deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

لَّقَد تَّابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ

তাবুক অভিযান: প্রচণ্ড গরমে কষ্টের বাহিনী

তাবুকে কোনো যুদ্ধ হয়নি। তবু এই অভিযান নিয়ে সূরা তাওবার বড় একটা অংশ নাজিল হয়েছে, কারণ এখানে পরীক্ষা ছিল তলোয়ারের নয়, মনের: কষ্টের সময় কে সত্যিই বের হয়, আর কে অজুহাত খোঁজে।

৬ দৃশ্য৭ হাদিস১০ আয়াত

সীরাত · মাদানী যুগ৬৩০ খ্রি. · ৯ হিজরি · রজব

কখন
৯ হিজরি, রজব মাস (প্রসিদ্ধ মত); প্রচণ্ড গরম আর ফল পাকার মৌসুম
কোথায়
মদিনা থেকে প্রায় ৭০০ কিমি উত্তরে তাবুক, রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তের কাছে
কারা
নবীজি (ﷺ) ও প্রায় ৩০,০০০ সাহাবি (সীরাতের বর্ণনা); মদিনায় আলী (রা.) পরিবারের দায়িত্বে
এই গল্পে
প্রস্তুতি ও দান থেকে কাব ইবনু মালিকের (রা.) তওবা কবুল পর্যন্ত

কেন পড়বেন: তাবুক মুমিন আর মুনাফিককে আলাদা করে দিয়েছিল। এখানে আছে দানের প্রতিযোগিতা, অপারগের চোখের পানি, ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির জায়গায় বিনয়, আর সত্য বলার সাহসের এক অসাধারণ গল্প।

গল্প

বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।

  1. ১

    রজব, ৯ হিজরি

    "কষ্টের বাহিনী"

    খবর এল, রোমানরা শামের সীমান্তে বাহিনী জড়ো করছে। নবীজি (ﷺ) সাধারণত অভিযানের গন্তব্য গোপন রাখতেন, কিন্তু এবার পথ দীর্ঘ আর কঠিন বলে আগেই সবাইকে জানিয়ে দিলেন, যাতে প্রস্তুতি নিতে পারে (কাব ইবনু মালিকের বর্ণনা, সহিহ বুখারী ৪৪১৮)। গরম ছিল প্রচণ্ড, খেজুর পাকছিল। মুনাফিকরা বলল, এই গরমে বের হয়ো না; আল্লাহ জবাব দিলেন:

    فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللَّهِ وَكَرِهُوا أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَالُوا لَا تَنفِرُوا فِي الْحَرِّ ۗ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا ۚ لَّوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ

    যারা পিছনে রয়ে গেল তারা আল্লাহ্‌র রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে বসে থাকতেই আনন্দ বোধ করল এবং তাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ করা অপছন্দ করল এবং তারা বলল, ‘গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না।‘ বলুন, ‘উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচন্ডতম’, যদি তারা বুঝত!

    সূত্রসূরা আত-তাওবা ৯:৮১ কুরআনসহিহ বুখারী ৪৪১৮ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: রোমানদের সমাবেশের খবর ঐতিহাসিক বর্ণনা

    "জাহান্নামের আগুন আরও বেশি গরম।" দুনিয়ার কষ্ট দিয়ে আখিরাতের কষ্ট থেকে বাঁচা যায়, উল্টোটা নয়।

  2. ২

    প্রস্তুতির দিনগুলো

    অর্ধেক, সব, আর হাজার দিনার

    এত বড় বাহিনীর জন্য বাহন, খাবার আর পানি দরকার ছিল। নবীজি (ﷺ) দানের আহ্বান জানালেন, আর শুরু হলো প্রতিযোগিতা:

    একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের দান করতে বললেন। তখন আমার কাছে কিছু সম্পদ ছিল। মনে মনে বললাম: কোনো দিন যদি আবু বকরকে ছাড়িয়ে যেতে পারি, তা আজই। আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে এলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? বললাম: এর সমান। আর আবু বকর (রা.) তাঁর কাছে যা ছিল সব নিয়ে এলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? তিনি বললেন: তাদের জন্য রেখে এসেছি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে। আমি বললাম: আমি আর কখনো কোনো বিষয়ে আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করব না।

    সুনানে আবু দাউদ ১৬৭৮হাসানবর্ণনাকারী: উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

    উসমান (রা.) এলেন এক হাজার দিনার নিয়ে:

    নবীজি (ﷺ) যখন কষ্টের বাহিনী (জাইশুল উসরা, তাবুক অভিযান) প্রস্তুত করছিলেন, উসমান (রা.) এক হাজার দিনার নিয়ে এসে তাঁর কোলে ঢেলে দিলেন। আমি দেখলাম, নবীজি (ﷺ) সেগুলো কোলে উল্টে-পাল্টে দেখছেন আর বলছেন: আজকের পর উসমান যা-ই করুক, তা তার ক্ষতি করবে না। দুবার বললেন।

    জামে আত-তিরমিযী ৩৭০১হাসানবর্ণনাকারী: আবদুর রহমান ইবনু সামুরা (রা.)

    সূত্রসুনানে আবু দাউদ ১৬৭৮ হাসানজামে আত-তিরমিযী ৩৭০১ হাসান

    "পরিবারের জন্য রেখে এসেছি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে।" আমরা পরিবারের জন্য কী রেখে যাচ্ছি: শুধু সম্পদ, নাকি আল্লাহর উপর ভরসাও?

  3. ৩

    রওনার আগে

    যাঁরা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেলেন

    কিছু গরিব সাহাবি নবীজির (ﷺ) কাছে এসে বাহন চাইলেন। তিনি বললেন, তোমাদের দেওয়ার মতো কিছু আমার কাছে নেই। তাঁরা ফিরে গেলেন, চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল, কারণ খরচ করার মতো কিছু তাঁদের ছিল না। আল্লাহ তাঁদের কথা কুরআনে রেখে দিলেন:

    وَلَا عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوْكَ لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ تَوَلَّوا وَّأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَّا يَجِدُوا مَا يُنفِقُونَ

    আর তাদেরও কোনো অপরাধ নেই যারা আপনার কাছে বাহনের জন্য আসলে আপনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের জন্য কোনো বাহন আমি পাচ্ছি না’; তারা অশ্রুবিগলিত চোখে ফিরে গেল, কারণ তারা খরচ করার মত কিছুই পায়নি।

    আর নবীজি (ﷺ) পরে বলেছেন, এমন মানুষেরা সফরের প্রতিটি ধাপে সাথেই ছিল:

    إِنَّ أَقْوَامًا بِالْمَدِينَةِ خَلْفَنَا، مَا سَلَكْنَا شِعْبًا وَلاَ وَادِيًا إِلاَّ وَهُمْ مَعَنَا فِيهِ، حَبَسَهُمُ الْعُذْرُ

    (এক অভিযানে) নবীজি (ﷺ) বললেন: মদিনায় আমাদের পেছনে এমন কিছু মানুষ আছে, আমরা যে গিরিপথ বা উপত্যকা দিয়েই গেছি, তারা আমাদের সাথেই ছিল; অপারগতা তাদের আটকে রেখেছে।

    সহিহ বুখারী ২৮৩৯সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

    সূত্রসূরা আত-তাওবা ৯:৯২ কুরআনসহিহ বুখারী ২৮৩৯ সহিহসূরা আত-তাওবা ৯:৯১ কুরআন

    যাঁরা যেতে পারেননি, কিন্তু মন থেকে চেয়েছিলেন, তাঁরা সওয়াবে সাথে ছিলেন। সত্যিকারের নিয়ত অপারগতাকেও আমলে বদলে দেয়।

  4. ৪

    রওনার দিন

    মদিনায় আলী (রা.)

    নবীজি (ﷺ) আলীকে (রা.) মদিনায় পরিবারগুলোর দেখাশোনার দায়িত্বে রেখে গেলেন। মুনাফিকরা কটাক্ষ করল। আলী (রা.) কষ্ট পেয়ে বললেন, আপনি কি আমাকে নারী আর শিশুদের মাঝে রেখে যাচ্ছেন? নবীজি (ﷺ) বললেন:

    أَتُخَلِّفُنِي فِي الصِّبْيَانِ وَالنِّسَاءِ قَالَ ‏ "‏ أَلاَ تَرْضَى أَنْ تَكُونَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُونَ مِنْ مُوسَى إِلاَّ أَنَّهُ لَيْسَ نَبِيٌّ بَعْدِي

    (তাবুক অভিযানে যাওয়ার সময় নবী ﷺ আলী রা.-কে মদিনায় রেখে গেলে আলী বললেন:) আপনি কি আমাকে শিশু আর নারীদের মাঝে রেখে যাচ্ছেন? তিনি বললেন: তুমি কি খুশি নও যে, আমার কাছে তোমার মর্যাদা মূসার কাছে হারূনের মতো? তবে আমার পরে কোনো নবী নেই।

    সহিহ বুখারী ৪৪১৬সহিহবর্ণনাকারী: সাদ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা.)

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪৪১৬ সহিহ

    পেছনে থেকে যাওয়াও একটা দায়িত্ব। কারও কাজ সামনে দেখা যায়, কারও কাজ পেছনে; আল্লাহর কাছে দুটোরই মূল্য আছে।

  5. ৫

    তাবুকের পথে

    সামূদের পাথরের ঘর

    পথে পড়ল হিজর, যেখানে সামূদ জাতি পাহাড় কেটে ঘর বানিয়েছিল আর সালেহ (আ.)-এর উটনী হত্যা করে ধ্বংস হয়েছিল (সূরা আল-আরাফ ৭:৭৮)। সাহাবিরা সেখানকার কূপ থেকে পানি নিয়েছিলেন; নবীজি (ﷺ) বললেন:

    (তাবুকের পথে) নবীজি (ﷺ) যখন হিজর (সামূদ জাতির এলাকা) দিয়ে যাচ্ছিলেন, বললেন: যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছিল, তাদের বাসস্থানে কাঁদতে কাঁদতে ছাড়া প্রবেশ কোরো না, যাতে তাদের যা হয়েছিল, তা তোমাদের না হয়। তারপর মাথা কাপড়ে ঢেকে দ্রুত চলে উপত্যকা পার হয়ে গেলেন।

    সহিহ বুখারী ৪৪১৯সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.)

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪৪১৯ সহিহসূরা আল-আরাফ ৭:৭৮ কুরআনসূরা আল-হিজর ১৫:৮০ কুরআন

    ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির জায়গা পর্যটনের জন্য নয়, শিক্ষা আর কান্নার জন্য। আমরা ইতিহাসের জায়গায় গেলে কী নিয়ে ফিরি?

  6. ৬

    মদিনায় ফেরার পর

    কাব ইবনু মালিকের (রা.) পঞ্চাশ দিন

    তাবুকে বিশ দিনের মতো অবস্থান করেও রোমানরা মুখোমুখি হলো না; আশেপাশের কয়েকটি গোত্র নবীজির (ﷺ) সাথে চুক্তি করল, আর বাহিনী ফিরে এল (সীরাতের বর্ণনা)। মদিনায় ফিরলে যারা যায়নি, তারা অজুহাত দিতে এল; আশির বেশি মুনাফিক মিথ্যা কসম খেল, নবীজি (ﷺ) তাদের বাহ্যিক কথা মেনে নিলেন। কিন্তু তিনজন সাহাবি মিথ্যা বললেন না, তাঁদের একজন কাব ইবনু মালিক (রা.):

    (তাবুক যুদ্ধে না গিয়ে পিছিয়ে থাকা কা'ব (রা.) বলেন) আমি সালাম দিলে তিনি রাগী মানুষের হাসি হাসলেন… আমি বললাম: আল্লাহর কসম, দুনিয়ার অন্য কারও সামনে বসলে আমি অজুহাত দেখিয়ে তার রাগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারতাম, কথার কৌশল আমার জানা। কিন্তু আমি জানি, আজ আপনাকে মিথ্যা বলে খুশি করলে আল্লাহ শিগগির আপনাকে আমার উপর নারাজ করে দেবেন। আর সত্য বললে আপনি আমার উপর রাগ করলেও… (পঞ্চাশ দিন সবাই তাঁর সাথে কথা বন্ধ রাখল। এর মধ্যে) গাসসানের রাজার চিঠি এল: শুনেছি তোমার সঙ্গী তোমার সাথে কঠোর আচরণ করছে; আল্লাহ তোমাকে অপমান আর অবহেলার জায়গায় রাখেননি, আমাদের কাছে চলে এসো, আমরা তোমাকে সম্মান দেব। আমি পড়ে বললাম: এটাও আরেক পরীক্ষা। তারপর চিঠিটা চুলায় ফেলে পুড়িয়ে দিলাম। … (পঞ্চাশতম দিনের ফজরের পর) আমার নিজের মন আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, প্রশস্ত পৃথিবীও সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তখন সালা পাহাড়ের উপর থেকে কারও চিৎকার শুনলাম: হে কা'ব ইবনু মালিক, সুসংবাদ নাও! আমি সিজদায় পড়ে গেলাম। … (মসজিদে গেলে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারা আনন্দে ঝলমল করছিল। তিনি বললেন: তোমার মা তোমাকে জন্ম দেওয়ার পর থেকে আজকের দিনটি তোমার জীবনের সবচেয়ে উত্তম দিন, সুসংবাদ নাও।

    সহিহ বুখারী ৪৪১৮সহিহবর্ণনাকারী: কা'ব ইবনু মালিক (রা.)

    পঞ্চাশ দিন পর আল্লাহ তাঁদের তওবা কবুলের আয়াত নাজিল করলেন:

    وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّىٰ إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَن لَّا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

    আর তিনি তাওবা কবুল করলেন অন্য তিনজনেরও, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না যমীন বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সেটা সংকুচিত হয়েছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিল আর তারা নিশ্চিত উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য তিনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। তারপর তিনি তাদের তাওবাহ্ কবুল করলেন যাতে তারা তাওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ অধিক তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪৪১৮ সহিহসূরা আত-তাওবা ৯:১১৮ কুরআনসূরা আত-তাওবা ৯:১১৯ কুরআনইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: তাবুকে অবস্থান ও আশেপাশের গোত্রের সাথে চুক্তি ঐতিহাসিক বর্ণনা

    মিথ্যা বলে তখনই মুক্তি পাওয়া যেত; সত্য বলে পঞ্চাশ দিনের কষ্ট। কিন্তু সত্যের পরিণতি হলো আল্লাহর আয়াত। আল্লাহ বলছেন: সত্যবাদীদের সাথে থাকো (সূরা আত-তাওবা ৯:১১৯)।

প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়

এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।

সনদ দুর্বল উসমান (রা.) তাবুক বাহিনীর জন্য একে একে তিনশো উট দিয়েছিলেন, আর নবীজি (ﷺ) মিম্বার থেকে নেমে প্রশংসা করেছিলেন

এই বর্ণনা সুনানে তিরমিযীতে (৩৭০০) আছে, কিন্তু এর সনদ দুর্বল (আলবানী, আহমাদ শাকির)। উসমানের (রা.) এক হাজার দিনার দেওয়া আর নবীজির (ﷺ) "আজকের পর উসমান যা-ই করুক, ক্ষতি নেই" বলার হাদিস হাসান (জামে আত-তিরমিযী ৩৭০১)। উসমানের (রা.) মর্যাদা প্রমাণে দুর্বল বর্ণনার দরকার নেই।

ঐতিহাসিক বর্ণনা তাবুকে রোমানদের সাথে বড় যুদ্ধ হয়েছিল

সীরাতের সব বর্ণনা একমত যে তাবুকে কোনো সম্মুখযুদ্ধ হয়নি; রোমান বাহিনী মুখোমুখি হয়নি, আর মুসলিমরা প্রায় বিশ দিন থেকে আশেপাশের গোত্রগুলোর সাথে চুক্তি করে ফিরে আসেন। কুরআন এই অভিযানকে বলেছে "কষ্টের সময়" (সূরা আত-তাওবা ৯:১১৭), যুদ্ধের নয়।

এই গল্প থেকে আমার জীবনে

গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।

দানে প্রতিযোগিতা

উমর অর্ধেক, আবু বকর সব, উসমান হাজার দিনার নিয়ে এসেছিলেন।

আজকের কাজ: আজ আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক কোনো ভালো খাতে দান করুন, আর তা নিয়মিত করার নিয়ত করুন।

সুনানে আবু দাউদ ১৬৭৮ হাসানসূরা আল-হাদীদ ৫৭:২১ কুরআন

নিয়তে সওয়াব

যাঁরা অপারগতায় যেতে পারেননি, তাঁরা সফরের প্রতিটি ধাপে সাথে ছিলেন।

আজকের কাজ: যে ভালো কাজ এখন সামর্থ্যের বাইরে (হজ, বড় দান), আজ তার আন্তরিক নিয়ত করুন আর আল্লাহর কাছে তৌফিক চান।

সহিহ বুখারী ২৮৩৯ সহিহসহিহ বুখারী ১ সহিহ

অজুহাত নয়, সত্য

কাব ইবনু মালিক (রা.) মিথ্যা অজুহাত দেননি, সত্য স্বীকার করেছেন।

আজকের কাজ: আজ কোনো ভুল বা দেরির জন্য বানানো অজুহাত না দিয়ে সোজাসুজি স্বীকার করুন।

সহিহ বুখারী ৪৪১৮ সহিহসূরা আত-তাওবা ৯:১১৯ কুরআন

ধ্বংসের জায়গায় বিনয়

সামূদের ঘর দিয়ে যাওয়ার সময় নবীজি (ﷺ) মাথা ঢেকে দ্রুত পার হয়েছেন।

আজকের কাজ: আজ কুরআনে কোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির কাহিনী (যেমন সূরা হুদ) অর্থসহ পড়ুন, আর নিজের জন্য শিক্ষা লিখুন।

সহিহ বুখারী ৪৪১৯ সহিহসূরা হুদ ১১:৬৭ কুরআন

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন

গরম, খেজুরের মৌসুম আর দীর্ঘ পথ: তাবুকের অজুহাতগুলো খুব বাস্তব ছিল। আজ আপনার কোন ভালো কাজ "পরে করব" অজুহাতে আটকে আছে?

সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
  • কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
  • সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
  • ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
  • মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
  • দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।

সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sirat/tabuk/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার