَّىٰ أَبْلُغَ مَجْمَعَ الْبَحْرَيْنِ أَوْ أَمْضِيَ حُقُبًا
আর স্মরণ করুন, যখন মূসা তার সঙ্গী যুবককে বলেছিলেন, দু’সাগরের মিলনস্থল না পৌছে আমি থামব না অথবা আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।
فَوَجَدَا عَبْدًا مِّنْ عِبَادِنَا آتَيْنَاهُ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَعَلَّمْنَاهُ مِن لَّدُنَّا عِلْمًا
এরপর তারা সাক্ষাত পেল আমাদের বান্দাদের মধ্যে একজনের, যাকে আমরা আমাদের কাছ থেকে অনুগ্রহ দান করেছিলাম ও আমাদের কাছ থেকে শিক্ষা দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান।
১১ইন্তেকাল
নবী (ﷺ) জানিয়েছেন, মালাকুল মাওত মানুষের রূপে এলে মূসা (আ.) প্রথমে তাঁকে চিনতে পারেননি। পরে দীর্ঘ আয়ুর প্রস্তাব পেয়েও তিনি আল্লাহর সাক্ষাৎ বেছে নিলেন, আর পবিত্র ভূমির কাছে মৃত্যুর দোয়া করলেন।
মালাকুল মাওতকে মূসা (আ.)-এর কাছে পাঠানো হলো। তিনি এলে মূসা (আ.) তাঁকে চড় মারলেন। তিনি তাঁর রবের কাছে ফিরে গিয়ে বললেন: আপনি আমাকে এমন বান্দার কাছে পাঠিয়েছেন, যে মরতে চায় না। আল্লাহ বললেন: তার কাছে ফিরে যাও, তাকে বলো সে যেন একটি ষাঁড়ের পিঠে হাত রাখে; হাতের নিচে যত পশম পড়বে, প্রতিটির বদলে সে এক বছর করে আয়ু পাবে। মূসা (আ.) বললেন: হে রব, তারপর কী? আল্লাহ বললেন: তারপর মৃত্যু। তিনি বললেন: তাহলে এখনই। তারপর তিনি আল্লাহর কাছে চাইলেন, যেন তাঁকে পবিত্র ভূমির এক ঢিল ছোড়ার দূরত্ব পর্যন্ত কাছে নেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: আমি সেখানে থাকলে তোমাদের তাঁর কবর দেখিয়ে দিতাম, পথের পাশে লাল বালির টিলার নিচে।
মিরাজের রাতে নবী (ﷺ) তাঁকে দেখেছেন এবং তাঁর চেহারার বর্ণনা দিয়েছেন।
رَأَيْتُ مُوسَى وَإِذَا رَجُلٌ ضَرْبٌ رَجِلٌ، كَأَنَّهُ مِنْ رِجَالِ شَنُوءَةَ، وَرَأَيْتُ عِيسَى، فَإِذَا هُوَ رَجُلٌ رَبْعَةٌ أَحْمَرُ كَأَنَّمَا خَرَجَ مِنْ دِيمَاسٍ
(মিরাজের রাতে নবী ﷺ বলেন) আমি মূসাকে দেখলাম: হালকা-পাতলা গড়নের, চুল না একেবারে কোঁকড়া না একেবারে সোজা, যেন শানূআ গোত্রের একজন মানুষ। আর ঈসাকে দেখলাম: মাঝারি উচ্চতার, লালচে গায়ের রং, যেন এইমাত্র গোসলখানা থেকে বের হয়েছেন।
দ্বীনের জন্য অবদান
- ফিরআউনের মতো জালিমের সামনে তাওহীদের দাওয়াত (সূরা আশ-শুআরা ২৬:২৪)।
- বনী ইসরাঈলকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করা (সূরা আশ-শুআরা ২৬:৬৫)।
- তাওরাত, যা হালাল-হারাম ও উপদেশের বিস্তারিত কিতাব (সূরা আল-আরাফ ৭:১৪৫)।
- মিরাজের রাতে আমাদের নবী (ﷺ)-কে বারবার আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে নামাজ কমানোর অনুরোধ করতে বলেন; শেষে পঞ্চাশ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত হয় (সহিহ বুখারী ৩৪৯)।
- আশুরার রোজা তাঁর মুক্তির শুকরিয়া হিসেবে চালু (সহিহ বুখারী ২০০৪)।
আমাদের জন্য শিক্ষা
- বিপদ যত বড়ই হোক, ঈমানদারের কথা: كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ (সূরা আশ-শুআরা ২৬:৬২)।
- কঠিন কাজের আগে মূসা (আ.)-এর দোয়া পড়ুন: رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي (সূরা ত্বা-হা ২০:২৫)।
- দাওয়াতে নরম ভাষা: ফিরআউনের মতো জালিমের সাথেও কোমল কথা বলতে বলা হয়েছে।
- তাওবার সময় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত; মৃত্যু সামনে এসে গেলে আর কাজে আসে না।
- আশুরার রোজা রাখুন, মূসা (আ.)-এর মুক্তির শুকরিয়া হিসেবে।
কুরআনে তাঁর আলোচনা
পুরো ঘটনা ধারাবাহিকভাবে পড়তে এই আয়াতগুলো খুলুন।
- সূরা আল-কাসাস ২৮:৩-৩৫ জন্ম থেকে নবুয়ত
- সূরা ত্বা-হা ২০:৯-৯৮ নবুয়ত ও ফিরআউন
- সূরা আশ-শুআরা ২৬:১০-৬৮ ফিরআউন ও সাগর
- সূরা আল-আরাফ ৭:১০৩-১৫৬ তাওরাত ও বাছুর
- সূরা আল-মায়িদা ৫:২০-২৬ পবিত্র ভূমি
- সূরা আল-বাকারা ২:৬৭-৭৩ গাভীর ঘটনা
- সূরা আল-কাহফ ১৮:৬০-৮২ খিযিরের সাথে
আরও বিস্তারিত জানতে
- তাফসীর ইবনু কাসীর: উপরের আয়াতগুলোর তাফসীর
- ইবনু কাসীর, কাসাসুল আম্বিয়া (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়ার প্রথম খণ্ড)
- সহিহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া (নবীদের অধ্যায়)
তাফসীর ও ইতিহাসের বইয়ে কিছু ইসরাঈলি বর্ণনাও আছে, যার অনেকগুলো লেখকরা নিজেই দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। দলিল হিসেবে কুরআন ও সহিহ হাদিসই মূল।