deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ

মক্কায় জন্ম: হাতির বছরে এক এতিম শিশু

হাতির বাহিনী ধ্বংস হওয়ার বছর, মক্কায় এক সোমবারে জন্ম নিলেন এক শিশু, যিনি বাবাকে কখনো দেখেননি। সেই এতিম শিশুকেই আল্লাহ সারা জগতের জন্য রহমত বানালেন।

৮ দৃশ্য৭ হাদিস১৪ আয়াত

সীরাত · নবুয়তের আগে৫৭০/৫৭১ খ্রি. · জন্ম থেকে ৫ বছর

কখন
হাতির বছর (আনুমানিক ৫৭০/৫৭১ খ্রি.), রবিউল আউয়াল মাসের এক সোমবার
কোথায়
মক্কা, কুরাইশ গোত্রের বনু হাশিম পরিবার
পরিবার
পিতা আবদুল্লাহ (জন্মের আগেই মৃত), মা আমিনা বিনতে ওয়াহব, দাদা আবদুল মুত্তালিব
এই গল্পে
জন্মের আগের কয়েক মাস থেকে চার-পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত

কেন পড়বেন: যাঁকে আমরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার দাবি করি, তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল অভাব আর হারানো দিয়ে। এই গল্প পড়লে বোঝা যায়, কষ্ট মানেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নয়; আর এতিম, দুর্বল ও একা মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেন তাঁর সুন্নাহর এত বড় অংশ।

গল্প

বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।

  1. ১

    জন্মের কিছুদিন আগে

    আবরাহার অহংকার

    ইয়েমেন তখন হাবশার (ইথিওপিয়ার) রাজার অধীনে, শাসক আবরাহা। সে সানআ শহরে বিশাল এক গির্জা বানাল, যাতে আরবরা কাবা ছেড়ে সেখানে হজ করতে আসে। আরবরা তা মানল না। রেগে গিয়ে আবরাহা ঠিক করল, কাবাই ভেঙে ফেলবে। বিশাল বাহিনী নিয়ে সে মক্কার দিকে রওনা দিল, সামনে একটি বড় হাতি; আরবরা এমন দৃশ্য আগে দেখেনি।

    মক্কার কাছে পৌঁছে তার লোকেরা কুরাইশদের পশু লুট করল, তার মধ্যে মক্কার নেতা আবদুল মুত্তালিবের দুইশো উটও ছিল। আবদুল মুত্তালিব আবরাহার সাথে দেখা করতে গেলেন। আবরাহা ভেবেছিল, তিনি কাবা না ভাঙার অনুরোধ করবেন; কিন্তু তিনি শুধু নিজের উট ফেরত চাইলেন। অবাক আবরাহাকে তিনি বললেন: আমি উটের মালিক; আর এই ঘরের একজন রব আছেন, তিনিই একে রক্ষা করবেন। তারপর তিনি কুরাইশদের পাহাড়ে সরে যেতে বললেন।

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আবরাহা ও হাতির ঘটনা (ইবনে ইসহাক থেকে) ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম: সূরা আল-ফীল ঐতিহাসিক বর্ণনা

    শক্তি আর সংখ্যার অহংকার নিয়ে এসেছিল আবরাহা। কিন্তু ঘরটা যাঁর, তিনি আল্লাহ।

  2. ২

    হাতির বছর

    আকাশ ভরা পাখি

    আবরাহা মক্কায় ঢোকার প্রস্তুতি নিল। সীরাতের বর্ণনায় আছে, হাতিটিকে মক্কার দিকে ফেরালেই সে বসে পড়ত, অন্য দিকে ফেরালে উঠে চলত। এর সমর্থন আছে নবীজির (ﷺ) নিজের কথায়: বহু বছর পর হুদায়বিয়ায় তাঁর উটনী কাসওয়া বসে পড়লে লোকেরা বলল, কাসওয়া অবাধ্য হয়েছে। তিনি বললেন: কাসওয়া অবাধ্য হয়নি, এটা তার স্বভাবও নয়; তাকে আটকেছেন তিনিই, যিনি হাতিকে আটকেছিলেন।

    তারপর আল্লাহ ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠালেন। তারা পোড়া মাটির পাথর ছুড়ে মারল, আর পুরো বাহিনী খেয়ে ফেলা ভুসির মতো হয়ে গেল। আল্লাহ এই ঘটনা কুরআনে পুরো একটি সূরায় রেখে দিয়েছেন:

    وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْرًا أَبَابِيلَ

    আর তাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠান

    تَرْمِيهِم بِحِجَارَةٍ مِّن سِجِّيلٍ

    যারা তাদের উপর শক্ত পোড়ামাটির কঙ্কর নিক্ষেপ করে।

    فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفٍ مَّأْكُولٍ

    অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণ-সদৃশ করেন।

    সূত্রসূরা আল-ফীল ১০৫:১ কুরআনসহিহ বুখারী ২৭৩১ (হুদায়বিয়ার দীর্ঘ হাদিস: حَبَسَهَا حَابِسُ الْفِيلِ) সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: হাতির বসে পড়া ও বাহিনীর পরিণতি ঐতিহাসিক বর্ণনা

    যে মানুষগুলো নিজের চোখে এই ঘটনা দেখেছিল, তাদের সামনেই এই সূরা পড়া হয়েছে। কেউ অস্বীকার করতে পারেনি।

  3. ৩

    জন্মের আগে

    বাবাকে না দেখা এক সন্তান

    এই সময় বনু হাশিম পরিবারে এক সন্তানের অপেক্ষা চলছিল। মা আমিনা বিনতে ওয়াহব। বাবা আবদুল্লাহ, আবদুল মুত্তালিবের ছেলে, ব্যবসার কাফেলা নিয়ে সিরিয়া থেকে ফেরার পথে ইয়াসরিবে (পরে মদিনা) অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখানে নিজের নানার বংশ বনু নাজ্জারের কাছে তাঁর মৃত্যু হয়, সেখানেই কবর।

    তাই শিশুটি দুনিয়ায় এল বাবাকে না দেখেই। কিছু বর্ণনায় আছে, বাবা জন্মের কয়েক মাস পরে মারা যান; তবে বেশিরভাগ সীরাতবিদ জন্মের আগের মতটিই নিয়েছেন। অনেক বছর পর আল্লাহ তাঁকে এই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন:

    أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ

    তিনি কি আপনাকে ইয়াতীম অবস্থায় পান নি? অতঃপর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন ;

    সূত্রসূরা আদ-দুহা ৯৩:৬ কুরআনইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আবদুল্লাহর মৃত্যু ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১ম খণ্ড ঐতিহাসিক বর্ণনা

    সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির জীবনের শুরুটাই ছিল হারানো দিয়ে। কষ্ট আল্লাহর অসন্তুষ্টির চিহ্ন নয়।

  4. ৪

    রবিউল আউয়াল, সোমবার

    এক সোমবারের ভোর

    রবিউল আউয়াল মাসের এক সোমবারে তাঁর জন্ম। দিনটি যে সোমবার, তা নবীজি (ﷺ) নিজেই বলেছেন। সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন:

    وَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الاِثْنَيْنِ قَالَ ‏"‏ ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ وَيَوْمٌ بُعِثْتُ أَوْ أُنْزِلَ عَلَىَّ فِيهِ

    নবীজি (ﷺ)-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেন: এই দিনে আমার জন্ম হয়েছে, আর এই দিনেই আমাকে নবী হিসেবে পাঠানো হয়েছে (বা আমার উপর ওহী নাজিল হয়েছে)।

    সহিহ মুসলিম ১১৬২সহিহবর্ণনাকারী: আবু কাতাদা আল-আনসারী (রা.)

    বছরটি ছিল সেই হাতির বছর; বেশিরভাগ আলেম ও সীরাতবিদের মত এটাই, খ্রিস্টাব্দের হিসাবে ৫৭০ বা ৫৭১ সাল। কিন্তু মাসের ঠিক কোন তারিখে, তা কোনো সহিহ হাদিসে আসেনি। তাই সীরাতবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে: কেউ ৮, কেউ ৯, কেউ ১২ রবিউল আউয়াল বলেছেন। নিশ্চিত শুধু দিনটি: সোমবার।

    সূত্রসহিহ মুসলিম ১১৬২ সহিহইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: জন্মের বছর ও তারিখের মতভেদ ঐতিহাসিক বর্ণনাসুনানে তিরমিযী ৩৬১৯: কায়েস ইবনে মাখরামা (রা.), "আমি আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাতির বছরে জন্মেছি"; সনদ দুর্বল (আলবানী, আহমাদ শাকির) দুর্বল

    নবীজি (ﷺ) নিজের জন্মের দিনে কী করতেন? আল্লাহর শুকরিয়া হিসেবে রোজা রাখতেন।

  5. ৫

    জন্মের সময়

    মায়ের দেখা আলো

    পরে নবীজি (ﷺ) নিজের শুরুর কথা বলতে গিয়ে বলেছেন: আমি আমার পিতা ইবরাহীমের দোয়া, ঈসার দেওয়া সুসংবাদ, আর আমার মায়ের সেই দেখা দৃশ্য, যা তিনি আমার জন্মের সময় দেখেছিলেন: তাঁর থেকে এক আলো বের হলো, যাতে সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়ে গেল।

    কাবা বানানোর সময় ইবরাহীম (আ.) দোয়া করেছিলেন, এই জনপদের মানুষের মধ্য থেকেই যেন একজন রাসূল আসেন; আর ঈসা (আ.) সুসংবাদ দিয়েছিলেন "আহমাদ" নামের এক রাসূলের। হাজার হাজার বছরের সেই দোয়া আর সুসংবাদ পূর্ণ হলো এই শিশুর মাধ্যমে।

    সূত্রমুসনাদে আহমাদ ১৭১৫০ (ইরবাদ ইবনে সারিয়া রা.); অন্য সনদের সমর্থনে সহিহ: আলবানী, সিলসিলা সহিহা ১৫৪৫; শুআইব আরনাউত সহিহসূরা আল-বাকারা ২:১২৯ কুরআনসূরা আস-সাফ ৬১:৬ কুরআন

    আল্লাহর পরিকল্পনা শত শত বছর ধরে চলে। আজকের দোয়ার ফল হয়তো আপনার পরের প্রজন্ম দেখবে।

  6. ৬

    জন্মের পর

    নাম রাখা হলো মুহাম্মাদ

    জন্মের খবর পেয়ে দাদা আবদুল মুত্তালিব এলেন। শিশুটিকে কোলে নিয়ে কাবায় গেলেন, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানালেন, আর নাম রাখলেন মুহাম্মাদ, মানে "যাঁর অনেক প্রশংসা করা হয়"। আরবে তখন এই নাম খুব প্রচলিত ছিল না।

    আল্লাহ সেই নামকে সত্য করেছেন। আজও প্রতিদিন পাঁচবার আজানে, প্রতিটি নামাজের তাশাহহুদে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়:

    وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ

    আর আমরা আপনার (মর্যাদা বৃদ্ধির) জন্য আপনার স্মরণকে সমুন্নত করেছি।

    নবীজি (ﷺ) নিজের নামগুলো সম্পর্কে বলেছেন:

    لِي خَمْسَةُ أَسْمَاءٍ أَنَا مُحَمَّدٌ، وَأَحْمَدُ، وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِي يَمْحُو اللَّهُ بِي الْكُفْرَ، وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِي يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمِي، وَأَنَا الْعَاقِبُ

    আমার পাঁচটি নাম: আমি মুহাম্মাদ (অনেক প্রশংসিত), আমি আহমাদ (সবচেয়ে বেশি প্রশংসাকারী), আমি আল-মাহী, যার মাধ্যমে আল্লাহ কুফর মুছে দেন; আমি আল-হাশির, যার পেছনে মানুষকে (কিয়ামতে) জড়ো করা হবে; আর আমি আল-আকিব (সবার শেষে আসা নবী)।

    সহিহ বুখারী ৩৫৩২সহিহবর্ণনাকারী: জুবাইর ইবনু মুতইম (রা.)

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: জন্ম ও দাদার নাম রাখা ঐতিহাসিক বর্ণনাসহিহ বুখারী ৩৫৩২ সহিহসূরা আশ-শারহ ৯৪:৪ কুরআন

    নামের অর্থ যেমন, জীবনও তেমন হোক: সন্তানের জন্য সুন্দর অর্থের নাম রাখা সুন্নাহর শিক্ষা।

  7. ৭

    প্রথম দুই বছর

    দুধমা: সুওয়াইবা, তারপর হালিমা

    প্রথম কয়েক দিন তাঁকে দুধ পান করান সুওয়াইবা, আবু লাহাবের মুক্ত করা দাসী। নবীজি (ﷺ) নিজে এ কথা বলেছেন:

    أَرْضَعَتْنِي وَأَبَا سَلَمَةَ ثُوَيْبَةُ فَلاَ تَعْرِضْنَ عَلَىَّ بَنَاتِكُنَّ وَلاَ أَخَوَاتِكُنَّ

    (নবীজি বললেন:) আমাকে আর আবু সালামাকে সুওয়াইবা দুধ পান করিয়েছে। তাই তোমরা তোমাদের মেয়ে বা বোনদের (বিয়ের জন্য) আমার কাছে পেশ কোরো না।

    সহিহ বুখারী ৫১০১সহিহবর্ণনাকারী: উম্মু হাবীবা (রা.)

    মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোর রীতি ছিল, শিশুকে কয়েক বছরের জন্য মরুভূমির গোত্রে পাঠানো, যাতে খোলা পরিবেশে সুস্থ হয়ে বেড়ে ওঠে আর বিশুদ্ধ আরবি শেখে। বনু সাদ গোত্রের কয়েকজন নারী দুধশিশুর খোঁজে মক্কায় এলেন, তাঁদের একজন হালিমা সাদিয়া। সে বছর ছিল দুর্ভিক্ষ, তাঁর গাধাটি দুর্বল, উটনীর দুধও শুকিয়ে গিয়েছিল।

    এতিম শিশুটিকে কেউ নিতে চায়নি, কারণ বাবা না থাকলে ভালো পারিশ্রমিকের আশা কম। খালি হাতে ফেরার চেয়ে হালিমা তাঁকেই নিলেন। হালিমা পরে বলেছেন, তারপর থেকে তাঁদের ঘরে বরকত নেমে এল: তাঁর দুধ বেড়ে গেল, উটনী দুধ দিতে শুরু করল, আর দুর্বল গাধাটি কাফেলার সবার আগে চলতে লাগল।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৫১০১ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: হালিমা সাদিয়ার বর্ণনা (ইবনে ইসহাক থেকে); সনদে দুর্বলতা আছে, তবে সীরাতবিদরা গ্রহণ করেছেন ঐতিহাসিক বর্ণনা

    যে শিশুকে সবাই ফিরিয়ে দিয়েছিল, তাকে যে ঘর আপন করল, সেই ঘরেই বরকত এল। এতিমের দায়িত্ব নেওয়া মানুষকে নবীজি (ﷺ) জান্নাতে নিজের পাশে থাকার সুসংবাদ দিয়েছেন (সহিহ বুখারী ৫৩০৪)।

  8. ৮

    চার-পাঁচ বছর বয়সে

    বনু সাদের মাঠে বক্ষ বিদারণ

    বনু সাদের মরুভূমিতে তিনি অন্য শিশুদের সাথে খেলতেন। একদিন খেলার সময় জিবরীল (আ.) এলেন। তাঁকে শুইয়ে বুক চিরলেন, হৃৎপিণ্ড বের করে তা থেকে একটি জমাট রক্তের টুকরো ফেলে দিলেন আর বললেন: এটা তোমার মধ্যে শয়তানের অংশ ছিল। তারপর একটি সোনার পাত্রে যমযমের পানি দিয়ে তা ধুয়ে আবার জায়গামতো বসিয়ে দিলেন।

    শিশুরা দৌড়ে দুধমায়ের কাছে গিয়ে বলল: মুহাম্মাদকে মেরে ফেলা হয়েছে! সবাই ছুটে এসে দেখল, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, চেহারা ফ্যাকাশে। আনাস (রা.) বলেন: আমি তাঁর বুকে সেই সেলাইয়ের দাগ দেখতাম।

    সীরাতের বর্ণনায় আছে, এই ঘটনার পর হালিমা ভয় পেয়ে তাঁকে মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে যান।

    সূত্রসহিহ মুসলিম ১৬২ (আনাস রা.; এই হাদিসের তৃতীয় বর্ণনা) সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক বর্ণনা

    আল্লাহ তাঁকে ছোটবেলা থেকেই শয়তানের প্রভাব থেকে পবিত্র রেখে বড় দায়িত্বের জন্য তৈরি করছিলেন।

প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়

এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।

দুর্বল জন্মরাতে কিসরার প্রাসাদের ১৪টি মিনার ভেঙে পড়া, পারস্যের হাজার বছরের আগুন নিভে যাওয়া

বায়হাকীর দালাইলুন নুবুওয়াহ ও অন্য কিছু বইয়ে বর্ণনাটি আছে, কিন্তু সনদে অজ্ঞাত ও দুর্বল বর্ণনাকারী আছে; মুহাদ্দিসগণ একে প্রমাণ হিসেবে নেননি। সহিহ সূত্রে যা আছে, তা হলো মায়ের দেখা আলো (উপরের ৫ নম্বর দৃশ্য)। বিস্তারিত: জন্মরাতের গল্প যাচাই।

দুর্বল নবীজি (ﷺ) খতনা করা ও নাড়ি কাটা অবস্থায় জন্মেছেন

এ বিষয়ের কোনো বর্ণনাই সহিহ নয়। হাকিম একে "মুতাওয়াতির" বললে যাহাবী তা প্রত্যাখ্যান করেন; ইবনুল কাইয়িম (যাদুল মাআদ) বলেছেন, এ বিষয়ে প্রমাণিত কোনো হাদিস নেই।

ভিত্তিহীন "আল্লাহ সবকিছুর আগে নবীজির (ﷺ) নূর সৃষ্টি করেছেন" (জাবির রা.-এর নামে)

কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থে এর সনদ নেই। সহিহ হাদিসে আছে, আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি কলম (সুনানে আবু দাউদ ৪৭০০)। আর কুরআন নবীজিকে (ﷺ) দিয়ে বলিয়েছে: আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার কাছে ওহী আসে (সূরা আল-কাহফ ১৮:১১০)।

প্রমাণ নয় আবু লাহাব জন্মের খুশিতে দাসী মুক্ত করেছিল, তাই প্রতি সোমবার তার আজাব হালকা হয়

সহিহ বুখারী ৫১০১-এর শেষে এটা তাবিঈ উরওয়ার নিজের কথা (মুরসাল): আবু লাহাবের মৃত্যুর পর তার এক আত্মীয় তাকে স্বপ্নে দেখেছিল। এতে "জন্মের খুশি" বা "সোমবার" কথাটা নেই, আর স্বপ্ন দিয়ে দ্বীনের কোনো বিধান প্রমাণ হয় না। মুক্ত করার সময় নিয়েও ভিন্ন বর্ণনা আছে (ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী, এই হাদিসের ব্যাখ্যা)।

সুন্নাহয় নেই জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ মিলাদ বা উৎসব

নবীজি (ﷺ) নিজের জন্মের দিনে শুকরিয়া জানিয়েছেন রোজা রেখে (সহিহ মুসলিম ১১৬২)। সাহাবি, তাবিঈ ও চার ইমামের যুগে জন্মদিন উদযাপনের কোনো চর্চা ছিল না, পরে চালু হয়েছে। ভালোবাসার আসল প্রকাশ তাঁর অনুসরণ (সূরা আলে ইমরান ৩:৩১); আর ইবাদতে নিজের থেকে নতুন কিছু যোগ করা প্রত্যাখ্যাত (সহিহ মুসলিম ১৭১৮)।

এই গল্প থেকে আমার জীবনে

গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।

সোমবারের রোজা

নবীজি (ﷺ) নিজের জন্মের দিনকে কৃতজ্ঞতার দিন বানিয়েছেন, রোজা রেখে।

আজকের কাজ: এই সোমবার একটি নফল রোজা রাখুন। শুরুতে মাসে একটি হলেও।

সহিহ মুসলিম ১১৬২ সহিহ

এতিমের পাশে দাঁড়ানো

যিনি নিজে এতিম ছিলেন, আল্লাহ তাঁকে বললেন: এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না। আর এতিমের দায়িত্ব নিলে জান্নাতে নবীজির (ﷺ) পাশে থাকার সুসংবাদ।

আজকের কাজ: আত্মীয় বা এলাকার একজন এতিম শিশুর খোঁজ নিন; সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত সাহায্যের নিয়ত করুন।

সূরা আদ-দুহা ৯৩:৯ কুরআনসহিহ বুখারী ৫৩০৪ সহিহ

চেষ্টা করে আল্লাহর উপর ভরসা

আবরাহার বিশাল বাহিনী কাবার কিছুই করতে পারেনি। যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।

আজকের কাজ: যে দুশ্চিন্তা আপনাকে চাপ দিচ্ছে, সাধ্যমতো চেষ্টা করুন, তারপর আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দোয়া করুন।

সূরা আত-তালাক ৬৫:৩ কুরআন

ভালোবাসা মানে অনুসরণ ও দরূদ

নবীজিকে (ﷺ) ভালোবাসার প্রমাণ তাঁর সুন্নাহ মানা। আর একবার দরূদ পড়লে আল্লাহ দশবার রহমত পাঠান।

আজকের কাজ: আজ থেকে প্রতিদিন অন্তত দশবার দরূদ পড়ুন, যেমন নামাজের দরূদে ইবরাহীম।

সূরা আলে ইমরান ৩:৩১ কুরআনসূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৬ কুরআনসহিহ মুসলিম ৪০৮ সহিহ

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন

যে এতিম শিশুকে কেউ নিতে চায়নি, আল্লাহ তাঁকেই সারা জগতের জন্য রহমত বানালেন (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১০৭)। আপনার জীবনের কোন কষ্টকে আপনি এখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টি ভাবছেন?

সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
  • কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
  • সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
  • ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
  • মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
  • দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।

সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sirat/jonmo/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার