إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا
শয়তান (ইবলিস): চিরশত্রুকে চেনা
সে কে, কেন আদমকে সিজদা করেনি, কী প্রতিজ্ঞা করেছিল, কীভাবে আজও মানুষকে ধরে, আর তার থেকে বাঁচার উপায় কী: সব কুরআনের আয়াত আর সহিহ হাদিস থেকে, সহজ বাংলায়।
এই পাতার প্রতিটি তথ্য কুরআনের আয়াত ও সহিহ/হাসান হাদিস থেকে। ইসরাঈলি বর্ণনা ও লোকমুখের গল্প দলিল হিসেবে নেওয়া হয়নি, শুধু "প্রচলিত ভুল" অংশে মানসহ দেখানো হয়েছে। আয়াতের বাংলা অর্থ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার অনুবাদ থেকে হুবহু; হাদিসের অনুবাদ Deenpedia-র নিজস্ব সহজ বাংলা। সব সূত্র: সূত্র তালিকা।
এক নজরে
- নাম
- ইবলিস; কুরআনে তাকে "আশ-শাইতান" (অবাধ্য, আল্লাহর রহমত থেকে দূরে) বলা হয়েছে
- জাতি
- জিন, ফেরেশতা নয় (সূরা আল-কাহফ ১৮:৫০)
- সৃষ্টি
- আগুন থেকে (সূরা আল-আরাফ ৭:১২, সূরা আর-রহমান ৫৫:১৫)
- প্রথম পাপ
- অহংকার করে আল্লাহর আদেশ অমান্য, আদম (আ.)-কে সিজদা না করা (সূরা আল-বাকারা ২:৩৪)
- অবকাশ
- কিয়ামতের নির্ধারিত দিন পর্যন্ত (সূরা আল-হিজর ১৫:৩৮)
- পরিণতি
- তাকে ও তার অনুসারীদের দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ হবে (সূরা সোয়াদ ৩৮:৮৫)
ঘটনাক্রম: সৃষ্টি থেকে শেষ পরিণতি
- ১আদমের দেহ দেখে
প্রাণ দেওয়ার আগে ইবলিস আদমের দেহের চারপাশে ঘুরে দেখল, বুঝল এ এমন সৃষ্টি যে নিজেকে পুরো সামলাতে পারবে না (সহিহ মুসলিম ২৬১১)।
- ২সিজদার আদেশ
আল্লাহ ফেরেশতাদের আদমকে সিজদা করতে বললেন; সেখানে উপস্থিত ইবলিসও আদেশের আওতায় ছিল (সূরা আল-আরাফ ৭:১২)। সবাই সিজদা করল, ইবলিস করল না (সূরা আল-বাকারা ২:৩৪)।
- ৩অহংকারের যুক্তি
"আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; আমাকে আগুন থেকে, তাকে মাটি থেকে বানিয়েছেন" (সূরা আল-আরাফ ৭:১২, সূরা সোয়াদ ৩৮:৭৬)।
- ৪বিতাড়ন ও লানত
আল্লাহ তাকে সেখান থেকে বের করে দিলেন, প্রতিদান দিবস পর্যন্ত তার উপর লানত (সূরা আল-হিজর ১৫:৩৪, সূরা আল-হিজর ১৫:৩৫)।
- ৫অবকাশ চাওয়া
সে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত সময় চাইল; আল্লাহ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অবকাশ দিলেন (সূরা আল-হিজর ১৫:৩৬-সূরা আল-হিজর ১৫:৩৮)।
- ৬প্রতিজ্ঞা
সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে থেকে এসে মানুষকে বিপথে নেবে, অল্প কয়েকজন ছাড়া (সূরা আল-আরাফ ৭:১৬, সূরা আল-আরাফ ৭:১৭, সূরা আল-ইসরা ১৭:৬২)।
- ৭আল্লাহর জবাব
আমার একনিষ্ঠ বান্দাদের উপর তোমার কোনো ক্ষমতা নেই (সূরা আল-হিজর ১৫:৪২, সূরা আল-ইসরা ১৭:৬৫)।
- ৮জান্নাতে ধোঁকা
কসম খেয়ে "শুভাকাঙ্ক্ষী" সেজে আদম ও তাঁর স্ত্রীকে নিষিদ্ধ গাছের দিকে টেনে নিল (সূরা আল-আরাফ ৭:২০, সূরা আল-আরাফ ৭:২১, সূরা ত্বা-হা ২০:১২০)।
- ৯দুই পথ
আদম ও হাওয়া ভুল স্বীকার করে তাওবা করলেন, আল্লাহ ক্ষমা করলেন (সূরা আল-আরাফ ৭:২৩, সূরা আল-বাকারা ২:৩৭); ইবলিস অহংকারে অটল রইল।
- ১০পৃথিবীতে শত্রুতা
মানুষ পৃথিবীতে নামল, শয়তান প্রকাশ্য শত্রু হয়ে সাথে রইল (সূরা আল-বাকারা ২:৩৬, সূরা আল-আরাফ ৭:২৭, সূরা ফাতির ৩৫:৬)।
- ১১কিয়ামতের দিন
নিজের অনুসারীদের সামনে সে দায় ঝেড়ে ফেলবে: "আমি শুধু ডেকেছিলাম, তোমরা সাড়া দিয়েছ" (সূরা ইবরাহীম ১৪:২২)।
- ১২শেষ ঠিকানা
সে ও তার অনুসারীরা জাহান্নামে (সূরা আল-হিজর ১৫:৪৩, সূরা আশ-শুআরা ২৬:৯৪, সূরা আশ-শুআরা ২৬:৯৫, সূরা সোয়াদ ৩৮:৮৫)।
ইবলিস কে? কী থেকে সৃষ্টি?
ইবলিস ছিল জিন জাতির একজন। কুরআন স্পষ্ট বলছে, সে "জিনদের একজন ছিল, তাই সে তার রবের আদেশ অমান্য করল":
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ ۗ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ ۚ بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلًا
আর স্মরণ করুন, আমরা যখন ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম, ‘আদমের প্রতি সাজদাহ কর’, তখন তারা সবাই সাজদাহ করল ইবলীস ছাড়া; সে ছিল জিনদের একজন, সে তার রবের আদেশ অমান্য করল। তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে, অথচ তারা তোমাদের শত্রু। যালেমদের এ বিনিময় কত নিকৃষ্ট!
জিনদের সৃষ্টি আগুন থেকে, আর ফেরেশতাদের সৃষ্টি নূর থেকে। ইবলিস নিজেও বলেছিল, "আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন" (সূরা আল-আরাফ ৭:১২)। আল্লাহ বলেন, তিনি জিনকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াহীন আগুনের শিখা থেকে (সূরা আর-রহমান ৫৫:১৫)। নবীজি (ﷺ) তিন সৃষ্টির উপাদান একসাথে বলেছেন:
خُلِقَتِ الْمَلاَئِكَةُ مِنْ نُورٍ وَخُلِقَ الْجَانُّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ
ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (আলো) থেকে, জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াহীন আগুনের শিখা থেকে, আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই জিনিস থেকে, যার বর্ণনা তোমাদের দেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ মাটি)।
"শয়তান" শব্দটি শুধু ইবলিসের নাম নয়; জিন বা মানুষ, যে-ই অবাধ্য হয়ে অন্যকে মন্দের দিকে ডাকে, তাকেও কুরআন শয়তান বলেছে: "মানুষ ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানরা" (সূরা আল-আনআম ৬:১১২, সূরা আন-নাস ১১৪:৬)। ইবলিস তাদের সর্দার, আর তার বংশধরও আছে (সূরা আল-কাহফ ১৮:৫০)।
ফেরেশতারা আল্লাহর অবাধ্য হন না, যা আদেশ করা হয় তা-ই করেন (সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬)। তাই যে আদেশ অমান্য করল, সে ফেরেশতা হতে পারে না। কেউ কেউ বলেন ইবলিস আগে ফেরেশতা ছিল; এ নিয়ে নিচে "প্রচলিত ভুল" অংশ দেখুন।
সিজদার আদেশ ও অহংকার
আল্লাহ মাটি থেকে আদমকে সৃষ্টি করলেন, তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিলেন, তারপর ফেরেশতাদের বললেন তাঁকে সিজদা করতে। এই সিজদা ছিল সম্মানের সিজদা, ইবাদতের নয়; আর সেটা ছিল আল্লাহর আদেশ পালন। সবাই সিজদা করল, শুধু ইবলিস ছাড়া:
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَىٰ وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ
আর স্মরণ করুন, যখন আমরা ফেরেশতাদের বললাম, আমাকে সিজদা কর, তখন ইবলিশ ছাড়া সকলেই সিজদা করল; সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল। আর সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল।
আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, যাকে আমি নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি অহংকার করলে, নাকি তুমি নিজেকে উঁচু মনে করো?
قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ ۖ أَسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنتَ مِنَ الْعَالِينَ
তিনি বললেন, 'হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু'হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সাজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন?'
ইবলিসের উত্তরেই তার রোগ ধরা পড়ে। সে আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের যুক্তি দাঁড় করাল, আর নিজের জন্মের উপাদান নিয়ে গর্ব করল:
قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ ۖ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ
সে বলল, 'আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা থেকে।’
এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম অহংকার, আর প্রথম "আমি ওর চেয়ে ভালো"। নবীজি (ﷺ) বলেছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে ঢুকবে না; আর অহংকার মানে সত্যকে অস্বীকার করা ও মানুষকে তুচ্ছ ভাবা (সহিহ মুসলিম ৯১)।
আজও ইবলিস এই সিজদার কথা ভুলতে পারেনি। মানুষ যখন সিজদা করে, তখন সে কাঁদে:
إِذَا قَرَأَ ابْنُ آدَمَ السَّجْدَةَ فَسَجَدَ اعْتَزَلَ الشَّيْطَانُ يَبْكِي يَقُولُ يَا وَيْلَهُ - وَفِي رِوَايَةِ أَبِي كُرَيْبٍ يَا وَيْلِي - أُمِرَ ابْنُ آدَمَ بِالسُّجُودِ فَسَجَدَ فَلَهُ الْجَنَّةُ وَأُمِرْتُ بِالسُّجُودِ فَأَبَيْتُ فَلِيَ النَّارُ
আদম সন্তান যখন সিজদার আয়াত পড়ে সিজদা করে, তখন শয়তান সরে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে: হায় আমার দুর্ভাগ্য! আদম সন্তানকে সিজদার আদেশ দেওয়া হলো, সে সিজদা করল, তাই তার জন্য জান্নাত। আর আমাকে সিজদার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, আমি অস্বীকার করলাম, তাই আমার জন্য জাহান্নাম।
বিতাড়ন, লানত ও অবকাশ
আল্লাহ তাকে সেখান থেকে বের হয়ে যেতে বললেন, কারণ সেখানে থেকে অহংকার করার কোনো অধিকার তার নেই:
قَالَ فَاهْبِطْ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَن تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ
তিনি বললেন, ‘তাহলে তুমি এখান থেকে নেমে যাও, এখানে থেকে অহংকার করবে, এটা হতে পারে না। সুতরাং তুমি বের হয়ে যাও, নিশ্চয় তুমি অধমদের অন্তর্ভুক্ত।’
অহংকারের কারণে সে হলো "রাজীম", অর্থাৎ বিতাড়িত, আর কিয়ামত পর্যন্ত তার উপর লানত (সূরা আল-হিজর ১৫:৩৪, সূরা আল-হিজর ১৫:৩৫)। কিন্তু তাওবা না করে সে চাইল সময়:
قَالَ رَبِّ فَأَنظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ
সে বলল, হে আমার রব! যেদিন তাদের পুনরুত্থান করা হবে সেদিন পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দিন।
قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ
তিনি বললেন, নিশ্চয় তুমি অবকাশপ্রাপ্তদের একজন,
إِلَىٰ يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ
সুনির্দিষ্ট সময় আসার দিন পর্যন্ত।
লক্ষ করুন, অবকাশ পাওয়া মানে সম্মান পাওয়া নয়। আল্লাহ পরীক্ষার জন্য তাকে সময় দিয়েছেন, যাতে বোঝা যায় কে আখিরাতে বিশ্বাস করে আর কে সন্দেহে থাকে (সূরা সাবা ৩৪:২১)।
মানুষকে বিপথে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা
নিজের ভুল স্বীকার না করে ইবলিস দোষ চাপাল আল্লাহর উপর, আর আদম সন্তানের বিরুদ্ধে প্রতিজ্ঞা করল:
قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ
সে বলল, ‘আপনি যে আমাকে পথভ্রষ্ট করলেন, সে কারণে অবশ্যই অবশ্যই আমি আপনার সরল পথে মানুষের জন্য বসে থাকব।’
ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ
‘তারপর অবশ্যই আমি তাদের কাছে আসব তাদের সামনে থেকে ও তাদের পিছন থেকে, ‘তাদের ডানদিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে এবং আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।’
অন্য জায়গায় সে বলেছে, আমি দুনিয়াকে তাদের চোখে সুন্দর করে দেখাব (সূরা আল-হিজর ১৫:৩৯), তাদের মিথ্যা আশা দেব, আল্লাহর সৃষ্টি বদলাতে উসকাব (সূরা আন-নিসা ৪:১১৯), আর অল্প কয়েকজন ছাড়া তাদের সবাইকে বশ করব (সূরা আল-ইসরা ১৭:৬২)। তবে সে নিজেই স্বীকার করেছে, আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদের সে বিপথে নিতে পারবে না:
إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ
তবে তাদের মধ্যে আপনার একান্ত বান্দাগণ ছাড়া।
আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিলেন, যারা তার পেছনে যাবে, তারাই তার সাথে জাহান্নামে যাবে; আর আল্লাহর বান্দাদের উপর তার কোনো ক্ষমতা চলবে না:
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ
বিভ্রান্তদের মধ্যে যে তোমার অনুসরণ করবে সে ছাড়া আমার বান্দাদের উপর তোমার কোনই ক্ষমতা থাকবে না;
তার আক্রমণের ভাষাও কুরআনে আছে: কণ্ঠ দিয়ে উসকানো, সওয়ার ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে চড়াও হওয়া, সম্পদ ও সন্তানে ভাগ বসানো, আর প্রতিশ্রুতি দেওয়া, যা প্রতারণা ছাড়া কিছু নয় (সূরা আল-ইসরা ১৭:৬৪)।
জান্নাতে আদম ও হাওয়াকে ধোঁকা
আল্লাহ আদম ও তাঁর স্ত্রীকে জান্নাতে থাকতে দিলেন, শুধু একটি গাছের কাছে যেতে নিষেধ করলেন, আর আগেই সতর্ক করলেন: এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু, যেন তোমাদের জান্নাত থেকে বের করে না দেয় (সূরা ত্বা-হা ২০:১১৭)। শয়তান কুমন্ত্রণা দিল, নিষেধের ভুল ব্যাখ্যা দিল:
فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِن سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَـٰذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ
তারপর তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল তা তাদের কাছে প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, ‘পাছে তোমরা উভয় ফিরিশ্তা হয়ে যাও কিংবা তোমরা স্থায়ীদের অন্তর্ভুক্ত হও, এ জন্যেই তোমাদের রব এ গাছ থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন।’
সে গাছটিকে "চিরস্থায়ী জীবনের গাছ" আর "অক্ষয় রাজত্ব" বলে লোভ দেখাল (সূরা ত্বা-হা ২০:১২০), আর কসম খেয়ে বলল, আমি তোমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী (সূরা আল-আরাফ ৭:২১)। এভাবে প্রতারণা করে তাঁদের নামিয়ে আনল:
فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ ۚ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِن وَرَقِ الْجَنَّةِ ۖ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَن تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُل لَّكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُّبِينٌ
অতঃপর সে তাদেরকে প্রবঞ্চনার দ্বারা অধঃপতিত করল। এরপর যখন তারা সে গাছের ফল খেল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগল। তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললেন, “আমি কি তোমাদেরকে এ গাছ থেকে নিষেধ করিনি এবং আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, নিশ্চয় শয়তান তোমাদের উভয়ের প্রকাশ্য শত্রু?’
কুরআনে কোথাও বলা নেই যে হাওয়া (আ.) আগে খেয়েছেন বা তিনি আদমকে প্ররোচিত করেছেন। কুরআন কুমন্ত্রণার কথা দুজনের ক্ষেত্রেই বলেছে (সূরা আল-আরাফ ৭:২০), আর এক জায়গায় শুধু আদমের কথা (সূরা ত্বা-হা ২০:১২০)। সাপ বা ময়ূরের পেটে লুকিয়ে শয়তানের জান্নাতে ঢোকার গল্প কুরআন বা সহিহ হাদিসে নেই।
এরপরই আসল পার্থক্য তৈরি হলো। ইবলিস ভুল করে যুক্তি দেখিয়েছিল, আল্লাহকে দোষ দিয়েছিল। আদম ও হাওয়া ভুল করে নিজেদের দোষ স্বীকার করলেন:
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
তারা বলল, ‘হে আমাদের রব! আমারা নিজেদের প্রতি যুলুম করছি। আর যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’
আল্লাহ তাঁদের তাওবা কবুল করলেন (সূরা আল-বাকারা ২:৩৭)। আর আদম সন্তানদের সতর্ক করলেন: শয়তান যেন তোমাদেরও সেভাবে ফিতনায় না ফেলে, যেভাবে তোমাদের বাবা-মাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল; সে ও তার দলবল তোমাদের দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখো না:
يَا بَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُم مِّنَ الْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا ۗ إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ ۗ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ
হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রলুব্ধ না করে- যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল, সে তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখানোর জন্য বিবস্ত্র করেছিল। নিশ্চয় সে নিজে এবং তার দল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। নিশ্চয় আমরা শয়তানকে তাদের অভিভাবক করেছি, যারা ঈমান আনে না।
আদম (আ.)-এর পুরো জীবনী: আদম (আ.) ›
শয়তানের কৌশল: কীভাবে সে মানুষকে ধরে
আল্লাহ বারবার বলেছেন, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু, তাকে শত্রু হিসেবেই নাও (সূরা ফাতির ৩৫:৬, সূরা আল-বাকারা ২:১৬৮)। শত্রুকে চিনতে হলে তার কৌশল জানা দরকার। কুরআন ও সহিহ হাদিসে তার যে কৌশলগুলো এসেছে:
| কৌশল | কী করে | দলিল |
|---|---|---|
| কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) | মনে গোপনে খারাপ চিন্তা ঢালে, তারপর আল্লাহর নাম শুনলে সরে যায় ("আল-খান্নাস") | সূরা আন-নাস ১১৪:৪, সূরা আন-নাস ১১৪:৫, সূরা আল-আরাফ ৭:২০ |
| ধাপে ধাপে টানা | এক লাফে বড় পাপে নয়, ছোট ছোট পদক্ষেপে নিয়ে যায় | সূরা আন-নূর ২৪:২১, সূরা আল-বাকারা ২:২০৮ |
| মন্দকে সুন্দর দেখানো | পাপকে আকর্ষণীয়, ভুলকে ঠিক মনে করায় | সূরা আল-আনআম ৬:৪৩, সূরা আল-হিজর ১৫:৩৯, সূরা আন-নাহল ১৬:৬৩ |
| অভাবের ভয় | দান করতে গেলে গরিব হয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়, অশ্লীলতার আদেশ দেয় | সূরা আল-বাকারা ২:২৬৮ |
| মিথ্যা আশা ও প্রতিশ্রুতি | "পরে তাওবা করবে", "এখনো সময় আছে" | সূরা আন-নিসা ৪:১২০, সূরা আল-ইসরা ১৭:৬৪ |
| ভুলিয়ে দেওয়া | আল্লাহর জিকির, দরকারি কাজ ও কথা ভুলিয়ে দেয় | সূরা আল-মুজাদালা ৫৮:১৯, সূরা আল-কাহফ ১৮:৬৩, সূরা ইউসুফ ১২:৪২ |
| শত্রুতা ও বিভেদ | কথার মাধ্যমে, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে মানুষে মানুষে শত্রুতা লাগায় | সূরা আল-ইসরা ১৭:৫৩, সূরা আল-মায়িদা ৫:৯১, সহিহ মুসলিম ২৮১২ |
| সংসার ভাঙা | তার কাছে সবচেয়ে "বড় কাজ" স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ | সহিহ মুসলিম ২৮১৩ |
| রাগ | রাগের মুহূর্তে মানুষকে নিয়ন্ত্রণহীন করে | সহিহ বুখারী ৩২৮২ |
| খারাপ ধারণা | নির্দোষ মানুষ সম্পর্কে মনে সন্দেহ ঢালে | সহিহ বুখারী ৩২৮১ |
| ঈমান নিয়ে সন্দেহ | "আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?" এমন প্রশ্ন মনে আনে | সহিহ বুখারী ৩২৭৬, সহিহ মুসলিম ১৩৪ |
| নামাজে মন ঘোরানো | নামাজে নানা কথা মনে করিয়ে রাকাত গুলিয়ে দেয় | সহিহ বুখারী ৬০৮, সহিহ মুসলিম ২২০৩ |
| অলসতা ও ঘুম | রাতে গিঁট দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে, ফজর ছাড়িয়ে দেয় | সহিহ বুখারী ১১৪২, সহিহ বুখারী ১১৪৪ |
| একা ও নির্জনতা | একা মানুষের কাছে, বেগানা নারী-পুরুষের নির্জনতায় সে তৃতীয়জন | জামে আত-তিরমিযী ২১৬৫ |
| অপচয় | অপচয়কারীদের কুরআন "শয়তানের ভাই" বলেছে | সূরা আল-ইসরা ১৭:২৭ |
| ভয় দেখানো | নিজের অনুসারীদের ভয় দেখিয়ে মুমিনদের দুর্বল করতে চায় | সূরা আলে ইমরান ৩:১৭৫ |
সে মানুষের এত কাছে থাকে যে নবীজি (ﷺ) বলেছেন, সে শরীরে রক্তের মতো চলাচল করে। আর তাই তিনি নিজেও মানুষের মনে ভুল ধারণা জন্মানোর সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন:
عَلَى رِسْلِكُمَا إِنَّهَا صَفِيَّةُ بِنْتُ حُيَىٍّ ". فَقَالاَ سُبْحَانَ اللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ " إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنَ الإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ، وَإِنِّي خَشِيتُ أَنْ يَقْذِفَ فِي قُلُوبِكُمَا سُوءًا
(নবীজি ইতিকাফে ছিলেন। রাতে সাফিয়্যা দেখা করতে এলেন, ফেরার সময় নবীজি তাঁকে এগিয়ে দিতে বের হলেন। দুজন আনসারি সাহাবি তাঁদের দেখে দ্রুত চলে যাচ্ছিলেন।) নবীজি বললেন: একটু থামো, এ হলো সাফিয়্যা বিনতু হুয়াই। তাঁরা বললেন: সুবহানাল্লাহ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন: শয়তান মানুষের শরীরে রক্ত চলাচলের মতো চলাচল করে। আমার ভয় হলো, সে তোমাদের মনে কোনো খারাপ ধারণা ঢেলে দেয় কি না।
তার আরেকটি কৌশল হলো ধাপে ধাপে টানা। আল্লাহ সতর্ক করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ وَمَن يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ ۚ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَىٰ مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَـٰكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। আর কেউ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে শয়তান তো অশ্লীলতা ও মন্দ কাজেরই নির্দেশ দেয়। আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউই কখনো পবিত্র হতে পারতে না, তবে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে পবিত্র করেন এবং আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
আর তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ কী, তা নবীজি (ﷺ) নিজে বলে দিয়েছেন:
ইবলিস তার সিংহাসন পানির উপর রাখে, তারপর তার বাহিনী (মানুষকে বিপথে নিতে) পাঠায়। তার কাছে সবচেয়ে মর্যাদার সে, যে সবচেয়ে বড় ফিতনা ঘটায়। একজন এসে বলে: আমি এই এই করেছি। ইবলিস বলে: তুমি কিছুই করোনি। তারপর আরেকজন এসে বলে: আমি তাকে ছাড়িনি, শেষে তার আর তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছি। তখন ইবলিস তাকে কাছে টেনে নেয় আর বলে: হ্যাঁ, তুমিই (আসল কাজ করেছ)।
কারীন: প্রত্যেকের সাথের জিন সঙ্গী
প্রত্যেক মানুষের সাথে জিনদের মধ্য থেকে একজন সঙ্গী লাগানো আছে, যাকে "কারীন" বলা হয়। সে মন্দের দিকে ডাকে। নবীজি (ﷺ)-এর সাথেও ছিল, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছেন:
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلاَّ وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ " . قَالُوا وَإِيَّاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ " وَإِيَّاىَ إِلاَّ أَنَّ اللَّهَ أَعَانَنِي عَلَيْهِ فَأَسْلَمَ فَلاَ يَأْمُرُنِي إِلاَّ بِخَيْرٍ
তোমাদের প্রত্যেকের সাথে জিনদের মধ্য থেকে একজন সঙ্গী (কারীন) নিযুক্ত আছে। সাহাবীরা বললেন: আপনার সাথেও, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন: আমার সাথেও; তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে সে আত্মসমর্পণ করেছে; এখন সে আমাকে শুধু ভালো কাজেরই কথা বলে।
যে আল্লাহর জিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য শয়তান সঙ্গী আরও শক্ত করে বসিয়ে দেওয়া হয়; সে তাকে সঠিক পথ থেকে সরিয়ে রাখে, অথচ লোকটা ভাবে সে ঠিক পথেই আছে:
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَـٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
আর যে রহমানের যিকর থেকে বিমুখ হয় আমরা তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সে হয় তার সহচর।
وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ
আর নিশ্চয় তারাই (শয়তানরা) মানুষদেরকে সৎপথ থেকে বাধা দেয়, অথচ মানুষরা (ভ্ৰষ্ট পথে থাকার পরও) মনে করে তারা (নিজেরা) হেদায়াতপ্ৰাপ্ত।
কিয়ামতের দিন এই সঙ্গী নিজের দায় অস্বীকার করবে: "হে আমাদের রব, আমি তাকে বিদ্রোহী বানাইনি, সে নিজেই ঘোর বিভ্রান্তিতে ছিল":
قَالَ قَرِينُهُ رَبَّنَا مَا أَطْغَيْتُهُ وَلَـٰكِن كَانَ فِي ضَلَالٍ بَعِيدٍ
তার সহচর শয়তান বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমি তাকে বিদ্রোহী করে তুলিনি। বস্তুত সেই ছিল ঘোর বিভ্রান্ত।
কারীনের কথা শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সে জোর করতে পারে না, শুধু ডাকে। আল্লাহর জিকির, আশ্রয় চাওয়া আর ভালো কাজে লেগে থাকলে তার ডাক দুর্বল হয়ে যায়।
হাদিসে বর্ণিত ঘটনা
১. নবীজির (ﷺ) জন্মের সময় খোঁচা থেকে মারইয়াম ও ঈসা (আ.) মুক্ত। প্রতিটি শিশু জন্মের সময় শয়তানের স্পর্শে কেঁদে ওঠে, শুধু এই দুজন ছাড়া; কারণ মারইয়ামের মা তাঁর ও তাঁর সন্তানের জন্য শয়তান থেকে আশ্রয় চেয়েছিলেন (সূরা আলে ইমরান ৩:৩৬):
مَا مِنْ بَنِي آدَمَ مَوْلُودٌ إِلاَّ يَمَسُّهُ الشَّيْطَانُ حِينَ يُولَدُ، فَيَسْتَهِلُّ صَارِخًا مِنْ مَسِّ الشَّيْطَانِ، غَيْرَ مَرْيَمَ وَابْنِهَا
আদম সন্তানের মধ্যে এমন কোনো শিশু নেই, যাকে জন্মের সময় শয়তান স্পর্শ করে না; শয়তানের স্পর্শে সে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। শুধু মারইয়াম ও তাঁর পুত্র (ঈসা) ছাড়া।
২. নামাজে নবীজির (ﷺ) চেহারায় আগুন। ইবলিস নিজে আগুনের শিখা নিয়ে নবীজির (ﷺ) দিকে এসেছিল:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নামাজে দাঁড়ালেন। আমরা শুনলাম তিনি বলছেন: "আমি তোমার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।" তারপর তিনবার বললেন: "আমি তোমাকে আল্লাহর লানত দিয়ে অভিশাপ দিই।" আর তিনি হাত বাড়ালেন, যেন কিছু ধরতে চাইছেন। নামাজ শেষে আমরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: আল্লাহর দুশমন ইবলিস আগুনের একটি শিখা নিয়ে এসেছিল আমার মুখে ছুড়ে মারতে। আমি তিনবার বললাম, আমি তোমার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। তারপর বললাম, আমি তোমাকে আল্লাহর পূর্ণ লানত দিয়ে অভিশাপ দিই। তবু সে পিছু হটল না, তিনবার। তারপর আমি তাকে ধরতে চাইলাম। আল্লাহর কসম, যদি আমাদের ভাই সুলাইমানের দোয়া না থাকত, তাহলে সে সকালে বাঁধা অবস্থায় থাকত আর মদীনার শিশুরা তাকে নিয়ে খেলা করত।
৩. এক দুষ্ট জিনকে ধরে ফেলা। আরেক রাতে এক ইফরীত নামাজ নষ্ট করতে এসেছিল:
গত রাতে এক দুষ্ট ইফরীত জিন হঠাৎ আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আমার নামাজ নষ্ট করার জন্য। আল্লাহ আমাকে তার উপর ক্ষমতা দিলেন। আমি চেয়েছিলাম তাকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখি, যাতে সকালে তোমরা সবাই তাকে দেখতে পাও। তখন আমার ভাই সুলাইমানের দোয়া মনে পড়ল: "হে আমার রব, আমাকে এমন রাজত্ব দাও, যা আমার পরে আর কারও জন্য শোভনীয় নয়।" (তাই তিনি তাকে অপমানিত করে ফিরিয়ে দিলেন।)
৪. বদরের দিন। কুরআন জানায়, বদরের দিন শয়তান মুশরিকদের কাজ সুন্দর করে দেখিয়ে বলেছিল, আজ তোমাদের কেউ হারাতে পারবে না, আমি তোমাদের পাশে আছি; কিন্তু দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে সে পিছু হটে বলল, আমি তোমাদের থেকে মুক্ত, আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখো না:
وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَّكُمْ ۖ فَلَمَّا تَرَاءَتِ الْفِئَتَانِ نَكَصَ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ وَقَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِّنكُمْ إِنِّي أَرَىٰ مَا لَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ ۚ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ
আর স্মরণ কর, যখন শয়তান তাদের জন্য তাদের কার্যাবলীকে শোভনীয় করেছিল এবং বলেছিল, ‘আজ মানুষের মধ্যে কেউই তোমাদের উপর বিজয় আর্জনকারী নেই, আর নিশ্চয় আমি তোমাদের পাশে অবস্থানকারী।’ অতঃপর দু দল যখন পরস্পর দৃশ্যমান হল তখন সে পিছনে সারে পড়ল এবং বলল, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের থেকে সম্পর্কমুক্ত, নিশ্চয় আমি এমন কিছু দেখেছি যা তোমরা দেখতে পাও না। নিশ্চয় আমি আল্লাহ্কে ভয় করি, ’আর আল্লাহ্ শাস্তি দানে কঠোর।
শয়তান সেদিন সুরাকা ইবনু মালিকের রূপ ধরে এসেছিল, এই বিবরণ ইবনু আব্বাস (রা.) প্রমুখ থেকে তাফসীরে (তাবারী, ইবনু কাসীর) বর্ণিত, নবীজি (ﷺ) থেকে সহিহ হাদিসে নয়। তাই আয়াতের মূল কথাটুকুই নিশ্চিত।
৫. উহুদের দিন ইবলিসের চিৎকার। তার এক চিৎকারে মুসলিমরা নিজেরাই নিজেদের সাথে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিল:
উহুদের দিন (প্রথমে) মুশরিকরা পরাজিত হলো। তখন ইবলিস চিৎকার করে বলল: হে আল্লাহর বান্দারা, তোমাদের পেছনের দলকে (আক্রমণ করো)! তখন সামনের দল ফিরে গিয়ে পেছনের দলের সাথেই লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ল। হুযাইফা (রা.) দেখলেন, তাঁর বাবা ইয়ামান (রা.) তাদের মাঝে। তিনি চিৎকার করে বললেন: হে আল্লাহর বান্দারা, আমার বাবা, আমার বাবা! কিন্তু আল্লাহর কসম, তারা থামল না, শেষে তাঁকে শহীদ করে ফেলল। হুযাইফা (রা.) বললেন: আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন।
৬. আবু হুরায়রা (রা.) ও যাকাতের খাদ্যচোর। তিন রাত ধরে আসা এক চোর শেষে আয়াতুল কুরসির ফজিলত শিখিয়ে গেল। নবীজি (ﷺ) বললেন, সে শয়তান ছিল।
(রমজানের যাকাতের খাবার পাহারা দেওয়ার সময় আবু হুরায়রা (রা.) পরপর তিন রাত এক চোরকে ধরেন। তৃতীয় রাতে সে বলল:) "যখন বিছানায় যাবে, আয়াতুল কুরসি পুরোটা পড়বে; তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য একজন পাহারাদার থাকবেন, আর সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান তোমার কাছে আসবে না।" … নবী (ﷺ) বললেন: "সে তোমাকে সত্য বলেছে, যদিও সে বড় মিথ্যাবাদী। তুমি কি জানো, তিন রাত ধরে কার সাথে কথা বলছ, হে আবু হুরায়রা?" তিনি বললেন: না। নবীজি বললেন: "সে শয়তান।"
বুখারী এই হাদিসটি সনদের শুরুর অংশ উল্লেখ না করে (মুআল্লাক হিসেবে) এনেছেন। ইবনু হাজার আসকালানী "তাগলীকুত তা‘লীক" ও "ফাতহুল বারী"-তে এর সংযুক্ত সনদ দেখিয়েছেন; হাদিসটি সহিহ হিসেবে গৃহীত।
৭. উমার (রা.)-কে দেখে শয়তানের পথ বদল।
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا لَقِيَكَ الشَّيْطَانُ قَطُّ سَالِكًا فَجًّا إِلاَّ سَلَكَ فَجًّا غَيْرَ فَجِّكَ
(উমার (রা.)-এর আওয়াজ শুনে কুরাইশের কিছু নারী তাড়াতাড়ি পর্দার আড়ালে চলে গেলেন। তখন) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! হে ইবনুল খাত্তাব, শয়তান যখনই তোমাকে কোনো পথে চলতে দেখে, সে তোমার পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে।
দৈনন্দিন জীবনে শয়তানের উপস্থিতি
নবীজি (ﷺ) আমাদের ছোট ছোট কাজেও শয়তান সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, যাতে সারাদিনের আমলই সুরক্ষা হয়ে যায়:
إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَأْكُلْ بِيَمِينِهِ وَإِذَا شَرِبَ فَلْيَشْرَبْ بِيَمِينِهِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ وَيَشْرَبُ بِشِمَالِهِ
তোমাদের কেউ যখন খায়, তখন যেন ডান হাতে খায়, আর যখন পান করে, তখন যেন ডান হাতে পান করে। কেননা শয়তান বাঁ হাতে খায় এবং বাঁ হাতে পান করে।
শয়তান তোমাদের প্রত্যেকের প্রতিটি কাজে হাজির থাকে, এমনকি খাওয়ার সময়ও। তাই কারও হাত থেকে লোকমা পড়ে গেলে সে যেন তাতে লেগে থাকা ময়লা সরিয়ে খেয়ে নেয়, শয়তানের জন্য ফেলে না রাখে। খাওয়া শেষ হলে যেন আঙুল চেটে নেয়, কারণ সে জানে না খাবারের কোন অংশে বরকত আছে।
التَّثَاؤُبُ مِنَ الشَّيْطَانِ، فَإِذَا تَثَاءَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدَّهُ مَا اسْتَطَاعَ، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا قَالَ هَا. ضَحِكَ الشَّيْطَانُ
হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে। তাই তোমাদের কারও হাই এলে যতটা পারে চেপে রাখবে। কেননা কেউ (হাই তুলে) "হা" শব্দ করলে শয়তান হাসে।
তোমাদের কেউ ঘুমালে শয়তান তার মাথার পেছনে তিনটি গিঁট দেয়। প্রতিটি গিঁটে সে এই বলে মন্ত্র দেয়: তোমার সামনে লম্বা রাত, ঘুমিয়ে থাকো। যদি সে জেগে উঠে আল্লাহর জিকির করে, একটি গিঁট খুলে যায়। যদি অজু করে, আরেকটি গিঁট খুলে যায়। যদি নামাজ পড়ে, শেষ গিঁটটিও খুলে যায়। তখন সে সকালে ওঠে চনমনে ও প্রফুল্ল মনে। নইলে সকালে ওঠে খারাপ মেজাজে, অলস হয়ে।
إِذَا اسْتَيْقَظَ ـ أُرَاهُ ـ أَحَدُكُمْ مِنْ مَنَامِهِ فَتَوَضَّأَ فَلْيَسْتَنْثِرْ ثَلاَثًا، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَبِيتُ عَلَى خَيْشُومِهِ
তোমাদের কেউ ঘুম থেকে জেগে অজু করলে যেন তিনবার নাকে পানি দিয়ে ঝেড়ে ফেলে। কেননা শয়তান তার নাকের ভেতরের অংশে রাত কাটায়।
الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلُمُ مِنَ الشَّيْطَانِ فَإِذَا حَلَمَ أَحَدُكُمْ حُلُمًا يَخَافُهُ فَلْيَبْصُقْ عَنْ يَسَارِهِ، وَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّهَا، فَإِنَّهَا لاَ تَضُرُّهُ
ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। তাই কেউ ভয়ের কোনো স্বপ্ন দেখলে যেন বাঁ দিকে হালকা থুথু ফেলে, আর তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। তাহলে তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।
لاَ يُشِيرُ أَحَدُكُمْ عَلَى أَخِيهِ بِالسِّلاَحِ، فَإِنَّهُ لاَ يَدْرِي لَعَلَّ الشَّيْطَانَ يَنْزِعُ فِي يَدِهِ، فَيَقَعُ فِي حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ
তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের দিকে অস্ত্র দিয়ে ইশারা না করে। কেননা সে জানে না, হয়তো শয়তান তার হাত থেকে সেটা ছুটিয়ে দেবে, আর সে (এ কারণে) জাহান্নামের গর্তে পড়বে।
কাতার সোজা করো, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াও, ফাঁক বন্ধ করো, ভাইদের হাতে নরম হও (কেউ কাতারে ঢুকতে চাইলে জায়গা দাও), আর শয়তানের জন্য ফাঁকা জায়গা রেখো না। যে কাতার মিলিয়ে দেয়, আল্লাহ তাকে মিলিয়ে দেন; আর যে কাতার ভাঙে, আল্লাহ তাকে বিচ্ছিন্ন করেন।
রমজানে কী হয়? রমজান এলে শয়তানদের শিকলে বাঁধা হয়:
إِذَا دَخَلَ شَهْرُ رَمَضَانَ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ، وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ
রমজান মাস এলে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, আর শয়তানদের শিকলে বেঁধে ফেলা হয়।
তবু রমজানে কেউ কেউ পাপ করে কেন? আলেমরা বলেছেন, পাপের উৎস শুধু শয়তান নয়; মানুষের নিজের নফস ও বছরের পর বছরের অভ্যাসও আছে। কেউ কেউ বলেছেন, বাঁধা হয় বড় অবাধ্য শয়তানদের। দুই ক্ষেত্রেই রমজানে ভালো কাজ সহজ হয়, এটা সবাই অনুভব করেন।
শয়তান থেকে বাঁচার উপায়: দোয়া ও আমল
শয়তানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। আল্লাহ নিজে শিখিয়েছেন:
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ۚ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
আর যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা আপনাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করছে, তাদেরকে শয়তান যখন কুমন্ত্রণা দেয় তখন তারা আল্লাহকে স্বরণ করে এবং সাথে সাথেই তাদের চোখ খুলে যায়।
কুরআন পড়ার আগে "আঊযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ার আদেশ, আর জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ঈমানদার ও আল্লাহর উপর ভরসাকারীদের উপর তার কোনো ক্ষমতা নেই:
فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
সুতরাং যখন আপনি কুরআন পাঠ করবেন তখন অভিশপ্ত শয়তান হতে আল্লাহ্র আশ্রয় প্রার্থনা করুন;
إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও তাদের রবেরই উপর নির্ভর করে তাদের উপর তার কোনো আধিপত্য নেই।
إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِينَ هُم بِهِ مُشْرِكُونَ
তার আধিপত্য তো শুধু তাদেরই উপর যারা তাকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহ্র সাথে শরীক করে।
নবীজিকে (ﷺ) এই দোয়াটিও শেখানো হয়েছে:
وَقُل رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ
আর বলুন, ‘হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি শয়তানের প্ররোচনা থেকে।’
وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ
‘আর হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার কাছে তাদের উপস্থিতি থেকে।’
কখন কী পড়বেন
| সময় | আমল | দলিল |
|---|---|---|
| সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগে | সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস | সহিহ মুসলিম ৮১৪ |
| ঘুমের আগে | আয়াতুল কুরসি (সূরা বাকারা ২৫৫) | সহিহ বুখারী ২৩১১ |
| দিনে যেকোনো সময় | "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু..." ১০০ বার | সহিহ বুখারী ৩২৯৩ |
| ঘরে | সূরা আল-বাকারা পড়া | সহিহ মুসলিম ৭৮০ |
| ঘর থেকে বের হতে | "বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" | সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৫ |
| ঘরে ঢুকতে ও খেতে | "বিসমিল্লাহ" | সহিহ মুসলিম ২০১৮ |
| টয়লেটে ঢোকার আগে | "আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস" | সহিহ বুখারী ১৪২ |
| স্বামী-স্ত্রীর মিলনের আগে | "বিসমিল্লাহ, আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইতান..." | সহিহ বুখারী ১৪১ |
| রাগ উঠলে | "আঊযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" | সহিহ বুখারী ৩২৮২ |
| নামাজে মন এলোমেলো হলে | আশ্রয় চাওয়া, বাঁ দিকে তিনবার হালকা থুথু | সহিহ মুসলিম ২২০৩ |
| ঈমান নিয়ে কুমন্ত্রণা এলে | আশ্রয় চাওয়া, চিন্তা থামানো, "আমানতু বিল্লাহ" | সহিহ বুখারী ৩২৭৬, সহিহ মুসলিম ১৩৪ |
| খারাপ স্বপ্ন দেখলে | বাঁ দিকে হালকা থুথু, আশ্রয় চাওয়া, কাউকে না বলা | সহিহ বুখারী ৩২৯২ |
| গাধার ডাক শুনলে | শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া | সহিহ বুখারী ৩৩০৩ |
| সন্ধ্যা নামলে | শিশুদের ঘরে রাখা, আল্লাহর নাম নিয়ে দরজা বন্ধ করা | সহিহ বুখারী ৩৩০৪ |
| হোঁচট খেলে বা কিছু খারাপ হলে | শয়তানকে গালি নয়, "বিসমিল্লাহ" | সুনানে আবু দাউদ ৪৯৮২ |
✦এই আমলগুলোর হাদিস পুরোটা পড়ুন
أَلَمْ تَرَ آيَاتٍ أُنْزِلَتِ اللَّيْلَةَ لَمْ يُرَ مِثْلُهُنَّ قَطُّ { قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ} وَ { قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ
তুমি কি দেখোনি, আজ রাতে এমন কিছু আয়াত নাযিল হয়েছে, যার মতো আর কখনো দেখা যায়নি? "কুল আঊযু বিরাব্বিল ফালাক" এবং "কুল আঊযু বিরাব্বিন নাস"।
যে ব্যক্তি দিনে একশো বার বলে: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর" (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, আর তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান), সে দশটি দাস মুক্ত করার সমান সওয়াব পায়, তার জন্য একশো নেকি লেখা হয়, একশো গুনাহ মুছে দেওয়া হয়, আর সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এটা তার জন্য শয়তান থেকে সুরক্ষা হয়ে থাকে। আর কেউ তার চেয়ে উত্তম কিছু নিয়ে আসতে পারবে না, তবে যে এর চেয়ে বেশি আমল করেছে সে ছাড়া।
لاَ تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ
তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থান বানিয়ো না (ঘরে নফল নামাজ ও তিলাওয়াত করো)। যে ঘরে সূরা আল-বাকারা পড়া হয়, সেখান থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।
কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় যদি বলে: "বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (আল্লাহর নামে, আল্লাহর উপর ভরসা করলাম, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই), তখন তাকে বলা হয়: তুমি পথ পেয়েছ, তোমার জন্য যথেষ্ট করা হয়েছে, তোমাকে রক্ষা করা হয়েছে। তখন শয়তানরা তার থেকে সরে যায়, আর এক শয়তান আরেকজনকে বলে: যাকে পথ দেখানো হয়েছে, যার জন্য যথেষ্ট করা হয়েছে ও যাকে রক্ষা করা হয়েছে, তার উপর তুমি কী করবে?
কেউ যখন ঘরে ঢোকে এবং ঢোকার সময় ও খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম নেয়, শয়তান (তার সঙ্গীদের) বলে: তোমাদের জন্য এখানে রাত কাটানোর জায়গাও নেই, রাতের খাবারও নেই। আর ঢোকার সময় আল্লাহর নাম না নিলে শয়তান বলে: তোমরা রাত কাটানোর জায়গা পেয়ে গেছ। আর খাওয়ার সময়ও আল্লাহর নাম না নিলে বলে: তোমরা রাতের জায়গা ও খাবার দুটোই পেয়ে গেছ।
لاَ تَقُلْ تَعِسَ الشَّيْطَانُ فَإِنَّكَ إِذَا قُلْتَ ذَلِكَ تَعَاظَمَ حَتَّى يَكُونَ مِثْلَ الْبَيْتِ وَيَقُولَ بِقُوَّتِي وَلَكِنْ قُلْ بِسْمِ اللَّهِ فَإِنَّكَ إِذَا قُلْتَ ذَلِكَ تَصَاغَرَ حَتَّى يَكُونَ مِثْلَ الذُّبَابِ
(এক সাহাবি নবীজির পেছনে সওয়ারিতে বসা ছিলেন। সওয়ারি হোঁচট খেলে তিনি বললেন: শয়তান ধ্বংস হোক।) নবীজি বললেন: "শয়তান ধ্বংস হোক" বোলো না। এটা বললে সে ফুলে উঠে ঘরের মতো বড় হয়ে যায়, আর বলে: আমার শক্তিতেই (এটা হয়েছে)। বরং বলো "বিসমিল্লাহ"। এটা বললে সে ছোট হতে হতে মাছির মতো হয়ে যায়।
لاَ يَزَالُ النَّاسُ يَتَسَاءَلُونَ حَتَّى يُقَالَ هَذَا خَلَقَ اللَّهُ الْخَلْقَ فَمَنْ خَلَقَ اللَّهَ فَمَنْ وَجَدَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَلْيَقُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ
মানুষ একে অপরকে প্রশ্ন করতেই থাকবে, শেষে বলা হবে: আল্লাহ তো সব সৃষ্টি করেছেন, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? কেউ এমন কিছু (মনে) টের পেলে সে যেন বলে: "আমানতু বিল্লাহ" (আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি)।
উসমান ইবনু আবিল আস (রা.) নবীজির কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, শয়তান আমার আর আমার নামাজ ও কিরাতের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সব গুলিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: ওটা এক শয়তান, তাকে খিনযাব বলা হয়। যখন তার উপস্থিতি টের পাবে, তখন আল্লাহর কাছে তার থেকে আশ্রয় চাইবে, আর বাঁ দিকে তিনবার হালকা থুথু ফেলবে। তিনি বলেন: আমি তা-ই করলাম, আল্লাহ তাকে আমার কাছ থেকে দূর করে দিলেন।
إِذَا سَمِعْتُمْ صِيَاحَ الدِّيَكَةِ فَاسْأَلُوا اللَّهَ مِنْ فَضْلِهِ، فَإِنَّهَا رَأَتْ مَلَكًا، وَإِذَا سَمِعْتُمْ نَهِيقَ الْحِمَارِ فَتَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ، فَإِنَّهُ رَأَى شَيْطَانًا
যখন মোরগের ডাক শোনো, তখন আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ চাও, কারণ সে একজন ফেরেশতা দেখেছে। আর যখন গাধার ডাক শোনো, তখন শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাও, কারণ সে একটি শয়তান দেখেছে।
যখন রাতের অন্ধকার নামে (বা সন্ধ্যা হয়), তখন তোমাদের শিশুদের (ঘরে) আটকে রাখো, কারণ তখন শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে। রাতের কিছু সময় পার হলে তাদের ছেড়ে দাও। আর দরজাগুলো বন্ধ করো এবং আল্লাহর নাম নাও, কারণ শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না।
দোয়ার পাশাপাশি যা সবচেয়ে জরুরি: একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত (ইখলাস) আর তাঁর উপর ভরসা (সূরা আল-হিজর ১৫:৪০, সূরা আন-নাহল ১৬:৯৯), জামাআতের সাথে থাকা (জামে আত-তিরমিযী ২১৬৫), পাপ হয়ে গেলে দেরি না করে তাওবা (সূরা আল-আরাফ ৭:২০১, সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৫), আর ভালো সঙ্গ। আদম (আ.) ভুলের পর তাওবা করে জিতেছিলেন, ইবলিস অহংকার করে হেরেছিল।
তার ক্ষমতার সীমা
শয়তানকে নিয়ে অতিরিক্ত ভয়ও ঠিক নয়। আল্লাহ বলেন, শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল:
الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ ۖ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا
যারা মুমিন তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, আর যারা কফের তারা তাগূতের পথে যুদ্ধ করে। কাজেই তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; শয়তানের কৌশল অবশ্যই দুর্বল।
সে কাউকে জোর করে পাপ করাতে পারে না; সে শুধু ডাকে, মানুষ নিজে সাড়া দেয়। কিয়ামতের দিন সে নিজেই এ কথা বলবে:
وَقَالَ الشَّيْطَانُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدتُّكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ ۖ وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُم مِّن سُلْطَانٍ إِلَّا أَن دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي ۖ فَلَا تَلُومُونِي وَلُومُوا أَنفُسَكُم ۖ مَّا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنتُم بِمُصْرِخِيَّ ۖ إِنِّي كَفَرْتُ بِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِن قَبْلُ ۗ إِنَّ الظَّالِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
আর যখন বিচারের কাজ সম্পন্ন হবে তখন শয়তান বলবে, ‘আল্লাহ্ তো তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি, আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছি। আমার তো তোমাদের উপর কোনো আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে ডাকছিলাম তাতে তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। কাজেই তোমরা আমাকে তিরস্কার করো না, তোমরা নিজেদেরই তিরস্কার কর। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। তোমরা যে আগে আমাকে আল্লাহ্র শরীক করেছিলে আমি তা অস্বীকার করছি। নিশ্চয় যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তাই পাপ করে "শয়তান করিয়েছে" বলে দায় এড়ানো যায় না। আবার ভালো কাজের তাওফিকও আল্লাহর কাছেই চাইতে হয়। নবীজি (ﷺ) শিখিয়েছেন, শয়তানকে গালি দিলে সে খুশি হয়ে ফুলে ওঠে, আর আল্লাহর নাম নিলে ছোট হয়ে যায় (সুনানে আবু দাউদ ৪৯৮২)।
শেষ পরিণতি
ইবলিসকে তার প্রতিজ্ঞার জবাবেই আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন তার শেষ ঠিকানা:
قَالَ فَالْحَقُّ وَالْحَقَّ أَقُولُ
তিনি বললেন, ‘তবে এটাই সত্য, আর আমি সত্যই বলি--
لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكَ وَمِمَّن تَبِعَكَ مِنْهُمْ أَجْمَعِينَ
'অবশ্যই তোমার দ্বারা ও তাদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে তাদের সবার দ্বারা আমি জাহান্নাম পূর্ণ করব।'
যারা তার অনুসরণ করেছে, তাদের সবার প্রতিশ্রুত স্থান জাহান্নাম (সূরা আল-হিজর ১৫:৪৩)। সেদিন "ইবলিসের বাহিনী" সবাইকে একসাথে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে (সূরা আশ-শুআরা ২৬:৯৪, সূরা আশ-শুআরা ২৬:৯৫)। আর অনুসারীদের সামনে তার শেষ কথা হবে দায় অস্বীকার, যেমন ওপরে সূরা ইবরাহীম ১৪:২২ আয়াতে এসেছে।
অন্যদিকে যারা তার ডাক উপেক্ষা করে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হয়ে থেকেছে, তাদের জন্য জান্নাত (সূরা আল-হিজর ১৫:৪৫, সূরা আল-হিজর ১৫:৪৬)।
প্রচলিত ভুল ও দুর্বল বর্ণনা
শয়তান নিয়ে ওয়াজ ও বইয়ে অনেক গল্প চলে। নিচের কথাগুলো মুহাদ্দিসদের মানদণ্ডে যাচাই করা:
ইবলিস ছিল ফেরেশতাদের শিক্ষক (মুআল্লিমুল মালাকূত), তার নাম ছিল "আযাযীল", আসমান-জমিনের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে সে সিজদা করেনি।
ইবলিস আসলে ফেরেশতা ছিল, পরে অবাধ্য হয়ে শয়তান হয়েছে।
শয়তান সাপের মুখে বা ময়ূরের সাহায্যে লুকিয়ে জান্নাতে ঢুকে আদম-হাওয়াকে ধোঁকা দিয়েছিল; হাওয়া (আ.) আগে খেয়ে আদমকে খাইয়েছিলেন।
"ইবলিস একবার নবীজির (ﷺ) কাছে এসে নিজের শত্রু-বন্ধুর লম্বা তালিকা দিয়েছিল" (ইবলিসের সাথে নবীজির দীর্ঘ কথোপকথন নামে প্রচলিত লেখা)।
"যার পীর নেই, তার পীর শয়তান।"
"ধীরস্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে।"
আবিদ বারসীসার কাহিনি: বহু বছর ইবাদত করা এক আবিদকে শয়তান ধাপে ধাপে ব্যভিচার, খুন আর শেষে শিরকে নিয়ে গেল।
বিপদ বা হোঁচটে "শয়তান দূর হ", "শয়তান ধ্বংস হোক" বলে গালি দিলে শয়তান দুর্বল হয়।
শয়তান ও জিনরা গায়েব (ভবিষ্যৎ) জানে, তাই গণক-তান্ত্রিকরা তাদের মাধ্যমে সত্য খবর দিতে পারে।
আরও যাচাই: প্রচলিত ভুল ও সঠিক তথ্য
সূত্র ও মান
এই পাতায় ৩৯টি হাদিস দলিল হিসেবে এসেছে; সবগুলো সহিহ বা হাসান। বুখারী ও মুসলিম ছাড়া বাকিগুলোর মান নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর তাহকীক অনুযায়ী। দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনাগুলো শুধু সতর্ক করার জন্য উল্লেখ করা হয়েছে।
| সূত্র | বিষয় | মান |
|---|---|---|
| সহিহ মুসলিম ২৬১১ | ইবলিস শুরু থেকেই আদম (আ.)-কে লক্ষ্য করছিল | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ২৯৯৬ | ফেরেশতারা নূর থেকে সৃষ্ট | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ৮১ | মানুষ সিজদা করলে শয়তান কাঁদে | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ২৮১২ | নামাজিদের মধ্যে বিভেদ লাগানো | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ২৮১৩ | পানির উপর ইবলিসের সিংহাসন | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩২৮২ | রাগ উঠলে শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩২৮১ | শয়তান মানুষের রক্তের মতো চলাচল করে | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩২৭৬ | মনে আল্লাহ সম্পর্কে কুমন্ত্রণা এলে | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ১৩৪ | ঈমান নিয়ে কুমন্ত্রণা এলে: "আমানতু বিল্লাহ" | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৬০৮ | আজান শুনে শয়তান পালায়, নামাজে ফিরে আসে | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ২২০৩ | নামাজে মন এলোমেলো করা শয়তান: খিনযাব | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ১১৪২ | ঘুমন্ত মানুষের মাথায় শয়তানের তিন গিঁট | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ১১৪৪ | সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে নামাজ ছেড়ে দিলে | সহিহ |
| জামে তিরমিযী ২১৬৫ | একা থাকলে শয়তান কাছে আসে | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ২৮১৪ | প্রত্যেকের সাথে একজন সঙ্গী জিন (কারীন) | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩৪৩১ | জন্মের সময় শয়তানের খোঁচা | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ৫৪২ | নামাজে নবীজির (ﷺ) চেহারায় আগুন ছুড়তে এসেছিল ইবলিস | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৪৬১ | নামাজ নষ্ট করতে আসা ইফরীত ও সুলাইমান (আ.)-এর দোয়া | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩২৯০ | উহুদের দিন ইবলিসের চিৎকার | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ২৩১১ | ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি: সকাল পর্যন্ত পাহারা | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩২৯৪ | উমার (রা.)-এর পথ ছেড়ে দেয় শয়তান | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ২০২০ | শয়তান বাঁ হাতে খায় | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ২০৩৩ | পড়ে যাওয়া লোকমা শয়তানের জন্য ফেলে রেখো না | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩২৮৯ | হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩২৯৫ | ঘুম থেকে উঠে নাক পরিষ্কার করা | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩২৯২ | খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৭০৭২ | ভাইয়ের দিকে অস্ত্র তাক করো না | সহিহ |
| সুনানে আবু দাউদ ৬৬৬ | কাতারে শয়তানের জন্য ফাঁক রেখো না | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ১৮৯৯ | রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দি করা হয় | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ৮১৪ | সূরা ফালাক ও নাস: তুলনাহীন আশ্রয় | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩২৯৩ | দিনে ১০০ বার: সারাদিন শয়তান থেকে সুরক্ষা | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ৭৮০ | যে ঘরে সূরা আল-বাকারা পড়া হয় | সহিহ |
| সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৫ | ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া | সহিহ |
| সহিহ মুসলিম ২০১৮ | ঘরে ঢোকা ও খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ১৪২ | টয়লেটে ঢোকার দোয়া | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ১৪১ | স্বামী-স্ত্রীর মিলনের আগের দোয়া | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩৩০৩ | গাধার ডাক শুনলে আশ্রয় চাওয়া | সহিহ |
| সহিহ বুখারী ৩৩০৪ | সন্ধ্যায় শিশুদের ঘরে রাখা, দরজা বন্ধ করা | সহিহ |
| সুনানে আবু দাউদ ৪৯৮২ | শয়তানকে গালি নয়, বিসমিল্লাহ বলো | সহিহ |
| জামে তিরমিযী ২০১২ | "তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে" | দুর্বল |
| (কোনো গ্রন্থে সহিহ সনদ নেই) | ইবলিস ও নবীজির (ﷺ) দীর্ঘ কথোপকথন | জাল |
| তাফসীরের বর্ণনা | ইবলিস ফেরেশতাদের শিক্ষক, "আযাযীল" নাম, সাপ-ময়ূরের গল্প, বারসীসা | প্রমাণহীন / ইসরাঈলি |
সাধারণ প্রশ্ন
১ইবলিস কি ফেরেশতা ছিল?
না। কুরআন বলছে "সে জিনদের একজন ছিল" (সূরা কাহফ ১৮:৫০), আর সে আগুনের সৃষ্টি, ফেরেশতারা নূরের সৃষ্টি (সহিহ মুসলিম ২৯৯৬)।
২শয়তান কেন আদমকে সিজদা করেনি?
অহংকারের কারণে। সে বলেছিল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, আমাকে আগুন থেকে আর তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন (সূরা আরাফ ৭:১২)।
৩কারীন কী?
প্রত্যেক মানুষের সাথে নিযুক্ত জিন সঙ্গী, যে মন্দের দিকে ডাকে (সহিহ মুসলিম ২৮১৪)।
৪শয়তান থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ আমল কী?
আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া (আঊযু বিল্লাহ), সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগে ইখলাস-ফালাক-নাস, ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি, আর প্রতিটি কাজে বিসমিল্লাহ।
৫রমজানে শয়তান বন্দি থাকলে পাপ হয় কেন?
হাদিসে রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দি করার কথা আছে (সহিহ বুখারী ১৮৯৯)। তবে পাপের উৎস মানুষের নিজের নফস ও অভ্যাসও; তাই পাপ পুরো বন্ধ হয় না, ভালো কাজ সহজ হয়।
আরও পড়ুন: আদম (আ.)-এর জীবনী · জিন · ফেরেশতা · নবীদের জীবনী