নবীদের জীবনী · খলীলুল্লাহ, উলুল আযম রাসূল
ইবরাহীম (আ.)
إِبْرَاهِيم
ইবরাহীম (আ.)-কে আল্লাহ নিজের অন্তরঙ্গ বন্ধু (খলীল) বানিয়েছেন। মূর্তিপূজারী সমাজে জন্ম নিয়েও তিনি একা তাওহীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, প্রিয় পুত্রকে কুরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছেন, আর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে নিয়ে কাবা নির্মাণ করেছেন। আমাদের দ্বীনকে কুরআন "ইবরাহীমের মিল্লাত" বলেছে।
এই পাতার ঘটনা শুধু কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া; ইসরাঈলি বর্ণনা বা লোকমুখের গল্প রাখা হয়নি। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
- পরিচয়
- আল্লাহর খলীল (সূরা আন-নিসা ৪:১২৫), মানুষের ইমাম (সূরা আল-বাকারা ২:১২৪)
- দ্বীন
- ইহুদি বা খ্রিস্টান নন, একনিষ্ঠ মুসলিম (সূরা আলে ইমরান ৩:৬৭)
- পুত্র
- ইসমাঈল ও ইসহাক (আ.), দুজনেই নবী
- কুরআনে যেখানে
- সূরা আল-বাকারা, আল-আনআম, ইবরাহীম, মারইয়াম, আল-আম্বিয়া, আস-সাফফাত সহ বহু সূরায়
জীবনের রোডম্যাপ: শুরু থেকে শেষ
- ১জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মূর্তিপূজারী সমাজে জন্ম; পিতা আযর মূর্তিপূজা করতেন (সূরা আল-আনআম ৬:৭৪)। ছোটবেলা থেকেই আল্লাহ তাঁকে সঠিক বুঝ দিয়েছিলেন (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৫১)।
- ২তাওহীদের দাওয়াত
পিতা, সম্প্রদায় ও শাসক, সবার সামনে যুক্তি দিয়ে তাওহীদ (সূরা মারইয়াম ১৯:৪২, সূরা আল-আনআম ৬:৭৬-সূরা আল-আনআম ৬:৭৯, সূরা আল-বাকারা ২:২৫৮)।
- ৩আগুনের পরীক্ষা ও হিজরত
আগুন শীতল হয়ে গেল (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৬৯), তারপর তিনি নিজ দেশ ছেড়ে চললেন (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৯৯)।
- ৪সন্তান
বৃদ্ধ বয়সে ইসমাঈল ও ইসহাক (আ.)-কে পাওয়া (সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৯)। আশি বছর বয়সে খতনা (সহিহ বুখারী ৩৩৫৬)।
- ৫মক্কা, কুরবানি ও কাবা
হাজার ও শিশু ইসমাঈলকে মক্কায় রেখে আসা (সহিহ বুখারী ৩৩৬৪), কুরবানির পরীক্ষা (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০২), কাবা নির্মাণ ও হজের ঘোষণা (সূরা আল-বাকারা ২:১২৭, সূরা আল-হাজ্জ ২২:২৭)।
- ৬শেষ জীবন
মৃত্যুর আগে সন্তানদের অসিয়ত করে গেছেন: মুসলিম না হয়ে মারা যেয়ো না (সূরা আল-বাকারা ২:১৩২)। তাঁর ইন্তেকালের সময় ও স্থান নিয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসে বিবরণ নেই।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা
১পিতাকে কোমল দাওয়াত
ইবরাহীম (আ.)-এর পিতা মূর্তিপূজা করতেন। তিনি অত্যন্ত আদবের সাথে "হে আমার পিতা" বলে বোঝালেন, যা শোনে না, দেখে না, কোনো কাজে আসে না, তার ইবাদত কেন?
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ ۚ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَّبِيًّا
আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইবরাহীমকে; তিনি তো ছিলেন এক সত্যনিষ্ঠ নবী।
إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنكَ شَيْئًا
যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, ‘হে আমার পিতা! আপনি তার ইবাদাত করেন কেন যে শুনা না, দেখে না এবং আপনার কোনো কাজেই আসে না?’
يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا
‘হে আমার পিতা! আমার কাছে তো এসেছে জ্ঞান যা আপনার কাছে আসেনি; কাজেই আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সঠিক পথ দেখাব।
পিতা পাথর মেরে হত্যার হুমকি দিলেন। তবু ইবরাহীম (আ.) কটু কথা না বলে সালাম দিয়ে বিদায় নিলেন।
قَالَ أَرَاغِبٌ أَنتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ ۖ لَئِن لَّمْ تَنتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ ۖ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا
পিতা বলল, ‘হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে বিমুখ? যদি তুমি বিরত না হও তবে অবশ্যই আমি পাথরের আঘাতে তোমার প্রান নাশ করব; আর তুমি চিরতরে আমাকে ত্যাগ করে চলে যাও।
قَالَ سَلَامٌ عَلَيْكَ ۖ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي ۖ إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا
ইবরাহীম বললেন, ‘আপনার প্রতি সালাম। আমি আপনার রবের কাছে আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি খুবই অনুগ্রহশীল।
২তারা, চাঁদ ও সূর্য: যুক্তি দিয়ে তাওহীদ
সম্প্রদায়কে বোঝাতে ইবরাহীম (আ.) আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখালেন, তারা ডুবে যায়, চাঁদ ডুবে যায়, সূর্যও ডুবে যায়; যা ডুবে যায় তা রব হতে পারে না। রব তিনিই, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন।
فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ اللَّيْلُ رَأَىٰ كَوْكَبًا ۖ قَالَ هَـٰذَا رَبِّي ۖ فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ
তারপর রাত যখন তাঁকে আচ্ছন্ন করল তখন তিনি তারকা দেখে বললেন, ‘এ আমার রব।’ তারপর যখন সেটা অস্তমিত হল তখন তিনি বললেন, ‘যা আন্তমিত হয় তা আমি পছন্দ করি না।’
فَلَمَّا رَأَى الْقَمَرَ بَازِغًا قَالَ هَـٰذَا رَبِّي ۖ فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَئِن لَّمْ يَهْدِنِي رَبِّي لَأَكُونَنَّ مِنَ الْقَوْمِ الضَّالِّينَ
অতঃপর যখন তিনি চাঁদকে সমুজ্জ্বলরূপে উঠতে দেখলেন তখন বললেন , ‘এটা আমার রব।’ যখন সেটাও অস্তমিত হল তখন বলেন, ‘আমাকে আমার রব হিদায়াত না করলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের শামিল হব।’
فَلَمَّا رَأَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هَـٰذَا رَبِّي هَـٰذَا أَكْبَرُ ۖ فَلَمَّا أَفَلَتْ قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ
‘অতঃপর যখন তিনি সূর্যকে দীপ্তিমানরূপে উঠতে দেখলেন তখন বললেন, ‘এটা আমার রব, এটা সবচেয়ে বড়।’ যখন এটাও অস্তমিল হল, তখন তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমারা যাকে আল্লাহ্র শরীক কর তার সাথে আমার কোনো সংশ্রব নেই।
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
‘আমি একনিষ্টভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিককদের অন্তর্ভুক্ত নই।’
৩রাজার সাথে বিতর্ক
এক শাসক ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে তাঁর রব নিয়ে তর্ক করল। সে দাবি করল সেও জীবন-মৃত্যু দেয়। ইবরাহীম (আ.) বললেন: আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে ওঠান, তুমি পশ্চিম দিক থেকে ওঠাও তো। সে নিরুত্তর হয়ে গেল।
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَّ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ آتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ ۖ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
আপনি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখেননি, যে ইব্রাহীমের সাথে তাঁর রব সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল, যেহেতু আল্লাহ্ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন। যখন ইব্রাহীম বললেন, ‘আমার রব তিনিই জিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান, সে বলল, ‘আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই। ইব্রাহীম বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদয় করান, তুমি সেটাকে পশ্চিম দিক থেকে উদয় করাও তো। তারপর যে কুফরী করেছিল সে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। আর আল্লাহ্ যালিম সম্প্রয়ায়কে হিদায়াত করেন না।
৪মূর্তি ভাঙা
সম্প্রদায়ের লোকেরা চলে গেলে তিনি বড়টি ছাড়া সব মূর্তি ভেঙে দিলেন। জিজ্ঞেস করা হলে বললেন, বড়টিকেই জিজ্ঞেস করো, যদি কথা বলতে পারে। এভাবে তিনি তাদের নিজেদের মুখেই দেখিয়ে দিলেন যে মূর্তির কোনো ক্ষমতা নেই।
وَتَاللَّهِ لَأَكِيدَنَّ أَصْنَامَكُم بَعْدَ أَن تُوَلُّوا مُدْبِرِينَ
আর আল্লাহর শপথ, তোমরা পিছনে ফিরে চলে গেলে আমি তোমাদের মূর্তিগুলো সম্বন্ধে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করব।’
فَجَعَلَهُمْ جُذَاذًا إِلَّا كَبِيرًا لَّهُمْ لَعَلَّهُمْ إِلَيْهِ يَرْجِعُونَ
অতঃপর তিনি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন মূর্তিগুলোকে, তাদের প্রধানটি ছাড়া; যাতে তারা তার দিকে ফিরে আসে।
قَالُوا أَأَنتَ فَعَلْتَ هَـٰذَا بِآلِهَتِنَا يَا إِبْرَاهِيمُ
তারা বলল, ‘হে ইবরাহীম! তুমি কি আমাদের মাবুদগুলোর প্রতি এরূপ করেছ?’
قَالَ بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَـٰذَا فَاسْأَلُوهُمْ إِن كَانُوا يَنطِقُونَ
তিনি বললেন, ‘বরং এদের এ প্রধান-ই তো এটা করেছে, সুতরাং এদেরকে জিজ্ঞেস কর যদি এরা কথা বলতে পারে।’
৫আগুন হয়ে গেল শীতল
যুক্তিতে হেরে তারা তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নিল। আল্লাহ আগুনকে আদেশ করলেন ইবরাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যেতে।
قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانصُرُوا آلِهَتَكُمْ إِن كُنتُمْ فَاعِلِينَ
তারা বলল, ‘তাকে পুড়িয়ে ফেল, আর সাহায্য কর তোমাদের মা’বুদদের, তোমরা যদি কিছু করতে চাও।’
قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ
আমরা বললাম, ‘হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’
৬হাজার (আ.) ও শিশু ইসমাঈল: মক্কার শুরু
ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর আদেশে স্ত্রী হাজার ও দুধের শিশু ইসমাঈলকে জনমানবহীন মক্কায় রেখে এলেন। হাজার (আ.)-এর জবাব ছিল ঈমানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত: "তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।" এখান থেকেই যমযম ও মক্কার জনবসতির শুরু।
তারপর ইবরাহীম (আ.) হাজার ও তাঁর দুধের শিশু ইসমাঈলকে নিয়ে এসে কাবাঘরের কাছে, যমযমের উপরে মসজিদের উঁচু জায়গায় একটি বড় গাছের নিচে রাখলেন। তখন মক্কায় কোনো মানুষ ছিল না, পানিও ছিল না। তিনি তাঁদের কাছে এক থলে খেজুর আর এক মশক পানি রেখে ফিরে চললেন। ইসমাঈলের মা পিছু পিছু এসে বললেন: হে ইবরাহীম! এমন উপত্যকায় আমাদের রেখে কোথায় যাচ্ছেন, যেখানে কোনো মানুষ নেই, কিছুই নেই? তিনি কয়েকবার বললেন, কিন্তু ইবরাহীম (আ.) তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন না। তখন তিনি বললেন: আল্লাহ কি আপনাকে এই আদেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। হাজার বললেন: তাহলে তিনি আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।
৭পুত্রের কুরবানি: সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
নিজের দেশ ছেড়ে তিনি আল্লাহর কাছে নেককার সন্তান চাইলেন। আল্লাহ এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলেন।
وَقَالَ إِنِّي ذَاهِبٌ إِلَىٰ رَبِّي سَيَهْدِينِ
তিনি বললেন, 'আমি আমার রবের দিকে চললাম, তিনি আমাকে অবশ্যই হেদায়াত করবেন,
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ
'হে আমার রব! আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।'
فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ
অতঃপর আমরা তাকে এক সহিষ্ণু পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।
পুত্র যখন বাবার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছালেন, ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন তিনি তাঁকে যবেহ করছেন। পুত্রের উত্তর ছিল: যা আদেশ পেয়েছেন তা-ই করুন, ইনশাআল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَىٰ ۚ قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ
অতঃপর তিনি যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হলেন, তখন ইবরাহীম বললেন, 'হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী বল?' তিনি বললেন, 'হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশপ্ৰাপ্ত হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।'
فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ
অতঃপর যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং ইবরাহীম তার পুত্রকে উপুড় করে শায়িত করলেন,
দুজনেই আল্লাহর আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করলে আল্লাহ ডেকে বললেন, স্বপ্ন সত্য করে দেখিয়েছ। তারপর এক মহান যবেহের বিনিময়ে পুত্রকে মুক্ত করলেন। ঈদুল আযহার কুরবানি এই আত্মসমর্পণেরই স্মরণ।
وَنَادَيْنَاهُ أَن يَا إِبْرَاهِيمُ
তখন আমরা তাকে ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহীম!
قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا ۚ إِنَّا كَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ
আপনি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যই পালন করলেন!’---এভাবেই আমরা মুহসিনদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।
وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ
আর আমরা তাকে মুক্ত করলাম এক বড় যবেহ এর বিনিময়ে।
এই ঘটনার পরেই কুরআনে ইসহাক (আ.)-এর জন্মের সুসংবাদ এসেছে (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১১২)। তাই ইবনু কাসীর সহ অধিকাংশ আলেমের মতে, যাঁকে কুরবানির জন্য শোয়ানো হয়েছিল তিনি ইসমাঈল (আ.)।
৮অতিথি ফেরেশতা ও ইসহাক (আ.)-এর সুসংবাদ
মানুষের রূপে কয়েকজন ফেরেশতা অতিথি হয়ে এলেন। ইবরাহীম (আ.) দেরি না করে ভুনা বাছুর এনে আপ্যায়ন করলেন। তাঁরা তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী (সারা)-কে ইসহাক ও তাঁর পরে ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলেন।
وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَىٰ قَالُوا سَلَامًا ۖ قَالَ سَلَامٌ ۖ فَمَا لَبِثَ أَن جَاءَ بِعِجْلٍ حَنِيذٍ
আর অবশ্যই আমাদের ফিরিশ্তাগণ সুসংবাদ নিয়ে ইবরাহীমের কাছে এসেছিল। তারা বলল, ‘সালাম।’ তিনিও বললেন, ‘সালাম।’ অতঃপর বিলম্ব না করে তিনি এক কাবাবকৃত বাছূর নিয়ে আসলেন।
وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَاقَ وَمِن وَرَاءِ إِسْحَاقَ يَعْقُوبَ
আর তাঁর স্ত্রী দাঁড়ানো ছিলেন, অতঃপর তিনি হেসে ফেললেন। অতঃপর আমরা তাকে ইস্হাকের ও ইস্হাকের পরবর্তী ইয়া’কূবের সুসংবাদ দিলাম।
قَالَتْ يَا وَيْلَتَىٰ أَأَلِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهَـٰذَا بَعْلِي شَيْخًا ۖ إِنَّ هَـٰذَا لَشَيْءٌ عَجِيبٌ
তিনি বললেন, ‘হায়, কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হব আমি, যখন আমি বৃদ্ধা এবং এ আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার!
قَالُوا أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ ۖ رَحْمَتُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ ۚ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ
তারা বলল, ‘আল্লাহ্র কাজে আপনি বিস্ময় বোধ করছেন? হে নবী পরিবার! আপনাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি তো প্রশংসার যোগ্য ও অত্যন্ত সম্মানিত।
وَبَشَّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا مِّنَ الصَّالِحِينَ
আর আমরা তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাকের, তিনি ছিলেন এক নবী, সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম।
৯মক্কার দোয়া ও কাবা নির্মাণ
মক্কার শস্যহীন উপত্যকায় পরিবারকে রেখে আসার সময় তিনি দোয়া করলেন, যেন তারা নামাজ কায়েম করে আর আল্লাহ তাদের রিযিক দেন।
رَّبَّنَا إِنِّي أَسْكَنتُ مِن ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِندَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ
হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে, হে আমাদের রব! এ জন্য যে, তারা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফল-ফলাদি দিয়ে তাদের রিযকের ব্যবস্থা করুন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
পরে তিনি ও ইসমাঈল (আ.) মিলে কাবার ভিত্তি তুললেন, আর দোয়া করলেন আমল কবুল হওয়ার জন্য এবং তাঁদের বংশ থেকে একজন রাসূল পাঠানোর জন্য। সেই দোয়ার জবাবই মুহাম্মাদ (ﷺ)।
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিলেন, (তারা বলছিলেন) ‘হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
‘হে আমাদের রব ! আর আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার এক অনুগত জাতি উত্থিত করুন। আর আমাদেরকে ‘‘ইবাদাতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমদের তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনিই বেশী তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
‘হে আমাদের রব! আর আপনি তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসূল পাঠান, যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করবেন ; তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’।
১০হজের ঘোষণা ও শেষ অসিয়ত
কাবা নির্মাণের পর আল্লাহ তাঁকে ঘর পবিত্র রাখতে আর মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দিতে বললেন।
وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَن لَّا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ
আর স্মরণ করুন যখন আমরা ইবরাহীমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম ঘরের স্থান, তখন বলেছিলাম, ‘আমার সাথে কোনো কিছু শরীক করবেন না এবং আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, সালাতে দণ্ডায়মান এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখুন।
وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَىٰ كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ
আর মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দিন, তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটের পিঠে করে, তারা আসবে দুর-দুরান্তের পথ অতিক্রম করে
তিনি দোয়া করলেন মক্কাকে নিরাপদ রাখার আর নিজেকে ও সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখার। শেষ জীবনে সন্তানদের অসিয়ত করলেন মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে।
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَـٰذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ
আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, ‘হে আমার রব! এ শহরকে নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে মূর্তি পূজা হতে দূরে রাখুন।
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ ۚ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্রই, যিনি আমাকে আমার বার্ধক্যে ইসমা’ঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দো’আ শ্রবণকারী।
وَوَصَّىٰ بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَىٰ لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
আর ইবরাহীম ও ইয়া’কূব তাদের পূত্রদেরকে এরই নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘হে পুত্রগণ ! আল্লাহ্ই তোমাদের জন্য এ দীনকে মনোনীত করেছেন। কাজেই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) না হয়ে তোমরা মারা যেও না’।
দ্বীনের জন্য অবদান
- কাবাঘর পুনর্নির্মাণ ও হজের ঘোষণা; আজকের হজ ও উমরার বহু আমল তাঁর পরিবারের স্মৃতি (সূরা আল-বাকারা ২:১২৭, সূরা আল-হাজ্জ ২২:২৬, সূরা আল-হাজ্জ ২২:২৭)।
- কুরবানির সুন্নাত, ঈদুল আযহা তাঁর আত্মসমর্পণের স্মরণ (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০৭)।
- তাঁর দোয়ার ফলেই মক্কায় শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আগমন (সূরা আল-বাকারা ২:১২৯)।
- তাঁর বংশে নবুয়তের ধারা: ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসুফ থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত।
- সহীফা (লিখিত কিতাব) পেয়েছিলেন (সূরা আল-আলা ৮৭:১৯)। খতনা সহ ফিতরাতের সুন্নাতগুলো তাঁর মাধ্যমে প্রসিদ্ধ (সহিহ বুখারী ৩৩৫৬)।
- আমাদের নামাজের দরুদে প্রতিদিন তাঁর ও তাঁর পরিবারের নাম আসে।
আমাদের জন্য শিক্ষা
- বাবা-মা ভুল পথে থাকলেও তাঁদের সাথে আদব ও নম্রতা ছাড়বেন না।
- বড় আমল করেও কবুলের জন্য দোয়া করুন: رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا (সূরা আল-বাকারা ২:১২৭)।
- আল্লাহর আদেশ বুঝে না এলেও আত্মসমর্পণ করাই ইসলাম। ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ.) তা করে দেখিয়েছেন।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখলে আগুনও ক্ষতি করতে পারে না।
- শিরকের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিন, তবে যুক্তি ও প্রজ্ঞা দিয়ে।
কুরআনে তাঁর আলোচনা
পুরো ঘটনা ধারাবাহিকভাবে পড়তে এই আয়াতগুলো খুলুন।
- সূরা মারইয়াম ১৯:৪১-৫০ পিতাকে দাওয়াত
- সূরা আল-আনআম ৬:৭৪-৮৩ তারা, চাঁদ, সূর্য
- সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৫১-৭৩ মূর্তি ভাঙা ও আগুন
- সূরা আল-বাকারা ২:২৫৮-২৬০ রাজার সাথে বিতর্ক ও পাখির নিদর্শন
- সূরা আল-বাকারা ২:১২৪-১৪১ কাবা নির্মাণ ও দোয়া
- সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৫-৪১ মক্কার জন্য দোয়া
- সূরা হুদ ১১:৬৯-৭৬ অতিথি ফেরেশতা
- সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৮৩-১১৩ কুরবানির পরীক্ষা
- সূরা আল-হাজ্জ ২২:২৬-২৯ হজের ঘোষণা
আরও বিস্তারিত জানতে
- তাফসীর ইবনু কাসীর: উপরের আয়াতগুলোর তাফসীর
- ইবনু কাসীর, কাসাসুল আম্বিয়া (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়ার প্রথম খণ্ড)
- সহিহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া (নবীদের অধ্যায়)
তাফসীর ও ইতিহাসের বইয়ে কিছু ইসরাঈলি বর্ণনাও আছে, যার অনেকগুলো লেখকরা নিজেই দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। দলিল হিসেবে কুরআন ও সহিহ হাদিসই মূল।