deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

سُلَيْمَان عَلَيْهِ السَّلَامُ

সুলাইমান (আ.)

নবী ও অনন্য রাজত্বের অধিকারী

সুলাইমান (আ.) দাউদ (আ.)-এর ছেলে ও উত্তরাধিকারী। আল্লাহ তাঁকে এমন রাজত্ব দিয়েছেন, যা তাঁর পরে আর কাউকে দেওয়া হয়নি: বাতাস তাঁর আদেশে চলত, জিনেরা তাঁর জন্য কাজ করত, পাখি ও পিঁপড়ার ভাষা তিনি বুঝতেন। তবু প্রতিটি নিয়ামত দেখে তিনি বলতেন, "এটা আমার রবের অনুগ্রহ, আমাকে পরীক্ষা করার জন্য, আমি কৃতজ্ঞ হই নাকি অকৃতজ্ঞ।"

فَتَبَسَّمَ ضَاحِكًا مِّن قَوْلِهَا وَقَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ

অতঃপর সুলাইমান তার এ কথাতে মৃদু হাসলেন এবং বললেন, ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন যাতে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি আপনি যে অনুগ্রহ করেছেন তার জন্য এবং যাতে আমি এমন সৎকাজ করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন। আর আপনার অনুগ্রহে আমাকে আপনার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের শামিল করুন।’

সূরা আন-নামল ২৭:১৯
১৭বার নাম এসেছে কুরআনে
৭টি সূরায় আলোচনা
১৬টি আয়াত এই পাতায়
৪টি সহিহ হাদিস

এই পাতার মূল ঘটনা কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া। তাফসীর ও ইতিহাসের বই (ইবনু কাসীর, তাবারী প্রভৃতি) থেকে যা এসেছে, তা আলাদা বাক্সে মানসহ দেখানো হয়েছে; ইসরাঈলি বর্ণনা (আগের কিতাবধারীদের কাছ থেকে আসা গল্প) চিহ্ন দিয়ে আলাদা করা, দলিল হিসেবে নয়। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।

পিতা
দাউদ (আ.) (সূরা সোয়াদ ৩৮:৩০, সূরা আন-নামল ২৭:১৬)
বিশেষ জ্ঞান
পাখির ভাষা (সূরা আন-নামল ২৭:১৬)
বশীভূত
বাতাস, জিন ও পাখি (সূরা সাবা ৩৪:১২, সূরা আন-নামল ২৭:১৭)
নির্মাণ
বাইতুল মাকদিস (সুনানে আন-নাসাঈ ৬৯৩)
কুরআনে যেখানে
সূরা আল-বাকারা, আল-আম্বিয়া, আন-নামল, সাবা ও সোয়াদ সহ কয়েকটি সূরায়
উত্তরাধিকার ও প্রজ্ঞা
১
📍 বাইতুল মাকদিস

দাউদের উত্তরাধিকারী, শৈশবেই প্রজ্ঞা

আল্লাহ দাউদ (আ.)-কে সুলাইমান দান করেছেন, আর তাঁর প্রশংসা করেছেন:

وَوَهَبْنَا لِدَاوُودَ سُلَيْمَانَ ۚ نِعْمَ الْعَبْدُ ۖ إِنَّهُ أَوَّابٌ

আর আমরা দাউদকে দান করলাম সুলাইমান। কতই না উত্তম বান্দা তিনি! নিশ্চয় তিনি ছিলেন অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী।

সূরা সোয়াদ ৩৮:৩০

অল্প বয়সেই তাঁর বিচারবুদ্ধি প্রকাশ পায়। শস্যক্ষেতের মামলায় আল্লাহ তাঁকে বেশি সঠিক ফয়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭৯)। দুই মায়ের এক শিশু নিয়ে বিবাদের সময় তিনি এক কৌশলে আসল মাকে চিনে ফেলেন:

দুজন নারী ছিল, সাথে তাদের দুই ছেলে। নেকড়ে এসে একজনের ছেলেকে নিয়ে গেল। তখন একজন বলল: নেকড়ে তোমার ছেলেকে নিয়েছে। অন্যজন বলল: না, তোমার ছেলেকে নিয়েছে। তারা দাউদ (আ.)-এর কাছে বিচার চাইল, তিনি শিশুটিকে বড়জনকে দিলেন। তারা বের হয়ে সুলাইমান ইবনু দাউদের কাছে গিয়ে ঘটনা জানাল। তিনি বললেন: একটা ছুরি আনো, শিশুটিকে দুই ভাগ করে দুজনকে দিই। তখন ছোটজন বলল: এমন করবেন না, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন, এ ওরই ছেলে। তখন তিনি শিশুটিকে ছোটজনকে দিলেন।

সহিহ বুখারী ৩৪২৭ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরাইরা (রা.)

পরে তিনি পিতার উত্তরাধিকারী হলেন, নবুয়ত, জ্ঞান ও রাজত্বে:

وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُودَ ۖ وَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِن كُلِّ شَيْءٍ ۖ إِنَّ هَـٰذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِينُ

আর সুলাইমান হয়েছিলেন দাউদের উত্তরাধিকারী এবং তিনি বলেছিলেন, ‘হে মানুষ! আমাদেরকে পাখিদের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে সবকিছু দেয়া হয়েছে, এটা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।’

সূরা আন-নামল ২৭:১৬
শিক্ষাজ্ঞান বয়সের উপর নির্ভর করে না; আল্লাহ যাকে চান বুঝ দেন। আর নবীদের আসল উত্তরাধিকার জ্ঞান।
২
📍 পিঁপড়ার উপত্যকা (শাম)

পিঁপড়ার উপত্যকা

সুলাইমান (আ.)-এর বাহিনী ছিল মানুষ, জিন আর পাখি নিয়ে, সুশৃঙ্খলভাবে (সূরা আন-নামল ২৭:১৭)। একবার তারা এক উপত্যকায় পৌঁছাল:

حَتَّىٰ إِذَا أَتَوْا عَلَىٰ وَادِ النَّمْلِ قَالَتْ نَمْلَةٌ يَا أَيُّهَا النَّمْلُ ادْخُلُوا مَسَاكِنَكُمْ لَا يَحْطِمَنَّكُمْ سُلَيْمَانُ وَجُنُودُهُ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

অবশেষে যখন তারা পিপড়া অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছল তখন এক পিপড়া বলল, ‘হে পিপড়া-বাহিনী! তোমরা তোমাদের ঘরে প্রবেশ কর, যেন সুলাইমান এবং তার বাহিনী তাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পায়ের নীচে পিষে না ফেলে।’

সূরা আন-নামল ২৭:১৮

একটি ছোট পিঁপড়া জাতিকে সতর্ক করছে, আর বলছে "তারা টেরও পাবে না", অর্থাৎ সুলাইমানের বাহিনী জেনেশুনে জুলুম করবে না। তিনি হাসলেন, আর অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতার দোয়া করলেন:

فَتَبَسَّمَ ضَاحِكًا مِّن قَوْلِهَا وَقَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ

অতঃপর সুলাইমান তার এ কথাতে মৃদু হাসলেন এবং বললেন, ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন যাতে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি আপনি যে অনুগ্রহ করেছেন তার জন্য এবং যাতে আমি এমন সৎকাজ করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন। আর আপনার অনুগ্রহে আমাকে আপনার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের শামিল করুন।’

সূরা আন-নামল ২৭:১৯
শিক্ষাক্ষমতার শীর্ষে থেকেও ছোট প্রাণীর কথায় মনোযোগ দেওয়া আর কৃতজ্ঞতার দোয়া করা প্রকৃত নেতৃত্ব।
রাজত্ব ও দাওয়াত
৩
📍 সাবা (ইয়েমেন)

হুদহুদের খবর

একদিন পাখিদের খোঁজ নিতে গিয়ে সুলাইমান (আ.) দেখলেন হুদহুদ নেই। তিনি বললেন, উপযুক্ত কারণ দেখাতে না পারলে শাস্তি পাবে (সূরা আন-নামল ২৭:২০, সূরা আন-নামল ২৭:২১)। হুদহুদ ফিরে এসে এক চমকপ্রদ খবর দিল:

فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيدٍ فَقَالَ أَحَطتُ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِن سَبَإٍ بِنَبَإٍ يَقِينٍ

কিছুক্ষণ পরেই হুদহুদ এসে পড়ল এবং বলল, ‘আপনি যা জ্ঞানে পরিবেষ্টন করতে পারেননি আমি তা পরিবেষ্টন করেছি এবং ‘সাবা’ হতে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি।

সূরা আন-নামল ২৭:২২

إِنِّي وَجَدتُّ امْرَأَةً تَمْلِكُهُمْ وَأُوتِيَتْ مِن كُلِّ شَيْءٍ وَلَهَا عَرْشٌ عَظِيمٌ

‘আমি তো এক নারীকে দেখলাম তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে দেয়া হয়েছে সকল কিছু হতেই এবং তার আছে এক বিরাট সিংহাসন।

সূরা আন-নামল ২৭:২৩

وَجَدتُّهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُونَ لِلشَّمْسِ مِن دُونِ اللَّهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُونَ

‘আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে সূর্যকে সাজদা করছে। আর শয়তান তাদের কার্যাবলী তাদের কাছে সুশোভিত করে দিয়েছে এবং তাদেরকে সৎপথ থেকে বাধাগ্রস্থ করেছে, ফলে তারা হেদায়েত পাচ্ছেনা;

সূরা আন-নামল ২৭:২৪

একটি পাখিও বুঝেছিল, সূর্যপূজা শিরক, আর সিজদার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ (সূরা আন-নামল ২৭:২৫, সূরা আন-নামল ২৭:২৬)। সুলাইমান (আ.) বললেন, দেখি তুমি সত্য বলছ কিনা, আর তার হাতে চিঠি পাঠালেন (সূরা আন-নামল ২৭:২৭, সূরা আন-নামল ২৭:২৮)।

শিক্ষানেতা অধীনদের খোঁজ রাখেন, আর অধীনরাও সত্য খবর নিয়ে আসে। খবর যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিন।
৪
📍 সাবা ও বাইতুল মাকদিস

সাবার রানির কাছে চিঠি

রানি দরবারে চিঠিটি পড়ে শোনালেন:

إِنَّهُ مِن سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

‘নিশ্চয় এটা সুলাইমানের কাছ থেকে এবং নিশ্চয় এটা রহমান, রহীম আল্লাহ্‌র নামে,

সূরা আন-নামল ২৭:৩০

أَلَّا تَعْلُوا عَلَيَّ وَأْتُونِي مُسْلِمِينَ

‘যাতে তোমরা আমার বিরোধিতার ঔদ্ধত্য প্রকাশ না করো এবং আনুগত্য স্বীকার করে আমার কাছে উপস্থিত হও।’

সূরা আন-নামল ২৭:৩১

এটাই কুরআনে উল্লেখিত সবচেয়ে ছোট আর স্পষ্ট দাওয়াতনামাগুলোর একটি: আল্লাহর নামে শুরু, অহংকার না করার আহ্বান, আর আত্মসমর্পণের দাওয়াত। রানি পরামর্শ চাইলেন, তারপর উপহার পাঠিয়ে পরীক্ষা করলেন (সূরা আন-নামল ২৭:৩২-সূরা আন-নামল ২৭:৩৫)। সুলাইমান (আ.) উপহার ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা এর চেয়ে উত্তম (সূরা আন-নামল ২৭:৩৬)।

শিক্ষাদাওয়াতে ঘুষ বা উপহারে দ্বীনের সওদা হয় না। চিঠি শুরু হোক বিসমিল্লাহ দিয়ে।
৫
📍 বাইতুল মাকদিস

চোখের পলকে সিংহাসন, কাচের প্রাসাদ

রানি আসার আগেই সুলাইমান (আ.) তাঁর সিংহাসন আনতে চাইলেন। এক শক্তিশালী জিন বলল, আপনি আসন ছেড়ে ওঠার আগেই এনে দেব। তখন কিতাবের জ্ঞান রাখা একজন বলল:

قَالَ الَّذِي عِندَهُ عِلْمٌ مِّنَ الْكِتَابِ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَن يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ ۚ فَلَمَّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا عِندَهُ قَالَ هَـٰذَا مِن فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ ۖ وَمَن شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ

কিতাবের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, ‘আপনি চোখের পলক ফেলার আগেই আমি তা আপনাকে এনে দেব।’ অতঃপর সুলাইমান যখন তা সামনে স্থির অবস্থায় দেখলেন তখন তিনি বললেন, ‘এ আমার রবের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আর যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজেরই কল্যাণের জন্য, আর যে কেউ অকৃতজ্ঞ হবে, সে জেনে রাখুক যে, আমার রব অভাবমুক্ত, মহানুভাব।’

সূরা আন-নামল ২৭:৪০

সিংহাসন সামনে দেখে তাঁর প্রথম কথা ছিল কৃতজ্ঞতার। রানি এসে নিজের বদলানো সিংহাসন চিনতে পারলেন (সূরা আন-নামল ২৭:৪২)। তারপর কাচের মেঝের প্রাসাদে ঢুকতে গিয়ে পানি ভেবে কাপড় তুলে ধরলেন, আর বুঝলেন এক মহাশক্তির সামনে তিনি দাঁড়িয়ে:

قِيلَ لَهَا ادْخُلِي الصَّرْحَ ۖ فَلَمَّا رَأَتْهُ حَسِبَتْهُ لُجَّةً وَكَشَفَتْ عَن سَاقَيْهَا ۚ قَالَ إِنَّهُ صَرْحٌ مُّمَرَّدٌ مِّن قَوَارِيرَ ۗ قَالَتْ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

তাকে বলা হল, ‘প্রাসাদটিতে প্রবেশ কর।’ অতঃপর যখন সে সেটা দেখল তখন সে সেটাকে এক গভীর জলাশয় মনে করল এবং সে তার পায়ের গোছা দুটো অনাবৃত করল। সুলাইমান বললেন, এটা তো স্বচ্ছ স্ফটিক মণ্ডিত প্রাসাদ। সেই নারী বলল, ‘হে আমার রব! আমি তো নিজের প্রতি যুলুম করেছিলাম, আর আমি সুলাইমানের সাথে সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্‌র কাছে আত্মসমর্পণ করছি।’

সূরা আন-নামল ২৭:৪৪
শিক্ষাসত্য বুঝলে অহংকার ছেড়ে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমত্তা। রানি বলেছিলেন "সুলাইমানের সাথে", তাঁর অধীনে নয়; ইসলাম সবাইকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে এক করে।
৬
📍 শাম

বাতাস, জিন ও গলিত তামা

আল্লাহ সুলাইমান (আ.)-এর জন্য বাতাসকে বশ করে দিলেন, আর জিনদেরকে তাঁর অধীনে কাজ করতে দিলেন:

وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ ۖ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ ۖ وَمِنَ الْجِنِّ مَن يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ ۖ وَمَن يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ

আর সুলাইমানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে যা ভোরে একমাসের পথ অতিক্রম করত ও সন্ধ্যায় একমাসের পথ অতিক্রম করত। আমরা তার জন্য গলিত তামার এক প্রস্রবণ প্রবাহিত করেছিলাম এবং তার রবের অনুমতিক্রমে জিনদের কিছু সংখ্যক তার সামনে কাজ করত। আর তাদের মধ্যে যে আমাদের নির্দেশ অমান্য করে, তাকে আমরা জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন করাব।

সূরা সাবা ৩৪:১২

يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِن مَّحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُورٍ رَّاسِيَاتٍ ۚ اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا ۚ وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ

তারা সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী তার জন্য প্রাসাদ, ভাস্কৰ্য, হাউজসদৃশ বৃহদাকার পাত্ৰ এবং সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত ডেগ নির্মাণ করত। 'হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সাথে তোমরা কাজ করতে থাক। আর আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ!’

সূরা সাবা ৩৪:১৩

আয়াতের শেষ কথাটি লক্ষ করুন: "হে দাউদ পরিবার, কৃতজ্ঞতার সাথে কাজ করো, আমার বান্দাদের মধ্যে কৃতজ্ঞ কমই।"

শিক্ষানিয়ামতের শুকরিয়া শুধু মুখে নয়, কাজে প্রকাশ করুন। কৃতজ্ঞ মানুষ সংখ্যায় কম।
৭
📍 বাইতুল মাকদিস

ঘোড়ার পরীক্ষা ও অনন্য রাজত্বের দোয়া

একদিন বিকেলে তাঁর সামনে উৎকৃষ্ট ঘোড়াগুলো হাজির করা হলো। তিনি বললেন, আমি তো রবের স্মরণের চেয়ে এগুলোর ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে গেছি, আর সূর্য ডুবে গেছে (সূরা সোয়াদ ৩৮:৩১, সূরা সোয়াদ ৩৮:৩২)। তারপর ঘোড়াগুলো ফিরিয়ে আনতে বললেন (সূরা সোয়াদ ৩৮:৩৩)।

তারপর আল্লাহ তাঁকে আরেকটি পরীক্ষায় ফেললেন, তাঁর আসনে একটি দেহ রাখলেন; তিনি আল্লাহর দিকে ফিরলেন আর দোয়া করলেন:

قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّن بَعْدِي ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে দান করুন এমন এক রাজ্য যা আমার পর আর কারও জন্যই প্রযোজ্য হবে না। নিশ্চয় আপনি পরম দাতা।'

সূরা সোয়াদ ৩৮:৩৫

আল্লাহ এই দোয়া কবুল করেছেন। নবী (ﷺ) নিজে এক রাতে নামাজে বিরক্ত করতে আসা এক দুষ্ট জিনকে ধরে ফেলেও ছেড়ে দিয়েছিলেন, শুধু ভাই সুলাইমানের এই দোয়ার কথা মনে করে:

গত রাতে এক দুষ্ট ইফরীত জিন হঠাৎ আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আমার নামাজ নষ্ট করার জন্য। আল্লাহ আমাকে তার উপর ক্ষমতা দিলেন। আমি চেয়েছিলাম তাকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখি, যাতে সকালে তোমরা সবাই তাকে দেখতে পাও। তখন আমার ভাই সুলাইমানের দোয়া মনে পড়ল: "হে আমার রব, আমাকে এমন রাজত্ব দাও, যা আমার পরে আর কারও জন্য শোভনীয় নয়।" (তাই তিনি তাকে অপমানিত করে ফিরিয়ে দিলেন।)

সহিহ বুখারী ৪৬১ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরায়রা (রা.)
শিক্ষাদুনিয়ার প্রিয় জিনিস যদি আল্লাহর স্মরণ থেকে সরিয়ে দেয়, তা থেকে নিজেকে ফেরানো ঈমানের দৃঢ়তা।
৮
📍 বাইতুল মাকদিস

"ইনশাআল্লাহ" বলতে ভুলে যাওয়া

আসনের উপর "দেহ" রাখার পরীক্ষাটি কী ছিল, তার একটি ব্যাখ্যা আলেমরা এই সহিহ হাদিস থেকে দিয়েছেন:

সুলাইমান ইবনু দাউদ (আ.) বললেন: আজ রাতে আমি আমার সত্তরজন (আরেক বর্ণনায় নব্বইজন) স্ত্রীর কাছে যাব, প্রত্যেকে এমন এক অশ্বারোহী সন্তান গর্ভে ধারণ করবে, যে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। তাঁর সাথী তাঁকে বললেন: ইনশাআল্লাহ (বলুন)। কিন্তু তিনি বললেন না। ফলে একজন ছাড়া কেউ গর্ভধারণ করল না, আর সে-ও জন্ম দিল এক অপূর্ণ শিশু। নবী (ﷺ) বললেন: যদি তিনি ইনশাআল্লাহ বলতেন, তবে তারা সবাই আল্লাহর পথে জিহাদ করত।

সহিহ বুখারী ৩৪২৪ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরাইরা (রা.)
শিক্ষাভবিষ্যতের যেকোনো পরিকল্পনায় "ইনশাআল্লাহ" বলুন; সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছায় হয় (সূরা আল-কাহফ ১৮:২৩, সূরা আল-কাহফ ১৮:২৪)।
৯
📍 বাইতুল মাকদিস

বাইতুল মাকদিস ও তিনটি দোয়া

সুলাইমান (আ.) বাইতুল মাকদিসের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। নির্মাণ শেষে তিনি আল্লাহর কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছিলেন:

সুলাইমান ইবনু দাউদ (আ.) যখন বাইতুল মাকদিস নির্মাণ করলেন, তখন আল্লাহর কাছে তিনটি জিনিস চাইলেন: এমন বিচারক্ষমতা, যা আল্লাহর ফয়সালার সাথে মিলে যায়, তা তাঁকে দেওয়া হলো; এমন রাজত্ব, যা তাঁর পরে আর কারো উপযুক্ত নয়, তা-ও দেওয়া হলো; আর মসজিদ নির্মাণ শেষে চাইলেন, শুধু নামাজের উদ্দেশ্যে যে কেউ এখানে আসবে, সে যেন মায়ের পেট থেকে জন্মের দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফেরে।

সুনানে আন-নাসাঈ ৬৯৩ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)

আজও যে কেউ শুধু নামাজের উদ্দেশ্যে মসজিদুল আকসায় যায়, সে এই দোয়ার বরকত আশা করতে পারে।

শিক্ষাবড় কাজ শেষে নিজের জন্য নয়, উম্মতের জন্য দোয়া করুন। মসজিদুল আকসা আমাদের দ্বীনেরই অংশ।
১০

সুলাইমান (আ.) জাদু করতেন না

ইহুদিদের একটি দল দাবি করত, সুলাইমান (আ.) জাদুর জোরে রাজত্ব চালাতেন, আর জাদুর বইগুলো তাঁর। কুরআন এই অপবাদ খণ্ডন করেছে:

وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِينُ عَلَىٰ مُلْكِ سُلَيْمَانَ ۖ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَـٰكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ ۚ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ ۖ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ ۚ وَمَا هُم بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۚ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ ۚ وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ ۚ وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنفُسَهُمْ ۚ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ

আর সুলাইমানের রাজত্বে শয়তানরা যা আবৃত্তি করতো তারা তা অনুসরণ করেছে। আর সুলাইমান কুফরী করেননি, বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে শিক্ষা দিত যাদু ও (সে বিষয় শিক্ষা দিত) যা বাবিল শহরে হারূত ও মারূত ফিরিশতাদ্বয়ের উপর নাযিল হয়েছিলো। তারা উভয়েই এই কথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, ‘আমরা নিছক একটি পরীক্ষা ; কাজেই তুমি কুফরী করো না।’ তা সত্বেও তারা ফিরিশতাদ্বয়ের কাছ থেকে এমন যাদু শিখতো যা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতো। অথচ তারা আল্লাহ্‌র অনুমতি ব্যাতীত তা দ্বারা কারো ক্ষতি করতে পারতো না। আর তারা তা-ই শিখতো যা তাদের ক্ষতি করতো এবং কোনো উপকারে আসত না আর তারা নিশ্চিত জানে যে, যে কেউ তা খরিদ করে, (অর্থাৎ যাদুর আশ্রয় নেয়) তার জন্য আখেরাতে কোনো অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছে, তা খুবই মন্দ, যদি তারা জানতো !

সূরা আল-বাকারা ২:১০২

সুলাইমান (আ.) কুফরি করেননি; কুফরি করেছিল শয়তানরা, যারা মানুষকে জাদু শেখাত। তাঁর রাজত্ব ছিল আল্লাহর দান, জাদু নয়।

শিক্ষানবীদের মুজিযা আর জাদু এক নয়। জাদু শেখা ও করা কুফরির কাজ।
ইন্তেকাল
১১
📍 বাইতুল মাকদিস

লাঠিতে ভর দিয়ে ইন্তেকাল

সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুও এক নিদর্শন। তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় ইন্তেকাল করলেন, কিন্তু জিনেরা টের পেল না, কাজ চালিয়ে গেল:

فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَىٰ مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنسَأَتَهُ ۖ فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتِ الْجِنُّ أَن لَّوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ

অতঃপর যখন আমরা সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন জিনদেরকে তার মৃত্যুর খবর জানাল শুধু মাটির পোকা, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন তিনি পড়ে গেলেন তখন জিনরা -বুঝতে পারল যে, যদি তারা গায়েব জানত, তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না।

সূরা সাবা ৩৪:১৪

এতে প্রমাণ হলো, জিনেরা গায়েব জানে না। যদি জানত, এতদিন অপমানজনক কাজে আটকে থাকত না।

শিক্ষাগায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহর; জিন, জ্যোতিষী বা কেউই তা জানে না।

শেখা ও রিসোর্স

দোয়া, হাদিস, শিক্ষা, ভুল ধারণা আর কুরআনে কোথায় পড়বেন

দোয়া

নিয়ামতের শুকরিয়া ও নেক আমলের তাওফীক

فَتَبَسَّمَ ضَاحِكًا مِّن قَوْلِهَا وَقَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ ﴿١٩﴾

অতঃপর সুলাইমান তার এ কথাতে মৃদু হাসলেন এবং বললেন, ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন যাতে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি আপনি যে অনুগ্রহ করেছেন তার জন্য এবং যাতে আমি এমন সৎকাজ করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন। আর আপনার অনুগ্রহে আমাকে আপনার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের শামিল করুন।’

সূরা আন-নামল ২৭:১৯
ক্ষমা ও অনন্য রাজত্বের দোয়া

قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّن بَعْدِي ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ ﴿٣٥﴾

তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে দান করুন এমন এক রাজ্য যা আমার পর আর কারও জন্যই প্রযোজ্য হবে না। নিশ্চয় আপনি পরম দাতা।'

সূরা সোয়াদ ৩৮:৩৫

দোয়াগুলো কুরআনের আয়াত, তাই আরবি হুবহু রাখা হয়েছে; অর্থ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে।

অন্য নবীদের জীবনী

deenpedia.com · https://deenpedia.com/nabi/sulaiman/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার