دَاوُود عَلَيْهِ السَّلَامُ
দাউদ (আ.)
দাউদ (আ.) ছিলেন একই সাথে নবী ও বাদশাহ। তরুণ বয়সে অত্যাচারী জালূতকে হত্যা করে খ্যাতি পান, পরে আল্লাহ তাঁকে রাজত্ব, প্রজ্ঞা আর যাবূর কিতাব দেন। তাঁর কণ্ঠ এত সুন্দর ছিল যে পাহাড় আর পাখি তাঁর সাথে তাসবীহ পড়ত। রাজা হয়েও তিনি নিজের হাতে বর্ম বানিয়ে উপার্জন করে খেতেন, আর তাঁর নামাজ ও রোজাকে নবী (ﷺ) আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বলেছেন।
وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُودَ مِنَّا فَضْلًا ۖ يَا جِبَالُ أَوِّبِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ ۖ وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ
আর অবশ্যই আমরা আমাদের পক্ষ থেকে দাউদকে দিয়েছিলাম মর্যাদা এবং আদেশ করেছিলাম, 'হে পর্বতমালা! তোমরা দাউদের সাথে বার বার আমার পবিত্ৰতা ঘোষণা কর' এবং পাখিদেরকেও। আর তার জন্য আমরা নরম করে দিয়েছিলাম লোহা---
এই পাতার মূল ঘটনা কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া। তাফসীর ও ইতিহাসের বই (ইবনু কাসীর, তাবারী প্রভৃতি) থেকে যা এসেছে, তা আলাদা বাক্সে মানসহ দেখানো হয়েছে; ইসরাঈলি বর্ণনা (আগের কিতাবধারীদের কাছ থেকে আসা গল্প) চিহ্ন দিয়ে আলাদা করা, দলিল হিসেবে নয়। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
- কিতাব
- যাবূর (সূরা আন-নিসা ৪:১৬৩, সূরা আল-ইসরা ১৭:৫৫)
- দায়িত্ব
- নবী ও খলীফা, ন্যায়বিচারক (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৬)
- মুজিযা
- পাহাড় ও পাখির তাসবীহ, লোহা নরম হওয়া (সূরা সাবা ৩৪:১০)
- সন্তান
- সুলাইমান (আ.) (সূরা সোয়াদ ৩৮:৩০)
- কুরআনে যেখানে
- সূরা আল-বাকারা, আন-নিসা, আল-আম্বিয়া, আন-নামল, সাবা ও সোয়াদ সহ কয়েকটি সূরায়
তালূতের বাহিনীতে এক তরুণ
মূসা (আ.)-এর অনেক পরে বনী ইসরাঈল শত্রুর হাতে পরাজিত হয়ে নিজেদের জন্য একজন বাদশাহ চাইল। আল্লাহ তালূতকে বাদশাহ বানালেন (সূরা আল-বাকারা ২:২৪৭)। জালূতের বিশাল বাহিনীর সামনে তালূতের ছোট দলের মুমিনরা দোয়া করল (সূরা আল-বাকারা ২:২৫০)। তারপর:
فَهَزَمُوهُم بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ ۗ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَـٰكِنَّ اللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعَالَمِينَ
অতঃপর তারা আল্লাহ্র হুকুমে তাদেরকে (কাফেরদেরকে) পরাভূত করল এবং দাউদ জালূতকে হত্যা করলেন। আর আল্লাহ্ তাকে রাজত্ব ও হেকমত দান করলেন এবং যা তিনি ইচ্ছা করলেন তা তাকে শিক্ষা দিলেন। আর আল্লাহ্ যদি মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন তবে পৃথিবী বিপর্যস্ত হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ্ সৃষ্টিকুলের প্রতি অনুগ্রহশীল।
এই আয়াতেই দাউদ (আ.)-এর জীবনের মোড় ঘোরা: জালূতকে হত্যা, তারপর রাজত্ব, প্রজ্ঞা আর আল্লাহর শেখানো জ্ঞান।
রাজত্ব, প্রজ্ঞা ও খিলাফত
আল্লাহ দাউদ (আ.)-এর রাজত্বকে মজবুত করলেন, আর দিলেন প্রজ্ঞা ও স্পষ্ট ফয়সালার ক্ষমতা (সূরা সোয়াদ ৩৮:২০)। তাঁকে বললেন:
يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَىٰ فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ
‘হে দাউদ! আমরা আপনাকে যমীনে খলীফা বানিয়েছি, অতএব আপনি লোকদের মধ্যে সুবিচার করুন এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না। কেননা এটা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।’ নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে ভ্ৰষ্ট হয় তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। কারণ, তারা বিচার দিনকে ভুলে আছে।
খিলাফতের শর্ত এই আয়াতে স্পষ্ট: ন্যায়বিচার, আর নিজের খেয়ালখুশির অনুসরণ না করা।
যাবূর আর সুমধুর কণ্ঠ
আল্লাহ দাউদ (আ.)-কে যাবূর দিয়েছেন (সূরা আন-নিসা ৪:১৬৩), আর কিছু নবীকে অন্যদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন:
وَرَبُّكَ أَعْلَمُ بِمَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۗ وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَىٰ بَعْضٍ ۖ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا
আর যারা আসমানসমূহ ও যমীনে আছে তাদের সম্পর্কে আপনার রব অধিক অবগত। আর অবশ্যই আমরা নবীগণের কিছু সংখ্যককে কিছু সংখ্যকের উপর মর্যাদা দিয়েছি এবং দাউদকে দিয়েছি যাবূর।
তাঁর জন্য যাবূর পড়া এত সহজ করা হয়েছিল যে, বাহনে জিন লাগানোর আগেই পড়ে ফেলতেন:
দাউদ (আ.)-এর জন্য কিতাব (যাবূর) পড়া সহজ করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি নিজের বাহনগুলোতে জিন লাগানোর আদেশ দিতেন, আর বাহন প্রস্তুত হওয়ার আগেই (যাবূর) পড়ে শেষ করতেন। আর তিনি নিজের হাতের উপার্জন ছাড়া খেতেন না।
সহিহ বুখারী ৩৪১৭ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরাইরা (রা.)
তাঁর কণ্ঠ ছিল প্রবাদতুল্য। সাহাবি আবু মূসা আশআরী (রা.)-এর সুন্দর তিলাওয়াত শুনে নবী (ﷺ) তাঁর কণ্ঠের সাথে তুলনা করেছেন:
(নবী ﷺ আবু মূসার কুরআন তিলাওয়াত শুনে বললেন:) হে আবু মূসা, তোমাকে দাউদ পরিবারের সুমধুর কণ্ঠের একটি অংশ দেওয়া হয়েছে।
সহিহ বুখারী ৫০৪৮ সহিহ বর্ণনা: আবু মূসা আশআরী (রা.)
পাহাড় ও পাখির তাসবীহ, লোহার বর্ম
আল্লাহ পাহাড় আর পাখিদের আদেশ দিলেন দাউদের সাথে তাসবীহ পড়তে, আর তাঁর জন্য লোহা নরম করে দিলেন:
وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُودَ مِنَّا فَضْلًا ۖ يَا جِبَالُ أَوِّبِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ ۖ وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ
আর অবশ্যই আমরা আমাদের পক্ষ থেকে দাউদকে দিয়েছিলাম মর্যাদা এবং আদেশ করেছিলাম, 'হে পর্বতমালা! তোমরা দাউদের সাথে বার বার আমার পবিত্ৰতা ঘোষণা কর' এবং পাখিদেরকেও। আর তার জন্য আমরা নরম করে দিয়েছিলাম লোহা---
أَنِ اعْمَلْ سَابِغَاتٍ وَقَدِّرْ فِي السَّرْدِ ۖ وَاعْمَلُوا صَالِحًا ۖ إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
(এ নির্দেশ দিয়ে যে) আপনি পূর্ণ মাপের বর্ম তৈরী করুন এবং বুননে পরিমাণ রক্ষা করুন’। আর তোমরা সৎকাজ কর, নিশ্চয় তোমরা যা কিছু কর আমি তার সম্যক দ্রষ্টা।
সূরা সাবা ৩৪:১১
সূরা সোয়াদে আছে, সকাল-সন্ধ্যায় পাহাড় তাঁর সাথে তাসবীহ পড়ত, আর পাখিরা দলে দলে এসে জড়ো হতো (সূরা সোয়াদ ৩৮:১৮, সূরা সোয়াদ ৩৮:১৯)। তিনিই প্রথম কড়া জোড়া দিয়ে বর্ম বানানো শুরু করেন, যাতে যুদ্ধে মানুষ রক্ষা পায় (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮০)।
রাজা, কিন্তু নিজের হাতের উপার্জনে
একজন বাদশাহ চাইলে রাজকোষ থেকে খেতে পারতেন। কিন্তু দাউদ (আ.) নিজে বর্ম বানিয়ে বিক্রি করে খেতেন। নবী (ﷺ) এটাকেই সবচেয়ে উত্তম খাবারের দৃষ্টান্ত বানিয়েছেন:
নিজ হাতে উপার্জন করে খাওয়ার চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতের উপার্জন থেকে খেতেন।
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নামাজ ও রোজা
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) সারা বছর রোজা আর সারা রাত নামাজ পড়তে চাইলে নবী (ﷺ) তাঁকে দাউদ (আ.)-এর পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন:
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নামাজ দাউদ (আ.)-এর নামাজ, আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি রাতের অর্ধেক ঘুমাতেন, এক-তৃতীয়াংশ নামাজে দাঁড়াতেন, তারপর ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন। আর তিনি এক দিন রোজা রাখতেন, এক দিন রাখতেন না।
রাতের শেষ ভাগে উঠে এক-তৃতীয়াংশ নামাজ, তারপর একটু ঘুম যাতে ফজরে সতেজ থাকা যায়; আর এক দিন পরপর রোজা। ইবাদতে ভারসাম্যের এর চেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত কম আছে।
দুই বিবাদী ও দাউদ (আ.)-এর তাওবা
একদিন দাউদ (আ.) ইবাদতখানায় ছিলেন। হঠাৎ দেয়াল টপকে দুজন লোক ঢুকল। তিনি ভয় পেলেন। তারা বলল, ভয় পাবেন না, আমরা দুই বিবাদী, ন্যায়বিচার করুন (সূরা সোয়াদ ৩৮:২১, সূরা সোয়াদ ৩৮:২২)। একজন বলল:
إِنَّ هَـٰذَا أَخِي لَهُ تِسْعٌ وَتِسْعُونَ نَعْجَةً وَلِيَ نَعْجَةٌ وَاحِدَةٌ فَقَالَ أَكْفِلْنِيهَا وَعَزَّنِي فِي الْخِطَابِ
'নিশ্চয় এ ব্যক্তি আমার ভাই, এর আছে নিরানব্বইটি ভেড়ী। আর আমার আছে মাত্র একটি ভেড়ী। তবুও সে বলে, ‘আমার যিম্মায় এটি দিয়ে দাও' এবং কথায় সে আমার প্ৰতি প্ৰাধান্য বিস্তার করেছে।
সূরা সোয়াদ ৩৮:২৩
قَالَ لَقَدْ ظَلَمَكَ بِسُؤَالِ نَعْجَتِكَ إِلَىٰ نِعَاجِهِ ۖ وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْخُلَطَاءِ لَيَبْغِي بَعْضُهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَّا هُمْ ۗ وَظَنَّ دَاوُودُ أَنَّمَا فَتَنَّاهُ فَاسْتَغْفَرَ رَبَّهُ وَخَرَّ رَاكِعًا وَأَنَابَ ۩
দাউদ বললেন, 'তোমার ভেড়ীটিকে তার ভেড়িগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার দাবী করে সে তোমার প্রতি যুলুম করেছে। আর শরীকদের অনেকে একে অন্যের উপর তো সীমালংঘন করে থাকে---করে না শুধু যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, আর তারা সংখ্যায় স্বল্প।’ আর দাউদ বুঝতে পারলেন, আমরা তো তাকে পরীক্ষা করলাম। অতঃপর তিনি তার রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং নত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন, আর তাঁর অভিমুখী হলেন।
রায় দিয়েই দাউদ (আ.) বুঝলেন, এটা আল্লাহর পরীক্ষা ছিল। সাথে সাথে তিনি ক্ষমা চেয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন, আর আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করলেন (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৫)। এই সিজদার স্মরণে নবী (ﷺ)-ও সূরা সোয়াদে সিজদা করতেন:
আমি ইবনু আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি সূরা সোয়াদে সিজদা করব? তিনি পড়লেন: "তাঁর বংশধরদের মধ্যে দাউদ, সুলাইমান..." (৬:৮৪) থেকে "সুতরাং তাদের পথ অনুসরণ করুন" (৬:৯০) পর্যন্ত। তারপর বললেন: তোমাদের নবী (ﷺ) তাঁদের একজন, যাঁদের অনুসরণ করার আদেশ তাঁকে দেওয়া হয়েছে (তাই দাউদ আ. যেখানে সিজদা করেছেন, তিনিও সেখানে সিজদা করেছেন)।
সহিহ বুখারী ৩৪২১ সহিহ বর্ণনা: মুজাহিদ (রহ.), ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে
শস্যক্ষেতের মামলা ও দুই মায়ের বিচার
দাউদ (আ.)-এর আদালতে এক মামলা এল: এক সম্প্রদায়ের ছাগল রাতে আরেকজনের শস্যক্ষেত নষ্ট করেছে। দাউদ ও তাঁর ছেলে সুলাইমান (আ.) দুজনেই রায় দিলেন, আর আল্লাহ সুলাইমানকে বেশি সঠিক রায়টি বুঝিয়ে দিলেন:
وَدَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ إِذْ يَحْكُمَانِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِينَ
আর স্মরণ করুন দাউদ ও সুলায়মানকে, যখন তাঁরা বিচার করছিলেন শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে; তাতে রাতে প্রবেশ করেছিল কোনো সম্প্রদায়ের মেষ; আর আমরা তাদের বিচার পর্যবেক্ষণ করছিলাম।
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭৮
فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ ۚ وَكُلًّا آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا ۚ وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ ۚ وَكُنَّا فَاعِلِينَ
অতঃপর আমরা সুলায়মানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে আমরা দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আর আমরা পর্বত ও পাখিদেরকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, তারা তার সাথে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত, আর আমরাই ছিলাম এ সবের কর্তা।
আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেছেন, দুজনকেই প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিয়েছিলাম; অর্থাৎ দাউদ (আ.)-এর রায়ও অন্যায় ছিল না। একই রকম আরেকটি ঘটনা নবী (ﷺ) শুনিয়েছেন:
দুজন নারী ছিল, সাথে তাদের দুই ছেলে। নেকড়ে এসে একজনের ছেলেকে নিয়ে গেল। তখন একজন বলল: নেকড়ে তোমার ছেলেকে নিয়েছে। অন্যজন বলল: না, তোমার ছেলেকে নিয়েছে। তারা দাউদ (আ.)-এর কাছে বিচার চাইল, তিনি শিশুটিকে বড়জনকে দিলেন। তারা বের হয়ে সুলাইমান ইবনু দাউদের কাছে গিয়ে ঘটনা জানাল। তিনি বললেন: একটা ছুরি আনো, শিশুটিকে দুই ভাগ করে দুজনকে দিই। তখন ছোটজন বলল: এমন করবেন না, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন, এ ওরই ছেলে। তখন তিনি শিশুটিকে ছোটজনকে দিলেন।
সহিহ বুখারী ৩৪২৭ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরাইরা (রা.)
ইন্তেকাল
দাউদ (আ.)-এর পর তাঁর উত্তরাধিকারী হলেন সুলাইমান (আ.):
وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُودَ ۖ وَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِن كُلِّ شَيْءٍ ۖ إِنَّ هَـٰذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِينُ
আর সুলাইমান হয়েছিলেন দাউদের উত্তরাধিকারী এবং তিনি বলেছিলেন, ‘হে মানুষ! আমাদেরকে পাখিদের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে সবকিছু দেয়া হয়েছে, এটা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।’
শেখা ও রিসোর্স
দোয়া, হাদিস, শিক্ষা, ভুল ধারণা আর কুরআনে কোথায় পড়বেন
দোয়া
وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ ﴿٢٥٠﴾
আর তারা যখন যুদ্ধার্থে জালুত ও তার সেনাবাহিনীর সম্মুখীন হল তখন তারা বলল, ‘হে আমাদের রব! আমাদের উপর ধৈর্য ঢেলে দিন, আমাদের পা অবিচলিত রাখুন এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের জয়জুক্ত করুন।’
সূরা আল-বাকারা ২:২৫০وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ عِلْمًا ۖ وَقَالَا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي فَضَّلَنَا عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّنْ عِبَادِهِ الْمُؤْمِنِينَ ﴿١٥﴾
আর অবশ্যই আমরা দাউদ ও সুলাইমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম এবং তারা উভয়ে বলেছিলেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ্র যিনি আমাদেরকে তাঁর বহু মুমিন বান্দাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।’
সূরা আন-নামল ২৭:১৫দোয়াগুলো কুরআনের আয়াত, তাই আরবি হুবহু রাখা হয়েছে; অর্থ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে।
হাদিস
خُفِّفَ عَلَى دَاوُدَ ـ عَلَيْهِ السَّلاَمُ ـ الْقُرْآنُ، فَكَانَ يَأْمُرُ بِدَوَابِّهِ فَتُسْرَجُ، فَيَقْرَأُ الْقُرْآنَ قَبْلَ أَنْ تُسْرَجَ دَوَابُّهُ، وَلاَ يَأْكُلُ إِلاَّ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ
দাউদ (আ.)-এর জন্য কিতাব (যাবূর) পড়া সহজ করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি নিজের বাহনগুলোতে জিন লাগানোর আদেশ দিতেন, আর বাহন প্রস্তুত হওয়ার আগেই (যাবূর) পড়ে শেষ করতেন। আর তিনি নিজের হাতের উপার্জন ছাড়া খেতেন না।
يَا أَبَا مُوسَى لَقَدْ أُوتِيتَ مِزْمَارًا مِنْ مَزَامِيرِ آلِ دَاوُدَ
(নবী ﷺ আবু মূসার কুরআন তিলাওয়াত শুনে বললেন:) হে আবু মূসা, তোমাকে দাউদ পরিবারের সুমধুর কণ্ঠের একটি অংশ দেওয়া হয়েছে।
مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ، وَإِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ دَاوُدَ ـ عَلَيْهِ السَّلاَمُ ـ كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ
নিজ হাতে উপার্জন করে খাওয়ার চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতের উপার্জন থেকে খেতেন।
أَحَبُّ الصَّلاَةِ إِلَى اللَّهِ صَلاَةُ دَاوُدَ ـ عَلَيْهِ السَّلاَمُ ـ وَأَحَبُّ الصِّيَامِ إِلَى اللَّهِ صِيَامُ دَاوُدَ، وَكَانَ يَنَامُ نِصْفَ اللَّيْلِ وَيَقُومُ ثُلُثَهُ وَيَنَامُ سُدُسَهُ، وَيَصُومُ يَوْمًا وَيُفْطِرُ يَوْمًا
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নামাজ দাউদ (আ.)-এর নামাজ, আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি রাতের অর্ধেক ঘুমাতেন, এক-তৃতীয়াংশ নামাজে দাঁড়াতেন, তারপর ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন। আর তিনি এক দিন রোজা রাখতেন, এক দিন রাখতেন না।
قُلْتُ لاِبْنِ عَبَّاسٍ أَسْجُدُ فِي {ص} فَقَرَأَ {وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ} حَتَّى أَتَى {فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهْ} فَقَالَ نَبِيُّكُمْ صلى الله عليه وسلم مِمَّنْ أُمِرَ أَنْ يَقْتَدِيَ بِهِمْ
আমি ইবনু আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি সূরা সোয়াদে সিজদা করব? তিনি পড়লেন: "তাঁর বংশধরদের মধ্যে দাউদ, সুলাইমান..." (৬:৮৪) থেকে "সুতরাং তাদের পথ অনুসরণ করুন" (৬:৯০) পর্যন্ত। তারপর বললেন: তোমাদের নবী (ﷺ) তাঁদের একজন, যাঁদের অনুসরণ করার আদেশ তাঁকে দেওয়া হয়েছে (তাই দাউদ আ. যেখানে সিজদা করেছেন, তিনিও সেখানে সিজদা করেছেন)।
দুজন নারী ছিল, সাথে তাদের দুই ছেলে। নেকড়ে এসে একজনের ছেলেকে নিয়ে গেল। তখন একজন বলল: নেকড়ে তোমার ছেলেকে নিয়েছে। অন্যজন বলল: না, তোমার ছেলেকে নিয়েছে। তারা দাউদ (আ.)-এর কাছে বিচার চাইল, তিনি শিশুটিকে বড়জনকে দিলেন। তারা বের হয়ে সুলাইমান ইবনু দাউদের কাছে গিয়ে ঘটনা জানাল। তিনি বললেন: একটা ছুরি আনো, শিশুটিকে দুই ভাগ করে দুজনকে দিই। তখন ছোটজন বলল: এমন করবেন না, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন, এ ওরই ছেলে। তখন তিনি শিশুটিকে ছোটজনকে দিলেন।
শিক্ষা
অবদান
- যাবূর কিতাব (সূরা আল-ইসরা ১৭:৫৫)।
- বর্ম তৈরির কৌশল, মানুষের সুরক্ষার জন্য (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮০)।
- ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টান্ত (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৬)।
জীবনের রোডম্যাপ
- ১যৌবন
তালূতের বাহিনীতে জালূতকে হত্যা (সূরা আল-বাকারা ২:২৫১)।
- ২রাজত্ব ও নবুয়ত
রাজত্ব, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান (সূরা আল-বাকারা ২:২৫১, সূরা সোয়াদ ৩৮:২০)।
- ৩কিতাব
যাবূর (সূরা আন-নিসা ৪:১৬৩, সূরা আল-ইসরা ১৭:৫৫)।
- ৪মুজিযা
পাহাড় ও পাখির তাসবীহ, লোহা নরম হওয়া (সূরা সাবা ৩৪:১০)।
- ৫বিচার
খলীফা ও বিচারক (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৬); শস্যক্ষেতের মামলা (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭৮)।
- ৬পরীক্ষা ও তাওবা
দুই বিবাদীর ঘটনা (সূরা সোয়াদ ৩৮:২১-সূরা সোয়াদ ৩৮:২৫)।
- ৭ইন্তেকাল
হঠাৎ, মালাকুল মাওতের আগমনে (মুসনাদ আহমাদ); উত্তরাধিকারী সুলাইমান (সূরা আন-নামল ২৭:১৬)।
ভুল ধারণা
দাউদ (আ.) উরিয়ার স্ত্রীকে পাওয়ার জন্য তাকে যুদ্ধে পাঠিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন।
যাবূর আর বর্তমান বাইবেলের "গীতসংহিতা" (Psalms) হুবহু এক।
লোকমুখে চলা গল্প যাচাই করা হয়েছে মুহাদ্দিসদের মান অনুযায়ী। কোনো গল্প এখানে না থাকলে, তা সঠিক বলে ধরে নেবেন না; দলিল দেখে নিন।
কুরআনে পড়ুন
পুরো ঘটনা ধারাবাহিকভাবে পড়তে এই অংশগুলো খুলুন।
| বিষয় | সূরা | আয়াত | সংখ্যা |
|---|---|---|---|
| তালূত ও জালূত | সূরা আল-বাকারা | ২:২৪৬-২৫১ | ৬ |
| যাবূর | সূরা আল-ইসরা | ১৭:৫৫-৫৫ | ১ |
| শস্যক্ষেতের বিচার, বর্ম | সূরা আল-আম্বিয়া | ২১:৭৮-৮০ | ৩ |
| জ্ঞান ও উত্তরাধিকার | সূরা আন-নামল | ২৭:১৫-১৬ | ২ |
| পাহাড়, পাখি ও লোহা | সূরা সাবা | ৩৪:১০-১১ | ২ |
| দুই বিবাদী ও খিলাফত | সূরা সোয়াদ | ৩৮:১৭-২৬ | ১০ |
যাচাই
১দাউদ (আ.) কাকে হত্যা করে খ্যাতি পান?
জালূতকে (২:২৫১)।
২নবী (ﷺ)-এর মতে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা কোনটি?
দাউদ (আ.)-এর রোজা: একদিন রোজা, একদিন বিরতি (বুখারী ১১৩১)।
৩দাউদ (আ.) কীভাবে জীবিকা অর্জন করতেন?
নিজের হাতে বর্ম বানিয়ে (বুখারী ২০৭২; ২১:৮০)।
সূত্র
- আল-কুরআনুল কারীম
আরবি পাঠ: তানযীল (হাফস)। বাংলা অর্থ: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, হুবহু। - সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম
বুখারীর নম্বর ফাতহুল বারী অনুযায়ী, মুসলিমের নম্বর মুহাম্মাদ ফুআদ আব্দুল বাকী অনুযায়ী। - তাফসীর ইবনু কাসীর
সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা; ইসরাঈলি বর্ণনা চিনতে ইবনু কাসীরের নিজের মন্তব্যও কাজে লাগে। - কাসাসুল আম্বিয়া ও আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া (১ম খণ্ড)
ইবনু কাসীর। আরও পড়ার জন্য; এখানে শুধু কুরআন ও সহিহ হাদিসের অংশ রাখা হয়েছে। - সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দঈফা ওয়াল মাওযূআ
মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী। দুর্বল ও জাল বর্ণনা যাচাইয়ের জন্য।
সাইটের সব সূত্র: সূত্র তালিকা · সূত্র নীতি