যে টাকায় আমরা খাই, পরি আর পরিবার চালাই, তা হালাল হওয়া দ্বীনের অংশ। হারাম উপার্জন দোয়া কবুল হওয়ার পথেও বাধা। এই ধাপে জানবেন সুদ, ঋণ, ব্যবসা আর চাকরিতে আল্লাহর সীমা কোথায়।
গল্প দিয়ে শুরু
আবু বকর (রা.) পেট থেকে যে খাবার বের করে দিলেন
আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর এক গোলাম ছিল, যে বাইরে কাজ করে উপার্জনের একটা অংশ তাঁকে এনে দিত। একদিন সে কিছু খাবার নিয়ে এল। আবু বকর (রা.) খেতে শুরু করলেন।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর গোলামটি জিজ্ঞেস করল: জানেন, এটা কোথা থেকে এসেছে? তারপর বলল, জাহেলি যুগে আমি এক লোককে গণক সেজে ভবিষ্যৎ বলে দিয়েছিলাম। আসলে আমি কিছুই জানতাম না, শুধু ধোঁকা দিয়েছিলাম। আজ সে লোকটির সাথে দেখা হলে সে আমাকে তার পারিশ্রমিক দিয়েছে। এই খাবার সেই টাকার।
আবু বকর (রা.) এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। মুখে হাত ঢুকিয়ে পেটে যা ছিল, সব বমি করে বের করে দিলেন।
সন্দেহের খাবার পেট থেকে বের করে দিলেন আবু বকর (রা.)সহিহ বুখারী ৩৮৪২ · সহিহ · পুরো হাদিস পড়ুন
আবু বকর (রা.)-এর একজন গোলাম ছিল, যে তাঁকে উপার্জনের একটি অংশ এনে দিত, আর আবু বকর (রা.) তা থেকে খেতেন। একদিন সে কিছু খাবার আনল, আবু বকর (রা.) তা থেকে খেলেন। তখন গোলাম বলল: জানেন, এটা কী? আবু বকর (রা.) বললেন: কী? সে বলল: জাহেলি যুগে আমি এক লোকের জন্য গণকগিরি করেছিলাম, অথচ আমি গণনা জানতাম না, শুধু তাকে ধোঁকা দিয়েছিলাম। আজ তার সাথে দেখা হলে সে আমাকে এর বিনিময় দিল। আপনি তা থেকেই খেয়েছেন। তখন আবু বকর (রা.) মুখে হাত ঢুকিয়ে পেটে যা ছিল সব বমি করে বের করে দিলেন।
খাবারটা তিনি না জেনে খেয়েছিলেন, তাই তাঁর কোনো দোষ ছিল না। তবু হারামের একটি লোকমাও তিনি নিজের শরীরে রাখতে চাননি। কারণ তিনি নবীজির (ﷺ) কাছে শুনেছিলেন, আল্লাহ পবিত্র, তিনি শুধু পবিত্র জিনিসই কবুল করেন (সহিহ মুসলিম ১০১৫)।
এই গল্প আপনাকে কী বলে
হালাল উপার্জন শুধু একটি নিয়ম নয়; আপনার দোয়া কবুল হওয়া, আপনার ইবাদতের স্বাদ, আপনার পরিবারের বরকত, সব এর সাথে জড়িত।
আজকের যুগে "গণকের টাকা" নানা রূপে আসে: সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, ভুয়া বিল, অফিসের সময় চুরি। নিজের আয় একবার যাচাই করুন।
আমাদের থেকে বমি করে বের করার মতো কঠোরতা কাউকে চাওয়া হয়নি। কিন্তু জানার পর হারাম থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তটা আজই নিন।
এই ধাপে সুদ, ঋণ, ব্যবসা আর চাকরির সততার বিধান দলিলসহ পাবেন।
এই ধাপ শেষে আপনি
সুদ, ঘুষ আর প্রতারণা চিনতে পারবেন
ঋণের লেনদেন সুন্নাহ অনুযায়ী করবেন
চাকরি ও ব্যবসায় আমানতদার থাকবেন
এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া। হাদিসের মান মুহাদ্দিসদের রায় অনুযায়ী। সব মূল গ্রন্থ ও মিলিয়ে দেখার লিংক এক জায়গায়: সূত্র তালিকা।
হালাল রিযিক কেন জরুরি
আল্লাহ সব মানুষকে হালাল ও পবিত্র জিনিস খেতে বলেছেন, আর শয়তানের পথে চলতে নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ পবিত্র, তিনি শুধু পবিত্র জিনিসই কবুল করেন। যার খাবার, পানীয় ও পোশাক হারাম, সে হাত তুলে দোয়া করলেও তা কবুল হওয়ার আশা কোথায়?
হারাম খেলে দোয়া কবুল হয় নাসহিহ মুসলিম ১০১৫ · সহিহ · পুরো হাদিস পড়ুন
হে লোকসকল, আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না। আল্লাহ মুমিনদের সেই আদেশই দিয়েছেন, যা রাসূলদের দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: "হে রাসূলগণ, পবিত্র জিনিস খাও আর নেক আমল করো।" আরও বলেছেন: "হে মুমিনগণ, আমি তোমাদের যে পবিত্র রিযিক দিয়েছি, তা থেকে খাও।" তারপর তিনি এক ব্যক্তির কথা বললেন, যে দীর্ঘ সফর করে, চুল উসকোখুসকো, শরীর ধুলোমাখা; আকাশের দিকে দুই হাত তুলে বলে: হে রব, হে রব! অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম, আর হারাম দিয়েই তার শরীর গড়ে উঠেছে। তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?
যারা সুদ খায় তারা তার ন্যায় দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, ‘ক্রয়-বিক্রয় তো সূদেরই মত।’ অথচ আল্লাহ্ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সূদকে হারাম করেছেন। অতএব, যার নিকট তার রবের পক্ষ হতে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, তাহলে অতীতে যা হয়েছে তা তারই এবং তার ব্যাপার আল্লাহ্র ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।
অতঃপর যদি তোমরা না কর তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও। আর যদি তোমরা তাওবা কর তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। তোমরা যুলুম করবে না এবং তোমাদের উপরও যুলুম করা হবে না।
ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবের "মুনাফা", সুদভিত্তিক ঋণ, ক্রেডিট কার্ডের সুদ, সবই এর মধ্যে পড়ে বলে বর্তমান যুগের বড় ফিকহ বোর্ডগুলো একমত হয়েছে। বিকল্প হিসেবে সুদমুক্ত হিসাব বা ইসলামি অর্থায়নের পদ্ধতি নির্ভরযোগ্য আলেমকে জিজ্ঞেস করে বেছে নিন।
ঋণ: লিখুন, সময়মতো শোধ করুন
ঋণের লেনদেন লিখে রাখুন, সাক্ষী রাখুন। কুরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াতটি এই বিষয়েই (সূরা আল-বাকারা ২:২৮২)।
শোধ করার নিয়ত নিয়ে ঋণ নিন। যে শোধ করার নিয়তে নেয়, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে শোধ করার ব্যবস্থা করেন (সহিহ বুখারী ২৩৮৭)।
সামর্থ্য থাকলে দেরি করবেন না। সামর্থ্যবানের টালবাহানা জুলুম।
ঋণগ্রহীতা বিপদে থাকলে সময় দিন, আর মাফ করে দিলে তা আরও উত্তম (সূরা আল-বাকারা ২:২৮০)।
مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ
সামর্থ্যবান ব্যক্তির (ঋণ শোধে) টালবাহানা করা জুলুম।
ক্রেতা-বিক্রেতা আলাদা না হওয়া পর্যন্ত (চুক্তি বাতিলের) সুযোগ রাখে। তারা যদি সত্য বলে আর (পণ্যের দোষ-ত্রুটি) স্পষ্ট করে, তাহলে তাদের কেনাবেচায় বরকত দেওয়া হয়; আর যদি গোপন করে ও মিথ্যা বলে, তাহলে কেনাবেচার বরকত মুছে ফেলা হয়।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি খাদ্যশস্যের স্তূপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ভেতরে হাত ঢোকালেন, আঙুলে ভেজা লাগল। তিনি বললেন: হে খাদ্যের মালিক, এটা কী? সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। তিনি বললেন: তাহলে ভেজা অংশটা উপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ দেখতে পায়? যে প্রতারণা করে, সে আমার দলের নয়।
নবীজির (ﷺ) জীবন থেকে: "সে তার মা-বাবার ঘরে বসে থাকল না কেন?"
নবীজি (ﷺ) এক ব্যক্তিকে যাকাত আদায়ের দায়িত্বে পাঠালেন। সে ফিরে এসে বলল, এগুলো সরকারি, আর এগুলো আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে। নবীজি (ﷺ) মিম্বরে দাঁড়িয়ে সবাইকে সতর্ক করলেন।
(নবীজি ﷺ যাকাত আদায়ের দায়িত্বে ইবনুল উতবিয়্যা নামের এক ব্যক্তিকে পাঠালেন। ফিরে এসে সে বলল: এগুলো আপনাদের, আর এগুলো আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে। নবীজি মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন) কর্মচারীর কী হলো! আমরা তাকে দায়িত্বে পাঠাই, আর সে এসে বলে: এটা আপনাদের, আর এটা আমার। সে তার বাবা-মায়ের ঘরে বসে থাকল না কেন, তখন দেখত তাকে উপহার দেওয়া হয় কিনা! … যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম, এমন যা-ই সে নেবে, কিয়ামতের দিন তা নিজের ঘাড়ে বহন করে নিয়ে আসবে।
আপনার জীবনে এর মানে: চাকরি বা পদের কারণে যে "উপহার" আসে, পদ না থাকলে যা আসত না, তা আসলে ঘুষের দরজা। অফিসের সুবিধা, কমিশন বা উপহার নেওয়ার আগে নিজেকে এই প্রশ্নটি করুন: আমি ঘরে বসে থাকলে কি এটা পেতাম?
কোন অবস্থায় কী করবেন
আগে থেকে ব্যাংকে সুদের টাকা জমা আছে। কী করব?
আসল টাকা আপনার, সুদের অংশ আপনার নয় (সূরা আল-বাকারা ২:২৭৯)। আলেমদের প্রসিদ্ধ মত হলো, সুদের অংশটুকু সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিবদের মধ্যে বা জনকল্যাণে দিয়ে নিজেকে মুক্ত করা। আর ভবিষ্যতে সুদমুক্ত হিসাবে টাকা রাখুন। জটিল অবস্থায় নির্ভরযোগ্য আলেমকে জিজ্ঞেস করুন (সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩)।
ঋণ শোধ করতে পারছি না। কী করব?
পাওনাদারের সাথে সৎভাবে কথা বলুন, সময় চেয়ে নিন, আর অল্প অল্প করে হলেও শোধ শুরু করুন। শোধ করার আন্তরিক নিয়ত থাকলে আল্লাহ সাহায্য করেন (সহিহ বুখারী ২৩৮৭)। ঋণ থেকে মুক্তির দোয়াও করুন। তবে নতুন সুদি ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করবেন না।
কাজের সুবাদে ক্লায়েন্ট বা সরবরাহকারী উপহার দেয়। নেওয়া যাবে?
যে উপহার শুধু আপনার পদের কারণে আসে, তা নেওয়া থেকে বিরত থাকুন বা প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে জমা দিন (সহিহ বুখারী ৭১৭৪)। কাজ পাইয়ে দেওয়া বা সুবিধার বিনিময়ে কিছু নেওয়া সরাসরি ঘুষ (সুনানে আবু দাউদ ৩৫৮০)।
অফিসের সময়ে ব্যক্তিগত কাজ করা কি সমস্যা?
চুক্তির সময়টুকু নিয়োগকর্তার আমানত (সূরা আল-আনফাল ৮:২৭)। নামাজের মতো প্রয়োজনীয় বিরতি ছাড়া ব্যক্তিগত কাজে সময় নষ্ট করা আমানতের খেয়ানত। নবীজি (ﷺ) কাজ সুন্দর ও নিখুঁতভাবে করতে বলেছেন (সহিহ মুসলিম ১৯৫৫)।
প্রচলিত ভুল
✗ "সবাই ঘুষ দেয়-নেয়, তাই এতে দোষ নেই।"
সবাই করলেও হারাম হালাল হয় না। ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা দুজনের উপরই লানত (সুনানে আবু দাউদ ৩৫৮০)।
✗ "ব্যবসায় একটু মিথ্যা না বললে চলে না।"
নবীজি (ﷺ) বলেছেন, সত্য বললে ও দোষ খুলে বললে ব্যবসায় বরকত হয়, আর মিথ্যা বললে ও দোষ লুকালে বরকত মুছে যায় (সহিহ বুখারী ২০৭৯)।
✗ "সুদের বা হারাম টাকা দান করলে সওয়াব পাওয়া যায়।"
আল্লাহ পবিত্র, তিনি শুধু পবিত্র জিনিসই কবুল করেন (সহিহ মুসলিম ১০১৫)। হারাম টাকা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হয়, কিন্তু তাতে দানের সওয়াবের আশা করা যায় না।
এই সপ্তাহের আমল
টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।
নিজেকে যাচাই করুন
সুদের ব্যাপারে নবীজির (ﷺ) লানত কার উপর?
সহিহ মুসলিম ১৫৯৮।
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ শোধে দেরি করা কী?
সামর্থ্যবানের টালবাহানা জুলুম (সহিহ বুখারী ২৪০০)।
পদের কারণে পাওয়া "উপহার" সম্পর্কে নবীজি (ﷺ) কী বলেছেন?