deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ

ইহুদি ও বনী ইসরাঈল: কুরআন ও সহিহ হাদিসে

নবীদের বংশধর এক জাতি, যাদের আল্লাহ একসময় বিশ্বের উপর মর্যাদা দিয়েছিলেন, আবার অঙ্গীকার ভাঙার কারণে কঠোর তিরস্কারও করেছেন। কুরআনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এই জাতির পরিচয়, তাদের নবী, আর তাদের ভুলের বিশ্লেষণ: শুধু দলিল দিয়ে।

৭১ আয়াত২০ হাদিস৯ ভুল ধারণা যাচাই

এই পাতার প্রতিটি কথা কুরআনের আয়াত বা হাদিস থেকে, আর প্রতিটি হাদিসের মান দেওয়া আছে। দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা ভুল ধারণা ও মান যাচাই অংশে আলাদা করে চিহ্নিত। উদ্দেশ্য কোনো মানুষ বা জাতির প্রতি বিদ্বেষ নয়; কুরআন যে ভুলগুলো চিহ্নিত করেছে, তা বোঝা আর নিজেরা তা থেকে বাঁচা। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু, হাদিসের অনুবাদ Deenpedia-র নিজস্ব। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।

ইসরাঈল কে
নবী ইয়াকুব (আ.)-এর আরেক নাম; তাঁর বারো ছেলের বংশধরই বনী ইসরাঈল (সূরা আলে ইমরান ৩:৯৩, সূরা ইউসুফ ১২:৪)
"ইহুদি" নাম
মূসা (আ.)-এর দোয়া "ইন্না হুদনা ইলাইক" (আমরা আপনার দিকে ফিরে এসেছি) থেকে, বা ইয়াকুবের ছেলে ইয়াহুদার নাম থেকে (সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৬)
কিতাব
তাওরাত, মূসা (আ.)-এর উপর; তাতে ছিল হিদায়াত ও নূর (সূরা আল-মায়িদা ৫:৪৪)। যাবুর দাউদ (আ.)-এর উপর (সূরা আন-নিসা ৪:১৬৩)
মর্যাদা
তাদের যুগে বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব, তাদের মধ্যে বহু নবী ও বাদশাহ (সূরা আল-বাকারা ২:৪৭, সূরা আল-মায়িদা ৫:২০)
শর্ত
অঙ্গীকার পূর্ণ করলে আল্লাহও পূর্ণ করবেন; জালিমরা প্রতিশ্রুতির অংশ পায় না (সূরা আল-বাকারা ২:৪০, সূরা আল-বাকারা ২:১২৪)
সূরা আল-ফাতিহায়
"মাগদূবি আলাইহিম" (যাদের উপর ক্রোধ): নবীজির ব্যাখ্যায় ইহুদি (সূরা আল-ফাতিহা ১:৭, জামে আত-তিরমিযী ২৯৫৪)
সবাই এক নয়
তাদের মধ্যে সত্যপন্থী একটি দলও আছে, কুরআন নিজেই বলেছে (সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৯, সূরা আলে ইমরান ৩:১১৩)

কোন নবীরা বনী ইসরাঈলের সাথে জড়িত

ইবরাহীম (আ.)-এর ছেলে ইসহাক, তাঁর ছেলে ইয়াকুব (ইসরাঈল)। ইয়াকুবের বংশে আল্লাহ একের পর এক নবী পাঠিয়েছেন; নবীজি (ﷺ) বলেছেন, বনী ইসরাঈলকে নবীরাই পরিচালনা করতেন:

বনী ইসরাঈলকে নবীরাই পরিচালনা করতেন। যখনই একজন নবী মারা যেতেন, আরেকজন নবী তাঁর স্থলে আসতেন। আর আমার পরে কোনো নবী নেই; তবে অনেক খলিফা হবে। সাহাবীরা বললেন: তখন আমাদের কী আদেশ? তিনি বললেন: প্রথম জনের বাইআত পূর্ণ করো, তারপর তার পরের জনের। তাদের প্রাপ্য তাদের দাও; কারণ আল্লাহ তাদের দায়িত্বে যা দিয়েছেন, সে বিষয়ে তাদের জিজ্ঞেস করবেন।

সহিহ বুখারী ৩৪৫৫সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

নিচের তালিকায় কুরআনে নাম আসা সেই নবীরা, যাঁরা বনী ইসরাঈলের মধ্যে বা তাদের কাছে এসেছেন। নাম নীল হলে জীবনী পড়া যাবে।

নবীসম্পর্ককুরআন ও হাদিসে
ইবরাহীম (আ.)পূর্বপুরুষ; তাঁর কাছেই বংশে নবুয়তের প্রতিশ্রুতিসূরা আল-আনকাবূত ২৯:২৭, সূরা আল-বাকারা ২:১২৪
ইসহাক (আ.)ইয়াকুবের বাবাসূরা হুদ ১১:৭১, সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১১২
ইয়াকুব (আ.) = ইসরাঈলজাতির পিতা; মৃত্যুর আগে সন্তানদের তাওহীদের অসিয়তসূরা আল-বাকারা ২:১৩৩, সূরা আলে ইমরান ৩:৯৩
ইউসুফ (আ.)তাঁর মাধ্যমে বনী ইসরাঈল কেনান থেকে মিসরে এলসূরা ইউসুফ ১২:৯৯, সূরা ইউসুফ ১২:১০০
মূসা (আ.)সবচেয়ে বড় নবী; ফিরআউন থেকে মুক্তি, তাওরাতসূরা আল-আরাফ ৭:১৩৭, সূরা আল-বাকারা ২:৫৩, সহিহ বুখারী ২০০৪
হারূন (আ.)মূসার ভাই ও সহযোগী নবী; বাছুর পূজা থেকে নিষেধ করেছিলেনসূরা ত্বা-হা ২০:৯০, সূরা মারইয়াম ১৯:৫৩
দাউদ (আ.)বাদশাহ ও নবী; যাবুর পেয়েছেন, জালূতকে হত্যা করেছেনসূরা আল-বাকারা ২:২৫১, সূরা আন-নিসা ৪:১৬৩
সুলাইমান (আ.)দাউদের উত্তরসূরি; বিশাল রাজত্ব, জিন ও বাতাস অধীনসূরা আন-নামল ২৭:১৬, সূরা সোয়াদ ৩৮:৩৫
ইলিয়াস (আ.)বা'ল মূর্তির পূজা থেকে জাতিকে ফেরাতে এসেছিলেনসূরা আস-সাফফাত ৩৭:১২৩, সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১২৫
আল-ইয়াসা (আ.)কুরআনে নেককারদের সাথে নাম এসেছেসূরা সোয়াদ ৩৮:৪৮
যাকারিয়া (আ.)বাইতুল মাকদিসের সেবক, মারইয়ামের অভিভাবকসূরা আলে ইমরান ৩:৩৭, সূরা মারইয়াম ১৯:৭
ইয়াহইয়া (আ.)যাকারিয়ার ছেলে, ঈসার সত্যায়নকারীসূরা আলে ইমরান ৩:৩৯, সূরা মারইয়াম ১৯:১২
ঈসা (আ.)বনী ইসরাঈলের শেষ নবী; তাদের অনেকে তাঁকে অস্বীকার করেসূরা আস-সাফ ৬১:৬, সূরা আন-নিসা ৪:১৫৭

পরিচয়: বনী ইসরাঈল ও ইহুদি

"ইসরাঈল" নবী ইয়াকুব (আ.)-এর আরেক নাম। কুরআনে তাওরাত নাযিলের আগের এক ঘটনায় তাঁকে এ নামেই ডাকা হয়েছে, আর তাঁর বারো ছেলের বংশধরদের বলা হয়েছে "বনী ইসরাঈল" (ইসরাঈলের সন্তানেরা):

كُلُّ الطَّعَامِ كَانَ حِلًّا لِّبَنِي إِسْرَائِيلَ إِلَّا مَا حَرَّمَ إِسْرَائِيلُ عَلَىٰ نَفْسِهِ مِن قَبْلِ أَن تُنَزَّلَ التَّوْرَاةُ ۗ قُلْ فَأْتُوا بِالتَّوْرَاةِ فَاتْلُوهَا إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ

তাওরাত নাযিল হওয়ার আগে ইস্‌রাঈল তার নিজের উপর যা হারাম করেছিল তা ছাড়া বনী ইসরাঈলের জন্য যাবতীয় খাদ্যই হালাল ছিল। বলুন, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তাওরাত আন এবং তা পাঠ কর।’

মৃত্যুর সময় ইয়াকুব (আ.) সন্তানদের কাছে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, তা এই জাতির আসল পরিচয়: এক আল্লাহর ইবাদত।

أَمْ كُنتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِن بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَـٰهَكَ وَإِلَـٰهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَـٰهًا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

ইয়াকুবের যখন মৃত্যু এসেছিল তোমর কি তখন উপস্থিত ছিলে ? তিনি যখন সন্তানদের বলেছিলেন, ‘আমার পরে তোমরা কার ‘ইবাদাত করবে’ ? তারা বলেছিলো, ‘আমরা আপনার ইলাহ ও আপনার পিতৃ পুরুষ ইবরাহীম, ইস্‌মাঈল ও ইসহাকের ইলাহ্‌ - সেই এক ইলাহ্‌রই ‘ইবাদাত করবো। আর আমরা তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণকারী’।

"ইহুদি" (আরবিতে ইয়াহূদ) নামের উৎস নিয়ে আলেমদের দুটি মত: মূসা (আ.)-এর তাওবার দোয়া "ইন্না হুদনা ইলাইক", মানে আমরা আপনার দিকে ফিরে এসেছি (সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৬); অথবা ইয়াকুবের ছেলে ইয়াহুদার নাম, যাঁর বংশ পরে সবচেয়ে বড় গোত্র হয় (ইবনু কাসীর, সূরা আল-বাকারা ২:৬২-এর তাফসীর)। "বনী ইসরাঈল" বংশের নাম, "ইহুদি" ধর্মের নাম; কুরআন দুটোই ব্যবহার করেছে।

মনে রাখার মতো কথা: কুরআন ইবরাহীম (আ.)-কে ইহুদি বা খ্রিস্টান বলতে নিষেধ করেছে; তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম (সূরা আলে ইমরান ৩:৬৭)। নবীদের দ্বীন এক, ইসলাম; বংশ বা দলের নাম আসল পরিচয় নয়।

আল্লাহর নিয়ামত ও শর্তযুক্ত মর্যাদা

কুরআনে বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করা প্রতিটি বড় অংশ শুরু হয় আল্লাহর নিয়ামত মনে করিয়ে দিয়ে:

يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَنِّي فَضَّلْتُكُمْ عَلَى الْعَالَمِينَ

হে ইসরাঈল বংশধরগণ ! আমার সে নি‘আমতের কথা স্মরণ করো যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছিলাম। আর নিশ্চয় আমি সমগ্র সৃষ্টিকুলের উপর তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।

وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنبِيَاءَ وَجَعَلَكُم مُّلُوكًا وَآتَاكُم مَّا لَمْ يُؤْتِ أَحَدًا مِّنَ الْعَالَمِينَ

আর স্মরণ করুন, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তিনি তোমাদের মধ্যে নবী করেছিলেন ও তোমাদেরকে রাজা-বাদশাহ করেছিলেন এবং সৃষ্টিকুলের কাউকেও তিনি যা দেননি তা তোমাদেরকে দিয়েছিলেন।

ফিরআউনের দাসত্ব থেকে মুক্তি, সমুদ্র ভাগ হয়ে যাওয়া (সূরা আল-বাকারা ২:৫০), মেঘের ছায়া, মান্না ও সালওয়া (সূরা আল-বাকারা ২:৫৭), পাথর থেকে বারোটি ঝরনা (সূরা আল-বাকারা ২:৬০): এত নিয়ামত আর কোনো জাতির কাহিনিতে একসাথে আসেনি।

কিন্তু এই মর্যাদা ছিল শর্তযুক্ত। আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করো, আমি তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব":

يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ

হে ইসরাঈল বংশধরগণ ! তোমারা আমার সে নিয়ামতের কথা স্মরণ করো যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করো, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করবো। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।

ইবরাহীম (আ.) যখন বংশধরদের জন্য নেতৃত্ব চাইলেন, আল্লাহ স্পষ্ট বললেন, জালিমরা এই প্রতিশ্রুতির অংশ পাবে না (সূরা আল-বাকারা ২:১২৪)। তাই "বিশ্বের উপর শ্রেষ্ঠত্ব" কোনো জন্মগত বা চিরস্থায়ী অধিকার নয়; ঈমান ও আমলের সাথে বাঁধা। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)।

তাওরাত ও অঙ্গীকার (মীসাক)

মূসা (আ.)-কে আল্লাহ তাওরাত দিয়েছিলেন, আর বনী ইসরাঈলের পরের নবীরা এই তাওরাত দিয়েই বিচার করতেন:

إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ ۚ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوا مِن كِتَابِ اللَّهِ وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاءَ ۚ فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

নিশ্চয় আমরা তাওরাত নাযিল করেছিলাম; এতে ছিল হেদায়াত ও আলো; নবীগণ, যারা ছিলেন অনুগত, তারা ইয়াহুদীদেরকে তদনুসারে হুকুম দিতেন। আর রব্বানী ও বিদ্বানগণও (তদনুসারে হুকুম দিতেন), কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল। আর তারা ছিল এর উপর সাক্ষী। কাজেই তোমরা মানুষকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় কর। আর আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য ক্রয় করো না। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয় না, তারাই কাফের।

তাওরাতের সাথে আল্লাহ তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার (মীসাক) নিয়েছিলেন। সূরা আল-বাকারায় সেই অঙ্গীকারের ধারাগুলো:

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنكُمْ وَأَنتُم مُّعْرِضُونَ

আর স্মরণ কর, যখন আমরা ইসরাঈল-সন্তানদের প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কারো ‘ইবাদাত করবে না, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও দরিদ্রের সাথে সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে। আর সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে, তারপর তোমাদের মধ্য হতে কিছুসংখ্যক লোক ছাড়া তোমরা সকলেই অবজ্ঞা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে।

সূরা আল-মায়িদায় আছে, তাদের মধ্য থেকে বারোজন নেতা নিযুক্ত করা হয়েছিল, আর নামাজ, যাকাত, রাসূলদের প্রতি ঈমান ও সাহায্যের শর্তে আল্লাহ তাদের সাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন (সূরা আল-মায়িদা ৫:১২)। পরের আয়াতেই এসেছে, অঙ্গীকার ভাঙার পরিণাম: অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া আর কিতাবের শব্দ জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া (সূরা আল-মায়িদা ৫:১৩)।

মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, মূসা (আ.)-এর উপর নাযিল হওয়া মূল তাওরাত আল্লাহর কিতাব। কিন্তু আজ যে গ্রন্থ তাওরাত নামে আছে, তা পরিবর্তন ও সংযোজন থেকে মুক্ত নয়; তাই তার যে কথা কুরআন-সুন্নাহর সাথে মেলে তা গ্রহণযোগ্য, যা বিপরীত তা প্রত্যাখ্যাত, আর বাকিটা নিয়ে নীরব থাকা: এটাই নবীজির শেখানো নীতি:

আহলে কিতাবরা হিব্রু ভাষায় তাওরাত পড়ত আর মুসলিমদের জন্য আরবিতে ব্যাখ্যা করত। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: আহলে কিতাবকে সত্যবাদীও বলো না, মিথ্যাবাদীও বলো না; বরং বলো: "আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর আর যা নাযিল হয়েছে তার উপর …" (২:১৩৬)।

সহিহ বুখারী ৪৪৮৫সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

কুরআনে বর্ণিত ভুল ও অবাধ্যতা: বিশ্লেষণ

কুরআন বনী ইসরাঈলের ইতিহাস বলেছে উপদেশ হিসেবে, যাতে পরের উম্মত একই ভুল না করে। নবীজি (ﷺ) সতর্ক করেছেন, এই উম্মতের কিছু মানুষ বিঘতে বিঘতে তাদের পথ অনুসরণ করবে:

لَتَتْبَعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا شِبْرًا وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ، حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ تَبِعْتُمُوهُمْ ‏"‏‏.‏ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى قَالَ ‏"‏ فَمَنْ

তোমরা অবশ্যই তোমাদের আগের লোকদের রীতিনীতি বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুসরণ করবে; এমনকি তারা যদি গুইসাপের গর্তে ঢোকে, তোমরাও তাদের পেছনে ঢুকবে। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, (আগের লোক মানে) ইহুদি ও নাসারা? তিনি বললেন: তাহলে আর কারা?

সহিহ বুখারী ৭৩২০সহিহবর্ণনাকারী: আবু সাঈদ খুদরী (রা.)

তাই নিচের ভুলগুলো পড়ার সময় প্রশ্নটা হওয়া উচিত: "আমাদের মধ্যে কি এটা আছে?"

১. তাওহীদ ভাঙা: বাছুর পূজা

মূসা (আ.) চল্লিশ রাতের জন্য তূর পাহাড়ে গেলে সামেরী গয়না গলিয়ে একটি বাছুর বানাল, আর জাতির বড় অংশ তার পূজা শুরু করল:

وَاتَّخَذَ قَوْمُ مُوسَىٰ مِن بَعْدِهِ مِنْ حُلِيِّهِمْ عِجْلًا جَسَدًا لَّهُ خُوَارٌ ۚ أَلَمْ يَرَوْا أَنَّهُ لَا يُكَلِّمُهُمْ وَلَا يَهْدِيهِمْ سَبِيلًا ۘ اتَّخَذُوهُ وَكَانُوا ظَالِمِينَ

আর মূসার সম্প্রদায় তার অনুপস্থিতিতে নিজেদের অলংকার দিয়ে একটি বাছুর তৈরী করল, একটা দেহ, যা 'হাম্বা’ শব্দ করত। তারা কি দেখল না যে, এটা তাদের সাথে কথা বলে না এবং তাদেরকে পথও দেখায় না? তারা এটাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করল এবং তারা ছিল যালেম।

একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: বর্তমান বাইবেলের যাত্রাপুস্তকে (৩২ অধ্যায়) বলা হয়েছে, হারূন নিজেই বাছুর বানিয়েছিলেন। কুরআন এই অপবাদ থেকে একজন নবীকে মুক্ত করেছে; হারূন (আ.) তাদের নিষেধ করেছিলেন, তারা মানেনি:

وَلَقَدْ قَالَ لَهُمْ هَارُونُ مِن قَبْلُ يَا قَوْمِ إِنَّمَا فُتِنتُم بِهِ ۖ وَإِنَّ رَبَّكُمُ الرَّحْمَـٰنُ فَاتَّبِعُونِي وَأَطِيعُوا أَمْرِي

অবশ্য হারুন তাদেরকে আগেই বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! এ দ্বারা তো শুধু তোমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। আর তোমাদের রব তো দয়াময়; কাজেই তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মেনে চল।

২. আল্লাহর আদেশ নিয়ে টালবাহানা

আল্লাহকে চোখে না দেখা পর্যন্ত ঈমান আনবে না বলা (সূরা আল-বাকারা ২:৫৫); একটি গাভী জবাইয়ের সহজ আদেশ পেয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে কাজটা কঠিন বানানো (সূরা আল-বাকারা ২:৬৭, সূরা আল-বাকারা ২:৭১); পবিত্র ভূমিতে ঢোকার আদেশে বলা "আপনি আর আপনার রব গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানেই বসে থাকব" (সূরা আল-মায়িদা ৫:২৪), যার শাস্তি ছিল চল্লিশ বছর মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ানো (সূরা আল-মায়িদা ৫:২৬)। শহরে ঢোকার সময় "হিত্তাহ" (ক্ষমা চাই) বলার বদলে শব্দ বিকৃত করা:

قِيلَ لِبَنِي إِسْرَائِيلَ ‏{‏ادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا وَقُولُوا حِطَّةٌ‏}‏ فَدَخَلُوا يَزْحَفُونَ عَلَى أَسْتَاهِهِمْ، فَبَدَّلُوا وَقَالُوا حِطَّةٌ، حَبَّةٌ فِي شَعَرَةٍ

বনী ইসরাঈলকে বলা হয়েছিল: "দরজা দিয়ে সিজদা করে (বিনয়ে মাথা নুইয়ে) ঢোকো আর বলো: হিত্তাহ (আমাদের পাপ ক্ষমা করো)।" কিন্তু তারা নিতম্বের উপর ভর দিয়ে হেঁচড়ে ঢুকল, আর কথাটা বদলে বলল: "হিন্তাহ, হাব্বাতুন ফী শাআরাহ" (যবের ভেতরে একটা দানা)।

সহিহ বুখারী ৪৪৭৯সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

৩. কৌশলে হারামকে হালাল বানানো

শনিবারে মাছ ধরা নিষেধ ছিল। একদল লোক শুক্রবার জাল পেতে রবিবার মাছ তুলত, যেন শনিবারে "ধরা" না হয় (সূরা আল-আরাফ ৭:১৬৩)। আল্লাহ তাদের লাঞ্ছিত বানরে পরিণত করেছিলেন (সূরা আল-বাকারা ২:৬৫)। একই মানসিকতা দেখা গেছে চর্বির ক্ষেত্রে:

قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ، حُرِّمَتْ عَلَيْهِمُ الشُّحُومُ فَجَمَلُوهَا فَبَاعُوهَا

আল্লাহ ইহুদিদের ধ্বংস করুন! তাদের জন্য (পশুর) চর্বি হারাম করা হয়েছিল, তখন তারা তা গলিয়ে বিক্রি করল (আর দাম খেল)।

সহিহ বুখারী ২২২৩সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.), উমার (রা.) থেকে

৪. কিতাব বিকৃত করা ও সত্য গোপন করা

কুরআন তাদের এক দলের তিনটি কাজ চিহ্নিত করেছে: শব্দ জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া (সূরা আন-নিসা ৪:৪৬), নিজের হাতে লিখে "এটা আল্লাহর কাছ থেকে" বলা, আর জেনেশুনে সত্য গোপন করা:

فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَـٰذَا مِنْ عِندِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا ۖ فَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا يَكْسِبُونَ

কাজেই দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে, অতঃপর সামান্য মূল্য পাওয়ার জন্য বলে, ‘এটা আল্লাহ্‌র কাছ থেকে’। অতএব, তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের ধ্বংস এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্য তাদের ধ্বংস।

নবীজির সামনেই তার একটি নমুনা ঘটেছিল, যখন তাওরাতের একটি আয়াত হাত দিয়ে ঢেকে রাখা হয়:

ইহুদিরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে জানাল, তাদের এক পুরুষ ও এক নারী ব্যভিচার করেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন: রজম (পাথর মারা) সম্পর্কে তাওরাতে কী পাও? তারা বলল: আমরা তাদের অপমান করি, আর তাদের বেত্রাঘাত করা হয়। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রা.) বললেন: তোমরা মিথ্যা বলছ, তাওরাতে রজমের বিধান আছে। তারা তাওরাত এনে খুলল; তাদের একজন রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে তার আগের ও পরের অংশ পড়ল। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম বললেন: হাত সরাও। সে হাত সরালে দেখা গেল সেখানে রজমের আয়াত। তখন তারা বলল: হে মুহাম্মাদ, তিনি সত্য বলেছেন, এতে রজমের আয়াত আছে। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আদেশে দুজনকে রজম করা হলো।

সহিহ বুখারী ৩৬৩৫সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)

৫. আলেমদের "রব" বানানো

আল্লাহ বলেছেন, তারা তাদের আলেম ও দরবেশদের আল্লাহর বদলে রব বানিয়েছে (সূরা আত-তাওবা ৯:৩১)। আদী ইবনু হাতিম (রা.) অবাক হয়ে প্রশ্ন করলে নবীজি ব্যাখ্যা দিলেন, এর মানে হালাল-হারামের অধিকার আল্লাহর বদলে মানুষের হাতে তুলে দেওয়া:

আমি গলায় সোনার একটি ক্রুশ ঝুলিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এলাম। তিনি বললেন: "হে আদী, এই মূর্তিটা ফেলে দাও।" আর আমি তাঁকে সূরা বারাআর এই আয়াত পড়তে শুনলাম: "তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের আলেম ও দরবেশদের রব বানিয়ে নিয়েছে।" তিনি বললেন: "তারা অবশ্য তাদের ইবাদত করত না; কিন্তু তারা যখন কোনো কিছু হালাল বলত, এরা তা হালাল মেনে নিত, আর যখন কোনো কিছু হারাম বলত, এরা তা হারাম মেনে নিত।"

জামে আত-তিরমিযী ৩০৯৫হাসানবর্ণনাকারী: আদী ইবনু হাতিম (রা.)

৬. আল্লাহ সম্পর্কে অশোভন কথা ও আত্মপ্রশংসা

কুরআন তাদের কিছু লোকের কথা উদ্ধৃত করেছে: "আল্লাহর হাত বাঁধা" (সূরা আল-মায়িদা ৫:৬৪), "আল্লাহ দরিদ্র, আমরা ধনী" (সূরা আলে ইমরান ৩:১৮১), "উযাইর আল্লাহর পুত্র" (সূরা আত-তাওবা ৯:৩০)। আর তারা দাবি করেছে, "আমরা আল্লাহর পুত্র ও প্রিয়জন" (সূরা আল-মায়িদা ৫:১৮), "ইহুদি ছাড়া কেউ জান্নাতে যাবে না" (সূরা আল-বাকারা ২:১১১), "আগুন আমাদের কয়েক দিনের বেশি স্পর্শ করবে না":

وَقَالُوا لَن تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّامًا مَّعْدُودَةً ۚ قُلْ أَتَّخَذْتُمْ عِندَ اللَّهِ عَهْدًا فَلَن يُخْلِفَ اللَّهُ عَهْدَهُ ۖ أَمْ تَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ

তারা বলে, ‘সামান্য কিছু দিন ছাড়া আগুন আমাদেরকে কখনও স্পর্শ করবে না।’ বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্‌র কাছ থেকে এমন কোনো অঙ্গীকার নিয়েছ; যে অঙ্গিকারের বিপরীত আল্লাহ্‌ কখনও করবেন না ? নাকি আল্লাহ্‌ সম্পর্কে এমন কিছু বলছ যা তোমরা জান না ?’

খাইবারের ইহুদিরা নবীজির সামনেও এই দাবি করেছিল (সহিহ বুখারী ৩১৬৯)। কুরআনের উত্তর ছিল নীতিগত: জান্নাত বংশ বা দলের নাম দিয়ে নয়; যে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে আর সৎকর্ম করে, সে-ই প্রতিদান পাবে (সূরা আল-বাকারা ২:১১২)।

৭. নবীদের অস্বীকার ও হত্যা

কুরআন জানিয়েছে, তারা নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করত, আর এটাই তাদের উপর লাঞ্ছনা নেমে আসার একটি কারণ (সূরা আল-বাকারা ২:৬১, সূরা আলে ইমরান ৩:১১২)। ঈসা (আ.)-কে তারা অস্বীকার করেছে, তাঁর মা মারইয়ামের উপর জঘন্য অপবাদ দিয়েছে, আর দাবি করেছে, "আমরা মাসীহকে হত্যা করেছি"; অথচ তারা তাঁকে হত্যাও করেনি, ক্রুশেও চড়ায়নি:

وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَـٰكِن شُبِّهَ لَهُمْ ۚ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ ۚ مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ ۚ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا

আর ‘আমরা আল্লাহর রাসূল মারঈয়াম তনয় ‘ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি’ তাদের এ উক্তির জন্য। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি; বরং তাদের জন্য (এক লোককে) তার সদৃশ করা হয়েছিল। আর নিশ্চয় যারা তার সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, তারা অবশ্যই এ সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ছাড়া তাদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। আর এটা নিশ্চিত যে, তারা তাঁকে হত্যা করেনি,

শেষ নবীকে চেনা ও অস্বীকার

মদিনার ইহুদি আলেমরা তাওরাত থেকে জানতেন, একজন শেষ নবী আসবেন। আগে তারা আরবদের বলত, সেই নবী এলে আমরা তাঁর সাথে মিলে তোমাদের হারাব; কিন্তু তিনি বনী ইসরাঈলের বাইরে থেকে এলে অস্বীকার করল (সূরা আল-বাকারা ২:৮৯)। কুরআন বলেছে, তারা তাঁকে চেনে, যেমন নিজের সন্তানকে চেনে:

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ ۖ وَإِنَّ فَرِيقًا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

আমরা যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তাকে সেরূপ জানে যেরূপ তারা নিজেদের সন্তানদেরকে চিনে। আর নিশ্চয় তাদের একদল জেনে-বুঝে সত্য গোপন করে থাকে।

তবে সবাই এমন ছিল না। মদিনার সবচেয়ে বড় ইহুদি আলেমদের একজন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রা.) সত্য চিনে সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ঘটনা দেখায়, জাতিগত গোঁড়ামি কীভাবে সত্যের পথে বাধা হয়:

নবী (ﷺ)-এর মদিনায় আসার খবর পেয়ে আবদুল্লাহ ইবনু সালাম তাঁর কাছে এলেন কিছু প্রশ্ন নিয়ে। বললেন: আমি আপনাকে তিনটি জিনিস জিজ্ঞেস করব, যা নবী ছাড়া কেউ জানে না: কিয়ামতের প্রথম আলামত কী? জান্নাতবাসীর প্রথম খাবার কী? আর সন্তান কখনো বাবার, কখনো মায়ের মতো হয় কেন? নবীজি উত্তর দিলেন (প্রথম আলামত এক আগুন যা মানুষকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে তাড়িয়ে নেবে; প্রথম খাবার মাছের কলিজার বাড়তি অংশ; …)। তিনি বললেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই আর আপনি আল্লাহর রাসূল। তারপর বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, ইহুদিরা অপবাদ দেওয়া জাতি; আমার ইসলামের কথা জানার আগে তাদের জিজ্ঞেস করুন। ইহুদিরা এলে নবীজি জিজ্ঞেস করলেন: আবদুল্লাহ ইবনু সালাম তোমাদের মধ্যে কেমন মানুষ? তারা বলল: আমাদের সবচেয়ে ভালো মানুষ, সবচেয়ে ভালো মানুষের ছেলে; আমাদের শ্রেষ্ঠ, শ্রেষ্ঠের ছেলে। তিনি বললেন: যদি আবদুল্লাহ ইসলাম গ্রহণ করে? তারা বলল: আল্লাহ তাকে এ থেকে রক্ষা করুন। তখন আবদুল্লাহ বেরিয়ে এসে কালিমা পড়লেন। সাথে সাথে তারা বলল: আমাদের সবচেয়ে খারাপ মানুষ, খারাপের ছেলে; আর তাঁকে ছোট করতে লাগল। তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, এটারই ভয় করছিলাম।

সহিহ বুখারী ৩৯৩৮সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

কুরআন এভাবেই ভারসাম্য রেখেছে: "তারা সবাই এক রকম নয়; আহলে কিতাবের মধ্যে একটি দল ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত, রাতে আল্লাহর আয়াত পড়ে, সিজদা করে":

لَيْسُوا سَوَاءً ۗ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ أُمَّةٌ قَائِمَةٌ يَتْلُونَ آيَاتِ اللَّهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ

তারা সবাই এক রকম নয়। কিতাবীদের মধ্যে অবিচলিত এক দল আছে; তারা রাতে আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে এবং তারা সাজ্‌দা করে।

وَمِن قَوْمِ مُوسَىٰ أُمَّةٌ يَهْدُونَ بِالْحَقِّ وَبِهِ يَعْدِلُونَ

আর মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন দল রয়েছে যারা অন্যকে ন্যায়ভাবে পথ দেখায় ও সে অনুযায়ীই (বিচারে) ইনসাফ করে।

নবীজি (ﷺ) ও মদিনার ইহুদি

হিজরতের সময় মদিনায় তিনটি বড় ইহুদি গোত্র ছিল: বনু কায়নুকা, বনু নাযীর ও বনু কুরাইযা। নবীজি (ﷺ) তাদের সাথে লিখিত চুক্তি করেন; সীরাত গ্রন্থে এটি "মদিনা সনদ" নামে পরিচিত। (সনদের পূর্ণ পাঠ ইবনু ইসহাক সনদ ছাড়া বর্ণনা করেছেন; তবে ইহুদিদের সাথে চুক্তি হয়েছিল, তা সহিহ হাদিস থেকেও প্রমাণিত।) একে একে তিন গোত্রই চুক্তি ভাঙে, আর প্রতিবার পরিণতি আলাদা হয়। ইবনু উমার (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

বনু নাযীর ও বনু কুরাইযা (চুক্তি ভেঙে) যুদ্ধ করল। তিনি বনু নাযীরকে নির্বাসন দিলেন, আর কুরাইযাকে থাকতে দিলেন ও তাদের প্রতি দয়া করলেন। পরে কুরাইযাও যুদ্ধ করল; তখন তাদের যোদ্ধা পুরুষদের হত্যা করা হলো, আর নারী, শিশু ও সম্পদ মুসলিমদের মধ্যে ভাগ করা হলো; তবে তাদের কেউ কেউ নবীজির কাছে চলে এসেছিল, তিনি তাদের নিরাপত্তা দিলেন এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করল। আর তিনি মদিনার সব ইহুদিকে নির্বাসন দিলেন: বনু কায়নুকা (আবদুল্লাহ ইবনু সালামের গোত্র), বনু হারিসার ইহুদি ও মদিনার সব ইহুদি।

সহিহ বুখারী ৪০২৮সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)

বনু নাযীরের নির্বাসন নিয়েই সূরা আল-হাশর নাযিল হয় (সূরা আল-হাশর ৫৯:২)। বনু কুরাইযা খন্দকের যুদ্ধে শত্রুপক্ষের সাথে যোগ দেয় (সূরা আল-আহযাব ৩৩:২৬); তারা নিজেরাই তাদের মিত্র সাদ ইবনু মুআয (রা.)-কে বিচারক মেনেছিল, আর তাঁর রায় অনুযায়ী শাস্তি হয় (সহিহ বুখারী ৪১২১ অংশে বিস্তারিত)। খাইবার বিজয়ের পর এক ইহুদি নারী নবীজিকে বিষ মেশানো খাবার দেয় (সহিহ বুখারী ৩১৬৯)।

যুদ্ধের পাশাপাশি সদাচার: নবীজির (ﷺ) আচরণ

এই ইতিহাসের অন্য দিকটিও সমান সহিহ, আর সেটা আমাদের প্রতিদিনের জন্য বেশি দরকারি। নবীজি এক ইহুদির জানাযা দেখে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন:

(কাদিসিয়ায়) সাহল ইবনু হুনাইফ ও কাইস ইবনু সাদ বসে ছিলেন। তাঁদের সামনে দিয়ে একটি জানাযা গেল, তাঁরা দাঁড়িয়ে গেলেন। বলা হলো: এটা তো এই দেশের অমুসলিম নাগরিকের লাশ। তাঁরা বললেন: নবী (ﷺ)-এর সামনে দিয়ে একটি জানাযা গিয়েছিল, তিনি দাঁড়ালেন। তাঁকে বলা হলো: এটা এক ইহুদির জানাযা। তিনি বললেন: "সে কি একজন মানুষ (প্রাণ) নয়?"

সহিহ বুখারী ১৩১২সহিহবর্ণনাকারী: সাহল ইবনু হুনাইফ ও কাইস ইবনু সাদ (রা.)

তাঁর খেদমত করা অসুস্থ ইহুদি ছেলেকে দেখতে গিয়েছেন (সহিহ বুখারী ১৩৫৬)। আর মৃত্যুর দিনও তাঁর বর্ম এক ইহুদির কাছে বন্ধক ছিল:

تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَدِرْعُهُ مَرْهُونَةٌ عِنْدَ يَهُودِيٍّ بِثَلاَثِينَ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ‏

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মারা গেলেন, তখন তাঁর বর্ম ত্রিশ সা যবের বিনিময়ে এক ইহুদির কাছে বন্ধক রাখা ছিল।

সহিহ বুখারী ২৯১৬সহিহবর্ণনাকারী: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)

মূসা (আ.)-এর মুক্তির দিন হিসেবে ইহুদিরা আশুরার রোজা রাখত; নবীজি বললেন, মূসার উপর আমাদের অধিকার বেশি, এবং নিজেও রোজা রাখলেন (সহিহ বুখারী ২০০৪)। অর্থাৎ মূসা (আ.) আমাদেরও নবী; তাঁকে ভালোবাসা ইহুদিদের একচেটিয়া নয়।

সময়রেখা

সালঘটনাসূত্রমান
১ হিজরিমদিনায় ইহুদি গোত্রদের সাথে চুক্তি; আবদুল্লাহ ইবনু সালামের ইসলাম গ্রহণসহিহ বুখারী ৩৯৩৮; ইবনু হিশামসহিহ
২ হিজরিবদরের পর বনু কায়নুকার চুক্তিভঙ্গ ও নির্বাসনসহিহ বুখারী ৪০২৮; বিস্তারিত ইবনু ইসহাকমূল ঘটনা সহিহ
৪ হিজরিবনু নাযীরের চুক্তিভঙ্গ ও নির্বাসন; সূরা আল-হাশরসূরা আল-হাশর ৫৯:২, সহিহ বুখারী ৪০২৮সহিহ
৫ হিজরিখন্দকের যুদ্ধে বনু কুরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা; সাদ ইবনু মুআযের রায়সূরা আল-আহযাব ৩৩:২৬, সহিহ বুখারী ৪১২১সহিহ
৭ হিজরিখাইবার বিজয়; ইহুদিরা জমি চাষের চুক্তিতে থেকে যায়; বিষ মেশানো খাবারসহিহ বুখারী ৩১৬৯সহিহ
১১ হিজরিনবীজির ওফাত; বর্ম তখনো এক ইহুদির কাছে বন্ধকসহিহ বুখারী ২৯১৬সহিহ

আজকের মুসলিমের জন্য শিক্ষা

বনী ইসরাঈলের কাহিনি থেকে মুসলিমদের জন্য তিনটি বড় শিক্ষা:

  • নিজের দিকে তাকানো। নবীজি সূরা আল-ফাতিহার শেষ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, "মাগদূব" ইহুদি আর "দোয়াল্লীন" নাসারা (জামে আত-তিরমিযী ২৯৫৪)। আলেমরা বলেন, যে জেনেও আমল করে না, তার মধ্যে প্রথম দলের স্বভাব; আর যে না জেনে ইবাদতে বাড়াবাড়ি করে, তার মধ্যে দ্বিতীয় দলের। প্রতি রাকাতে আমরা দুটো থেকেই আশ্রয় চাই।
  • কবর ও ব্যক্তিপূজা থেকে সাবধান। নবীজির শেষ সতর্কবাণীগুলোর একটি ছিল, নবীদের কবরকে মসজিদ না বানানো (সহিহ বুখারী ৪৩৫)।
  • ন্যায়বিচার সবার জন্য। কোনো জাতির শত্রুতাও যেন অবিচারে না ঠেলে দেয় (সূরা আল-মায়িদা ৫:৮)। চুক্তি বা নিরাপত্তার অধীনে থাকা অমুসলিমকে হত্যা করা কবীরা গুনাহ (সহিহ বুখারী ৩১৬৬)। আর যারা দ্বীনের কারণে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, তাদের সাথে সদাচার ও ন্যায় করতে আল্লাহ নিষেধ করেন না (সূরা আল-মুমতাহিনা ৬০:৮)।

আহলে কিতাবের সাথে আলোচনার আদব কুরআন নিজে শিখিয়েছে:

وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ ۖ وَقُولُوا آمَنَّا بِالَّذِي أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَـٰهُنَا وَإِلَـٰهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া কিতাবীদের সাথে বিতর্ক করবে না, তবে তাদের সাথে করতে পার, যারা তাদের সাথে যুলুম করেছে। আর তোমরা বল, 'আমাদের প্রতি এবং তোমদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে, তাতে আমরা ঈমান এনেছি। আর আমাদের ইলাহ্ ও তোমাদের ইলাহ্ তো একই। আর আমরা তাঁরই প্ৰতি আত্মসমৰ্পণকারী |’

ইহুদিদের নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা: দুই দিক থেকে

ভুল শুধু তাদের আকিদায় নয়; তাদের নিয়ে আমাদের সমাজেও অনেক ভুল কথা চলে। দুই দিকই কুরআন-হাদিস দিয়ে যাচাই:

হারাম

ইহুদিরা অভিশপ্ত জাতি, তাই যেকোনো ইহুদির সাথে অন্যায় করা, প্রতারণা করা বা তার ক্ষতি করা দোষের নয়।

যা সঠিক: কুরআন অন্যায়ের অনুমতি কোনো জাতির ক্ষেত্রেই দেয়নি: "কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদের অবিচারে প্ররোচিত না করে" (সূরা আল-মায়িদা ৫:৮)। কুরআনের তিরস্কার নির্দিষ্ট কাজের জন্য, আর তাদের মধ্যে সৎ লোক থাকার কথাও কুরআন বলেছে (সূরা আলে ইমরান ৩:১১৩)। নিরাপত্তার অধীনে থাকা অমুসলিমকে হত্যাকারী জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না (সহিহ বুখারী ৩১৬৬)।
ভুল

ইহুদি বা অমুসলিমের সাথে ব্যবসা, বাকিতে কেনাবেচা বা লেনদেন করা নাজায়েজ।

যা সঠিক: নবীজি (ﷺ) নিজে এক ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে খাদ্য কিনেছেন, বর্ম বন্ধক রেখেছেন, আর মৃত্যুর দিনও সেই বন্ধক ছিল (সহিহ বুখারী ২৯১৬)। হালাল জিনিসের বৈধ লেনদেন সবার সাথেই জায়েজ।
ভিত্তিহীন গল্প

এক ইহুদি বুড়ি প্রতিদিন নবীজির (ﷺ) পথে কাঁটা বা ময়লা ফেলত; একদিন না দেখে তিনি তাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে গেলেন, আর সে মুসলিম হয়ে গেল।

যা সঠিক: এই জনপ্রিয় গল্পের কোনো সনদ হাদিসের গ্রন্থ, সীরাতে ইবনি হিশাম বা ইতিহাসের প্রাচীন কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না। নবীজির উত্তম চরিত্র বোঝাতে বানানো গল্পের দরকার নেই; সহিহ ঘটনাই যথেষ্ট: ইহুদির জানাযায় দাঁড়ানো (সহিহ বুখারী ১৩১২), অসুস্থ ইহুদি ছেলেকে দেখতে যাওয়া (সহিহ বুখারী ১৩৫৬)। নবীজির নামে প্রমাণহীন কথা বলাও গুরুতর (সহিহ বুখারী ৩৪৬১)।
ভুল ব্যাখ্যা

কুরআন বনী ইসরাঈলকে "বিশ্বের উপর শ্রেষ্ঠ" বলেছে, তাই আজও কোনো জাতি জন্মগতভাবে আল্লাহর বিশেষ প্রিয়।

যা সঠিক: সেই শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তাদের যুগে, ঈমান ও অঙ্গীকার পূরণের শর্তে (সূরা আল-বাকারা ২:৪০)। জালিমরা আল্লাহর প্রতিশ্রুতির অংশ পায় না (সূরা আল-বাকারা ২:১২৪)। "আমরা আল্লাহর প্রিয়জন" দাবিকে কুরআন সরাসরি খণ্ডন করেছে (সূরা আল-মায়িদা ৫:১৮)। মর্যাদার মাপকাঠি তাকওয়া, বংশ নয় (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)। একই কথা মুসলিমদের জন্যও: শুধু নাম মুসলিম হলে মর্যাদা আসে না।
আংশিক ঠিক

সব ইহুদি উযাইরকে আল্লাহর পুত্র বলে বিশ্বাস করে।

যা সঠিক: কুরআন উযাইর সম্পর্কে এই কথা ইহুদিদের দিকে সম্বোধন করেছে (সূরা আত-তাওবা ৯:৩০)। তবে তাফসীরবিদরা (তাবারী, ইবনু কাসীর) ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে উল্লেখ করেছেন, কথাটি বলেছিল নবীজির যুগের নির্দিষ্ট কিছু ইহুদি; এটি ইহুদিদের সর্বজনীন মূল আকিদা হিসেবে পরিচিত নয়। দলিলের কথা দলিলের সীমায় বলাই ন্যায় (সূরা আল-মায়িদা ৫:৮)।
সতর্কতা দরকার

ইসরাঈলি বর্ণনা (বনী ইসরাঈলের গল্প) সবই বাতিল; অথবা উল্টো, তাফসীরে আছে মানেই সত্য।

যা সঠিক: দুটোই বাড়াবাড়ি। নবীজি বলেছেন, বনী ইসরাঈল থেকে বর্ণনা করো, সমস্যা নেই (সহিহ বুখারী ৩৪৬১); আবার বলেছেন, তাদের কথা সত্যও বলো না, মিথ্যাও বলো না (সহিহ বুখারী ৪৪৮৫)। তাই কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত হলে প্রত্যাখ্যান, মিললে গ্রহণ, আর অজানা হলে শুধু গল্প হিসেবে, আকিদা বা দলিল হিসেবে নয়।
ইসরাঈলি জাল গল্প

"উজ ইবনু উনুক" নামের এক দানব ছিল, যে সাগর থেকে মাছ তুলে সূর্যে ভেজে খেত, নূহের প্লাবনে পানি তার হাঁটুও ছোঁয়নি; মূসা (আ.) তাকে হত্যা করেন।

যা সঠিক: ইবনু কাসীর সূরা আল-মায়িদা ৫:২২-এর তাফসীরে এবং মুহাম্মাদ আবু শাহবা "আল-ইসরাঈলিয়্যাত"-এ এই গল্পকে বাতিল ইসরাঈলি বর্ণনা বলেছেন, যা বিবেক ও শরীআত দুটোর বিপরীত। কুরআন বলছে, নূহ (আ.)-এর নিজের ছেলেও পাহাড়ে উঠে বাঁচতে পারেনি (সূরা হুদ ১১:৪৩), আর বাকি সব কাফিরকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৮২)। নবীজি (ﷺ) জানিয়েছেন, আদম (আ.)-এর পর থেকে মানুষের উচ্চতা ক্রমে কমে এসেছে (সহিহ বুখারী ৩৩২৬)।
ভুল প্রয়োগ

"পাথর বলবে, আমার পেছনে ইহুদি" হাদিস দিয়ে আজকের যেকোনো ইহুদি মানুষকে আক্রমণ করা বৈধ।

যা সঠিক: হাদিসটি সহিহ (সহিহ বুখারী ২৯২৬), কিন্তু এটি কিয়ামতের আগে ঈসা (আ.)-এর নেমে আসার পর দাজ্জালের অনুসারীদের সাথে এক নির্দিষ্ট যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী। ভবিষ্যদ্বাণী আর আজকের বিধান এক নয়। আজকের বিধান: ন্যায়বিচার (সূরা আল-মায়িদা ৫:৮), নিরাপত্তাপ্রাপ্তকে হত্যা হারাম (সহিহ বুখারী ৩১৬৬), আর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বৈধ শাসকের, ব্যক্তির নয়।
ভুল

আশুরার রোজা ইহুদিদের অনুকরণ, তাই মুসলিমদের রাখা উচিত নয়।

যা সঠিক: নবীজি (ﷺ) নিজে আশুরার রোজা রেখেছেন এবং রাখতে বলেছেন, কারণ "মূসার উপর আমাদের অধিকার বেশি" (সহিহ বুখারী ২০০৪)। পার্থক্য রাখতে শেষ জীবনে তিনি আগের দিন (৯ মুহাররম) মিলিয়ে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন (সহিহ মুসলিম ১১৩৪)।

আরও যাচাই: প্রচলিত ভুল ও সঠিক তথ্য।

মান যাচাই: এই পাতার সব বর্ণনা

এই পাতায় ২০টি হাদিস দলিল হিসেবে এসেছে: ১৮টি সহিহ, ২টি হাসান। নিচে প্রচলিত কিছু দুর্বল, জাল ও ইসরাঈলি বর্ণনাও রাখা হলো, যাতে পার্থক্য স্পষ্ট হয়।

বর্ণনাসূত্রমানকে বলেছেন
সূরা আল-ফাতিহার "মাগদূব" ও "দোয়াল্লীন"জামে তিরমিযী ২৯৫৪হাসানআলবানী
আশুরার রোজা: মূসা (আ.)-এর মুক্তির দিনসহিহ বুখারী ২০০৪সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
আহলে কিতাবের কথা: সত্যও বলো না, মিথ্যাও বলো নাসহিহ বুখারী ৪৪৮৫সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
"তোমরা আগের লোকদের পথ অনুসরণ করবে"সহিহ বুখারী ৭৩২০সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
"হিত্তাহ" বদলে "হিন্তাহ": আদেশের শব্দ ও কাজ দুটোই বদলানোসহিহ বুখারী ৪৪৭৯সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
হারাম চর্বি গলিয়ে বিক্রি: কৌশলে হারামকে হালাল করাসহিহ বুখারী ২২২৩সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
তাওরাতের আয়াত হাত দিয়ে ঢেকে রাখাসহিহ বুখারী ৩৬৩৫সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
আলেম ও দরবেশদের "রব" বানানো মানে কীজামে তিরমিযী ৩০৯৫হাসানআলবানী
খাইবারে বিষ মেশানো ছাগলসহিহ বুখারী ৩১৬৯সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
ইহুদি আলেম আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণসহিহ বুখারী ৩৯৩৮সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
মদিনার ইহুদি গোত্রদের সাথে কী হয়েছিল: সংক্ষেপেসহিহ বুখারী ৪০২৮সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
বনু কুরাইযা নিজেরাই সাদ ইবনু মুআয (রা.)-কে বিচারক মানলসহিহ বুখারী ৪১২১সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
ইহুদির জানাযা দেখে নবীজি (ﷺ) দাঁড়ালেন: "সে কি মানুষ নয়?"সহিহ বুখারী ১৩১২সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
অসুস্থ ইহুদি ছেলেকে দেখতে যাওয়াসহিহ বুখারী ১৩৫৬সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
নবীজির (ﷺ) বর্ম এক ইহুদির কাছে বন্ধকসহিহ বুখারী ২৯১৬সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
নবীদের কবরকে মসজিদ বানানো: মৃত্যুশয্যায় সতর্কবাণীসহিহ বুখারী ৪৩৫সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা: জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে নাসহিহ বুখারী ৩১৬৬সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
"বনী ইসরাঈল থেকে বর্ণনা করো, সমস্যা নেই"সহিহ বুখারী ৩৪৬১সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ও সালামের শুরুসহিহ বুখারী ৩৩২৬সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
কিয়ামতের আগের এক যুদ্ধ (শেষ যামানার ভবিষ্যদ্বাণী)সহিহ বুখারী ২৯২৬সহিহইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ)
ইহুদি বুড়ির ময়লা ফেলার গল্পকোনো হাদিস বা সীরাত গ্রন্থে নেইভিত্তিহীনসনদই পাওয়া যায় না
উজ ইবনু উনুকের দানবীয় উচ্চতাতাফসীরে তাবারী (সুদ্দী থেকে), আদ-দুররুল মানসূরইসরাঈলি জালইবনু কাসীর (৫:২২), আবু শাহবা
মদিনা সনদের পূর্ণ পাঠসীরাতু ইবনি হিশাম (ইবনু ইসহাক)সনদ ছাড়ামূল চুক্তি সহিহ; পূর্ণ পাঠের সনদ নেই (আকরাম যিয়া উমারী)
বনু কুরাইযার নিহতদের সংখ্যা (৬০০-৯০০)ইবনু ইসহাক ও অন্যান্য সীরাতনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রমাণিত নয়মূল ঘটনা সহিহ বুখারী ৪০২৮, ৪১২১-এ
"আলেম ও দরবেশদের রব বানানো"-র নববী ব্যাখ্যাজামে তিরমিযী ৩০৯৫হাসানআলবানী: হাসান; যুবাইর আলী যাঈ: দুর্বল

সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের হাদিস উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে সহিহ। বাকি গ্রন্থের মান শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানীর তাহকীক অনুযায়ী; অন্য মুহাদ্দিসের ভিন্নমত থাকলে হাদিসের পাতায় দেখানো আছে।

প্রশ্নোত্তর

১ইহুদি আর বনী ইসরাঈল কি একই?

প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়, তবে পার্থক্য আছে। বনী ইসরাঈল বংশের নাম: নবী ইয়াকুব (ইসরাঈল)-এর বংশধর। ইহুদি ধর্মের নাম; বনী ইসরাঈলের বাইরের কেউ এ ধর্ম গ্রহণ করলেও ইহুদি হয়।

২কুরআনে বনী ইসরাঈলের কথা এত বেশি কেন?

তারা আগের সবচেয়ে বড় কিতাবধারী উম্মত, যাদের কাছে সবচেয়ে বেশি নবী এসেছেন। তাদের ইতিহাস মুসলিম উম্মতের জন্য আয়না; নবীজি সতর্ক করেছেন, এই উম্মত তাদের পথ অনুসরণ করবে (সহিহ বুখারী ৭৩২০)।

৩মূসা (আ.) কি শুধু ইহুদিদের নবী?

তিনি বনী ইসরাঈলের কাছে পাঠানো রাসূল, কিন্তু সব নবীর প্রতি ঈমান আনা মুসলিমের ঈমানের অংশ (২:১৩৬)। নবীজি (ﷺ) বলেছেন, "মূসার উপর আমাদের অধিকার তোমাদের চেয়ে বেশি" (সহিহ বুখারী ২০০৪)।

৪বর্তমান তাওরাত কি আল্লাহর বাণী?

মূল তাওরাত আল্লাহর নাযিল করা কিতাব (৫:৪৪)। তবে কুরআন জানিয়েছে, তাতে বিকৃতি ও গোপন করা হয়েছে (২:৭৯, ৪:৪৬)। তাই আজকের গ্রন্থের কোনো কথা কুরআন-সুন্নাহর সাথে মিললে গ্রহণ, বিপরীত হলে প্রত্যাখ্যান, আর বাকিটায় নীরবতা (সহিহ বুখারী ৪৪৮৫)।

৫"মাগদূবি আলাইহিম" মানে কি শুধু ইহুদি?

নবীজির ব্যাখ্যায় এর প্রধান উদাহরণ ইহুদি (তিরমিযী ২৯৫৪, হাসান)। কারণ ছিল সত্য জেনেও না মানা। তাই যে মুসলিমও জেনেশুনে সত্য অমান্য করে, সে এই দোষের অংশীদার হয়; এজন্যই প্রতি রাকাতে আশ্রয় চাওয়া।

৬ইহুদি প্রতিবেশীর সাথে কেমন ব্যবহার করব?

যারা দ্বীনের কারণে যুদ্ধ করে না, তাদের সাথে সদাচার ও ন্যায় করা আল্লাহ নিষেধ করেননি (৬০:৮)। নবীজি ইহুদির জানাযায় দাঁড়িয়েছেন, অসুস্থ ইহুদিকে দেখতে গিয়েছেন, ইহুদির সাথে লেনদেন করেছেন (বুখারী ১৩১২, ১৩৫৬, ২৯১৬)।

৭আহলে কিতাবের খাবার ও বিয়ের বিধান কী?

কুরআন আহলে কিতাবের জবাই করা খাবার আর তাদের সচ্চরিত্রা নারীকে বিয়ে করা মুসলিম পুরুষের জন্য হালাল বলেছে (৫:৫)। তবে আলেমরা শর্ত দিয়েছেন: জবাই আসলে শরীআত মতো হতে হবে, আর বিয়েতে সন্তানের দ্বীন ও পরিবারের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে তা অপছন্দনীয়। মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম বিয়ে হারাম (৬০:১০)।

সূত্র

  1. আল-কুরআনুল কারীম
    আরবি: Tanzil; বাংলা অর্থ: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া (QuranEnc)
  2. সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম, জামে তিরমিযী
    আরবি মূল পাঠ; তিরমিযীর মান: আলবানী
  3. ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম
    সূরা আল-বাকারা ২:৪০-১২৩, আল-মায়িদা ৫:১২-২৬, আত-তাওবা ৯:৩০-৩১
  4. ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ও কাসাসুল আম্বিয়া
    বনী ইসরাঈলের নবীগণ; উজ ইবনু উনুকের গল্পের খণ্ডন
  5. ইবনু জারীর তাবারী, জামিউল বায়ান
    উযাইর (৯:৩০) ও "রব বানানো" (৯:৩১)-র ব্যাখ্যা
  6. সীরাতু ইবনি হিশাম; আকরাম যিয়া আল-উমারী, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা আস-সহীহা
    মদিনার ইহুদি গোত্র, চুক্তি ও তার সনদ-বিশ্লেষণ
  7. মুহাম্মাদ আবু শাহবা, আল-ইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল-মাওদূআত
    তাফসীরে ঢোকা ইসরাঈলি বর্ণনার যাচাই
  8. ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী
    বুখারী ২৯১৬, ৩৬৩৫, ৪৪৮৫-এর ব্যাখ্যা

সাইটের সব সূত্র: সূত্র তালিকা · সূত্র নীতি

আরও পড়ুন

deenpedia.com · https://deenpedia.com/ahle-kitab/ihudi/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার