وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ
হাবশায় হিজরত: ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর দরবারে জাফর
মক্কা যখন মুসলিমদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেল, নবীজি (ﷺ) তাঁদের দেখালেন সমুদ্রের ওপারের এক দেশ, যেখানে এক খ্রিস্টান রাজা ন্যায়বিচার করতেন। সেই রাজার দরবারে দাঁড়িয়ে এক যুবক কয়েক মিনিটে বুঝিয়ে দিলেন, ইসলাম কী।
সীরাত · মক্কী যুগ৬১৫ - ৬১৬ খ্রি. · নবুয়তের ৫ম বছর
- কখন
- নবুয়তের ৫ম বছর রজব মাসে প্রথম দল, পরে দ্বিতীয় বড় দল (আনুমানিক ৬১৫-৬১৬ খ্রি.)
- কোথায়
- লোহিত সাগর পার হয়ে হাবশা (আজকের ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া অঞ্চল)
- কারা
- উসমান ও রুকাইয়া, জাফর ইবনু আবি তালিব, উম্মু সালামা (রা.) সহ প্রায় একশো মুসলিম; বাদশাহ নাজ্জাশী আসহামা
- এই গল্পে
- প্রথম হিজরত থেকে নাজ্জাশীর মৃত্যু পর্যন্ত
কেন পড়বেন: ইসলামের প্রথম হিজরত মদিনায় নয়, হাবশায়। এই গল্প শেখায়, দ্বীন বাঁচাতে ঘর ছাড়াও ইবাদত; অন্য ধর্মের ন্যায়পরায়ণ মানুষকে কদর করা যায়; আর জ্ঞান ও শান্ত যুক্তি দিয়ে সত্য তুলে ধরলে শত্রুর চালও ব্যর্থ হয়।
গল্প
বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।
- ১
নবুয়তের ৫ম বছর
"সেখানে এক বাদশাহ আছেন, যার কাছে কেউ জুলুমের শিকার হয় না"
নির্যাতন যখন অসহ্য হয়ে উঠল, নবীজি (ﷺ) সাহাবিদের বললেন, তোমরা চাইলে হাবশায় চলে যেতে পারো; সেখানে এক বাদশাহ আছেন, যাঁর রাজ্যে কারও উপর জুলুম হয় না। আল্লাহ যতদিন না পথ খুলে দেন, সেখানে থাকো।
নবুয়তের পঞ্চম বছর রজব মাসে প্রথম ছোট দলটি গোপনে রওনা হলো: সীরাতের বর্ণনায় এগারোজন পুরুষ আর চারজন নারী, তাঁদের মধ্যে ছিলেন উসমান ইবনু আফফান (রা.) আর তাঁর স্ত্রী, নবীজির (ﷺ) মেয়ে রুকাইয়া (রা.)। সমুদ্রতীরে পৌঁছে তাঁরা নৌকায় হাবশা পাড়ি দিলেন।
এই সময়ের মক্কী আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন:
قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَـٰذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ ۗ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ ۗ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
বলুন, 'হে আমার মুমিন বান্দাগণ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন কর। যারা এ দুনিয়াতে কল্যাণকর কাজ করে তাদের জন্য আছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত, ধৈর্যশীলদেরকেই তো তাদের পুরস্কার পূর্ণরূপে দেয়া হবে বিনা হিসেবে।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: হাবশায় হিজরতের নির্দেশ (ইবনে ইসহাক থেকে) ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা: প্রথম দলের সংখ্যা ও রজব মাস ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা আয-যুমার ৩৯:১০ কুরআন
আল্লাহর জমিন প্রশস্ত। দ্বীন মানা যেখানে অসম্ভব, সেখান থেকে সরে যাওয়াও ঈমানের কাজ।
- ২
কয়েক মাস পর
একটি গুজব আর ফিরে আসা
একদিন কাবার কাছে নবীজি (ﷺ) সূরা আন-নাজম পড়লেন। শেষ আয়াতে সিজদা এল, আর এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল:
أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم سَجَدَ بِالنَّجْمِ وَسَجَدَ مَعَهُ الْمُسْلِمُونَ وَالْمُشْرِكُونَ وَالْجِنُّ وَالإِنْسُ
নবীজি (ﷺ) সূরা আন-নাজম (পড়ে) সিজদা করলেন, আর তাঁর সাথে সিজদা করল মুসলিমরা, মুশরিকরা, জিন ও মানুষ।
সীরাতের বর্ণনায় আছে, এই খবর বেড়ে গুজব হয়ে হাবশায় পৌঁছাল: কুরাইশ মুসলিম হয়ে গেছে! কিছু মুহাজির খুশি হয়ে মক্কায় ফিরে এলেন। কাছে এসে জানলেন, খবর মিথ্যা, নির্যাতন আরও বেড়েছে। কেউ কেউ গোপনে বা কারও আশ্রয়ে মক্কায় ঢুকলেন, অনেকে আবার ফিরে গেলেন।
সূত্রসহিহ বুখারী ১০৭১ সহিহইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা: গুজব শুনে প্রথম দলের ফিরে আসা ঐতিহাসিক বর্ণনা
যাচাই না করা খবর মানুষকে বিপদে ফেলে। খবর শুনে আগে যাচাই করা কুরআনের নির্দেশ।
- ৩
এরপর
দ্বিতীয় হিজরত: বড় কাফেলা
এবার আরও বড় দল রওনা হলো। ইবনে ইসহাকের হিসাবে আশির বেশি পুরুষ, সাথে নারী ও শিশু। দলের নেতৃত্বে ছিলেন নবীজির (ﷺ) চাচাতো ভাই জাফর ইবনু আবি তালিব (রা.)। সাথে ছিলেন তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতু উমাইস, আবু সালামা ও উম্মু সালামা (রা.)সহ আরও অনেকে।
উম্মু সালামা (রা.) পরে বলেছেন: হাবশায় পৌঁছে আমরা পেলাম সবচেয়ে ভালো প্রতিবেশী, নাজ্জাশীকে। আমরা নিরাপদে আল্লাহর ইবাদত করতে লাগলাম, কেউ কষ্ট দিত না, খারাপ কথাও শুনতে হতো না।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: দ্বিতীয় হিজরতকারীদের নামের তালিকা ঐতিহাসিক বর্ণনামুসনাদে আহমাদ ১৭৪০ (উম্মু সালামা রা.-এর দীর্ঘ বর্ণনা, ইবনে ইসহাকের সনদে); শুআইব আরনাউত: সনদ হাসান হাসান
একটি নিরাপদ জায়গার মূল্য সে-ই বোঝে, যে নির্যাতন দেখেছে। আজ নিরাপদে নামাজ পড়তে পারা কত বড় নিয়ামত!
- ৪
হাবশায়
কুরাইশের দূত আর উপহারের বস্তা
কুরাইশ এটা মেনে নিল না। তারা দুজন চতুর দূত পাঠাল, আমর ইবনুল আস আর আবদুল্লাহ ইবনু আবি রাবীআ, সাথে হাবশার প্রিয় উপহার: চামড়া। পরিকল্পনা ছিল, আগে বাদশাহর পাদ্রিদের উপহার দিয়ে হাত করা, তারপর বাদশাহকে বলা: আমাদের কিছু নির্বোধ ছেলে নিজেদের ধর্ম ছেড়েছে, আপনার ধর্মও নেয়নি, এক নতুন ধর্ম বানিয়েছে; ওদের কথা না শুনেই আমাদের হাতে ফিরিয়ে দিন।
পাদ্রিরা তাদের পক্ষে বলল। কিন্তু নাজ্জাশী রেগে গেলেন: যারা আমার দেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের কথা না শুনে আমি কাউকে তুলে দেব না।
সূত্রমুসনাদে আহমাদ ১৭৪০ (উম্মু সালামা রা.-এর দীর্ঘ বর্ণনা, ইবনে ইসহাকের সনদে); শুআইব আরনাউত: সনদ হাসান হাসানইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: কুরাইশের দূত ঐতিহাসিক বর্ণনা
ন্যায়বিচার মানে দুই পক্ষের কথা শোনা। নাজ্জাশী এক পক্ষের অভিযোগে রায় দেননি।
- ৫
নাজ্জাশীর দরবারে
জাফরের ভাষণ
মুসলিমরা পরামর্শ করলেন, বাদশাহকে কী বলবেন। সিদ্ধান্ত হলো: নবীজি (ﷺ) যা শিখিয়েছেন, সত্যটাই বলব, যা হয় হোক। জাফর (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন:
হে বাদশাহ, আমরা ছিলাম জাহিল জাতি। মূর্তির পূজা করতাম, মরা পশু খেতাম, অশ্লীল কাজ করতাম, আত্মীয়তা ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীর সাথে খারাপ ব্যবহার করতাম, আমাদের শক্তিশালীরা দুর্বলদের খেয়ে ফেলত। তারপর আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল পাঠালেন, যাঁর বংশ, সত্যবাদিতা, আমানতদারি আর পবিত্রতা আমরা জানি।
তিনি আমাদের ডাকলেন এক আল্লাহর ইবাদতে, আর পূর্বপুরুষের পাথর ও মূর্তি ছাড়তে। আদেশ দিলেন সত্য বলতে, আমানত রক্ষা করতে, আত্মীয়তা জুড়তে, প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করতে, রক্তপাত আর হারাম থেকে বিরত থাকতে। নিষেধ করলেন অশ্লীলতা, মিথ্যা সাক্ষ্য, এতিমের সম্পদ খাওয়া আর সতী নারীকে অপবাদ দিতে। আদেশ দিলেন নামাজ, জাকাত আর রোজার। আমরা তাঁকে বিশ্বাস করেছি। আর এজন্যই আমাদের জাতি আমাদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে।
নাজ্জাশী বললেন, তিনি যা এনেছেন, তার কিছু শোনাও। জাফর (রা.) পড়লেন সূরা মারইয়ামের শুরু। বাদশাহ কাঁদতে লাগলেন, চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে গেল; পাদ্রিরাও কাঁদলেন। তারপর নাজ্জাশী বললেন:
এটা আর মূসা যা এনেছিলেন, দুটোই একই প্রদীপের আলো।
তিনি দূতদের বলে দিলেন: আমি এদের কখনো তোমাদের হাতে দেব না।সূত্রমুসনাদে আহমাদ ১৭৪০ (উম্মু সালামা রা.-এর দীর্ঘ বর্ণনা, ইবনে ইসহাকের সনদে); শুআইব আরনাউত: সনদ হাসান হাসানইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: জাফরের (রা.) ভাষণ ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা মারইয়াম ১৯:১৬ কুরআন
জাফর (রা.) কাউকে গালি দেননি, শুধু বলেছেন ইসলাম তাঁদের জীবনে কী বদলেছে। সবচেয়ে শক্তিশালী দাওয়াত হলো বদলে যাওয়া জীবনের সাক্ষ্য।
- ৬
পরের দিন
"ঈসা সম্পর্কে তোমরা কী বলো?"
আমর ইবনুল আস হার মানলেন না। পরদিন এসে বললেন: এরা ঈসা ইবনু মারইয়াম সম্পর্কে এক ভয়ংকর কথা বলে, জিজ্ঞেস করে দেখুন। মুসলিমরা ভয় পেলেন, কারণ বাদশাহ খ্রিস্টান। তবু সিদ্ধান্ত একটাই: আল্লাহ আর তাঁর রাসূল যা বলেছেন, তাই বলব।
জাফর (রা.) বললেন:
আমরা তাঁর সম্পর্কে তা-ই বলি, যা আমাদের নবী এনেছেন: তিনি আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তাঁর রূহ, আর তাঁর কালিমা, যা তিনি কুমারী, পবিত্র মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছেন।
কুরআনেও তা-ই আছে:يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ ۚ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَىٰ مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِّنْهُ ۖ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ۖ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ ۚ انتَهُوا خَيْرًا لَّكُمْ ۚ إِنَّمَا اللَّهُ إِلَـٰهٌ وَاحِدٌ ۖ سُبْحَانَهُ أَن يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ ۘ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ وَكِيلًا
হে কিতাবীরা! স্বীয় দীনের মধ্যে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ব্যতীত কিছু বলো না। মারইয়াম-তনয় ঈসা মসীহ কেবল আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন ও তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। কাজেই তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের উপর ঈমান আন এবং বলো না, ‘তিন !’ নিবৃত্ত হও, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহই তো এক ইলাহ; তাঁর সন্তান হবে... তিনি এটা থেকে পবিত্র-মহান। আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই; আর কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট।
নাজ্জাশী মাটি থেকে একটা কাঠি তুলে বললেন: আল্লাহর কসম, তুমি যা বললে, ঈসা তার চেয়ে এই কাঠিটুকুও বেশি নন। পাদ্রিরা অসন্তুষ্ট হলো, কিন্তু তিনি পরোয়া করলেন না। মুসলিমদের বললেন: যাও, তোমরা আমার দেশে নিরাপদ। আর কুরাইশের উপহার ফিরিয়ে দিলেন।
সূত্রমুসনাদে আহমাদ ১৭৪০ (উম্মু সালামা রা.-এর দীর্ঘ বর্ণনা, ইবনে ইসহাকের সনদে); শুআইব আরনাউত: সনদ হাসান হাসানসূরা আন-নিসা ৪:১৭১ কুরআন
চাপের মুখেও আকীদার কথা ঘুরিয়ে বলেননি জাফর (রা.)। সত্য বিনয়ের সাথে, কিন্তু অবিকৃত বলতে হয়।
- ৭
৭ম ও ৯ম হিজরি
আসহামা: দূর দেশের এক ভাই
মুহাজিররা বহু বছর হাবশায় ছিলেন। জাফর (রা.) আর তাঁর সাথীরা ফিরে এলেন সপ্তম হিজরিতে, খায়বার বিজয়ের সময়। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলল, আমরা তোমাদের আগে হিজরত করেছি। আসমা বিনতু উমাইস (রা.) নবীজিকে (ﷺ) জানালে তিনি বললেন:
لَيْسَ بِأَحَقَّ بِي مِنْكُمْ، وَلَهُ وَلأَصْحَابِهِ هِجْرَةٌ وَاحِدَةٌ، وَلَكُمْ أَنْتُمْ أَهْلَ السَّفِينَةِ هِجْرَتَانِ
(উমার বলেছিলেন, তিনি হাবশার মুহাজিরদের চেয়ে রাসূলের বেশি হকদার। শুনে নবীজি বললেন:) সে তোমাদের চেয়ে আমার বেশি হকদার নয়। তার ও তার সাথীদের হিজরত একটি, আর তোমরা নৌকার লোকেরা, তোমাদের হিজরত দুটি।
নাজ্জাশী নিজে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। নবম হিজরিতে যেদিন তিনি মারা গেলেন, নবীজি (ﷺ) মদিনায় বসেই সাহাবিদের খবর দিলেন আর তাঁর জানাজা পড়ালেন:
হাবশার বাদশাহ নাজাশী যেদিন মারা গেলেন, সেদিনই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের তাঁর মৃত্যুর খবর দিলেন এবং বললেন: তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। … নবীজি ঈদগাহে সাহাবীদের কাতারবন্দি করে তাঁর (গায়েবানা জানাযায়) চার তাকবীর দিলেন।
অন্য বর্ণনায় তিনি তাঁর নাম ধরে বলেছেন: তোমাদের ভাই আসহামা (সহিহ বুখারী ৩৮৭৭)।
সূত্রসহিহ বুখারী ৪২৩১ সহিহসহিহ বুখারী ১৩২৭ সহিহসহিহ বুখারী ৩৮৭৭ সহিহ
যাঁকে নবীজি (ﷺ) কখনো চোখে দেখেননি, তাঁকে ডেকেছেন "তোমাদের ভাই"। ঈমানের বন্ধন দেশ আর সমুদ্র মানে না।
প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়
এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।
প্রমাণিত নয় "গারানীক" কাহিনি: সূরা নাজম পড়ার সময় শয়তান মূর্তির প্রশংসা জুড়ে দিয়েছিল, তাই কুরাইশ সিজদা করেছিল
সহিহ বুখারীতে আছে শুধু এটুকু: সূরা নাজমের সিজদায় মুসলিম ও মুশরিক সবাই সিজদা করেছিল (সহিহ বুখারী ১০৭১)। মূর্তির প্রশংসার অংশটি যত সূত্রে এসেছে, সবগুলোর সনদ বিচ্ছিন্ন বা দুর্বল; ইবনে কাসীর বলেছেন, এর কোনো সহিহ সনদ তিনি পাননি, আর কাযী ইয়ায, ইবনে খুযাইমাসহ অনেকে একে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটা কুরআনের এই ঘোষণারও বিরোধী: তিনি নিজের খেয়ালখুশি থেকে কিছু বলেন না (সূরা আন-নাজম ৫৩:৩)। বিস্তারিত: টাইমলাইনে গারানীকের যাচাই।
ভুল ধারণা নাজ্জাশী মুসলিম ছিলেন না, শুধু দয়ালু খ্রিস্টান রাজা হিসেবে আশ্রয় দিয়েছিলেন
নবীজি (ﷺ) তাঁকে "নেককার মানুষ" ও "তোমাদের ভাই" বলেছেন, আর তাঁর জন্য জানাজা পড়েছেন ও ক্ষমা চাইতে বলেছেন (সহিহ বুখারী ১৩২৭, সহিহ বুখারী ৩৮৭৭)। অমুসলিমের জন্য জানাজা ও ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ (সূরা আত-তাওবা ৯:৮৪)। কাজেই তিনি মুসলিম হয়েই মারা গেছেন।
ভুল বোঝা "নাজ্জাশী" বাদশাহর নাম
নাজ্জাশী ছিল হাবশার রাজাদের উপাধি, যেমন পারস্যের রাজাকে কিসরা আর রোমের রাজাকে কায়সার বলা হতো। মুসলিমদের আশ্রয় দেওয়া বাদশাহর নাম আসহামা, নবীজি (ﷺ) নিজে এই নাম বলেছেন (সহিহ বুখারী ৩৮৭৭)।
এই গল্প থেকে আমার জীবনে
গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।
দ্বীন বাঁচাতে জায়গা বদলানোর সাহস
সাহাবিরা ঘর, সম্পদ আর আত্মীয় ছেড়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন, শুধু নিরাপদে আল্লাহর ইবাদত করতে। আল্লাহর জমিন প্রশস্ত।
আজকের কাজ: যে সঙ্গ, গ্রুপ বা অভ্যাস আপনাকে বারবার গুনাহে টানে, আজ তা থেকে সরে আসার অন্তত একটা বাস্তব পদক্ষেপ নিন।
সূরা আয-যুমার ৩৯:১০ কুরআনসূরা আন-নিসা ৪:৯৭ কুরআন
সংক্ষেপে, সুন্দর করে ইসলাম বোঝানো
জাফর (রা.) কয়েক মিনিটে বলেছিলেন: আমরা কী ছিলাম, কী পেলাম, আর কেন নির্যাতিত। কোনো গালি নেই, কোনো অতিরঞ্জন নেই।
আজকের কাজ: কেউ জিজ্ঞেস করলে কী বলবেন, আজ তা দুই-তিন লাইনে লিখে রাখুন: ইসলাম আমার জীবনে কী বদলেছে।
সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫ কুরআনমুসনাদে আহমাদ ১৭৪০ (উম্মু সালামা রা.-এর দীর্ঘ বর্ণনা, ইবনে ইসহাকের সনদে); শুআইব আরনাউত: সনদ হাসান হাসান
ন্যায়পরায়ণ মানুষের কদর
মুসলিমদের প্রথম আশ্রয়দাতা ছিলেন তখনকার এক খ্রিস্টান রাজা। যারা ধর্মের কারণে লড়াই করে না, তাদের সাথে সদাচার ও ইনসাফ করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি।
আজকের কাজ: ভিন্ন ধর্মের যে প্রতিবেশী বা সহকর্মী আপনার সাথে ন্যায় আচরণ করেন, আজ তাঁকে ধন্যবাদ দিন বা একটা ভালো কাজে সাহায্য করুন।
সূরা আল-মুমতাহিনা ৬০:৮ কুরআন
ঈসা (আ.) সম্পর্কে সঠিক আকীদা
জাফর (রা.) চাপের মুখেও কুরআনের কথাই বলেছেন: ঈসা আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
আজকের কাজ: আজ সূরা মারইয়ামের প্রথম ৩৬ আয়াত অর্থসহ পড়ুন, যা শুনে নাজ্জাশী কেঁদেছিলেন।
সূরা আন-নিসা ৪:১৭১ কুরআনসূরা মারইয়াম ১৯:৩০ কুরআন
দূরের ভাইয়ের জন্য দোয়া
নবীজি (ﷺ) কখনো না দেখা এক বাদশাহর জন্য জানাজা পড়েছেন আর সাহাবিদের ক্ষমা চাইতে বলেছেন।
আজকের কাজ: আজ পৃথিবীর কোথাও বিপদে থাকা মুসলিমদের জন্য নাম বা দেশ ধরে আন্তরিকভাবে দোয়া করুন।
সহিহ বুখারী ১৩২৭ সহিহসহিহ বুখারী ৩৮৭৭ সহিহ
জাফর (রা.) এক বিদেশি রাজার দরবারে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ইসলাম তাঁদের জীবনে কী বদলে দিয়েছে। কেউ যদি আজ আপনাকে জিজ্ঞেস করে "ইসলাম তোমাকে কী দিয়েছে?", আপনার উত্তর কী হবে?
সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
- কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
- সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
- ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
- মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
- দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।
সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।