قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ
জিন: কুরআন ও সহিহ হাদিসে যা আছে
আগুনের শিখায় সৃষ্ট এক অদৃশ্য জাতি, যাদেরও আছে ঈমান-কুফর আর কিয়ামতের হিসাব। কুরআন শুনে তাদের ঈমান আনার ঘটনা থেকে শুরু করে সুরক্ষার আমল আর প্রচলিত ভুল, সব দলিল ও মানসহ।
এই পাতার প্রতিটি কথা কুরআনের আয়াত বা হাদিস থেকে, আর প্রতিটি হাদিসের মান দেওয়া আছে। দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা প্রচলিত ভুল ও মান যাচাই অংশে আলাদা করে চিহ্নিত। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু, হাদিসের অনুবাদ Deenpedia-র নিজস্ব। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
- নাম ও অর্থ
- "জিন" শব্দের মূল অর্থ লুকানো বা আড়ালে থাকা; তারা আমাদের চোখের আড়ালে থাকে (সূরা আল-আরাফ ৭:২৭)
- সৃষ্টি
- ধোঁয়াহীন আগুনের শিখা থেকে (সূরা আর-রহমান ৫৫:১৫), মানুষের আগে (সূরা আল-হিজর ১৫:২৭)
- কেন সৃষ্টি
- মানুষের মতোই, আল্লাহর ইবাদতের জন্য (সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬)
- স্বাধীন ইচ্ছা
- আছে: তাদের মধ্যে মুমিন আছে, কাফিরও আছে (সূরা আল-জিন ৭২:১১, সূরা আল-জিন ৭২:১৪)
- খাওয়া, বংশ, মৃত্যু
- খায় (সহিহ মুসলিম ৪৫০), বংশধর আছে (সূরা আল-কাহফ ১৮:৫০), মারা যায় (সহিহ বুখারী ৭৩৮৩)
- গায়েবের জ্ঞান
- নেই; সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুও টের পায়নি (সূরা সাবা ৩৪:১৪)
- হিসাব
- কিয়ামতে মানুষের মতো জিনদেরও হিসাব হবে (সূরা আল-আনআম ৬:১৩০, সূরা আর-রহমান ৫৫:৩১)
- ইবলিস
- জিনদেরই একজন, ফেরেশতা নয় (সূরা আল-কাহফ ১৮:৫০)
জিন কারা
জিন আল্লাহর এক সৃষ্টি, যাদের আমরা সাধারণত দেখতে পাই না। আরবিতে "জান্না" মানে ঢেকে ফেলা বা লুকানো; একই মূল থেকে "জান্নাত" (গাছে ঢাকা বাগান) আর "জুন্নাহ" (ঢাল)। জিনেরা চোখের আড়ালে থাকে বলেই এই নাম।
জিনের অস্তিত্ব কোনো লোককথা নয়। কুরআনে প্রায় তিরিশ জায়গায় জিনের কথা এসেছে, আর একটি পুরো সূরার নাম সূরা আল-জিন। আল্লাহ মানুষ ও জিন দুই জাতিকে একই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।
তাই কুরআনের অনেক আয়াতে দুই জাতিকে একসাথে সম্বোধন করা হয়েছে: "হে জিন ও মানুষের দল" (সূরা আল-আনআম ৬:১৩০, সূরা আর-রহমান ৫৫:৩৩)। কুরআনের মতো কিছু বানানোর চ্যালেঞ্জও দুই জাতিকেই দেওয়া হয়েছে (সূরা আল-ইসরা ১৭:৮৮)। এ কারণে আলেমরা মানুষ ও জিনকে বলেন "আস-সাকালান", দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই জাতি (সূরা আর-রহমান ৫৫:৩১)।
জিনের বিষয়ে আমাদের অবস্থান হবে মাঝামাঝি: কুরআন-হাদিসে যা আছে তা পুরো বিশ্বাস করা, আর যা নেই তা নিয়ে কল্পনা, ভয় বা ব্যবসা না করা।
সৃষ্টি: ধোঁয়াহীন আগুনের শিখা থেকে
কুরআন জিনদের উপাদান স্পষ্ট বলেছে: আগুন। সূরা আর-রহমানে "মারিজ মিন নার", মানে আগুনের এমন শিখা যাতে ধোঁয়া নেই। সূরা আল-হিজরে আছে, মানুষের আগেই তাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল।
وَخَلَقَ الْجَانَّ مِن مَّارِجٍ مِّن نَّارٍ
এবং জিনকে সৃষ্টি করেছেন নির্ধূম আগুনের শিখা থেকে।
وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِن قَبْلُ مِن نَّارِ السَّمُومِ
আর এর আগে আমরা সৃষ্টি করেছি জিনদেরকে অতি উষ্ণ নির্ধুম আগুন থেকে।
নবীজি (ﷺ) তিন সৃষ্টির উপাদান এক হাদিসে একসাথে বলে দিয়েছেন:
خُلِقَتِ الْمَلاَئِكَةُ مِنْ نُورٍ وَخُلِقَ الْجَانُّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ
ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (আলো) থেকে, জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াহীন আগুনের শিখা থেকে, আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই জিনিস থেকে, যার বর্ণনা তোমাদের দেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ মাটি)।
এখান থেকে একটি বড় প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যায়: ইবলিস কি ফেরেশতা ছিল? না। কুরআন বলছে, "সে ছিল জিনদের একজন", আর ইবলিস নিজেই বলেছে, "আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন"। ফেরেশতারা নূর থেকে সৃষ্টি, আর তাঁরা আল্লাহর অবাধ্য হন না (সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬)।
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ ۗ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ ۚ بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلًا
আর স্মরণ করুন, আমরা যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, ‘আদমের প্রতি সাজদাহ কর’, তখন তারা সবাই সাজদাহ করল ইবলীস ছাড়া; সে ছিল জিনদের একজন, সে তার রবের আদেশ অমান্য করল। তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, অথচ তারা তোমাদের শত্রু। যালেমদের এ বিনিময় কত নিকৃষ্ট!
قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ ۖ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ
তিনি বললেন, ‘আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম তখন কি তোমাকে নিবৃত্ত করল যে, তুমি সিজদা করলে না?’ সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে শ্ৰেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কাদামাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
জিনেরা মানুষের মতোই জন্মায় ও মারা যায়। ইবলিসের বংশধরের কথা কুরআনে আছে (সূরা আল-কাহফ ১৮:৫০), আর নবীজি (ﷺ) আল্লাহকে "চিরঞ্জীব" বলে প্রশংসা করে বলতেন, জিন ও মানুষ মারা যায়:
أَعُوذُ بِعِزَّتِكَ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ، الَّذِي لاَ يَمُوتُ وَالْجِنُّ وَالإِنْسُ يَمُوتُونَ
(নবী (ﷺ) বলতেন:) "তোমার ইজ্জতের আশ্রয় চাই, তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তুমি সেই চিরঞ্জীব, যিনি মারা যান না, আর জিন ও মানুষ মারা যায়।"
আরও বিস্তারিত: ইবলিসের অহংকার, আদম (আ.)-কে সিজদা না করা আর তার কুমন্ত্রণার কৌশল শয়তানের পাতায় পড়ুন।
ফেরেশতা, জিন ও মানুষ: পার্থক্য এক নজরে
| ফেরেশতা | জিন | মানুষ | |
|---|---|---|---|
| কী দিয়ে সৃষ্টি | নূর (আলো) সহিহ মুসলিম ২৯৯৬ | ধোঁয়াহীন আগুনের শিখা সূরা আর-রহমান ৫৫:১৫ | মাটি সূরা আল-হিজর ১৫:২৬ |
| আমরা দেখতে পাই? | সাধারণত না; আল্লাহ চাইলে মানুষের রূপে আসেন | সাধারণত না সূরা আল-আরাফ ৭:২৭; অন্য রূপে দেখা দিতে পারে সহিহ মুসলিম ২২৩৬ | হ্যাঁ |
| অবাধ্য হতে পারে? | না, যা আদেশ করা হয় তা-ই করেন সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬ | হ্যাঁ, মুমিন ও কাফির দুই-ই আছে সূরা আল-জিন ৭২:১৪ | হ্যাঁ |
| খাওয়া-দাওয়া | খান না (ইবরাহীম (আ.)-এর মেহমানরা খাননি সূরা আয-যারিয়াত ৫১:২৭) | খায় সহিহ বুখারী ৩৮৬০ | খায় |
| কিয়ামতে হিসাব | তাঁরা আল্লাহর আদেশ পালনকারী বান্দা | হবে সূরা আল-আনআম ৬:১৩০ | হবে |
দলিলসহ তুলনা। বিস্তারিত: ফেরেশতাদের পাতা।
আমরা তাদের দেখি না: তাদের শক্তি ও সীমা
জিনেরা আমাদের দেখে, আমরা তাদের দেখি না। শয়তান সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
يَا بَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُم مِّنَ الْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا ۗ إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ ۗ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ
হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রলুব্ধ না করে- যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল, সে তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য বিবস্ত্র করেছিল। নিশ্চয় সে নিজে এবং তার দল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। নিশ্চয় আমরা শয়তানকে তাদের অভিভাবক করেছি, যারা ঈমান আনে না।
তবে তারা অন্য রূপে দেখা দিতে পারে। আবু হুরায়রা (রা.)-এর কাছে যে "চোর" তিন রাত এসেছিল, সে ছিল শয়তান, মানুষের রূপে (সহিহ বুখারী ২৩১১)। আর মদিনার ঘরে সাপের রূপে মুসলিম জিন থাকার কথা নবীজি জানিয়েছেন (সহিহ মুসলিম ২২৩৬)।
তাদের কিছু শক্তি আছে যা মানুষের নেই। সুলাইমান (আ.)-এর দরবারে এক ইফরীত (শক্তিশালী জিন) বলেছিল, রাজার আসন থেকে ওঠার আগেই সে বিলকিসের সিংহাসন এনে দেবে (সূরা আন-নামল ২৭:৩৯)। কিন্তু তাদের শক্তির সীমাও আছে:
- গায়েব জানে না। সুলাইমান (আ.) লাঠিতে ভর দিয়ে মারা গেলেন, জিনেরা কাজ করেই চলল; উইপোকা লাঠি খেয়ে ফেলায় তিনি পড়ে গেলেন, তখন তারা বুঝল (সূরা সাবা ৩৪:১৪)।
- আকাশের খবর আর চুরি করতে পারে না। নবুয়তের পর থেকে আকাশে পাহারা আর উল্কা (সূরা আল-জিন ৭২:৮, সূরা আল-জিন ৭২:৯)। আগে যা চুরি করত, তার সাথেও শত মিথ্যা মেশাত (সহিহ বুখারী ৩২১০)।
- আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারও ক্ষতি করতে পারে না। জাদুর ক্ষেত্রেও কুরআন বলেছে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা কারও ক্ষতি করতে পারে না (সূরা আল-বাকারা ২:১০২)।
- কুরআনের মতো কিছু আনতে পারে না, মানুষের সাথে মিলেও না (সূরা আল-ইসরা ১৭:৮৮)।
কিছু আলেম জিনের প্রকার নিয়ে একটি হাদিস উল্লেখ করেন: "জিন তিন প্রকার: এক প্রকার ডানায় ভর করে আকাশে চলে, এক প্রকার সাপ ও কুকুর, আর এক প্রকার কোথাও থামে, আবার চলে যায়।" এটি তাবারানী ও হাকিম বর্ণনা করেছেন, আলবানী সহিহ বলেছেন (সহিহুল জামি)। এর বেশি খুঁটিনাটি, যেমন জিনদের "রাজা", "বাদশাহর নাম" বা "জাত-পাত"-এর তালিকা, কুরআন-সহিহ হাদিসে নেই।
কুরআন শুনে জিনদের ঈমান: সূরা আল-জিন ও আল-আহকাফ
জিনদের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা হলো কুরআন শুনে তাদের ঈমান আনা। সহিহ বুখারীতে ইবনু আব্বাস (রা.) পুরো ঘটনা বর্ণনা করেছেন: আকাশে পাহারা বসার কারণ খুঁজতে বের হওয়া জিনদের একটি দল নাখলা নামের জায়গায় নবীজির ফজরের তিলাওয়াত শুনল।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কয়েকজন সাহাবীকে নিয়ে উকায বাজারের দিকে রওনা হলেন। তখন শয়তানদের আর আকাশের খবর শুনতে দেওয়া হচ্ছিল না, তাদের দিকে উল্কা ছোড়া হচ্ছিল। শয়তানরা নিজেদের লোকদের কাছে ফিরে গেলে তারা জিজ্ঞেস করল: কী হয়েছে? তারা বলল: আকাশের খবর আর আমাদের কাছে আসছে না, আমাদের দিকে উল্কা ছোড়া হচ্ছে। তারা বলল: নিশ্চয়ই নতুন কিছু ঘটেছে, তাই পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমে ঘুরে দেখো কী হয়েছে। যে দলটি তিহামার দিকে গেল, তারা নাখলায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে পৌঁছাল; তিনি তখন সাহাবীদের নিয়ে ফজরের নামাজ পড়ছিলেন। কুরআন শুনে তারা মন দিয়ে শুনতে লাগল এবং বলল: এটাই সেই জিনিস, যা আমাদের ও আকাশের খবরের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকে তারা নিজের জাতির কাছে ফিরে গিয়ে বলল: "হে আমাদের জাতি, আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সঠিক পথ দেখায়; তাই আমরা এতে ঈমান এনেছি, আর আমরা কখনো আমাদের রবের সাথে কাউকে শরিক করব না।" তখন আল্লাহ তাঁর নবীর উপর নাযিল করলেন: "বলুন, আমার কাছে ওহি এসেছে যে, জিনদের একটি দল মন দিয়ে শুনেছে…" নবীজির কাছে আসলে জিনদের কথাটাই ওহি করে জানানো হয়েছিল।
একই ঘটনা সূরা আল-আহকাফে এসেছে। লক্ষ করুন, তারা একে অপরকে বলল "চুপ করে শোনো"; শুনে শেষ হলে নিজের জাতির কাছে সতর্ককারী হয়ে ফিরে গেল। তারা মূসা (আ.)-এর কিতাবের কথা জানত, আর বুঝল এই কিতাব আগের কিতাবকে সত্যায়ন করে।
وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَرًا مِّنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ فَلَمَّا حَضَرُوهُ قَالُوا أَنصِتُوا ۖ فَلَمَّا قُضِيَ وَلَّوْا إِلَىٰ قَوْمِهِم مُّنذِرِينَ
আর স্মরণ করুন, যখন আমরা আপনার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম জিনদের একটি দলকে, যারা মনোযোগসহকারে কুরআন পাঠ শুনছিল। অতঃপর যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হল, তারা বলল, ‘চুপ করে শুন।’ অতঃপর যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে।
قَالُوا يَا قَوْمَنَا إِنَّا سَمِعْنَا كِتَابًا أُنزِلَ مِن بَعْدِ مُوسَىٰ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ يَهْدِي إِلَى الْحَقِّ وَإِلَىٰ طَرِيقٍ مُّسْتَقِيمٍ
তারা বলেছিল, ‘হে আমাদের সম্প্রদায় ! নিশ্চয় আমরা এমন এক কিতাবের পাঠ শুনেছি যা নাযিল হয়েছে মূসার পরে, এটা তার সম্মুখস্থ কিতাবকে সত্যায়ন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে হেদায়াত করে।
يَا قَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللَّهِ وَآمِنُوا بِهِ يَغْفِرْ لَكُم مِّن ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرْكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
‘হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহর দিকে আহবানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তাঁর উপর ঈমান আন, তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করবেন।’
وَمَن لَّا يُجِبْ دَاعِيَ اللَّهِ فَلَيْسَ بِمُعْجِزٍ فِي الْأَرْضِ وَلَيْسَ لَهُ مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءُ ۚ أُولَـٰئِكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
আর যে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া না দেয় তবে সে যমীনে আল্লাহ্কে অপারগকারী নয়। আর আল্লাহ ছাড়া তার কোনো অভিভাবক নেই। তারাই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।
আর সূরা আল-জিনের শুরু:
قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا
বলুন, ‘আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগের সাথে শুনেছে অতঃপর বলেছে, ‘আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি,
يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ ۖ وَلَن نُّشْرِكَ بِرَبِّنَا أَحَدًا
যা সত্যের দিকে হেদায়াত করে; ফলে আমরা এতে ঈমান এনেছি। আর আমরা কখনো আমাদের রবের সাথে কাউকে শরীক করব না,
প্রথম ঘটনায় নবীজি (ﷺ) জিনদের দেখেননি; ওহির মাধ্যমে জেনেছেন (ইবনু আব্বাসের বর্ণনার শেষ বাক্য)। পরে জিনেরা নিজেরাই প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল, আর নবীজি তাদের কাছে গিয়ে কুরআন শুনিয়েছিলেন। ইবনু হাজার আসকালানীসহ মুহাদ্দিসরা এভাবেই দুই বর্ণনার সমন্বয় করেছেন: জিনদের সাথে সাক্ষাৎ একাধিকবার হয়েছিল।
(এক রাতে সাহাবীরা নবীজিকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না; ভোরে তিনি হেরার দিক থেকে এলেন এবং বললেন:) "জিনদের পক্ষ থেকে একজন আহ্বানকারী আমার কাছে এসেছিল, আমি তার সাথে গিয়ে তাদের কুরআন পড়ে শুনিয়েছি।" (ইবনু মাসঊদ বলেন) তারপর তিনি আমাদের নিয়ে গিয়ে তাদের চিহ্ন ও তাদের আগুনের চিহ্ন দেখালেন। তারা তাঁর কাছে খাবার চেয়েছিল। তিনি বললেন: "আল্লাহর নাম নিয়ে (জবাই করা) প্রতিটি হাড়, যা তোমাদের হাতে পড়বে, তা আগের চেয়েও বেশি গোশতে ভরা থাকবে, আর প্রতিটি গোবর তোমাদের পশুর খাবার।" তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: "তাই তোমরা এ দুটি দিয়ে ইস্তিঞ্জা কোরো না, কারণ এগুলো তোমাদের ভাইদের খাবার।"
সূরা আর-রহমান শুনে জিনদের জবাব ছিল সাহাবীদের চুপ থাকার চেয়ে সুন্দর। এ জন্য আজও অনেকে এই সূরায় "ফাবিআইয়ি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান" শুনে মনে মনে বলেন: "লা বিশাইয়িম মিন নিআমিকা রাব্বানা নুকাযযিবু, ফালাকাল হামদ।"
لَقَدْ قَرَأْتُهَا عَلَى الْجِنِّ لَيْلَةَ الْجِنِّ فَكَانُوا أَحْسَنَ مَرْدُودًا مِنْكُمْ كُنْتُ كُلَّمَا أَتَيْتُ عَلَى قَوْلِهِِ : ( فبأَىِّ آلاَءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ) قَالُوا لاَ بِشَيْءٍ مِنْ نِعَمِكَ رَبَّنَا نُكَذِّبُ فَلَكَ الْحَمْدُ
(নবীজি সাহাবীদের সামনে সূরা আর-রহমান পুরোটা পড়লেন, তাঁরা চুপ করে রইলেন। তখন তিনি বললেন:) "জিনদের রাতে আমি এই সূরা জিনদের পড়ে শুনিয়েছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে ভালো জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি পড়তাম, "অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?", তারা বলত: হে আমাদের রব, তোমার কোনো নিয়ামতই আমরা অস্বীকার করি না, সব প্রশংসা তোমারই।"
শিক্ষা: যে কুরআন জিনদের এক শোনাতেই বদলে দিল, তা আমরা প্রতিদিন শুনেও কতটা মন দিই? জিনেরা শুনেই দাওয়াতের কাজে নেমে পড়েছিল (সূরা আল-আহকাফ ৪৬:২৯)।
সূরা আল-জিনে জিনদের নিজের মুখের কথা
| আয়াত | জিনেরা যা বলেছে | যা শিখি |
|---|---|---|
| ৭২:১-২ | আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, তাতে ঈমান এনেছি, রবের সাথে কাউকে শরিক করব না। | কুরআন শুনে সাথে সাথে ঈমান ও তাওহীদের ঘোষণা |
| ৭২:৩-৫ | আমাদের রবের কোনো স্ত্রী বা সন্তান নেই; আমাদের নির্বোধেরা আল্লাহর নামে মিথ্যা বলত। | জিনদের মধ্যেও ভুল আকিদা ছিল; কুরআন তা শুধরে দিল |
| ৭২:৬ | কিছু মানুষ কিছু জিনের আশ্রয় চাইত, তাতে জিনদের অহংকার বেড়ে গিয়েছিল। | জিনের আশ্রয় চাওয়া মানুষের ক্ষতিই বাড়ায়; আশ্রয় শুধু আল্লাহর কাছে |
| ৭২:৭ | তারাও তোমাদের মতো ভাবত, আল্লাহ কাউকে আর পুনরুত্থিত করবেন না। | আখিরাত অস্বীকার মানুষ ও জিন দুই জাতির মধ্যেই ছিল |
| ৭২:৮-৯ | আগে আমরা আকাশের খবর শুনতে বসতাম; এখন আকাশ কঠোর প্রহরী আর উল্কায় ভরা। | নবুয়তের পর আকাশের খবর চুরি বন্ধ; গণকের "খবর" আরও অবিশ্বাস্য |
| ৭২:১০ | আমরা জানি না, পৃথিবীবাসীর অমঙ্গল চাওয়া হয়েছে, না তাদের রব তাদের কল্যাণ চান। | জিনেরা গায়েব জানে না, নিজেরাই স্বীকার করছে |
| ৭২:১১-১২ | আমাদের মধ্যে কেউ সৎ, কেউ তার বিপরীত; নানা পথে ছিলাম। আল্লাহকে আমরা অক্ষম করতে পারব না। | জিনদের মধ্যেও নানা দল ও মত |
| ৭২:১৩-১৫ | হিদায়াত শুনে আমরা ঈমান এনেছি। আমাদের মধ্যে মুসলিম আছে, সীমালঙ্ঘনকারীও আছে; সীমালঙ্ঘনকারীরা জাহান্নামের ইন্ধন। | জিনদেরও প্রতিদান ও শাস্তি আছে |
| ৭২:২৬-২৭ | আল্লাহ গায়েবের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না, শুধু তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া। | জিন, গণক বা "আমিল" কেউ গায়েব জানে না |
পুরো সূরা আরবি ও অর্থসহ পড়ুন: সূরা আল-জিন · সূরা আল-আহকাফ ৪৬:২৯-৩২
নবীজি (ﷺ) ও জিন: ঘটনার সময়রেখা
| সময় | ঘটনা | সূত্র | মান |
|---|---|---|---|
| নবুয়তের আগে | জিনেরা আকাশের কাছাকাছি বসে ফেরেশতাদের কথা চুরি করে শুনত | সূরা আল-জিন সূরা আল-জিন ৭২:৯ | কুরআন |
| নবুয়তের শুরুর পর | আকাশে পাহারা বসানো হয়, খবর চুরি করতে গেলে উল্কা ছোড়া হয় | সহিহ বুখারী ৪৯২১, সূরা আল-জিন ৭২:৮ | সহিহ |
| মক্কি যুগ | নাখলা উপত্যকায় ফজরের নামাজে কুরআন শুনে একদল জিন ঈমান আনে; সূরা আল-জিন নাযিল | সহিহ বুখারী ৪৯২১, সূরা আল-আহকাফ ৪৬:২৯ | সহিহ |
| মক্কি যুগ (প্রসিদ্ধ মত) | তায়েফ থেকে ফেরার পথে নাখলায় এই ঘটনা ঘটেছিল (নবুয়তের ১০ম বছর) | ইবনু ইসহাক, সীরাতু ইবনি হিশাম | সনদ মুরসাল |
| মক্কি যুগ | জিনদের আহ্বানকারী এসে নবীজিকে নিয়ে যায়, তিনি তাদের কুরআন শোনান; সকালে সাহাবীদের তাদের আগুনের চিহ্ন দেখান | সহিহ মুসলিম ৪৫০ | সহিহ |
| অজানা | নাসীবীনের জিনদের প্রতিনিধি দল আসে, খাবার চায়; নবীজি তাদের জন্য দোয়া করেন | সহিহ বুখারী ৩৮৬০ | সহিহ |
| অজানা | জিনদের সূরা আর-রহমান শোনান; প্রতিটি "ফাবিআইয়ি আলা-ই" শুনে তারা স্বীকৃতি দেয় | জামে আত-তিরমিযী ৩২৯১ | হাসান |
| মাদানি যুগ | এক ইফরীত জিন নামাজ নষ্ট করতে আসে; নবীজি তাকে ধরেও সুলাইমান (আ.)-এর দোয়ার কথা ভেবে ছেড়ে দেন | সহিহ বুখারী ৪৬১ | সহিহ |
| মাদানি যুগ | মদিনায় একদল জিনের ইসলাম গ্রহণ; ঘরের সাপের ব্যাপারে নির্দেশ | সহিহ মুসলিম ২২৩৬ | সহিহ |
মুমিন ও কাফির জিন
মানুষের মতো জিনেরও বুদ্ধি ও স্বাধীন ইচ্ছা আছে, তাই তাদের মধ্যেও ভালো-মন্দ, মুমিন-কাফির আছে। সূরা আল-জিনে তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে:
وَأَنَّا مِنَّا الصَّالِحُونَ وَمِنَّا دُونَ ذَٰلِكَ ۖ كُنَّا طَرَائِقَ قِدَدًا
‘এও যে, আমাদের কিছু সংখ্যক সৎকর্মপরায়ণ এবং কিছু সংখ্যক এর ব্যতিক্রম, আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী;
وَأَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا الْقَاسِطُونَ ۖ فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُولَـٰئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا
‘এও যে, আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক আছে মুসলিম আর কিছু সংখ্যক আছে সীমালঙ্ঘনকারী; অতঃপর যারা ইসলাম গ্ৰহণ করেছে তারা সুচিন্তিতভাবে সত্য পথ বেছে নিয়েছে।
وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا
‘আর যারা সীমালঙ্ঘনকারী তারা তো হয়েছে জাহান্নামের ইন্ধন।’
মদিনায় একদল জিন ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এ কারণে নবীজি (ﷺ) ঘরে সাপ দেখলে সাথে সাথে না মেরে আগে তিনবার সতর্ক করতে বলেছেন:
إِنَّ بِالْمَدِينَةِ نَفَرًا مِنَ الْجِنِّ قَدْ أَسْلَمُوا فَمَنْ رَأَى شَيْئًا مِنْ هَذِهِ الْعَوَامِرِ فَلْيُؤْذِنْهُ ثَلاَثًا فَإِنْ بَدَا لَهُ بَعْدُ فَلْيَقْتُلْهُ فَإِنَّهُ شَيْطَانٌ
মদিনায় জিনদের একটি দল ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই কেউ (ঘরে) এসব বাসিন্দার (সাপের) কোনোটি দেখলে তিনবার তাকে সতর্ক করে দেবে (চলে যেতে বলবে)। এরপরও দেখা দিলে তাকে মেরে ফেলবে, কারণ সেটা শয়তান।
প্রত্যেক মানুষের সাথে জিনদের মধ্য থেকে একজন সঙ্গী (কারীন) থাকে, যে মন্দের দিকে ডাকে। নবীজির কারীন আল্লাহর সাহায্যে আত্মসমর্পণ করেছিল:
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلاَّ وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ " . قَالُوا وَإِيَّاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ " وَإِيَّاىَ إِلاَّ أَنَّ اللَّهَ أَعَانَنِي عَلَيْهِ فَأَسْلَمَ فَلاَ يَأْمُرُنِي إِلاَّ بِخَيْرٍ
তোমাদের প্রত্যেকের সাথে জিনদের মধ্য থেকে একজন সঙ্গী (কারীন) নিযুক্ত আছে। সাহাবীরা বললেন: আপনার সাথেও, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন: আমার সাথেও; তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে সে আত্মসমর্পণ করেছে; এখন সে আমাকে শুধু ভালো কাজেরই কথা বলে।
রাসূল কি জিনদের মধ্য থেকেও এসেছেন?
সূরা আল-আনআমের আয়াতে বলা হয়েছে, "তোমাদের মধ্য থেকে রাসূলগণ কি আসেনি?" (সূরা আল-আনআম ৬:১৩০)। অধিকাংশ আলেম, যেমন ইবনু কাসীর, বলেছেন: রাসূল শুধু মানুষের মধ্য থেকেই এসেছেন, জিনদের মধ্যে ছিল "সতর্ককারী" (মুনযির), যারা রাসূলের বাণী নিজের জাতিকে পৌঁছে দিত; ঠিক যেমন নাখলার জিনেরা করেছিল (সূরা আল-আহকাফ ৪৬:২৯)। আর মুহাম্মাদ (ﷺ) মানুষ ও জিন দুই জাতির রাসূল।
সুলাইমান (আ.) ও জিন
জিনকে অধীন করে দেওয়া ছিল সুলাইমান (আ.)-এর প্রতি আল্লাহর এক বিশেষ দান। তিনি দোয়া করেছিলেন এমন রাজত্বের, যা তাঁর পরে আর কারও হবে না; আল্লাহ তাঁকে বাতাস আর জিনদের অধীন করে দিলেন:
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّن بَعْدِي ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে দান করুন এমন এক রাজ্য যা আমার পর আর কারও জন্যই প্রযোজ্য হবে না। নিশ্চয় আপনি পরম দাতা।'
فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيحَ تَجْرِي بِأَمْرِهِ رُخَاءً حَيْثُ أَصَابَ
তখন আমরা তার অধীন করে দিলাম বায়ুকে যা তার আদেশে তিনি যেখানে ইচ্ছে করতেন সেখানে মৃদুমন্দভাবে প্রবাহিত হত,
وَالشَّيَاطِينَ كُلَّ بَنَّاءٍ وَغَوَّاصٍ
আর (অধীন করে দিলাম) প্রত্যেক প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী শয়তানসমূহকেও
وَآخَرِينَ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ
এবং শৃংখলে আবদ্ধ আরও অনেককে
জিনেরা তাঁর রবের অনুমতিতে তাঁর জন্য প্রাসাদ, বড় বড় পাত্র ও ডেগ বানাত; অবাধ্য হলে শাস্তি পেত। তাঁর বাহিনীতে মানুষ ও পাখির সাথে জিনও ছিল:
وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ ۖ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ ۖ وَمِنَ الْجِنِّ مَن يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ ۖ وَمَن يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ
আর সুলাইমানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে যা ভোরে একমাসের পথ অতিক্রম করত ও সন্ধ্যায় একমাসের পথ অতিক্রম করত। আমরা তার জন্য গলিত তামার এক প্রস্রবণ প্রবাহিত করেছিলাম এবং তার রবের অনুমতিক্রমে জিনদের কিছু সংখ্যক তার সামনে কাজ করত। আর তাদের মধ্যে যে আমাদের নির্দেশ অমান্য করে, তাকে আমরা জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন করাব।
يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِن مَّحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُورٍ رَّاسِيَاتٍ ۚ اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا ۚ وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ
তারা সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী তার জন্য প্রাসাদ, ভাস্কৰ্য, হাউজসদৃশ বৃহদাকার পাত্ৰ এবং সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত ডেগ নির্মাণ করত। 'হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সাথে তোমরা কাজ করতে থাক। আর আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ!’
وَحُشِرَ لِسُلَيْمَانَ جُنُودُهُ مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ وَالطَّيْرِ فَهُمْ يُوزَعُونَ
আর সুলাইমানের সামনে সমবেত করা হল তার বাহিনীকে---জিন, মানুষ ও বিহঙ্গকুলকে এবং তাদেরকে বিন্যস্ত করা হল বিভিন্ন ব্যূহে।
বিলকিসের সিংহাসন আনার ঘটনায় ইফরীত জিনের চেয়েও দ্রুত কাজ করেছিলেন "যাঁর কাছে কিতাবের জ্ঞান ছিল"। শিক্ষা: জ্ঞান ও ঈমানের শক্তি জিনের শক্তির চেয়ে বড়।
قَالَ عِفْرِيتٌ مِّنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَن تَقُومَ مِن مَّقَامِكَ ۖ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ
এক শক্তিশালী জিন বলল, ‘আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার আগেই আমি তা এনে দেব এবং এ ব্যাপারে আমি অবশ্যই শক্তিমান, বিশ্বস্ত।’
قَالَ الَّذِي عِندَهُ عِلْمٌ مِّنَ الْكِتَابِ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَن يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ ۚ فَلَمَّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا عِندَهُ قَالَ هَـٰذَا مِن فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ ۖ وَمَن شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ
কিতাবের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, ‘আপনি চোখের পলক ফেলার আগেই আমি তা আপনাকে এনে দেব।’ অতঃপর সুলাইমান যখন তা সামনে স্থির অবস্থায় দেখলেন তখন তিনি বললেন, ‘এ আমার রবের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আর যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজেরই কল্যাণের জন্য, আর যে কেউ অকৃতজ্ঞ হবে, সে জেনে রাখুক যে, আমার রব অভাবমুক্ত, মহানুভাব।’
আর সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর ঘটনা দেখিয়ে দেয়, যারা দিনরাত তাঁর পাশে কাজ করত, সেই জিনেরাও গায়েব জানত না:
فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَىٰ مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنسَأَتَهُ ۖ فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتِ الْجِنُّ أَن لَّوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ
অতঃপর যখন আমরা সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন জিনদেরকে তার মৃত্যুর খবর জানাল শুধু মাটির পোকা, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন তিনি পড়ে গেলেন তখন জিনরা -বুঝতে পারল যে, যদি তারা গায়েব জানত, তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না।
এই রাজত্ব যে শুধু তাঁর জন্যই ছিল, শেষ নবীর আচরণ তার সাক্ষী:
গত রাতে এক দুষ্ট ইফরীত জিন হঠাৎ আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আমার নামাজ নষ্ট করার জন্য। আল্লাহ আমাকে তার উপর ক্ষমতা দিলেন। আমি চেয়েছিলাম তাকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখি, যাতে সকালে তোমরা সবাই তাকে দেখতে পাও। তখন আমার ভাই সুলাইমানের দোয়া মনে পড়ল: "হে আমার রব, আমাকে এমন রাজত্ব দাও, যা আমার পরে আর কারও জন্য শোভনীয় নয়।" (তাই তিনি তাকে অপমানিত করে ফিরিয়ে দিলেন।)
মানুষের মুখে মুখে সুলাইমান (আ.)-কে জাদুকর বলা হতো, কুরআন তা খণ্ডন করেছে: "সুলাইমান কুফরি করেননি, শয়তানরাই কুফরি করেছিল" (সূরা আল-বাকারা ২:১০২)। তাঁর পুরো জীবনী: সুলাইমান (আ.)।
জিনদের খাবার
জিনদের খাবার নিয়ে সহিহ হাদিসে স্পষ্ট তথ্য আছে, আর তা থেকে আমাদের জন্য একটি বিধানও এসেছে:
(নবীজি বললেন) "আমার জন্য কয়েকটি পাথর খুঁজে আনো, তা দিয়ে ইস্তিঞ্জা করব; হাড় বা গোবর আনবে না।" … (পরে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হাড় আর গোবর কেন নয়?) তিনি বললেন: "এ দুটি জিনদের খাবারের অংশ। নাসীবীনের জিনদের একটি প্রতিনিধি দল আমার কাছে এসেছিল, তারা কত ভালো জিন! তারা আমার কাছে খাবার চাইল। আমি আল্লাহর কাছে তাদের জন্য দোয়া করলাম, যেন তারা যে হাড় বা গোবরের পাশ দিয়েই যায়, তাতে খাবার পায়।"
জিনদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল: হে মুহাম্মাদ, আপনার উম্মতকে হাড়, গোবর বা কয়লা দিয়ে ইস্তিঞ্জা করতে নিষেধ করুন, কারণ আল্লাহ এগুলোতে আমাদের জন্য রিযিক রেখেছেন। তখন নবী (ﷺ) তা নিষেধ করলেন।
- আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করা পশুর হাড় মুমিন জিনদের খাবার; তাদের হাতে তা আবার গোশতে ভরে যায় (সহিহ মুসলিম ৪৫০)।
- গোবর তাদের পশুর খাবার; অর্থাৎ জিনদেরও বাহন বা পশু আছে।
- তাই হাড়, গোবর বা কয়লা দিয়ে ইস্তিঞ্জা (শৌচ) করা নিষেধ; এগুলো "তোমাদের ভাইদের" খাবার।
- যে খাবারে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না, শয়তান তাতে ভাগ বসায়; আর যে ঘরে ঢোকার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না, সেখানে রাত কাটায় (সহিহ মুসলিম ২০১৮)। শয়তান বাম হাতে খায়, তাই ডান হাতে খাওয়ার নির্দেশ (সহিহ মুসলিম ২০২০)।
শিক্ষা: মুমিন জিনেরা আমাদের দ্বীনি ভাই; তাদের খাবার নষ্ট না করাও ইসলামের আদব। আর খাওয়ার আগে "বিসমিল্লাহ" শয়তানকে আমাদের খাবার থেকে দূরে রাখে।
জিনদের জবাবদিহি: কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নাম
জিনেরা দায়িত্বপ্রাপ্ত সৃষ্টি, তাই কিয়ামতের দিন তাদেরও হিসাব হবে। আল্লাহ দুই জাতিকে একসাথে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন, রাসূলেরা কি তোমাদের সতর্ক করেননি?
يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ يَقُصُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي وَيُنذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَـٰذَا ۚ قَالُوا شَهِدْنَا عَلَىٰ أَنفُسِنَا ۖ وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَشَهِدُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ أَنَّهُمْ كَانُوا كَافِرِينَ
'হে জিন ও মানুষের দল! তোমাদের মধ্য থেকে কি রাসূলগণ তোমাদের কাছে আসেনি যারা আমার নিদর্শন তোমাদের কাছে বিবৃত করত এবং তোমাদেরকে এ দিনের সম্মুখীন হওয়া সম্বন্ধে সতর্ক করত ?’ তারা বলবে, ‘আমারা আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলাম।’ বস্তুত দুনিয়ার জীবন তাদেরকে প্রতারিত করেছিল, আর তারা নিজেদের বিরুদ্ধে এই সাক্ষ্য দেবে, যে তারা কাফের ছিল।
سَنَفْرُغُ لَكُمْ أَيُّهَ الثَّقَلَانِ
হে মানুষ ও জিন! আমরা অচিরেই তোমাদের (হিসাব-নিকাশের) প্রতি মনোনিবেশ করব,
যে জিনেরা মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে, আর যে মানুষেরা জিনদের কাছ থেকে "সুবিধা" নিয়েছে, সেদিন তারা একে অপরকে দোষ দেবে:
وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ قَدِ اسْتَكْثَرْتُم مِّنَ الْإِنسِ ۖ وَقَالَ أَوْلِيَاؤُهُم مِّنَ الْإِنسِ رَبَّنَا اسْتَمْتَعَ بَعْضُنَا بِبَعْضٍ وَبَلَغْنَا أَجَلَنَا الَّذِي أَجَّلْتَ لَنَا ۚ قَالَ النَّارُ مَثْوَاكُمْ خَالِدِينَ فِيهَا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ۗ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ
আর যেদিন তিনি তাদের সবাইকে একত্র করবেন এবং বলবেন, ‘হে জিন সম্প্রদায় ! তোমারা তো অনেক লোককে পথভ্রষ্ট করেছিলে’ এবং মানুষের মধ্য থেকে তাদের বন্ধুরা বলবে, ’হে আমাদের রব! আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক অপর কিছু সংখ্যক দ্বারা লাভবান হয়েছে এবং আপনি আমাদের জন্য যে সময় নির্ধারণ করেছিলেন এখন আমারা তাতে উপনীত হয়েছি’। আল্লাহ্ বলবেন, ‘আগুনই তোমাদের বাসস্থান, তোমারা সেখানে স্থায়ী হবে’, যদি না আল্লাহ্ অন্য রকম ইচ্ছে করেন। নিশ্চয় আপনার রব প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا رَبَّنَا أَرِنَا اللَّذَيْنِ أَضَلَّانَا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ نَجْعَلْهُمَا تَحْتَ أَقْدَامِنَا لِيَكُونَا مِنَ الْأَسْفَلِينَ
আর কাফিররা বলবে, 'হে আমাদের রব! জিন ও মানুষের মধ্য থেকে যে দু'জন আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল তাদেরকে দেখিয়ে দিন, আমরা তাদের উভয়কে আমাদের পায়ের নিচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়।'
জাহান্নাম জিন ও মানুষ দুই দিয়েই পূর্ণ করা হবে (সূরা হুদ ১১:১১৯, সূরা আল-আরাফ ৭:৩৮)। আর মুমিন জিনদের জন্য ক্ষমা ও শাস্তি থেকে মুক্তির ওয়াদা আছে (সূরা আল-আহকাফ ৪৬:৩১)।
মুমিন জিনেরা কি জান্নাতে যাবে? সূরা আর-রহমানে জান্নাতের বর্ণনার সাথে বারবার জিন ও মানুষ দুজনকে বলা হয়েছে, "তোমরা উভয়ে রবের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?"; আর জান্নাতের সঙ্গিনীদের কোনো মানুষ বা জিন আগে স্পর্শ করেনি (সূরা আর-রহমান ৫৫:৫৬)। এ থেকে অধিকাংশ আলেম (ইমাম মালিক, শাফেয়ী, আহমাদ প্রমুখ) বলেছেন, মুমিন জিনেরাও জান্নাতে যাবে। ইমাম আবু হানীফা থেকে বর্ণিত, তাদের প্রতিদান জাহান্নাম থেকে মুক্তি। ইবনু কাসীর প্রথম মতটিকে শক্তিশালী বলেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ
আর যে তার রবের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান।
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ
কাজেই তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন্ অনুগ্রহে মিথ্যারোপ করবে?
জিন ও শয়তান থেকে সুরক্ষা: প্রতিদিনের আমল
জিন ও শয়তানের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য ইসলাম ভয় নয়, যিকির শিখিয়েছে। এগুলো সবই সহিহ হাদিস থেকে, প্রতিদিনের জীবনের সাথে মিশে থাকা আমল:
- ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৫): সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে পাহারাদার থাকে, শয়তান কাছে আসে না (সহিহ বুখারী ২৩১১)।
- ঘুমের আগে তিন কুল (সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক, আন-নাস): হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে বোলানো, তিনবার (সহিহ বুখারী ৫০১৭)। নবীজি জিন ও বদনজর থেকে আশ্রয়ের অন্য সব বাক্য ছেড়ে এই দুই সূরা ধরেছিলেন (জামে আত-তিরমিযী ২০৫৮)।
- রাতে সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৫, সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬): তা "যথেষ্ট" হয়ে যায় (সহিহ বুখারী ৫০০৯)।
- ঘরে সূরা আল-বাকারা পড়া: শয়তান সেই ঘর থেকে পালায় (সহিহ মুসলিম ৭৮০)।
- ঘরে ঢোকা ও খাওয়ার সময় "বিসমিল্লাহ": শয়তান রাত কাটানোর জায়গা ও খাবার পায় না (সহিহ মুসলিম ২০১৮)।
- ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া: "বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৫)।
- টয়লেটে ঢোকার আগে: "বিসমিল্লাহ" (জামে আত-তিরমিযী ৬০৬), তারপর "আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস" (সহিহ বুখারী ১৪২)।
- নতুন জায়গায় নামলে: "আঊযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক" (সহিহ মুসলিম ২৭০৮)।
- সন্ধ্যায়: শিশুদের ঘরে রাখা, আল্লাহর নাম নিয়ে দরজা বন্ধ ও পাত্র ঢেকে রাখা (সহিহ বুখারী ৩২৮০)।
- স্বামী-স্ত্রীর মিলনের আগে মাসনূন দোয়া, যাতে সন্তানকে শয়তান ক্ষতি করতে না পারে (সহিহ বুখারী ১৪১)।
- কুমন্ত্রণা বা ভয় এলে: আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৬, সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৯৭, সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৯৮)।
(রমজানের যাকাতের খাবার পাহারা দেওয়ার সময় আবু হুরায়রা (রা.) পরপর তিন রাত এক চোরকে ধরেন। তৃতীয় রাতে সে বলল:) "যখন বিছানায় যাবে, আয়াতুল কুরসি পুরোটা পড়বে; তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য একজন পাহারাদার থাকবেন, আর সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান তোমার কাছে আসবে না।" … নবী (ﷺ) বললেন: "সে তোমাকে সত্য বলেছে, যদিও সে বড় মিথ্যাবাদী। তুমি কি জানো, তিন রাত ধরে কার সাথে কথা বলছ, হে আবু হুরায়রা?" তিনি বললেন: না। নবীজি বললেন: "সে শয়তান।"
নবী (ﷺ) প্রতি রাতে বিছানায় যাওয়ার সময় দুই হাতের তালু একত্র করে তাতে ফুঁ দিতেন, আর সূরা আল-ইখলাস, সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস পড়তেন। তারপর যতটুকু সম্ভব শরীরে হাত বুলিয়ে নিতেন; মাথা, মুখমণ্ডল ও শরীরের সামনের দিক থেকে শুরু করতেন। এভাবে তিনবার করতেন।
মূল কথা: যে আল্লাহর যিকিরে থাকে, জিনের ভয়ে তার রাত জাগতে হয় না। ভয় আর কুসংস্কার যত বাড়ে, শয়তানের সুযোগ তত বাড়ে (সূরা আল-জিন ৭২:৬)।
রুকইয়াহ: সুন্নাহ অনুযায়ী ঝাড়ফুঁক
রুকইয়াহ মানে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম ও মাসনূন দোয়া পড়ে ফুঁ দেওয়া। এটা নবীজি (ﷺ) নিজে করেছেন, জিবরীল (আ.) তাঁকে করেছেন, সাহাবীরা করেছেন। শর্ত একটাই, এতে শিরক থাকতে পারবে না:
اعْرِضُوا عَلَىَّ رُقَاكُمْ لاَ بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ
(সাহাবিরা জাহিলি যুগে ঝাড়ফুঁক করতেন, তাই সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে নবী ﷺ বললেন:) তোমাদের ঝাড়ফুঁকগুলো আমার সামনে পেশ করো। যে ঝাড়ফুঁকে শিরক নেই, তাতে কোনো সমস্যা নেই।
জিবরীল (আ.) নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললেন: হে মুহাম্মাদ, আপনি কি অসুস্থ? তিনি বললেন: হ্যাঁ। জিবরীল বললেন: "বিসমিল্লাহি আরক্বীক, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ'যীক, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনি হাসিদ, আল্লাহু ইয়াশফীক, বিসমিল্লাহি আরক্বীক" (আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি, যা কিছু আপনাকে কষ্ট দেয় তা থেকে, প্রত্যেক প্রাণের অনিষ্ট ও হিংসুকের বদনজর থেকে; আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দিন, আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি)।
নবীজির কয়েকজন সাহাবী এক সফরে আরবের এক গোত্রের কাছে নামলেন এবং মেহমানদারি চাইলেন, কিন্তু তারা মেহমানদারি করল না। এরপর সেই গোত্রের সর্দারকে (বিচ্ছু বা সাপে) কামড়াল। তারা সব রকম চেষ্টা করল, কিছুতেই কাজ হলো না। তারা সাহাবীদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, আপনাদের কারও কাছে কিছু আছে কি? একজন বললেন: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম, আমি ঝাড়ফুঁক জানি; কিন্তু তোমরা আমাদের মেহমানদারি করোনি, তাই পারিশ্রমিক ঠিক না করলে করব না। তারা এক পাল ছাগল দিতে রাজি হলো। তিনি গিয়ে সর্দারের উপর হালকা থুতু দিয়ে "আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন" (সূরা আল-ফাতিহা) পড়তে লাগলেন। সে যেন বাঁধন থেকে ছাড়া পেল, হেঁটে চলল, কোনো কষ্টই রইল না। … তাঁরা নবীজির কাছে এসে ঘটনা বললেন। তিনি বললেন: "তুমি কীভাবে জানলে যে এটা রুকইয়াহ?" তারপর বললেন: "তোমরা ঠিক করেছ। ভাগ করে নাও, আর তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটা ভাগ রাখো।"
সুন্নাহ অনুযায়ী রুকইয়াহর নিয়ম
- যা পড়বেন: সূরা আল-ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত, তিন কুল, আর হাদিসে আসা দোয়া। নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়াও জায়েয।
- কীভাবে: পড়ে হালকা ফুঁ দেওয়া, হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে বোলানো (সহিহ বুখারী ৫০১৭); পানিতে পড়ে ফুঁ দেওয়া নিয়েও সালাফের আমল বর্ণিত আছে।
- কে করবেন: সবচেয়ে উত্তম নিজে নিজের জন্য পড়া। বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়া সত্তর হাজারের গুণ হলো, তারা অন্যের কাছে ঝাড়ফুঁক চায় না (সহিহ বুখারী ৫৭০৫)। প্রয়োজনে নেককার কারও কাছে করানো জায়েয।
- বিশ্বাস: আরোগ্য আল্লাহর হাতে; আয়াত বা পাঠকারীর নিজের কোনো ক্ষমতা নেই।
- চিকিৎসাও সুন্নাহ: ডাক্তার দেখানো তাওয়াক্কুলের বিপরীত নয়। খিঁচুনির রোগী নারীকে নবীজি ধৈর্য ও দোয়ার কথা বলেছেন, কোনো "জিন তাড়ানো"-র আয়োজন করেননি (সহিহ বুখারী ৫৬৫২)।
যা সুন্নাহর রুকইয়াহ নয়
- মায়ের নাম, জন্ম তারিখ বা কাপড় চেয়ে "হিসাব" করা: এটা গণকের পদ্ধতি।
- অর্থ না বোঝা শব্দ, নকশা, সংখ্যার ঘর (নকশা-তাবিজ) বা জিন-শয়তানের নাম ধরে ডাকা।
- রোগীকে মারধর, শ্বাসরোধ, ধোঁয়া দেওয়া বা অপমান করা।
- রোগীর মুখ দিয়ে "জিনের সাক্ষাৎকার" নেওয়া, তার কথায় কাউকে জাদুকর বলা (সহিহ বুখারী ২৩১১-এ নবীজি শয়তানকে "বড় মিথ্যাবাদী" বলেছেন)।
- জবাই, মানত বা কোনো শর্ত দিয়ে জিনকে খুশি করা (সহিহ মুসলিম ১৯৭৮)।
- রুকইয়াহকে পেশা ও প্যাকেজ বানিয়ে রোগীর ভয় নিয়ে ব্যবসা।
জিন কি মানুষের শরীরে ঢোকে? বিশ্লেষণ
এটি সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত, আবার সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত বিষয়। দুই দিক আলাদা করে বুঝুন।
১. সম্ভব কিনা: আহলুস সুন্নাহর অবস্থান
সুদখোরের কিয়ামতের অবস্থা বোঝাতে আল্লাহ উপমা দিয়েছেন "যাকে শয়তান স্পর্শ দিয়ে পাগল করে দেয়" তার মতো:
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا ۗ وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ۚ فَمَن جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَىٰ فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَمَنْ عَادَ فَأُولَـٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
যারা সুদ খায় তারা তার ন্যায় দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, ‘ক্রয়-বিক্রয় তো সূদেরই মত।’ অথচ আল্লাহ্ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সূদকে হারাম করেছেন। অতএব, যার নিকট তার রবের পক্ষ হতে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, তাহলে অতীতে যা হয়েছে তা তারই এবং তার ব্যাপার আল্লাহ্র ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।
উসমান ইবনু আবিল আস (রা.)-এর ঘটনায় নবীজি (ﷺ) তাঁর বুকে হাত মেরে বলেছিলেন, "বের হয়ে যা, আল্লাহর শত্রু!":
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন আমাকে তায়েফের দায়িত্ব দিলেন, তখন নামাজে আমার সামনে কিছু একটা আসতে লাগল, এমনকি আমি বুঝতে পারতাম না কী পড়ছি। তা দেখে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে গেলাম। তিনি বললেন: "আবুল আসের ছেলে?" আমি বললাম: জি, হে আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: "কী জন্য এসেছ?" আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, নামাজে আমার সামনে কিছু একটা আসে, এমনকি বুঝতে পারি না কী পড়ছি। তিনি বললেন: "ওটা শয়তান। কাছে এসো।" আমি কাছে গিয়ে পায়ের পাতার উপর বসলাম। তিনি হাত দিয়ে আমার বুকে আঘাত করলেন, আমার মুখে হালকা থুতু দিলেন এবং বললেন: "বের হয়ে যা, আল্লাহর শত্রু!" তিনবার এমন করলেন। তারপর বললেন: "তোমার কাজে ফিরে যাও।" উসমান বলেন: আমার জীবনের কসম, এরপর আর কখনো সে আমার কাছে এসেছে বলে মনে হয় না।
এসব দলিলের ভিত্তিতে আবুল হাসান আল-আশআরী (মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন) আহলুস সুন্নাহর মত হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে জিন মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ইবনু তাইমিয়া লিখেছেন, এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর ইমামরা একমত; আর ইমাম আহমাদকে যখন বলা হলো, কেউ কেউ বলে জিন শরীরে ঢোকে না, তিনি বললেন, "তারা ভুল বলে" (মাজমূউল ফাতাওয়া ২৪/২৭৬-২৭৭)। মুতাযিলা সম্প্রদায় এটা অস্বীকার করত।
২. বাস্তবে: সব কিছুকে "জিন" বলা ভুল
সম্ভব হওয়া মানে প্রতিটি অসুখ জিন নয়। মৃগী, প্যানিক অ্যাটাক, বিষণ্নতা, স্কিজোফ্রেনিয়া, হিস্টিরিয়া বা ঘুমের সমস্যার লক্ষণ অনেক সময় "জিনে ধরা" বলে ভুল বোঝা হয়। তাতে রোগী চিকিৎসা পায় না, উল্টো মারধর ও অপমানের শিকার হয়। সহিহ হাদিসে নবীজি খিঁচুনির রোগকে রোগ হিসেবেই দেখেছেন (সহিহ বুখারী ৫৬৫২)।
- প্রথমে ডাক্তার দেখান, প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।
- পাশাপাশি নিজে বা পরিবারের নেককার কেউ সুন্নাহর রুকইয়াহ ও দৈনিক যিকির চালিয়ে যান।
- "আমিল", "কবিরাজ" বা যে কেউ জিনের নাম-ঠিকানা, মায়ের নাম, জবাই বা টাকার প্যাকেজ চায়, তাকে এড়িয়ে চলুন।
জিন নিয়ে প্রচলিত ভুল, বিদআত ও শিরক
বাংলাদেশে জিন নিয়ে যত কথা চলে, তার বড় অংশের কুরআন-হাদিসে কোনো ভিত্তি নেই, আর কিছু সরাসরি শিরক। প্রতিটির মান ও সঠিক কথা:
জিনের আশ্রয় চাওয়া, জিন বা "পীরের জিন"-কে খুশি করতে মুরগি-ছাগল জবাই করা, মানত দেওয়া।
"জিন হাজির" করে হারানো জিনিস, চোর, ভবিষ্যৎ বা কে জাদু করেছে জেনে নেওয়া যায়।
তাবিজ, কবচ, সুতা, তামার আংটি বা হাড় ঝুলিয়ে জিন ও বদনজর থেকে বাঁচা।
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) দোয়া লিখে ছোট বাচ্চাদের গলায় ঝুলিয়ে দিতেন, তাই কুরআনের তাবিজ সুন্নাহ।
"আমিল" জিন বশ করে কাজ করান; জিন সাধনা, জিনের নামে আমল-ওজিফা করে জিন কাজে লাগানো যায়।
মৃত মানুষের আত্মা ভূত হয়ে ঘোরে, অপঘাতে মরা মানুষ "আছর" করে।
আদমের আগে পৃথিবীতে জিনেরা (বনুল জান) রাজত্ব করত, ফেরেশতারা যুদ্ধ করে তাদের তাড়িয়ে দেয়, ইবলিস ছিল তাদের সেনাপতি।
সুলাইমান (আ.)-এর আংটির জোরে জিন বশ ছিল; "সাখর" নামের এক শয়তান আংটি চুরি করে চল্লিশ দিন তাঁর সিংহাসনে বসেছিল।
আকাশে উল্কা ছুটলে বুঝতে হবে বড় কেউ জন্মেছে বা মারা গেছে।
জিনের সাথে মানুষের বিয়ে হয়, "জিন-স্বামী" বা "জিন-স্ত্রী" থাকে, তাই কারও বিয়ে হচ্ছে না।
সন্ধ্যায় চুল খোলা রাখলে, তেঁতুল বা শ্যাওড়া গাছের নিচে গেলে, ভরদুপুরে পুকুরে নামলে জিনে ধরে।
গরম পানি ফেলার আগে "বিসমিল্লাহ" না বললে জিন পুড়ে যায়, তারপর প্রতিশোধ নেয়।
রুকইয়াহর সময় রোগীর মুখ দিয়ে "জিন" যা বলে (কে জাদু করেছে, কোন আত্মীয় দায়ী), তা মেনে নেওয়া।
আরও যাচাই: প্রচলিত ভুল ও সঠিক তথ্য।
মান যাচাই: এই পাতার সব বর্ণনা
এই পাতায় ৩৫টি হাদিস দলিল হিসেবে এসেছে: ৩৪টি সহিহ, ১টি হাসান। নিচে সেগুলোর সাথে প্রচলিত কিছু দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনাও রাখা হলো, যাতে পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
| বর্ণনা | সূত্র | মান | কে বলেছেন |
|---|---|---|---|
| ফেরেশতারা নূর থেকে সৃষ্ট | সহিহ মুসলিম ২৯৯৬ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| জিন ও মানুষ মারা যায়, আল্লাহ চিরঞ্জীব | সহিহ বুখারী ৭৩৮৩ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি: সকাল পর্যন্ত পাহারা | সহিহ বুখারী ২৩১১ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| মদিনায় মুসলিম জিন, ঘরের সাপের বিধান | সহিহ মুসলিম ২২৩৬ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| শয়তান জিনের চুরি করে শোনা ও গণকের মিথ্যা | সহিহ বুখারী ৩২১০ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| নাখলায় জিনদের কুরআন শোনা ও সূরা আল-জিন | সহিহ বুখারী ৪৯২১ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| জিনদের রাত: নবীজি (ﷺ) তাদের কুরআন শোনালেন | সহিহ মুসলিম ৪৫০ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| সূরা আর-রহমান শুনে জিনদের সুন্দর জবাব | জামে তিরমিযী ৩২৯১ | হাসান | আলবানী |
| প্রত্যেকের সাথে একজন সঙ্গী জিন (কারীন) | সহিহ মুসলিম ২৮১৪ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| নামাজ নষ্ট করতে আসা ইফরীত ও সুলাইমান (আ.)-এর দোয়া | সহিহ বুখারী ৪৬১ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| নাসীবীনের জিনদের প্রতিনিধি দল ও তাদের খাবার | সহিহ বুখারী ৩৮৬০ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| জিনদের অনুরোধ: হাড় ও গোবর দিয়ে ইস্তিঞ্জা নয় | সুনানে আবু দাউদ ৩৯ | সহিহ | আলবানী |
| ঘরে ঢোকা ও খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম | সহিহ মুসলিম ২০১৮ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| ঘুমের আগে তিন কুল পড়ে শরীরে হাত বোলানো | সহিহ বুখারী ৫০১৭ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| জিন ও বদনজর থেকে আশ্রয়ে সূরা ফালাক ও নাস | জামে তিরমিযী ২০৫৮ | সহিহ | আলবানী |
| রাতে সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত | সহিহ বুখারী ৫০০৯ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| যে ঘরে সূরা আল-বাকারা পড়া হয় | সহিহ মুসলিম ৭৮০ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া | সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৫ | সহিহ | আলবানী |
| টয়লেটে ঢোকার আগে "বিসমিল্লাহ" | জামে তিরমিযী ৬০৬ | সহিহ | আলবানী |
| টয়লেটে ঢোকার দোয়া | সহিহ বুখারী ১৪২ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| নতুন জায়গায় নামলে যে দোয়া | সহিহ মুসলিম ২৭০৮ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| সন্ধ্যায় শিশুদের ঘরে রাখা ও রাতের আদব | সহিহ বুখারী ৩২৮০ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| স্বামী-স্ত্রীর মিলনের আগের দোয়া | সহিহ বুখারী ১৪১ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| শিরকমুক্ত ঝাড়ফুঁক জায়েয | সহিহ মুসলিম ২২০০ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| জিবরীল (আ.)-এর রুকইয়াহ | সহিহ মুসলিম ২১৮৬ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| সূরা আল-ফাতিহা দিয়ে রুকইয়াহ | সহিহ বুখারী ২২৭৬ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়া সত্তর হাজার | সহিহ বুখারী ৫৭০৫ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| মৃগী রোগে ধৈর্য ধরা নারী জান্নাতী | সহিহ বুখারী ৫৬৫২ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাই | সহিহ মুসলিম ১৯৭৮ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| "বের হয়ে যা, আল্লাহর শত্রু!" | সুনানে ইবনু মাজাহ ৩৫৪৮ | সহিহ | আলবানী |
| গণকের কাছে যাওয়া | সহিহ মুসলিম ২২৩০ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| গণকের কথা বিশ্বাস করা | সুনানে আবু দাউদ ৩৯০৪ | সহিহ | আলবানী |
| গণকের "সত্য" কথার আসল উৎস | সহিহ মুসলিম ২২২৮ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| তাবিজ ও শিরকি ঝাড়ফুঁক | সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮৩ | সহিহ | আলবানী |
| উল্কা কারও জন্ম-মৃত্যুর জন্য পড়ে না | সহিহ মুসলিম ২২২৯ | সহিহ | ইমাম বুখারী/মুসলিম (সহিহ গ্রন্থ) |
| শিশুদের গলায় দোয়া লিখে ঝুলানো (আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)-এর কাজ) | সুনানে আবু দাউদ ৩৮৯৩ | দুর্বল | আলবানী ও যুবাইর আলী যাঈ: যঈফ |
| নাখলার ঘটনা তায়েফ থেকে ফেরার পথে | সীরাতু ইবনি হিশাম (ইবনু ইসহাক) | মুরসাল | সনদ নবীজি পর্যন্ত যুক্ত নয়; ঘটনার মূল অংশ সহিহ বুখারীতে আছে |
| আদমের আগে জিনদের রাজত্ব ও ফেরেশতাদের সাথে যুদ্ধ | তাফসীরে তাবারী (সাহাবী-তাবিঈর উক্তি) | প্রমাণিত নয় | মারফূ নয়; ইসরাঈলি উৎস |
| সুলাইমান (আ.)-এর আংটি ও সাখর শয়তানের সিংহাসন দখল | বিভিন্ন তাফসীর | ইসরাঈলিয়্যাত | ইবনু কাসীর (৩৮:৩৪) গ্রহণ করেননি |
| জিন তিন প্রকার: ডানাওয়ালা, সাপ-কুকুর, আর যারা থামে ও চলে | তাবারানী, হাকিম | সহিহ | আলবানী: সহিহ (সহিহুল জামি) |
| "যে তাবিজ ঝুলাল সে শিরক করল" | মুসনাদ আহমাদ | সহিহ | আলবানী: সহিহ (সিলসিলা সহিহাহ ৪৯২) |
সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের হাদিস উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে সহিহ। বাকি গ্রন্থের মান শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানীর তাহকীক অনুযায়ী; কোথাও অন্য মুহাদ্দিসের ভিন্নমত থাকলে হাদিসের পাতায় দেখানো আছে।
প্রশ্নোত্তর
১জিন কি সত্যিই আছে?
হ্যাঁ। কুরআনে বহু জায়গায় জিনের কথা আছে, পুরো একটি সূরার নাম সূরা আল-জিন। জিনে বিশ্বাস গায়েবের প্রতি ঈমানের অংশ; তা অস্বীকার করা কুরআন অস্বীকারের শামিল।
২জিন কী দিয়ে তৈরি?
ধোঁয়াহীন আগুনের শিখা থেকে (সূরা আর-রহমান ৫৫:১৫; সহিহ মুসলিম ২৯৯৬)। ফেরেশতা নূর থেকে, মানুষ মাটি থেকে।
৩ইবলিস কি ফেরেশতা ছিল?
না। কুরআন স্পষ্ট বলেছে, সে জিনদের একজন (সূরা আল-কাহফ ১৮:৫০), আর নিজেও বলেছে তাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে (৭:১২)।
৪জিনদের মধ্যে কি মুসলিম আছে?
হ্যাঁ। সূরা আল-জিনে তারা নিজেরাই বলেছে, "আমাদের মধ্যে কিছু মুসলিম, কিছু সীমালঙ্ঘনকারী" (৭২:১৪)। মদিনায় একদল জিন ইসলাম গ্রহণ করেছিল (সহিহ মুসলিম ২২৩৬)।
৫জিনেরা কী খায়?
নবীজি (ﷺ) জানিয়েছেন, আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করা পশুর হাড় তাদের খাবার, আর গোবর তাদের পশুর খাবার; তাই হাড় ও গোবর দিয়ে ইস্তিঞ্জা নিষেধ (সহিহ মুসলিম ৪৫০; সহিহ বুখারী ৩৮৬০)।
৬জিনেরা কি গায়েব জানে?
না। সুলাইমান (আ.) মারা যাওয়ার পরও তারা কাজ করে যাচ্ছিল, টের পায়নি (৩৪:১৪)। গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহর (৭২:২৬-২৭)।
৭জিন কি মানুষের শরীরে ঢুকতে পারে?
আহলুস সুন্নাহর অধিকাংশ আলেমের মতে পারে (দলিল: ২:২৭৫, ইবনু মাজাহ ৩৫৪৮)। তবে আজ যত ঘটনাকে "জিনে ধরা" বলা হয়, তার বেশির ভাগই মানসিক বা স্নায়ুর রোগ। চিকিৎসা ও সুন্নাহর রুকইয়াহ দুটোই নিন, আর জিনের কথায় কাউকে দোষ দেবেন না।
৮জিন থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ আমল কী?
সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগে তিন কুল (বুখারী ৫০১৭), ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি (বুখারী ২৩১১), রাতে সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত (বুখারী ৫০০৯), ঘরে সূরা আল-বাকারা পড়া (মুসলিম ৭৮০), আর ঘরে ঢোকা, খাওয়া, টয়লেট ও ঘর থেকে বের হওয়ার মাসনূন দোয়া।
৯মুমিন জিন কি জান্নাতে যাবে?
অধিকাংশ আলেমের মতে যাবে; সূরা আর-রহমানে জান্নাতের নিয়ামতের কথা জিন ও মানুষ দুজনকেই সম্বোধন করে বলা হয়েছে (৫৫:৪৬-৪৭, ৫৫:৫৬)। ইমাম আবু হানীফা থেকে বর্ণিত, তাদের প্রতিদান জাহান্নাম থেকে মুক্তি (৪৬:৩১)। আল্লাহই ভালো জানেন।
সূত্র
- আল-কুরআনুল কারীম
আরবি: Tanzil; বাংলা অর্থ: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া (QuranEnc) - সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ
আরবি মূল পাঠ; মান: আলবানী (সুনান গ্রন্থের জন্য) - ইবনু কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম
সূরা আল-আনআম ৬:১৩০, আল-আহকাফ ৪৬:২৯-৩২, সোয়াদ ৩৮:৩৪, আল-জিন - ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী
সহিহ বুখারী ২৩১১ (মুআল্লাক সনদ) ও ৪৯২১-এর ব্যাখ্যা - ইবনু তাইমিয়া, মাজমূউল ফাতাওয়া ২৪/২৭৬-২৭৭
জিনের মানুষের শরীরে প্রবেশ বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর অবস্থান - আবুল হাসান আল-আশআরী, মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন
আহলুস সুন্নাহর আকিদার বিবরণ - সীরাতু ইবনি হিশাম
নাখলার ঘটনার সময় (ইবনু ইসহাকের বর্ণনা) - আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহিহাহ ও যঈফাহ
তাবিজ ও জিন বিষয়ক বর্ণনার মান
সাইটের সব সূত্র: সূত্র তালিকা · সূত্র নীতি