deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ

রাসূলুল্লাহর (ﷺ) ইন্তেকাল: "হে আল্লাহ, সর্বোচ্চ সঙ্গী"

যিনি সারা জীবন মানুষকে আল্লাহর দিকে ডেকেছেন, তাঁর বিদায়ের দিনগুলোও ছিল শিক্ষায় ভরা। অসুখের কষ্টে বারবার অজ্ঞান হয়েছেন, কিন্তু জ্ঞান ফিরলেই প্রথম প্রশ্ন: লোকেরা কি নামাজ পড়েছে?

৬ দৃশ্য১৩ হাদিস১ আয়াত

সীরাত · মাদানী যুগ৬৩২ খ্রি. · ১১ হিজরি · রবিউল আউয়াল · বয়স ৬৩

কখন
১১ হিজরি, রবিউল আউয়াল, সোমবার (৬৩২ খ্রি.); তারিখ হিসেবে ১২ রবিউল আউয়াল প্রসিদ্ধ, তবে মতভেদ আছে
কোথায়
মদিনা, মসজিদে নববীর পাশে আয়েশার (রা.) হুজরা; সেখানেই দাফন
কারা
নবীজি (ﷺ), আয়েশা, ফাতিমা, আবু বকর, উমর, আব্বাস ও আলী (রা.)
এই গল্পে
বিদায়ের আভাস থেকে আবু বকরের (রা.) ভাষণ পর্যন্ত

কেন পড়বেন: মৃত্যু সবার আসবে, এমনকি আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দারও। এই গল্প শেখায় কীভাবে বিদায় নিতে হয়: নামাজের চিন্তা, অধীনদের হকের চিন্তা আর আল্লাহর সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। আর শেখায়, আমাদের ইবাদত চিরঞ্জীব আল্লাহর জন্য।

গল্প

বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।

  1. ১

    অসুখের শুরুতে

    ফাতিমার (রা.) কানে কানে

    একদিন ফাতিমা (রা.) এলেন; তাঁর হাঁটা ঠিক বাবার মতো। নবীজি (ﷺ) তাঁকে কাছে বসিয়ে চুপিচুপি কিছু বললেন, তিনি কাঁদলেন; আবার কিছু বললেন, তিনি হাসলেন:

    ফাতিমা (রা.) হেঁটে এলেন, তাঁর হাঁটা ঠিক নবীজির (ﷺ) হাঁটার মতো। নবীজি (ﷺ) বললেন: আমার মেয়ে, স্বাগতম। তারপর তাঁকে ডানে বা বাঁয়ে বসিয়ে চুপিচুপি কিছু বললেন; তিনি কাঁদলেন। আমি বললাম: কাঁদছ কেন? তারপর আবার চুপিচুপি কিছু বললেন; তিনি হাসলেন। আমি বললাম: দুঃখের এত কাছে আনন্দ আজকের মতো আর দেখিনি। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে বললেন: রাসূলুল্লাহর (ﷺ) গোপন কথা আমি ফাঁস করব না। নবীজির (ﷺ) ইন্তেকালের পর জিজ্ঞেস করলে বললেন: তিনি আমাকে চুপিচুপি বলেছিলেন: জিবরীল প্রতি বছর একবার আমার সাথে কুরআন পুনরাবৃত্তি করতেন, এ বছর দুবার করেছেন; আমার মনে হয় আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে; আর আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই প্রথম আমার সাথে মিলিত হবে। তখন আমি কাঁদলাম। তিনি বললেন: তুমি কি খুশি নও যে তুমি জান্নাতি নারীদের (বা মুমিন নারীদের) নেত্রী হবে? তখন আমি হাসলাম।

    সহিহ বুখারী ৩৬২৩সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

    জিবরীল (আ.) এ বছর দুবার কুরআন পুনরাবৃত্তি করেছেন, আর নবীজি (ﷺ) তা থেকে বুঝেছিলেন, তাঁর সময় ঘনিয়ে এসেছে।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৬২৩ সহিহ

    সবচেয়ে কষ্টের খবরের সাথেই তিনি দিলেন সবচেয়ে বড় সুসংবাদ। দুঃখের মধ্যে আশা দেখানো, এটাও সুন্নাহ।

  2. ২

    অসুখ ভারী হলে

    আয়েশার (রা.) ঘরে

    অসুখ বাড়তে থাকলে তিনি স্ত্রীদের কাছে অনুমতি চাইলেন, যাতে আয়েশার (রা.) ঘরে সেবা নিতে পারেন; ন্যায়ের পালা ভাঙবেন না বলে অনুমতি চাওয়া:

    রাসূলুল্লাহর (ﷺ) অসুখ যখন ভারী হলো আর ব্যথা বেড়ে গেল, তিনি স্ত্রীদের কাছে আমার ঘরে সেবা নেওয়ার অনুমতি চাইলেন; তাঁরা অনুমতি দিলেন। তিনি দুজন মানুষের মাঝে ভর দিয়ে বের হলেন, পা দুটো মাটিতে দাগ কেটে যাচ্ছিল; একজন আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব, আরেকজন (ইবনু আব্বাসের ব্যাখ্যায়) আলী।

    সহিহ বুখারী ৪৪৪২সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

    সেখানে সাত মশক পানি ঢেলে গোসল করিয়ে দেওয়ার পর তিনি মসজিদে গিয়ে মানুষের সাথে নামাজ পড়লেন আর খুতবা দিলেন (সহিহ বুখারী ৪৪৪২)।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪৪৪২ সহিহ

    মৃত্যুশয্যায়ও তিনি স্ত্রীদের মধ্যে ইনসাফ ভোলেননি; অনুমতি নিয়ে তবেই আয়েশার (রা.) ঘরে থেকেছেন।

  3. ৩

    শেষ দিনগুলো

    "আবু বকরকে বলো, নামাজ পড়াক"

    এক রাতে এশার সময় মসজিদে সবাই অপেক্ষা করছিল। তিনি তিনবার উঠতে চেষ্টা করলেন, তিনবারই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন:

    নবীজির (ﷺ) অসুখ ভারী হলো। তিনি বললেন: লোকেরা কি নামাজ পড়েছে? আমরা বললাম: না, তারা আপনার অপেক্ষায়। তিনি বললেন: গামলায় আমার জন্য পানি রাখো। আমরা রাখলাম, তিনি গোসল করলেন, তারপর উঠতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। জ্ঞান ফিরলে আবার বললেন: লোকেরা কি নামাজ পড়েছে? এভাবে তিনবার। মানুষ তখন মসজিদে এশার নামাজের জন্য তাঁর অপেক্ষায় বসে ছিল। তখন নবীজি (ﷺ) আবু বকরকে (রা.) বলে পাঠালেন, তিনি যেন নামাজ পড়ান। আবু বকর (কোমল মনের মানুষ ছিলেন) বললেন: উমর, তুমি নামাজ পড়াও। উমর বললেন: আপনিই এর বেশি হকদার। তাই সেই দিনগুলোতে আবু বকর নামাজ পড়ালেন। তারপর একদিন নবীজি (ﷺ) একটু হালকা বোধ করে দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে যোহরের নামাজে এলেন, তখন আবু বকর নামাজ পড়াচ্ছিলেন। তাঁকে দেখে আবু বকর পিছিয়ে আসতে চাইলেন, নবীজি (ﷺ) ইশারায় নিষেধ করে বললেন: আমাকে তার পাশে বসিয়ে দাও। তারা তাঁকে আবু বকরের পাশে বসিয়ে দিলেন; আবু বকর নবীজির (ﷺ) নামাজ অনুসরণ করছিলেন আর লোকেরা আবু বকরের, আর নবীজি (ﷺ) বসে ছিলেন।

    সহিহ বুখারী ৬৮৭সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

    সূত্রসহিহ বুখারী ৬৮৭ সহিহ

    নিজে নামাজ পড়াতে না পেরে তিনি আবু বকরকে (রা.) ইমাম বানালেন, আর পরে সাহাবিরা তাঁকেই প্রথম খলিফা হিসেবে বাইআত দিলেন। নামাজের ইমামতি ছিল উম্মতের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত।

  4. ৪

    ইন্তেকালের দিন, ফজর

    সোমবার ফজরের শেষ হাসি

    সোমবার ভোরে সাহাবিরা আবু বকরের (রা.) পেছনে ফজরের নামাজে দাঁড়িয়ে। তখন:

    নবীজির (ﷺ) যে অসুখে ইন্তেকাল হয়, তখন আবু বকর (রা.) লোকদের নামাজ পড়াতেন। সোমবার, লোকেরা কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজে, তখন নবীজি (ﷺ) হুজরার পর্দা সরিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন; তিনি দাঁড়িয়ে, তাঁর চেহারা যেন মুসহাফের একটি পাতা। তারপর তিনি হাসলেন। নবীজিকে (ﷺ) দেখার আনন্দে আমরা প্রায় নামাজ ভুলে যাচ্ছিলাম। আবু বকর কাতারে মিলতে পিছিয়ে এলেন, ভাবলেন নবীজি (ﷺ) নামাজে আসছেন। নবীজি (ﷺ) ইশারায় বললেন, তোমরা নামাজ পূর্ণ করো, তারপর পর্দা নামিয়ে দিলেন। সেই দিনই তাঁর ইন্তেকাল হলো।

    সহিহ বুখারী ৬৮০সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

    সূত্রসহিহ বুখারী ৬৮০ সহিহ

    তাঁর শেষ দেখা: উম্মত কাতারবন্দি হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে। এই দৃশ্য দেখে তিনি হেসেছিলেন। আমাদের নামাজই তাঁর চোখের শীতলতা।

  5. ৫

    সোমবার, দুপুর

    শেষ উপদেশ, শেষ মিসওয়াক, শেষ কথা

    আলী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহর (ﷺ) শেষ উপদেশ ছিল:

    كَانَ آخِرُ كَلاَمِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ الصَّلاَةَ الصَّلاَةَ اتَّقُوا اللَّهَ فِيمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ

    রাসূলুল্লাহর (ﷺ) শেষ কথা ছিল: নামাজ, নামাজ! আর তোমাদের অধীনদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।

    সুনানে আবু দাউদ ৫১৫৬সহিহবর্ণনাকারী: আলী ইবনু আবী তালিব (রা.)

    আয়েশা (রা.) তাঁকে নিজের বুকে হেলান দিয়ে ধরে ছিলেন:

    আমার উপর আল্লাহর নিয়ামত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার ঘরে, আমার পালার দিনে, আমার বুক ও গলার মাঝে (হেলান দিয়ে) ইন্তেকাল করেছেন, আর আল্লাহ তাঁর মৃত্যুর সময় আমার আর তাঁর লালা মিলিয়ে দিয়েছেন। আবদুর রহমান (আমার ভাই) হাতে মিসওয়াক নিয়ে ঢুকলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (ﷺ) হেলান দিয়ে ধরে আছি। দেখলাম তিনি সেদিকে তাকাচ্ছেন; জানতাম তিনি মিসওয়াক ভালোবাসেন। বললাম: আপনার জন্য নেব? তিনি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন। আমি নিলাম, তা তাঁর জন্য শক্ত ছিল; বললাম: নরম করে দেব? তিনি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন; আমি (চিবিয়ে) নরম করে দিলাম। তাঁর সামনে একটা পানির পাত্র ছিল; তিনি পানিতে হাত ডুবিয়ে চেহারায় বুলাচ্ছিলেন আর বলছিলেন: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মৃত্যুর সত্যিই যন্ত্রণা আছে। তারপর হাত তুলে বলতে লাগলেন: সর্বোচ্চ সঙ্গীর সাথে (আর-রফীকুল আ’লা)। এভাবেই তাঁর রূহ কবজ হলো, আর হাতটা নুয়ে পড়ল।

    সহিহ বুখারী ৪৪৪৯সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

    তিনি সুস্থ অবস্থায় বলতেন, প্রত্যেক নবীকে মৃত্যুর আগে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। আয়েশা (রা.) বুঝলেন, তিনি বেছে নিয়েছেন:

    নবীজি (ﷺ) সুস্থ থাকতে বলতেন: কোনো নবীর রূহ কবজ করা হয় না, যতক্ষণ না তাঁকে জান্নাতে তাঁর জায়গা দেখানো হয়, তারপর (দুনিয়া বা আখিরাত বেছে নেওয়ার) সুযোগ দেওয়া হয়। যখন মৃত্যু এল, তাঁর মাথা আমার উরুর উপর; তিনি অজ্ঞান হলেন, তারপর জ্ঞান ফিরলে ছাদের দিকে চোখ তুলে বললেন: হে আল্লাহ, সর্বোচ্চ সঙ্গী। আমি (মনে মনে) বললাম: তাহলে তিনি আর আমাদের বেছে নিচ্ছেন না। বুঝলাম, এটাই সেই কথা, যা তিনি সুস্থ অবস্থায় বলতেন। তাঁর শেষ কথা ছিল: হে আল্লাহ, সর্বোচ্চ সঙ্গী।

    সহিহ বুখারী ৪৪৬৩সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

    সূত্রসুনানে আবু দাউদ ৫১৫৬ সহিহসহিহ বুখারী ৪৪৪৯ সহিহসহিহ বুখারী ৪৪৬৩ সহিহ

    জীবনের শেষ মুহূর্তেও মুখে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ", চিন্তায় নামাজ আর অধীনদের হক, আর অন্তরে আল্লাহর সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা।

  6. ৬

    ইন্তেকালের পর

    "আল্লাহ চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না"

    তেষট্টি বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করলেন (সহিহ বুখারী ৩৫৩৬)। খবর ছড়াতেই মদিনা স্তব্ধ। উমর (রা.) মানতেই পারছিলেন না; তখন আবু বকর (রা.) এলেন:

    রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন ইন্তেকাল করলেন, আবু বকর (রা.) তখন সুনহে (মদিনার উঁচু এলাকায়)। উমর (রা.) দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন: আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মারা যাননি; আল্লাহ অবশ্যই তাঁকে আবার পাঠাবেন। আবু বকর এসে রাসূলুল্লাহর (ﷺ) মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে চুমু খেয়ে বললেন: আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান, জীবনে ও মরণে আপনি পবিত্র; যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো দুবার মৃত্যুর স্বাদ দেবেন না। তারপর বের হয়ে বললেন: হে কসমকারী, থামো। আবু বকর কথা বলতে শুরু করলে উমর বসে পড়লেন। আবু বকর আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন: শোনো, যে মুহাম্মাদের (ﷺ) ইবাদত করত, (সে জেনে নিক) মুহাম্মাদ (ﷺ) মারা গেছেন; আর যে আল্লাহর ইবাদত করত, (সে জেনে নিক) আল্লাহ চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না। তারপর পড়লেন: "আপনিও মরবেন, তারাও মরবে" আর "মুহাম্মাদ একজন রাসূল ছাড়া কিছু নন, তাঁর আগে অনেক রাসূল গত হয়েছেন; তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন, তোমরা কি পেছনে ফিরে যাবে?..." তখন মানুষ ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

    সহিহ বুখারী ৩৬৬৭সহিহবর্ণনাকারী: আয়েশা (রা.)

    وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ ۚ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ ۚ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا ۗ وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ

    আর মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র; তার আগে বহু রাসূল গত হয়েছেন। কাজেই যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? আর কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহ্‌র ক্ষতি করবে না; আর আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কৃত করবেন।

    ফাতিমা (রা.) কাঁদছিলেন। মৃত্যুর আগে নবীজি (ﷺ) তাঁকে বলেছিলেন: আজকের পর তোমার বাবার আর কোনো কষ্ট নেই (সহিহ বুখারী ৪৪৬২)।

    যিনি পুরো আরবের নেতা ছিলেন, তিনি দুনিয়ায় কোনো মীরাস রেখে যাননি: আমরা (নবীরা) যা রেখে যাই, তা সদকা (সহিহ বুখারী ৬৭২৭)। মৃত্যুর সময় তাঁর বর্ম পরিবারের খাবারের জন্য ত্রিশ সা’ যবের বিনিময়ে এক ইহুদির কাছে বন্ধক ছিল (সহিহ বুখারী ২৯১৬)।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৫৩৬ সহিহসহিহ বুখারী ৩৬৬৭ সহিহসূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪ কুরআনসহিহ বুখারী ৪৪৬২ সহিহসহিহ বুখারী ৬৭২৭ সহিহসহিহ বুখারী ২৯১৬ সহিহ

    "যে মুহাম্মাদের (ﷺ) ইবাদত করত, মুহাম্মাদ মারা গেছেন; যে আল্লাহর ইবাদত করত, আল্লাহ চিরঞ্জীব।" নবীজির (ﷺ) প্রতি ভালোবাসার পূর্ণতা এখানেই: তাঁকে ভালোবাসা, কিন্তু ইবাদত শুধু আল্লাহর।

প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়

এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।

দুর্বল মৃত্যুর ফেরেশতা দরজায় এসে অনুমতি চেয়েছিলেন, আর জিবরীল (আ.) সাথে ছিলেন

ওয়াজে খুব প্রচলিত এই দীর্ঘ বর্ণনা (মালাকুল মাওতের অনুমতি চাওয়া, জিবরীলের সাথে কথোপকথন) তাবারানী ও অন্যান্য গ্রন্থে দুর্বল বা অত্যন্ত দুর্বল সনদে এসেছে। সহিহ বর্ণনায় শুধু আছে যে প্রত্যেক নবীকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, আর তিনি বলেছিলেন: হে আল্লাহ, সর্বোচ্চ সঙ্গী (সহিহ বুখারী ৪৪৬৩)।

মতভেদ আছে নবীজির (ﷺ) জন্ম ও ইন্তেকাল দুটোই নিশ্চিতভাবে ১২ রবিউল আউয়াল

সহিহ হাদিসে নিশ্চিত শুধু এটুকু: তিনি সোমবার জন্মেছেন (সহিহ মুসলিম ১১৬২) আর সোমবার ইন্তেকাল করেছেন (সহিহ বুখারী ৬৮০)। ইন্তেকালের তারিখ হিসেবে ১২ রবিউল আউয়াল প্রসিদ্ধ হলেও ১ ও ২ তারিখের মতও আছে; জন্মতারিখ নিয়ে মতভেদ আরও বেশি। আর কোনো তারিখকেই সাহাবিরা উৎসব বা শোক দিবস হিসেবে পালন করেননি।

এই গল্প থেকে আমার জীবনে

গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।

নামাজ, নামাজ

জ্ঞান ফিরলেই প্রথম প্রশ্ন: লোকেরা কি নামাজ পড়েছে? আর শেষ উপদেশ: নামাজ, নামাজ।

আজকের কাজ: আজ পাঁচ ওয়াক্তের কোনো একটা নামাজ, যেটা সবচেয়ে বেশি দেরি করে পড়েন, প্রথম ওয়াক্তে পড়ুন।

সহিহ বুখারী ৬৮৭ সহিহসুনানে আবু দাউদ ৫১৫৬ সহিহ

অধীনদের হক

শেষ কথাগুলোর মধ্যে ছিল: তোমাদের অধীনদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।

আজকের কাজ: বাসার গৃহকর্মী, ড্রাইভার বা অফিসের অধীন কর্মীর বেতন বা প্রাপ্য বাকি থাকলে আজ মিটিয়ে দিন, আর তাদের সাথে নরম কথা বলুন।

সুনানে আবু দাউদ ৫১৫৬ সহিহ

মিসওয়াকের সুন্নাহ

জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি মিসওয়াক চেয়েছিলেন।

আজকের কাজ: আজ থেকে অজুর সময় মিসওয়াক বা ব্রাশ করার অভ্যাস করুন।

সহিহ বুখারী ৪৪৪৯ সহিহ

মৃত্যুর প্রস্তুতি

তিনি ঋণ ও দায়িত্ব নিয়ে সচেতন ছিলেন, আর মৃত্যুকে দেখেছেন আল্লাহর সাক্ষাৎ হিসেবে।

আজকের কাজ: আজ একটা কাগজে আপনার ঋণ, পাওনা আর ওসিয়ত লিখে রাখুন।

সহিহ বুখারী ২৯১৬ সহিহসহিহ বুখারী ৪৪৬৩ সহিহ

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন

আবু বকর (রা.) বলেছিলেন: যে মুহাম্মাদের (ﷺ) ইবাদত করত, তিনি মারা গেছেন; যে আল্লাহর ইবাদত করত, আল্লাহ চিরঞ্জীব। আপনার দ্বীন কি কোনো মানুষের উপর দাঁড়িয়ে, নাকি চিরঞ্জীব আল্লাহর উপর?

সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
  • কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
  • সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
  • ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
  • মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
  • দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।

সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sirat/intekal/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার