deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ

কৈশোর ও যৌবন: রাখাল, সফর আর ন্যায়ের শপথ

নবী হওয়ার আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে চিনত একটি নামে: আল-আমীন, বিশ্বস্ত। সেই চরিত্র তৈরি হয়েছিল রাখালের ধৈর্যে, সফরের অভিজ্ঞতায়, আর জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসে।

৫ দৃশ্য৭ হাদিস৪ আয়াত

সীরাত · নবুয়তের আগেআনুমানিক ৫৮২ - ৫৯৪ খ্রি. · ১২ থেকে ২৪ বছর

কখন
আনুমানিক ৫৮২ থেকে ৫৯৪ খ্রি., নবুয়তের প্রায় ৩০ বছর আগে
কোথায়
মক্কা ও আশেপাশের পাহাড়, সিরিয়ার বুসরা শহর
কারা ছিলেন
চাচা আবু তালিব, চাচা যুবাইর, কুরাইশের গোত্রগুলো
এই গল্পে
বারো বছর থেকে পঁচিশের আগ পর্যন্ত

কেন পড়বেন: তরুণ বয়সের চরিত্রই পরে মানুষের পরিচয় হয়ে যায়। নবুয়তের আগেই নবীজি (ﷺ) সৎ উপার্জন, আমানতদারি আর মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর যে নজির রেখেছেন, আজকের তরুণের জন্য তা সবচেয়ে কাছের আদর্শ।

গল্প

বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।

  1. ১

    কৈশোরে

    মক্কার পাহাড়ে রাখাল

    চাচা আবু তালিবের সংসারে অভাব ছিল। কিশোর মুহাম্মাদ (ﷺ) তাই কাজ নিলেন: সামান্য পারিশ্রমিকে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতেন। পরে নবী হয়ে তিনি এ কথা লুকাননি, বরং গর্বের সাথে বলেছেন:

    مَا بَعَثَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلاَّ رَعَى الْغَنَمَ ‏"‏‏.‏ فَقَالَ أَصْحَابُهُ وَأَنْتَ فَقَالَ ‏"‏ نَعَمْ كُنْتُ أَرْعَاهَا عَلَى قَرَارِيطَ لأَهْلِ مَكَّةَ

    আল্লাহ এমন কোনো নবী পাঠাননি, যিনি ছাগল চরাননি। সাহাবিরা বললেন: আপনিও? তিনি বললেন: হ্যাঁ, আমি কয়েক কীরাতের (সামান্য পারিশ্রমিকের) বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম।

    সহিহ বুখারী ২২৬২সহিহবর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)

    ছাগলের পাল চরাতে লাগে ধৈর্য, নজর রাখা, দুর্বলটার প্রতি দয়া, আর হারিয়ে যাওয়াটাকে খুঁজে আনা। আলেমরা বলেছেন, মানুষকে পথ দেখানোর আগে আল্লাহ নবীদের এভাবেই তৈরি করেছেন।

    সূত্রসহিহ বুখারী ২২৬২ সহিহইবনে হাজার, ফাতহুল বারী: হাদিস ২২৬২-এর ব্যাখ্যা (নবীদের ছাগল চরানোর হিকমত) ঐতিহাসিক বর্ণনা

    হালাল উপার্জনের কোনো কাজ ছোট নয়। নবীজি (ﷺ) রাখাল ছিলেন, আর তা বলতে লজ্জা পাননি।

  2. ২

    প্রায় ১২ বছর বয়সে

    চাচার সাথে সিরিয়া সফর

    আবু তালিব ব্যবসার কাফেলা নিয়ে সিরিয়া যাচ্ছিলেন। ভাতিজা এমনভাবে জড়িয়ে ধরলেন যে চাচা তাঁকে সাথে নিলেন। কাফেলা পৌঁছাল সিরিয়ার সীমান্তের শহর বুসরায়।

    সীরাতের বইয়ে আছে, সেখানে বাহিরা নামের এক খ্রিস্টান পাদ্রি কাফেলাকে খাবারের দাওয়াত দেন। কিশোরটিকে দেখে, কাঁধের মাঝের মোহরে নবুয়ত দেখে তিনি আবু তালিবকে বলেন, এই ছেলের বড় ভবিষ্যৎ আছে; তাকে রোমানদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। আবু তালিব তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠান।

    এই ঘটনা তিরমিযীতে সনদসহ আছে, কিন্তু তার মান নিয়ে মুহাদ্দিসদের মতভেদ আছে। বিশেষ করে বর্ণনার শেষে "আবু বকর তাঁর সাথে বিলালকে পাঠালেন" অংশটি নিশ্চিতভাবে ভুল, কারণ আবু বকর তখন নিজেই প্রায় দশ বছরের শিশু, আর বিলাল হয়তো জন্মই নেননি।

    সূত্রসুনানে তিরমিযী ৩৬২০ (আবু মূসা রা.); তিরমিযী: হাসান গরীব; আহমাদ শাকির: মুনকার মান নিয়ে মতভেদইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আবু তালিবের সাথে সিরিয়া সফর ও বাহিরা ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ ও যাহাবী: আবু বকর-বিলালের অংশটি ভুল ঐতিহাসিক বর্ণনা

    দুর্বল বর্ণনা দিয়ে নবীজির (ﷺ) মর্যাদা বাড়াতে হয় না। কুরআন আর সহিহ হাদিসে যা আছে, তা-ই যথেষ্ট বড়।

  3. ৩

    কৈশোরের শেষে

    ফিজার যুদ্ধ

    নিষিদ্ধ মাসে, যখন আরবে যুদ্ধ হারাম মানা হতো, তখন কুরাইশ ও কাইস গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ বাধল। নিষিদ্ধ মাসের পবিত্রতা ভাঙার কারণে একে বলা হয় "ফিজার" (পাপাচারের) যুদ্ধ।

    কিশোর মুহাম্মাদ (ﷺ) চাচাদের সাথে ছিলেন। পরে বলেছেন, আমি চাচাদের জন্য (শত্রুর ছোড়া) তীর কুড়িয়ে দিতাম। কয়েক দফা লড়াইয়ের পর দুই পক্ষ সন্ধি করল। কিন্তু এই রক্তারক্তি মক্কার বিবেকবান মানুষদের ভাবিয়ে তুলেছিল।

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: হারবুল ফিজার (বয়স নিয়ে বর্ণনায় ভিন্নতা: চৌদ্দ থেকে বিশ) ঐতিহাসিক বর্ণনা

    যুদ্ধের ক্ষত মানুষকে শান্তির মূল্য শেখায়। এর পরের ঘটনাই ছিল ন্যায়ের শপথ।

  4. ৪

    প্রায় ২০ বছর বয়সে

    হিলফুল ফুযূল: মজলুমের পাশে শপথ

    ইয়েমেনের যুবাইদ গোত্রের এক ব্যবসায়ী মক্কায় পণ্য বিক্রি করল আস ইবনে ওয়াইল নামের এক কুরাইশ নেতার কাছে। আস মাল নিল, দাম দিল না। বিদেশি মানুষটির পক্ষে দাঁড়ানোর কেউ ছিল না। সে আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠে কবিতায় চিৎকার করে কুরাইশের কাছে বিচার চাইল।

    নবীজির (ﷺ) চাচা যুবাইর উদ্যোগ নিলেন। বনু হাশিম, বনু যুহরা, বনু তাইমসহ কয়েকটি গোত্রের লোক আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে জড়ো হয়ে শপথ করল: মক্কায় কেউ জুলুমের শিকার হলে, সে স্থানীয় হোক বা বিদেশি, সবাই মিলে তার পাশে দাঁড়াবে, যতক্ষণ না তার হক ফিরে আসে। তারা আস-এর কাছে গিয়ে ব্যবসায়ীর মাল ফেরত আদায় করল।

    যুবক মুহাম্মাদ (ﷺ) সেই শপথে ছিলেন। নবী হওয়ার পর বলেছেন: আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে আমি এমন এক চুক্তিতে ছিলাম যে, তার বদলে লাল উট পেলেও আমি খুশি হতাম না। ইসলামের যুগেও এমন চুক্তিতে ডাকা হলে আমি সাড়া দিতাম।

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: হিলফুল ফুযূল (ইবনে ইসহাক থেকে, মুরসাল সনদে) ঐতিহাসিক বর্ণনামুসনাদে আহমাদ: আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর হাদিস, কুরাইশের ন্যায়ের চুক্তিতে শৈশবে উপস্থিতি ও "লাল উট পেলেও ভাঙতাম না"; শুআইব আরনাউত: সনদ সহিহ সহিহসূরা আল-মায়িদা ৫:২ কুরআন

    জাহিলিয়াতের যুগের ভালো কাজকেও নবীজি (ﷺ) স্বীকৃতি দিয়েছেন। ভালো কাজ যেখানেই হোক, তাতে সহযোগিতা করা ইসলামের শিক্ষা।

  5. ৫

    যৌবনে

    আল-আমীন: বিশ্বস্ত মানুষটি

    এই বছরগুলোতে মক্কার মানুষ তাঁকে একটি নামে ডাকতে শুরু করল: আল-আমীন, মানে বিশ্বস্ত। মানুষ নিজেদের মূল্যবান জিনিস তাঁর কাছে আমানত রাখত। তিনি কখনো মিথ্যা বলেননি, কাউকে ঠকাননি।

    এর সাক্ষ্য দিয়েছে তাঁর শত্রুরাও। নবুয়তের পর সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি যখন জিজ্ঞেস করলেন, আমি যদি বলি পাহাড়ের ওপারে শত্রুবাহিনী, বিশ্বাস করবে? কুরাইশরা একবাক্যে বলল: আমরা তোমার কাছ থেকে সত্য ছাড়া কিছু পাইনি। আর বহু বছর পর রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন, নবুয়ত দাবির আগে কি তোমরা তাঁকে কখনো মিথ্যার অভিযোগ দিয়েছ? আবু সুফিয়ানকেও বলতে হলো: না।

    প্রথম ওহীর রাতে খাদিজা (রা.) তাঁর চরিত্র এক কথায় বলেছিলেন: আপনি আত্মীয়তা রক্ষা করেন, অসহায়ের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বকে উপার্জন করে দেন, মেহমানদারি করেন, আর বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ান (সহিহ বুখারী ৩)।

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: "আল-আমীন" উপাধি ঐতিহাসিক বর্ণনাসহিহ বুখারী ৪৭৭০ সহিহসহিহ বুখারী ৭ (হিরাক্লিয়াসের প্রশ্ন: "নবুয়ত দাবির আগে কি তাঁকে মিথ্যার অভিযোগ দিয়েছ?") সহিহসহিহ বুখারী ৩ সহিহ

    শত্রুও যার সততার সাক্ষ্য দেয়, সে-ই প্রকৃত বিশ্বস্ত। আমাদের সম্পর্কে আমাদের প্রতিবেশী কী সাক্ষ্য দেবে?

প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়

এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।

ভিত্তিহীন নবীজি (ﷺ) পাদ্রি বাহিরার কাছ থেকে ধর্মের জ্ঞান শিখেছিলেন

কোনো বর্ণনায়ই এমন কথা নেই; বর্ণনামতে দেখা হয়েছিল একবেলা, বারো বছরের কিশোরের সাথে। নবীজি (ﷺ) পড়তে-লিখতে জানতেন না (সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৪৮), আর কুরআন এই অভিযোগের জবাব দিয়েছে: যার কথা তারা বলে, তার ভাষা অনারব, আর এই কুরআন স্পষ্ট আরবি (সূরা আন-নাহল ১৬:১০৩)।

প্রমাণিত নয় নবীজির (ﷺ) মাথার উপর সবসময় একখণ্ড মেঘ ছায়া দিত

মেঘের ছায়ার কথা আছে শুধু বাহিরার বর্ণনায়, যার মান নিয়েই মতভেদ। সবসময় মেঘ ছায়া দিত, এমন কোনো সহিহ বর্ণনা নেই; বরং হিজরতের দিন রোদ লাগলে আবু বকর (রা.) চাদর দিয়ে তাঁকে ছায়া দিয়েছিলেন (সহিহ বুখারী ৩৯০৬)।

এই গল্প থেকে আমার জীবনে

গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।

হালাল উপার্জন, কাজ যত ছোটই হোক

নবীজি (ﷺ) সামান্য পারিশ্রমিকে ছাগল চরিয়েছেন। আল্লাহ পবিত্র, পবিত্র উপার্জন ছাড়া কিছু কবুল করেন না।

আজকের কাজ: আপনার উপার্জনে কোনো সন্দেহজনক অংশ থাকলে আজই তা শুধরে নেওয়ার নিয়ত করুন; আর নিজের কাজকে ছোট ভাববেন না।

সহিহ বুখারী ২২৬২ সহিহসহিহ মুসলিম ১০১৫ সহিহ

জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো

হিলফুল ফুযূলে নবীজি (ﷺ) এক অচেনা বিদেশির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। জালিমকে থামানোও তাকে সাহায্য করা।

আজকের কাজ: আশেপাশে কেউ অন্যায়ের শিকার হলে চুপ না থেকে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ান: কথা দিয়ে, সাক্ষ্য দিয়ে বা সাহায্য করে।

সূরা আল-মায়িদা ৫:২ কুরআনসহিহ বুখারী ২৪৪৪ সহিহ

সত্যবাদিতা ও আমানতদারি

আল-আমীন নামটি এসেছিল বছরের পর বছর সত্য বলা আর আমানত রক্ষা থেকে। সত্য মানুষকে জান্নাতের পথে নিয়ে যায়।

আজকের কাজ: আজ সারাদিন ঠাট্টাতেও মিথ্যা বলবেন না; কারও ধার বা আমানত থাকলে ফেরত দেওয়ার দিন ঠিক করুন।

সহিহ বুখারী ৬০৯৪ সহিহ

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন

মক্কার মানুষ তাঁকে "আল-আমীন" ডাকত নবুয়তের আগেই। আজ আপনার পরিচিতরা আপনাকে এক শব্দে কী নামে ডাকবে? সেই শব্দটা বদলাতে আজ কী করা যায়?

সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
  • কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
  • সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
  • ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
  • মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
  • দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।

সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sirat/kishor/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার