وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
খাদিজা (রা.)-এর সাথে বিয়ে: বিশ্বস্ততা থেকে ভালোবাসা
যে নারী তাঁর সততা দেখে ব্যবসার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনিই হলেন জীবনসঙ্গী। পঁচিশ বছরের সেই সংসারে নবীজি (ﷺ) আর কাউকে বিয়ে করেননি, আর মৃত্যুর পরেও তাঁকে ভোলেননি।
সীরাত · নবুয়তের আগে৫৯৫ খ্রি. · ২৫ বছর
- কখন
- আনুমানিক ৫৯৫ খ্রি., নবীজির (ﷺ) বয়স ২৫
- কোথায়
- মক্কা; তার আগে সিরিয়ায় বাণিজ্য সফর
- কারা ছিলেন
- খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.), তাঁর দাস মাইসারা, চাচা আবু তালিব ও হামযা, খাদিজার চাচা আমর ইবনে আসাদ
- এই গল্পে
- বাণিজ্য সফর থেকে পঁচিশ বছরের সংসার
কেন পড়বেন: বিয়ের ভিত্তি কী হওয়া উচিত, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের কাছে কতটা কৃতজ্ঞ থাকতে পারে, আর ভালোবাসা মৃত্যুর পরেও কীভাবে বেঁচে থাকে: এই গল্প আমাদের পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে সুন্দর আদর্শ।
গল্প
বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।
- ১
বিয়ের আগে
মক্কার সম্মানিত ব্যবসায়ী নারী
খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ ছিলেন কুরাইশের বনু আসাদ গোত্রের সম্ভ্রান্ত, ধনী ও সম্মানিত নারী। নিজের পুঁজি দিয়ে লোক নিয়োগ করে ব্যবসা চালাতেন, লাভের একটি অংশ তাদের দিতেন। পবিত্র জীবনযাপনের জন্য জাহিলিয়াতের যুগেও তাঁকে "তাহিরা" (পবিত্র নারী) বলা হতো।
তিনি যুবক মুহাম্মাদের (ﷺ) সত্যবাদিতা, আমানতদারি আর সুন্দর চরিত্রের কথা শুনলেন। তাঁকে প্রস্তাব দিলেন, তাঁর পণ্য নিয়ে সিরিয়া যেতে, অন্যদের চেয়ে বেশি লাভের ভাগে; সাথে যাবে তাঁর দাস মাইসারা।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: খাদিজার ব্যবসা ও সিরিয়া সফরের প্রস্তাব ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৮ম খণ্ড: খাদিজা (রা.) ঐতিহাসিক বর্ণনা
সততার সুনাম সবচেয়ে বড় পুঁজি। এই সুনামই তাঁকে খাদিজার (রা.) কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।
- ২
বিয়ের কিছু আগে
সিরিয়ার বাণিজ্য সফর
তিনি খাদিজার (রা.) পণ্য নিয়ে মাইসারার সাথে সিরিয়া গেলেন, কেনাবেচা করে ফিরলেন। ব্যবসায় এত লাভ হলো, যা আগে কখনো হয়নি।
ফিরে মাইসারা পুরো সফরের কথা খাদিজাকে (রা.) শোনাল: তাঁর লেনদেনের সততা, কোমল আচরণ, আর এমন কিছু বিষয়, যা তাকে অবাক করেছিল। খাদিজা (রা.) মুগ্ধ হলেন।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: মাইসারার সাথে সফর ঐতিহাসিক বর্ণনা
ব্যবসায় সততা শুধু আখিরাতের জন্য নয়, দুনিয়াতেও বরকত আনে (সহিহ বুখারী ২০৭৯)।
- ৩
৫৯৫ খ্রি.
বিয়ের প্রস্তাব
খাদিজা (রা.) আগে দুবার বিধবা হয়েছিলেন; কুরাইশের বহু নেতা তাঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, তিনি রাজি হননি। এবার তিনি নিজেই তাঁর বান্ধবী নাফীসা বিনতে মুনইয়াকে পাঠালেন, যুবক মুহাম্মাদের (ﷺ) মত জানতে। তিনি রাজি হলেন।
নবীজির (ﷺ) চাচারা, আবু তালিব ও হামযা, প্রস্তাব নিয়ে গেলেন খাদিজার (রা.) চাচা আমর ইবনে আসাদের কাছে। বিয়ে হলো; মোহর ছিল বিশটি জোয়ান উট। বিয়ের খুতবা দিলেন আবু তালিব।
সীরাতের প্রসিদ্ধ বর্ণনায় তখন নবীজির (ﷺ) বয়স পঁচিশ, আর খাদিজার (রা.) চল্লিশ। তবে খাদিজার (রা.) বয়স নিয়ে ভিন্ন বর্ণনাও আছে; চল্লিশের কথাটি ওয়াকিদীর সূত্রে, যিনি দুর্বল বর্ণনাকারী। অন্য বর্ণনায় আঠাশ।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: খাদিজার সাথে বিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৮ম খণ্ড (ওয়াকিদীর সূত্রে বয়স ৪০) ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: খাদিজার বয়স নিয়ে মতভেদ (২৮ বছরের বর্ণনা) ঐতিহাসিক বর্ণনা
একজন নারী নিজে থেকে সৎ পুরুষের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে পারেন, সম্মান আর লজ্জা বজায় রেখে।
- ৪
৫৯৫ - ৬১৯ খ্রি.
পঁচিশ বছরের সংসার
এই সংসারে আল্লাহ তাঁদের সন্তান দিলেন: ছেলে কাসিম (তাঁর নামেই নবীজির (ﷺ) ডাকনাম "আবুল কাসিম") ও আবদুল্লাহ, আর মেয়ে যাইনাব, রুকাইয়া, উম্মু কুলসুম ও ফাতিমা (রা.)। দুই ছেলেই শৈশবে মারা যান। ইবরাহীম ছাড়া নবীজির (ﷺ) সব সন্তান খাদিজার (রা.) গর্ভে।
খাদিজা (রা.) স্বামীকে উপহার দিলেন এক কিশোর দাস, যায়েদ ইবনে হারিসা। নবীজি (ﷺ) তাঁকে মুক্ত করে দিলেন। পরে যায়েদের বাবা তাঁকে নিতে এলে নবীজি (ﷺ) তাঁকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিলেন; যায়েদ বাবার বদলে নবীজিকেই (ﷺ) বেছে নিলেন। কুরআনে নাম ধরে উল্লেখ করা একমাত্র সাহাবি তিনিই (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৭)।
খাদিজা (রা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত নবীজি (ﷺ) আর কোনো বিয়ে করেননি:
لَمْ يَتَزَوَّجِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى خَدِيجَةَ حَتَّى مَاتَتْ
খাদিজা (রা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত নবীজি (ﷺ) আর কোনো বিয়ে করেননি।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: নবীজির (ﷺ) সন্তান ও যায়েদ ইবনে হারিসা ঐতিহাসিক বর্ণনাসহিহ মুসলিম ২৪৩৬ সহিহসূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৭ কুরআন
পঁচিশ বছরের এক স্ত্রীর সংসার, যার প্রথম পনেরো বছর নবুয়তের আগে। নবীজির (ﷺ) পারিবারিক জীবনের বড় অংশ এটাই।
- ৫
খাদিজার (রা.) ইন্তেকালের পর
যে ভালোবাসা মৃত্যুতেও শেষ হয়নি
নবুয়তের প্রথম দিন থেকে খাদিজা (রা.) ছিলেন সবচেয়ে বড় সহায়: সবার আগে ঈমান এনেছেন, সম্পদ দিয়েছেন, বয়কটের কষ্ট ভাগ করেছেন। আল্লাহ জিবরীলের মাধ্যমে তাঁকে সালাম পাঠিয়েছেন আর জান্নাতে মুক্তার ঘরের সুসংবাদ দিয়েছেন (সহিহ বুখারী ৩৮২০)।
তাঁর ইন্তেকালের বহু বছর পরেও নবীজি (ﷺ) তাঁর কথা বলতেন। আয়েশা (রা.) বলেন:
নবীজির (ﷺ) কোনো স্ত্রীর প্রতি আমার এত ঈর্ষা হয়নি, যত হয়েছে খাদিজার প্রতি; অথচ আমি তাঁকে দেখিনি। নবীজি (ﷺ) তাঁর কথা খুব বেশি বলতেন। কখনো ছাগল জবাই করে টুকরো করে খাদিজার বান্ধবীদের কাছে পাঠাতেন। আমি কখনো বলতাম: যেন দুনিয়ায় খাদিজা ছাড়া আর কোনো নারী নেই! তিনি বলতেন: সে এমন ছিল, এমন ছিল; আর তার থেকেই আমার সন্তান হয়েছে।
একদিন আয়েশা (রা.) খাদিজার (রা.) কথা তুলে তাঁকে রাগিয়ে দিলে তিনি শুধু বললেন:
আমাকে তার ভালোবাসা দান করা হয়েছে
(সহিহ মুসলিম ২৪৩৫)। আর বলেছেন, এই উম্মতের নারীদের মধ্যে সেরা খাদিজা (সহিহ বুখারী ৩৮১৫)।সূত্রসহিহ বুখারী ৩৮১৮ সহিহসহিহ মুসলিম ২৪৩৫ সহিহসহিহ বুখারী ৩৮১৫ সহিহসহিহ বুখারী ৩৮২০ সহিহ
জীবনসঙ্গীর বন্ধুদের সম্মান করা, তার মৃত্যুর পরেও তার ভালো কথা বলা: এটা নবীজির (ﷺ) সুন্নাহ।
প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়
এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।
দুর্বল খাদিজার (রা.) বাবাকে মদ খাইয়ে বিয়েতে রাজি করানো হয়েছিল
ইবনে সাদ বর্ণনাটি এনে ওয়াকিদীর কথাও উল্লেখ করেছেন যে, এটা ভুল। নির্ভরযোগ্য বর্ণনামতে খাদিজার (রা.) বাবা খুওয়াইলিদ ফিজার যুদ্ধের আগেই মারা যান, আর বিয়ে দেন তাঁর চাচা আমর ইবনে আসাদ।
নিশ্চিত নয় বিয়ের সময় খাদিজার (রা.) বয়স নিশ্চিতভাবে চল্লিশ
চল্লিশ বছরের কথাটি প্রসিদ্ধ, কিন্তু তা এসেছে ওয়াকিদীর সূত্রে; কোনো সহিহ সনদে খাদিজার (রা.) নির্দিষ্ট বয়স আসেনি। অন্য বর্ণনায় আঠাশ। তাই নিশ্চিত করে কোনো একটি বলা ঠিক নয়।
এই গল্প থেকে আমার জীবনে
গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।
দ্বীন ও চরিত্র দেখে বিয়ে
খাদিজা (রা.) সম্পদ বা বংশ নয়, চরিত্র দেখে জীবনসঙ্গী বেছেছিলেন। নবীজি (ﷺ) দ্বীনদারিকেই প্রধান বলেছেন।
আজকের কাজ: নিজের বা পরিবারের কারও বিয়ের আলোচনায় প্রথম প্রশ্নটি হোক: তার নামাজ, সততা আর আচরণ কেমন?
সহিহ বুখারী ৫০৯০ সহিহ
জীবনসঙ্গীর প্রতি কৃতজ্ঞতা
নবীজি (ﷺ) খাদিজার (রা.) অবদান কখনো ভোলেননি, তাঁর বান্ধবীদের পর্যন্ত উপহার পাঠাতেন। পরিবারের কাছে যে ভালো, সে-ই সবচেয়ে ভালো মানুষ।
আজকের কাজ: আজ জীবনসঙ্গী (বা মা-বাবা) আপনার জন্য যা করেন, তার একটির জন্য মুখে ধন্যবাদ দিন; তাঁর কোনো আত্মীয় বা বন্ধুর খোঁজ নিন।
সহিহ বুখারী ৩৮১৮ সহিহজামে আত-তিরমিযী ৩৮৯৫ সহিহ
ব্যবসায় সততা
সিরিয়ার সফরে লাভ এসেছিল সততা থেকে। সত্য বললে ও দোষ গোপন না করলে কেনাবেচায় বরকত হয়।
আজকের কাজ: আজ কোনো কেনাবেচা বা লেনদেনে পণ্যের দোষ বা আসল দাম লুকাবেন না।
সহিহ বুখারী ২০৭৯ সহিহ
খাদিজা (রা.) সবার আগে নবীজিকে (ﷺ) বিশ্বাস করেছিলেন, আর নবীজি (ﷺ) সারাজীবন তা মনে রেখেছেন। আপনার জীবনের কোন মানুষটি কঠিন সময়ে আপনার পাশে ছিল, যাকে আপনি এখনো ধন্যবাদ দেননি?
সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
- কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
- সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
- ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
- মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
- দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।
সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।