deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ

আকাবার বাইআত: মদিনার মানুষের অঙ্গীকার

মক্কা আর তায়েফ দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। হজের মৌসুমে তিনি একের পর এক গোত্রের তাঁবুতে যেতেন। একদিন মিনার এক গিরিপথে দেখা হলো মদিনার কয়েকজন যুবকের সাথে, আর সেখান থেকেই শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়।

৭ দৃশ্য৫ হাদিস৪ আয়াত

সীরাত · মক্কী যুগ৬২০ - ৬২২ খ্রি. · নবুয়তের ১১শ থেকে ১৩শ বছর · হজের মৌসুম

কখন
নবুয়তের ১১শ বছরে ছয়জন, ১২শ বছরে প্রথম বাইআত (১২ জন), ১৩শ বছরে দ্বিতীয় বাইআত (৭৩ পুরুষ, ২ নারী)
কোথায়
মিনার আকাবা (জামরাতুল আকাবার কাছের গিরিপথ)
কারা
মদিনার আউস ও খাযরাজ গোত্র, মুসআব ইবনু উমাইর (রা.), আব্বাস ইবনু আবদিল মুত্তালিব
এই গল্পে
হজের মৌসুমে দাওয়াত থেকে হিজরতের অনুমতি পর্যন্ত

কেন পড়বেন: মদিনার মানুষ নবীজিকে (ﷺ) আশ্রয় দিয়েছিলেন এমন সময়ে, যখন তাঁর কাছে দেওয়ার মতো দুনিয়ার কিছুই ছিল না, ছিল শুধু জান্নাতের ওয়াদা। এই গল্প শেখায়, অঙ্গীকার মানে কী, আর একজন নিবেদিত শিক্ষক কীভাবে একটা শহর বদলে দিতে পারেন।

গল্প

বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।

  1. ১

    হজের মৌসুমগুলোতে

    "কেউ কি আমাকে তার কওমের কাছে নিয়ে যাবে?"

    মক্কার কাছে উকায, মাজান্না, যুল মাজায নামে বড় মেলা বসত, আর হজের সময় সারা আরবের গোত্র আসত মিনায়। নবীজি (ﷺ) প্রতি বছর তাঁবুতে তাঁবুতে যেতেন:

    كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَعْرِضُ نَفْسَهُ عَلَى النَّاسِ فِي الْمَوْقِفِ فَقَالَ ‏ "‏ أَلاَ رَجُلٌ يَحْمِلُنِي إِلَى قَوْمِهِ فَإِنَّ قُرَيْشًا قَدْ مَنَعُونِي أَنْ أُبَلِّغَ كَلاَمَ رَبِّي

    রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (হজের) সমাবেশে নিজেকে মানুষের সামনে পেশ করতেন আর বলতেন: এমন কোনো লোক কি আছে, যে আমাকে তার কওমের কাছে নিয়ে যাবে? কুরাইশ আমাকে আমার রবের কালাম পৌঁছে দিতে বাধা দিয়েছে।

    সুনানে আবু দাউদ ৪৭৩৪সহিহবর্ণনাকারী: জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.)

    সীরাতের বর্ণনায় আছে, অনেক সময় তাঁর পেছনে পেছনে চাচা আবু লাহাব হাঁটত আর লোকদের বলত: এর কথা শুনো না, এ মিথ্যাবাদী। বহু গোত্র ফিরিয়ে দিল; কেউ শর্ত দিল, তোমার পরে ক্ষমতা আমাদের দিতে হবে। নবীজি (ﷺ) বললেন, ক্ষমতা আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে চান দেন।

    সূত্রসুনানে আবু দাউদ ৪৭৩৪ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: গোত্রগুলোর কাছে নিজেকে পেশ করা ঐতিহাসিক বর্ণনা

    বছরের পর বছর "না" শুনেও তিনি পরের বছর আবার গেছেন। দাওয়াতে ফল আল্লাহর হাতে, চেষ্টা আমাদের দায়িত্ব।

  2. ২

    নবুয়তের ১১শ বছর

    খাযরাজের ছয় যুবক

    মদিনার (তখন নাম ইয়াসরিব) দুই বড় গোত্র আউস আর খাযরাজ বহু বছর যুদ্ধ করে ক্লান্ত। শেষ বড় যুদ্ধ বুআস তাদের নেতাদের শেষ করে দিয়েছিল:

    বুআসের দিনটি (আউস ও খাযরাজের যুদ্ধ) ছিল এমন এক দিন, যা আল্লাহ তাঁর রাসূলের (আগমনের) জন্য আগে ঘটিয়ে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন এলেন, তখন তাদের নেতৃত্ব বিভক্ত, তাদের বড় নেতারা নিহত, অনেকে আহত। এভাবে আল্লাহ এটা আগে ঘটিয়ে রেখেছিলেন তাদের ইসলামে প্রবেশের জন্য।

    সহিহ বুখারী ৩৭৭৭সহিহবর্ণনাকারী: আয়িশা (রা.)

    সীরাতের বর্ণনায় আছে, মদিনার ইহুদিরা আউস-খাযরাজকে প্রায়ই বলত: শিগগিরই এক নবী আসবেন, তাঁর সাথে মিলে আমরা তোমাদের শেষ করব। সেই বছর হজে আকাবার কাছে নবীজির (ﷺ) সাথে দেখা হলো খাযরাজের ছয়জন লোকের। তিনি কুরআন পড়ে শোনালেন, ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তারা একে অন্যকে বলল: এ-ই সেই নবী, যার কথা ইহুদিরা বলে; ওরা যেন আমাদের আগে তাঁর কাছে পৌঁছাতে না পারে। ছয়জনই মুসলিম হলেন।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৭৭৭ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: খাযরাজের ছয়জনের ইসলাম ঐতিহাসিক বর্ণনা

    আল্লাহ বহু বছর আগে থেকে মদিনাকে প্রস্তুত করছিলেন। আমরা যে দরজা দেখি না, আল্লাহ সেটাও খুলে রাখেন।

  3. ৩

    নবুয়তের ১২শ বছর

    প্রথম বাইআত: বারোজনের অঙ্গীকার

    পরের বছর হজে এলেন বারোজন: আগের ছয়জনের পাঁচজন, সাথে নতুন সাতজন, তাঁদের দুজন আউস গোত্রের। আকাবায় তাঁরা নবীজির (ﷺ) হাতে অঙ্গীকার করলেন। সেই রাতে উপস্থিত উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) বলেছেন:

    রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চারপাশে একদল সাহাবিকে নিয়ে বললেন: এসো, আমার কাছে বাইআত (অঙ্গীকার) করো এই কথার উপর যে, আল্লাহর সাথে কিছু শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, মনগড়া অপবাদ রটাবে না, আর ভালো কাজে আমার অবাধ্য হবে না। তোমাদের যে এটা পূরণ করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে। আর কেউ এর কোনোটি করে ফেললে দুনিয়ায় শাস্তি পেলে তা তার জন্য কাফফারা; আর আল্লাহ গোপন রাখলে তার বিষয় আল্লাহর হাতে, চাইলে শাস্তি দেবেন, চাইলে ক্ষমা করবেন। (উবাদা বলেন:) আমি এর উপর তাঁর কাছে বাইআত করলাম।

    সহিহ বুখারী ৩৮৯২সহিহবর্ণনাকারী: উবাদা ইবনুস সামিত (রা.), আকাবার রাতের একজন

    এই অঙ্গীকারে যুদ্ধের কোনো শর্ত ছিল না, ছিল শুধু ঈমান আর চরিত্রের শর্ত। পরে নারীদের বাইআতও একই শর্তে হয়েছে, তাই সীরাত গ্রন্থে একে "বাইআতুন নিসা"-র মতো বাইআত বলা হয়েছে।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৮৯২ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আকাবার প্রথম বাইআত ঐতিহাসিক বর্ণনাসূরা আল-মুমতাহিনা ৬০:১২ কুরআন

    ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল ছয়টি নৈতিক অঙ্গীকার: শিরক নয়, চুরি নয়, ব্যভিচার নয়, সন্তান হত্যা নয়, অপবাদ নয়, ভালো কাজে অবাধ্যতা নয়।

  4. ৪

    নবুয়তের ১২শ-১৩শ বছর

    মদিনার প্রথম শিক্ষক: মুসআব

    তাঁরা ফিরে যাওয়ার সময় নবীজি (ﷺ) তাঁদের সাথে পাঠালেন এক যুবককে, যাতে তিনি তাঁদের কুরআন আর দ্বীন শেখান:

    أَوَّلُ مَنْ قَدِمَ عَلَيْنَا مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ وَابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ، وَكَانَا يُقْرِئَانِ النَّاسَ

    আমাদের কাছে (মদিনায়) সবার আগে এসেছিলেন মুসআব ইবনু উমাইর আর ইবনু উম্মি মাকতূম; তাঁরা মানুষকে কুরআন পড়াতেন।

    সহিহ বুখারী ৩৯২৫সহিহবর্ণনাকারী: বারা ইবনু আযিব (রা.)

    মুসআব ইবনু উমাইর (রা.) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে আদরের, সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরা ধনী যুবক; ইসলামের জন্য সব ছেড়েছিলেন। সীরাতের বর্ণনায় আছে, মদিনায় তিনি আসআদ ইবনু যুরারার (রা.) ঘরে থাকতেন, ঘরে ঘরে গিয়ে কুরআন পড়াতেন। একদিন আউসের নেতা উসাইদ ইবনু হুদাইর বর্শা হাতে রেগে এলেন। মুসআব শান্তভাবে বললেন: একটু বসে শুনুন; ভালো লাগলে গ্রহণ করবেন, না লাগলে আমরা থেমে যাব। কুরআন শুনে উসাইদ মুসলিম হলেন। তারপর সাদ ইবনু মুআয (রা.), আর তাঁর সাথে পুরো বনু আবদিল আশহাল গোত্র।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৯২৫ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: মুসআবের (রা.) দাওয়াত, উসাইদ ও সাদ ইবনু মুআযের ইসলাম ঐতিহাসিক বর্ণনা

    "একটু বসে শুনুন।" রাগী মানুষের সামনে মুসআবের (রা.) শান্ত একটি বাক্য পুরো গোত্রের হেদায়াতের দরজা খুলে দিল।

  5. ৫

    নবুয়তের ১৩শ বছর, তাশরীকের এক রাত

    রাতের আঁধারে তিয়াত্তর জন

    পরের হজে মদিনা থেকে এল বড় কাফেলা, তাঁদের মধ্যে তিয়াত্তর জন পুরুষ আর দুজন নারী মুসলিম। কুরাইশ যাতে না জানে, তাই সময় ঠিক হলো তাশরীকের দিনগুলোর এক রাতে, যখন সবাই ঘুমিয়ে। রাতের এক-তৃতীয়াংশ পার হলে তাঁরা চুপিচুপি এক এক করে আকাবার গিরিপথে জড়ো হলেন।

    নবীজির (ﷺ) সাথে এলেন চাচা আব্বাস, তখনো তিনি মুসলিম হননি, এসেছিলেন ভাতিজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তিনি বললেন: মুহাম্মাদ তার গোত্রে সম্মানে আছে; তোমরা যদি শেষ পর্যন্ত তাকে রক্ষা করতে পারো, তবে নাও, নইলে এখনই ছেড়ে দাও। জাবির (রা.) বলেছেন, তিনি নিজে, তাঁর বাবা আর দুই মামা সেই রাতে ছিলেন (সহিহ বুখারী ৩৮৯০, ৩৮৯১)।

    সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: দ্বিতীয় আকাবা, সংখ্যা ও আব্বাসের কথা ঐতিহাসিক বর্ণনাসহিহ বুখারী ৩৮৯১ (জাবির রা.): "আমি, আমার বাবা আর মামা আকাবার লোকদের মধ্যে" সহিহ

    দুজন নারীও সেই রাতে অঙ্গীকার করেছিলেন, তাঁদের একজন উম্মু উমারা নুসাইবা (রা.), যিনি পরে উহুদে নবীজিকে (ﷺ) রক্ষা করতে লড়েছিলেন।

  6. ৬

    সেই রাতেই

    অঙ্গীকার: জান্নাতের বিনিময়ে

    আনসাররা জিজ্ঞেস করলেন, কীসের উপর আমরা বাইআত করব? জাবিরের (রা.) বর্ণনায় নবীজির (ﷺ) জবাব: সক্রিয়তা আর অলসতা, সব অবস্থায় শোনা ও মানা; সচ্ছলতা আর অভাবে খরচ করা; ভালো কাজের আদেশ আর মন্দ কাজে নিষেধ; আল্লাহর ব্যাপারে কারও নিন্দার ভয় না করা; আর আমি তোমাদের কাছে গেলে তোমরা আমাকে সেভাবে রক্ষা করবে, যেভাবে নিজেদের, নিজেদের স্ত্রী আর সন্তানদের রক্ষা করো। এর বিনিময়ে তোমাদের জন্য জান্নাত।

    সীরাতের বর্ণনায় আছে, আবুল হাইসাম ইবনুত তাইয়িহান (রা.) জিজ্ঞেস করলেন: আমরা ইহুদিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছি; আল্লাহ আপনাকে বিজয় দিলে আপনি কি আমাদের ফেলে নিজের কওমের কাছে ফিরে যাবেন? নবীজি (ﷺ) হেসে বললেন: না, তোমাদের রক্ত আমার রক্ত। আমি তোমাদের, তোমরা আমার। তারপর তিনি তাঁদের মধ্য থেকে বারোজন নকীব (দায়িত্বশীল) বাছাই করলেন।

    সূত্রমুসনাদে আহমাদ (জাবির রা.): দ্বিতীয় আকাবার বাইআতের শর্ত; আলবানী সহিহ বলেছেন (সিলসিলা সহিহা) হাসানইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: আবুল হাইসামের প্রশ্ন ও বারো নকীব ঐতিহাসিক বর্ণনাসহিহ বুখারী ৩৮৯৩: উবাদা (রা.) "আমি সেই নকীবদের একজন" সহিহ

    নবীজি (ﷺ) সেই কথা রেখেছিলেন: মক্কা বিজয়ের পরও তিনি মক্কায় থাকেননি, ফিরে গেছেন মদিনায়, আনসারদের মাঝে।

  7. ৭

    বাইআতের পর

    হিজরতের দরজা খুলল

    সকালে কুরাইশ খবর পেয়ে মদিনার কাফেলায় খোঁজাখুঁজি শুরু করল, কিন্তু প্রমাণ পেল না। কিছুদিনের মধ্যেই নবীজি (ﷺ) সাহাবিদের জানালেন: আমাকে তোমাদের হিজরতের জায়গা দেখানো হয়েছে, দুই কালো পাথুরে প্রান্তরের মাঝে খেজুর বাগানের দেশ। এরপর মুসলিমরা দলে দলে মদিনার দিকে রওনা হলেন।

    যে আনসাররা সেই রাতে অঙ্গীকার করেছিলেন, তাঁদের সম্পর্কে আল্লাহ পরে বলেছেন:

    وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

    আর তাদের জন্যও, মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা এ নগরীকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছে ও ঈমান গ্রহণ করেছে, তারা তাদের কাছে যারা হিজরত করে এসেছে তাদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোনো (না পাওয়া জনিত) হিংসা অনুভব করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্ৰাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্ৰস্ত হলেও। বস্তুতঃ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।

    সূত্রসহিহ বুখারী ৩৯০৫ (আয়িশা রা.): "আমাকে তোমাদের হিজরতের জায়গা দেখানো হয়েছে" সহিহসূরা আল-হাশর ৫৯:৯ কুরআন

    মক্কা যাঁকে বের করে দিতে চাইল, মদিনা তাঁকে বুকে টেনে নিল। আল্লাহ এক দরজা বন্ধ করলে আরেকটা খুলে দেন।

প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়

এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।

ভুল ধারণা আকাবার বাইআতের পরেই মদিনার সবাই মুসলিম হয়ে গিয়েছিল

মুসআবের (রা.) দাওয়াতে অনেক পরিবার মুসলিম হয়েছিল, কিন্তু সবাই নয়। হিজরতের পরেও মদিনায় মুশরিক, ইহুদি গোত্র আর পরে মুনাফিকরা ছিল। ইসলাম ছড়িয়েছে ঘরে ঘরে, ধীরে ধীরে (সহিহ বুখারী ৩৯২৫)।

ভুল বোঝা দ্বিতীয় আকাবায় আব্বাস (রা.) মুসলিম হিসেবে বাইআত করেছিলেন

ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় আছে, আব্বাস তখনো নিজের কওমের ধর্মে ছিলেন; এসেছিলেন ভাতিজার নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে। তিনি অনেক পরে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন।

এই গল্প থেকে আমার জীবনে

গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।

অঙ্গীকার রক্ষা করা

আনসাররা যে অঙ্গীকার করেছিলেন, বদর, উহুদ আর খন্দকে তা জীবন দিয়ে রেখেছেন। আল্লাহ বলেছেন, অঙ্গীকার পূরণ করো, অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

আজকের কাজ: যে কথা দিয়ে রাখেননি (ঋণ ফেরত, দেখা করা, কাজ শেষ করা), আজ তার একটি পূরণ করুন বা সময় চেয়ে নিন।

সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৪ কুরআন

ছয়টি অঙ্গীকার নিজের জন্য

আকাবার প্রথম বাইআতের শর্ত ছিল শিরক, চুরি, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা, অপবাদ আর ভালো কাজে অবাধ্যতা থেকে বাঁচা।

আজকের কাজ: আজ রাতে এই ছয়টি বিষয়ে নিজের হিসাব নিন; কোনোটিতে ভুল থাকলে আন্তরিক তাওবা করুন।

সহিহ বুখারী ৩৮৯২ সহিহসূরা আল-মুমতাহিনা ৬০:১২ কুরআন

একজনকে দ্বীন শেখানো

মুসআব (রা.) একা একটা শহরে গিয়ে ঘরে ঘরে কুরআন শিখিয়েছেন। আর সেরা মানুষ সে, যে কুরআন শেখে ও শেখায়।

আজকের কাজ: এই সপ্তাহে পরিবারের বা পরিচিত একজনকে একটি ছোট সূরা, দোয়া বা নামাজের একটি মাসআলা শিখিয়ে দিন।

সহিহ বুখারী ৩৯২৫ সহিহসহিহ বুখারী ৫০২৭ সহিহ

আনসারের মতো হৃদয়

আল্লাহ আনসারদের প্রশংসা করেছেন: তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে, নিজেদের প্রয়োজন থাকলেও অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়।

আজকের কাজ: আপনার এলাকা, অফিস বা মসজিদে নতুন আসা কাউকে আজ নিজে থেকে পরিচিত হয়ে সাহায্যের প্রস্তাব দিন।

সূরা আল-হাশর ৫৯:৯ কুরআন

রাগী মানুষের সামনে শান্ত থাকা

বর্শা হাতে রেগে আসা উসাইদকে মুসআব (রা.) বলেছিলেন: একটু বসে শুনুন। আল্লাহ বলেছেন, মন্দকে প্রতিহত করো যা উত্তম তা দিয়ে।

আজকের কাজ: আজ কেউ রেগে কথা বললে পাল্টা রাগ না দেখিয়ে শান্ত গলায় একটা প্রশ্ন বা অনুরোধ দিয়ে শুরু করুন।

সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪ কুরআন

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন

আনসাররা যখন অঙ্গীকার করেছিলেন, তখন নবীজির (ﷺ) কাছে দুনিয়ার কিছুই দেওয়ার ছিল না, ছিল শুধু জান্নাতের ওয়াদা। আজ যদি দ্বীনের জন্য কিছু করার বিনিময়ে দুনিয়ার কোনো লাভ না থাকে, তবু কি আপনি সেটা করবেন?

সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
  • কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
  • সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
  • ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
  • মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
  • দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।

সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sirat/aqaba/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার