নবীদের জীবনী · উলুল আযম রাসূল
নূহ (আ.)
نُوح
নূহ (আ.) দৃঢ়প্রতিজ্ঞ (উলুল আযম) রাসূলদের একজন। পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর তিনি নিজের সম্প্রদায়কে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডেকেছেন। অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউ ঈমান আনেনি। শেষে আল্লাহ মহাপ্লাবন দিয়ে যালিমদের ডুবিয়ে দেন আর মুমিনদের নৌকায় বাঁচিয়ে দেন।
এই পাতার ঘটনা শুধু কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া; ইসরাঈলি বর্ণনা বা লোকমুখের গল্প রাখা হয়নি। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
- পরিচয়
- দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পাঁচ রাসূলের একজন (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৭)
- দাওয়াতের সময়
- পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর (সূরা আল-আনকাবূত ২৯:১৪)
- মূল বার্তা
- আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত নয় (সূরা হুদ ১১:২৬)
- কুরআনে যেখানে
- সূরা নূহ (৭১) পুরোটাই তাঁর দাওয়াত নিয়ে; এছাড়া হূদ, আল-মুমিনূন, আল-কামার সহ বিভিন্ন সূরায়
জীবনের রোডম্যাপ: শুরু থেকে শেষ
- ১পরিচয়
আদম (আ.)-এর পর পৃথিবীবাসীর কাছে প্রথম রাসূল (সহিহ বুখারী ৩৩৪০)। আল্লাহ তাঁকে "কৃতজ্ঞ বান্দা" বলেছেন (সূরা আল-ইসরা ১৭:৩)।
- ২দাওয়াত
পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর নিজের সম্প্রদায়কে ডেকেছেন (সূরা আল-আনকাবূত ২৯:১৪), দিনে-রাতে, প্রকাশ্যে-গোপনে (সূরা নূহ ৭১:৫)।
- ৩নৌকা ও মহাপ্লাবন
আল্লাহর আদেশে নৌকা তৈরি, মুমিনদের নিয়ে প্লাবন থেকে রক্ষা (সূরা হুদ ১১:৩৭-সূরা হুদ ১১:৪৪)।
- ৪প্লাবনের পর
আল্লাহ তাঁর বংশধরদেরই পৃথিবীতে টিকিয়ে রেখেছেন (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৭৭), আর পরবর্তী সব প্রজন্মে তাঁর উপর সালাম রেখে দিয়েছেন (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৭৯)।
- ৫ইন্তেকাল
প্লাবনের পর তিনি কত দিন বেঁচে ছিলেন, কোথায় ইন্তেকাল করেছেন, কুরআন ও সহিহ হাদিসে তার বিবরণ নেই।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা
১এক আল্লাহর দিকে ডাক
আল্লাহ নূহ (আ.)-কে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠালেন, যেন শাস্তি আসার আগেই তাদের সতর্ক করেন। তাঁর বার্তা ছিল সব নবীর মতোই: আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত কোরো না।
إِنَّا أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِ أَنْ أَنذِرْ قَوْمَكَ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
নিশ্চয় আমরা নূহ্কে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের প্রতি এ নির্দেশসহ যে, আপনি আপনার সম্প্রদায়কে সতর্ক করুন তাদের প্রতি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আসার আগে।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ
আর অবশ্যই আমরা নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী,’
أَن لَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ ۖ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ
‘যেন তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কিছুর ‘ইবাদত না কর; আমি তো তোমাদের জন্য এক যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির আশংকা করি।’
তিনি তাদের মাঝে অবস্থান করেছিলেন পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِ فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا فَأَخَذَهُمُ الطُّوفَانُ وَهُمْ ظَالِمُونَ
আর আমরা তো নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি তাদের মধ্যে অবস্থান করেছিলেন পঞ্চাশ কম হাজার বছর। অতঃপর প্লাবন তাদেরকে গ্রাস করে; এমতাবস্থায় যে তারা ছিল যালিম।
২দিনরাত দাওয়াত, তবু মুখ ফিরিয়ে নেওয়া
নূহ (আ.) রাতে-দিনে, প্রকাশ্যে-গোপনে সব ভাবে ডেকেছেন। কিন্তু তারা কানে আঙুল দিয়েছে, কাপড়ে মুখ ঢেকেছে, অহংকার করেছে।
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا
তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! আমি তো আমার সম্প্রদায়কে দিনরাত ডেকেছি,
فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَائِي إِلَّا فِرَارًا
কিন্তু আমার ডাক তাদের পলায়ন প্রবণতাই বৃদ্ধি করেছে।
وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا
আমি যখনই তাদেরকে ডাকি যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তারা নিজেদের কানে আঙ্গুল দিয়েছে, কাপড় দ্বারা ঢেকে দিয়েছে নিজেদেরকে এবং জেদ করতে থেকেছে, আর খুবই ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে।
তিনি তাদের ইস্তিগফারের দিকে ডেকেছেন এবং জানিয়েছেন, ক্ষমা চাইলে আল্লাহ বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান ও বাগান দিয়ে সমৃদ্ধ করবেন।
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
অতঃপর বলেছি, ‘তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল,
يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا
তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন
وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
এবং তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।’
নেতারা বলল, তুমি তো আমাদের মতোই মানুষ, আর তোমার অনুসারীরা সমাজের নিচু শ্রেণির লোক।
فَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن قَوْمِهِ مَا نَرَاكَ إِلَّا بَشَرًا مِّثْلَنَا وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا بَادِيَ الرَّأْيِ وَمَا نَرَىٰ لَكُمْ عَلَيْنَا مِن فَضْلٍ بَلْ نَظُنُّكُمْ كَاذِبِينَ
অতঃপর তাঁর সম্প্রদায়ের নেতারা যারা কুফরী করেছিল, তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাকে আমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছু দেখছি না; আমরা তো দেখছি, তোমার অনুসরণ করছে তারাই, যারা আমাদের মধ্যে বাহ্যিক দৃষ্টিতেই অধম এবং আমরা আমাদের উপর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখছি না, বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করি।’
৩নৌকা তৈরির আদেশ
আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া আর কেউ ঈমান আনবে না। তারপর আল্লাহর তত্ত্বাবধানে ও ওহী অনুযায়ী নৌকা বানাতে বললেন। নেতারা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে উপহাস করত।
وَأُوحِيَ إِلَىٰ نُوحٍ أَنَّهُ لَن يُؤْمِنَ مِن قَوْمِكَ إِلَّا مَن قَدْ آمَنَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ
আর নূহের প্রতি অহী করা হয়েছিল, ‘যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া আপনার সম্প্রদায়ের অন্য কেউ কখনো ঈমান আনবে না। কাজেই তারা যা করে তার জন্য আপনি চিন্তিত হবেন না।’
وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا وَلَا تُخَاطِبْنِي فِي الَّذِينَ ظَلَمُوا ۚ إِنَّهُم مُّغْرَقُونَ
‘আর আপনি আমাদের চাক্ষুষ তত্ত্বাবধানে ও আমাদের ওহী অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ করুন এবং যারা যুলুম করেছে তাদের সম্পর্কে আপনি আমাকে কোনো আবেদন করবেন না; তারা তো নিমজ্জিত হবে।‘
وَيَصْنَعُ الْفُلْكَ وَكُلَّمَا مَرَّ عَلَيْهِ مَلَأٌ مِّن قَوْمِهِ سَخِرُوا مِنْهُ ۚ قَالَ إِن تَسْخَرُوا مِنَّا فَإِنَّا نَسْخَرُ مِنكُمْ كَمَا تَسْخَرُونَ
আর তিনি নৌকা নির্মাণ করতে লাগলেন এবং যখনই তার সম্প্রদায়ের নেতারা তার পাশ দিয়ে যেত, তাকে নিয়ে উপহাস করত; তিনি বললেন, ‘তোমরা যদি আমাদেরকে নিয়ে উপহাস কর, তবে নিশ্চয় আমরাও তোমাদেরকে উপহাস করব, যেমন তোমরা উপহাস করছ;
৪মহাপ্লাবন
আদেশ আসার পর নূহ (আ.) প্রতিটি প্রাণীর এক জোড়া, তাঁর পরিবার (যাদের ব্যাপারে আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা ছাড়া) আর মুমিনদের নৌকায় তুললেন। তাঁর সাথে ঈমান এনেছিল মাত্র অল্প কয়েকজন।
حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ قُلْنَا احْمِلْ فِيهَا مِن كُلٍّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَن سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ وَمَنْ آمَنَ ۚ وَمَا آمَنَ مَعَهُ إِلَّا قَلِيلٌ
অবশেষে যখন আমাদের আদেশ আসল এবং উনান উথলে উঠল; আমরা বললাম, এতে উঠিয়ে নিন প্রত্যেক শ্রেণীর যুগলের দুটি, যাদের বিরুদ্ধে পূর্ব-সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা ছাড়া আপনার পরিবার-পরিজনকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে। আর তার সাথে ঈমান এনেছিল কেবল অল্প কয়েকজন।
আকাশের দরজা খুলে মুষলধারে বৃষ্টি নামল, মাটি থেকে ঝর্ণা বের হলো।
فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُّنْهَمِرٍ
ফলে আমরা উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বারসমূহ প্রবল বর্ষণশীল বারিধারার মাধ্যমে,
وَفَجَّرْنَا الْأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَىٰ أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ
এবং মাটি থেকে উৎসারিত করলাম ঝর্ণাসমূহ; ফলে সমস্ত পানি মিলিত হল এক পরিকল্পনা অনুসারে
وَحَمَلْنَاهُ عَلَىٰ ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ
আর নূহকে আমরা আরোহণ করালাম কাঠ ও পেরেগ নির্মিত এক নৌযানে,
৫পুত্রের ঘটনা
পাহাড়সমান ঢেউয়ের মাঝে নূহ (আ.) তাঁর পুত্রকে নৌকায় উঠতে ডাকলেন। সে বলল, পাহাড়ে উঠে বেঁচে যাবে। কিন্তু সেদিন আল্লাহর আদেশ থেকে বাঁচানোর কেউ ছিল না।
وَهِيَ تَجْرِي بِهِمْ فِي مَوْجٍ كَالْجِبَالِ وَنَادَىٰ نُوحٌ ابْنَهُ وَكَانَ فِي مَعْزِلٍ يَا بُنَيَّ ارْكَب مَّعَنَا وَلَا تَكُن مَّعَ الْكَافِرِينَ
আর পর্বত-প্রমাণ তরঙ্গের মধ্যে এটা তাদেরকে নিয়ে বয়ে চলল; নূহ তাঁর পুত্রকে, যে পৃথক ছিল, ডেকে বললেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমাদের সাথে আরোহণ কর এবং কাফিরদের সঙ্গী হয়ো না।’
قَالَ سَآوِي إِلَىٰ جَبَلٍ يَعْصِمُنِي مِنَ الْمَاءِ ۚ قَالَ لَا عَاصِمَ الْيَوْمَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ إِلَّا مَن رَّحِمَ ۚ وَحَالَ بَيْنَهُمَا الْمَوْجُ فَكَانَ مِنَ الْمُغْرَقِينَ
সে বলল, ‘আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেব যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে।’ তিনি বললেন, ‘আজ আল্লাহ্র হুকুম থেকে রক্ষা করার কেউ নেই, তবে যাকে আল্লাহ্ দয়া করবেন সে ছাড়া।’ আর তরঙ্গ তাদের মধ্যে অন্তরায় হয়ে গেল, ফলে সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হল।
পরে নূহ (আ.) পুত্রের ব্যাপারে আল্লাহকে বললেন। আল্লাহ জানালেন, সে তাঁর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ তার কাজ অসৎ। নূহ (আ.) সাথে সাথে ক্ষমা চাইলেন।
وَنَادَىٰ نُوحٌ رَّبَّهُ فَقَالَ رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِي وَإِنَّ وَعْدَكَ الْحَقُّ وَأَنتَ أَحْكَمُ الْحَاكِمِينَ
আর নূহ্ তার রবকে ডেকে বললেন, ‘হে আমার রব! নিশ্চয় আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং নিশ্চয় আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য, আর আপনি তো বিচারকের মধ্যে শ্রেষ্ট বিচারক।
قَالَ يَا نُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ ۖ إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ ۖ فَلَا تَسْأَلْنِ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۖ إِنِّي أَعِظُكَ أَن تَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ
আল্লাহ্ বললেন, ‘হে নূহ্! নিশ্চয় সে আপনার পরিবারভুক্ত নয়। সে অবশ্যই অসৎকর্মপরায়ণ। কাজেই যে বিষয়ে আপনার জ্ঞান নেই সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করবেন না। আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি, আপনি যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হন।‘
قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ ۖ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে যাতে আপনাকে অনুরোধ না করি, এ জন্য আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।‘
৬প্লাবনের শেষ
যমীনকে পানি শুষে নিতে আর আকাশকে থামতে বলা হলো। নৌকা জূদী পাহাড়ে গিয়ে থামল। আল্লাহ এই ঘটনাকে পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন করে রেখেছেন।
وَقِيلَ يَا أَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَا سَمَاءُ أَقْلِعِي وَغِيضَ الْمَاءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِيِّ ۖ وَقِيلَ بُعْدًا لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
আর বলা হল, ‘হে যমীন! তুমি তোমার পানি গ্রাস করে নাও, হে আকাশ! ক্ষান্ত হও।’ আর পানি হ্রাস করা হল এবং সিদ্ধান্ত বস্তবায়িত হল। আর নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হল এবং বলা হল, ‘যালিম সম্প্রদায়ের জন্য ধ্বংস।’
وَلَقَد تَّرَكْنَاهَا آيَةً فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ
আর অবশ্যই আমরা এটাকে রেখে দিয়েছি এক নিদর্শনরূপে; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
৭নূহ (আ.)-এর দোয়া ও আল্লাহর সাড়া
দীর্ঘ দাওয়াতের শেষে নূহ (আ.) কাফিরদের বিরুদ্ধে দোয়া করেন, আর নিজের, বাবা-মায়ের ও সব মুমিনের জন্য ক্ষমা চান।
وَقَالَ نُوحٌ رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا
নূহ্ আরও বলেছিলেন, ‘হে আমার রব! যমীনের কাফিরদের মধ্য থেকে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দেবেন না।
إِنَّكَ إِن تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا
আপনি তাদেরকে অব্যাহতি দিলে তারা আপনার বান্দাদেরকে বিভ্ৰান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে শুধু দুস্কৃতিকারী ও কাফির।
رَّبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارًا
হে আমার রব! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে; আর যালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন।’
আল্লাহ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে মহাসংকট থেকে উদ্ধার করলেন, তাঁর বংশধরদেরই টিকিয়ে রাখলেন, আর তাঁর প্রতি সালাম চিরস্থায়ী করলেন।
وَلَقَدْ نَادَانَا نُوحٌ فَلَنِعْمَ الْمُجِيبُونَ
আর অবশ্যই নূহ আমাদেরকে ডেকেছিলেন, অতঃপর (দেখুন) আমরা কত উত্তম সাড়াদানকারী।
وَنَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ
আর তাকে এবং তার পরিবারবর্গকে আমরা উদ্ধার করেছিলাম মহাসংকট থেকে।
وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَاقِينَ
আর তার বংশধরদেরকেই আমরা বিদ্যমান রেখেছি (বংশপরম্পরায়),
سَلَامٌ عَلَىٰ نُوحٍ فِي الْعَالَمِينَ
সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে নূহের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।
কিয়ামতের দিনও মানুষ তাঁর মর্যাদা স্বীকার করবে।
فَيَأْتُونَ نُوحًا فَيَقُولُونَ يَا نُوحُ أَنْتَ أَوَّلُ الرُّسُلِ إِلَى أَهْلِ الأَرْضِ، وَسَمَّاكَ اللَّهُ عَبْدًا شَكُورًا
(কিয়ামতের দিন সুপারিশের জন্য) মানুষ নূহ (আ.)-এর কাছে এসে বলবে: হে নূহ! আপনি পৃথিবীবাসীর প্রতি প্রথম রাসূল, আর আল্লাহ আপনাকে "কৃতজ্ঞ বান্দা" নাম দিয়েছেন।
দ্বীনের জন্য অবদান
- শিরকের বিরুদ্ধে প্রথম রাসূল হিসেবে তাওহীদের দাওয়াত (সূরা হুদ ১১:২৬)।
- দাওয়াতে ধৈর্যের সবচেয়ে দীর্ঘ উদাহরণ, প্রায় এক হাজার বছর।
- ইস্তিগফারের দুনিয়াবি বরকতের শিক্ষা (সূরা নূহ ৭১:১০-সূরা নূহ ৭১:১২)।
- মুমিনদের জন্য দোয়া, যা আজও আমরা পড়তে পারি (সূরা নূহ ৭১:২৮)।
- কিয়ামতের দিন নিজের উম্মতের বিপক্ষে সাক্ষী; সুপারিশের হাদিসেও তাঁর উল্লেখ (সহিহ বুখারী ৩৩৪০)।
আমাদের জন্য শিক্ষা
- দাওয়াতে ধৈর্য: সাড়ে নয়শো বছর ডেকেও নূহ (আ.) হাল ছাড়েননি। ফল আল্লাহর হাতে, আমাদের কাজ চেষ্টা করা।
- ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফ নয়, দুনিয়ার বরকতেরও কারণ (সূরা নূহ ৭১:১০-সূরা নূহ ৭১:১২)।
- নাজাতের মাপকাঠি ঈমান ও আমল, বংশ নয়। নবীর পুত্রও ঈমান ছাড়া বাঁচেনি।
- সত্যের অনুসারী কম হওয়া সত্যের দুর্বলতা নয়।
কুরআনে তাঁর আলোচনা
পুরো ঘটনা ধারাবাহিকভাবে পড়তে এই আয়াতগুলো খুলুন।
- সূরা হুদ ১১:২৫-৪৯ দাওয়াত, নৌকা ও প্লাবন
- সূরা নূহ ৭১:১-২৮ দাওয়াতের পদ্ধতি ও দোয়া
- সূরা আল-মুমিনূন ২৩:২৩-৩০ নৌকা ও প্লাবন
- সূরা আল-কামার ৫৪:৯-১৭ মহাপ্লাবনের নিদর্শন
- সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৭৫-৮২ আল্লাহর সাড়া
আরও বিস্তারিত জানতে
- তাফসীর ইবনু কাসীর: উপরের আয়াতগুলোর তাফসীর
- ইবনু কাসীর, কাসাসুল আম্বিয়া (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়ার প্রথম খণ্ড)
- সহিহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া (নবীদের অধ্যায়)
তাফসীর ও ইতিহাসের বইয়ে কিছু ইসরাঈলি বর্ণনাও আছে, যার অনেকগুলো লেখকরা নিজেই দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। দলিল হিসেবে কুরআন ও সহিহ হাদিসই মূল।