وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
মা আমিনার ইন্তেকাল: দাদা আর চাচার কোলে
ছয় বছর বয়সে মা, আট বছরে দাদা। একের পর এক প্রিয় মানুষ হারিয়েও শিশুটি কখনো আশ্রয়হীন হননি; আল্লাহ প্রতিবার নতুন কোনো হাত পাঠিয়েছেন।
সীরাত · নবুয়তের আগে৫৭৬ - ৫৭৮ খ্রি. · ৬ থেকে ৮ বছর
- কখন
- আনুমানিক ৫৭৬ খ্রি. (মায়ের ইন্তেকাল), ৫৭৮ খ্রি. (দাদার ইন্তেকাল)
- কোথায়
- ইয়াসরিব (পরে মদিনা), আবওয়া, মক্কা
- কারা ছিলেন
- মা আমিনা, দাসী উম্মু আয়মান, দাদা আবদুল মুত্তালিব, চাচা আবু তালিব
- এই গল্পে
- পাঁচ-ছয় বছর থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত
কেন পড়বেন: মা-বাবা হারানোর কষ্ট যিনি নিজে বুঝেছেন, তিনিই আমাদের মা-বাবার সেবা আর কবর জিয়ারতের শিক্ষা দিয়েছেন। যাঁদের মা-বাবা এখনো জীবিত, তাঁদের জন্য এই গল্প একটা সতর্কবার্তা; আর যাঁরা হারিয়েছেন, তাঁদের জন্য সান্ত্বনা।
গল্প
বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।
- ১
পাঁচ-ছয় বছর বয়সে
মায়ের কোলে ফেরা
বনু সাদের মরুভূমি থেকে ফিরে শিশু মুহাম্মাদ (ﷺ) মা আমিনার কাছে মক্কায় থাকতে লাগলেন। বাবা নেই, কিন্তু মা আছেন, আছেন দাদা আবদুল মুত্তালিব। ঘরের কাজে সাহায্য করতেন উম্মু আয়মান, বাবার রেখে যাওয়া হাবশি দাসী, যাঁর আসল নাম বারাকা।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: মায়ের কাছে ফেরা ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১ম খণ্ড: উম্মু আয়মান ঐতিহাসিক বর্ণনা
উম্মু আয়মান সারাজীবন তাঁর পাশে ছিলেন। পরে নবীজি (ﷺ) তাঁকে মায়ের মতো সম্মান করতেন।
- ২
ছয় বছর বয়সে
ইয়াসরিবের সফর
ছয় বছর বয়সে মা আমিনা তাঁকে নিয়ে ইয়াসরিবে গেলেন, সেখানে বাবার নানার বংশ বনু আদী ইবনুন নাজ্জারের আত্মীয়দের দেখতে। সাথে ছিলেন উম্মু আয়মান। সেখানে তাঁরা প্রায় এক মাস থাকলেন।
অনেক বছর পর হিজরত করে মদিনায় এসে নবীজি (ﷺ) সেই বাড়িটি দেখিয়ে বলেছিলেন, এখানে আমার মা আমাকে নিয়ে থেকেছিলেন, আর বনু আদী ইবনুন নাজ্জারের পুকুরে আমি সাঁতার শিখেছিলাম।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আমিনার মদিনা সফর ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১ম খণ্ড: মদিনায় শৈশবের স্মৃতি ঐতিহাসিক বর্ণনা
ছোটবেলার একটি সফর, একটি পুকুর; পঞ্চাশ বছর পরেও তিনি মনে রেখেছিলেন। শিশুর সাথে কাটানো সময় সে ভোলে না।
- ৩
মক্কায় ফেরার পথে
আবওয়ার পথে বিদায়
ফেরার পথে মক্কা আর মদিনার মাঝে আবওয়া নামের জায়গায় মা আমিনা অসুস্থ হয়ে পড়লেন, আর সেখানেই ইন্তেকাল করলেন। তাঁকে আবওয়াতেই দাফন করা হলো।
ছয় বছরের শিশুটি বাবাকে দেখেননি, আর এখন মাকেও হারালেন, তাও বাড়ি থেকে দূরে, মরুভূমির পথে। উম্মু আয়মান তাঁকে নিয়ে মক্কায় দাদার কাছে ফিরলেন।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আমিনার ইন্তেকাল ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: আমিনার ইন্তেকাল ঐতিহাসিক বর্ণনা
দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির শৈশব কেটেছে একের পর এক বিদায়ে। আল্লাহ যাকে বড় কাজের জন্য তৈরি করেন, তাকে কখনো কষ্টের পথেও নেন।
- ৪
নবুয়তের পরে
বহু বছর পর মায়ের কবরে
অনেক বছর পর, নবী হিসেবে, তিনি সাহাবিদের নিয়ে আবওয়ার পথে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়ালেন। কাঁদলেন, আর তাঁর কান্না দেখে চারপাশের সবাই কাঁদল। তারপর বললেন:
নবী (ﷺ) তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করলেন; তিনি কাঁদলেন, আশপাশের সবাইকেও কাঁদালেন। তারপর বললেন: আমি আমার রবের কাছে মায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলাম, অনুমতি দেওয়া হয়নি; আর তাঁর কবর জিয়ারতের অনুমতি চেয়েছিলাম, অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই তোমরা কবর জিয়ারত করো, কারণ তা মৃত্যুকে মনে করিয়ে দেয়।
যিনি নিজের মায়ের জন্য কাঁদলেন, তিনিই আল্লাহর ফয়সালা মেনে নিলেন, আর সেই কষ্টের মুহূর্তেও উম্মতকে শিক্ষা দিলেন: কবর মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়।
সূত্রসহিহ মুসলিম ৯৭৬ সহিহ
মৃত্যুর কথা মনে রাখা মন নরম করে, আর দুনিয়ার লোভ কমায়।
- ৫
ছয় থেকে আট বছর
দাদার বিছানা
এবার দায়িত্ব নিলেন দাদা আবদুল মুত্তালিব, মক্কার নেতা। কাবার ছায়ায় তাঁর জন্য একটি বিশেষ বিছানা পাতা হতো; সম্মানের কারণে তাঁর ছেলেরাও তাতে না বসে চারপাশে বসত। কিন্তু ছোট্ট নাতিটি এসে সোজা সেই বিছানায় বসে পড়তেন। চাচারা তাঁকে সরাতে চাইলে দাদা বলতেন: আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও; আল্লাহর কসম, এর বড় মর্যাদা হবে। তারপর তাঁকে পাশে বসিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন।
কিন্তু এই স্নেহও বেশিদিন রইল না। নাতির বয়স যখন আট, আবদুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করলেন।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আবদুল মুত্তালিবের তত্ত্বাবধান ও ইন্তেকাল ঐতিহাসিক বর্ণনা
বড়দের মজলিসে ছোটদের জায়গা দেওয়া, তাদের সম্মান করা: এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
- ৬
আট বছর থেকে
চাচা আবু তালিবের ঘর
মৃত্যুর আগে আবদুল মুত্তালিব নাতির দায়িত্ব দিয়ে গেলেন আবু তালিবকে, যিনি ছিলেন নবীজির (ﷺ) বাবা আবদুল্লাহর আপন ভাই। আবু তালিবের সংসারে অভাব ছিল, সন্তানও অনেক; তবু তিনি ভাতিজাকে নিজের ছেলেদের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন, কাছে রাখতেন, সফরেও সাথে নিতেন।
এই আশ্রয় চলেছিল চল্লিশ বছরেরও বেশি। নবুয়তের পর যখন পুরো কুরাইশ শত্রু হয়ে গেল, তখনো আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ না করেও ভাতিজাকে রক্ষা করেছেন। এই দিনগুলোর কথাই আল্লাহ পরে মনে করিয়ে দিয়েছেন: তিনি কি তোমাকে এতিম পেয়ে আশ্রয় দেননি? (সূরা আদ-দুহা ৯৩:৬)
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আবু তালিবের তত্ত্বাবধান ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১ম খণ্ড ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা আদ-দুহা ৯৩:৬ কুরআন
আশ্রয় সবসময় ধনী ঘর থেকে আসে না। অভাবের সংসারও ভালোবাসায় বড় হতে পারে।
প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়
এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।
জাল আল্লাহ নবীজির (ﷺ) মা-বাবাকে জীবিত করেছিলেন, আর তাঁরা ঈমান এনে আবার মারা যান
ইবনুল জাওযী (আল-মাওদূআত) সহ মুহাদ্দিসগণ বর্ণনাটিকে জাল বলেছেন; এর সনদে অজ্ঞাত ও মিথ্যা বর্ণনাকারী আছে। সহিহ মুসলিমের হাদিস (সহিহ মুসলিম ৯৭৬) এর বিপরীত। এ বিষয়ে আদব হলো, সহিহ হাদিসে যতটুকু এসেছে ততটুকুই বলা, আর বাকিটা আল্লাহর জ্ঞানে ছেড়ে দেওয়া।
দুর্বল এতিমের মাথায় হাত বুলালে প্রতিটি চুলের বদলে একটি করে নেকি
মুসনাদে আহমাদের এই বর্ণনার সনদে আলী ইবনে ইয়াযীদ আল-আলহানী নামের দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন; আলবানী একে দুর্বল বলেছেন। এতিমের প্রতি দয়ার ফযিলতে সহিহ হাদিসই যথেষ্ট: এতিমের দায়িত্ব নিলে জান্নাতে নবীজির (ﷺ) পাশে (সহিহ বুখারী ৫৩০৪)।
এই গল্প থেকে আমার জীবনে
গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।
কবর জিয়ারত ও মৃতদের জন্য দোয়া
নবীজি (ﷺ) নিজে মায়ের কবর জিয়ারত করেছেন, আর বলেছেন কবর মৃত্যুর কথা মনে করায়। কবরস্থানে গিয়ে কী বলতে হবে, তাও শিখিয়েছেন।
আজকের কাজ: এই সপ্তাহে কাছের কবরস্থানে গিয়ে সালাম দিন ("আস-সালামু আলাইকুম আহলাদ দিয়ার..."), আর নিজের মৃত্যুর কথা একটু ভাবুন।
সহিহ মুসলিম ৯৭৬ সহিহসহিহ মুসলিম ৯৭৫ সহিহ
মা-বাবা থাকতে তাঁদের সেবা
নবীজি (ﷺ) মাকে পেয়েছিলেন মাত্র ছয় বছর। আল্লাহ মা-বাবার সাথে সদাচরণের আদেশ দিয়েছেন, আর তাঁদের জন্য দোয়া শিখিয়েছেন।
আজকের কাজ: আজ মা-বাবার খোঁজ নিন, সম্ভব হলে নিজ হাতে কিছু করে দিন; আর নামাজের পর পড়ুন: রব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানী সাগীরা।
সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩ কুরআনসূরা আল-ইসরা ১৭:২৪ কুরআনসহিহ বুখারী ৫৯৭১ সহিহ
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা
মা আমিনা ছেলেকে নিয়ে দূরের আত্মীয়দের দেখতে গিয়েছিলেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে আল্লাহ রিযিক ও আয়ুতে বরকত দেন।
আজকের কাজ: অনেক দিন যোগাযোগ নেই এমন একজন আত্মীয়কে আজ ফোন করুন।
সহিহ বুখারী ৫৯৮৬ সহিহ
ছয় বছরে মা, আট বছরে দাদা; তবু আল্লাহ তাঁকে কখনো একা ছাড়েননি। আপনার জীবনে কারা আশ্রয় হয়ে পাশে ছিলেন? শেষ কবে তাঁদের জন্য দোয়া করেছেন?
সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
- কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
- সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
- ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
- মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
- দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।
সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।