deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ

মসজিদে নববী ও ভ্রাতৃত্ব: নতুন সমাজের ভিত

একটা নতুন শহর, যেখানে অর্ধেক মানুষ সব হারিয়ে এসেছে আর অর্ধেক মানুষ সবে দ্বীন শিখছে। নবীজি (ﷺ) প্রথম বানালেন একটা মসজিদ, তারপর বানালেন মানুষে মানুষে ভাইয়ের সম্পর্ক।

৬ দৃশ্য৫ হাদিস৪ আয়াত

সীরাত · মাদানী যুগ৬২২ - ৬২৩ খ্রি. · ১ হিজরি

কখন
হিজরতের প্রথম কয়েক মাস (১ হিজরি)
কোথায়
কুবা, মদিনায় বনু নাজ্জারের মহল্লা, আবু আইয়ুব আল-আনসারীর (রা.) ঘর
কারা
নবীজি (ﷺ), আনসার ও মুহাজিররা, আবু আইয়ুব, সাদ ইবনুর রাবী, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, বিলাল (রা.)
এই গল্পে
কুবায় পৌঁছানো থেকে মসজিদ, ভ্রাতৃত্ব আর আজানের শুরু পর্যন্ত

কেন পড়বেন: আজ মসজিদ কি শুধু নামাজের জায়গা, নাকি সমাজের প্রাণকেন্দ্র? আর প্রতিবেশী কি সত্যিই ভাই? এই গল্প দেখায়, নবীজি (ﷺ) কীভাবে ইট-পাথর আর মানুষের হৃদয় একসাথে গেঁথে একটা সমাজ বানিয়েছিলেন।

গল্প

বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।

  1. ১

    মদিনায় পৌঁছানোর পর

    কুবায় চৌদ্দ রাত

    মদিনার প্রান্তে কুবা গ্রামে বনু আমর ইবনু আওফের মধ্যে তিনি প্রথম নামলেন, আর সেখানে চৌদ্দ রাত থাকলেন (সহিহ বুখারী ৪২৮)। এখানেই ইসলামের প্রথম মসজিদের ভিত্তি রাখা হলো, কুবা মসজিদ। অনেক মুফাসসির বলেছেন, এই মসজিদ সম্পর্কেই আল্লাহ বলেছেন:

    لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا ۚ لَّمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَىٰ مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَن تَقُومَ فِيهِ ۚ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُوا ۚ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ

    আপনি তাতে কখনো সালাতের জন্য দাঁড়াবেন না; যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই স্থাপিত হয়েছে তাক্ওয়ার উপর, তাই আপনার সালাতের জন্য দাঁড়ানোর বেশী হকদার। সেখানে এমন লোক আছে যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন ভালবাসে, আর পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে আল্লাহ্‌ পছন্দ করেন।

    এর মধ্যে আলী (রা.) মক্কার আমানত ফিরিয়ে দিয়ে হেঁটে এসে কুবায় তাঁর সাথে মিলিত হলেন।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪২৮ সহিহসূরা আত-তাওবা ৯:১০৮ কুরআনইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: কুবা মসজিদ ও আলীর (রা.) আগমন ঐতিহাসিক বর্ণনা

    নতুন জায়গায় পৌঁছে তাঁর প্রথম কাজ ছিল আল্লাহর ঘর বানানো।

  2. ২

    কুবা থেকে মদিনায়

    উটনী যেখানে বসল

    তারপর বনু নাজ্জার, নবীজির (ﷺ) দাদার মামার গোত্র, তলোয়ার ঝুলিয়ে তাঁকে নিতে এল। প্রতিটি ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ উটনীর লাগাম ধরে অনুরোধ করত: আমাদের কাছে থাকুন। সীরাতের বর্ণনায় আছে, তিনি বলতেন: ওকে ছেড়ে দাও, ও আদেশপ্রাপ্ত।

    উটনী গিয়ে বসল বনু নাজ্জারের এক জায়গায়, পাশেই আবু আইয়ুব আল-আনসারীর (রা.) ঘর। নবীজি (ﷺ) সেখানেই উঠলেন। আনাস (রা.) সেই দৃশ্য বর্ণনা করেছেন:

    নবীজি (ﷺ) মদিনায় এসে প্রথমে মদিনার উঁচু অংশে বনু আমর ইবনু আওফের মহল্লায় নামলেন, সেখানে চৌদ্দ রাত থাকলেন। তারপর বনু নাজ্জারকে খবর পাঠালেন, তারা তলোয়ার ঝুলিয়ে এল। আমি যেন এখনো দেখছি, নবীজি (ﷺ) নিজের উটনীর উপর, পেছনে আবু বকর, চারপাশে বনু নাজ্জারের লোকেরা, শেষে তিনি আবু আইয়ুবের ঘরের আঙিনায় নামলেন। নামাজের সময় যেখানে হতো, সেখানেই নামাজ পড়তে তিনি পছন্দ করতেন, ছাগলের খোঁয়াড়েও পড়তেন। তারপর তিনি মসজিদ বানানোর নির্দেশ দিলেন, বনু নাজ্জারের নেতাদের ডেকে বললেন: হে বনু নাজ্জার, তোমাদের এই বাগানটির দাম বলো। তারা বলল: না, আল্লাহর কসম, আমরা এর দাম আল্লাহর কাছ ছাড়া চাই না। আনাস বলেন: সেখানে ছিল মুশরিকদের কবর, কিছু ভাঙা ঘর আর খেজুর গাছ। তাঁর নির্দেশে কবর সরানো হলো, ভাঙা জায়গা সমান করা হলো, খেজুর গাছ কাটা হলো। খেজুর গাছের কাণ্ড সারি করে কিবলার দিকে বসানো হলো, দরজার দুই পাশে পাথর। সাহাবিরা পাথর বয়ে আনতেন আর ছন্দে গাইতেন, নবীজিও (ﷺ) তাঁদের সাথে বলতেন: হে আল্লাহ, আখিরাতের কল্যাণই আসল কল্যাণ, তুমি আনসার আর মুহাজিরদের ক্ষমা করো।

    সহিহ বুখারী ৪২৮সহিহবর্ণনাকারী: আনাস (রা.)

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪২৮ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: "দাওহা ফা ইন্নাহা মামূরা" (ইবনে ইসহাক থেকে) ঐতিহাসিক বর্ণনা

    সবাই চেয়েছিল নবীজি (ﷺ) তাদের ঘরে থাকুন। তিনি কাউকে বেছে নিয়ে অন্যদের মন ভাঙেননি, সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছেন আল্লাহর উপর।

  3. ৩

    ১ হিজরি

    এতিমদের জমি আর নিজ হাতে পাথর

    উটনী যেখানে বসেছিল, সে জমিটি ছিল দুই এতিম বালকের, সাহল আর সুহাইল। বনু নাজ্জার বিনামূল্যে দিতে চাইলে নবীজি (ﷺ) তা নিলেন না; সীরাতের বর্ণনা আর সহিহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি দাম দিয়ে জমি কিনলেন।

    মসজিদ বানানো হলো খেজুর গাছের কাণ্ডের খুঁটি আর কাঁচা ইটের দেয়ালে, ছাদ খেজুর পাতার। সাহাবিরা পাথর বয়ে আনতেন, নবীজি (ﷺ) নিজেও তাঁদের সাথে বইতেন, আর সবাই মিলে বলতেন: হে আল্লাহ, আখিরাতের কল্যাণই আসল কল্যাণ, তুমি আনসার আর মুহাজিরদের ক্ষমা করো (সহিহ বুখারী ৪২৮)।

    মসজিদের এক পাশে ছায়াঘেরা একটি জায়গা রাখা হলো, "সুফফা", যেখানে গরিব, ঘরহীন সাহাবিরা থাকতেন আর দিনরাত দ্বীন শিখতেন। পাশেই বানানো হলো নবীজির (ﷺ) স্ত্রীদের জন্য ছোট ছোট ঘর।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৪২৮ সহিহসহিহ বুখারী ৩৯০৬: দুই এতিমের জমি দাম দিয়ে কেনা সহিহইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা: মসজিদের নির্মাণ ও সুফফা ঐতিহাসিক বর্ণনা

    রাষ্ট্রপ্রধান নিজে কাঁধে পাথর বইছেন, গাইছেন সাথীদের সাথে। নেতৃত্ব মানে আগে নিজের হাত লাগানো।

  4. ৪

    মসজিদ নির্মাণের পর

    দুই অচেনা মানুষ, এক ভাই

    মুহাজিররা মক্কায় ঘর, ব্যবসা, সম্পদ সব রেখে এসেছিলেন। নবীজি (ﷺ) একেকজন মুহাজিরকে একেকজন আনসারের ভাই বানিয়ে দিলেন। এই ভাইয়ের সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল, তা একটি ঘটনাতেই বোঝা যায়:

    আমরা মদিনায় এলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার আর সাদ ইবনুর রাবীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব করে দিলেন। সাদ বললেন: আমি আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক, আমার সম্পদের অর্ধেক তোমাকে ভাগ করে দিচ্ছি; আর আমার দুই স্ত্রীর মধ্যে যাকে তোমার পছন্দ, আমি তাকে ছেড়ে দেব, ইদ্দত শেষ হলে তুমি বিয়ে কোরো। আবদুর রহমান বললেন: আমার এসবের দরকার নেই; এখানে কি কোনো বাজার আছে যেখানে ব্যবসা হয়? তিনি বললেন: কাইনুকার বাজার। আবদুর রহমান পরদিন সেখানে গেলেন, (লাভ হিসেবে) পনির আর ঘি নিয়ে এলেন, তারপর প্রতিদিন যেতে থাকলেন। কিছুদিন পর তাঁর গায়ে হলুদ রঙের চিহ্ন দেখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: বিয়ে করেছ? তিনি বললেন: হ্যাঁ, আনসারের এক নারীকে, খেজুরের বিচির সমান সোনা মোহর দিয়ে। তিনি বললেন: একটি ছাগল দিয়ে হলেও ওয়ালিমা করো।

    সহিহ বুখারী ২০৪৮সহিহবর্ণনাকারী: আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রা.)

    সাদের (রা.) উদারতা আর আবদুর রহমানের (রা.) আত্মমর্যাদা, দুটোই অসাধারণ। একজন অর্ধেক সম্পদ দিতে চাইলেন, আরেকজন বললেন: শুধু বাজারের পথটা দেখিয়ে দিন। এই আবদুর রহমানই পরে মদিনার অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী হন।

    আল্লাহ আনসারদের প্রশংসা করেছেন:

    وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

    আর তাদের জন্যও, মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা এ নগরীকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছে ও ঈমান গ্রহণ করেছে, তারা তাদের কাছে যারা হিজরত করে এসেছে তাদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোনো (না পাওয়া জনিত) হিংসা অনুভব করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্ৰাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্ৰস্ত হলেও। বস্তুতঃ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।

    সূত্রসহিহ বুখারী ২০৪৮ সহিহসূরা আল-হাশর ৫৯:৯ কুরআন

    যে দেয়, সে উদার; যে নেয় না, সেও সম্মানিত। ভ্রাতৃত্ব মানে একে অন্যের উপর বোঝা হওয়া নয়, পাশে দাঁড়ানো।

  5. ৫

    ১ বা ২ হিজরি

    নামাজের ডাক: আজানের শুরু

    মসজিদ তৈরি, কিন্তু নামাজের সময় সবাইকে কীভাবে ডাকা হবে? সাহাবিরা পরামর্শ করলেন:

    মুসলিমরা মদিনায় এসে নামাজের জন্য আন্দাজ করে জমা হতেন, তখন নামাজের জন্য কোনো ডাক দেওয়া হতো না। একদিন এ নিয়ে তাঁরা আলোচনা করলেন। কেউ বললেন, খ্রিস্টানদের মতো ঘণ্টা নাও। কেউ বললেন, বরং ইহুদিদের মতো শিঙা। উমার (রা.) বললেন, তোমরা একজন মানুষকে পাঠাও না কেন, যে নামাজের জন্য ডাক দেবে? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: হে বিলাল, ওঠো, নামাজের জন্য ডাক দাও।

    সহিহ বুখারী ৬০৪সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.)

    এরপর আবদুল্লাহ ইবনু যায়দ (রা.) স্বপ্নে আজানের বাক্যগুলো শিখলেন। নবীজি (ﷺ) বললেন, এটা সত্য স্বপ্ন; বিলালকে শিখিয়ে দাও, তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে উঁচু:

    রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মানুষকে নামাজে ডাকার জন্য ঘণ্টা বানানোর আদেশ দিলেন, তখন আমি ঘুমের মধ্যে দেখলাম, এক লোক হাতে ঘণ্টা নিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর বান্দা, ঘণ্টাটা বিক্রি করবে? সে বলল, এটা দিয়ে কী করবে? বললাম, এটা দিয়ে নামাজে ডাকব। সে বলল, এর চেয়ে ভালো কিছু দেখিয়ে দেব না? তারপর সে আজানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দিল, তারপর ইকামতের বাক্য। সকালে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে স্বপ্নের কথা জানালাম। তিনি বললেন: ইনশাআল্লাহ, এটা সত্য স্বপ্ন। তুমি বিলালের সাথে দাঁড়াও, যা দেখেছ তাকে বলে দাও, সে আজান দিক; কারণ তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে উঁচু।

    সুনানে আবু দাউদ ৪৯৯সহিহবর্ণনাকারী: আবদুল্লাহ ইবনু যায়দ (রা.)

    সূত্রসহিহ বুখারী ৬০৪ সহিহসুনানে আবু দাউদ ৪৯৯ সহিহ

    যে বিলাল একদিন মক্কার রোদে "আহাদ, আহাদ" বলতেন, আজ তাঁর কণ্ঠেই মদিনার আকাশে বাজল "আল্লাহু আকবার"।

  6. ৬

    হিজরতের প্রথম বছর

    সবার জন্য এক চুক্তি

    মদিনায় শুধু মুসলিমরা ছিলেন না, ছিল ইহুদি গোত্রগুলো আর তখনো ইসলাম গ্রহণ না করা আরবরা। সীরাতের বর্ণনায় আছে, নবীজি (ﷺ) সবার জন্য একটি লিখিত চুক্তি করলেন: মুমিনরা পরস্পরের দায় নেবে, কেউ অন্যায় করলে সবাই মিলে তা প্রতিহত করবে, ইহুদিরা নিজেদের ধর্মে স্বাধীন থাকবে, আর বাইরের আক্রমণ হলে মদিনা একসাথে লড়বে। বিরোধ হলে চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে।

    এই চুক্তির পূর্ণ পাঠ ইবনে ইসহাক সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন; তবে এর কিছু অংশ, যেমন রক্তপণের দায়, সহিহ হাদিসেও এসেছে।

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: মদিনার চুক্তিপত্র (ইবনে ইসহাক থেকে, সনদ ছাড়া) ঐতিহাসিক বর্ণনা

    একটা শহরে নানা ধর্মের মানুষ থাকলে ন্যায়ভিত্তিক লিখিত নিয়ম দরকার। নবীজি (ﷺ) প্রথম বছরেই তা করেছেন।

প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়

এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।

ভুল বোঝা সাদ ইবনুর রাবী (রা.) ভাইয়ের জন্য স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলেন

সাদ (রা.) প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু আবদুর রহমান (রা.) বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করে শুধু বাজারের পথ জানতে চেয়েছিলেন (সহিহ বুখারী ২০৪৮)। কোনো তালাক হয়নি।

ভুল বোঝা মদিনার চুক্তিপত্রের প্রতিটি ধারা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত

চুক্তির দীর্ঘ পাঠ ইবনে ইসহাক সনদ ছাড়া এনেছেন; আবু উবাইদ ও অন্যরা অন্য সূত্রে এনেছেন। এর মূল কথা সীরাতবিদরা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু প্রতিটি বাক্যকে নবীজির (ﷺ) সহিহ হাদিস বলা ঠিক নয়।

এই গল্প থেকে আমার জীবনে

গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।

মসজিদের সাথে সম্পর্ক

নতুন শহরে নবীজির (ﷺ) প্রথম কাজ মসজিদ বানানো। আর মসজিদ ছিল নামাজ, শিক্ষা, পরামর্শ আর অসহায়ের আশ্রয়ের জায়গা।

আজকের কাজ: এই সপ্তাহে অন্তত এক ওয়াক্ত মসজিদে জামাআতে পড়ুন, আর মসজিদের কোনো কাজে (পরিষ্কার, পানি, দান) নিজের হাত লাগান।

সহিহ বুখারী ৪২৮ সহিহসূরা আত-তাওবা ৯:১০৮ কুরআন

এতিমের হক রক্ষা

জমি এতিমদের ছিল বলে নবীজি (ﷺ) বিনামূল্যে নেননি, দাম দিয়ে কিনেছেন।

আজকের কাজ: আপনার পরিবার বা এলাকায় কোনো এতিমের সম্পদ বা পড়াশোনার খোঁজ নিন; সম্ভব হলে একজন এতিমের মাসিক খরচের দায়িত্ব নিন।

সূরা আন-নিসা ৪:১০ কুরআন

ভাইয়ের মতো পাশে দাঁড়ানো

আনসাররা অচেনা মুহাজিরদের ঘর, সম্পদ আর কাজ ভাগ করে নিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেছেন, মুমিনরা পরস্পর ভাই।

আজকের কাজ: নতুন চাকরি, নতুন শহর বা কঠিন সময়ে থাকা কাউকে আজ একটা বাস্তব সাহায্য দিন: কাজের খোঁজ, পরিচয় করিয়ে দেওয়া বা কিছু সময়।

সহিহ বুখারী ২০৪৮ সহিহসূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১০ কুরআন

আত্মমর্যাদা নিয়ে উপার্জন

আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রা.) দান না নিয়ে বাজারের পথ চেয়েছিলেন। নিজের হাতের উপার্জনই সবচেয়ে উত্তম।

আজকের কাজ: সাহায্য নেওয়ার বদলে আজ নিজের উপার্জন বাড়ানোর একটা বাস্তব পদক্ষেপ নিন: নতুন দক্ষতা শেখা বা ছোট কোনো উদ্যোগ।

সহিহ বুখারী ২০৪৮ সহিহ

আজানের জবাব

আজান শুরু হয়েছে মদিনায়, বিলালের (রা.) কণ্ঠে। আজান শুনে তার জবাব দেওয়া সুন্নাহ।

আজকের কাজ: আজ প্রতিটি আজানে কাজ থামিয়ে মুয়াজ্জিনের সাথে সাথে বাক্যগুলো বলুন, তারপর দরূদ আর আজানের পরের দোয়া পড়ুন।

সুনানে আবু দাউদ ৪৯৯ সহিহসহিহ মুসলিম ৪০৮ সহিহ

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন

সাদ (রা.) এক অচেনা মানুষকে নিজের অর্ধেক সম্পদ দিতে চেয়েছিলেন, শুধু কারণ নবীজি (ﷺ) তাঁকে ভাই বানিয়ে দিয়েছিলেন। আপনার মসজিদের পাশের কাতারে যে মানুষটি দাঁড়ান, তাঁর নামটা কি আপনি জানেন?

সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
  • কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
  • সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
  • ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
  • মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
  • দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।

সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sirat/masjid-nababi/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার