deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا

মদিনায় হিজরত: "দুজনের তৃতীয়জন আল্লাহ"

তেরো বছর মক্কায় দাওয়াতের পর এক রাতে কুরাইশ তাঁর দরজা ঘিরে দাঁড়াল, হাতে তলোয়ার। সেই রাতেই শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত সফর, যার দিন থেকে আজও মুসলিমরা সাল গোনে।

৭ দৃশ্য৫ হাদিস৬ আয়াত

সীরাত · মাদানী যুগ৬২২ খ্রি. · ১ হিজরি · বয়স ৫৩

কখন
নবুয়তের ১৩শ বছর, রবিউল আউয়াল (৬২২ খ্রি.); এখান থেকে হিজরি সাল শুরু
কোথায়
মক্কা থেকে সাওর গুহা, সমুদ্রতীরের পথ ধরে কুবা, তারপর মদিনা
কারা
নবীজি (ﷺ), আবু বকর (রা.), আসমা ও আবদুল্লাহ ইবনু আবি বকর, আমির ইবনু ফুহাইরা, পথপ্রদর্শক আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিত
এই গল্পে
কুরাইশের ষড়যন্ত্র থেকে মদিনায় পৌঁছানো পর্যন্ত

কেন পড়বেন: হিজরত শুধু এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়া নয়। এই গল্পে আছে নিখুঁত পরিকল্পনা আর পূর্ণ তাওয়াক্কুল একসাথে, আছে এক বন্ধুর ত্যাগ, আর আছে কিশোর-কিশোরীদের সাহস। আর শেখায়: যে আল্লাহর জন্য কিছু ছাড়ে, আল্লাহ তাকে এর চেয়ে ভালো কিছু দেন।

গল্প

বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।

  1. ১

    হিজরতের আগে

    দারুন নাদওয়ার সিদ্ধান্ত

    আকাবার বাইআতের পর মুসলিমরা একে একে মদিনায় চলে যেতে লাগলেন। কুরাইশ বুঝল, মুহাম্মাদ (ﷺ) মদিনায় পৌঁছালে তাঁকে আর থামানো যাবে না। তারা দারুন নাদওয়ায় বসল। সীরাতের বর্ণনায় আছে, শেষে আবু জাহলের প্রস্তাব গৃহীত হলো: প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী যুবক একসাথে আঘাত করবে, যাতে রক্তের দায় সব গোত্রে ভাগ হয়ে যায়।

    আল্লাহ কুরআনে এই ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দিয়েছেন:

    وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ ۚ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ ۖ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ

    আর স্মরণ করুন, যখন কাফেররা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আপনাকে বন্দী করার জন্য, বা হত্য করার অথবা নির্বাসিত করার জন্য। আর তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও (তাদের ষড়যন্ত্রের বিপক্ষে) ষড়যন্ত্র করেন; আর আল্লাহ্‌ সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী।

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: দারুন নাদওয়ার পরামর্শ ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা আল-আনফাল ৮:৩০ কুরআন

    তারা ষড়যন্ত্র করে, আল্লাহও কৌশল করেন, আর আল্লাহর কৌশলই সেরা।

  2. ২

    হিজরতের দিন

    ভরদুপুরে আবু বকরের ঘরে

    আবু বকর (রা.) অনেক আগেই হিজরতের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, কিন্তু নবীজি (ﷺ) বলেছিলেন: অপেক্ষা করো, আমি আশা করি আমাকেও অনুমতি দেওয়া হবে। তিনি দুটি উট চার মাস ধরে খাইয়ে প্রস্তুত রেখেছিলেন। তারপর একদিন:

    একদিন ভরদুপুরে আমরা আবু বকরের ঘরে বসে ছিলাম, এমন সময় কেউ বলল: ওই যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাথা ঢেকে আসছেন, এমন সময়ে, যখন তিনি কখনো আসেন না। আবু বকর বললেন: আমার বাবা-মা তাঁর জন্য কুরবান, আল্লাহর কসম, নিশ্চয়ই বড় কোনো ব্যাপার। তিনি অনুমতি নিয়ে ঢুকে বললেন: তোমার কাছে যারা আছে, তাদের সরিয়ে দাও। আবু বকর বললেন: এরা তো আপনারই পরিবার। তিনি বললেন: আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আবু বকর বললেন: আমি কি সাথে যাব? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আবু বকর বললেন: তাহলে আমার এই দুই উটের একটি নিন। তিনি বললেন: দাম দিয়ে। আমরা দ্রুত তাঁদের সফরের সব গুছিয়ে দিলাম, চামড়ার থলিতে খাবার ভরলাম। আসমা বিনতু আবি বকর নিজের কোমরবন্ধ ছিঁড়ে থলির মুখ বাঁধলেন, এজন্যই তাঁকে বলা হয় "যাতুন নিতাক" … তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবু বকর সাওর পাহাড়ের গুহায় গিয়ে তিন রাত লুকিয়ে রইলেন। আবদুল্লাহ ইবনু আবি বকর, বুদ্ধিমান এক যুবক, রাতে তাঁদের কাছে থাকতেন, ভোর হওয়ার আগে মক্কায় ফিরে কুরাইশের মধ্যে এমনভাবে থাকতেন যেন রাতে সেখানেই ছিলেন; তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্রের কথা শুনলে মনে রাখতেন, আর অন্ধকার নামলে এসে জানাতেন। আবু বকরের মুক্ত দাস আমির ইবনু ফুহাইরা ছাগল চরিয়ে রাতে তাঁদের কাছে নিয়ে আসতেন, তাঁরা দুধ পান করতেন, ভোরের আগে আমির ছাগল নিয়ে চলে যেতেন। তিন রাতের প্রতিটি রাতে এমনই করতেন।

    সহিহ বুখারী ৩৯০৫সহিহবর্ণনাকারী: আয়িশা (রা.)

    "আমি কি সাথে যাব?" "হ্যাঁ।" আয়িশা (রা.) অন্য বর্ণনায় বলেছেন, সেদিন আবু বকর (রা.) খুশিতে কেঁদে ফেলেছিলেন। আর নবীজি (ﷺ) বন্ধুর দেওয়া উটও বিনামূল্যে নিলেন না, দাম দিয়ে নিলেন।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৯০৫ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আবু বকরের (রা.) আনন্দাশ্রু ঐতিহাসিক বর্ণনা

    হিজরত আল্লাহর জন্য, তাই খরচও নিজের। নবীজি (ﷺ) প্রিয় বন্ধুর উপহারও এই সফরে নিলেন না।

  3. ৩

    সেই রাতে

    বিছানায় আলী, দরজায় তলোয়ার

    সীরাতের বর্ণনায় আছে, যে রাতে কুরাইশের যুবকরা বাড়ি ঘিরে অপেক্ষা করছিল, নবীজি (ﷺ) আলী (রা.)-কে নিজের সবুজ চাদর গায়ে দিয়ে নিজের বিছানায় শুতে বললেন, আর বললেন, মানুষের যে আমানত তাঁর কাছে আছে, সেগুলো ফেরত দিয়ে তারপর আসবে। তিনি সূরা ইয়াসীনের আয়াত পড়তে পড়তে তাদের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন, তারা দেখতে পেল না:

    وَجَعَلْنَا مِن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ

    আর আমরা তাদের সামনে প্রাচীর ও পিছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি তারপর তাদেরকে আবৃত করেছি; ফলে তারা দেখতে পায় না।

    যে কুরাইশ তাঁকে হত্যা করতে চাইছিল, তাদের সম্পদই তাঁর কাছে আমানত রাখা ছিল, আর তিনি তা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে গেলেন।

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আলীর (রা.) বিছানায় থাকা ও আমানত ফেরত ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা ইয়াসীন ৩৬:৯ কুরআন

    শত্রুও যাঁর কাছে সম্পদ আমানত রাখে, আর যিনি পালানোর রাতেও সেই আমানত ফেরত দেন, তিনিই আল-আমীন।

  4. ৪

    মক্কার দক্ষিণে, তিন দিন

    সাওর গুহার তিন রাত

    দুজন মদিনার উল্টো দিকে, দক্ষিণের সাওর পাহাড়ের গুহায় গিয়ে লুকালেন। কুরাইশ সব দিকে লোক পাঠাল, পুরস্কার ঘোষণা করল। একসময় খোঁজকারীরা গুহার মুখে এসে দাঁড়াল:

    قُلْتُ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَأَنَا فِي الْغَارِ لَوْ أَنَّ أَحَدَهُمْ نَظَرَ تَحْتَ قَدَمَيْهِ لأَبْصَرَنَا‏.‏ فَقَالَ ‏ "‏ مَا ظَنُّكَ يَا أَبَا بَكْرٍ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِثُهُمَا

    আমি গুহায় থাকা অবস্থায় নবীজিকে (ﷺ) বললাম: তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের নিচে তাকায়, আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন: হে আবু বকর, সেই দুজন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয়জন আল্লাহ?

    সহিহ বুখারী ৩৬৫৩সহিহবর্ণনাকারী: আবু বকর (রা.)

    কুরআন এই মুহূর্তটি চিরদিনের জন্য রেখে দিয়েছে:

    إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ۖ فَأَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَىٰ ۗ وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

    যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ্‌ তো তাঁকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেরেরা তাঁকে বহিস্কার করেছিল এবং তিনি ছিলেন দুজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহায় ছিলেন; তিনি তখন তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন, ‘বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ্‌ তো আমাদের সাথে আছেন।’ অতঃপর আল্লাহ্‌ তার উপর তাঁর প্রশান্তি নাযিল করেন এবং তাঁকে শক্তিশালী করেন এমন এক সৈন্যবাহিনী দ্বারা যা তোমরা দেখনি এবং তিনি কাফেরদের কথা হেয় করেন। আর আল্লাহ্‌র কথাই সমুন্নত এবং আল্লাহ্‌ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

    এই তিন দিন পুরো একটা পরিবার কাজ করেছে: আবদুল্লাহ ইবনু আবি বকর রাতে খবর আনতেন, আমির ইবনু ফুহাইরা ছাগল চরিয়ে পায়ের ছাপ মুছে দিতেন আর দুধ পৌঁছাতেন, আসমা (রা.) খাবার আনতেন।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৬৫৩ সহিহসূরা আত-তাওবা ৯:৪০ কুরআনসহিহ বুখারী ৩৯০৫ সহিহ

    নিখুঁত পরিকল্পনা, তারপর পুরো ভরসা আল্লাহর উপর। গুহার মুখে শত্রু দাঁড়িয়ে, তবু তিনি বললেন: চিন্তা কোরো না, আল্লাহ আমাদের সাথে।

  5. ৫

    গুহা থেকে বের হয়ে

    সমুদ্রতীরের পথ আর সুরাকার ঘোড়া

    তিন দিন পর তাঁরা ভাড়া করা পথপ্রদর্শকের সাথে রওনা হলেন। লোকটি তখনো মুশরিক, কিন্তু বিশ্বস্ত; তাঁরা তাকে নিরাপদ মনে করেছিলেন। সে চেনা রাস্তা বাদ দিয়ে সমুদ্রতীরের পথ ধরল।

    কুরাইশ দুজনের প্রত্যেকের জন্য একশো উট পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। বনু মুদলিজের সুরাকা ইবনু মালিক খবর পেয়ে গোপনে ঘোড়া ছোটালেন। সুরাকা নিজে বলেছেন: কাছে যেতেই ঘোড়া হোঁচট খেল, আমি পড়ে গেলাম। আবার উঠে ছুটলাম। এত কাছে গেলাম যে নবীজির (ﷺ) কুরআন পড়া শুনছিলাম; তিনি একবারও পেছনে তাকাচ্ছিলেন না, আবু বকর বারবার তাকাচ্ছিলেন। তখন আমার ঘোড়ার সামনের পা হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে দেবে গেল। আমি বুঝলাম, এই মানুষটির বিষয় একদিন বিজয়ী হবেই। আমি নিরাপত্তা চেয়ে ডাকলাম, খাবার আর জিনিস দিতে চাইলাম। তাঁরা কিছুই নিলেন না, শুধু বললেন: আমাদের কথা গোপন রেখো।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৯০৬ (সুরাকা ইবনু মালিক রা.-এর নিজের বর্ণনা) সহিহসহিহ বুখারী ৩৯০৫ সহিহ

    যে মানুষটি পুরস্কারের লোভে হত্যা করতে ছুটে এসেছিল, সে ফিরে গেল রক্ষক হয়ে, অন্যদের অন্য দিকে ফিরিয়ে দিতে।

  6. ৬

    ১২ রবিউল আউয়াল (প্রসিদ্ধ মত), সোমবার

    মদিনার অপেক্ষা

    মদিনার মুসলিমরা খবর পেয়েছিলেন, নবীজি (ﷺ) মক্কা থেকে বেরিয়েছেন। প্রতিদিন সকালে তাঁরা শহরের বাইরের হাররায় গিয়ে অপেক্ষা করতেন, দুপুরের রোদ কড়া হলে ফিরে আসতেন। একদিন ফেরার পর এক ইহুদি উঁচু জায়গা থেকে দেখে চিৎকার করে উঠল: হে আরবরা, তোমরা যার অপেক্ষা করছিলে, ওই যে তিনি এসেছেন! মুসলিমরা অস্ত্র হাতে ছুটে গেলেন।

    অনেকে আগে নবীজিকে (ﷺ) দেখেনি, তাই আবু বকরকেই নবী ভেবে সালাম দিচ্ছিল। তখন রোদ এসে পড়ল:

    فَأَقْبَلَ أَبُو بَكْرٍ حَتَّى ظَلَّلَ عَلَيْهِ بِرِدَائِهِ، فَعَرَفَ النَّاسُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عِنْدَ ذَلِكَ

    (মদিনায় পৌঁছার দিন) রোদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গায়ে এসে পড়ল। তখন আবু বকর এগিয়ে এসে নিজের চাদর দিয়ে তাঁকে ছায়া দিলেন; এতে লোকেরা চিনতে পারল, কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)।

    সহিহ বুখারী ৩৯০৬সহিহবর্ণনাকারী: উরওয়া ইবনুয যুবাইর (রহ.)

    বারা (রা.) বলেন: আমি মদিনাবাসীকে কোনো কিছুতে এত খুশি হতে দেখিনি, যতটা খুশি তারা রাসূলুল্লাহর (ﷺ) আগমনে হয়েছিল (সহিহ বুখারী ৩৯২৫)।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৯০৬ (সুরাকা ইবনু মালিক রা.-এর নিজের বর্ণনা) সহিহসহিহ বুখারী ৩৯০৬ সহিহসহিহ বুখারী ৩৯২৫ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: কুবায় পৌঁছানোর দিন ও তারিখ ঐতিহাসিক বর্ণনা

    বন্ধুকে রোদ থেকে বাঁচাতে আবু বকর (রা.) নিজের চাদর তুলে ধরলেন। আর তাতেই সবাই চিনল, কে আসল সম্মানের মানুষ।

  7. ৭

    মদিনায় পৌঁছে

    প্রথম কথা: সালাম, খাবার, রাতের নামাজ

    মদিনার ইহুদি আলেমদের একজন, আবদুল্লাহ ইবনু সালাম, ভিড়ের মধ্যে তাঁকে দেখতে এলেন। পরে তিনি মুসলিম হন। তিনি বলেছেন:

    রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনায় এলে মানুষ দলে দলে তাঁর কাছে ছুটে গেল। আমিও মানুষের সাথে তাঁকে দেখতে গেলাম। তাঁর চেহারা স্পষ্ট দেখেই বুঝলাম, এই চেহারা কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। তিনি প্রথম যে কথা বললেন, তা হলো: হে মানুষ, সালামের প্রসার ঘটাও, খাবার খাওয়াও, আর মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ পড়ো, তাহলে শান্তির সাথে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

    জামে আত-তিরমিযী ২৪৮৫সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রা.)

    নতুন শহরে পা রেখে তিনি কোনো রাজনৈতিক ঘোষণা দেননি, প্রতিশোধের কথা বলেননি; বলেছেন সালাম, খাবার আর রাতের নামাজের কথা। এই তিনটি দিয়েই তিনি নতুন সমাজের ভিত গড়লেন।

    সূত্রজামে আত-তিরমিযী ২৪৮৫ সহিহ

    একটা সমাজ বদলানো শুরু হয় তিনটি সহজ কাজে: সালাম, খাবার ভাগ করা, আর রাতে একা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো।

প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়

এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।

মান নিয়ে মতভেদ সাওর গুহার মুখে মাকড়সা জাল বুনল আর কবুতর ডিম পাড়ল

মাকড়সার জালের কথা মুসনাদে আহমাদে (৩২৫১, ইবনু আব্বাস রা.) এসেছে; ইবনে কাসীর ও ইবনে হাজার এর সনদকে হাসান বলেছেন, কিন্তু শুআইব আরনাউত ও আলবানী দুর্বল বলেছেন। দুই কবুতরের কথা আরও দুর্বল সূত্রে। সহিহ বুখারীতে আছে শুধু খোঁজকারীদের কাছে আসা আর নবীজির (ﷺ) ভরসার কথা (সহিহ বুখারী ৩৬৫৩)। আল্লাহ বলেছেন, তিনি এমন বাহিনী দিয়ে সাহায্য করেছেন, যা তোমরা দেখোনি (সূরা আত-তাওবা ৯:৪০)।

দুর্বল মদিনায় পৌঁছানোর দিন শিশুরা "তালাআল বাদরু আলাইনা" গেয়ে স্বাগত জানিয়েছিল

কবিতাটি বায়হাকী (দালাইলুন নুবুওয়াহ) এনেছেন সনদ বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। ইবনে হাজার ও ইরাকী একে দুর্বল বলেছেন, আর ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, এমন কিছু হয়ে থাকলে তা তাবুক থেকে ফেরার সময়, কারণ "সানিয়্যাতুল ওয়াদা" মক্কার দিকে নয়, শামের দিকে। সহিহ বর্ণনায় আছে শুধু মদিনাবাসীর অসাধারণ আনন্দের কথা (সহিহ বুখারী ৩৯২৫)।

ভুল ধারণা হিজরত ছিল ভয়ে পালিয়ে যাওয়া

নবীজি (ﷺ) আল্লাহর অনুমতির অপেক্ষা করেছেন, অনুমতি পেয়ে তবেই বের হয়েছেন (সহিহ বুখারী ৩৯০৫)। আর মুসলিমদের জন্য আগে থেকেই মদিনায় আশ্রয় ও সাহায্যের অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল। এটা ছিল আল্লাহর নির্দেশে এক পরিকল্পিত স্থানান্তর, যেখান থেকে শুরু হলো ইসলামি সমাজ।

এই গল্প থেকে আমার জীবনে

গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।

পরিকল্পনা আর তাওয়াক্কুল একসাথে

নবীজি (ﷺ) উল্টো পথে গুহায় গেছেন, তিন দিন অপেক্ষা করেছেন, পথপ্রদর্শক ভাড়া করেছেন; আবার গুহার মুখে শত্রু দেখে বলেছেন: আল্লাহ আমাদের সাথে।

আজকের কাজ: আপনার সামনের কোনো বড় কাজের (চাকরি, পরীক্ষা, ব্যবসা) জন্য আজ লিখিত পরিকল্পনা করুন, তারপর দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করুন।

সহিহ বুখারী ৩৬৫৩ সহিহসূরা আত-তাওবা ৯:৪০ কুরআনসূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯ কুরআন

আমানত ফেরত দেওয়া

হিজরতের রাতেও নবীজি (ﷺ) শত্রুদের আমানত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে গেছেন। আল্লাহ আমানত তার মালিককে ফিরিয়ে দিতে বলেছেন।

আজকের কাজ: কারও কোনো জিনিস, টাকা বা ধার করা বই আপনার কাছে রয়ে গেলে আজই ফেরত দিন বা ফেরত দেওয়ার তারিখ জানান।

সূরা আন-নিসা ৪:৫৮ কুরআন

পরিবারকে দ্বীনের কাজে যুক্ত করা

আবু বকরের (রা.) ছেলে, মেয়ে আর মুক্ত দাস, সবাই হিজরতের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিলেন।

আজকের কাজ: এই সপ্তাহে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটা ভালো কাজ করুন (দান, কাউকে দেখতে যাওয়া), যাতে প্রত্যেকের একটা ভূমিকা থাকে।

সহিহ বুখারী ৩৯০৫ সহিহ

আল্লাহর জন্য ছেড়ে দেওয়া

নবীজি (ﷺ) জন্মভূমি ছেড়েছেন আল্লাহর জন্য, আর আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন মদিনা আর বিজয়। আল্লাহ বলেছেন, যে আল্লাহর পথে হিজরত করে, সে প্রশস্ত জায়গা ও প্রাচুর্য পাবে।

আজকের কাজ: যে গুনাহ বা হারাম উপার্জন ছাড়া কঠিন মনে হয়, আজ আল্লাহর ওপর ভরসা করে সেটা ছাড়ার প্রথম পদক্ষেপ নিন। এটাও এক রকম হিজরত।

সূরা আন-নিসা ৪:১০০ কুরআন

সালাম, খাবার, রাতের নামাজ

মদিনায় নবীজির (ﷺ) প্রথম উপদেশ: সালামের প্রসার, খাবার খাওয়ানো, আর মানুষ ঘুমালে নামাজ।

আজকের কাজ: আজ তিনটিই একটু করুন: পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দিন, কাউকে খাওয়ান, আর ঘুমানোর আগে বা শেষ রাতে দুই রাকাত পড়ুন।

জামে আত-তিরমিযী ২৪৮৫ সহিহ

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন

গুহার মুখে শত্রু দাঁড়িয়ে, তবু নবীজি (ﷺ) বললেন: চিন্তা কোরো না, আল্লাহ আমাদের সাথে। আপনার জীবনের কোন ভয়টা এখন আপনাকে আটকে রেখেছে, যেখানে আপনার এই কথাটা নিজেকে শোনানো দরকার?

সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
  • কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
  • সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
  • ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
  • মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
  • দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।

সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sirat/hijrat/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার