deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

إِسْمَاعِيل عَلَيْهِ السَّلَامُ

ইসমাঈল (আ.)

প্রতিশ্রুতিতে সত্যবাদী রাসূলআরবদের পূর্বপুরুষ

ইসমাঈল (আ.) ইবরাহীম (আ.)-এর বড় ছেলে, বৃদ্ধ বয়সের দোয়ার ফসল। দুধের শিশু অবস্থায় মায়ের সাথে পানিহীন মক্কায় তাঁকে রেখে আসা হয়, তাঁর জন্যই যমযম বের হয়। কিশোর বয়সে আল্লাহর আদেশে নিজেকে কুরবানির জন্য পেশ করেন, যুবক বয়সে পিতার সাথে কাবা গাঁথেন। কুরআন তাঁকে বলেছে প্রতিশ্রুতিতে সত্যবাদী রাসূল ও নবী। তাঁর বংশেই এসেছেন শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)।

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ ۚ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا

আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইসমাঈলকে, তিনি তো ছিলেন প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসুল, নবী;

সূরা মারইয়াম ১৯:৫৪
১২বার নাম এসেছে কুরআনে
৮টি সূরায় আলোচনা
১৫টি আয়াত এই পাতায়
৪টি সহিহ হাদিস

এই পাতার মূল ঘটনা কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া। তাফসীর ও ইতিহাসের বই (ইবনু কাসীর, তাবারী প্রভৃতি) থেকে যা এসেছে, তা আলাদা বাক্সে মানসহ দেখানো হয়েছে; ইসরাঈলি বর্ণনা (আগের কিতাবধারীদের কাছ থেকে আসা গল্প) চিহ্ন দিয়ে আলাদা করা, দলিল হিসেবে নয়। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।

পিতা-মাতা
ইবরাহীম (আ.) ও হাজার (আ.)
পরিচয়
প্রতিশ্রুতিতে সত্যবাদী রাসূল ও নবী (সূরা মারইয়াম ১৯:৫৪)
বসবাস
মক্কা, জুরহুম গোত্রের মাঝে (সহিহ বুখারী ৩৩৬৫)
বংশধর
আরবের আদনানী গোত্রগুলো, কুরাইশ ও নবী (ﷺ) (সহিহ মুসলিম ২২৭৬)
কুরআনে যেখানে
সূরা আল-বাকারা, ইবরাহীম, মারইয়াম, আল-আম্বিয়া, আস-সাফফাত, সোয়াদ সহ কয়েকটি সূরায়
জন্ম ও মক্কার শৈশব
১
📍 শাম (ফিলিস্তিন)

দোয়ার ফসল: এক সহনশীল পুত্র

নিজের দেশ আর পরিবার ছেড়ে আসার পর ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর কাছে একটি নেক সন্তান চেয়েছিলেন। আল্লাহ সুসংবাদ দিলেন:

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ

'হে আমার রব! আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।'

সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০০

فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ

অতঃপর আমরা তাকে এক সহিষ্ণু পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।

সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০১

"হালীম" মানে সহনশীল, ধৈর্যশীল। পরের ঘটনাগুলোতেই দেখা যাবে, এই শব্দ তাঁর সাথে কতটা মানানসই। বৃদ্ধ বয়সে এই সন্তান পেয়ে ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর প্রশংসা করেছেন:

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ ۚ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌রই, যিনি আমাকে আমার বার্ধক্যে ইসমা’ঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দো’আ শ্রবণকারী।

সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৯
শিক্ষাসন্তান আল্লাহর দান। নেক সন্তানের জন্য দোয়া করা নবীদের সুন্নাত।
২
📍 মক্কা

মরুভূমিতে মা ও শিশু, আর যমযম

ইসমাঈল (আ.) তখনো দুধের শিশু। আল্লাহর আদেশে ইবরাহীম (আ.) তাঁকে আর তাঁর মা হাজারকে নিয়ে এলেন এমন এক উপত্যকায়, যেখানে না মানুষ ছিল, না পানি। সেখানেই আজকের মক্কা:

তারপর ইবরাহীম (আ.) হাজার ও তাঁর দুধের শিশু ইসমাঈলকে নিয়ে এসে কাবাঘরের কাছে, যমযমের উপরে মসজিদের উঁচু জায়গায় একটি বড় গাছের নিচে রাখলেন। তখন মক্কায় কোনো মানুষ ছিল না, পানিও ছিল না। তিনি তাঁদের কাছে এক থলে খেজুর আর এক মশক পানি রেখে ফিরে চললেন। ইসমাঈলের মা পিছু পিছু এসে বললেন: হে ইবরাহীম! এমন উপত্যকায় আমাদের রেখে কোথায় যাচ্ছেন, যেখানে কোনো মানুষ নেই, কিছুই নেই? তিনি কয়েকবার বললেন, কিন্তু ইবরাহীম (আ.) তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন না। তখন তিনি বললেন: আল্লাহ কি আপনাকে এই আদেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। হাজার বললেন: তাহলে তিনি আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।

সহিহ বুখারী ৩৩৬৪ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)

ফিরে যাওয়ার পথে ইবরাহীম (আ.) দোয়া করলেন:

رَّبَّنَا إِنِّي أَسْكَنتُ مِن ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِندَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ

হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে, হে আমাদের রব! এ জন্য যে, তারা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফল-ফলাদি দিয়ে তাদের রিযকের ব্যবস্থা করুন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৭

পানি শেষ হলে শিশু পিপাসায় ছটফট করতে লাগল। মা সাফা আর মারওয়া পাহাড়ে সাতবার ছোটাছুটি করলেন, কাউকে দেখা যায় কিনা। শেষে ফেরেশতা এসে পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন, আর বের হলো যমযমের পানি। নবী (ﷺ) বলেছেন, মানুষ যে সাফা-মারওয়ায় সাঈ করে, তা এরই স্মরণ (বুখারী ৩৩৬৪-এর পূর্ণ বর্ণনা)।

পানির খোঁজ পেয়ে জুরহুম গোত্রের লোকেরা এসে হাজার (আ.)-এর অনুমতি নিয়ে সেখানে বসতি করল। ইসমাঈল (আ.) তাদের মাঝে বড় হলেন, তাদের কাছ থেকে আরবি শিখলেন।

শিক্ষাআল্লাহর আদেশে যে ভরসা করে, আল্লাহ তাকে নষ্ট হতে দেন না। এক মায়ের ভরসা থেকেই একটি শহর আর একটি ইবাদতের জন্ম।
৩
📍 মিনা, মক্কা

কুরবানির পরীক্ষা: "বাবা, আদেশ পালন করুন"

ইসমাঈল (আ.) বাবার সাথে চলাফেরা আর কাজ করার বয়সে পৌঁছালেন। তখন ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন, তিনি ছেলেকে যবেহ করছেন। নবীদের স্বপ্নও ওহী। তিনি ছেলেকে জোর না করে তাঁর মত জানতে চাইলেন, আর ছেলের উত্তর ইতিহাসে অমর হয়ে আছে:

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَىٰ ۚ قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ

অতঃপর তিনি যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হলেন, তখন ইবরাহীম বললেন, 'হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী বল?' তিনি বললেন, 'হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশপ্ৰাপ্ত হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।'

সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০২

লক্ষ করুন, তিনি নিজের সাহসের কথা বলেননি, বলেছেন "ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন"। দুজনেই আত্মসমর্পণ করলেন, বাবা ছেলেকে কাত করে শোয়ালেন। তখন আল্লাহ ডাক দিলেন:

وَنَادَيْنَاهُ أَن يَا إِبْرَاهِيمُ

তখন আমরা তাকে ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহীম!

সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০৪

قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا ۚ إِنَّا كَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ

আপনি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যই পালন করলেন!’---এভাবেই আমরা মুহসিনদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।

সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০৫

إِنَّ هَـٰذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ

নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা।

সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০৬

وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ

আর আমরা তাকে মুক্ত করলাম এক বড় যবেহ এর বিনিময়ে।

সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০৭
শিক্ষাআল্লাহর আদেশের সামনে ছোট-বড় সবাই সমান। নিজের শক্তির উপর নয়, "ইনশাআল্লাহ" বলে আল্লাহর উপর ভরসা করুন।
পরিবার, কাবা ও নবুয়ত
৪
📍 মক্কা

দুই বিয়ে আর পিতার উপদেশ

ইসমাঈল (আ.) জুরহুম গোত্রের এক মেয়েকে বিয়ে করলেন। এর মধ্যে হাজার (আ.) ইন্তেকাল করেন। একদিন ইবরাহীম (আ.) খোঁজ নিতে এলেন, ছেলে তখন শিকারে। পুত্রবধূকে সংসারের অবস্থা জিজ্ঞেস করলে সে শুধু অভাব-অভিযোগ করল। ইবরাহীম (আ.) বলে গেলেন, ছেলেকে বলো, ঘরের চৌকাঠ বদলে ফেলতে। ইসমাঈল (আ.) বুঝলেন, এটা পিতার উপদেশ, আর সেই স্ত্রীকে বিদায় দিলেন। পরে আরেকজনকে বিয়ে করলেন। এবার ইবরাহীম (আ.) এসে দেখলেন নতুন বউ আল্লাহর প্রশংসা করছে, সামান্য মাংস আর পানিতেই সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য বরকতের দোয়া করলেন, আর বলে গেলেন চৌকাঠ ধরে রাখতে:

জুরহুম গোত্রের কিছু লোক উপত্যকার নিচ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা কিছু পাখি উড়তে দেখে অবাক হলো, বলল: পাখি তো পানি ছাড়া ঘোরে না। তারা একজনকে পাঠাল, সে গিয়ে দেখে পানি আছে। ফিরে এসে খবর দিল। তারা হাজার (আ.)-এর কাছে এসে বলল: হে ইসমাঈলের মা, আমাদের কি আপনার সাথে থাকার অনুমতি দেবেন? (তিনি অনুমতি দিলেন।) তাঁর ছেলে বড় হলো আর তাদের এক মেয়েকে বিয়ে করল। তারপর ইবরাহীম (আ.)-এর মনে হলো, যাদের রেখে এসেছি তাদের খোঁজ নিই। তিনি এসে সালাম দিয়ে বললেন: ইসমাঈল কোথায়? তাঁর স্ত্রী বলল: শিকারে গেছেন। তিনি বললেন: সে এলে বলবে, তোমার দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলো। ইসমাঈল ফিরলে স্ত্রী তাঁকে জানাল। তিনি বললেন: তুমিই সেই চৌকাঠ, তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আবার ইবরাহীম (আ.)-এর মনে হলো, খোঁজ নিই। এসে বললেন: ইসমাঈল কোথায়? (নতুন) স্ত্রী বলল: শিকারে গেছেন; আপনি কি নামবেন না, কিছু খাবেন-পান করবেন না? তিনি বললেন: তোমাদের খাবার কী, পানীয় কী? সে বলল: আমাদের খাবার মাংস, পানীয় পানি। তিনি দোয়া করলেন: হে আল্লাহ, তাদের খাবার ও পানীয়তে বরকত দিন। নবী (ﷺ) বললেন: (মক্কার খাবারে) এটা ইবরাহীমের দোয়ার বরকত। আবার তাঁর মনে হলো, খোঁজ নিই। এবার এসে দেখেন, ইসমাঈল যমযমের পেছনে বসে নিজের তীর ঠিক করছেন। বললেন: হে ইসমাঈল, তোমার রব আমাকে তাঁর জন্য একটি ঘর বানাতে আদেশ করেছেন। ইসমাঈল বললেন: আপনার রবের আনুগত্য করুন। তিনি বললেন: তিনি আমাকে আদেশ করেছেন, তুমি যেন আমাকে সাহায্য করো। ইসমাঈল বললেন: তাহলে আমি তা-ই করব। তারপর দুজনে দাঁড়ালেন। ইবরাহীম (আ.) গাঁথতে লাগলেন, ইসমাঈল পাথর এগিয়ে দিতে লাগলেন, আর দুজনে বলছিলেন: "হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সব শোনেন, সব জানেন" (২:১২৭)। দেয়াল উঁচু হলে বৃদ্ধ পিতা পাথর তুলতে কষ্ট পাচ্ছিলেন, তখন তিনি মাকামের পাথরের উপর দাঁড়ালেন।

সহিহ বুখারী ৩৩৬৫ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)

এই হাদিসে দেখা যায়, ঘরের শান্তির মূল কথা কৃতজ্ঞতা। একই অভাবের মধ্যে একজন অভিযোগ করে, আরেকজন আল্লাহর প্রশংসা করে।

শিক্ষাসংসারে অভিযোগ নয়, কৃতজ্ঞতাই বরকত আনে। বাবা-মায়ের ভালো পরামর্শ মেনে চলা সন্তানের মর্যাদা।
৫
📍 কাবা, মক্কা

পিতা-পুত্র মিলে কাবা নির্মাণ

তৃতীয়বার ইবরাহীম (আ.) এসে দেখলেন, ইসমাঈল (আ.) যমযমের পাশে বসে তীর ঠিক করছেন। বললেন, আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে আদেশ করেছেন, তুমি কি সাহায্য করবে? ছেলে এক কথায় রাজি। বাবা গাঁথেন, ছেলে পাথর এগিয়ে দেন, আর দুজনে দোয়া করেন:

وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিলেন, (তারা বলছিলেন) ‘হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

সূরা আল-বাকারা ২:১২৭

رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

‘হে আমাদের রব ! আর আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার এক অনুগত জাতি উত্থিত করুন। আর আমাদেরকে ‘‘ইবাদাতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমদের তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনিই বেশী তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

সূরা আল-বাকারা ২:১২৮

এরপর তাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দোয়া করলেন, যা হাজার হাজার বছর পর কবুল হয়েছে, তাঁদেরই বংশে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আগমনে:

رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

‘হে আমাদের রব! আর আপনি তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসূল পাঠান, যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করবেন ; তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’।

সূরা আল-বাকারা ২:১২৯

আল্লাহ দুজনকে দায়িত্ব দিলেন এই ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী আর নামাজিদের জন্য পবিত্র রাখতে (সূরা আল-বাকারা ২:১২৫)।

শিক্ষাবড় কাজ করেও "কবুল করুন" বলে বিনয়ী থাকা নবীদের পথ। ভালো কাজে পরিবার একসাথে হলে তাতে বরকত।
৬
📍 মক্কা ও আশপাশ

প্রতিশ্রুতিতে সত্যবাদী রাসূল

কুরআন ইসমাঈল (আ.)-এর আলাদা প্রশংসা করেছে দুটি গুণের জন্য: কথা রাখা, আর পরিবারকে নামাজ-যাকাতের তাগিদ দেওয়া:

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ ۚ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا

আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইসমাঈলকে, তিনি তো ছিলেন প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসুল, নবী;

সূরা মারইয়াম ১৯:৫৪

وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِندَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا

তিনি তার পরিজনবর্গকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি ছিলেন তার রবের সন্তোষভাজন।

সূরা মারইয়াম ১৯:৫৫

তিনি আল্লাহর সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন ("আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন"), তা রেখেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে গণ্য করেছেন (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৫), আর সারা জগতের উপর মর্যাদা দেওয়া নবীদের তালিকায় রেখেছেন (সূরা আল-আনআম ৬:৮৬)।

শিক্ষাকথা দিলে কথা রাখুন; আর নিজের পরিবারকে দিয়ে দাওয়াত শুরু করুন।
বংশ ও শেষ জীবন
৭
📍 মক্কা

তীরন্দাজ পিতা ও তাঁর বংশ

ইসমাঈল (আ.) ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ। নবী (ﷺ) সাহাবিদের তীর ছোড়ার প্রতিযোগিতায় উৎসাহ দিতে গিয়ে তাঁকে তাদের পিতা বলে স্মরণ করেছেন:

নবী (ﷺ) আসলাম গোত্রের একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা তীর ছোড়ার প্রতিযোগিতা করছিল। তিনি বললেন: হে ইসমাঈলের বংশধর, তীর ছোড়ো; তোমাদের পিতা (ইসমাঈল আ.) দক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন। তীর ছোড়ো, আমি অমুক দলের সাথে আছি।

সহিহ বুখারী ২৮৯৯ সহিহ বর্ণনা: সালামা ইবনুল আকওয়া (রা.)

আরবের বড় অংশ, আর বিশেষ করে কুরাইশ বংশ তাঁরই সন্তান। আল্লাহ এই বংশ থেকেই শেষ নবীকে বেছে নিয়েছেন:

আল্লাহ ইসমাঈলের সন্তানদের মধ্য থেকে কিনানাকে বেছে নিয়েছেন, কিনানা থেকে কুরাইশকে বেছে নিয়েছেন, কুরাইশ থেকে বনু হাশিমকে বেছে নিয়েছেন, আর বনু হাশিম থেকে আমাকে বেছে নিয়েছেন।

সহিহ মুসলিম ২২৭৬ সহিহ বর্ণনা: ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রা.)
শিক্ষাবংশমর্যাদা নয়, তাকওয়াই আসল। তবে নেক পূর্বপুরুষের দোয়া আর আমলের বরকত প্রজন্মের পর প্রজন্মে পৌঁছায়।
৮
📍 হিজর, মক্কা

শেষ জীবন ও ইন্তেকাল

কুরআন ও সহিহ হাদিসে ইসমাঈল (আ.)-এর ইন্তেকালের বিবরণ আসেনি। কুরআন এটুকু জানিয়েছে, ইয়াকুব (আ.)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর সন্তানরা ইসমাঈল (আ.)-কেও নিজেদের "পিতা"দের মধ্যে গণ্য করে একই আল্লাহর ইবাদতের অঙ্গীকার করেছিল:

أَمْ كُنتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِن بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَـٰهَكَ وَإِلَـٰهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَـٰهًا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

ইয়াকুবের যখন মৃত্যু এসেছিল তোমর কি তখন উপস্থিত ছিলে ? তিনি যখন সন্তানদের বলেছিলেন, ‘আমার পরে তোমরা কার ‘ইবাদাত করবে’ ? তারা বলেছিলো, ‘আমরা আপনার ইলাহ ও আপনার পিতৃ পুরুষ ইবরাহীম, ইস্‌মাঈল ও ইসহাকের ইলাহ্‌ - সেই এক ইলাহ্‌রই ‘ইবাদাত করবো। আর আমরা তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণকারী’।

সূরা আল-বাকারা ২:১৩৩
শিক্ষানবীদের জীবনের শেষ খবর না জানলেও তাঁদের রেখে যাওয়া দ্বীন আমাদের হাতে আছে; সেটাই আসল উত্তরাধিকার।

শেখা ও রিসোর্স

দোয়া, হাদিস, শিক্ষা, ভুল ধারণা আর কুরআনে কোথায় পড়বেন

দোয়া

কাজ কবুলের দোয়া (কাবা নির্মাণের সময়)

وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴿١٢٧﴾ رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ ﴿١٢٨﴾

আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিলেন, (তারা বলছিলেন) ‘হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। ‘হে আমাদের রব ! আর আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার এক অনুগত জাতি উত্থিত করুন। আর আমাদেরকে ‘‘ইবাদাতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমদের তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনিই বেশী তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

সূরা আল-বাকারা ২:১২৭-১২৮
পরবর্তী প্রজন্মের হিদায়াতের দোয়া

رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ﴿١٢٩﴾

‘হে আমাদের রব! আর আপনি তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসূল পাঠান, যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করবেন ; তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’।

সূরা আল-বাকারা ২:১২৯

দোয়াগুলো কুরআনের আয়াত, তাই আরবি হুবহু রাখা হয়েছে; অর্থ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে।

অন্য নবীদের জীবনী

deenpedia.com · https://deenpedia.com/nabi/ismail/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার