أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ
নির্যাতনের দিনগুলো: বুকে পাথর, মুখে "আহাদ, আহাদ"
প্রকাশ্য দাওয়াতের পর কুরাইশ বুঝল, কথা দিয়ে এই আলো থামানো যাবে না। তারা হাত তুলল, সবচেয়ে বেশি তাদের উপর, যাদের রক্ষা করার কেউ ছিল না। তবু একজনও ঈমান ছাড়েননি।
সীরাত · মক্কী যুগ৬১৩ - ৬১৯ খ্রি. · প্রকাশ্য দাওয়াতের পর
- কখন
- প্রকাশ্য দাওয়াতের পর থেকে হিজরত পর্যন্ত, সবচেয়ে কঠিন নবুয়তের ৪র্থ থেকে ১০ম বছর
- কোথায়
- মক্কা: কাবার চত্বর, মরুভূমির রোদ, মক্কার পাহাড়ি পথ
- কারা
- বিলাল, আম্মার ও তাঁর মা-বাবা সুমাইয়া ও ইয়াসির, খাব্বাব (রা.), আর নবীজি (ﷺ) নিজে
- এই গল্পে
- দুর্বল মুসলিমদের নির্যাতন, নবীজির (ﷺ) উপর আক্রমণ আর তাঁর সান্ত্বনা
কেন পড়বেন: আমরা অনেক সময় ভাবি, দ্বীন মানলে জীবন সহজ হয়ে যাওয়া উচিত। এই গল্প দেখায়, দুনিয়ার সেরা মানুষেরা ঈমানের জন্য কী সহ্য করেছেন, আর কেন নবীজি (ﷺ) তাঁদের বলেছিলেন: তোমরা তাড়াহুড়ো করছ।
গল্প
বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।
- ১
প্রকাশ্য দাওয়াতের পর
যে সাতজন প্রকাশ্যে বললেন
প্রকাশ্য দাওয়াতের পর মুসলিমদের দুই ভাগ হয়ে গেল: যাঁদের পেছনে শক্তিশালী গোত্র আছে, আর যাঁদের কেউ নেই। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন:
সবার আগে যারা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কথা জানিয়েছিলেন, তাঁরা সাতজন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ), আবু বকর, আম্মার, তাঁর মা সুমাইয়া, সুহাইব, বিলাল ও মিকদাদ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আল্লাহ তাঁর চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে রক্ষা করলেন, আর আবু বকরকে তাঁর গোত্রের মাধ্যমে। বাকিদের মুশরিকরা ধরে লোহার বর্ম পরিয়ে রোদে ফেলে রাখত। ... কিন্তু বিলাল আল্লাহর পথে নিজের কষ্টকে তুচ্ছ মনে করলেন। তারা তাঁকে ধরে বাচ্চাদের হাতে তুলে দিল, তারা তাঁকে মক্কার পাহাড়ি পথে টেনে বেড়াত, আর তিনি বলতে থাকতেন: আহাদ, আহাদ (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)।
নবীজি (ﷺ) আর আবু বকর (রা.) গোত্রের আশ্রয়ে থাকায় কুরাইশ তাঁদের সরাসরি মারতে সাহস পেত না। কিন্তু দাস আর গরিব মুসলিমদের উপর নেমে এল নির্মম শাস্তি।
সূত্রসুনানে ইবনু মাজাহ ১৫০ হাসান
নির্যাতনের প্রথম লক্ষ্য হয় দুর্বলরা। তাই দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো ঈমানের দায়িত্ব।
- ২
নির্যাতনের দিনগুলো
মরুভূমির রোদে বিলাল
বিলাল (রা.) ছিলেন উমাইয়া ইবনু খালাফের হাবশি দাস। সীরাতের বর্ণনায় আছে, দুপুরের প্রচণ্ড রোদে উমাইয়া তাঁকে মক্কার উত্তপ্ত বালুতে শুইয়ে বুকে বিরাট পাথর চাপা দিত আর বলত: মুহাম্মাদকে অস্বীকার কর, নইলে এভাবেই মরবি। বিলাল (রা.) শুধু বলতেন: আহাদ, আহাদ। আল্লাহ এক, আল্লাহ এক।
আবু বকর (রা.) পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এ দৃশ্য দেখে নিজের টাকায় বিলালকে কিনে মুক্ত করে দিলেন। এভাবে তিনি আরও কয়েকজন নির্যাতিত দাস-দাসীকে মুক্ত করেছিলেন। পরে উমর (রা.) এর কথা বলতেন:
كَانَ عُمَرُ يَقُولُ أَبُو بَكْرٍ سَيِّدُنَا، وَأَعْتَقَ سَيِّدَنَا. يَعْنِي بِلاَلاً
উমার (রা.) বলতেন: আবু বকর আমাদের নেতা, আর তিনি আমাদের নেতাকে মুক্ত করেছেন। অর্থাৎ বিলালকে।
সূত্রসুনানে ইবনু মাজাহ ১৫০ হাসানইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: উমাইয়ার নির্যাতন ও আবু বকরের (রা.) দাস মুক্ত করা ঐতিহাসিক বর্ণনাসহিহ বুখারী ৩৭৫৪ সহিহ
যে দাসকে মক্কা মানুষ মনে করত না, তাঁকেই উমর (রা.) বলতেন "আমাদের নেতা"। ইসলাম মানুষের মর্যাদা মাপে ঈমান দিয়ে।
- ৩
নির্যাতনের দিনগুলো
ইয়াসির পরিবার: "ধৈর্য ধরো, জান্নাত তোমাদের ঠিকানা"
আম্মার ইবনু ইয়াসির (রা.), তাঁর বাবা ইয়াসির আর মা সুমাইয়া (রা.), পুরো পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বনু মাখযুম তাঁদের মক্কার রোদে নিয়ে শাস্তি দিত। নবীজি (ﷺ) পাশ দিয়ে যেতেন, কিন্তু তাঁদের মুক্ত করার শক্তি তখন তাঁর ছিল না। তিনি বলতেন:
ধৈর্য ধরো, হে ইয়াসির পরিবার, তোমাদের প্রতিশ্রুত ঠিকানা জান্নাত।
সীরাতের বর্ণনায় আছে, আবু জাহল সুমাইয়াকে (রা.) বর্শা মেরে হত্যা করে। তিনিই ইসলামের প্রথম শহীদ। ইয়াসিরও নির্যাতনে মারা যান।
এক সময় অসহ্য শাস্তির মুখে আম্মার (রা.) মুখে তাদের কথামতো কিছু বলে ফেলেন, আর কাঁদতে কাঁদতে নবীজির (ﷺ) কাছে আসেন। তাফসীরের বর্ণনায় আছে, তখন এই আয়াত নাজিল হয়, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, যার অন্তর ঈমানে অটল, জোর করে কিছু বলানো হলে সে দায়ী নয়:
مَن كَفَرَ بِاللَّهِ مِن بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَـٰكِن مَّن شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
কেউ তার ঈমান আনার পর আল্লাহ্র সাথে কুফরী করলে এবং কুফরীর জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আপতিত হবে আল্লাহ্র গযব এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরীর জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচলিত।
সূত্র"صبرا آل ياسر فإن موعدكم الجنة": মুস্তাদরাকে হাকিম; আলবানী: হাসান সহিহ (ফিকহুস সীরাহর তাখরীজ) হাসানইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা: সুমাইয়া (রা.), ইসলামের প্রথম শহীদ ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা আন-নাহল ১৬:১০৬ কুরআনইবনে কাসীর, তাফসীর: সূরা নাহল ১০৬ (আম্মারের ঘটনা) ঐতিহাসিক বর্ণনা
নবীজি (ﷺ) তাঁদের দুনিয়ার মুক্তির ওয়াদা দেননি, দিয়েছেন জান্নাতের। ঈমানের আসল পুরস্কার সবসময় এখানে মেলে না।
- ৪
নির্যাতনের দিনগুলো
খাব্বাবের অভিযোগ: "আপনি দোয়া করবেন না?"
খাব্বাব ইবনুল আরাত (রা.) ছিলেন কামার, এক নারীর দাস। সীরাতের বর্ণনায় আছে, মুশরিকরা জ্বলন্ত কয়লার উপর তাঁকে শুইয়ে রাখত; পিঠের চর্বি গলে কয়লা নিভে যেত। একদিন তাঁরা কয়েকজন আর সহ্য করতে না পেরে নবীজির (ﷺ) কাছে গেলেন:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কাবার ছায়ায় নিজের চাদরে হেলান দিয়ে ছিলেন, আমরা তাঁর কাছে অভিযোগ করলাম: আপনি কি আমাদের জন্য সাহায্য চাইবেন না? আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন না? তিনি বললেন: তোমাদের আগের যুগে একজন মানুষকে ধরে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে তাতে রাখা হতো, তারপর করাত এনে মাথায় রেখে দুই ভাগ করা হতো, তবু এটা তাকে তার দ্বীন থেকে ফেরাতে পারত না। লোহার চিরুনি দিয়ে তার গোশতের নিচের হাড় আর রগ আঁচড়ানো হতো, তবু এটা তাকে তার দ্বীন থেকে ফেরাতে পারত না। আল্লাহর কসম, আল্লাহ এই দ্বীনকে পূর্ণ করবেন, এমনকি একজন আরোহী সানআ থেকে হাদরামাওত পর্যন্ত চলে যাবে, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না, আর ভয় শুধু ছাগলের ওপর নেকড়ের। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়ো করছ।
নবীজি (ﷺ) তাঁদের দুটি কথা মনে করিয়ে দিলেন: আগের ঈমানদাররা এর চেয়েও বেশি সহ্য করেছেন, আর আল্লাহর ওয়াদা অবশ্যই পূর্ণ হবে। সেই ওয়াদা পূরণ হয়েছিল; খাব্বাব (রা.) নিজে বেঁচে থেকে দেখেছেন, পুরো আরব নিরাপদ হয়ে গেছে।
সূত্রসহিহ বুখারী ৩৬১২ সহিহইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা: খাব্বাব (রা.)-এর নির্যাতন ঐতিহাসিক বর্ণনা
"তোমরা তাড়াহুড়ো করছ।" আল্লাহর ওয়াদা সত্য, কিন্তু তাঁর সময়সূচি আমাদের ঘড়ি মেনে চলে না।
- ৫
কাবার চত্বরে, এক দিন
সিজদারত নবীজির (ﷺ) পিঠে নাড়িভুঁড়ি
গোত্রের আশ্রয় থাকলেও নবীজি (ﷺ) নিজেও অপমান আর আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) নিজের চোখে দেখা একটি দৃশ্য বলেছেন:
নবীজি (ﷺ) কাবার কাছে নামাজ পড়ছিলেন, আবু জাহল আর তার সঙ্গীরা বসে ছিল। একজন আরেকজনকে বলল: অমুক গোত্রের জবাই করা উটের নাড়িভুঁড়ি এনে কে মুহাম্মাদ সিজদায় গেলে তার পিঠে রেখে দেবে? তাদের সবচেয়ে হতভাগা লোকটা উঠে গিয়ে নিয়ে এল, আর নবীজি (ﷺ) সিজদায় গেলে তাঁর দুই কাঁধের মাঝে পিঠে রেখে দিল। আমি তাকিয়ে দেখছিলাম, কিছুই করতে পারছিলাম না; হায়, যদি আমার (রক্ষা করার মতো) শক্তি থাকত! তারা হাসতে হাসতে একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সিজদায় পড়ে রইলেন, মাথা তুললেন না, যতক্ষণ না ফাতিমা এসে তা পিঠ থেকে ফেলে দিলেন। তারপর তিনি মাথা তুলে বললেন: হে আল্লাহ, কুরাইশকে তুমি পাকড়াও করো।
সেই দোয়ায় তিনি নাম ধরে আবু জাহল, উতবা, শাইবা, উমাইয়া ইবনু খালাফসহ কয়েকজনের কথা বলেছিলেন। ইবনু মাসউদ (রা.) কসম করে বলেছেন, পরে বদরের দিন তিনি তাদের সবাইকে বদরের কূপে মৃত পড়ে থাকতে দেখেছেন।
সূত্রসহিহ বুখারী ২৪০ সহিহ
অপমানের মুহূর্তেও তিনি সিজদা ছাড়েননি। আর ছোট্ট ফাতিমা (রা.) একাই এগিয়ে এসেছিলেন, যখন বড়রা কেউ সাহস পায়নি।
- ৬
কাবার হাতীমে, আরেক দিন
"তোমরা কি একজনকে মারবে, কারণ সে বলে আমার রব আল্লাহ?"
উরওয়া (রহ.) আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মুশরিকরা নবীজির (ﷺ) সাথে সবচেয়ে খারাপ কী করেছিল? তিনি বললেন:
নবীজি (ﷺ) কাবার হিজরে (হাতীমে) নামাজ পড়ছিলেন, তখন উকবা ইবনু আবি মুআইত এসে নিজের কাপড় তাঁর গলায় পেঁচিয়ে শক্ত করে শ্বাসরোধ করতে লাগল। আবু বকর এসে তার কাঁধ ধরে নবীজির (ﷺ) কাছ থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন আর বললেন: "তোমরা কি একজন মানুষকে শুধু এজন্য হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ?"
আবু বকর (রা.) যে আয়াত পড়েছিলেন, তা ফেরাউনের দরবারের এক গোপন মুমিনের কথা, যিনি মূসা (আ.)-কে রক্ষা করতে দাঁড়িয়েছিলেন:
وَقَالَ رَجُلٌ مُّؤْمِنٌ مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ إِيمَانَهُ أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَن يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُم بِالْبَيِّنَاتِ مِن رَّبِّكُمْ ۖ وَإِن يَكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهُ ۖ وَإِن يَكُ صَادِقًا يُصِبْكُم بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ
আর ফিরআউন বংশের এক মুমিন ব্যক্তি যে তার ঈমান গোপন রাখছিল সে বলল, ‘তোমরা কি এক ব্যক্তিকে এ জন্য হত্যা করবে যে, সে বলে, 'আমার রব আল্লাহ’, অথচ সে তোমাদের রবের কাছ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের এসেছে? সে মিথ্যাবাদী হলে তার মিথ্যাবাদিতার জন্য সে দায়ী হবে, আর যদি সে সত্যবাদী হয়, সে তোমাদেরকে যে ওয়াদা দিচ্ছে, তার কিছু তোমাদের উপর আপতিত হবে।’ নিশ্চয় আল্লাহ্ তাকে হেদায়াত দেন না, যে সীমালংঘনকারী, মিথ্যাবাদী।
সূত্রসহিহ বুখারী ৩৮৫৬ সহিহসূরা গাফির ৪০:২৮ কুরআন
অন্যায়ের সামনে আবু বকর (রা.) চুপ থাকেননি, নিজে মার খাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও এগিয়ে গেছেন।
- ৭
মক্কী যুগ জুড়ে
এই পথে পরীক্ষা আসবেই
এই দিনগুলোতে নাজিল হওয়া আয়াতগুলো মুসলিমদের মনে করিয়ে দিত, পরীক্ষা ঈমানের অংশ। আল্লাহ বলেছেন, মানুষ কি মনে করে "আমরা ঈমান এনেছি" বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, পরীক্ষা করা হবে না (সূরা আল-আনকাবূত ২৯:২)? আর বলেছেন:
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم ۖ مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّىٰ يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَىٰ نَصْرُ اللَّهِ ۗ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
নাকি তোমরা মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনও তোমাদের কাছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত অবস্থা আসেনি ? অর্থ-সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত-কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তাঁর সংগী-সাথী ঈমানদারগণ বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহ্র সাহায্য কখন আসবে’ ? জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্র সাহায্য অতি নিকটে।
এত নির্যাতনের পরও ইতিহাসে এমন একজন সাহাবির নাম পাওয়া যায় না, যিনি এই কারণে ঈমান ছেড়ে চলে গেছেন।
সূত্রসূরা আল-আনকাবূত ২৯:২ কুরআনসূরা আল-বাকারা ২:২১৪ কুরআন
"আল্লাহর সাহায্য কবে?" এই প্রশ্ন নবী আর মুমিনরাও করেছেন। উত্তর একটাই: নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য কাছে।
প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়
এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।
ভিত্তিহীন বিলাল (রা.) "শীন" উচ্চারণ করতে পারতেন না, "সীন" বলতেন; তাই হাদিস: "বিলালের সীন আল্লাহর কাছে শীন"
হাদিস বিশারদ সাখাবী (আল-মাকাসিদুল হাসানা) সহ অনেকে বলেছেন, এর কোনো ভিত্তি নেই। বরং বিলাল (রা.) ছিলেন উঁচু আর সুন্দর কণ্ঠের মুয়াজ্জিন; উচ্চারণে ত্রুটি থাকলে তাঁকে আজানের দায়িত্ব দেওয়া হতো না।
ভিত্তিহীন কাঁটা বিছানো এক বুড়ি, যে অসুস্থ হলে নবীজি (ﷺ) তাকে দেখতে গিয়েছিলেন
গল্পটি বাংলা বই আর ওয়াজে খুব প্রচলিত, কিন্তু আমাদের জানামতে কোনো হাদিসগ্রন্থ বা প্রাচীন সীরাত গ্রন্থে এর কোনো সনদ নেই। নবীজির (ﷺ) ক্ষমা আর দয়া প্রমাণে বানানো গল্পের দরকার নেই; সহিহ ঘটনাই যথেষ্ট, যেমন তায়েফে রক্তাক্ত হয়েও তিনি তাদের ধ্বংস চাননি (সহিহ বুখারী ৩২৩১)।
ভুল ধারণা নির্যাতনের মুখে জোর করে কুফরি কথা বলালে ঈমান চলে যায়
কুরআন স্পষ্ট বলেছে, যাকে বাধ্য করা হয়েছে অথচ তার অন্তর ঈমানে অটল, সে এর আওতায় পড়ে না (সূরা আন-নাহল ১৬:১০৬)। আম্মার (রা.)-এর ঘটনায় এই আয়াত নাজিল হয়েছে বলে তাফসীরে এসেছে। তবে যিনি ধৈর্য ধরে সহ্য করেন, যেমন বিলাল (রা.), তাঁর মর্যাদা আরও বেশি।
এই গল্প থেকে আমার জীবনে
গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।
পরীক্ষায় অবিচল থাকা
আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, "ঈমান এনেছি" বললেই পরীক্ষা ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হয় না। আর নবীজি (ﷺ) বলেছেন, আগের মুমিনরা এর চেয়েও বেশি সহ্য করেছেন।
আজকের কাজ: কঠিন সময়ে প্রথম যে আমলটা ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করে (সাধারণত নামাজ), আজ সেটাই সময়মতো আদায় করুন।
সূরা আল-আনকাবূত ২৯:২ কুরআনসহিহ বুখারী ৩৬১২ সহিহ
নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানো
আবু বকর (রা.) নিজের সম্পদ দিয়ে বিলালসহ কয়েকজন নির্যাতিতকে মুক্ত করেছিলেন। কুরআন একে বলেছে "গিরিপথ" পার হওয়া: একজনকে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা।
আজকের কাজ: এই মাসে একজন বিপদগ্রস্ত মানুষের ঋণ, চিকিৎসা বা মামলার খরচে সাধ্যমতো সাহায্য করুন।
সহিহ বুখারী ৩৭৫৪ সহিহসূরা আল-বালাদ ৯০:১৩ কুরআন
অন্যায়ের সামনে চুপ না থাকা
নবীজির (ﷺ) গলা চেপে ধরা দেখে আবু বকর (রা.) ঝুঁকি নিয়েও এগিয়ে গিয়েছিলেন।
আজকের কাজ: আজ কারও প্রতি অন্যায় দেখলে, অফিসে, পরিবারে বা অনলাইনে, ভদ্র কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় তার পক্ষে একটা কথা বলুন।
সহিহ বুখারী ৩৮৫৬ সহিহ
তাড়াহুড়ো নয়, ধৈর্য
"তোমরা তাড়াহুড়ো করছ": আল্লাহর ওয়াদা অবশ্যই আসে, তবে তাঁর সময়ে।
আজকের কাজ: যে দোয়ার ফল এখনো দেখেননি, তার জন্য হতাশ না হয়ে আজ আবার দোয়া করুন, আর বলুন: আল্লাহর সাহায্য কাছে।
সহিহ বুখারী ৩৬১২ সহিহসূরা আল-বাকারা ২:২১৪ কুরআন
বিপদেও সিজদা
পিঠে বোঝা নিয়েও নবীজি (ﷺ) সিজদা থেকে মাথা তোলেননি। আল্লাহ বলেছেন, ধৈর্য আর নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও।
আজকের কাজ: আজ কোনো কষ্ট বা অপমান পেলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে সিজদায় নিজের ভাষায় আল্লাহকে সব বলুন।
সহিহ বুখারী ২৪০ সহিহসূরা আল-বাকারা ২:৪৫ কুরআন
বিলালের (রা.) বুকে ছিল পাথর, মুখে ছিল "আহাদ, আহাদ"। আমাদের বুকে কোনো পাথর নেই, তবু কত সহজে নামাজ বা হালাল রুজির পথ ছেড়ে দিই। আজ আল্লাহর জন্য কোন ছোট কষ্টটা আপনি হাসিমুখে সহ্য করবেন?
সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
- কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
- সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
- ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
- মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
- দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।
সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।