deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

يُوسُف عَلَيْهِ السَّلَامُ

ইউসুফ (আ.)

আল-কারীমসূরা ইউসুফের নায়ক

ইউসুফ (আ.)-এর জীবনকে আল্লাহ নিজে বলেছেন "সবচেয়ে সুন্দর কাহিনি"। নবী (ﷺ) তাঁকে বলেছেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত বংশের মানুষ, নবীর ছেলে নবী, তাঁর ছেলে নবী, তাঁর ছেলে আল্লাহর খলীল। ভাইদের হিংসায় কূপে পড়া এক শিশু, তারপর দাস, তারপর বন্দি, শেষে মিসরের ধনভান্ডারের দায়িত্বে। প্রতিটি ধাপে তাঁর পবিত্রতা, ধৈর্য আর ক্ষমা আমাদের জন্য শিক্ষা।

قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

তিনি বললেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো ভর্ৎসনা নেই। আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই শ্ৰেষ্ঠ দয়ালু।

সূরা ইউসুফ ১২:৯২
২৭বার নাম এসেছে কুরআনে
৩টি সূরায় আলোচনা
২৭টি আয়াত এই পাতায়
৪টি সহিহ হাদিস

এই পাতার মূল ঘটনা কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া। তাফসীর ও ইতিহাসের বই (ইবনু কাসীর, তাবারী প্রভৃতি) থেকে যা এসেছে, তা আলাদা বাক্সে মানসহ দেখানো হয়েছে; ইসরাঈলি বর্ণনা (আগের কিতাবধারীদের কাছ থেকে আসা গল্প) চিহ্ন দিয়ে আলাদা করা, দলিল হিসেবে নয়। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।

বংশ
ইউসুফ ইবনু ইয়াকুব ইবনু ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (সহিহ বুখারী ৩৩৮২)
মর্যাদা
মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত বংশধারা (সহিহ বুখারী ৩৩৭৪)
সৌন্দর্য
সৌন্দর্যের অর্ধেক দেওয়া হয়েছিল (সহিহ মুসলিম ১৬২)
বিশেষ জ্ঞান
স্বপ্নের ব্যাখ্যা (সূরা ইউসুফ ১২:৬, সূরা ইউসুফ ১২:১০১)
কুরআনে যেখানে
সূরা ইউসুফ (১১১ আয়াত, প্রায় পুরোটাই তাঁর কাহিনি); আল-আনআম ৮৪ ও গাফির ৩৪
কেনান: স্বপ্ন ও কূপ
১
📍 কেনান (ফিলিস্তিন)

সবচেয়ে সুন্দর কাহিনি

সূরা ইউসুফ শুরু হয়েছে এই ঘোষণা দিয়ে:

نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَـٰذَا الْقُرْآنَ وَإِن كُنتَ مِن قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ

আমরা আপনার কাছে উত্তম কাহিনি বর্ণনা করছি, ওহীর মাধ্যমে আপনার কাছে এ কুরআন পাঠিয়ে; যদিও এর আগে আপনি ছিলেন অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত।

সূরা ইউসুফ ১২:৩

কুরআনে অন্য নবীদের ঘটনা বিভিন্ন সূরায় ছড়িয়ে আছে, কিন্তু ইউসুফ (আ.)-এর পুরো জীবন একটি সূরায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, এতে প্রশ্নকারীদের জন্য অনেক নিদর্শন আছে (সূরা ইউসুফ ১২:৭)। আলেমরা বলেন, সূরাটি নাজিল হয়েছিল মক্কার কঠিন সময়ে, যখন নবী (ﷺ) নিজেও আপনজনদের হাতে কষ্ট পাচ্ছিলেন।

তাঁর বংশ নিয়ে নবী (ﷺ) বলেছেন:

সম্মানিত, সম্মানিতের ছেলে, সম্মানিতের ছেলে, সম্মানিতের ছেলে: ইউসুফ ইবনু ইয়াকুব ইবনু ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (আ.)।

সহিহ বুখারী ৩৩৮২ সহিহ বর্ণনা: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)
শিক্ষাকষ্টের মাঝেও আল্লাহর পরিকল্পনা সবচেয়ে সুন্দর; কাহিনির শেষ না দেখে হতাশ হবেন না।
২
📍 কেনান

শৈশবের স্বপ্ন

ছোট্ট ইউসুফ বাবাকে এসে বললেন এক আশ্চর্য স্বপ্নের কথা:

إِذْ قَالَ يُوسُفُ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ

স্মরণ করুন, যখন ‘ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিলেন, ‘হে আমার পিতা! আমি তো দেখেছি এগার নক্ষত্র, সূর্য এবং চাঁদকে, দেখেছি তাদেরকে আমার প্রতি সিজ্দাবনত অবস্থায়।’

সূরা ইউসুফ ১২:৪

ইয়াকুব (আ.) বুঝলেন, এগারো তারা এগারো ভাই, সূর্য আর চাঁদ বাবা-মা। তিনি সাবধান করলেন:

قَالَ يَا بُنَيَّ لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَىٰ إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا ۖ إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

তিনি বললেন, ‘হে আমার বৎস! তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বলো না; বললে তাঁরা তোমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।

সূরা ইউসুফ ১২:৫

আর সুসংবাদ দিলেন:

وَكَذَٰلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَىٰ آلِ يَعْقُوبَ كَمَا أَتَمَّهَا عَلَىٰ أَبَوَيْكَ مِن قَبْلُ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ ۚ إِنَّ رَبَّكَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

আর এভাবে আপনার রব আপনাকে মনোনীত করবেন এবং আপনাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন এবং আপনার প্রতি ও ইয়া’কুবের পরিবার পরিজনদের উপর তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি এটা আগে পূর্ণ করেছিলেন আপনার পিতৃ-পুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের উপর। নিশ্চয় আপনার রব সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

সূরা ইউসুফ ১২:৬
শিক্ষাভালো স্বপ্ন শুধু প্রিয় ও বিশ্বস্ত মানুষকে বলুন; হিংসুকের কাছে নয়।
৩
📍 কেনানের কূপ

ভাইদের হিংসা আর অন্ধকার কূপ

ভাইদের মনে হলো, বাবা ইউসুফ আর তাঁর ছোট ভাইকে বেশি ভালোবাসেন। হিংসা থেকে জন্ম নিল ভয়ংকর পরিকল্পনা:

إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَىٰ أَبِينَا مِنَّا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ

স্মরণ করুন, তারা বলেছিল, ‘আমাদের পিতার কাছে ইউসুফ এবং তার ভাই তো আমাদের চেয়ে বেশী প্রিয়, অথচ আমরা একটি সংহত দল; আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই আছে।

সূরা ইউসুফ ১২:৮

اقْتُلُوا يُوسُفَ أَوِ اطْرَحُوهُ أَرْضًا يَخْلُ لَكُمْ وَجْهُ أَبِيكُمْ وَتَكُونُوا مِن بَعْدِهِ قَوْمًا صَالِحِينَ

‘তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর অথবা কোনো স্থানে তাকে ফেলে আস, তাহলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি শুধু তোমাদের দিকেই নিবিষ্ট হবে এবং তারপর তোমরা ভাল লোক হয়ে যাবে।‘

সূরা ইউসুফ ১২:৯

একজন বলল, হত্যা কোরো না, কোনো কূপে ফেলে দাও, পথিকরা তুলে নেবে (সূরা ইউসুফ ১২:১০)। তারা বাবাকে রাজি করিয়ে ইউসুফকে নিয়ে গেল, আর কূপের গভীরে ফেলে দিল। সেই অন্ধকারেই আল্লাহ তাঁকে ওহী পাঠালেন:

فَلَمَّا ذَهَبُوا بِهِ وَأَجْمَعُوا أَن يَجْعَلُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ ۚ وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ لَتُنَبِّئَنَّهُم بِأَمْرِهِمْ هَـٰذَا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

অতঃপর তারা যখন তাকে নিয়ে গেল এবং কূপের গভীরে নিক্ষেপ করতে একমত হল, আর এ অবস্থায় আমরা তাকে জানিয়ে দিলাম, ‘তুমি তাদেরকে এ কাজের কথা অবশ্যই বলে দেবে’; অথচ তারা তা উপলব্ধি করতে পারবে না।

সূরা ইউসুফ ১২:১৫

রাতে তারা রক্তমাখা জামা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবার কাছে ফিরল (সূরা ইউসুফ ১২:১৬-সূরা ইউসুফ ১২:১৮)।

শিক্ষাহিংসা ভাইকেও শত্রু বানায়। আর অন্ধকারতম মুহূর্তেও আল্লাহ তাঁর বান্দাকে একা ছাড়েন না।
মিসর: আযীযের ঘর ও কারাগার
৪
📍 মিসর

কয়েক দিরহামে বিক্রি

এক কাফেলা এসে পানি তোলার জন্য বালতি নামাল, উঠে এল এক সুন্দর বালক (সূরা ইউসুফ ১২:১৯)। তারা তাঁকে লুকিয়ে পণ্য হিসেবে নিয়ে গেল, আর মিসরে বিক্রি করল সামান্য দামে:

وَشَرَوْهُ بِثَمَنٍ بَخْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ

আর তারা তাকে বিক্রি করল স্বল্প মূল্যে, মাত্র কয়েক দিরহামের বিনিময়ে এবং তারা ছিল তার ব্যাপারে অনাগ্রহী।

সূরা ইউসুফ ১২:২০

যিনি পরে মিসরের ধনভান্ডারের মালিক হবেন, তাঁকে আজ বিক্রি করা হলো কয়েকটি রুপার মুদ্রায়। মিসরের যে ব্যক্তি কিনলেন, তিনি স্ত্রীকে বললেন, একে সম্মানের সাথে রাখো (সূরা ইউসুফ ১২:২১)। আল্লাহ বলেন:

وَقَالَ الَّذِي اشْتَرَاهُ مِن مِّصْرَ لِامْرَأَتِهِ أَكْرِمِي مَثْوَاهُ عَسَىٰ أَن يَنفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا ۚ وَكَذَٰلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ وَلِنُعَلِّمَهُ مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَىٰ أَمْرِهِ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ

আর মিসরের যে ব্যক্তি তাকে কিনেছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, ‘এর থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা কর, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে বা আমরা একে পুত্ররূপেও গ্রহণ করতে পারি।‘ আর এভাবেই আমরা ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম; এবং যাতে আমরা তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেই। আর আল্লাহ্‌ তাঁর কাজ সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।

সূরা ইউসুফ ১২:২১
শিক্ষামানুষ যাকে ছোট মনে করে, আল্লাহ তাকে উঁচু করতে পারেন। আল্লাহ তাঁর কাজে প্রবল, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ জানে না।
৫
📍 আযীযের ঘর, মিসর

আযীযের ঘরে প্রলোভন

ইউসুফ (আ.) পূর্ণ যৌবনে পৌঁছালে আল্লাহ তাঁকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিলেন (সূরা ইউসুফ ১২:২২)। তখন এল জীবনের কঠিন পরীক্ষা। গৃহকর্ত্রী দরজা বন্ধ করে তাঁকে ডাকল:

وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَن نَّفْسِهِ وَغَلَّقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ ۚ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ ۖ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ

আর তিনি যে স্ত্রীলোকের ঘরে ছিলেন সে তাকে কু-প্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল, আর বলল, ‘আস।‘ তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহ্‌র আশ্রয় প্রার্থনা করছি, নিশ্চয় তিনি আমার মনিব; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমরা সফলকাম হয় না।’

সূরা ইউসুফ ১২:২৩

"মাআযাল্লাহ", আল্লাহর আশ্রয় চাই। যে মানুষ তাঁকে সম্মানে রেখেছে, তার ঘরে খেয়ানত করবেন না, আর আল্লাহর অবাধ্যতা তো নয়ই। কুরআন জানায়, আল্লাহ তাঁকে নিজের নিদর্শন দেখিয়ে রক্ষা করেছেন:

وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ ۖ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَن رَّأَىٰ بُرْهَانَ رَبِّهِ ۚ كَذَٰلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ۚ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ

আর সে মহিলা তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিল এবং তিনিও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তেন যদি না তিনি তার রবের নিদর্শন দেখতে পেতেন। এভাবেই (তা হয়েছিল), যাতে আমরা তার থেকে মন্দকাজ ও অশ্লীলতা দূর করে দেই। তিনি তো ছিলেন আমাদের মুখলিস বা বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।

সূরা ইউসুফ ১২:২৪
শিক্ষাপাপের সব দরজা খোলা থাকলেও "মাআযাল্লাহ" বলে আল্লাহর আশ্রয় নেওয়াই মুক্তির পথ।
৬
📍 আযীযের ঘর

ছেঁড়া জামার সাক্ষ্য

ইউসুফ (আ.) দরজার দিকে দৌড় দিলেন, সে পেছন থেকে জামা টেনে ধরল, জামা ছিঁড়ে গেল। দরজায় দেখা গেল গৃহকর্তা দাঁড়িয়ে। মুহূর্তে সে উল্টো অভিযোগ করল (সূরা ইউসুফ ১২:২৫)। ইউসুফ (আ.) বললেন, সে-ই আমাকে ডেকেছিল। তখন তার পরিবারেরই একজন সাক্ষী এক সহজ বিচার দিলেন:

قَالَ هِيَ رَاوَدَتْنِي عَن نَّفْسِي ۚ وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِّنْ أَهْلِهَا إِن كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِن قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ

ইউসুফ বললেন, ‘সে-ই আমাকে কু-প্ররোচনা দিয়েছে।’ আর স্ত্রীলোকটির পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিল, ‘যদি তার জামা সামনের দিকে ছিঁড়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি সত্য কথা বলেছে এবং সে পুরুষটি মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।

সূরা ইউসুফ ১২:২৬

وَإِن كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِن دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ

আর তার জামা যদি পিছন দিক থেকে ছিঁড়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যা বলেছে এবং সে পুরুষটি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।’

সূরা ইউসুফ ১২:২৭

জামা পেছন থেকে ছেঁড়া পাওয়া গেল। গৃহকর্তা বুঝলেন, দোষ তাঁর স্ত্রীর (সূরা ইউসুফ ১২:২৮)। কিন্তু সম্মানের ভয়ে ব্যাপারটা চাপা দিতে বললেন (সূরা ইউসুফ ১২:২৯)।

শিক্ষাসত্যের পক্ষে আল্লাহ এমন জায়গা থেকে সাক্ষী আনেন, যা কেউ ভাবেনি।
৭
📍 মিসর

নগরের নারীরা ও কারাগারের পথ

খবর ছড়িয়ে পড়ল। শহরের নারীরা নিন্দা করতে লাগল। আযীযের স্ত্রী তাদের দাওয়াত দিয়ে প্রত্যেকের হাতে ছুরি দিল, আর ইউসুফকে সামনে আসতে বলল। তাঁকে দেখে তারা অভিভূত হয়ে নিজেদের হাত কেটে ফেলল:

فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّكَأً وَآتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِّنْهُنَّ سِكِّينًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ ۖ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَـٰذَا بَشَرًا إِنْ هَـٰذَا إِلَّا مَلَكٌ كَرِيمٌ

অতঃপর স্ত্রীলোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্য আসন প্রস্তুত করল। আর তাদের সবাইকে একটি করে ছুরি দিল এবং ইউসুফকে বলল, ‘তাদের সামনে বের হও।’ অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল তখন তারা তার সৌন্দর্যে অভিভূত হল ও নিজেদের হাত কেটে ফেলল এবং তারা বলল, ‘অদ্ভুত আল্লাহ্‌র মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশ্‌তা।’

সূরা ইউসুফ ১২:৩১

সে সবার সামনে বলল, আমি তাকে ডেকেছিলাম, সে নিজেকে রক্ষা করেছে; এবার আমার কথা না মানলে জেলে যাবে (সূরা ইউসুফ ১২:৩২)। ইউসুফ (আ.)-এর উত্তর এল দোয়া হয়ে:

قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ۖ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَاهِلِينَ

ইউসুফ বললেন, ‘হে আমার রব! এ নারীরা আমাকে যার দিকে ডাকছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে বেশী প্রিয়। আপনি যদি তাদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।’

সূরা ইউসুফ ১২:৩৩

আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন (সূরা ইউসুফ ১২:৩৪)। নির্দোষ প্রমাণের পরও তাঁকে জেলে পাঠানো হলো (সূরা ইউসুফ ১২:৩৫)।

নবী (ﷺ) জীবনের শেষ অসুখে যখন আবু বকর (রা.)-কে ইমামতির আদেশ দিচ্ছিলেন আর বারবার আপত্তি আসছিল, তখন এই নারীদের দৃষ্টান্ত দিয়েছিলেন:

নবী (ﷺ) অসুস্থ হলেন, অসুখ বেড়ে গেল। তিনি বললেন: আবু বকরকে বলো, সে যেন লোকদের নিয়ে নামাজ পড়ায়। আয়েশা (রা.) বললেন: তিনি কোমল হৃদয়ের মানুষ, আপনার জায়গায় দাঁড়ালে লোকদের নিয়ে নামাজ পড়াতে পারবেন না। তিনি আবার বললেন: আবু বকরকে বলো, সে যেন লোকদের নিয়ে নামাজ পড়ায়। আয়েশা (রা.) আবার একই কথা বললেন। তখন তিনি বললেন: আবু বকরকে বলো, সে যেন লোকদের নিয়ে নামাজ পড়ায়; তোমরা তো ইউসুফের (ঘটনার) সেই নারীদের মতো (মুখে এক কথা, মনে আরেক)।

সহিহ বুখারী ৬৭৮ সহিহ বর্ণনা: আবু মূসা আশআরী (রা.)
শিক্ষাপাপের চেয়ে কারাগার প্রিয়, এটাই ঈমানের দৃঢ়তা। আর নিজের শক্তিতে নয়, আল্লাহর সাহায্যেই পাপ থেকে বাঁচা যায়।
৮
📍 মিসরের কারাগার

কারাগারে দাওয়াত

জেলে তাঁর সাথে আরও দুই যুবক ঢুকল। দুজনেই স্বপ্ন দেখল, আর তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাইল, কারণ তারা দেখেছিল তিনি নেককার (সূরা ইউসুফ ১২:৩৬)। ইউসুফ (আ.) প্রথমে ব্যাখ্যা না দিয়ে সুযোগটা দাওয়াতের জন্য নিলেন:

يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ

'হে আমার কারা-সঙ্গীদ্বয়! ভিন্ন ভিন্ন বহু রব উত্তম, না মহাপ্রতাপশালী এক আল্লাহ্‌?

সূরা ইউসুফ ১২:৩৯

مَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ ۚ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ

‘তাঁকে ছেড়ে তোমরা শুধু কতগুলো নামের ‘ইবাদাত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ; এগুলোর কোনো প্রমাণ আল্লাহ্‌ পাঠাননি। বিধান দেয়ার অধিকার শুধু আল্লাহ্‌রই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন শুধু তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ‘ইবাদাত না করতে, এটাই শাশ্বত দীন কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা জানে না।

সূরা ইউসুফ ১২:৪০

তারপর ব্যাখ্যা দিলেন: একজন মুক্ত হয়ে রাজাকে মদ পরিবেশন করবে, আরেকজনকে শূলে চড়ানো হবে (সূরা ইউসুফ ১২:৪১)। যে মুক্তি পাবে, তাকে বললেন রাজার কাছে আমার কথা বোলো। কিন্তু শয়তান তাকে ভুলিয়ে দিল, আর তিনি কয়েক বছর জেলে রইলেন (সূরা ইউসুফ ১২:৪২)।

শিক্ষাযেখানেই থাকুন, সেখান থেকেই আল্লাহর দিকে ডাকা যায়। মানুষের প্রয়োজনের সময়টাই দাওয়াতের সবচেয়ে ভালো সময়।
ধনভান্ডার, ক্ষমা ও মিলন
৯
📍 মিসরের রাজদরবার

রাজার স্বপ্ন ও নির্দোষ প্রমাণ

একদিন রাজা স্বপ্ন দেখলেন: সাতটি মোটা গাভীকে সাতটি রোগা গাভী খেয়ে ফেলছে, আর সাতটি সবুজ শীষ ও সাতটি শুকনো (সূরা ইউসুফ ১২:৪৩)। দরবারের কেউ ব্যাখ্যা দিতে পারল না। তখন সেই মুক্তি পাওয়া লোকটির ইউসুফের কথা মনে পড়ল। ইউসুফ (আ.) শুধু ব্যাখ্যা দিলেন না, সমাধানও দিলেন:

قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَأَبًا فَمَا حَصَدتُّمْ فَذَرُوهُ فِي سُنبُلِهِ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّا تَأْكُلُونَ

ইউসুফ বললেন, ‘তোমরা সাত বছর একাধারে চাষ করবে, অতঃপর তোমরা যে শস্য কাটবে তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে, তা ছাড়া বাকী সবগুলো শীষসহ রেখে দেবে;

সূরা ইউসুফ ১২:৪৭

ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّا تُحْصِنُونَ

‘এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর, এ সাত বছর, যা আগে সঞ্চয় করে রাখবে, লোকেরা তা খাবে; শুধুমাত্র সামান্য কিছু যা তোমরা সংরক্ষণ করবে, তা ছাড়া।

সূরা ইউসুফ ১২:৪৮

ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ

‘তারপর আসবে এক বছর, সে বছর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সে বছর মানুষ ফলের রস নিংড়াবে ।’

সূরা ইউসুফ ১২:৪৯

রাজা তাঁকে ডেকে পাঠালেন। কিন্তু ইউসুফ (আ.) বের হলেন না যতক্ষণ না তাঁর নির্দোষিতা প্রকাশ্যে প্রমাণ হয়:

وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ ۖ فَلَمَّا جَاءَهُ الرَّسُولُ قَالَ ارْجِعْ إِلَىٰ رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ اللَّاتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ ۚ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ

আর রাজা বলল, ‘তোমরা ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে আস।’ অতঃপর যখন দূত তার কাছে উপস্থিত হল তখন তিনি বললেন, ‘তুমি তোমার মনিবের কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস কর, যে নারীরা হাত কেটে ফেলেছিল তাদের অবস্থা কী! নিশ্চয় আমার রব তাদের ছলনা সম্পর্কে সম্যক অবগত।’

সূরা ইউসুফ ১২:৫০

নারীরা সাক্ষ্য দিল, তিনি নির্দোষ; আযীযের স্ত্রীও স্বীকার করল, দোষ তার (সূরা ইউসুফ ১২:৫১)। নবী (ﷺ) তাঁর এই ধৈর্যের প্রশংসা করে বলেছেন, ইউসুফ যত দিন জেলে ছিলেন, আমি থাকলে ডাক আসামাত্র সাড়া দিতাম:

(সন্দেহের প্রশ্ন উঠলে) আমরা ইবরাহীমের চেয়ে বেশি যোগ্য, যখন তিনি বলেছিলেন: "হে আমার রব, আমাকে দেখান কীভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন। তিনি বললেন: তুমি কি বিশ্বাস করো না? তিনি বললেন: অবশ্যই, তবে আমার অন্তর প্রশান্ত হওয়ার জন্য" (২:২৬০)। আল্লাহ লূতের উপর রহম করুন, তিনি তো এক শক্ত আশ্রয়েই আশ্রয় নিচ্ছিলেন। আর ইউসুফ যত দিন কারাগারে ছিলেন, আমি তত দিন থাকলে (মুক্তির) ডাক আসতেই সাড়া দিতাম।

সহিহ বুখারী ৩৩৭২ সহিহ বর্ণনা: আবু হুরাইরা (রা.)
শিক্ষানিজের সম্মান ও নির্দোষিতা পরিষ্কার করা দোষ নয়। আর জ্ঞান দিয়ে মানুষের সমস্যার সমাধান দেওয়া দাওয়াতের অংশ।
১০
📍 মিসরের রাজধানী

মিসরের ধনভান্ডারের দায়িত্বে

রাজা বললেন, তাঁকে আমার কাছে আনো, তাঁকে আমার একান্ত লোক বানাব। কথা বলে বললেন, আজ থেকে তুমি আমাদের কাছে মর্যাদাবান ও বিশ্বস্ত (সূরা ইউসুফ ১২:৫৪)। ইউসুফ (আ.) নিজেই এমন একটি দায়িত্ব চাইলেন, যেখানে তাঁর যোগ্যতা দেশের কাজে লাগবে:

قَالَ اجْعَلْنِي عَلَىٰ خَزَائِنِ الْأَرْضِ ۖ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ

ইউসুফ বললেন, ‘আমাকে দেশের ধনভান্ডারের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন; আমি তো উত্তম রক্ষক, সুবিজ্ঞ।’

সূরা ইউসুফ ১২:৫৫

আল্লাহ বলেন, এভাবেই আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম (সূরা ইউসুফ ১২:৫৬)। কূপ থেকে কারাগার, কারাগার থেকে দেশের ধনভান্ডার। আর আখিরাতের প্রতিদান আরও উত্তম (সূরা ইউসুফ ১২:৫৭)।

শিক্ষাযোগ্যতা থাকলে আমানতদারির সাথে দায়িত্ব নেওয়া দোষ নয়: হাফীয (রক্ষাকারী) আর আলীম (জ্ঞানী) হওয়াই শর্ত।
১১
📍 মিসর

ভাইদের আগমন ও বিনইয়ামীন

দুর্ভিক্ষ এল, যেমন তিনি বলেছিলেন। কেনান থেকে ভাইয়েরা খাদ্য নিতে এল। তিনি তাদের চিনলেন, তারা তাঁকে চিনল না (সূরা ইউসুফ ১২:৫৮)। তিনি খাদ্য দিলেন, আর বললেন পরের বার বাবার দিকের ভাইটিকে আনতে হবে, নইলে খাদ্য পাবে না (সূরা ইউসুফ ১২:৫৯, সূরা ইউসুফ ১২:৬০)। তাদের দেওয়া দামও গোপনে বস্তায় ফিরিয়ে দিলেন (সূরা ইউসুফ ১২:৬২)।

পরের বার বিনইয়ামীন এলেন। ইউসুফ (আ.) তাঁকে আলাদা করে পরিচয় দিলেন (সূরা ইউসুফ ১২:৬৯)। তারপর আল্লাহর শেখানো কৌশলে রাজার পানপাত্র তাঁর বস্তায় রাখলেন, যাতে তাঁকে নিজের কাছে রেখে দেওয়া যায় (সূরা ইউসুফ ১২:৭০, সূরা ইউসুফ ১২:৭৬)। ভাইয়েরা তখন বলল, সে চুরি করে থাকলে তার ভাইও আগে চুরি করেছিল। ইউসুফ (আ.) মুখে কিছু বললেন না:

قَالُوا إِن يَسْرِقْ فَقَدْ سَرَقَ أَخٌ لَّهُ مِن قَبْلُ ۚ فَأَسَرَّهَا يُوسُفُ فِي نَفْسِهِ وَلَمْ يُبْدِهَا لَهُمْ ۚ قَالَ أَنتُمْ شَرٌّ مَّكَانًا ۖ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا تَصِفُونَ

তারা বলল, ‘সে যদি চুরি করে থাকে তবে তার সহোদরও তো আগে চুরি করেছিল।’ কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখলেন এবং তাদের কাছে প্রকাশ করলেন না; তিনি (মনে মনে) বললেন, ‘তোমাদের অবস্থা তো হীনতর এবং তোমরা যা বলছ সে সম্বন্ধে আল্লাহ্ই অধিক অবগত।’

সূরা ইউসুফ ১২:৭৭
শিক্ষাকেউ অন্যায় অপবাদ দিলে সাথে সাথে জবাব না দিয়ে ধৈর্য ধরা মর্যাদার পরিচয়।
১২
📍 মিসর

"আমিই ইউসুফ": আজ কোনো ভর্ৎসনা নেই

তৃতীয়বার ভাইয়েরা এল একেবারে নিঃস্ব হয়ে, দয়া চাইতে (সূরা ইউসুফ ১২:৮৮)। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জানো ইউসুফ আর তার ভাইয়ের সাথে কী করেছিলে? তারা চমকে উঠল:

قَالُوا أَإِنَّكَ لَأَنتَ يُوسُفُ ۖ قَالَ أَنَا يُوسُفُ وَهَـٰذَا أَخِي ۖ قَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا ۖ إِنَّهُ مَن يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ

তারা বলল, ‘তবে কি তুমিই ইউসুফ?’ তিনি বললেন, ‘আমিই ইউসুফ এবং এ আমার সহোদর; আল্লাহ্‌ তো আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্যধারণ করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মুহসিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।’

সূরা ইউসুফ ১২:৯০

ভাইয়েরা স্বীকার করল, আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন, আমরাই অপরাধী ছিলাম (সূরা ইউসুফ ১২:৯১)। প্রতিশোধের পূর্ণ ক্ষমতা হাতে নিয়ে ইউসুফ (আ.) বললেন:

قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

তিনি বললেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো ভর্ৎসনা নেই। আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই শ্ৰেষ্ঠ দয়ালু।

সূরা ইউসুফ ১২:৯২

তারপর নিজের জামা দিলেন, বললেন বাবার চেহারায় রাখতে, তাঁর দৃষ্টি ফিরে আসবে, আর পুরো পরিবারকে নিয়ে আসতে (সূরা ইউসুফ ১২:৯৩)।

শিক্ষাক্ষমতা হাতে থাকার সময় ক্ষমা করাই সবচেয়ে বড় ক্ষমা। অতীতের কষ্ট নিয়ে খোঁটা না দেওয়াও ক্ষমার অংশ।
১৩
📍 মিসর

স্বপ্ন সত্য হলো: পরিবারের মিলন

বাবা-মা আর ভাইয়েরা মিসরে এলেন। ইউসুফ (আ.) তাঁদের সিংহাসনে বসালেন, আর সবাই তাঁর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন, যেমন শৈশবের স্বপ্নে দেখেছিলেন:

وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا ۖ وَقَالَ يَا أَبَتِ هَـٰذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا ۖ وَقَدْ أَحْسَنَ بِي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ وَجَاءَ بِكُم مِّنَ الْبَدْوِ مِن بَعْدِ أَن نَّزَغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي ۚ إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِّمَا يَشَاءُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

আর ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে উঁচু আসনে বসালেন এবং তারা সবাই তার সম্মানে সাজদায় লুটিয়ে পড়ল। তিনি বললেন, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার আগেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা; আমার রব এটা সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেন এবং শয়তান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার রব যা ইচ্ছে তা নিপুণতার সাথে করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’

সূরা ইউসুফ ১২:১০০

লক্ষ করুন, তিনি কূপের কথা বললেন না, যাতে ভাইয়েরা লজ্জা না পায়; বললেন কারাগার থেকে বের করার কথা। আর দোষ দিলেন শয়তানকে, ভাইদের নয়। সেই যুগে সম্মানের সিজদা বৈধ ছিল, আমাদের শরিয়তে তা নিষিদ্ধ।

শিক্ষাঅতীতের কষ্টের কথা বলতে হলে এমনভাবে বলুন, যাতে কারো মন না ভাঙে। আল্লাহ যা চান, তা সূক্ষ্ম কৌশলে বাস্তবায়ন করেন।
১৪
📍 মিসর

শেষ দোয়া ও ইন্তেকাল

সব পাওয়ার পর ইউসুফ (আ.)-এর দোয়ায় দুনিয়ার কিছু চাওয়া নেই। আছে শুধু একটি চাওয়া, ভালো মৃত্যু:

رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ

‘হে আমার রব! আপনি আমাকে রাজ্য দান করেছেন এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। হে আসমানসমূহ ও যমীনের সষ্টা! আপনিই দুনিয়া ও আখিরাতে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’

সূরা ইউসুফ ১২:১০১

তাঁর মৃত্যুর অনেক পরেও তাঁর দাওয়াতের কথা মিসরে স্মরণ করা হতো। ফিরআউনের দরবারের মুমিন লোকটি বলেছিলেন, আগে ইউসুফ তোমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছিলেন, তোমরা সন্দেহে থেকেছ; তাঁর মৃত্যুর পর বলেছ, আল্লাহ আর কোনো রাসূল পাঠাবেন না (সূরা গাফির ৪০:৩৪)।

মিরাজের রাতে তৃতীয় আসমানে নবী (ﷺ) তাঁর সাথে দেখা করেছেন:

(তৃতীয় আসমানের দরজা খোলা হলো,) আর আমি দেখি ইউসুফ (আ.)। তাঁকে সৌন্দর্যের অর্ধেক দেওয়া হয়েছে। তিনি আমাকে স্বাগত জানালেন আর আমার জন্য কল্যাণের দোয়া করলেন।

সহিহ মুসলিম ১৬২ সহিহ বর্ণনা: আনাস ইবনু মালিক (রা.)
শিক্ষাসব সাফল্যের শেষে চাওয়া হোক মুসলিম হয়ে মৃত্যু আর নেককারদের সাথে মিলন।

শেখা ও রিসোর্স

দোয়া, হাদিস, শিক্ষা, ভুল ধারণা আর কুরআনে কোথায় পড়বেন

দোয়া

পাপ থেকে বাঁচার দোয়া

قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ۖ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَاهِلِينَ ﴿٣٣﴾

ইউসুফ বললেন, ‘হে আমার রব! এ নারীরা আমাকে যার দিকে ডাকছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে বেশী প্রিয়। আপনি যদি তাদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।’

সূরা ইউসুফ ১২:৩৩
ভালো মৃত্যু ও নেককারদের সঙ্গ চাওয়া

رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ ﴿١٠١﴾

‘হে আমার রব! আপনি আমাকে রাজ্য দান করেছেন এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। হে আসমানসমূহ ও যমীনের সষ্টা! আপনিই দুনিয়া ও আখিরাতে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’

সূরা ইউসুফ ১২:১০১
যারা কষ্ট দিয়েছে তাদের জন্য ক্ষমার দোয়া

قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ﴿٩٢﴾

তিনি বললেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো ভর্ৎসনা নেই। আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই শ্ৰেষ্ঠ দয়ালু।

সূরা ইউসুফ ১২:৯২

দোয়াগুলো কুরআনের আয়াত, তাই আরবি হুবহু রাখা হয়েছে; অর্থ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে।

অন্য নবীদের জীবনী

deenpedia.com · https://deenpedia.com/nabi/yusuf/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার