deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

দ্বীনের পথ · ধাপ ৯

অটল থাকা ও বিদআত থেকে বাঁচা: সঠিক পথে টিকে থাকা

দ্বীনের পথে শুরু করা যতটা জরুরি, টিকে থাকা তার চেয়ে কম নয়। এই শেষ ধাপে জানবেন কীভাবে অটল থাকবেন, ঈমান কমে গেলে কী করবেন, আর কীভাবে চিনবেন কোন আমল সুন্নাহ, আর কোনটি দ্বীনে নতুন যোগ করা।

গল্প দিয়ে শুরু

কা'ব ইবনু মালিক (রা.): সত্যের জন্য পঞ্চাশ দিনের নিঃসঙ্গতা

তাবুক অভিযানের ডাক এসেছিল প্রচণ্ড গরমে, ফসল পাকার মৌসুমে। কা'ব ইবনু মালিক (রা.) প্রস্তুতও ছিলেন, সামর্থ্যও ছিল। কিন্তু "কাল যাব, পরশু যাব" করতে করতে বাহিনী চলে গেল, তিনি পেছনে রয়ে গেলেন।

নবীজি (ﷺ) ফিরে এলে আশির বেশি লোক এসে কসম খেয়ে নানা অজুহাত দিল। নবীজি (ﷺ) তাদের বাইরের কথা মেনে নিলেন। কা'ব (রা.)-ও চাইলে সুন্দর একটা অজুহাত বানাতে পারতেন; তিনি নিজেই বলেছেন, কথার কৌশল তাঁর জানা ছিল। কিন্তু তিনি সত্য বলার সিদ্ধান্ত নিলেন: আমার কোনো অজুহাত নেই।

ফল হলো কঠিন। নবীজি (ﷺ) সবাইকে তাঁর সাথে কথা বলতে নিষেধ করলেন। পঞ্চাশ দিন। চেনা মানুষ সালামের জবাব দেয় না, চাচাতো ভাই মুখ ফিরিয়ে নেয়। এর মধ্যেই এল গাসসানের রাজার চিঠি: তোমার সঙ্গী তোমাকে অবহেলা করছে, আমাদের কাছে চলে এসো, সম্মান পাবে। কা'ব (রা.) চিঠিটা পড়ে বললেন, এটাও এক পরীক্ষা, আর সেটা চুলায় ছুড়ে দিলেন।

পঞ্চাশতম দিনের ভোরে, যখন প্রশস্ত পৃথিবীও তাঁর জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছে, পাহাড়ের চূড়া থেকে ভেসে এল চিৎকার: হে কা'ব ইবনু মালিক, সুসংবাদ নাও! আল্লাহ তাঁর তাওবা কবুল করে আয়াত নাজিল করেছেন।

কা'ব ইবনু মালিক (রা.): সত্য বলে পঞ্চাশ দিনের পরীক্ষাসহিহ বুখারী ৪৪১৮ · সহিহ · পুরো হাদিস পড়ুন

(তাবুক যুদ্ধে না গিয়ে পিছিয়ে থাকা কা'ব (রা.) বলেন) আমি সালাম দিলে তিনি রাগী মানুষের হাসি হাসলেন… আমি বললাম: আল্লাহর কসম, দুনিয়ার অন্য কারও সামনে বসলে আমি অজুহাত দেখিয়ে তার রাগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারতাম, কথার কৌশল আমার জানা। কিন্তু আমি জানি, আজ আপনাকে মিথ্যা বলে খুশি করলে আল্লাহ শিগগির আপনাকে আমার উপর নারাজ করে দেবেন। আর সত্য বললে আপনি আমার উপর রাগ করলেও… (পঞ্চাশ দিন সবাই তাঁর সাথে কথা বন্ধ রাখল। এর মধ্যে) গাসসানের রাজার চিঠি এল: শুনেছি তোমার সঙ্গী তোমার সাথে কঠোর আচরণ করছে; আল্লাহ তোমাকে অপমান আর অবহেলার জায়গায় রাখেননি, আমাদের কাছে চলে এসো, আমরা তোমাকে সম্মান দেব। আমি পড়ে বললাম: এটাও আরেক পরীক্ষা। তারপর চিঠিটা চুলায় ফেলে পুড়িয়ে দিলাম। … (পঞ্চাশতম দিনের ফজরের পর) আমার নিজের মন আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, প্রশস্ত পৃথিবীও সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তখন সালা পাহাড়ের উপর থেকে কারও চিৎকার শুনলাম: হে কা'ব ইবনু মালিক, সুসংবাদ নাও! আমি সিজদায় পড়ে গেলাম। … (মসজিদে গেলে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারা আনন্দে ঝলমল করছিল। তিনি বললেন: তোমার মা তোমাকে জন্ম দেওয়ার পর থেকে আজকের দিনটি তোমার জীবনের সবচেয়ে উত্তম দিন, সুসংবাদ নাও।

সহিহ বুখারী ৪৪১৮সহিহবর্ণনাকারী: কা'ব ইবনু মালিক (রা.)

وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّىٰ إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَن لَّا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

আর তিনি তাওবা কবুল করলেন অন্য তিনজনেরও, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না যমীন বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সেটা সংকুচিত হয়েছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিল আর তারা নিশ্চিত উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য তিনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই। তারপর তিনি তাদের তাওবাহ্ কবুল করলেন যাতে তারা তাওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ অধিক তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।

এই গল্প আপনাকে কী বলে

  • দ্বীনের পথে কঠিন সময় আসবে: মানুষ দূরে সরে যাবে, অন্য দিক থেকে লোভনীয় ডাক আসবে। অটল থাকা মানে সেই মুহূর্তে চিঠিটা চুলায় ফেলে দেওয়া।
  • কা'ব (রা.)-কে বাঁচিয়েছে সত্য। সহজ মিথ্যার চেয়ে কঠিন সত্য সবসময় উত্তম; আয়াতের শেষ কথাও তাই: সত্যবাদীদের সাথে থাকো।
  • তাঁর ভুলের শুরু ছিল "কাল করব" বলে দেরি করা। আজকের ভালো কাজ আজই করুন।
  • ভুল হলে হতাশ নয়, তাওবা আর ধৈর্য। কা'ব (রা.)-এর জীবনের সবচেয়ে উত্তম দিনটি এসেছিল তাঁর সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর পরে।

এই ধাপ শেষে আপনি

  1. ঈমান কমে গেলে কী করবেন, জানবেন
  2. ভালো সঙ্গ আর নির্ভরযোগ্য আলেম বেছে নিতে পারবেন
  3. নতুন আবিষ্কৃত আমল (বিদআত) চিনতে পারবেন

এই পাতার প্রতিটি আয়াত ও হাদিস মূল আরবি সোর্সের সাথে মিলিয়ে দেওয়া। হাদিসের মান মুহাদ্দিসদের রায় অনুযায়ী। সব মূল গ্রন্থ ও মিলিয়ে দেখার লিংক এক জায়গায়: সূত্র তালিকা।

ইস্তিকামাহ: ঈমান আনো, তারপর অটল থাকো

এক সাহাবি নবীজির (ﷺ) কাছে ইসলামের এমন একটি কথা চাইলেন, যার পর আর কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে না। উত্তর ছিল দুই শব্দের।

قُلْ لِي فِي الإِسْلاَمِ قَوْلاً لاَ أَسْأَلُ عَنْهُ أَحَدًا بَعْدَكَ - وَفِي حَدِيثِ أَبِي أُسَامَةَ غَيْرَكَ - قَالَ ‏ "‏ قُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ فَاسْتَقِمْ

আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, ইসলাম সম্পর্কে আমাকে এমন একটি কথা বলে দিন, যার ব্যাপারে আপনার পরে আর কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে না। তিনি বললেন: বলো, "আমি আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম", তারপর এর উপর অটল থাকো।

সহিহ মুসলিম ৩৮সহিহবর্ণনাকারী: সুফইয়ান ইবনু আবদুল্লাহ আস-সাকাফী (রা.)

যারা বলে "আমাদের রব আল্লাহ", তারপর অটল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতারা আসে আর বলে: ভয় কোরো না, দুঃখ কোরো না।

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ

নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’, তারপর অবিচলিত থাকে, তাদের কাছে নাযিল হয় ফেরেশতা (এ বলে) যে, 'তোমরা ভীত হয়ে না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও।

নবীজি (ﷺ) নিজে বেশি বেশি দোয়া করতেন, যেন আল্লাহ অন্তরকে দ্বীনের উপর স্থির রাখেন।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খুব বেশি বলতেন: "ইয়া মুকাল্লিবাল কুলূব, সাব্বিত কালবী আলা দীনিক" (হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর স্থির রাখো)। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনার উপর ও আপনার আনা দ্বীনের উপর ঈমান এনেছি; আপনি কি আমাদের ব্যাপারে ভয় করেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। অন্তরগুলো আল্লাহর আঙুলসমূহের দুই আঙুলের মাঝে; তিনি যেভাবে চান তা ঘুরিয়ে দেন।

জামে আত-তিরমিযী ২১৪০সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

‘হে আমাদের রব! সরল পথ দেয়ার পর আপনি আমাদের অন্তরসমূহকে সত্য লঙ্ঘনপ্রবণ করবেন না। আর আপনার কাছ থেকে আমাদেরকে করুণা দান করুন, নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।’

টিকে থাকার পাঁচটি উপায়

  1. ভালো সঙ্গ বেছে নিন। সঙ্গী আতর বিক্রেতার মতো হলে সুগন্ধ পাবেন, কামারের মতো হলে পোড়া দাগ (সহিহ বুখারী ২১০১)। যারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহকে ডাকে, তাদের সাথে থাকুন (সূরা আল-কাহফ ১৮:২৮)।
  2. ফরজকে কখনো ছাড়বেন না, বিশেষ করে নামাজ। ঈমান কমে গেলেও ফরজ ধরে রাখলে ফেরার পথ খোলা থাকে।
  3. অল্প হলেও নিয়মিত আমল রাখুন। দ্বীন সহজ; বাড়াবাড়ি করলে মানুষ টিকতে পারে না (সহিহ বুখারী ৩৯)।
  4. দ্বীন শিখতে থাকুন। জ্ঞানের পথে চললে আল্লাহ জান্নাতের পথ সহজ করেন (সহিহ মুসলিম ২৬৯৯)।
  5. ভুল হলে দ্রুত তাওবা করুন, আর হতাশ হবেন না; ধাপ ০-তে ফিরে যান: নিয়ত ও তাওবা।
"হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে!": ঈমানের ওঠানামাসহিহ মুসলিম ২৭৫০ · সহিহ · পুরো হাদিস পড়ুন

(হানযালা ও আবু বকর রাসূলুল্লাহর কাছে গেলেন। হানযালা বললেন) হে আল্লাহর রাসূল, আমরা যখন আপনার কাছে থাকি, আপনি জাহান্নাম ও জান্নাতের কথা মনে করিয়ে দেন, যেন আমরা নিজের চোখে দেখছি। কিন্তু আপনার কাছ থেকে বের হয়ে স্ত্রী-সন্তান আর কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ি, তখন অনেক কিছুই ভুলে যাই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম, আমার কাছে থাকা অবস্থায় আর যিকিরের সময় তোমরা যেমন থাকো, সব সময় যদি তেমন থাকতে, তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের বিছানায় ও পথে-ঘাটে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানযালা, কিছু সময় এমন, কিছু সময় তেমন। (তিনবার বললেন)

সহিহ মুসলিম ২৭৫০সহিহবর্ণনাকারী: হানযালা আল-উসাইদী (রা.)

জানা না থাকলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করুন

আল্লাহ বলেছেন, তোমরা না জানলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, দলিল-প্রমাণসহ।

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوحِي إِلَيْهِمْ ۚ فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

আর আপনার আগে আমরা ওহীসহ কেবল পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছিলাম, সুতরাং তোমরা জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর যদি না জান,

নবীজি (ﷺ) সতর্ক করেছেন, শেষ যামানায় মানুষ অজ্ঞদের নেতা বানাবে, যারা না জেনে ফতোয়া দেবে।

আল্লাহ জ্ঞানকে বান্দাদের (অন্তর) থেকে টেনে বের করে উঠিয়ে নেন না। বরং আলেমদের মৃত্যুর মাধ্যমে জ্ঞান উঠিয়ে নেন। শেষে যখন কোনো আলেম থাকবে না, মানুষ অজ্ঞদের নেতা বানাবে। তাদের জিজ্ঞেস করা হবে, আর তারা না জেনে ফতোয়া দেবে। ফলে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করবে।

সহিহ বুখারী ১০০সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.)

কাকে জিজ্ঞেস করবেন: এমন আলেমকে, যিনি কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে দলিল দিয়ে উত্তর দেন, যিনি নিজের মত চাপিয়ে না দিয়ে মতভেদ থাকলে তা স্পষ্ট বলেন, আর যার নিজের জীবনে সুন্নাহর ছাপ আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হলেই কেউ নির্ভরযোগ্য আলেম হয়ে যান না।

বিদআত কী, আর কেন বিপজ্জনক

বিদআত মানে দ্বীনে নতুন কোনো ইবাদত বা আমল যোগ করা, যা নবীজি (ﷺ) ও সাহাবিরা করেননি, আর তা দিয়ে সওয়াবের আশা করা। আল্লাহ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন (সূরা আল-মায়িদা ৫:৩), তাই এতে যোগ করার কিছু নেই।

مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ

যে আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নতুন যোগ করে যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।

সহিহ বুখারী ২৬৯৭সহিহবর্ণনাকারী: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)

مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ

যে এমন কোনো আমল করে, যার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।

সহিহ মুসলিম ১৭১৮সহিহবর্ণনাকারী: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)

أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ

(নবীজি ﷺ খুতবায় বলতেন) এরপর কথা হলো: সবচেয়ে উত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব, আর সবচেয়ে উত্তম পথ মুহাম্মাদের (ﷺ) পথ। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো (দ্বীনে) নতুন আবিষ্কৃত বিষয়, আর প্রতিটি বিদআত পথভ্রষ্টতা।

সহিহ মুসলিম ৮৬৭সহিহবর্ণনাকারী: জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.)

দুনিয়াবি নতুন জিনিস, যেমন মোবাইল, গাড়ি, মাইক বা অনলাইনে কুরআন পড়া, বিদআত নয়। বিদআত হলো ইবাদতে নতুন পদ্ধতি, সময়, সংখ্যা বা উপলক্ষ বানানো।

নতুন কোনো আমল চেনার চারটি প্রশ্ন

প্রশ্নউত্তর "না" হলে
নবীজি (ﷺ) কি এটা করেছেন, বলেছেন বা অনুমোদন দিয়েছেন?সাবধান হোন
করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সাহাবিরা কি এটা করেছেন?তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ভালো কাজের আগ্রহী ছিলেন; তাঁরা না করে থাকলে এর পেছনে কারণ আছে
এর দলিল কি সহিহ বা হাসান হাদিস?দুর্বল বা জাল বর্ণনার উপর আমল দাঁড়ায় না
নির্দিষ্ট দিন, সংখ্যা বা পদ্ধতি কি দলিল থেকে এসেছে?সাধারণ ভালো কাজকে নিজের বানানো সময় বা নিয়মে বাঁধলে তা বিদআতে পরিণত হয়

সমাজে প্রচলিত এমন অনেক আমল ও বিশ্বাস দলিলসহ যাচাই করে রাখা আছে: প্রচলিত ভুল ও সঠিক তথ্য। যেমন মৃত্যুর পর কুলখানি-চল্লিশার জমায়েত সাহাবিরা নিষিদ্ধ বিলাপের মধ্যে গণ্য করতেন (সুনানে ইবনু মাজাহ ১৬১২)।

فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ

তোমরা আমার সুন্নাহ এবং সঠিক পথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো, মাড়ির দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড়ে ধরো। আর (দ্বীনে) নতুন আবিষ্কৃত বিষয় থেকে সাবধান থাকো, কারণ প্রতিটি নতুন আবিষ্কৃত বিষয় বিদআত, আর প্রতিটি বিদআত পথভ্রষ্টতা।

সুনানে আবু দাউদ ৪৬০৭সহিহবর্ণনাকারী: ইরবায ইবনু সারিয়া (রা.)

নবীজির (ﷺ) জীবন থেকে: যারা নবীজির চেয়েও বেশি ইবাদত করতে চেয়েছিলেন

তিনজন সাহাবি নবীজির (ﷺ) ইবাদতের খবর শুনে তা কম মনে করলেন, আর প্রতিজ্ঞা করলেন: একজন সারা রাত নামাজ পড়বেন, একজন সারা বছর রোজা রাখবেন, একজন বিয়েই করবেন না। নবীজি (ﷺ) শুনে কী বললেন, দেখুন।

তিন সাহাবির বাড়াবাড়ি ও নবীজির (ﷺ) জবাবসহিহ বুখারী ৫০৬৩ · সহিহ · পুরো হাদিস পড়ুন

তিনজন লোক নবী (ﷺ)-এর স্ত্রীদের ঘরে এসে তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। জানানোর পর তারা যেন তা কম মনে করলেন। তারা বললেন: নবী (ﷺ)-এর সাথে আমাদের তুলনা কোথায়! তাঁর আগের-পরের সব গুনাহ তো মাফ করে দেওয়া হয়েছে। একজন বললেন: আমি সারা রাত নামাজ পড়ব, কখনো ঘুমাব না। আরেকজন বললেন: আমি সারা বছর রোজা রাখব, কখনো বাদ দেব না। আরেকজন বললেন: আমি নারীদের থেকে দূরে থাকব, কখনো বিয়ে করব না। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এসে বললেন: তোমরাই কি এই এই কথা বলেছ? শোনো, আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, তাঁর ব্যাপারে বেশি সতর্ক। তবু আমি রোজা রাখি, আবার বাদও দিই; নামাজ পড়ি, আবার ঘুমাই; আর বিয়েও করি। যে আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলের নয়।

সহিহ বুখারী ৫০৬৩সহিহবর্ণনাকারী: আনাস ইবনু মালিক (রা.)

আপনার জীবনে এর মানে: সুন্নাহর বাইরে যাওয়া শুধু কম করায় নয়, নিজের মতো বাড়াবাড়িতেও হয়। নিয়ত ভালো হলেও আমলটি হতে হবে নবীজির (ﷺ) পদ্ধতিতে। দ্বীনে নতুন এসে উৎসাহে নিজের উপর অসাধ্য বোঝা চাপাবেন না; সুন্নাহর মাঝামাঝি পথই নিরাপদ পথ।

কোন অবস্থায় কী করবেন

আগের মতো ঈমানি অনুভূতি পাচ্ছি না। আমি কি মুনাফিক হয়ে গেছি?

এই ভয় পাওয়াটাই ঈমানের লক্ষণ। সাহাবি হানযালা (রা.)-ও একই ভয় পেয়েছিলেন, আর নবীজি (ﷺ) বলেছিলেন: কিছু সময় এমন, কিছু সময় তেমন (সহিহ মুসলিম ২৭৫০)। ফরজগুলো ধরে রাখুন, যিকির আর কুরআন বাড়ান, ভালো সঙ্গে থাকুন, আর "ইয়া মুকাল্লিবাল কুলূব" দোয়াটি করুন (জামে আত-তিরমিযী ২১৪০)।

পরিবারে বা এলাকায় প্রচলিত কোনো আমল বিদআত মনে হচ্ছে। কী করব?

আগে নিজে নিশ্চিত হোন: নির্ভরযোগ্য আলেমকে দলিলসহ জিজ্ঞেস করুন, বা আমাদের প্রচলিত ভুল পাতায় দেখুন। তারপর নিজে সেটা থেকে বিরত থাকুন, আর অন্যদের নরমভাবে, হিকমতের সাথে বলুন (সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫)। ঝগড়া বা অপমান করে মানুষকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দেবেন না (সহিহ বুখারী ৬৯)।

বিভিন্ন আলেমের বিভিন্ন মত দেখে বিভ্রান্ত হচ্ছি। কোনটা মানব?

যেসব বিষয়ে সহিহ দলিল স্পষ্ট, সেখানে দলিল মানুন। যেখানে সহিহ দলিলের ভিত্তিতে আলেমদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য মতভেদ আছে, সেখানে আপনার আস্থাভাজন একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের মত মানুন, আর অন্য মতের অনুসারীদের প্রতি কঠোর হবেন না। মতভেদ হলে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরতে বলা হয়েছে (সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)।

খারাপ বন্ধুদের ছাড়তে পারছি না। কী করব?

ধীরে ধীরে সময় কমান, আর ভালো মানুষের সাথে সময় বাড়ান: মসজিদ, জ্ঞানের মজলিস বা দ্বীনি বন্ধু। মানুষ তার বন্ধুর পথেই চলে, তাই বন্ধু বাছাইয়ে সতর্ক থাকুন (সুনানে আবু দাউদ ৪৮৩৩)। পুরোনো বন্ধুদের জন্য দোয়া করুন, আর সুযোগ পেলে সুন্দরভাবে দাওয়াত দিন।

প্রচলিত ভুল

✗ "নিয়ত ভালো থাকলে যেকোনো ভালো কাজই ইবাদত, পদ্ধতি নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।"

আমল কবুলের দুটি শর্ত: নিয়ত শুধু আল্লাহর জন্য হওয়া (সহিহ বুখারী ১), আর আমলটি নবীজির (ﷺ) পদ্ধতিতে হওয়া (সহিহ মুসলিম ১৭১৮)। তিন সাহাবির নিয়তও ভালো ছিল, তবু নবীজি (ﷺ) তাঁদের থামিয়েছেন (সহিহ বুখারী ৫০৬৩)।

✗ "উমার (রা.) নিজেই বলেছেন বিদআত ভালো, তাই নতুন আমল বানানো যায়।"

উমার (রা.) রমজানে সবাইকে এক ইমামের পেছনে তারাবিহতে একত্র করে বলেছিলেন, "এটা কত সুন্দর নতুন ব্যবস্থা" (সহিহ বুখারী ২০১০)। অথচ জামাতে তারাবিহ নবীজি (ﷺ) নিজেই কয়েক রাত পড়িয়েছিলেন, ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে ছেড়েছিলেন (সহিহ বুখারী ২০১২)। তাই এটা শুধু শাব্দিক অর্থে "নতুন", দ্বীনে নতুন আমল নয়। নবীজি (ﷺ) স্পষ্ট বলেছেন, প্রতিটি বিদআত পথভ্রষ্টতা (সহিহ মুসলিম ৮৬৭)।

✗ "আলেমদের জিজ্ঞেস করা মানে অন্ধ অনুসরণ।"

না জানলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করা আল্লাহর আদেশ, আর তা দলিল-প্রমাণসহ (সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩, সূরা আন-নাহল ১৬:৪৪)। অন্ধ অনুসরণ হলো দলিলের বিরুদ্ধে কারও কথা মানা; দলিল চেয়ে নেওয়া আর বুঝে মানা তার উল্টো।

এই সপ্তাহের আমল

টিক দিলে তা শুধু আপনার ফোনেই থাকবে।

নিজেকে যাচাই করুন

সাহাবি সুফইয়ান (রা.)-কে নবীজি (ﷺ) কোন দুই শব্দের উপদেশ দিয়েছিলেন?

বলো, আমি আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম, তারপর অটল থাকো (সহিহ মুসলিম ৩৮)।

নিচের কোনটি বিদআত?

দুনিয়াবি নতুন মাধ্যম বিদআত নয়; ইবাদতে নতুন পদ্ধতি বা উপলক্ষ বানানো বিদআত (সহিহ মুসলিম ১৭১৮)।

যারা সারা রাত নামাজ, সারা বছর রোজা আর বিয়ে না করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, নবীজি (ﷺ) তাঁদের কী বললেন?

সহিহ বুখারী ৫০৬৩।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/poth/otol-thaka/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার