إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ
খ্রিস্টান (নাসারা): কুরআন ও সহিহ হাদিসে
ঈসা (আ.)-কে মুসলিমরাও ভালোবাসে, খ্রিস্টানরাও। পার্থক্য হলো, তিনি কে ছিলেন। কুরআন তাঁকে বলেছে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল; খ্রিস্টান বিশ্বাস তাঁকে বানিয়েছে আল্লাহর পুত্র ও উপাস্য। এই পাতায় সেই পার্থক্যের দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণ, সম্মান ও ন্যায় বজায় রেখে।
এই পাতার প্রতিটি কথা কুরআনের আয়াত বা হাদিস থেকে, আর প্রতিটি হাদিসের মান দেওয়া আছে। দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা ভুল ধারণা ও মান যাচাই অংশে আলাদা করে চিহ্নিত। উদ্দেশ্য কোনো মানুষ বা জাতির প্রতি বিদ্বেষ নয়; কুরআন যে ভুলগুলো চিহ্নিত করেছে, তা বোঝা আর নিজেরা তা থেকে বাঁচা। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু, হাদিসের অনুবাদ Deenpedia-র নিজস্ব। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
- "নাসারা" নাম
- যারা বলেছিল "আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী (আনসার)"; কারও মতে ঈসা (আ.)-এর জন্মস্থান নাসিরা (নাজারেথ) থেকে (সূরা আল-মায়িদা ৫:১৪, সূরা আস-সাফ ৬১:১৪)
- "খ্রিস্টান" নাম
- গ্রিক "খ্রিস্টোস" থেকে, যার অর্থ "মাসীহ" (অভিষিক্ত); কুরআনেও ঈসা (আ.)-এর উপাধি আল-মাসীহ (সূরা আলে ইমরান ৩:৪৫)
- কিতাব
- ইঞ্জিল, ঈসা (আ.)-এর উপর; তাতে ছিল হিদায়াত ও নূর (সূরা আল-মায়িদা ৫:৪৬)
- ঈসা (আ.) কে
- আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, পিতা ছাড়া জন্ম, যেমন আদম (আ.) মা-বাবা ছাড়া (সূরা মারইয়াম ১৯:৩০, সূরা আলে ইমরান ৩:৫৯)
- ক্রুশ
- তাঁকে হত্যাও করা হয়নি, ক্রুশেও চড়ানো হয়নি; আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন (সূরা আন-নিসা ৪:১৫৭, সূরা আন-নিসা ৪:১৫৮)
- মূল ভুল
- নবীর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করে তাঁকে আল্লাহর আসনে বসানো (সূরা আন-নিসা ৪:১৭১, সহিহ বুখারী ৩৪৪৫)
- সম্পর্ক
- মুমিনদের প্রতি বন্ধুত্বে সবচেয়ে কাছের (সূরা আল-মায়িদা ৫:৮২); সূরা আল-ফাতিহার "দোয়াল্লীন" (পথভ্রষ্ট) (জামে আত-তিরমিযী ২৯৫৪)
কোন নবীরা খ্রিস্টানদের সাথে জড়িত
খ্রিস্টান ধর্মের কেন্দ্রে ঈসা (আ.)। তিনি বনী ইসরাঈলের শেষ নবী, আর তাঁর ও আমাদের নবীর মাঝে আর কোনো নবী আসেননি:
أَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِابْنِ مَرْيَمَ، وَالأَنْبِيَاءُ أَوْلاَدُ عَلاَّتٍ، لَيْسَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ نَبِيٌّ
মারইয়ামের পুত্রের (ঈসা) সবচেয়ে কাছের মানুষ আমি। নবীরা সবাই একই পিতার ভিন্ন মায়ের সন্তানের মতো (দ্বীন এক, শরীয়ত ভিন্ন)। আমার ও তাঁর মাঝে কোনো নবী নেই।
তাঁর আগের ও আশপাশের নবীরাও এই কাহিনির অংশ। নাম নীল হলে জীবনী পড়া যাবে।
| নবী | সম্পর্ক | কুরআন ও হাদিসে |
|---|---|---|
| ঈসা (আ.) | যাঁর অনুসারী বলে খ্রিস্টানদের দাবি; ইঞ্জিল পেয়েছেন | সূরা মারইয়াম ১৯:৩০, সূরা আল-মায়িদা ৫:৪৬, সূরা আস-সাফ ৬১:৬ |
| যাকারিয়া (আ.) | মারইয়ামের অভিভাবক; বৃদ্ধ বয়সে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ | সূরা আলে ইমরান ৩:৩৭, সূরা মারইয়াম ১৯:৭ |
| ইয়াহইয়া (আ.) | ঈসার আত্মীয়, তাঁর সত্যায়নকারী (খ্রিস্টানদের কাছে "যোহন ব্যাপ্টিস্ট") | সূরা আলে ইমরান ৩:৩৯, সূরা মারইয়াম ১৯:১২ |
| মূসা (আ.) | ঈসা (আ.) তাওরাতের সত্যায়নকারী হয়ে এসেছিলেন, নতুন ধর্ম নিয়ে নয় | সূরা আলে ইমরান ৩:৫০, সূরা আল-মায়িদা ৫:৪৬ |
| দাউদ (আ.) | ঈসা (আ.) তাঁর বংশধর; দাউদের জবানে কাফিরদের প্রতি লানত | সূরা আল-মায়িদা ৫:৭৮ |
| ইবরাহীম (আ.) | তিনি ইহুদিও নন, খ্রিস্টানও নন; একনিষ্ঠ মুসলিম | সূরা আলে ইমরান ৩:৬৭ |
পরিচয়: নাসারা ও খ্রিস্টান
কুরআনে খ্রিস্টানদের বলা হয়েছে "নাসারা"। এক আয়াতে আছে, "যারা বলে, আমরা নাসারা", আর তাদের থেকেও আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, কিন্তু তারা উপদেশের এক অংশ ভুলে গেছে:
وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَارَىٰ أَخَذْنَا مِيثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ ۚ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللَّهُ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ
আর যারা বলে, ‘আমরা নাসারা’, তাদেরও অঙ্গীকার আমরা গ্রহণ করেছিলাম; অতঃপর তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তার একাংশ তারা ভুলে গিয়েছে। ফলে আমরা তাদের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরুক রেখেছি। আর তারা যা করত আল্লাহ অচিরেই তাদেরকে তা জানিয়ে দেবেন।
নামের উৎস নিয়ে দুটি মত: ঈসা (আ.)-এর সাথীরা বলেছিলেন "নাহনু আনসারুল্লাহ", আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী (সূরা আস-সাফ ৬১:১৪, সূরা আলে ইমরান ৩:৫২); অথবা ঈসা (আ.)-এর শহর নাসিরা (নাজারেথ) থেকে (ইবনু কাসীর, ২:৬২-এর তাফসীর)। কুরআন ঈসা (আ.)-এর সাথীদের বলেছে "হাওয়ারী", আর তাঁরা ছিলেন মুসলিম (সূরা আল-মায়িদা ৫:১১১)।
ইতিহাসে খ্রিস্টানরা বহু দলে ভাগ হয়েছে, যার কথা কুরআনও বলেছে (সূরা মারইয়াম ১৯:৩৭)। আজকের প্রধান তিন ধারা (ক্যাথলিক, অর্থোডক্স, প্রোটেস্ট্যান্ট) ত্রিত্ববাদে মোটামুটি একমত; আবার ইতিহাসে এমন দলও ছিল (যেমন আরিয়ুসের অনুসারীরা), যারা ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর সমান মানত না। তাই "সব খ্রিস্টান একই কথা বলে" ধরে নেওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট বিশ্বাস ধরে আলোচনা করাই ন্যায়।
কুরআনে ঈসা (আ.) ও মারইয়াম
কুরআনে ঈসা (আ.)-এর কথা যত সম্মানের সাথে এসেছে, তা অনেক খ্রিস্টানকে অবাক করে। তাঁর মা মারইয়ামের নামে কুরআনের একটি পূর্ণ সূরা, আর তাঁকে বলা হয়েছে বিশ্বের নারীদের উপর মনোনীত:
وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَىٰ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ
আর স্মরণ করুন, যখন ফেরেশতাগণ বলেছিল, ‘হে মার্ইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ্ আপনাকে মনোনীত করেছেন এবং পবিত্র করেছেন আর বিশ্বজগতের নারীগণের উপর আপনাকে মনোনীত করেছেন’
পিতা ছাড়া তাঁর জন্মে কুরআন বিশ্বাস করে; কিন্তু তা তাঁকে উপাস্য বানায় না। আদম (আ.)-এর তো মা-বাবা কেউই ছিল না:
إِنَّ مَثَلَ عِيسَىٰ عِندَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ ۖ خَلَقَهُ مِن تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُن فَيَكُونُ
নিশ্চয় আল্লাহ্র নিকট ‘ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্তসদৃশ। তিনি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছিলেন; তারপর তাকে বলেছিলেন, ‘হও’, ফলে তিনি হয়ে যান।
জন্মের পরই দোলনা থেকে তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন, আর তাঁর প্রথম কথাই ছিল "আমি আল্লাহর বান্দা":
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا
তিনি বললেন, ‘আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নবী করেছেন,
وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
‘যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে-
তাঁর মুজিযা: মাটির পাখিতে ফুঁ দিলে তা জীবন্ত পাখি হওয়া, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগী সুস্থ করা, মৃতকে জীবিত করা। কিন্তু প্রতিটির সাথে কুরআন একটি শব্দ জুড়ে দিয়েছে: "আল্লাহর অনুমতিতে" (সূরা আলে ইমরান ৩:৪৯, সূরা আল-মায়িদা ৫:১১০)। মুজিযা নবুয়তের প্রমাণ, উপাস্য হওয়ার নয়; মূসা (আ.)-এর লাঠিও সাপ হয়েছিল।
বিস্তারিত জীবনী: ঈসা (আ.)।
ইঞ্জিল ও আজকের বাইবেল
আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে ইঞ্জিল দিয়েছিলেন, তাওরাতের সত্যায়নকারী হিসেবে:
وَقَفَّيْنَا عَلَىٰ آثَارِهِم بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ ۖ وَآتَيْنَاهُ الْإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ
আর আমরা তাদের পশ্চাতে মারইয়াম-পুত্র ‘ঈসাকে পাঠিয়েছিলাম, তার সামনে তাওরাত থেকে যা বিদ্যমান রয়েছে তার সত্যতা প্রতিপন্নকারীরূপে। আর আমরা তাকে ইঞ্জীল দিয়েছিলাম, এতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো; আর তা ছিল তার সামনে অবশিষ্ট তাওরাতের সত্যতা প্রতিপন্নকারী এবং মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত ও উপদেশস্বরূপ।
ঈসা (আ.) নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে আসেননি; তিনি বলেছিলেন, "আল্লাহ আমার রব ও তোমাদের রব, তাই তাঁর ইবাদত করো, এটাই সরল পথ" (সূরা আলে ইমরান ৩:৫১)। আর তিনি পরের এক রাসূলের সুসংবাদ দিয়েছিলেন:
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُم مُّصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ ۖ فَلَمَّا جَاءَهُم بِالْبَيِّنَاتِ قَالُوا هَـٰذَا سِحْرٌ مُّبِينٌ
আর স্মরণ করুন, যখন মারইয়াম—পুত্র ‘ঈসা বলেছিলেন, ‘হে বনী ইসরাঈল! নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে তাওরাত রয়েছে আমি তার সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসবেন আমি তার সুসংবাদদাতা। পরে তিনি যখন সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তাদের কাছে আসলেন তখন তারা বলতে লাগল, এটা তো স্পষ্ট জাদু।’
আজ যে "বাইবেলের নতুন নিয়ম" আছে, তা ঈসা (আ.)-এর উপর নাযিল হওয়া ইঞ্জিল নয়। এর চারটি "সুসমাচার" (মথি, মার্ক, লূক, যোহন) তাঁর পরে বিভিন্ন লেখকের লেখা জীবনীমূলক বিবরণ, আর বাকি অংশের বড় অংশ পৌলের চিঠি; খ্রিস্টান গবেষকরাও এটা স্বীকার করেন। তাই এতে ঈসা (আ.)-এর কিছু সত্য কথা থাকতে পারে, আবার মানুষের সংযোজনও আছে। মুসলিমের নীতি সেটাই, যা নবীজি (ﷺ) শিখিয়েছেন: কুরআন-সুন্নাহর সাথে মিললে গ্রহণ, বিপরীত হলে প্রত্যাখ্যান, বাকিটায় নীরবতা (সহিহ বুখারী ৪৪৮৫)।
আকিদার মূল ভুল: কুরআন-হাদিসের বিশ্লেষণ
নবীজি (ﷺ) খ্রিস্টানদের মূল সমস্যাটি এক বাক্যে চিহ্নিত করেছেন, আর তা থেকে নিজের উম্মতকেও সতর্ক করেছেন:
لاَ تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ
নাসারারা যেভাবে মারইয়ামের ছেলে (ঈসা)-এর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা আমার প্রশংসায় সেভাবে বাড়াবাড়ি কোরো না। আমি তো শুধু তাঁর (আল্লাহর) বান্দা; তাই বলো: আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।
কুরআনও আহলে কিতাবকে একই কথা বলেছে: "তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কোরো না, আর আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া কিছু বোলো না" (সূরা আন-নিসা ৪:১৭১, সূরা আল-মায়িদা ৫:৭৭)। নিচের প্রতিটি ভুল এই বাড়াবাড়িরই শাখা।
১. ত্রিত্ববাদ (ট্রিনিটি): "তিন"
খ্রিস্টান আকিদায় আল্লাহ এক, কিন্তু তিন "সত্তা": পিতা, পুত্র (ঈসা) ও পবিত্র আত্মা। কুরআন দুই জায়গায় সরাসরি এর জবাব দিয়েছে:
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ ۚ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَىٰ مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِّنْهُ ۖ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ۖ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ ۚ انتَهُوا خَيْرًا لَّكُمْ ۚ إِنَّمَا اللَّهُ إِلَـٰهٌ وَاحِدٌ ۖ سُبْحَانَهُ أَن يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ ۘ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ وَكِيلًا
হে কিতাবীরা! স্বীয় দীনের মধ্যে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ব্যতীত কিছু বলো না। মারইয়াম-তনয় ঈসা মসীহ কেবল আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন ও তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। কাজেই তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের উপর ঈমান আন এবং বলো না, ‘তিন !’ নিবৃত্ত হও, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহই তো এক ইলাহ; তাঁর সন্তান হবে... তিনি এটা থেকে পবিত্র-মহান। আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই; আর কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট।
لَّقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَاثَةٍ ۘ وَمَا مِنْ إِلَـٰهٍ إِلَّا إِلَـٰهٌ وَاحِدٌ ۚ وَإِن لَّمْ يَنتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
তারা অবশ্যই কুফরী করেছে –যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে তৃতীয়, অথচ এক ইলাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর তারা যা বলে তা থেকে বিরত না হলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, তাদের উপর অবশ্যই কষ্টদায়ক শাস্তি আপতিত হবে।
বিশ্লেষণ: "এক" আর "তিন" একই অর্থে একসাথে সত্য হতে পারে না; তাই খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব নিজেও একে "রহস্য" বলে, যা বোঝা যায় না। অথচ ঈসা (আ.)-এর নিজের মুখে সবচেয়ে বড় আদেশ ছিল, "হে ইসরাঈল, শোনো, আমাদের প্রভু ঈশ্বর এক প্রভু" (বাইবেল, মার্ক ১২:২৯)। ত্রিত্ববাদের আনুষ্ঠানিক রূপ এসেছে ঈসা (আ.)-এর প্রায় তিনশো বছর পর, ৩২৫ খ্রিস্টাব্দের নাইসিয়া ও ৩৮১ খ্রিস্টাব্দের কনস্টান্টিনোপল সম্মেলনে। কুরআনের সূরা আল-ইখলাস চার বাক্যে পুরো বিষয়টির মীমাংসা করে (সূরা আল-ইখলাস ১১২:১, সূরা আল-ইখলাস ১১২:৩)।
২. ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ বলা
কুরআন স্পষ্ট বলেছে, যারা বলে "মাসীহই আল্লাহ", তারা কুফরি করেছে; আর ঈসা (আ.) নিজে তাদের বলেছিলেন, আমার ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত করো:
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ ۖ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ ۖ إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ ۖ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ
যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহ্ তিনি তো মার্ইয়াম-তনয় মসীহ’, অবশ্যই তারা কুফরী করেছে। অথচ মসীহ বলেছিলেন, ‘হে ইসরাঈল-সন্তানগণ! তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত কর।’ নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।
কুরআনের যুক্তিটি খুব সহজ: "তাঁরা দুজনই (ঈসা ও তাঁর মা) খাবার খেতেন" (সূরা আল-মায়িদা ৫:৭৫)। যে খাবারের মুখাপেক্ষী, ক্ষুধা ও ক্লান্তি যাকে স্পর্শ করে, সে স্রষ্টা হতে পারে না। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি মানুষকে বলেছিলে আমাকে আর আমার মাকে ইলাহ বানাও? আর তিনি নিজেকে এ কথা থেকে মুক্ত ঘোষণা করবেন:
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَـٰهَيْنِ مِن دُونِ اللَّهِ ۖ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّ ۚ إِن كُنتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ ۚ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ ۚ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ
আরও স্মরণ করুন, আল্লাহ্ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়াম –তনয় ‘ঈসা! আপনি কি লোকদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া আমাকে আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ কর? ‘তিনি বলবেন, ‘আপনিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে আপনি তো তা জানতেন। আমার অন্তরের কথাতো আপনি জানেন, কিন্তু আপনার অন্তরের কথা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি অদৃশ্য সম্বদ্ধে সবচেয়ে ভালো জানেন।’
مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ ۚ وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَّا دُمْتُ فِيهِمْ ۖ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ ۚ وَأَنتَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ
‘আপনি আমাকে যে আদেশ করেছেন তা ছাড়া তাদেরকে আমি কিছুই বলিনি, তা এই যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহ্র ইবাদত কর এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কাজ-কর্মের সাক্ষী, কিন্তু যখন আপনি আমাকে তুলে নিলেন তখন আপনিই তো ছিলেন তাদের কাজ-কর্মের তত্ত্বাবধায়ক এবং আপনিই সব বিষয়ে সাক্ষী।’
৩. "আল্লাহর পুত্র"
আল্লাহর সন্তান থাকা তাঁর মর্যাদার পরিপন্থী; সন্তান লাগে তার, যে মরণশীল, যার উত্তরসূরি দরকার, বা যার সঙ্গী আছে। কুরআন বলেছে, এ কথা এত গুরুতর যে আকাশ ফেটে পড়ার উপক্রম হয়:
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَـٰنُ وَلَدًا
আর তারা বলে, ‘দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন’।
لَّقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِدًّا
তোমরা তো এমন এক বীভৎস বিষয়ের অবতারণা করছ;
تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا
যাতে আসমানসমূহ বিদীর্ণ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, আর যমীন খণ্ড-বিখণ্ড এবং পর্বতমণ্ডলী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে,
أَن دَعَوْا لِلرَّحْمَـٰنِ وَلَدًا
এ জন্য যে, তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরপ করে।
وَمَا يَنبَغِي لِلرَّحْمَـٰنِ أَن يَتَّخِذَ وَلَدًا
অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্য শোভন নয়!
বাইবেলে "ঈশ্বরের পুত্র" শব্দটি অনেকের জন্য এসেছে: আদম (লূক ৩:৩৮), ইসরাঈল জাতি (যাত্রা ৪:২২), শান্তি স্থাপনকারীরা (মথি ৫:৯)। মানে মূলত "আল্লাহর প্রিয় বান্দা"; পরে ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে একে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া হয়েছে। কুরআন দেখিয়েছে, এটা আগের কাফিরদের কথারই অনুকরণ (সূরা আত-তাওবা ৯:৩০)।
৪. ক্রুশ, আদি পাপ ও প্রায়শ্চিত্ত
খ্রিস্টান আকিদায় আদম (আ.)-এর পাপ সব মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবে এসেছে ("আদি পাপ"), আর ঈসা (আ.) ক্রুশে মরে সেই পাপের দাম দিয়েছেন। কুরআন এর প্রতিটি ধাপের জবাব দিয়েছে:
- আদম (আ.)-এর পাপ ক্ষমা হয়ে গেছে। তিনি তাওবা করেছেন, আল্লাহ কবুল করেছেন (সূরা আল-বাকারা ২:৩৭, সূরা ত্বা-হা ২০:১২২)। তাই উত্তরাধিকারে পাওয়ার মতো কোনো পাপ অবশিষ্ট নেই।
- প্রত্যেক শিশু নিষ্পাপ ফিতরাতে জন্মায় (সহিহ বুখারী ১৩৮৫)।
- একজনের বোঝা আরেকজন বহন করবে না (সূরা আল-আনআম ৬:১৬৪, সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৮)। আল্লাহ ক্ষমা করতে চাইলে নিরপরাধ কাউকে শাস্তি দেওয়ার দরকার নেই; তিনি তাওবাকারীকে সরাসরি ক্ষমা করেন (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)।
- ঈসা (আ.)-কে ক্রুশে চড়ানোই হয়নি। তাঁর মতো একজনকে তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল, আর আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন:
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَـٰكِن شُبِّهَ لَهُمْ ۚ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ ۚ مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ ۚ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا
আর ‘আমরা আল্লাহর রাসূল মারঈয়াম তনয় ‘ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি’ তাদের এ উক্তির জন্য। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি; বরং তাদের জন্য (এক লোককে) তার সদৃশ করা হয়েছিল। আর নিশ্চয় যারা তার সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, তারা অবশ্যই এ সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ছাড়া তাদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। আর এটা নিশ্চিত যে, তারা তাঁকে হত্যা করেনি,
بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
যিনি ক্রুশে চড়ানো হয়েছিলেন তিনি কে, তা নিয়ে তাফসীরে কয়েকটি বর্ণনা আছে (একজন সাহাবী নিজে রাজি হয়েছিলেন, বা বিশ্বাসঘাতক নিজেই); ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে প্রথম মতটির সনদ ইবনু কাসীর সহিহ বলেছেন (৪:১৫৭-এর তাফসীর)। কিন্তু সেই মানুষটির পরিচয় আকিদার অংশ নয়; আকিদা হলো, ঈসা (আ.)-কে হত্যা করা হয়নি।
৫. আলেম ও পাদ্রিদের রব বানানো
আল্লাহ বলেছেন, তারা তাদের আলেম ও দরবেশদের রব বানিয়েছে, আর মারইয়ামের ছেলে মাসীহকেও (সূরা আত-তাওবা ৯:৩১)। আদী ইবনু হাতিম (রা.) ছিলেন খ্রিস্টান; গলায় ক্রুশ নিয়ে এসেছিলেন। নবীজি (ﷺ) তাঁকে ব্যাখ্যা দিলেন, পাদ্রিরা হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল বললে তা মেনে নেওয়াই "রব বানানো":
আমি গলায় সোনার একটি ক্রুশ ঝুলিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এলাম। তিনি বললেন: "হে আদী, এই মূর্তিটা ফেলে দাও।" আর আমি তাঁকে সূরা বারাআর এই আয়াত পড়তে শুনলাম: "তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের আলেম ও দরবেশদের রব বানিয়ে নিয়েছে।" তিনি বললেন: "তারা অবশ্য তাদের ইবাদত করত না; কিন্তু তারা যখন কোনো কিছু হালাল বলত, এরা তা হালাল মেনে নিত, আর যখন কোনো কিছু হারাম বলত, এরা তা হারাম মেনে নিত।"
৬. বৈরাগ্য, ছবি ও কবর-ভক্তি
বিয়ে না করা, দুনিয়া ছেড়ে মঠে থাকা (রাহবানিয়্যাত) আল্লাহ তাদের উপর ফরজ করেননি; তারা নিজেরাই তা উদ্ভাবন করেছিল, তারপর ঠিকমতো পালনও করেনি (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৭)। আর নেককারদের কবরে ইবাদতখানা বানানো ও তাতে ছবি রাখার ব্যাপারে নবীজি কঠোর সতর্ক করেছেন:
উম্মু হাবীবা ও উম্মু সালামা (রা.) হাবশায় (আবিসিনিয়ায়) দেখা একটি গির্জার কথা বললেন, যাতে অনেক ছবি ছিল। তাঁরা নবী (ﷺ)-কে তা জানালে তিনি বললেন: ওই লোকদের মধ্যে কোনো নেককার মানুষ মারা গেলে তারা তার কবরের উপর ইবাদতখানা বানাত আর সেখানে এসব ছবি আঁকত। কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তারাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি।
ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদ ও শেষ নবী
কুরআন জানিয়েছে, তাওরাত ও ইঞ্জিলে শেষ নবীর বর্ণনা ছিল (সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৭), আর সব নবীর কাছ থেকে আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, পরের রাসূল এলে তাঁর উপর ঈমান আনবে (সূরা আলে ইমরান ৩:৮১)। তাই ঈসা (আ.)-কে সত্যিকার মানা মানেই তাঁর সুসংবাদ দেওয়া রাসূলকে মানা।
নবীজির (ﷺ) কথা শোনার পরও যে ইহুদি বা খ্রিস্টান তাঁর উপর ঈমান আনে না, তার পরিণতি সম্পর্কে সহিহ হাদিস:
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلاَ نَصْرَانِيٌّ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ إِلاَّ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ
যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, তাঁর কসম! এই উম্মতের (আমার যুগ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সব মানুষের) কোনো ইহুদি বা নাসারা আমার কথা শোনার পর, আমাকে যা দিয়ে পাঠানো হয়েছে তাতে ঈমান না এনে মারা গেলে, সে অবশ্যই জাহান্নামীদের একজন হবে।
আবার যে আহলে কিতাব নিজের নবীর উপর ঈমান রাখার পর মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপরও ঈমান আনে, তার জন্য দ্বিগুণ প্রতিদান (সহিহ বুখারী ৯৭)। প্রথম ওহির পর খাদিজা (রা.) নবীজিকে যাঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ওয়ারাকা ইবনু নাওফাল ছিলেন একজন খ্রিস্টান আলেম, যিনি ইঞ্জিল পড়তেন; তিনিই প্রথম বলেছিলেন, এটা সেই নামূস (জিবরীল), যিনি মূসার কাছে আসতেন (সহিহ বুখারী ৩)।
মুসলিমের সঠিক সাক্ষ্য কী, তাও নবীজি শিখিয়ে দিয়েছেন: ঈসা (আ.) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, তাঁর কালিমা ও তাঁর পক্ষ থেকে রূহ:
যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই; মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল; আর ঈসা আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, তাঁর "কালিমা" (কুন: "হও" শব্দে সৃষ্ট), যা তিনি মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন, আর তাঁর পক্ষ থেকে এক রূহ; আর জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য: আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, তার আমল যেমনই হোক।
ঈসা (আ.) আবার আসবেন
ঈসা (আ.) মারা যাননি; কিয়ামতের আগে তিনি আবার নেমে আসবেন। কুরআন বলেছে, আহলে কিতাবের প্রত্যেকে তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর উপর ঈমান আনবে (সূরা আন-নিসা ৪:১৫৯), আর তিনি কিয়ামতের এক নিদর্শন (সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৬১)। সহিহ হাদিস:
যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! শিগগিরই মারইয়ামের পুত্র (ঈসা) তোমাদের মাঝে ন্যায়বিচারক শাসক হয়ে নেমে আসবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিযিয়া তুলে দেবেন। সম্পদ এত বেশি হবে যে কেউ তা নিতে চাইবে না। তখন একটি সিজদা দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে উত্তম হবে।
"ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন" মানে, তিনি নিজেই ঘোষণা করবেন যে ক্রুশ-কেন্দ্রিক বিশ্বাস তাঁর শিক্ষা নয়। আর তিনি নতুন শরীআত নিয়ে আসবেন না; মুসলিমদের ইমামের পেছনে থাকবেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর শরীআতে চলবেন (সহিহ বুখারী ৩৪৪৯)।
মিরাজের রাতে নবীজি (ﷺ) দ্বিতীয় আসমানে ঈসা ও ইয়াহইয়া (আ.)-এর সাথে দেখা করেছিলেন; তাঁরা বলেছিলেন, "স্বাগতম, ভাই ও নবী" (সহিহ বুখারী ৩২০৭, সহিহ মুসলিম ১৬২)।
সম্পর্ক ও দাওয়াতের নববী পদ্ধতি
কুরআন খ্রিস্টানদের সম্পর্কে একটি বিশেষ কথা বলেছে: তাদের মধ্যে বিনয়ী আলেম ও দরবেশ আছে, যারা অহংকার করে না, আর সত্য শুনলে তাদের চোখে পানি আসে:
لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِّلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا ۖ وَلَتَجِدَنَّ أَقْرَبَهُم مَّوَدَّةً لِّلَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَارَىٰ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسِّيسِينَ وَرُهْبَانًا وَأَنَّهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ
অবশ্যই মুমিনদের মধ্যে শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইয়াহুদী ও মুশরিকদেরকেই আপনি সবচেয়ে উগ্র দেখবেন। আর যারা বলে, ‘আমরা নাসারা’ মানুষের মধ্যে তাদেরকেই আপনি মুমিনদের কাছাকাছি বন্ধুত্বে দেখবেন, তা এই কারণে যে, তাদের মধ্যে অনেক পণ্ডিত ও সংসারবিরাগী রয়েছে। আর এজন্যেও যে, তারা অহংকার করে না।
وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَىٰ أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ ۖ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
আর রাসূলের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা যখন তারা শুনে, তখন তারা যে সত্য উপলব্ধি করে তার জন্য আপনি তাদের চোখ অশ্রু বিগলিত দেখবেন। তারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি; কাজেই আপনি আমাদেরকে সাক্ষ্যবহদের তালিকাভুক্ত করুন।’
এর জীবন্ত উদাহরণ হাবশার (আবিসিনিয়ার) খ্রিস্টান বাদশাহ নাজাশী, যিনি নির্যাতিত মুসলিমদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে নবীজি (ﷺ) তাঁকে "তোমাদের ভাই" বলে গায়েবানা জানাযা পড়িয়েছেন:
হাবশার বাদশাহ নাজাশী যেদিন মারা গেলেন, সেদিনই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের তাঁর মৃত্যুর খবর দিলেন এবং বললেন: তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। … নবীজি ঈদগাহে সাহাবীদের কাতারবন্দি করে তাঁর (গায়েবানা জানাযায়) চার তাকবীর দিলেন।
নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল মদিনায় এসে ঈসা (আ.) নিয়ে বিতর্ক করেছিল; তখন সূরা আলে ইমরানের ৩:৫৯-৬১ নাযিল হয়, আর শেষে মুবাহালার আহ্বান আসে (সূরা আলে ইমরান ৩:৬১)। তারা মুবাহালা না করে চুক্তি করে ফিরে যায়:
নাজরানের দুই নেতা আকিব ও সাইয়্যিদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এল মুবাহালা (দুই পক্ষ মিলে মিথ্যাবাদীর উপর আল্লাহর লানত চাওয়া) করতে। একজন অন্যজনকে বলল: এটা কোরো না; আল্লাহর কসম, তিনি যদি সত্যিই নবী হন আর আমরা মুবাহালা করি, তাহলে আমরা ও আমাদের পরের বংশধর কেউ সফল হব না। তারা বলল: আপনি যা চান তা আমরা দেব; আমাদের সাথে একজন বিশ্বস্ত লোক পাঠান। নবীজি বললেন: আমি অবশ্যই তোমাদের সাথে সত্যিকারের বিশ্বস্ত একজনকে পাঠাব। সাহাবীরা আশা নিয়ে তাকালেন। তিনি বললেন: ওঠো, হে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ। তিনি দাঁড়ালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: ইনি এই উম্মতের আমীন (বিশ্বস্ত ব্যক্তি)।
খ্রিস্টানদের প্রতি দাওয়াতের সবচেয়ে সুন্দর নমুনা রোমের সম্রাটকে লেখা নবীজির চিঠি: ছোট, সম্মানজনক, আর মূল কথা শুধু তাওহীদ:
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রোমের প্রধান হিরাক্লিয়াসের প্রতি। যে হিদায়াত অনুসরণ করে, তার উপর শান্তি। তারপর: আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদ থাকবেন; আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে আপনার প্রজাদের (গুনাহের) দায়ও আপনার উপর। আর "হে আহলে কিতাব, এসো এমন এক কথার দিকে যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই: আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কিছু শরিক করব না, আর আমরা কেউ আল্লাহকে ছেড়ে একে অপরকে রব বানাব না। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে বলো: তোমরা সাক্ষী থাকো, আমরা মুসলিম।"
নীতি হলো: সুন্দরতম পদ্ধতিতে আলোচনা (সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৪৬), দ্বীনে জবরদস্তি নেই (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৬), আর শত্রুতা না করা প্রতিবেশীর সাথে সদাচার ও ন্যায় (সূরা আল-মুমতাহিনা ৬০:৮)। সাথে স্পষ্টতা: আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম (সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫)।
খ্রিস্টান ও ঈসা (আ.) নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
খ্রিস্টান আকিদার ভুল উপরে দেখা হয়েছে। এখানে মুসলিম সমাজে চালু কিছু ভুল কথা, দলিলসহ:
ঈসা (আ.) স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন, কাশ্মীরে তাঁর কবর আছে, আর "প্রতিশ্রুত মাসীহ" অন্য কেউ (কাদিয়ানি মত)।
ঈসা (আ.) চতুর্থ আসমানে আছেন।
"বার্নাবাসের সুসমাচার" (Gospel of Barnabas) আসল ইঞ্জিল, যাতে নবীজির নাম স্পষ্ট লেখা আছে।
আজকের বাইবেলে নবীজির নাম "মুহাম্মাদ" বা "আহমাদ" স্পষ্ট লেখা আছে।
খ্রিস্টানরাও আহলে কিতাব, তাই নবীজিকে না মানলেও ভালো মানুষ হলে তারা এমনিতেই নাজাত পাবে।
খ্রিস্টানরা মুশরিক, তাই তাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ, লেনদেন, তাদের জবাই করা খাবার বা বিয়ে কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নয়।
বড়দিন বা ইস্টারের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শুধুই সামাজিক সৌজন্য।
নবীজি (ﷺ)-কে এত বড় করে দেখানো যায় যে তাঁকে আলিমুল গায়েব (সব গায়েব জানেন) বা সর্বত্র হাজির-নাজির মনে করা ভালোবাসার প্রমাণ।
আরও যাচাই: প্রচলিত ভুল ও সঠিক তথ্য।
মান যাচাই: এই পাতার সব বর্ণনা
এই পাতায় ১৭টি হাদিস দলিল হিসেবে এসেছে: ১৫টি সহিহ, ২টি হাসান। নিচে প্রচলিত কিছু দুর্বল, জাল ও ইসরাঈলি বর্ণনাও রাখা হলো, যাতে পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
| বর্ণনা | সূত্র | মান | কে বলেছেন |
|---|---|---|---|
| "নাসারারা যেভাবে ইবনু মারইয়ামের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে" | সহিহ বুখারী ৩৪৪৫ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| সূরা আল-ফাতিহার "মাগদূব" ও "দোয়াল্লীন" | জামে তিরমিযী ২৯৫৪ | হাসান | আলবানী |
| আহলে কিতাবের কথা: সত্যও বলো না, মিথ্যাও বলো না | সহিহ বুখারী ৪৪৮৫ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের উপর জন্মায় | সহিহ বুখারী ১৩৮৫ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| আলেম ও দরবেশদের "রব" বানানো মানে কী | জামে তিরমিযী ৩০৯৫ | হাসান | আলবানী |
| হাবশার গির্জার ছবি ও কবরের উপর ইবাদতখানা | সহিহ বুখারী ৪২৭ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| নবীজির (ﷺ) কথা শোনার পর ইহুদি-নাসারার দায় | সহিহ মুসলিম ১৫৩ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| আহলে কিতাবের যে ব্যক্তি দ্বিগুণ সওয়াব পাবে | সহিহ বুখারী ৯৭ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| প্রথম ওহি: "পড়ো, তোমার রবের নামে" | সহিহ বুখারী ৩ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| ঈসা (আ.) সম্পর্কে সঠিক সাক্ষ্য: জান্নাতের পথ | সহিহ বুখারী ৩৪৩৫ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| ঈসা (আ.) আবার নেমে আসবেন | সহিহ বুখারী ৩৪৪৮ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| "যখন ইবনু মারইয়াম তোমাদের মধ্যে নামবেন আর তোমাদের ইমাম তোমাদেরই একজন" | সহিহ বুখারী ৩৪৪৯ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| বাইতুল মা‘মূর: প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা | সহিহ বুখারী ৩২০৭ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| মিরাজের রাতে তৃতীয় আসমানে ইউসুফ (আ.) | সহিহ মুসলিম ১৬২ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| নাজাশীর মৃত্যু: "তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা চাও" | সহিহ বুখারী ১৩২৭ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল ও মুবাহালা | সহিহ বুখারী ৪৩৮০ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে নবীজির (ﷺ) চিঠি | সহিহ বুখারী ৭ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| বার্নাবাসের সুসমাচার | ষোড়শ শতাব্দীর ইতালীয় ও স্প্যানিশ পাণ্ডুলিপি | পরবর্তী যুগের রচনা | ঐতিহাসিক ও বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ |
| ঈসা (আ.) চতুর্থ আসমানে | কিছু ওয়াজ ও বই | সহিহ হাদিসের বিপরীত | বুখারী ৩২০৭, মুসলিম ১৬২: দ্বিতীয় আসমান |
| ক্রুশে চড়ানো ব্যক্তি একজন স্বেচ্ছাসেবী সাহাবী | তাফসীরে ইবনু কাসীর (৪:১৫৭), ইবনু আব্বাস থেকে | সনদ সহিহ (মাওকূফ) | ইবনু কাসীর; নবীজি থেকে নয়, আকিদার অংশ নয় |
| "আলেম ও দরবেশদের রব বানানো"-র নববী ব্যাখ্যা | জামে তিরমিযী ৩০৯৫ | হাসান | আলবানী: হাসান; যুবাইর আলী যাঈ: দুর্বল |
সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের হাদিস উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে সহিহ। বাকি গ্রন্থের মান শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানীর তাহকীক অনুযায়ী; অন্য মুহাদ্দিসের ভিন্নমত থাকলে হাদিসের পাতায় দেখানো আছে।
প্রশ্নোত্তর
১মুসলিমরা কি ঈসা (আ.)-কে বিশ্বাস করে?
হ্যাঁ। ঈসা (আ.)-কে নবী ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস না করলে কেউ মুসলিমই থাকে না (২:১৩৬, ৪:১৫০-১৫১)। আমরা তাঁর অলৌকিক জন্ম, মুজিযা, আসমানে তুলে নেওয়া আর ফিরে আসায় বিশ্বাস করি; শুধু তাঁকে আল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র মানি না।
২কুরআন ও খ্রিস্টান বিশ্বাসে ঈসা (আ.) নিয়ে মূল পার্থক্য কী?
তিনটি: (১) তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, আল্লাহ বা পুত্র নন (১৯:৩০, ৫:৭২); (২) তাঁকে ক্রুশে হত্যা করা হয়নি (৪:১৫৭); (৩) মুক্তি আসে তাওবা ও আমলে, অন্যের রক্তে নয় (৬:১৬৪)।
৩ঈসা (আ.) কি মারা গেছেন?
না। আল্লাহ তাঁকে জীবিত অবস্থায় নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন (৪:১৫৮), আর কিয়ামতের আগে তিনি নেমে আসবেন (সহিহ বুখারী ৩৪৪৮)। ৩:৫৫-এর "মুতাওয়াফফীকা" শব্দের অর্থ অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে "তোমাকে পুরোপুরি নিয়ে নেব" বা ঘুম; মৃত্যু নয়।
৪আজকের বাইবেল কি ইঞ্জিল?
না। ইঞ্জিল ঈসা (আ.)-এর উপর নাযিল হওয়া কিতাব (৫:৪৬)। আজকের "নতুন নিয়ম" তাঁর পরের লেখকদের লেখা সুসমাচার ও চিঠির সংকলন। এতে সত্যের অংশ থাকতে পারে, তবে যাচাইয়ের মাপকাঠি কুরআন (৫:৪৮)।
৫"দোয়াল্লীন" মানে কি শুধু খ্রিস্টান?
নবীজির ব্যাখ্যায় এর প্রধান উদাহরণ নাসারা (তিরমিযী ২৯৫৪, হাসান), কারণ তারা জ্ঞান ছাড়া ইবাদতে বাড়াবাড়ি করেছে। যে মুসলিম দলিল ছাড়া দ্বীনে নতুন আমল বানায়, সেও এই দোষের অংশীদার হয়।
৬খ্রিস্টানদের সাথে কীভাবে কথা বলব?
নবীজির পদ্ধতিতে: সম্মান দিয়ে, সংক্ষেপে, তাওহীদকে কেন্দ্রে রেখে (সহিহ বুখারী ৭; ৩:৬৪)। সুন্দরতম পদ্ধতিতে আলোচনা (২৯:৪৬), কোনো জবরদস্তি নয় (২:২৫৬)। ঈসা (আ.)-এর প্রতি আমাদের ভালোবাসাই আলোচনার সবচেয়ে ভালো শুরু।
সূত্র
- আল-কুরআনুল কারীম
আরবি: Tanzil; বাংলা অর্থ: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া (QuranEnc) - সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম, জামে তিরমিযী
আরবি মূল পাঠ; তিরমিযীর মান: আলবানী - ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম
আলে ইমরান ৩:৪৫-৬৪, আন-নিসা ৪:১৫৬-১৭১, আল-মায়িদা ৫:৭২-৮৩, ১১০-১১৮, মারইয়াম ১৯:১৬-৪০ - ইবনু তাইমিয়া, আল-জাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ
খ্রিস্টান আকিদার বিস্তারিত পর্যালোচনা - ইবনুল কাইয়্যিম, আহকামু আহলিয যিম্মাহ ও হিদায়াতুল হায়ারা
অমুসলিমদের উৎসব ও আলোচনার আদব - রাহমাতুল্লাহ কিরানবী, ইযহারুল হক
বাইবেলের লিখিত ইতিহাস ও পরিবর্তনের বিশ্লেষণ - ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী
বুখারী ৭, ৩৪৪৫, ৩৪৪৮, ৪৩৮০-এর ব্যাখ্যা
সাইটের সব সূত্র: সূত্র তালিকা · সূত্র নীতি