مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ
মুতা যুদ্ধ: তিন সেনাপতি আর "আল্লাহর তলোয়ার"
মক্কা বিজয়ের কয়েক মাস আগে তিন হাজার সাহাবি রওনা হলেন উত্তরে, শামের সীমান্তে। সামনে ছিল বিশাল রোমান বাহিনী আর তাদের আরব মিত্ররা। নবীজি (ﷺ) সেখানে ছিলেন না, তবু যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্তের খবর তিনি মদিনায় বসে দিচ্ছিলেন।
সীরাত · মাদানী যুগ৬২৯ খ্রি. · ৮ হিজরি · জুমাদাল উলা
- কখন
- ৮ হিজরি, জুমাদাল উলা (প্রসিদ্ধ মত)
- কোথায়
- শামের সীমান্তে মুতা গ্রাম, আজকের জর্ডানের কারাক এলাকার কাছে
- দুই পক্ষ
- মুসলিম প্রায় ৩০০০ জন; রোমান ও তাদের আরব মিত্রদের বাহিনী অনেক বড় (সীরাতের বইয়ে বিশাল সংখ্যা এসেছে, সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই)
- এই গল্পে
- সেনাপতি নির্ধারণ থেকে খালিদের নেতৃত্বে বাহিনী রক্ষা পর্যন্ত
কেন পড়বেন: মুতা দেখায়, নবীজি (ﷺ) সাহাবিদের কতটা ভালোবাসতেন, আর সাহাবিরা আল্লাহর পথে কতটা অটল ছিলেন। তিন সেনাপতির একজনও পিছু হটেননি। আর এখান থেকেই খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) পেলেন "আল্লাহর তলোয়ার" উপাধি।
গল্প
বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।
- ১
মদিনা থেকে রওনা
"যায়েদ শহীদ হলে জাফর"
সীরাতের বর্ণনায় আছে, নবীজির (ﷺ) পাঠানো এক দূতকে শামের সীমান্তে রোমানদের এক আরব শাসক হত্যা করেছিল; দূত হত্যা ছিল সব যুগে বড় অপরাধ। তার জবাবে এই অভিযান। নবীজি (ﷺ) সেনাপতি বানালেন তাঁর পালকপুত্র যায়েদ ইবনু হারিসাকে (রা.), আর আগেই বলে দিলেন পরের দুজনের নাম:
মুতার অভিযানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়েদ ইবনু হারিসাকে সেনাপতি করলেন এবং বললেন: যায়েদ শহীদ হলে জাফর, জাফর শহীদ হলে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা। আবদুল্লাহ (ইবনু উমর) বলেন: আমি সেই অভিযানে ছিলাম। আমরা জাফর ইবনু আবি তালিবকে খুঁজে শহীদদের মধ্যে পেলাম; তাঁর শরীরে বর্শা আর তীরের নব্বইটিরও বেশি আঘাত ছিল।
সূত্রসহিহ বুখারী ৪২৬১ সহিহইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা: দূত হারিস ইবনু উমাইর আল-আযদীকে হত্যা ঐতিহাসিক বর্ণনা
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) পরপর তিনজনের নাম বললেন। সাহাবিরা জানতেন এর মানে কী, তবু কেউ পিছু হটেননি।
- ২
মুতার কাছে পৌঁছে
সামনে বিশাল বাহিনী
সীমান্তে পৌঁছে মুসলিমরা দেখলেন, শত্রুর সংখ্যা তাঁদের বহু গুণ। সীরাতের বর্ণনায় আছে, কেউ কেউ বললেন, নবীজিকে (ﷺ) চিঠি লিখে নির্দেশ চাওয়া হোক। তখন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন: আমরা সংখ্যা বা শক্তি দিয়ে লড়ি না, লড়ি এই দ্বীনের জন্য, যা দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন; দুটির একটি কল্যাণ আমাদের জন্য নিশ্চিত: বিজয় অথবা শাহাদাত। এ কথায় সবাই এগিয়ে গেলেন। কুরআন মুমিনদের এই অবস্থার কথা বলেছে:
قُلْ هَلْ تَرَبَّصُونَ بِنَا إِلَّا إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ ۖ وَنَحْنُ نَتَرَبَّصُ بِكُمْ أَن يُصِيبَكُمُ اللَّهُ بِعَذَابٍ مِّنْ عِندِهِ أَوْ بِأَيْدِينَا ۖ فَتَرَبَّصُوا إِنَّا مَعَكُم مُّتَرَبِّصُونَ
বলুন, ‘তোমরা আমাদের দুটি মঙ্গলের একটির প্রতীক্ষা করছ এবং আমরা প্রতীক্ষা করছি যে, আল্লাহ্ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন সরাসরি নিজ পক্ষ থেকে অথবা আমাদের হাত দ্বারা। অতএব তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমরাও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।
অনুবাদে ‘আমরা’, ‘আমাদের’: আল্লাহ যেখানে নিজের কথা বলেছেন, সেখানে এটা আরবির সম্মানসূচক বহুবচন (নাহনু, ইন্না)। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার (রা.) ভাষণ ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা আত-তাওবা ৯:৫২ কুরআনসূরা আল-বাকারা ২:২৪৯ কুরআন
"দুটি কল্যাণের একটি": যে মুমিন আল্লাহর জন্য কাজ করে, তার জন্য ব্যর্থতা বলে কিছু নেই।
- ৩
যুদ্ধের দিন
সামনে সব আঘাত
যায়েদ (রা.) পতাকা নিয়ে লড়তে লড়তে শহীদ হলেন। তারপর পতাকা নিলেন জাফর ইবনু আবি তালিব (রা.), নবীজির (ﷺ) চাচাতো ভাই, হাবশা থেকে ফিরেছিলেন মাত্র এক বছর আগে। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) নিজে সেই যুদ্ধে ছিলেন:
وَقَفَ عَلَى جَعْفَرٍ يَوْمَئِذٍ وَهْوَ قَتِيلٌ، فَعَدَدْتُ بِهِ خَمْسِينَ بَيْنَ طَعْنَةٍ وَضَرْبَةٍ، لَيْسَ مِنْهَا شَىْءٌ فِي دُبُرِهِ. يَعْنِي فِي ظَهْرِهِ
ইবনু উমর (রা.) সেদিন শহীদ জাফরের (রা.) পাশে দাঁড়িয়ে গুনে দেখলেন, বর্শা ও তলোয়ারের পঞ্চাশটি আঘাত; তার একটিও পেছনে, অর্থাৎ পিঠে ছিল না।
তারপর আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রা.) পতাকা তুলে নিলেন, তিনিও শহীদ হলেন।
সূত্রসহিহ বুখারী ৪২৬০ সহিহসহিহ বুখারী ৪২৬১ সহিহ
জাফরের (রা.) একটি আঘাতও পিঠে ছিল না; তিনি পালাননি, একবারও পেছন ফেরেননি। অটল থাকা মানে শেষ পর্যন্ত মুখ সামনে রাখা।
- ৪
একই দিন, মদিনায়
মদিনায় চোখের পানি
মুতা থেকে মদিনা প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। কোনো দূত তখনো আসেনি। নবীজি (ﷺ) মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন:
খবর আসার আগেই নবীজি (ﷺ) মানুষকে যায়েদ, জাফর ও ইবনু রাওয়াহার শাহাদাতের খবর দিলেন। তিনি বললেন: পতাকা নিল যায়েদ, সে শহীদ হলো; তারপর নিল জাফর, সে শহীদ হলো; তারপর নিল ইবনু রাওয়াহা, সে-ও শহীদ হলো। (বলার সময়) তাঁর দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। অবশেষে পতাকা নিল আল্লাহর তলোয়ারগুলোর একটি তলোয়ার, আর আল্লাহ তাদের রক্ষা ও বিজয় দিলেন।
সূত্রসহিহ বুখারী ৪২৬২ সহিহ
আল্লাহ তাঁকে দূর থেকে সব দেখালেন, আর তিনি বলতে বলতে কাঁদলেন। প্রিয়জনের মৃত্যুতে চোখের পানি সুন্নাহ, এটা ধৈর্যের বিপরীত নয়।
- ৫
যুদ্ধের শেষ দিকে
খালিদের নয় তলোয়ার
তিন সেনাপতি শহীদ হওয়ার পর সাহাবিরা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে (রা.) নেতা বানালেন, যিনি মাত্র কয়েক মাস আগে মুসলিম হয়েছিলেন। নবীজি (ﷺ) তাঁকেই বললেন "আল্লাহর তলোয়ারগুলোর একটি" (সহিহ বুখারী ৪২৬২)। সেদিন তিনি কেমন লড়েছিলেন, নিজেই বলেছেন:
لَقَدِ انْقَطَعَتْ فِي يَدِي يَوْمَ مُوتَةَ تِسْعَةُ أَسْيَافٍ، فَمَا بَقِيَ فِي يَدِي إِلاَّ صَفِيحَةٌ يَمَانِيَةٌ
মুতার দিন আমার হাতে নয়টি তলোয়ার ভেঙেছে; শেষে আমার হাতে শুধু একটা ইয়েমেনি চওড়া তলোয়ার টিকে ছিল।
সীরাতের বর্ণনায় আছে, তিনি কৌশলে বাহিনী সাজিয়ে মুসলিমদের নিরাপদে সরিয়ে আনেন।
সূত্রসহিহ বুখারী ৪২৬৫ সহিহসহিহ বুখারী ৪২৬২ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: খালিদের (রা.) নেতৃত্বে বাহিনী সরিয়ে আনা ঐতিহাসিক বর্ণনা
যে খালিদ উহুদে মুসলিমদের পেছন থেকে আক্রমণ করেছিলেন, তিনিই মুতায় মুসলিমদের রক্ষা করলেন। ইসলাম মানুষের অতীত নয়, বর্তমান দেখে।
- ৬
যুদ্ধের পর
"দুই ডানাওয়ালার ছেলে"
জাফরের (রা.) দুই হাত কাটা পড়েছিল (সীরাতের বর্ণনা)। নবীজি (ﷺ) সুসংবাদ দিলেন:
رَأَيْتُ جَعْفَرًا يَطِيرُ فِي الْجَنَّةِ مَعَ الْمَلاَئِكَةِ
আমি জাফরকে দেখেছি, জান্নাতে ফেরেশতাদের সাথে উড়ছে।
তাই ইবনু উমর (রা.) জাফরের ছেলেকে সালাম দিতেন এভাবে:
كَانَ إِذَا سَلَّمَ عَلَى ابْنِ جَعْفَرٍ قَالَ السَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا ابْنَ ذِي الْجَنَاحَيْنِ
ইবনু উমর (রা.) জাফরের ছেলেকে সালাম দেওয়ার সময় বলতেন: আসসালামু আলাইকা, হে দুই ডানাওয়ালার ছেলে।
সূত্রজামে আত-তিরমিযী ৩৭৬৩ সহিহসহিহ বুখারী ৩৭০৯ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: জাফরের (রা.) দুই হাত হারানো ঐতিহাসিক বর্ণনা
দুনিয়ায় যা হারিয়েছেন, আল্লাহ জান্নাতে তার চেয়ে উত্তম দিয়েছেন। আল্লাহর পথে হারানো কিছুই আসলে হারায় না।
প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়
এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।
ঐতিহাসিক বর্ণনা মুতায় রোমানরা ছিল ঠিক দুই লাখ
ইবনে ইসহাক লিখেছেন, রোমান এক লাখ আর তাদের আরব মিত্র আরও এক লাখ। এটা সীরাতের বর্ণনা, সহিহ হাদিসে কোনো সংখ্যা নেই; ঐতিহাসিকদের অনেকে এই সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত মনে করেন। নিশ্চিত শুধু এটুকু: শত্রু মুসলিমদের চেয়ে বহু গুণ বেশি ছিল, আর আল্লাহ মুসলিমদের রক্ষা করেছেন (সহিহ বুখারী ৪২৬২)।
ভুল ধারণা মুতা ছিল মুসলিমদের পরাজয়
তিন সেনাপতি শহীদ হয়েছিলেন, কিন্তু নবীজি (ﷺ) নিজেই বলেছেন, খালিদ পতাকা নেওয়ার পর আল্লাহ তাদের বিজয় (রক্ষা) দিয়েছেন (সহিহ বুখারী ৪২৬২)। এত বড় বাহিনীর সামনে থেকে অল্প ক্ষতিতে বাহিনী ফিরিয়ে আনা ছিল বড় সাফল্য।
এই গল্প থেকে আমার জীবনে
গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।
দায়িত্বের জন্য আগে প্রস্তুতি
নবীজি (ﷺ) আগেই ঠিক করে দিয়েছিলেন, কেউ না থাকলে কে দায়িত্ব নেবে।
আজকের কাজ: পরিবার বা প্রতিষ্ঠানে আপনার অনুপস্থিতিতে কে কোন দায়িত্ব নেবে, আজ তা ঠিক করে লিখে রাখুন; অসিয়ত না লিখে থাকলে লিখুন।
সহিহ বুখারী ৪২৬১ সহিহসহিহ বুখারী ২৭৩৮ সহিহ
শোকে কান্না, তবু ধৈর্য
সাহাবিদের শাহাদাতের খবর দিতে গিয়ে নবীজির (ﷺ) চোখে পানি ছিল।
আজকের কাজ: আজ এমন কোনো পরিবারের খোঁজ নিন, যারা সম্প্রতি প্রিয়জন হারিয়েছে; তাদের জন্য খাবার বা সান্ত্বনার কথা পাঠান।
সহিহ বুখারী ৪২৬২ সহিহসূরা আল-বাকারা ২:১৫৬ কুরআন
অতীত নয়, বর্তমান দেখা
উহুদের শত্রু খালিদ মুতায় মুসলিমদের রক্ষাকারী হলেন।
আজকের কাজ: যে মানুষটার অতীত ভুলের জন্য আপনি এখনো তাকে দূরে রাখেন, অথচ সে বদলেছে, আজ তাকে নতুন করে সুযোগ দিন।
সহিহ বুখারী ৪২৬২ সহিহসূরা আল-আনফাল ৮:৩৮ কুরআন
তিন সাহাবি জানতেন, নাম ঘোষণার মানে হয়তো শাহাদাত। তবু কেউ পিছু হটেননি। আপনার কাছে আল্লাহর জন্য কোন ত্যাগটা সবচেয়ে কঠিন মনে হয়?
সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
- কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
- সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
- ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
- মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
- দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।
সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।