আল-কুরআন
সূরা আল-হাদীদ ৫৭:১৩
يَوْمَ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِن نُّورِكُمْ قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءَكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا فَضُرِبَ بَيْنَهُم بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِن قِبَلِهِ الْعَذَابُ
সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা যারা ঈমান এনেছে বলবে, ‘তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম, যাতে আমরা তোমাদের নূরের কিছু গ্ৰহণ করতে পারি।’ বলা হবে, ‘তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও ও নূরের সন্ধান কর।’ তারপর উভয়ের মাঝামাঝি স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর যাতে একটি দরজা থাকবে, যার ভিতরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে শাস্তি [১]।
অনুবাদে ‘আমরা’ কেন, আল্লাহ তো এক?
আরবিতে রাজা বা মহান কেউ নিজের মর্যাদা বোঝাতে নিজেকে বহুবচনে বলেন। কুরআনে আল্লাহ কখনো একবচনে বলেছেন (যেমন ত্বা-হা ২০:১৪-এ «إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ», নিশ্চয় আমিই আল্লাহ), কখনো বহুবচনে (যেমন «إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ», সূরা হিজর ১৫:৯)। এই বহুবচন সম্মান আর মহত্ত্বের, সংখ্যার নয়। আল্লাহ যে এক, তা কুরআনে স্পষ্ট: «قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ» (সূরা ইখলাস ১১২:১)।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেন, আল্লাহ নিজেকে কখনো একবচনে, কখনো বহুবচনে উল্লেখ করেন, কিন্তু দ্বিবচনে কখনো নয়; কারণ বহুবচন তাঁর প্রাপ্য মহত্ত্ব বোঝায়, আর দ্বিবচন নির্দিষ্ট সংখ্যা বোঝায়, যা থেকে তিনি পবিত্র (আত-তাদমুরিয়্যা, পৃ. ৭৫)।
ড. যাকারিয়া আরবির শব্দ যেমন আছে তেমন রেখে ‘আমরা’ লিখেছেন; কোনো কোনো অনুবাদক বাংলার রীতিতে ‘আমি’ লেখেন। দুটোর অর্থ একই। মানুষের কথায় যে ‘আমরা’ আসে (যেমন দোয়ায়), সেটা সাধারণ বহুবচন।
অনুবাদকের টীকা
“অতঃপর তোমরা কবর থেকে হাশরের ময়দানে স্থানান্তরিত হবে। হাশরের বিভিন্ন মনযিল ও স্থান অতিক্রম করতে হবে। এক মনযিলে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে কিছু মুখমণ্ডলকে সাদা ও উজ্জ্বল করে দেয়া হবে এবং কিছু মুখমণ্ডলকে গাঢ় কৃষ্ণবৰ্ণ করে দেয়া হবে। অপর এক মনযিলে সমবেত সব মুমিন ও কাফেরকে গভীর অন্ধকার আচ্ছন্ন করে ফেলবে। কিছুই দৃষ্টিগোচর হবে না। এরপর নূর বণ্টন করা হবে। প্রত্যেক মুমিনকে নূর দেয়া হবে। মুনাফিক ও কাফেরকে নূর ব্যতীত অন্ধকারেই রেখে দেয়া হবে। আর এ উদাহরণই আল্লাহ তাঁর কুরআনে পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “অথবা তাদের কাজ গভীর সাগরের তলের অন্ধকারের মত, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার উর্ধ্বের মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। আল্লাহ যাকে নূর দান করেন না তার জন্য কোনো নূরই নেই।” [সূরা আন-নূর ৪০]
অতঃপর যেভাবে অন্ধ ব্যক্তি চক্ষুম্মান ব্যক্তির চোখ দ্বারা দেখতে পায় না তেমনি কাফের ও মুনাফিক ঈমানদারের নূর দ্বারা আলোকিত হতে পারবে না। মুনাফিকরা ঈমানদারদের বলবে, “তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম, যাতে আমরা তোমাদের নূরের কিছু গ্ৰহণ করতে পারি।” এভাবে আল্লাহ মুনাফিকদেরকে ধোঁকাগ্ৰস্থ করবেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তারা আল্লাহকে ধোঁকা দেয় আর আল্লাহ তাদেরকে ধোঁকা দিবেন।” [সূরা আন-নিসা ১৪২] তারপর তারা যেখানে নূর বন্টন হয়েছিল সেখানে ফিরে যাবে, কিন্তু তারা কিছুই পাবেনা; ফলে তারা তখন ঈমানদারদের কাছে ফিরে আসবে, ইত্যবসরে উভয়ের মাঝামাঝি স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর যাতে একটি দরজা থাকবে, এটার ভিতরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে শাস্তি। এভাবেই মুনাফিক ধোঁকাগ্ৰস্ত হতে থাকবে আর মুমিনদের মাঝে নূর বন্টিত হয়ে যাবে। [ইবন কাসীর]
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, প্রত্যেক মুমিনকে তার আমল পরিমাণে নূর দেয়া হবে। ফলে কারও নূর পর্বতসম, কারও খর্জুর বৃক্ষসম এবং কারও মানবদেহসম হবে। সর্বাপেক্ষা কম নূর সেই ব্যক্তির হবে, যার কেবল বৃদ্ধাঙ্গুলিতে নূর থাকবে; তাও আবার কখনও জ্বলে উঠবে এবং কখনও নিভে যাবে। [ইবন কাসীর]
এই আয়াত যেসব পাতায় এসেছে
আরবি পাঠ: Tanzil Quran Text (Simple), CC BY 3.0, tanzil.net। বাংলা অর্থ: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, QuranEnc.com থেকে হুবহু। তিলাওয়াত: শাইখ মিশারী রাশিদ আল-আফাসী (everyayah.com)।