يَعْقُوب عَلَيْهِ السَّلَامُ
ইয়াকুব (আ.)
ইয়াকুব (আ.) ইসহাক (আ.)-এর ছেলে, ইবরাহীম (আ.)-এর নাতি। তাঁর আরেক নাম ইসরাঈল, আর তাঁর বারো ছেলের বংশধরই বনী ইসরাঈল। প্রিয় ছেলে ইউসুফকে হারিয়ে তিনি বছরের পর বছর কেঁদেছেন, চোখ সাদা হয়ে গেছে, তবু অভিযোগ করেছেন শুধু আল্লাহর কাছে। তাঁর "সুন্দর ধৈর্য" কুরআনের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ শিক্ষাগুলোর একটি।
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
তিনি বললেন, ‘আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহ্র কাছেই নিবেদন করছি এবং আমি আল্লাহ্র কাছ থেকে তা জানি যা তোমরা জান না।
এই পাতার মূল ঘটনা কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া। তাফসীর ও ইতিহাসের বই (ইবনু কাসীর, তাবারী প্রভৃতি) থেকে যা এসেছে, তা আলাদা বাক্সে মানসহ দেখানো হয়েছে; ইসরাঈলি বর্ণনা (আগের কিতাবধারীদের কাছ থেকে আসা গল্প) চিহ্ন দিয়ে আলাদা করা, দলিল হিসেবে নয়। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
- পিতা
- ইসহাক (আ.); দাদা ইবরাহীম (আ.) (সূরা ইউসুফ ১২:৩৮)
- আরেক নাম
- ইসরাঈল (সূরা আলে ইমরান ৩:৯৩, জামে আত-তিরমিযী ৩১১৭)
- সন্তান
- বারো ছেলে, তাঁদের মধ্যে ইউসুফ ও বিনইয়ামীন (সূরা ইউসুফ ১২:৪)
- বিশেষ গুণ
- "সুন্দর ধৈর্য" (সূরা ইউসুফ ১২:১৮, সূরা ইউসুফ ১২:৮৩)
- কুরআনে যেখানে
- সূরা ইউসুফে বিস্তারিত; আল-বাকারা, আলে ইমরান, মারইয়াম, সোয়াদ সহ বহু সূরায় নাম
সুসংবাদে জন্ম, নবুয়তের উত্তরাধিকার
ইয়াকুব (আ.)-এর জন্মের সুসংবাদ এসেছিল তাঁর বাবা ইসহাকের জন্মের আগেই, ফেরেশতাদের মুখে:
وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَاقَ وَمِن وَرَاءِ إِسْحَاقَ يَعْقُوبَ
আর তাঁর স্ত্রী দাঁড়ানো ছিলেন, অতঃপর তিনি হেসে ফেললেন। অতঃপর আমরা তাকে ইস্হাকের ও ইস্হাকের পরবর্তী ইয়া’কূবের সুসংবাদ দিলাম।
সূরা হুদ ১১:৭১
আল্লাহ তাঁকে বলেছেন ইবরাহীম (আ.)-এর জন্য "নাফিলা", অর্থাৎ চাওয়ার চেয়েও বাড়তি দান (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭২)। ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুব (আ.) তিন প্রজন্মকে আল্লাহ একসাথে প্রশংসা করেছেন:
فَلَمَّا اعْتَزَلَهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ۖ وَكُلًّا جَعَلْنَا نَبِيًّا
অতঃপর তিনি যখন তাদের থেকে ও তারা আল্লাহ্ ছাড়া যাদের ‘ইবাদাত করত সেসব থেকে পৃথক হয়ে গেলেন, তখন আমরা তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়া’কুব এনং প্রত্যেককে নবী করলাম।
وَوَهَبْنَا لَهُم مِّن رَّحْمَتِنَا وَجَعَلْنَا لَهُمْ لِسَانَ صِدْقٍ عَلِيًّا
এবং তাদেরকে আমরা দান করলাম আমাদের অনুগ্রহ, আর তাদের নাম-যশ সমুচ্চ করলাম।
সূরা মারইয়াম ১৯:৫০
ইসরাঈল: যে খাবার নিজের উপর হারাম করেছিলেন
কুরআন ইয়াকুব (আ.)-কে "ইসরাঈল" নামেও উল্লেখ করেছে। আলেমরা বলেন, এর অর্থ "আল্লাহর বান্দা"। ইহুদিরা দাবি করত, তাদের উপর যা হারাম তা সবসময়ই হারাম ছিল। আল্লাহ জানালেন:
كُلُّ الطَّعَامِ كَانَ حِلًّا لِّبَنِي إِسْرَائِيلَ إِلَّا مَا حَرَّمَ إِسْرَائِيلُ عَلَىٰ نَفْسِهِ مِن قَبْلِ أَن تُنَزَّلَ التَّوْرَاةُ ۗ قُلْ فَأْتُوا بِالتَّوْرَاةِ فَاتْلُوهَا إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
তাওরাত নাযিল হওয়ার আগে ইস্রাঈল তার নিজের উপর যা হারাম করেছিল তা ছাড়া বনী ইসরাঈলের জন্য যাবতীয় খাদ্যই হালাল ছিল। বলুন, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তাওরাত আন এবং তা পাঠ কর।’
সূরা আলে ইমরান ৩:৯৩
কোন খাবার? মদিনার ইহুদিরা নবী (ﷺ)-কে এই প্রশ্নই করেছিল, আর তিনি উত্তর দিয়েছিলেন:
(ইহুদিরা নবী ﷺ-কে কয়েকটি প্রশ্ন করার পর বলল:) আমাদের বলুন, ইসরাঈল নিজের উপর কী হারাম করেছিলেন? তিনি বললেন: তাঁর সায়াটিকা (কোমর থেকে পায়ে নামা রগের ব্যথা) হয়েছিল। উটের গোশত আর উটের দুধ ছাড়া তাঁর উপযোগী কিছু পাননি, তাই তিনি এগুলো (নিজের উপর) হারাম করেছিলেন। তারা বলল: আপনি সত্য বলেছেন।
হাররানে হিজরত ও পরিবার
কুরআন ইয়াকুব (আ.)-এর যৌবনের ঘটনা বলেনি। এটুকু জানা যায়, তাঁর বারো ছেলে ছিল (ইউসুফের স্বপ্নে এগারো তারা মানে এগারো ভাই, সূরা ইউসুফ ১২:৪), আর তাঁদের মধ্যে ইউসুফ ও তাঁর ছোট ভাই (বিনইয়ামীন) ছিলেন এক মায়ের সন্তান (সূরা ইউসুফ ১২:৮)। ইতিহাসের বইয়ে বাকি বিবরণ এসেছে আহলে কিতাব থেকে:
ইউসুফের স্বপ্ন আর বাবার সতর্কতা
ছোট্ট ইউসুফ স্বপ্নে দেখলেন এগারো তারা, সূর্য আর চাঁদ তাঁকে সিজদা করছে। ইয়াকুব (আ.) বুঝলেন, এ ছেলের বড় ভবিষ্যৎ আছে, আর বুঝলেন ভাইদের হিংসার ভয়ও:
قَالَ يَا بُنَيَّ لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَىٰ إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا ۖ إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
তিনি বললেন, ‘হে আমার বৎস! তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বলো না; বললে তাঁরা তোমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।
وَكَذَٰلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَىٰ آلِ يَعْقُوبَ كَمَا أَتَمَّهَا عَلَىٰ أَبَوَيْكَ مِن قَبْلُ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ ۚ إِنَّ رَبَّكَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
আর এভাবে আপনার রব আপনাকে মনোনীত করবেন এবং আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন এবং আপনার প্রতি ও ইয়া’কুবের পরিবার পরিজনদের উপর তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি এটা আগে পূর্ণ করেছিলেন আপনার পিতৃ-পুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের উপর। নিশ্চয় আপনার রব সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
সূরা ইউসুফ ১২:৬
ভাইয়েরা মনে করত, বাবা ইউসুফ আর তাঁর ভাইকে বেশি ভালোবাসেন (সূরা ইউসুফ ১২:৮)। একদিন তারা ইউসুফকে খেলতে নিয়ে যেতে চাইল। বাবার মন সায় দিল না:
قَالَ إِنِّي لَيَحْزُنُنِي أَن تَذْهَبُوا بِهِ وَأَخَافُ أَن يَأْكُلَهُ الذِّئْبُ وَأَنتُمْ عَنْهُ غَافِلُونَ
তিনি বললেন, ‘এটা আমাকে অবশ্যই কষ্ট দেবে যে তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি আশংকা করি তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে, আর তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী থাকবে।’
সূরা ইউসুফ ১২:১৩
রক্তমাখা জামা: "সুন্দর ধৈর্য"
রাতের বেলা ছেলেরা কাঁদতে কাঁদতে এল, হাতে ইউসুফের জামা, তাতে মিথ্যা রক্ত। বলল, নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে। ইয়াকুব (আ.) বুঝলেন এটা সাজানো গল্প, কিন্তু ভেঙে পড়লেন না:
وَجَاءُوا عَلَىٰ قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ ۚ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ
আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। তিনি বললেন, ‘না, বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে। কাজেই উত্তম ধৈর্যই আমি গ্রহণ করব। আর তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ্ই আমার সাহায্যস্থল।
"সাবরুন জামীল" বা সুন্দর ধৈর্য মানে এমন ধৈর্য, যাতে মানুষের কাছে অভিযোগ নেই। শত শত বছর পরে আয়েশা (রা.) যখন মিথ্যা অপবাদের সবচেয়ে কঠিন দিন পার করছিলেন, তখন এই কথাই তাঁর মুখে এসেছিল:
(মিথ্যা অপবাদের সময় নবী ﷺ তাঁকে তওবা করতে বললে আয়েশা রা. বললেন:) আল্লাহর কসম, আমি আমার জন্য ইউসুফের পিতার উদাহরণ ছাড়া আর কোনো উদাহরণ পাচ্ছি না: "সুতরাং সুন্দর ধৈর্যই উত্তম, আর তোমরা যা বলছ, তার বিপরীতে আল্লাহই সাহায্যস্থল" (১২:১৮)।
সহিহ বুখারী ৪৬৯০ সহিহ বর্ণনা: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)
দুর্ভিক্ষ, বিনইয়ামীন ও বাবার উপদেশ
বহু বছর পর দুর্ভিক্ষের সময় ছেলেরা মিসর থেকে খাদ্য আনতে গেল। মিসরের আযীয (যিনি আসলে ইউসুফ) শর্ত দিলেন, পরের বার ছোট ভাইকে আনতে হবে (সূরা ইউসুফ ১২:৬০)। ইয়াকুব (আ.) আগের অভিজ্ঞতা মনে করে প্রথমে রাজি হলেন না, পরে আল্লাহর নামে অঙ্গীকার নিয়ে পাঠালেন (সূরা ইউসুফ ১২:৬৬)। যাওয়ার সময় একটি উপদেশ দিলেন, যাতে সতর্কতা আর ভরসা দুটোই আছে:
وَقَالَ يَا بَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِن بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُّتَفَرِّقَةٍ ۖ وَمَا أُغْنِي عَنكُم مِّنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ ۖ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ۖ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ
আর তিনি বললেন, ‘হে আমার পুত্ৰগণ! তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না, ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহ্র সিদ্ধান্তের বিপরীতে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না। হুকুমের মালিক তো আল্লাহ্ই। আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি। আর আল্লাহ্রই উপর যেন নির্ভরকারীরা নির্ভর করে।’
তাফসীরকাররা বলেন, এগারোজন সুদর্শন ভাই একসাথে ঢুকলে মানুষের নজর লাগতে পারে, তাই এই উপদেশ। কিন্তু সাথেই বললেন, আল্লাহর ফয়সালা থেকে আমি তোমাদের বাঁচাতে পারব না, ভরসা শুধু তাঁরই উপর।
দ্বিতীয় আঘাত: চোখ সাদা হয়ে গেল
এবার ছেলেরা ফিরল বিনইয়ামীনকে ছাড়া, বলল সে চুরি করেছে, আর বড় ভাই লজ্জায় মিসরেই রয়ে গেছে। ইয়াকুব (আ.)-এর উত্তর আগের মতোই, সাথে নতুন আশা:
قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ عَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
ইয়া’কূব বললেন, ‘না, তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে, কাজেই উত্তম ধৈর্য্যই আমি গ্রহণ করব; হয়ত আল্লাহ্ তাদেরকে একসঙ্গে আমার কাছে এনে দেবেন। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’
সূরা ইউসুফ ১২:৮৩
তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পুরোনো ক্ষত আবার জেগে উঠল:
وَتَوَلَّىٰ عَنْهُمْ وَقَالَ يَا أَسَفَىٰ عَلَىٰ يُوسُفَ وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ
আর তিনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেন, ‘আফসোস ইউসুফের জন্য।’ শোকে তার চোখ দু’টি সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ছিলেন সংবরণকারী।
সূরা ইউসুফ ১২:৮৪
ছেলেরা বলল, ইউসুফের কথা ভাবতে ভাবতে আপনি তো শেষ হয়ে যাবেন (সূরা ইউসুফ ১২:৮৫)। তাঁর উত্তর কান্নার আর অভিযোগের আদব শিখিয়ে দেয়:
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
তিনি বললেন, ‘আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহ্র কাছেই নিবেদন করছি এবং আমি আল্লাহ্র কাছ থেকে তা জানি যা তোমরা জান না।
তারপর বললেন, যাও, ইউসুফ আর তার ভাইকে খোঁজো, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না (সূরা ইউসুফ ১২:৮৭)।
ইউসুফের গন্ধ, ফিরে পাওয়া দৃষ্টি
ইউসুফ (আ.) ভাইদের হাতে নিজের জামা পাঠালেন, বললেন বাবার চেহারায় রাখতে, তাঁর দৃষ্টি ফিরে আসবে (সূরা ইউসুফ ১২:৯৩)। কাফেলা মিসর ছাড়তেই কেনানে বসে ইয়াকুব (আ.) বললেন:
وَلَمَّا فَصَلَتِ الْعِيرُ قَالَ أَبُوهُمْ إِنِّي لَأَجِدُ رِيحَ يُوسُفَ ۖ لَوْلَا أَن تُفَنِّدُونِ
আর যখন যাত্রীদল বের হয়ে পড়ল তখন তাদের পিতা বললেন, ‘তোমরা যদি আমাকে বৃদ্ধ-অপ্রকৃতস্থ মনে না কর তবে বলি, আমি ইউসুফের ঘ্ৰাণ পাচ্ছি।’
সূরা ইউসুফ ১২:৯৪
সুসংবাদদাতা এসে জামাটি তাঁর চেহারায় রাখল, আর তিনি দেখতে পেলেন:
فَلَمَّا أَن جَاءَ الْبَشِيرُ أَلْقَاهُ عَلَىٰ وَجْهِهِ فَارْتَدَّ بَصِيرًا ۖ قَالَ أَلَمْ أَقُل لَّكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
অতঃপর যখন সুসংবাদবাহক উপস্থিত হল এবং তাঁর চেহারার উপর জামাটি রাখল তখন তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন। তিনি বললেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহ্র কাছ থেকে যা জানি তা তোমরা জান না?’
লজ্জিত ছেলেরা ক্ষমা চাইল। তিনি বললেন, আমি শীঘ্রই আমার রবের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা চাইব (সূরা ইউসুফ ১২:৯৭, সূরা ইউসুফ ১২:৯৮)।
মিসরে পুনর্মিলন
পুরো পরিবার মিসরে গেল। ইউসুফ (আ.) বাবা-মাকে নিজের কাছে টেনে নিলেন, সিংহাসনে বসালেন, আর সবাই তাঁর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। সেদিন শৈশবের স্বপ্ন সত্য হলো:
فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَىٰ يُوسُفَ آوَىٰ إِلَيْهِ أَبَوَيْهِ وَقَالَ ادْخُلُوا مِصْرَ إِن شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ
অতঃপর তারা যখন ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল, তখন তিনি তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং বললেন, ‘আপনারা আল্লাহ্র ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।’
সূরা ইউসুফ ১২:৯৯
وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا ۖ وَقَالَ يَا أَبَتِ هَـٰذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا ۖ وَقَدْ أَحْسَنَ بِي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ وَجَاءَ بِكُم مِّنَ الْبَدْوِ مِن بَعْدِ أَن نَّزَغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي ۚ إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِّمَا يَشَاءُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
আর ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে উঁচু আসনে বসালেন এবং তারা সবাই তার সম্মানে সাজদায় লুটিয়ে পড়ল। তিনি বললেন, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার আগেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা; আমার রব এটা সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেন এবং শয়তান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার রব যা ইচ্ছে তা নিপুণতার সাথে করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’
সেই যুগে সম্মানের সিজদা বৈধ ছিল; আমাদের শরিয়তে আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা নিষিদ্ধ।
মৃত্যুশয্যার অসিয়ত ও ইন্তেকাল
জীবনের শেষ মুহূর্তে ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের ডেকে একটাই প্রশ্ন করলেন: আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে? সম্পদ, জমি বা রাজত্বের কথা নয়:
أَمْ كُنتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِن بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَـٰهَكَ وَإِلَـٰهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَـٰهًا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
ইয়াকুবের যখন মৃত্যু এসেছিল তোমর কি তখন উপস্থিত ছিলে ? তিনি যখন সন্তানদের বলেছিলেন, ‘আমার পরে তোমরা কার ‘ইবাদাত করবে’ ? তারা বলেছিলো, ‘আমরা আপনার ইলাহ ও আপনার পিতৃ পুরুষ ইবরাহীম, ইস্মাঈল ও ইসহাকের ইলাহ্ - সেই এক ইলাহ্রই ‘ইবাদাত করবো। আর আমরা তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণকারী’।
এর আগে তিনিও ইবরাহীম (আ.)-এর মতো সন্তানদের অসিয়ত করেছিলেন: আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দ্বীন বেছে নিয়েছেন, মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না (সূরা আল-বাকারা ২:১৩২)।
শেখা ও রিসোর্স
দোয়া, হাদিস, শিক্ষা, ভুল ধারণা আর কুরআনে কোথায় পড়বেন
দোয়া
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ ﴿٨٦﴾
তিনি বললেন, ‘আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহ্র কাছেই নিবেদন করছি এবং আমি আল্লাহ্র কাছ থেকে তা জানি যা তোমরা জান না।
সূরা ইউসুফ ১২:৮৬وَجَاءُوا عَلَىٰ قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ ۚ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ ﴿١٨﴾
আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। তিনি বললেন, ‘না, বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে। কাজেই উত্তম ধৈর্যই আমি গ্রহণ করব। আর তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ্ই আমার সাহায্যস্থল।
সূরা ইউসুফ ১২:১৮দোয়াগুলো কুরআনের আয়াত, তাই আরবি হুবহু রাখা হয়েছে; অর্থ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে।
হাদিস
فَأَخْبِرْنَا عَمَّا حَرَّمَ إِسْرَائِيلُ عَلَى نَفْسِهِ قَالَ " اشْتَكَى عِرْقَ النَّسَا فَلَمْ يَجِدْ شَيْئًا يُلاَئِمُهُ إِلاَّ لُحُومَ الإِبِلِ وَأَلْبَانَهَا فَلِذَلِكَ حَرَّمَهَا " . قَالُوا صَدَقْتَ
(ইহুদিরা নবী ﷺ-কে কয়েকটি প্রশ্ন করার পর বলল:) আমাদের বলুন, ইসরাঈল নিজের উপর কী হারাম করেছিলেন? তিনি বললেন: তাঁর সায়াটিকা (কোমর থেকে পায়ে নামা রগের ব্যথা) হয়েছিল। উটের গোশত আর উটের দুধ ছাড়া তাঁর উপযোগী কিছু পাননি, তাই তিনি এগুলো (নিজের উপর) হারাম করেছিলেন। তারা বলল: আপনি সত্য বলেছেন।
قُلْتُ إِنِّي وَاللَّهِ لاَ أَجِدُ مَثَلاً إِلاَّ أَبَا يُوسُفَ {فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ
(মিথ্যা অপবাদের সময় নবী ﷺ তাঁকে তওবা করতে বললে আয়েশা রা. বললেন:) আল্লাহর কসম, আমি আমার জন্য ইউসুফের পিতার উদাহরণ ছাড়া আর কোনো উদাহরণ পাচ্ছি না: "সুতরাং সুন্দর ধৈর্যই উত্তম, আর তোমরা যা বলছ, তার বিপরীতে আল্লাহই সাহায্যস্থল" (১২:১৮)।
শিক্ষা
অবদান
- বনী ইসরাঈলের বারো গোত্রের পিতা।
- কুরআনে ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি আশার শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত (সূরা ইউসুফ ১২:১৮, সূরা ইউসুফ ১২:৮৭)।
- মৃত্যুশয্যায় তাওহীদের অসিয়ত, যা প্রত্যেক বাবা-মায়ের আদর্শ (সূরা আল-বাকারা ২:১৩৩)।
জীবনের রোডম্যাপ
- ১জন্ম
ইসহাক (আ.)-এর ঘরে, ফেরেশতাদের সুসংবাদ অনুযায়ী (সূরা হুদ ১১:৭১)।
- ২নাম
ইসরাঈল; যে খাবার নিজের উপর হারাম করেছিলেন (সূরা আলে ইমরান ৩:৯৩, জামে আত-তিরমিযী ৩১১৭)।
- ৩পরিবার
বারো ছেলে; ইউসুফ ও বিনইয়ামীন এক মায়ের (সূরা ইউসুফ ১২:৪, সূরা ইউসুফ ১২:৮)। বিবরণ আহলে কিতাব থেকে।
- ৪ইউসুফকে হারানো
"সুন্দর ধৈর্য" (সূরা ইউসুফ ১২:১৮)।
- ৫বিনইয়ামীনকে হারানো
চোখ সাদা হয়ে যাওয়া, আল্লাহর কাছে অভিযোগ (সূরা ইউসুফ ১২:৮৪, সূরা ইউসুফ ১২:৮৬)।
- ৬দৃষ্টি ফিরে পাওয়া
ইউসুফের জামা চেহারায় রাখার পর (সূরা ইউসুফ ১২:৯৬)।
- ৭মিসরে পুনর্মিলন
- ৮ইন্তেকাল
সন্তানদের তাওহীদের অসিয়ত (সূরা আল-বাকারা ২:১৩৩)। ইতিহাসবিদদের মতে মিসরে, হেবরনে দাফন।
ভুল ধারণা
ইয়াকুব (আ.) এক ফেরেশতার সাথে কুস্তি লড়েছিলেন, তাই তাঁর নাম ইসরাঈল।
বেশি কাঁদা বা দুঃখ প্রকাশ করা ধৈর্যের খেলাপ।
লোকমুখে চলা গল্প যাচাই করা হয়েছে মুহাদ্দিসদের মান অনুযায়ী। কোনো গল্প এখানে না থাকলে, তা সঠিক বলে ধরে নেবেন না; দলিল দেখে নিন।
কুরআনে পড়ুন
পুরো ঘটনা ধারাবাহিকভাবে পড়তে এই অংশগুলো খুলুন।
| বিষয় | সূরা | আয়াত | সংখ্যা |
|---|---|---|---|
| তাওহীদের অসিয়ত | সূরা আল-বাকারা | ২:১৩২-১৩৩ | ২ |
| যা নিজের উপর হারাম করেছিলেন | সূরা আলে ইমরান | ৩:৯৩-৯৫ | ৩ |
| পুরো কাহিনী | সূরা ইউসুফ | ১২:৪-১০১ | ৯৮ |
| তিন প্রজন্মের প্রশংসা | সূরা মারইয়াম | ১৯:৪৯-৫০ | ২ |
| বাড়তি দান | সূরা আল-আম্বিয়া | ২১:৭২-৭৩ | ২ |
| শক্তিশালী ও দৃষ্টিমান | সূরা সোয়াদ | ৩৮:৪৫-৪৭ | ৩ |
যাচাই
১ইয়াকুব (আ.)-এর আরেক নাম কী?
ইসরাঈল (৩:৯৩)।
২"ফাসাবরুন জামীল" কথাটি ইয়াকুব (আ.) কখন বলেছিলেন?
ইউসুফের রক্তমাখা জামা দেখে (১২:১৮), আর বিনইয়ামীনের খবরে আবার (১২:৮৩)।
৩মৃত্যুশয্যায় ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের কী জিজ্ঞেস করেছিলেন?
"আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে?" (২:১৩৩)।
সূত্র
- আল-কুরআনুল কারীম
আরবি পাঠ: তানযীল (হাফস)। বাংলা অর্থ: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, হুবহু। - সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম
বুখারীর নম্বর ফাতহুল বারী অনুযায়ী, মুসলিমের নম্বর মুহাম্মাদ ফুআদ আব্দুল বাকী অনুযায়ী। - তাফসীর ইবনু কাসীর
সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা; ইসরাঈলি বর্ণনা চিনতে ইবনু কাসীরের নিজের মন্তব্যও কাজে লাগে। - কাসাসুল আম্বিয়া ও আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া (১ম খণ্ড)
ইবনু কাসীর। আরও পড়ার জন্য; এখানে শুধু কুরআন ও সহিহ হাদিসের অংশ রাখা হয়েছে। - সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দঈফা ওয়াল মাওযূআ
মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী। দুর্বল ও জাল বর্ণনা যাচাইয়ের জন্য।
সাইটের সব সূত্র: সূত্র তালিকা · সূত্র নীতি